মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)


 

পর্ব:-০৩




বাস স্টপেজে প্রতিদিনের মতো শীতল সকাল নেমেছিল। বেঞ্চে সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি আগের মতোই চুপচাপ সোজা তাকিয়ে বসে ছিল। 


কোলে সেই কালো মলাটের বই আর তার কালো হাত দুটো বইয়ের কিনারায় শক্ত করে রাখা। 


মেহমিল আজ কিছুটা ক্লান্ত আর বিষণ্ণ ছিল, তাই গিয়ে বেঞ্চেই বসে পড়ল। 


দশটা মিনিটই তো কাটাতে হবে, তবে এত এড়িয়ে চলার কী আছে! 


কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি ঘাড় সামান্য তার দিকে ঘোরাল।


"রাতে কি ঠিকমতো ঘুমাওনি?"


"ব্যস এমনিই।" সে অন্যদিকে তাকাতে লাগল।


সামনের রাস্তা খালি ছিল। অন্য পাশে দু-একজন মানুষ বাসের অপেক্ষায় পায়চারি করছিল।


"মানুষের ওপর কি খুব ক্ষোভ?"

মেহমিল চমকে তার দিকে তাকাল।


"আপনি কীভাবে বলতে পারেন?"—সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করল সে।


"তোমার চেহারাতেই লেখা আছে। তোমার মন বিষণ্ণ আর আত্মা ভারাক্রান্ত। তুমি কষ্টে আছো আর মানুষের কথাবার্তা তোমার সহ্য হয় না।


 তাই না?"


"জানি না।" সে ওপর ওপর অবহেলার ভান করে কাঁধ ঝাঁকাল।


 তবে ভেতরে মন জোরে ধকধক করে উঠল।


"আর তুমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত এবং অতীত নিয়ে সম্ভবত দুঃখিত।"


"সম্ভবত..." এবার সে স্পষ্টভাবে চমকে উঠল। অজান্তেই ঠোঁট থেকে কথাটি পিছলে গেল।


"তুমি তোমার ভবিষ্যৎ আর সব দুশ্চিন্তার সমাধান জানতে চাও। 


এমন কিছু হোক যাতে এই তোমাকে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলো তোমার পিছে পিছে ঘোরে, তোমার প্রিয়তম তোমার পায়ে এসে পড়ুক, ধন-সম্পদ তোমার ওপর বর্ষিত হোক, তুমি সবাইকে নিজের মুঠোয় নিয়ে দুনিয়ায় রাজ করো—তুমি কি এটাই চাও না?"


"হ্যাঁ।" মেহমিল অসহায়ভাবে তার দিকে তাকাল। 


তার মন মোমের মতো গলে যাচ্ছিল। সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি তার প্রতিটি দুর্বল শিরা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিচ্ছিল। 


"আমি এটাই চাই।"


"আর যদি আমি তোমাকে এমন কিছু দিই তবে?"


"কী... এই বইটা?" সে ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল।


 তার মনে হচ্ছিল, সে বেশিক্ষণ বাধা দিতে (resist) পারবে না।



"হ্যাঁ, যদি তুমি এটা করতে পারো তবে সব কিছু তোমার মুঠোয় চলে আসবে। 


সব কিছু।" মেহমিল দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ঠোঁট কামড়াতে লাগল। 


এই মেয়েটির কথাগুলো খুব মায়াবী আর আকর্ষণীয় ছিল। তার মনে হলো সে শীঘ্রই পা পিছলে পড়ে যাবে, পথভ্রষ্ট হবে।


"এসব কি এতই সহজ?"


"বোধহয় না। এই বইয়ের আমল (কাজ) করতে তোমার অনেক কষ্ট হবে, কিন্তু একবার শিখে গেলে সব সহজ হয়ে যাবে। জীবন সহজ হবে। আর যাদের জন্য তুমি কাঁদো, তখন তারা তোমার জন্য কাঁদবে। তারা তোমার পিছে পিছে আসবে।"



বাসের তীব্র হর্ন তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। সে চমকে উঠল আর ব্যাগের স্ট্র্যাপ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। 


দশ মিনিট শেষ হয়ে গিয়েছিল।


"আমার বাস..."


"যাও।" কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি হাসল।


সে দ্রুত কদমে বাসের দিকে এগিয়ে গেল। বুক তখনও জোরে ধকধক করছিল।


'প্রিয়তম পায়ে পড়বে, মানুষ মুঠোয় থাকবে, সম্পদ বর্ষিত হবে আর দুনিয়ায় রাজত্ব...'


কীভাবে এসব সম্ভব? সারা রাস্তা সে তার বলা কথাগুলো নিয়ে ভাবতে লাগল। কিন্তু বারবার নিজেকে ধমক দিচ্ছিল।


'এই কালো জাদু, কুফরি কালাম, জাদুটোনা, চিল্লা—এসব খুব খারাপ কাজ।


 এসবের মধ্যে তার জড়ানো উচিত নয়। এমনটা ভাবাও উচিত নয়।'


কলেজের গেটে নামার সময় সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে, ভবিষ্যতে সে আর ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির কাছেও যাবে না। 


বেঞ্চে বসবে না, তার সাথে কথাও বলবে না। তার ভয় হচ্ছিল যে, যদি সে আরও একবার ওই প্রস্তাব শুনে ফেলে, তবে হয়তো সে তা গ্রহণ করে এমন কোনো অচেনা পথে পা বাড়াবে, যেখান থেকে ফেরার পথ হয়তো থাকবে না।

রেজওয়ান হোসেন মাসুম

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

রেজওয়ান হোসেন মাসুম


সেদিন সিদরার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কিছু মানুষ আসছিল। এই খবর মুসাররাত তাকে তখন দিলেন, যখন সে ঘরজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর মেয়েদের দৌড়ঝাঁপ দেখে অবাক হয়ে মায়ের কাছে এসেছিল।


 অন্যথায়, আগে যখনই সে বিকেলে লাউঞ্জের দরজা আলতো করে খুলে আসত, তখন ঘরে এক নিস্তব্ধতা আর জনশূন্যতা ছেয়ে থাকত, কিন্তু আজ......

লম্বা সামিয়া বাঁশের ঝাড়ু দিয়ে ছাদের ঝুল পরিষ্কার করছিল।


 সিদরা ড্রয়িং রুমের সাজসজ্জা নতুন করে সাজাচ্ছিল। নিদা মায়ের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে লন পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিল, আর মেহরিন মেহতাব তায়ির কথা শুনে মাথা নেড়ে কোনো নির্দেশনা নিচ্ছিল। 


একমাত্র আরজুই ছিল, যে বারান্দায় পা তুলে বসে কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে কোনো ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছিল। বেপরোয়া, উদাসীন আর অহংকারী। ভাগ্যিস সে সুন্দরী ছিল না, নইলে হয়তো সে আকাশ থেকে নিচেই নামত না।



'বিয়ের প্রস্তাব সিদরার, আর এই স্বার্থপর পুরো পরিবার উঠেপড়ে লেগেছে, মানে কী?'


"উমমম, আস্তে বলো!"—মুসাররাত ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন, তারপর নিচু স্বরে বলতে লাগলেন। 


"আসলে ভাবি বেগম (তায়ি) কেবল আন্দাজ করছেন যে প্রস্তাব সিদরার জন্যই হবে। 


নোমান ভাইয়ের স্ত্রী বিশেষভাবে কারও নাম নেননি, তাই ফিজার হয়তো কিছুটা আশা আছে।"


"নোমান ভাইয়ের স্ত্রী কে?"


"তোমার আব্বার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। উনার ছেলে ফুরকান অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। খুব ভালো পরিবার। আর একটি মেয়ে আছে, বিবাহিত—অস্ট্রেলিয়ায় থাকে।


 বেগম নোমান কারও মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছেন।"



'আর এই সব মেয়েরা এই আশায় লেগে আছে যে হয়তো তিনি তাদের বিয়ের প্রস্তাব চেয়ে বসবেন।


 ওয়াট রাবিশ!’—সে বিদ্রূপের হাসি হেসে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।



বিকেলে মুসাররাত তাকে রান্নাঘরে সাহায্যের জন্য ডেকেছিলেন। 


"আচার গোশত, বিরিয়ানি, শিক কাবাব, ফ্রায়েড ফিশ আর কত কিছু করবেন আপনি?"—সে বাসনের ঢাকনা তুলে তুলে উঁকি দিতে দিতে জিজ্ঞেস করছিল।



"এইসব তো তৈরি। তুমি মিষ্টির দুটো পদ আর রাশিয়ান সালাদ বানিয়ে দাও। আর চায়ের সাথে স্ন্যাকসও।"


"চাও আবার খাবারও?"—সে কোমরে হাত রেখে অবাক হয়ে বলল। 


"এত কিছু কিসের জন্য? সিদরা বাজির জন্য কি বিয়ের প্রস্তাবের আকাল পড়েছিল?"


"উমমম, আস্তে বলো।"


"আমি কাউকে ভয় পাই না কি? এখনই গিয়ে মুখে এ কথা বলতে পারি।"


"আর তোমার এই বলার কারণে কথাগুলো তো আমাকে শুনতে হয় মেহমিল!"—তিনি ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে বললেন, তখন সে চুপ হয়ে গেল। 


তারপর ওড়নাটা কোমরে কষে বেঁধে কাজে লেগে পড়ল।


চায়ের ট্রলি সে অনেক যত্ন আর পরিশ্রম দিয়ে সাজিয়েছিল। ওই সময়ও সে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বসে ট্রলির নিচের অংশে প্লেটগুলো সেট করছিল, যখন মেহতাব তায়ি কিছু বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢুকলেন। সিদরা উনার পেছনে ছিল।


"সব কি তৈরি?"


"জি।"—সে বসা অবস্থাতেই ঘাড় তুলল। 


মেহতাব তায়িকে কিছুটা তাড়াহুড়োর মধ্যে মনে হচ্ছিল।


"ঠিক আছে সিদরা! তুমি এটা নিয়ে যাও। 


আর মিষ্টি কোথায়? আমার মনে হয় চায়ের পরেই কথা পাকা করে ফেলি, মিষ্টি ততক্ষণ সাজিয়ে রাখো।"


"উনারা তো কেবল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তায়ি! কথা এত জলদি পাকা করে দেবেন?"—সে অবাক হয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল। 


তায়িও অন্য মুডে ছিলেন, তাই বলতে লাগলেন—"হ্যাঁ, তো এখন আর কিসের অপেক্ষা? 


ছেলে এত ভালো আর সুদর্শন, আবার আমাদের কাছে কি কিছুর অভাব আছে? 


বাগদান (এনগেজমেন্ট) আরামসে এক-দুই মাসের মধ্যে করব। আর বিয়ে বছর দেড়েক পর।


সিদরার বিয়ে এমন ধুমধাম করে দেব যে দুনিয়া দেখবে।"—উনার ঢঙে অহংকারের গন্ধ যেন বেয়ে পড়ছিল।


এক মুহূর্তের জন্য মেহমিলের ইচ্ছে হলো, ড্রয়িং রুমে বসে থাকা সেই মার্জিত নারী যেন সিদরাকে অপছন্দ করে চলে যান আর তায়ি যেন শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। 


আসলে দখলদার মানুষ কার ভালো লাগে? কিন্তু হয়তো এখানে সব পরিকল্পনা হয়েই গিয়েছিল।


 সিদরা চিকন হিলের 'টুক-টুক' শব্দ তুলে ট্রলি ঠেলে নিয়ে গেল আর সে খালি রান্নাঘরে চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়ল। 


মুসাররাতও মেহমানদের কাছে ছিলেন—কে জানে কীভাবে তায়ির কাছে হঠাৎ করে আজকের জন্য উনাকে পরিবারের সদস্য মনে হলো এবং সেখানে বসিয়ে রাখলেন।


"এই মেহমিল শোনো,, টিস্যু নিয়ে আসো! টিস্যু.....!"—নাঈমা চাচি জোরে হাঁক দিলেন, তখন সে দ্রুত উঠল। 


টিস্যু রাখতে ভুলে গিয়েছিল? 


উফ! সে টিস্যুর বক্স নিয়ে দৌড়াল। 


লাউঞ্জে এক মুহূর্তের জন্য থেমে বড় আয়নায় নিজেকে দেখল। উঁচুতে বাঁধা ঝুঁটি, কালো জিন্সের ওপর লম্বা সাদা কুর্তা আর গলায় বিশেষ ঢঙে পেঁচানো একটি টাই-অ্যান্ড-ডাই ওড়না, যা সে অনেক পোশাকের সাথেই ব্যবহার করত। 


এটা সম্ভবত গতর আগের কোরবানির ঈদে বানানো জোড়া ছিল, যা এখন বেশ পুরনো হয়ে গিয়েছে। 


'যাই হোক, কে আর আমার বিয়ের প্রস্তাবের জন্য এসেছে!'—সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেল।



মার্জিত আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বেগম নোমান বড় সোফায় আয়েস করে বসে হাসিমুখে মেহতাব তায়ির কথা শুনছিলেন। 


মেহমিলকে আসতে দেখে তিনি কিছুটা খুশি হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।


"মেহমিল বেটা! তুমি এখন এলে? কতক্ষণ ধরে তোমার তায়ির কাছে জিজ্ঞেস করছিলাম।"—সে হুট করে একটু ঘাবড়ে গেল কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখা করল।


"আসসালামু আলাইকুম!"


"ওয়ালাইকুম আসসালাম। অনেকক্ষণ ধরে তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলাম।"

"........."



"হ্যাঁ, আমি.........


আমি জানি বেটা! তুমি নিশ্চয়ই এই আয়োজনে ব্যস্ত ছিলে। 


আমার মনে আছে, যখন আমি করিম ভাইয়ের অসুস্থতার খবর নিতে এসেছিলাম, তখন এই একলা মেয়েটা সব রান্না করেছিল।"—তিনি তাকে নিজের সাথে বসিয়ে পরম মমতায় দুই বছর আগের কথা বলছিলেন।



সে ঘাবড়ে গিয়ে কখনো তায়ির শক্ত হয়ে যাওয়া মুখ দেখছিল তো কখনো সিদরার বিবর্ণ হয়ে যাওয়া চেহারা।


 সে তো কেবল টিস্যু দিতে এসেছিল, তবে এত অভ্যর্থনার মানে কী?



"আপনি এই ড্রামস্টিকগুলো নিন না 

ভাবি!"—তায়ি উনার মনোযোগ সরাতে চাইলেন।


"আরে, এটা তো আমার ফেভারিট। 


মেহমিল! তুমি বানিয়েছ না? আমার মনে আছে, তুমি সেবারও খাবারে এটা বানিয়েছিলে আর ফারি বেটি স্পেশালি তোমার কাছ থেকে রেসিপি জেনে গিয়েছিল।"


আর মেহমিল বুঝতে পারছিল না কী করবে। অসহায়ভাবে সে কোনোমতে কেবল মাথা নাড়ছিল। 


ওদিকে তায়ি মেহতাব এখন দুশ্চিন্তায় পড়ছিলেন। এটাই তো সব সময় হয়ে আসছিল।


 সিদরার বিয়ের প্রস্তাবের জন্য আসা প্রতিটি মেহমানের সামনে তিনি মেহমিল আর মুসাররাতের বানানো জিনিসগুলোকে 'আমার সিদরা বানিয়েছে' বলে পরিবেশন করতেন, কিন্তু কে জানে ওই নারী কখন তাদের ঘরের সব খবর নিয়ে গিয়েছিলেন।


"ব্যস ভাবি! আমাদের ঘরের মেয়েরা মাশাআল্লাহ সবাই খুব গুণবতী।"—ফিজা চাচি দৃশ্যত হেসে কথা সামলানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুটা অস্থির তিনিও ছিলেন। 


কোথাও কিছু একটা খুব ভুল হচ্ছিল।


"জি, কিন্তু এসব তো সিদরা বানিয়েছে। বেচারি সকাল থেকে লেগে ছিল।"—মুসাররাত তাড়াতাড়ি বললেন।



"জি, জি।"—তায়ি মেহতাব সাথে সাথে সায় দিলেন।


"ভেরি গুড সিদরা!"—বেগম নোমান এখন বক্স প্যাটিস নিচ্ছিলেন।


 "এই বক্স প্যাটিস তো খুব ভালো বানিয়েছ সিদরা! এর ফিলিং-এ কী কী দিয়েছ?"



আর সিদরার তো সাত জন্মেও জানা ছিল না যে বেকারি প্যাটিসে কী কী দেওয়া হয়। সে একদম কনফিউজড হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।


"আসলে আমি রান্নার খুব শখ রাখি এবং আমার সন্তানদের রুচিও খুব উন্নত। 


নোমান সাহেব নিজে অনন্য আর ভালো খাবারের ভক্ত, তাই সব সময় বলেন যে পুত্রবধূ খুঁজলে তার হাতের স্বাদ চেখেই বিয়ের প্রস্তাব দিও। 


এমনিতে আপনাদের সব মেয়েরাই মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর আর সলিড, কিন্তু মেহমিল আমার কাছে বিশেষভাবে প্রিয়। সাঈদা আপা নিশ্চয়ই উল্লেখ করেছেন যে আমি বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে আসছি, তো এখন লম্বা-চওড়া ভূমিকা আর কী বাঁধব? 


মেহতাব আপা! ফুরকান তো আপনাদের চেনা-জানাই। আল্লাহর শুকুর, তিনি আমাদের সব দিক থেকে ধন্য করেছেন। 


কেবল মেহমিলের জন্য আমি আপনাদের কাছে আরজি নিয়ে এসেছি। যদি সম্ভব হয় তবে ওকে আমার পুত্রবধূ করে দিন।"



আর মেহতাব তায়ির পক্ষে এর বেশি শোনা কষ্টকর হচ্ছিল। "মেহমিল! তুমি ভেতরে যাও।"—তিনি নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক রেখে ইশারা করলেন, তখন সে যে হতাবাক হয়ে বসে শুনছিল, দ্রুত বাইরে সে বেরিয়ে গেল।



পেছনে কী কথা হলো, কে কী বলল, কখন ওই নারীকে খাবার না খাইয়েই বিদায় করে দেওয়া হলো আর তায়ির বন্ধ ঘরে সব বড়দের কী আলোচনা হলো—সে সবকিছু থেকে দূরে নিজের ঘরে কান পেতে পড়ে রইল। 


তার মন কিছুই করতে চাইছিল না। অদ্ভুত এক অনুভূতি, যেন বন্ধ গুহায় আলো আর বাতাসের কোনো পথ খুলে গেছে। নিরানন্দ আর পানসে জীবনে হুট করেই খুব সুখকর আর সতেজ এক মোড় এসেছিল।


 আশাগুলো আবার জীবিত হয়ে উঠেছিল এবং তার মনে হচ্ছিল যে একটি নতুন জীবন দুহাত বাড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে দাঁড়িয়ে আছে।



'অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সুদর্শন ফুরকান, মা-বাবার একমাত্র ছেলে, ভালো খাবারের শৌখিন'—তার ঠোঁট অজান্তেই হাসিতে ভরে উঠল।

রেজওয়ান হোসেন মাসুম

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

রেজওয়ান হোসেন মাসুম

"ওরা সিদরার বদলে আমার বিয়ের প্রস্তাব চেয়ে পাঠিয়েছে। Can you believe it? আমি তো পুরো থতমত খেয়ে গেছি।


 ওহ গড! কিন্তু প্রস্তাবটা এত ভালো যে কী বলব, ওই আন্টি এত লাভিং আর সুইট ছিলেন যে তোমাকে বোঝাতে পারব না। 


আর জানো, উনার ছেলে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং... তুমি কি আমার কথা শুনছ না কি না?" সে ফাইলে পাতা গোছাতে থাকা নাদিয়ার কাঁধ নাড়িয়ে দিলে সে—"হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো না, তারপর কী হলো?" বলে আবারও পাতার বিন্যাস ঠিক করতে লাগল।


"হওয়ার আর কী ছিল, তায়ি আম্মার চেহারা তো দেখার মতো হয়ে গিয়েছিল।"



"আচ্ছা।" নাদিয়া এখন ইংলিশ বইয়ের পাতা উল্টে কিছু খুঁজছিল। 


তারা দুজন কলেজের বারান্দার সিঁড়িতে বসে ছিল আর মেহমিল তাকে গতকালের পুরো ঘটনা শোনাচ্ছিল।



"তায়ি আমাকে সাথে সাথে ওখান থেকে পাঠিয়ে দিলেন। বেচারি প্রতিটি জিনিস সিদরার বানানো বলে চালিয়ে দিচ্ছিলেন কিন্তু ওই আন্টিও খুব চতুর ছিলেন, 


এমনভাবে সব ফাঁস করে দিলেন যে তায়ি অনেকদিন মনে রাখবেন... তুমি আমার কথা শুনছ না নাদিয়া!" সে অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে নিল।


"না, না। শুনছি তো।" নাদিয়া ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফাইলটা একপাশে সিঁড়িতে রাখল, কিন্তু মেহমিল মুখ ফিরিয়েই বসে রইল। 


"আচ্ছা বলো না, তো ওই সাহেব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার?"



"আমি দুই ঘণ্টা ধরে বকবক করে ক্লান্ত হয়ে গেছি যে উনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, তুমি যদি মন দিয়ে শুনতে তবে এই প্রশ্ন করতে না। 


তুমি তোমার ফাইল গোছাও, আমি যাচ্ছি।" সে ব্যাগ তুলে উঠে দাঁড়াল তো নাদিয়াও সাথে সাথে উঠল।



"আরে, রাগ কোরো না তো।"

"না রে! সিরিয়াসলি রাগ করিনি।


 আমার মনে পড়ল, একটা কাজের জন্য আমাকে এখন ম্যাডাম মিসবাহর সাথে দেখা করতে হবে। আমি একটু পর আসছি।" মেহমিল কৃত্রিমভাবে হেসে বলল এবং ঘুরে হাঁটা দিল। 


যখন সে মাথা নিচু করে হনহন করে হাঁটত, তখন উঁচুতে বাঁধা ঝুঁটিটা এদিক-ওদিক দুলত যা তাকে খুব মানাত।

কয়েক কদম দূরে গিয়ে সে সামান্য ঘুরে দেখল, নাদিয়া খুব শান্তিতে আর মগ্ন হয়ে বসে ফাইলে কিছু লিখছে। 


সে আক্ষেপ নিয়ে আবার সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। কত দ্রুত নাদিয়া, তার তথাকথিত So called 'বেস্ট ফ্রেন্ড', তার পানসে হাসির সাথে বলা শেষ বাক্যটা বিশ্বাস করে নিল যে সে সত্যিই রাগ করেনি—অথচ সে রেগে ছিল। 


বাড়িতে আম্মা ছিল আর কলেজে নাদিয়া, যাদের কাছে সে মনের কথা শেয়ার করত। কিন্তু দুজনেই খুব অবহেলা নিয়ে শুনত, কখনো কাজে ব্যস্ত থাকলে 'হুঁ-হ্যাঁ' করে দিত তো কখনো শুনতই না।



'এই পৃথিবীতে কেউ কারও আপন নয়।' সে সামনের বারান্দার একটা একা স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল আর বিষণ্ণ মনে লনের সবুজ চত্বরের দিকে তাকাল। সোনালী আর উজ্জ্বল সকাল সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল। ঘাসের ওপর ছোট ছোট দলে সাদা ইউনিফর্ম পরা মেয়েরা বসে ছিল। কেউ খাওয়া-দাওয়ায় তো কেউ গল্পগুজবে ব্যস্ত। সবার নিজস্ব এক পৃথিবী ছিল এবং তারা তাতেই মগ্ন ছিল। এটাই কি জীবন? নাকি তার জীবনের মতো কঠিন জীবন আর কারও ছিল না?

সে আক্ষেপ করে ভাবল—'আমি কি কখনো সেই সুখগুলো পাব না যা আমি চাই? বড় একটা বাড়ি, অগাধ সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, একজন ভালোবাসার জীবনসঙ্গী... এসব কি আমার পায়ে একসাথে জড়ো হতে পারে?' সে স্তম্ভে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। বন্ধ চোখের পাতায় সোনালী স্বপ্নরা নামতে শুরু করল।


 'ওই অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অথবা ফাওয়াদ (ফাওয়াদ কারীম)—আমি এদের যেকোনো একজনের স্ত্রী হতে পারলেই সবকিছু আমার হতে পারে। 


সবকিছু আমার পায়ে জড়ো হতে পারে। সর্বোচ্চ সবকিছুর উচ্চতা...'


"যে ওই আমলগুলো (কাজ) করে নেয়, সে দুনিয়া শাসন করে।"


"এমন কিছু হোক যাতে তোমাকে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলো তোমার পিছে পিছে ঘোরে, ধন-সম্পদ তোমার ওপর বর্ষিত হোক, তোমার প্রিয়তম তোমার পায়ে এসে পড়ুক।"


"আর যদি আমি এমন কিছু তোমাকে দিই তবে?"


সে এক ঝটকায় চোখ খুলল। হঠাৎ করেই সেই সব কথা আর ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির কালো উজ্জ্বল চোখগুলো তার মনে পড়ে গেল।


"তুমি সবাইকে নিজের মুঠোয় নিয়ে দুনিয়ায় রাজ করো। তুমি কি এটাই চাও না?" সে ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। 


মনে হচ্ছিল, ওই মেয়েটি তার সেই রহস্যময় কণ্ঠে তার পাশ থেকেই কথা বলছে।


'জানি না, কী করব?' তার বুক জোরে জোরে ধকধক করছিল। এক মুহূর্তের জন্য সে ওই বইটি তার কাছে চাওয়ার কথা ভাবল কিন্তু পরের মুহূর্তেই ভয়ের দাপট তাকে গ্রাস করল।


 'না, না! জানি না কেমন কালো জাদু আছে ওর কাছে। আমি এসব কাজে জড়াব না। আগা জান জানতে পারলে আমার পা ভেঙে দেবেন।' সে নিজেকে ধমক দিয়ে ফাইল আর ব্যাগ সামলে উঠে দাঁড়াল। 


সে ঠিক করে নিল ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির সাথে আর কোনো কথা বলবে না, ব্যস! তবে মনের কোনো এক গোপন কোণে ওই বইটি পাওয়ার ইচ্ছা খুব নিঃশব্দে মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছিল।







চলবে,,,,


Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)