মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:-০৪
এই দিনগুলোতে মুসাররাত খুব খুশি থাকতে শুরু করেছিলেন এবং তাকে দেখে মেহমিল নিজেও আনন্দিত হতো।
"জানো মেহমিল! এরা খুব ভালো মানুষ। নোমান ভাই অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি আর উনার ছেলে তো ভীষণ হ্যান্ডসাম। আল্লাহ আমাদের ডাক শুনেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের ওপর রহম করবেন।"
মাঝেমধ্যে তিনি বসে মেহমিলকে এসব শোনাতেন, আর মেহমিল চুপচাপ হাসি চেপে মাথা নিচু করে শুনে যেত। এখন থেকে সে ঘরের কাজও খুব শান্তিতে করে দিত।
কয়েকদিন ধরে তায়িকে মুখে মুখে জবাব দেওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো এই কারাগার থেকে বের হওয়ার কোনো আশা যে জেগেছিল।
সিদরা অবশ্য উঠতে-বসতে তাকে খুব অদ্ভুত নজরে দেখত। মেহমিল ভ্রুক্ষেপ করত না, কিন্তু সেদিন তো সীমা ছাড়িয়ে গেল।
সে যখন বিকেলের চায়ের ট্রলি ঠেলে বাইরের লনে নিয়ে এল, সিদরা তাকে দেখামাত্রই মুখ ফিরিয়ে নিল।
'হয়তো এখনো রেগে আছে'—সে ভাবল এবং অনেকটা ক্ষতিপূরণ করার মতো করেই সবার আগে সিদরার জন্য কাপ বানাল।
"সিদরা আপু! চা নিন"—খুব ভদ্রভাবে হেসে কাপ বাড়িয়ে দিল সে।
"আপু? আমি তোমার আপু হই?"—সিদরা কাপ নিতে গিয়ে সজোরে ঝাড়া দিল। ফুটন্ত গরম চা মেহমিলের হাঁটুর ওপর পড়ল। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে দাঁড়াল, কাপটা ঘাসের ওপর গিয়ে পড়ল।
"এভাবে মানুষের সামনে আপু বলে তুমি কি এটা জাহির করতে চাও যে আমি বুড়ি হয়ে গেছি, হ্যাঁ?"
—সিদরা হুট করেই চেঁচাতে শুরু করল। "মাম্মি! মাম্মি! ওকে দেখুন, ও সব সময় এটাই করে। ও সব সময় মানুষের সামনে আমাকে অপমান করে।" সিদরা ডুকরে কাঁদতে শুরু করল।
"আরে ওদের তো এটাই স্বভাব, এই মা-মেয়ে তো এই বাড়ির সুখ দেখতে পারে না।
না আমার মা! তুই মন খারাপ করিস না।
আর তুই এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, তোর অপয়া চেহারা আমার সামনে থেকে নিয়ে যা।"—মেহতাব তায়িও অনেক দিনের জমে থাকা রাগ একবারে উগরে দিলেন।
মেহমিল হতভম্ব হয়ে দৌড়ে ভেতরে এল। মুসাররাতও চিন্তিত হয়ে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনিও সব শুনেছিলেন। মেহমিল কিছু না বলে নিজের ঘরে খিল দিল।
মেহমিল আন্দাজ করেছিল যে বেগম নোমানের কথার পর থেকে তায়ির মেজাজ খারাপ ছিল, কিন্তু তিনি কিছু বলছিলেন না, চুপচাপ ছিলেন। সম্ভবত এই ভেবে যে এখন তারা মেহমিলের হবু শ্বশুরবাড়ি, তাদের সাথে ঝামেলা করে কী লাভ।
কিন্তু রাতে তার এই ভুল ধারণা ভেঙে গেল, যখন সে রান্নাঘরে মেহতাব তায়িকে মুসাররাতের উদ্দেশ্যে বলতে শুনল—
"আমরা তো সেদিনই নোমান ভাইদের না করে দিয়েছি। মেহমিলের কি এখন বিয়ের বয়স হয়েছে? এখনো ঘরের বড় মেয়েরা আছে, আগে তাদের হবে, তারপরই মেহমিলকে নিয়ে ভাবব। চা আগা সাহেবের রুমে পাঠিয়ে দাও, তিনি রাতে খাবার খাবেন না। আর টেবিল সাজাও।" তিনি আদেশ দিয়ে নির্বিকারভাবে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
রান্নাঘরের দরজায় বিষণ্ণ মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহমিলের ওপর কেবল এক অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন।
অন্যদিকে ভেতরে বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা মুসাররাতের দিকে ফিরেও তাকালেন না, যার বুকে তিনি যেন বিষাক্ত তীর বিঁধিয়ে দিয়েছিলেন।
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
সে জানত না কেন, তবে রাত অনেক অব্দি সে বারান্দার সিঁড়িতে বসে কাঁদছিল। ভেতরে সবাই ঘুমাচ্ছিল, মুসাররাতও ঘুমাতে চলে গিয়েছিলেন। সে পড়াশোনার বাহানা করে বাইরে এসেছিল এবং দীর্ঘক্ষণ সেখানে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছিল।
অল্প বয়সের প্রথম স্বপ্ন ছিল এটি, যা এমনভাবে চুরমার হয়ে গিয়েছিল যে তার আত্মা চিৎকার করে উঠছিল। সে এতটাই আঘাত পেয়েছে যে তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। কেউ কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, যতটা তায়ি ছিলেন? যতটা এই সব মানুষ ছিল? তার মন চাইছিল, সে অঘোরে ঘুমানো এই মানুষগুলোর ঘরে আগুন লাগিয়ে দিক, অথবা ছু*রি দিয়ে তাদের গলা কে*টে ফেলুক অথবা বি*ষ দিয়ে সবাইকে মেরে ফেলুক। আর শেষে নিজেও সেই বি*ষ পান করুক। ঘৃণা—তীব্র ঘৃণা অনুভব করছিল সে তার এই আত্মীয়দের প্রতি। তার মন চাইছিল সে এই নিচ আর জঘন্য মানুষগুলোর থেকে দূরে কোথাও চলে যাক, যেখানে তাকে এদের মুখ দেখতে হবে না।
আর সত্যিই, এবার সে চলেও যাবে। সে ঠিক করে নিয়েছিল, শুধু একবার ওই স্কলারশিপটা পেয়ে গেলেই হবে, যার জন্য সে ব্রিটিশ হাই কমিশনের বিজ্ঞাপনের পর আবেদন করেছিল।
বাড়ির পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সে পঞ্চম শ্রেণি থেকে এফএসসি পর্যন্ত প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষায় পুরো বোর্ডে টপ করেছিল।
এফএসসি প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং-এ টপ করা সত্ত্বেও তার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দিকে ঝোঁক ছিল না, বা আর থাকেনি। তাই বিএসসি ম্যাথ-এ অ্যাডমিশন নিয়েছিল এবং তার আশা ছিল এবারও সে-ই টপ করবে। আর যদি স্কলারশিপটা পেয়ে যায়, তবে খুব সহজেই এই কারাগার থেকে তার মুক্তি মিলবে।
সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে এই চিন্তায় মগ্ন ছিল, ঠিক তখনই কেউ তার সামনে এসে দাঁড়াল। সে জুতো দেখে চমকে উঠল এবং ভেজা মুখ তুলে তাকাল।
ওয়াসিম তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
"ওয়াসিম ভাই?" সে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো উঠে দাঁড়াল এবং দুই কদম পিছিয়ে গেল।
সে ছিল মেহতাব তায়ির তৃতীয় ছেলে।
ফাওয়াদ কারীমের ছোট এবং অকর্মণ্য ও বখাটে ভাই।
ওই সময়ও সে তার লাল চোখ দিয়ে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিল। কে জানে কখন হঠাৎ এসে সেখানে দাঁড়িয়েছিল।
খোলা কলার, টাইট জিন্স, গলায় ঝোলানো চেইন, উস্কোখুস্কো চুল আর লাল চোখ।
সে নেশা করত, বাড়িতে সবাই জানত। এমনকি ফিজা চাচি তার মেয়েদের ওয়াসিমের কাছেও ঘেঁষতে দিতেন না। নিজে থেকে হাসানও সাবধান থাকত।
আরজু অবশ্য লাপরোয়া আর নির্ভীক ছিল। এমনিতে ওয়াসিমকে বাড়িতে খুব কমই দেখা যেত। মেহমিল যথাসম্ভব সাবধানে থাকত যেন একান্তে তার মুখোমুখি হতে না হয়, কারণ তার চোখের চাউনি দেখে মেহমিলের ভয় লাগত। কিন্তু আজ যে কেন...
"কী করছ এখানে?" সে এক ধাপ ওপরের সিঁড়িতে পা রাখলে মেহমিল
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আরও পিছিয়ে গেল।
"কিছু... কিছু না। ওই যে আগা জান ডাকছেন।" সে এক ঝটকায় ঘুরে ভেতরে দৌড়ে পালাল।
"হুহ!" ওয়াসিম বিদ্রূপের সাথে মাথা ঝাকালো, কয়েক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবল, তারপর বাইরের গেটের দিকে হাঁটা দিল।
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
সে খুব ভারাক্রান্ত ছিল। বাস স্টপেজে পৌঁছে একা বসে ফোলা চোখে দূরের দিগন্তে কে জানে কী খুঁজছিল, যেখানে নীল সকালের পাখিরা উড়ছিল। সারা রাত কান্নার কারণে তার মাথায় ব্যথার স্পন্দন উঠছিল এবং তার ওপর সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটিও আসেনি।
কে জানে আজ সে কোথায় রয়ে গেল? এখন পর্যন্ত কেন এল না? শুধু এ জন্যই মেহমিল আজ পনেরো মিনিট আগেই চলে এসেছিল, যাতে দশ মিনিটের বদলে পঁচিশ মিনিট তার সাথে দেখা হয়; কিন্তু সে তো এটাও জানত না যে মেয়েটি কখন আসে। সে এটাও জানত না যে কেন সে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
যদিও এমন কোনো কথা ছিল না যা সে তার সাথে শেয়ার করতে পারত, কোনো সমস্যার সমাধান চাইতে পারত বা তার সাথে বসে কাঁদতে পারত।
না, তার কাছে বলার মতো কিছুই ছিল না, তবুও সে তার অপেক্ষা করছিল। সে বারবার কবজিতে বাঁধা হাতঘড়ি দেখছিল।
মুহূর্তগুলো সরে যাচ্ছিল, পঁচিশ মিনিট শেষ হওয়ার পথে, কিন্তু সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো নামনিশানা ছিল না।
বাসের হর্ন বাজলে সে ভগ্ন হৃদয়ে উঠে হাঁটা দিল। পাথরের বেঞ্চটি খালি রয়ে গেল। সকালের পাখিরা তাদের গন্তব্যে বেরিয়ে পড়ল এবং নীলচে সোনালী দিগন্ত সোনালী রশ্মিতে ভিজে উঠতে লাগল। সে খুব উদাস মনে বাসে সওয়ার হয়েছিল।
সারা রাস্তা মুখ ফিরিয়ে জানালার ওপাশে তাকিয়ে রইল। তার সুরাহির মতো দীর্ঘ সুন্দর ঘাড় উঁচুতে বাঁধা ঝুঁটির(পনিটেইল) কারণে পেছন থেকেও দৃশ্যমান ছিল এবং তাকে সবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছিল। বাস থামার আগে সে ব্যাগ থেকে পকেট মিরর বের করে দেখল এবং তারপর কিছু ভেবে ফোলা চোখ ঢাকতে ঘন করে কাজল দিল।
"মেহমিল! তুমি এত কাজল দিও না।
মাইন্ড কোরো না, কিন্তু তোমার চোখ একদম সোনালী রঙের আর কাজলে তোমাকে একদম বিড়ালের মতো লাগে।
ইউ নো, ক্যাট ওমেন।"—নাদিয়া দেখে হেসে বলেছিল।
"আর আমি বিড়াল একদম পছন্দ করি না।
খাবে?"—সে হাতে থাকা চিপসের প্যাকেট এগিয়ে দিল।
মেহমিল তার দিকে একবার নিঃশব্দে তাকাল এবং "নো থ্যাঙ্কস" বলে মাথা নিচু করে নিজের বইয়ে কিছু লিখতে লাগল।
মাথা নিচু করায় তার উঁচুতে বাঁধা ঝুঁটি(পনিটেইল) আরও উঁচিয়ে উঠল এবং বাদামী চুলগুলো ঘাড়ে এসে পড়তে লাগল।
"মাই প্লেজার!"—নাদিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্যাকেটটি ফিরিয়ে নিল।
সে চুপচাপ মাথা নিচু করে কিছু লিখতে থাকল। সে লাইব্রেরিতে নাদিয়াকে কালকের তায়ি আম্মার উত্তরের কথা বলতে এসেছিল, কিন্তু তার বিদ্রূপ শুনে মন একদম ভেঙে গেল।
নাদিয়া তুড়ি বাজিয়ে মেহমিলের সুন্দর বাদামী-সোনালী চোখগুলোকে বিড়ালের সাথে তুলনা করে দিল; হয়তো এ জন্যই যে সাধারণ চেহারার নাদিয়া যখন মেহমিলের সাথে হাঁটত, তখন অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে সবসময় প্রশংসার দৃষ্টিতে মেহমিলের দিকেই তাকাত।
দীর্ঘদেহী, স্মার্ট, লম্বা ঘাড় আর উঁচুতে বাদামী ঝুঁটি(পনিটেইল) বাঁধা মেয়েটি, যার সোনালী চোখ রোদে আরও বেশি জ্বলজ্বল করত, পুরো কলেজে জনপ্রিয় ছিল। এমন অবস্থায় সে কাজল দিয়ে যখন আরও বেশি সুন্দরী লাগত, তখন নাদিয়া মাঝেমধ্যে সহ্য করতে পারত না এবং এমন কিছু অবশ্যই বলে দিত যা মেহমিলের মন ভেঙে দিত।
এখনও সে নাদিয়া—তার বেস্ট ফ্রেন্ডের কাছে কাঁদতে এসেছিল, কিন্তু নাদিয়ার কাছে তার দুঃখ-কষ্ট শোনার ফুরসত ছিল না। সে অনবরত নিজের নোটসে মগ্ন ছিল এবং যখন সামান্য সময়ের জন্য অবসর পেল, তখন তার মন এমনভাবে ভাঙল যে সে আর কিছু বলতেই পারল না।
"হ্যাঁ, তুমি কিছু বলছিলে।" সে বইয়ের আড়ালে চিপসের প্যাকেট লুকিয়ে অনবরত চিপস বের করে চিবুচ্ছিল।
"তায়ি আম্মার কোনো কথা ছিল বোধহয়..."
"না। কোনো কথা ছিল না।"
"আচ্ছা, আমার মনে হয়েছিল।"
"তোমার ভুল মনে হয়েছিল। আমি আসছি। জারার সাথে কিছু কাজ আছে।"
সে ব্যস্ততার ভান করে বইগুলো তুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
পরের দুদিন এভাবেই অবসাদে কাটল। দুশ্চিন্তা, হতাশা, নিরাশা আর কষ্ট—সে সব ধরনের নেতিবাচক চিন্তায় ঘেরা ছিল।
মনে হচ্ছিল যেন দুনিয়া থেকে রঙই হারিয়ে গেছে।
সবকিছু পানসে লাগছিল আর মনের বাগান ছিল জনশূন্য, উজাড়। এবং তারপর হঠাৎ তৃতীয় দিনে সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি এল।
দূর থেকে তাকে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখে মেহমিলের ভেতরে হুট করেই রাগের একটি ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে হনহন করে হেঁটে তার কাছে এল।
"তুমি দুদিন ধরে কোথায় ছিলে?"
কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি মাথা তুলল। মেহমিল খুব রাগী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"আমার কিছু কাজ ছিল, আমি..."
"তোমাদের খুব মজা লাগে অন্যদের অপেক্ষা করিয়ে রাখতে?
তোমার কি মনে হয় আমি তোমার সাহায্য ছাড়া মরে যাব?
হ্যাঁ, যদিও এমনটা হবে না। তুমি মনোযোগ পাওয়ার জন্য এমন সব কথা বলো যাতে অন্য কেউ তোমার দিকে ছুটে আসে।
কিন্তু আমার তোমাকে একদম প্রয়োজন নেই আর না আমি তোমার তোয়াক্কা করি আর... আর আমার তোমার বইয়েরও প্রয়োজন নেই। আমি মরিনি তোমার সাহায্য ছাড়া। দেখো, দেখে নাও! আমি বেঁচে আছি।" দ্রুত কথাগুলো বলতে বলতে সে হাঁপাতে লাগল।
কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি সামান্য হাসল।
"তাহলে তুমি আমার অপেক্ষা করছিলে?"
"না। একদম না।" সে দু কদম পিছিয়ে গেল।
"আমার তোমাকে কোনো প্রয়োজন নেই।"
"তুমি সম্ভবত উচ্চস্বরে নিজের মনের আওয়াজকে অস্বীকার করছো। যদি তাই হয় তবে এমনটা করো না।
নিজের মনের কথা শোনো। সে তোমাকে কিছু বলছে।"
"আমাকে ডিক্টেট কোরো না। আমি আমার ভালো-মন্দ খুব ভালো বুঝি।
তুমি আমার সাথে আশা আর ভয় দেখিয়ে এই বই আমাকে গছাতে চাও। তোমার উদ্দেশ্য আমাকে মুরিদ বানিয়ে রাখা, আমি তোমার থেকে এই বই কখনোই কিনব না।"
"আমি তোমাকে এটা বিক্রিও করছি না। কিন্তু একদিন এমন আসবে যখন তুমি নিজেই আমার কাছে এই বই চাইতে আসবে এবং তখন আমি তখনই এটা তোমাকে দিয়ে দেব।
এখন তুমি সফরের শুরুতে আছো। আর যখন ক্লান্ত হবে, তখন এই বইয়ের পেছনে আসবে। আমি তোমার কোনো কথায় কিছু মনে করিনি। আমি শুধু তোমার ক্লান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছি। তোমার বাস এসে গেছে।"
ওই সময় সে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল, কিন্তু তারপর সারা দিন এটাই ভাবতে থাকল যে ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটিকে দেখে তার কী হয়েছিল।
কেন সে তার ওপর এত রাগ করল?
মেয়েটি তার কে হতো?
সে তার কী ক্ষতি করেছিল?
আর তার রাগ কিসের ওপর ছিল? এমন অপরিচিত মানুষের সাথে মেহমিল ইব্রাহিম কখনো এমন ব্যবহার করত না,
তবে এখন কেন?
অনুতাপ আর লজ্জার অনুভূতি তাকে সারা দিন আঁকড়ে ধরল। সে রান্নাঘরের সব কাজ খুব অমনোযোগের সাথে শেষ করল। পড়াশোনাও ঠিকমতো করতে পারল না। পরীক্ষা চলছিল, এখনও তার কাছে পড়ার অনেক কিছু ছিল; কিন্তু সারা দিন অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে বিদ্ধ করতে থাকল।
আর যখন রাতে হঠাৎ রাজিয়া ফুপ্পুর আসার শোরগোল উঠল, তখন সে খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও লাউঞ্জে এল।
"ফায়েকা আজকাল সারা সময় আমার সাথে রান্নাঘরে লেগে থাকে। আমি তো নিষেধ করি কিন্তু সাধ্য নেই যে ও আমাকে কোনো কাজ হাত দিতে দেয়।
আজও পুডিং বানিয়েছিল, বলছিল সব মামারা শখ করে খায়, তাদের দিয়ে আসি। আমি নিজেই বললাম, নিজেই দিয়ে আয়।
মামাদের মাঝেই তো আমার মেয়ের জান। আর সব ঠিক আছে বাড়িতে? ফাওয়াদ কারীম কোথায়? দেখা যাচ্ছে না।"
মেহতাব তায়ির সাথে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে রাজিয়া ফুপ্পু কথা শেষে চারদিকে তাকিয়ে আপাতদৃষ্টিতে আলতোভাবে জিজ্ঞেস করলেন।
ফাওয়াদকে দেখা গেল না, কিন্তু মেহমিলের ওপর নজর পড়লে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
সম্ভবত এ কারণে যে ফুপ্পুর শেষ কথাটিতে সে সামান্য তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল।
"এই মেয়ে! তোমার কোনো কাজকর্ম আছে? যখন দেখি, পাগলের মতো (অলসভাবে) এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছ।
আমার ভাবির কলিজা বড় যে অন্ন ধ্বংসকারীদের (মুফত খোর) বাড়িতে জায়গা দিয়েছেন। নইলে আমি হলে তো..." ফুপ্পুর কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
তার হাসি ফুপ্পুকে রাগিয়ে দিয়েছিল, যেন চুরি ধরা পড়েছে; তাই বিগড়ে গিয়ে বড় সোফায় বসলেন।
ফায়েকাও দু হাতে ট্রে ধরে, যাতে দুটো বাটি ছিল, চলে আসছিল।
ফ্যাশন অনুযায়ী শর্ট শার্টের নিচে ট্রাউজার আর লম্বা চুল খোলা ছিল, যাতে বিনুনির ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে সিদরার মতো কড়া মেকআপ করত এবং সম্ভবত এ কারণে তাকে কিছুটা গ্রহণযোগ্য লাগত যদি সে ঘন মাস্কারা আর আই মেকআপের ওপর ওই বড় কালো ফ্রেমের চশমাটি না পরত।
"এটা কোথায় রাখব মাম্মি জান?"—সে থেমে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করছিল, অথচ এই ফায়েকা কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রচণ্ড শোরগোল করত।
"রান্নাঘরে রেখে দাও। বরং মেহমিল! তুমি নিয়ে যাও।"
"দিন।" মেহমিল এগিয়ে এলে ফায়েকা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
"দিয়ে দিন ফায়েকা আপু! ফাওয়াদ কারীম ভাই তো এমনিতে এখনো অফিস থেকে আসেননি।
ফুপ্পু জিজ্ঞেস করছিলেন, এখনো উনার..." সে নির্লিপ্তভাবে বলে ট্রে নিয়ে রান্নাঘরে রেখে এল।
"ফাওয়াদ এখনো আসেনি?" ফুপ্পু অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখলেন, তারপর ফায়েকাকে চোখের ইশারা করলেন।
সে সাথে সাথে মেহতাব তায়ির ঠিক সামনের সোফায় ভদ্র হয়ে বসে পড়ল।
"হ্যাঁ, কোনো কাজ ছিল বোধহয়। আর
তুমি ঠিক আছো?" তায়ি রিমোট তুলে চ্যানেল পাল্টাচ্ছিলেন, ঢঙে ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভাব।
যাদের ফাওয়াদ কারীমের মতো ছেলে থাকে, তাদের ওপর মেয়েদের মায়েরা এভাবেই মাছির মতো ভনভন করে; তিনি রাজিয়া ফুপ্পুর হাবভাব খুব ভালো বুঝতেন।
"এই পুডিং কি ফায়েকা আপু বানিয়েছে ফুপ্পু?" সে ফিরে এসে তাদের সামনের সোফায় পা তুলে বসল।
সেই একই জিন্স, কুর্তা, গলায় মাফলারের মতো ওড়না আর উঁচু পনিটেইল। এটিই ছিল তার নির্দিষ্ট বেশভুষা।
"হ্যাঁ তো আর নয় তো কী?"
"আচ্ছা। আপনি তো সেদিন আপনার বুয়া সলিমার থেকে পুডিং বানানো শিখছিলেন, যখন আমি আপনাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম; আপনি তো বলছিলেন যে আপনার বা ফায়েকা আপুর কেউই পুডিং বানাতে পারেন না।
ফায়েকা আপু!" সে মুখ ফায়েকার দিকে ঘোরাল।
"খুব সম্প্রতি শিখেছেন বুঝি?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার সাথে আজকাল সবকিছুই শিখছে।
বসে বসে তো আর অন্ন ধ্বংস করছে না।" ফুপ্পু তেড়ে উঠলেন।
মেহতাব তায়ি রিমোট হাতে চ্যানেল পাল্টাচ্ছিলেন, চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি।
"আর আপনি কার থেকে শিখলেন? আপনার বুয়ার থেকে?"
"বেশি মুখ চলছে তোমার মেহমিল! এটা তো আমার ভাবির সাহস যে তোমাকে সহ্য করেন, উনার জায়গায় আমি হলে দুদিনেই বাড়ি থেকে বের করে দিতাম।"
"উনার জায়গায় আপনি কীভাবে হতে পারতেন ফুপ্পু? অন্যের পয়সায় আয়েশ করা একটা আর্ট, আর এটা তো সবার আসে না..."
"শাট আপ মেহমিল!" তায়ি রাগে রিমোট রাখলেন। "বেশি বকবক করলে পা ভেঙে দেব।
আরে আমরা না রাখলে কোথায় যেতে
তুমি, হ্যাঁ?"
"ইংল্যান্ড।" সে অনায়াসে পা তুলে বসে পা দোলাচ্ছিল।
"মানে কী?" তারা সবাই চমকে উঠল।
"আমি স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছি আর খুব শীঘ্রই আমি আম্মাকে নিয়ে ইংল্যান্ড চলে যাব, তাই আপনারা এখন থেকেই কাজের লোক খুঁজতে শুরু করুন।
আপনারা বসুন, আমি একটু রান্নাঘর দেখে আসি।" সে উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে এল; জানত যে তাদের মাথায় বোমা ফাটিয়ে এসেছে।
কিন্তু ওই মুহূর্তে তাদের সবাইকে জ্বালাতন করতে মন চাইছিল।
খাওয়ার সময়ই তার তলব পড়ল। "তুমি কোন স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছ? মেহতাব বলছিল, ব্যাপার কী?"
আগা জান হঠাৎ মনে পড়ায় খাওয়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"স্কলারশিপ?" আরজু ভ্রু কুঁচকাল। নিদা আর সামিয়া গল্প করতে করতে থমকে গেল।
ফিজা চাচি অবাক হয়ে গ্লাস রাখলেন আর ফাওয়াদ কারীম লোকমা মুখে দিতে গিয়ে মারাত্মকভাবে চমকে উঠল।
বাকি সবাই হুট করে থেমে তার দিকে তাকাতে লাগল, যে খুব শান্তভাবে হাত বাড়িয়ে রায়তার বাটি তুলছিল।
"জি আগা জান! ব্রিটিশ হাই কমিশনের পক্ষ থেকে কিছু স্কলারশিপ ঘোষণা করা হয়েছিল মাস্টার্সের জন্য। আমি আবেদন করেছি।
এখন সে বড় চামচ ভরে রায়তা ভাতের ওপর দিচ্ছিল। আশা করছি শীঘ্রই পেয়ে যাব। তারপর আমি ইংল্যান্ড চলে যাব। ভাবছি ওখানে সাথে সাথে জব টবও করে নেব। আসলে খরচ তো মেটাতে হবেই না!" চামচ দিয়ে রায়তা মিশিয়ে সে নির্লিপ্তভাবে খবরটি দিল এবং তার মনে হয়েছিল যে এখনই বাড়িতে তুফান শুরু হয়ে যাবে, কিন্তু...
"হুম, ভেরি গুড। অবশ্যই এ্যাপ্লাই করো।" আগা জান আবার খাবারের দিকে মন দিলেন।
এবার অবাক হওয়ার পালা ছিল মেহমিলের।
সে মুহূর্তের জন্য থমকে তাদের দেখল এবং নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—"থ্যাঙ্ক ইউ আগা জান!"
তার কথায় যেখানে মুসাররাত শান্তিতে খেতে লাগলেন, সেখানে টেবিলে অনেকের মাঝে নিরব ও অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হলো।
সে মাথা নিচু করে ভাত খেতে থাকল। আশা করেনি যে তারা কোনো নাটক করবে না, কিন্তু কারণটিও সাথে সাথে বুঝে ফেলল।
সে বাইরে চলে গেলে তাদের কাছে সম্পত্তিতে অংশ চাইতে কে আসবে?
তাদের জন্য তো ভালোই ছিল যে সে চলে যাবে।
'এভাবে তো তোমাদের ছাড়ব না আমি। চলে গেলেও একদিন অবশ্যই ফিরে আসব এবং নিজের অংশ দাবি করব।
আর তোমাদের প্রত্যেককে সেই আদালতে টানব যেখানে যেতে তোমরা ভয় পাও।'—সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।
তারপর যখন জলের জগ তোলার জন্য মাথা তুলল, হঠাৎ চমকে উঠল। অমনোযোগী হয়ে খেতে থাকা ফাওয়াদ কারীম তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেহমিলকে মাথা তুলতে দেখে সে সাথে সাথে নিজের প্লেটে ঝুঁকে পড়ল।
পরে ফুপ্পু কতবার "আমার ফায়েকা আজ পুডিং বানিয়েছে" বলে তাকে থামাতে চাইলেন, সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
"আমার কাজ আছে, আমি আসছি।"
"হ্যাঁ বাবা! তুমি কাজ করো।" মেহতাব তায়িও সাথে সাথে সায় দিলেন।
ওদিকে ফুপ্পু হাহাকার করতে রয়ে গেলেন আর সে বড় বড় পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। মেহমিলের মন হঠাৎ করে খুব বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কে জানে কেন।
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
দূরের বেঞ্চে বসে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটিকে দেখে তার কদমের গতি বেড়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে বেঞ্চের কাছে এল।
"গুড মর্নিং।"
কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি চমকে মাথা তুলল এবং তারপর সামান্য হাসল।
"গুড মর্নিং টু ইউ।" সে আগের মতোই বইয়ের কিনারায় শক্ত করে হাত চেপে ধরে বসে ছিল।
"আমি আসলে..." মেহমিল ইতস্তত করে তার পাশে বসল।
"আমার... আমার কালকের ব্যবহারের জন্য খুব লজ্জা লাগছে। আমি কখনো এতটা রূড (নিষ্ঠুর) হই না এবং..."
"থাক, বাদ দাও। আমার খারাপ লাগেনি।"
"না, আই এ্যাম সরি। রিয়েলি সরি। আমি কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম।"
"আমি তো তোমাকে তোমার সব দুশ্চিন্তার সমাধান বলেছিলাম। তুমি নিজেই তো সেদিকে আসতে চাও না।"
"না, ওটা..." সে অজান্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। "আমার এই বইয়ের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই।"
"কিন্তু এই বইয়ের তোমার প্রতি আগ্রহ আছে। এটি আমাকে বলেছে যেন আমি এটি তোমার হাতে তুলে দিই।"
সে ভীষণভাবে চমকে উঠল। প্রথমদিকের কথোপকথনেও মেয়েটি তাকে এমন কিছু একটা বলেছিল।
"এই... এই বই কি আমাকে চেনে?"
"শতভাগ চেনে। তোমার জীবনের সব গল্প এতে লেখা আছে। ঘটে যাওয়া ঘটনা আর সামনে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিস্থিতি।"
"সত্যিই?" সে অবাক হয়ে তাকে দেখছিল। এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা কাজ করছিল মনে।
"হ্যাঁ, এতে সব লেখা আছে।"
"তুমি... তুমি কি আমার জীবনের গল্প পড়েছ?"
"না, আমি ওটা পড়তে পারি না।"
"কেন? তুমি কি এই বই পুরোটা পড়োনি?"
"আমি পুরোটা পড়েছি। কিন্তু আমার সামনে শুধু আমার জীবনের গল্প উন্মোচিত হয়েছে।
তোমার জীবনের গল্প শুধু তোমার সামনেই উন্মোচিত হবে।"
"তুমি কী বলছো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।" এবার সে সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়ল।
"সব কথা বুঝে আসবে। সবকিছু বুঝে আসবে। শুধু কিছুটা সময় লাগবে।"
মেহমিল তার দিকে তাকিয়েই রইল। ওই মেয়েটি কে ছিল, কোথা থেকে এসেছিল আর এই বই কে তার জন্য শত শত বছর আগে লিখিয়ে রেখে গিয়েছিল—কিছুই বুঝে আসছিল না।
বাসের হর্ন বাজলে সে চমকে উঠল এবং তারপর কিছু না বলে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি হাসিমুখে তাকে বাসে সওয়ার হতে দেখছিল।
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
"ফাওয়াদকে চা ওর ঘরে দিয়ে এসো।
আর মেহমিল! তুমি ট্রলি বাইরে নিয়ে এসো।" তায়ি মেহতাব তার স্বভাবজাত নির্লিপ্ততায় আদেশ দিয়ে ফিরে যেতেই ট্রলি গোছানো মেহমিল কোনো এক ভাবনায় চমকে উঠল।
"ফাওয়াদের ট্রে আলাদা গুছিয়ে দাও মেহমিল! আমি দিয়ে আসব, তুমি ট্রলি বাইরে নিয়ে যাও।"
"আমি ট্রলি নিয়ে যাচ্ছি না। এই জঘন্য মানুষগুলোর সামনে যেতে যেতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।"
"আচ্ছা, আচ্ছা। চুপ করো।" মুসাররাত ঘাবড়ে গিয়ে এগিয়ে এলেন এবং ট্রলির কিনারা ধরে ফেললেন।
"আমি নিয়ে যাচ্ছি, তুমি ফাওয়াদকে চা দিয়ে এসো।"
আর এটাই তো সে চেয়েছিল। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে লোকদেখানো অবহেলায় ফুয়াদের ট্রে সাজাল এবং তারপর সেটি তুলে নিয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
"ফাওয়াদ ভাই!" দরজায় হালকা নক করল সে।
"হুম, ভেতরে এসো।"
সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে ফাওয়াদ তার দিকে তাকাল।
ফাওয়াদ হাত চোখের ওপর রেখে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিল।
"ফাওয়াদ ভাই! আপনার চা।"
"হ্যাঁ, রেখে দাও।" সে অলসভাবে উঠে বসল। ঢঙ দেখে মনে হচ্ছিল সে বেশ ক্লান্ত।
"কী ব্যাপার ফাওয়াদ ভাই! আপনাকে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছে।" সে ট্রে-টি টেবিলের ওপর রাখল এবং কাপ হাতে নিয়ে তার কাছে এগিয়ে এল।
"হ্যাঁ, কিছু না। অফিসের সমস্যা।" সে চায়ের জন্য হাত বাড়ালে তাকে কাপ ধরিয়ে দেওয়ার সময় মেহমিলের আঙুলগুলো তার হাতের সাথে সামান্য ছোঁয়া লাগল।
সে সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিলে ফাওয়াদ অজান্তেই মৃদু হাসল, তারপর চায়ের চুমুক দিল।
"হুম, চা তো তুমি বেশ ভালোই বানাও।"
"আম্মা বানিয়েছেন।" সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—সেই উঁচুতে বাদামী ঝুঁটি(পনিটেইল)করা দীর্ঘদেহী মেহমিল।
"কিন্তু এনেছ তো তুমি। স্বাদ তোমার হাতেই আছে।"
"আচ্ছা।" সে হাসল।
"আর এই ইংল্যান্ডে যাওয়ার ব্যাপারটা কী?"
"ওটা আমি... আমি উচ্চশিক্ষা নিতে চাই।" সে মাথা নিচু করে আঙুল মচকাতে মচকাতে দাঁড়িয়ে ছিল।
"কিন্তু তুমি জবের কথা বলছিলে, কথাটা আমার ভালো লাগেনি।"
সে চায়ের কাপ পাশে রেখে খুব গম্ভীরভাবে তার দিকে তাকাচ্ছিল।
"আমি শুধু নিজের খরচের জন্য জব করতে চাই।"
"আর এই বিশাল বিজনেস এম্পায়ার? এটা কে সামলাবে?"
মেহমিল এক ঝটকায় ঘাড় তুলল। তার মনে হলো সে ভুল শুনেছে।
"বিজনেস এম্পায়ার?"
"হ্যাঁ। তুমি এর মালিকদের একজন। এটা কি তোমার দায়িত্ব নয় যে তুমি তোমার আব্বার বিজনেসেও মন দাও? শেষমেশ তো তোমাকেই এসব সামলাতে হবে।"
"জি?" সে অবিশ্বাস্য চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"এত অবাক হচ্ছ কেন মেহমিল?" সে উঠে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
মেহমিল দেখল সে তার চেয়ে বেশ লম্বা। "আমি... আমি জানি না।"
"তুমি কি এসব সামলাতে চাও না?"
"আমি সামলাতে চাই। কিন্তু কীভাবে?"
"তুমি সত্যিই সামলাতে চাও?" ফাওয়াদের চেহারায় সুখকর বিস্ময় ফুটে উঠল।
"অর্থাৎ যদি আমি তোমাকে আমার সাথে অফিসে বসাতে চাই, তবে তুমি আমার সাথে কাজ করবে?"
"জি... জি অবশ্যই।" তার বুক হঠাৎ অন্য কোনো ছন্দে ধকধক করতে লাগল, হাত কাঁপতে শুরু করল।
"ঠিক আছে, তবে আমি সন্ধ্যায় আগা জানের সাথে কথা বলে নেব।"
"উনি... উনি কি অনুমতি দেবেন?" তার ভেতরে সন্দেহের উদ্রেগ হলো।
"শিওর, কেন দেবেন না?" সে হেসে তাকে আশ্বস্ত করছিল আর মেহমিল বুঝতে পারছিল না কীভাবে নিজের খুশি প্রকাশ করবে।
মুহূর্তেই সবকিছু তার হাতের মুঠোয় চলে আসছে বলে মনে হলো।
ধন-সম্পদ বর্ষিত হবে... প্রিয়তম পায়ে পড়বে...
এখন তার ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির বইয়ের আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। সে যেন হাওয়ায় উড়তে উড়তে নিজের ঘরে ফিরে এল।
আর তারপর রাতে ফাওয়াদ যখন তাকে বিজনেসে সাথে নেওয়ার প্রস্তাব আগা জানের কাছে রাখল, তখন সবার আগে হাসান অস্বস্তিতে উসখুস করতে লাগল।
"এর কী প্রয়োজন ফাওয়াদ! মেহমিলের এখন পড়াশোনায় মন দেওয়া উচিত।" সে বিরক্ত হয়ে বললে মেহমিলের বেশ খারাপ লাগল।
ভাগ্যিস পরিবারের মহিলারা সেখানে ছিলেন না, নইলে তো তুফান বয়ে যেত।
"তুমি মাঝখানে কথা বলো না হাসান! আমি আগা জানের সাথে কথা বলছি।"
"আর আমি তোমার কথার মানে খুব ভালোভাবেই বুঝি।" হাসান এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেহমিলের ওপর নিক্ষেপ করল।
"আমি খুব ভালো করেই জানি যে এখানে কী চক্কর চলছে।"
"শাট আপ!" ফাওয়াদ খেপে উঠলে আগা জান দুজনেই ধমক দিলেন।
"চুপ করো তোমরা। হাসান! তুমি নিজের ঘরে যাও।" আর সে সাথে সাথে উঠে দ্রুত কদমে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
"আর ফাদি! হাসান ঠিকই বলছে।
মেহমিলের অফিসের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আর না সে কখনো অফিসে যাবে।"
"কিন্তু আগা জান!"
"আগা ভাই ঠিকই বলছেন। মেহমিলের অফিসে কী কাজ?"
"একদম। মেয়েদের ওদিকে ধাক্কা খাওয়ার কী দরকার?" গুফরান চাচা আর আসাদ চাচাও সাথে সাথে আগা জানকে সমর্থন করলে মেহমিল অসহায়ভাবে সাহায্যপ্রার্থী দৃষ্টিতে ফাওয়াদের দিকে তাকাল।
"ওকে, আপনাদের যেমন ইচ্ছা।" সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে এখন ঝুঁকে নিজের জুতোর ফিতে বাঁধছিল। মেহমিলের মন যেন কোনো গভীর খাদে গিয়ে পড়ল।
সে দ্রুত দৌড়ে রান্নাঘরে এল এবং সিঙ্কে ঝুঁকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার চোখের জলের সাথে সব স্বপ্ন ভেঙে ভেসে যাচ্ছিল।
সে এত কাঁদল যে হিক্কা উঠতে লাগল; শেষে ট্যাপ ছেড়ে মুখে জল দিতে শুরু করল।
সে ঠিক করে নিয়েছিল যে আজই সে শেষবারের মতো কাঁদছে। আজকের পর সে আর কখনো কাঁদবে না। সে তো সোজা পথে সবকিছু ফিরে পাওয়ার কথা ভেবেছিল, কিন্তু এই মানুষগুলোর সোজা পথ সহ্য হলো না।
ঠিক আছে, এখন যদি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে তাকে জাদু বা কালো বিদ্যার আশ্রয়ও নিতে হয়, তবে সে অবশ্যই নেবে।
সে এখন সকালের অপেক্ষায় ছিল। সকালে তাকে বাস স্টপেজে গিয়ে ওই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির থেকে বইটি নিতে হবে।
সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতেই হয়!
মুখে ঠাণ্ডা জল দিতে দিতে সে চরম ঘৃণা নিয়ে এমনটাই ভেবেছিল।
চলবে,,,,,

বেচারি মেহমিল 🥺
ReplyDelete