মুসহাফ - পর্ব: ০৬ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:-০৬
সিঁড়ির সাথে লাগানো বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে কানে ঝুমকা পরছিল। ঝুমকাটি ছিল রুপালি রঙের, তার সিলভার চুড়িদার পায়জামার মতো; আর সবুজ কামিজের ওপরেও ছিল এমন সিলভার কাজ করা ডিজাইন।
ওড়নাটি ছিল এমন, যেন সবুজ আকাশে তারা ফুঁটে আছে। ছোট হাতার কারণে তার ফর্সা নমনীয় হাতগুলো ফুটে উঠছিল আর চিকন কবজি দুটিতে ঠাসা ছিল সিলভার ও সবুজ চুড়ি।
হালকা মেকআপ আর সোনালি-বাদামি চুলগুলো কালো মলাটের মুসহাফের মতো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে ছিল।
ঝুমকাটি কানে সেট হতেই চাইছিল না। সে চুড়ি পরা দুই হাতে ঝুমকাটি কানের ছিদ্রে ঢোকানোর চেষ্টা করছিল। সবাই বাইরে লনে জড়ো হয়েছে, বাগদানের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে আর শুধু তারই সাজগোজ বাকি।
"উফ!" সে বিরক্ত হয়ে ঝুমকাটি কান থেকে সরিয়ে নিল। কানের লতি লাল হয়ে গিয়েছিল।
"এখন কী করি?"
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়নায় তার পেছনে ফাওয়াদ-এর চেহারা ভেসে উঠল।
"ফাওয়াদ ভাই?" সে অবাক হয়ে ফিরল।
"আপনি এখানে? সবাই তো বাইরে।"
"তুমিও তো এখানেই আছ।" সে মেহমিলের একদম সামনে এসে দাঁড়াল।
ব্ল্যাক সুটে তাকে এতটাই স্মার্ট লাগছিল যে মেহমিল পলকহীনভাবে স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরক্ষণেই তার দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিচু হয়ে গেল।
"তুমি কত সুন্দর মেহমিল!"
মেহমিলের বুক সজোরে ধকধক করে উঠল। সে কোনোমতে চোখের পলক তুলল। ফাওয়াদ সেই মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার দৃষ্টির প্রখরতায় মেহমিলের গাল লাল হতে শুরু করল।
"ওটা... ওই ঝুমকাটা পরা যাচ্ছে না।" সে ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
"এদিকে দেখাও।" ফাওয়াদ তার হাত থেকে ঝুমকাটি নিল, সামান্য ঝুঁকে এক হাতে তার কান ধরল আর অন্য হাত দিয়ে ঝুমকাটি পরিয়ে দিল।
"নাও... সামান্য এই ব্যাপার, আর তুমি পুরো কান লাল করে ফেলেছ।" সে কোমল স্বরে বলে আলতো করে মেহমিলের বাদামি চুলগুলো ছুঁল এবং তারপর পিছিয়ে গেল।
মেহমিলও নিজেকে সামলে নিয়ে ঝুমকাটি ঠিক করতে লাগল।
হঠাৎ ফাওয়াদ কিছু না বলেই বাইরে চলে গেল। মেহমিল যে গত মুহূর্তের মায়াজালে হারিয়ে গিয়েছিল, চমকে ফিরে তাকাল।
সে দরজা বন্ধ করে চলে গেছে।
"এটা কী?" সে বিভ্রান্ত হয়ে আয়নার দিকে ফিরতেই থমকে গেল। হাসান সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সে অপ্রস্তুত হয়ে জলদি চিড়ঁনি দিয়ে চুল আচড়িয়ে চালিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু হাসান দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল এবং...
"যদি আজকের পর আমি তোমাকে ফাওয়াদ-এর ১০ ফুটের আশেপাশেও দেখি, তবে পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে দেব, বুঝেছ?" রাগে হাসানের কবজি ধরে সে এত জোরে ঝটকা দিল যে মেহমিল চিৎকার করে উঠল।
"হাসান ভাই..."
"বুঝেছ, নাকি বোঝোনি?" সে আবারও ঝটকা দিয়ে তার কবজি ছেড়ে দিল এবং এক রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বড় বড় কদমে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সে নিথর হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। হাসান তার সবুজ চুড়ি পরা কবজিটি এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে অর্ধেকের বেশি চুড়ি 'তড়তড়' করে ভেঙে নিচে পড়ে গেল। কাঁচের অনেকগুলো টুকরো তার চামড়ায় বিঁধে গিয়েছিল এবং জায়গায় জায়গায় রক্ত জমতে শুরু করেছিল।
"হাসান ভাই এমন কেন করল?" সে দুঃখভরা চোখে নিজের আহত কবজি দেখতে লাগল।
সবুজ কাঁচের টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিল। তার চোখে জল চলে এল।
এতিম হওয়ার মানে কি এই যে যার খুশি সে হাত তুলবে? সে চোখের জল মুছে ভেতরের ক্ষততে কোনোমতে ধৈর্যের প্রলেপ লাগিয়ে ঝুঁকে পড়ে কাঁচ কুড়াতে লাগল।
মন চাইছিল প্রাণভরে কাঁদতে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে অন্য চুড়ি পরে সে বাইরে এল।
সিদরা বড় সোফায় কনের মতো সেজেগুজে বসে ছিল। সাধারণ চেহারার সিদরাকে অনেক মেকআপের পরেও সাধারণই লাগছিল। তার হবু বর ছিল কিছুটা স্থূলকায়(মোটা) এবং বেশ লাজুকও।
তার মাঝে এমন কিছু ছিল না যা কাউকে মুগ্ধ করবে। আর নিদা ও সামিয়া তো মিটিমিটি হেসে জ্বালাময়ী মন্তব্য করছিল। শোনা গিয়েছিল যে সে মেহতাব তায়ির কোনো এক সেকেন্ড কাজিনের ছেলে।
এখানেই ইসলামাবাদে একটি ভালো পোস্টে কাজ করছে। জানি না কবে সম্বন্ধ এল আর কবে 'হ্যাঁ' হলো; তাকে আর মুসাররাতকে তো বাইরের লোকের মতো খবর দেওয়া হয়েছিল।
লনে ঝাড়বাতি আর আলোকসজ্জার বাহার ছিল। সে যখন বাইরে এল তখন রসম (অনুষ্ঠান) চলছিল এবং মায়েরা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিল। সবাই হাসাহাসি করছিল।
সে চুপচাপ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে একটি চেয়ারে গিয়ে বসল। তার মন ছিল বিষণ্ণ আর চোখ ছিল মেঘাচ্ছন্ন।
ফাওয়াদ ওখানেই স্টেজে কারো কথায় হাসতে হাসতে তার দুলাভাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিল। মেহমিল চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাল। স্টেজের সামনে ঘাসের ওপর শাড়ি পরিহিত ফিজা নিজের পরিচিত এক মহিলার সাথে হাসানের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন।
হাসানের বাহু ধরে তিনি খুব গর্বের সাথে তার কথা বলছিলেন এবং হাসান হাসিমুখে ওই মহিলার সাথে কথা বলছিল। সে-ও ব্ল্যাক ডিনার সুট পরেছিল এবং নিঃসন্দেহে তাকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছিল।
মেহমিল দুঃখের সাথে তাকে দেখল। ওই মুহূর্তে তার কাছে হাসানের চেয়ে বড় মুনাফিক আর দুমুখো ব্যক্তি আর কেউ মনে হলো না।
হাসান শুধু তার কোমল কবজিই নয়, তার হৃদয়কেও ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল।
পুরো অনুষ্ঠানের মজা মাটি হয়ে গিয়েছিল। সে এতটাই মনমরা আর দুঃখিত হয়ে বসে ছিল যে খেয়ালই করেনি ওয়াসিম কখন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"আজ কতজনকে ধরাশায়ী করার ইচ্ছা আছে, সরকার?" সে হঠাৎ খুব কাছে এসে বললে মেহমিল আঁতকে উঠল।
সে তার চিরচেনা লম্পট ঢঙে হাসছিল।
"খুব ঝিলিক মারছ ছোট কাজিন, খবর
কী?" সে অর্থপূর্ণভাবে আবার হাসলে মেহমিল ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মেয়েদের গ্রুপের দিকে এগিয়ে গেল।
সাথে সাথে বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল। ওয়াসিম এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে অনবরত তাকে নিজের দৃষ্টির সীমানায় আটকে রেখেছিল।
সে নিজেকে বাঁচিয়ে মানুষের ভিড়েই মিশে রইল। কাজিনরা সবাই খুব খুশি আর একতাবদ্ধ ছিল।
শুধু সে-ই ছিল একটি অতিরিক্ত চরিত্র। যদিও কতজন মহিলা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে "এই সবুজ আর রুপালি কাপড় পরা মেয়েটি কে?" সে ছিল এতটাই অনন্য আর আলাদা।
কিন্তু সব কিছু থেকে উদাসীন হয়ে সে পুরোটা সময় বিষণ্ণই রইল।
সিদরার বাগদানে যতটা আনন্দ আর মজার কথা সে ভেবেছিল, তার চেয়েও বেশি তা তিক্ততায় ভরে গিয়েছিল
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রেজওয়ান হোসেন মাসুম
ফাওয়াদ তাকে অফিসে ছোটখাটো কাজ দিতে শুরু করেছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাকে সুপারভিশনের কাজই দিত।
"এই ড্রাফটটি তৈরি করতে হবে, নিজের তত্ত্বাবধানে ফিন্যান্সের জাকির সাহেবকে দিয়ে এটি করিয়ে আনো।"
"এই চেকে সই করাতে হবে, মুফতি সাহেবের থেকে করিয়ে আনো।"
আর এই সব কাজই ছিল অনেক আস্থার। মেহমিলের ভালো লাগত যে ফাওয়াদ তার ওপর ভরসা করে, তার খেয়াল রাখে। দুপুরের খাবার তারা একসাথেই খেত।
বাকি সময় ফাওয়াদ নিজের অফিসে কাজ করত আর মেহমিল নিজের কেবিনে বসে অন্যদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। মাঝে মাঝে তার মনে হতো, এতগুলো দিন কেটে যাওয়ার পরেও সে কাজ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বুঝতে পারেনি এবং ফাওয়াদ ও তার মাঝে দূরত্বও খুব একটা কমেনি।
ফাওয়াদ সবসময় তার পছন্দের খাবার আনাত, তার পড়াশোনা আর শখ নিয়ে হালকা গল্পগুজব করত, কিন্তু সেই সন্ধ্যায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুমকা পরিয়ে দেওয়ার মতো সেই আত্মহারা ভাব আর সাহস সে আর দেখায়নি।
সেদিন সকালে সে ফাওয়াদের সাথে অফিসে যায়নি।
"দুপুরে স্টপেজে চলে এসো, আমি তোমাকে পিক করে নেব। আজ তোমার সাথে কিছু কথা আছে।" ফাওয়াদ সকালে ধীরে করে বলে গিয়েছিল।
আর এখন সে সেই আনন্দময় দুপুরের অপেক্ষায় ওপরের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল।
জানি না ফাওয়াদ কী কথা বলতে চায়, এত বিশেষ কী কাজ ছিল। সে পায়ের ওপর পা তুলে বসে চায়ের চুমুক দিতে দিতে ভাবছিল।
দৃষ্টি সামনে প্রতিবেশীদের লনের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেখানে ঘাসের ওপর সাদা চাদর বিছানো ছিল এবং সেখানে সাদা সালোয়ার-কামিজ আর টুপি পরা মাদ্রাসার বাচ্চারা মিলেমিশে সিপারা (কুরআনের অংশ) পড়ছিল।
মাঝখানে একটি ছোট টেবিল ছিল, তার ওপর একটি বড় কুরআন মাজিদ এবং কিছু সিপারা রাখা ছিল। পাশে আগরবাতি জ্বলছিল।
সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেই বড়, বন্ধ কুরআনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনের কোনো এক কোণ থেকে সেই চেহারাটি বেরিয়ে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির চেহারা।
কালো চোখ আর মোটা কৃষ্ণকায় ঠোঁট। সে মুসহাফ বুকে জড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তার ওপারে চলে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে তার সেই দৃশ্য মনে পড়লে মনে হতো, হয়তো চলে যাওয়ার সময় তার কালো চোখে জল ছিল।
সে কেন কাঁদছিল, তা মেহমিল বুঝতে পারেনি।
বাচ্চারা ওভাবেই মিলেমিশে সিপারা পড়ছিল। সে দেখল, কোণে বসা একটি বাচ্চা সিপারার পাতা ওল্টানোর সময় সাবধানে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দুই পাতা একসাথে উল্টে দিল।
কয়েক মুহূর্ত পর সে আবার আশেপাশে তাকাল এবং কাউকে খেয়াল করতে না দেখে একসাথে তিন পাতা উল্টে দিল আর তারপর খুব উঁচু স্বরে সুর করে পড়তে লাগল।
না চাইতেও মেহমিল হেসে ফেলল। সেই ছোট বাচ্চাটি নিজের বুদ্ধিমত তার চারপাশের মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছিল নাকি খোদ রবকে, তা সে জানে না।
বাচ্চারা ধীরে ধীরে উঠে সিপারাগুলো গুছিয়ে রাখতে লাগল। যখন সবগুলো সিপারা টেবিলের ওপর স্তূপ করা হলো, তখন কারি সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চাকরকে ইশারায় ডাকলেন।
"কুরআনখানি শেষ হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার সাহেবকে ডেকে দিন যেন দোয়াতে অংশগ্রহণ করেন।" চাকর মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেল।
সে ফাওয়াদের কথা ভুলে গিয়ে কৌতূহল আর আগ্রহ নিয়ে রেলিংয়ে ঝুঁকে সব দৃশ্য দেখতে লাগল। চায়ের কাপটি সে একপাশে রেখে দিয়েছিল।
কয়েক মিনিট পর চাকর বারান্দা পেরিয়ে লনে নেমে এল। কারি সাহেব প্রতীক্ষায় ছিলেন, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।
"স্যার বলছেন যে তিনি ব্যস্ত আছেন, দোয়াতে অংশ নিতে পারবেন না। তবে আপনাদের ধন্যবাদ যে আপনারা কুরআন পড়েছেন।
স্যার বলছেন যে তার মনে শান্তি নেই, বাকি সব ঠিক আছে। শুধু এই দোয়া করে দিন যেন তিনি শান্তি পান।"
কারি সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোয়ার জন্য হাত তুললেন।
সে স্তম্ভিত হয়ে পুরো দৃশ্যটি দেখছিল। মনে এক অজানা আফসোস দানা বাঁধল। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ, এক বিচিত্র অস্থিরতা। সে এই অনুভূতির কোনো নাম দিতে পারল না, তাই চায়ের কাপ হাতে নিচে নেমে এল।
আর দুপুরের মধ্যে সে এই ঘটনা পুরোপুরি ভুলে গেল।
স্টপেজে নির্দিষ্ট সময়ে ফাওয়াদের মার্সিডিজ আসতে দেখে সে খুশি আর উৎসাহ নিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠল।
"কেমন আছ?" দরজা খুলে ভেতরে বসলে ফাওয়াদ হাসিমুখে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"ভালো আছি ফাওয়াদ ভাই! আপনি কেমন আছেন?" সে সাধারণভাবে বলে ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে পেছনে রাখল।
নিজের আচরণে সে কখনোই ফাওয়াদের কাছে প্রকাশ করেনি যে সে ফাওয়াদের আবেগ বুঝে ফেলেছে। সে সবসময় নিজেকে ফাওয়াদের উপকারের ভারে কৃতজ্ঞ দেখাত।
"আজকের দিনটি খুব স্পেশাল মেহমিল!" ফাওয়াদ গাড়ি রাস্তায় তুলে খুব উৎসাহের সাথে বলছিল।
"আজ আমাকে তোমাকে অনেক কিছু বলতে হবে।"
"জি বলুন।"
"উমম... এখন না। এখনই সারপ্রাইজ খুলে দেওয়া যাবে না।"
"আচ্ছা, এমন কী ব্যাপার ফাওয়াদ ভাই?"
"তুমি নিজেই দেখে নিও। যাই হোক, এখন আমরা শপিংয়ে যাচ্ছি। তোমার জন্য খুব স্পেশাল কিছু নিতে হবে।"
"কাপড়? কিন্তু এখন তো কোনো অনুষ্ঠান নেই।"
"আছে না। আজ আছে। বিশেষ কিছু।"
"আচ্ছা? সেখানে কে কে থাকবে?"
"আমি আর তুমি।" সে রহস্যময় হেসে মেহমিলের চোখের দিকে তাকাল।
"অফিসে?" সে কিছুটা বুঝতে পারছিল, কিন্তু না বোঝার ভান করল।
"উমম... ম্যারিয়ট (Marriott)-এ। আজ আমরা একসাথে ডিনার করব।"
"ম্যারিয়ট?" মুহূর্তের জন্য সে শ্বাস নিতে ভুলে গেল।
ম্যারিয়টে ডিনার তো দূরে থাক, সে কখনো ম্যারিয়টের ভেতরটাও দেখেনি। কিন্তু ডিনার শব্দটি তাকে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।
"আমি এত রাতে কী বলে বাইরে থাকব ফাওয়াদ ভাই?"
"না, আমরা জলদি চলে আসব। আর আজ রাতে আমি নিজেই তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব, সবার সামনে। কিন্তু অবশ্যই তোমার উত্তরের পর।"
"উত্তর? কিসের উত্তর?"
"তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আছে।"
তার বুক ধকধক করে উঠল। সে যা ভাবছে, তা কি সত্যি?
"কিন্তু কী?"
"সেটা ওখানেই বলব। আসো, তোমার জন্য কিছু কাপড় নিই।" সে গাড়ি পার্ক করে সিটবেল্ট খুলছিল।
"কিন্তু এগুলো তো ঠিকই আছে।" সে সামান্য প্রতিবাদ করল।
"উমম... আজ তোমাকে ইউনিক (Unique) তৈরি হতে হবে।" তার স্বরে ছিল মায়াবী এক আবদার।
মেহমিল হেসে "আচ্ছা" বলে নিচে নেমে এল।
সে মেহমিলকে বেশ দামি একটি বুটিকে নিয়ে এল। কাপড়ের চেয়ে কাপড়ের দাম দেখে তার জ্ঞান হারানোর অবস্থা। ফাওয়াদ নিজেই এগিয়ে গিয়ে কাপড় এদিক-ওদিক করে দেখতে লাগল,
তারপর থেমে জিজ্ঞেস করল—
"তোমার কি শাড়ি পছন্দ মেহমিল?"
"শাড়ি?" সে অবাক হলো। "জি, কিন্তু সেগুলো তো খুব ফরমাল..."
"কোনো যদি-কিন্তু নয়। এই শাড়িটি দেখো, কেমন?" সে একটি কালো শাড়ি এগিয়ে দিল।
কালো শিফন শাড়ির ওপর রুপালি মুকেশ (ঝরি) ছড়ানো ছিল। সেটি এত সুন্দর আর ঝিলমিলে শাড়ি ছিল যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
"সুন্দর। কিন্তু খুব দামি।"
"তোমার চেয়ে বেশি দামি নয়। এটি প্যাক করে দিন।"
তারপর ম্যাচিং জুতো আর একটি চমৎকার রুপালি পাথর বসানো আর্টিফিশিয়াল কৃত্রিম কঙ্কণ নিতে বেশ সময় লেগে গেল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে লাগল যখন তারা জুয়েলারি শপে ঢুকল। গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড জুয়েলারি শপে মেহমিলের বুক সজোরে কাঁপছিল। ফাওয়াদ কি তার জন্য এত দামি কিছু নিতে যাচ্ছে? সে কি ফুয়াদের কাছে এতই বিশেষ?
"ডায়মন্ড রিংস (হীরার আংটি) দেখান।" সে চেয়ার টেনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে বেশ আধিপত্যের সাথে বললে মেহমিল তো দম নিতেই ভুলে গেল।
ঈশ্বর এভাবে দুহাত ভরে সদয় হন, তা সে আজই টের পেল।
বয়স্ক, দাড়িওয়ালা স্বর্ণকার সাহেব দ্রুত কিছু কালো কেস সামনে রাখলেন এবং যেমন যেমন তিনি সেগুলো খুলছিলেন, ঝিকঝিক করা হীরার আংটি দেখে তার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল।
"সলিটায়ার (Solitaire) দেখাব?"
"হ্যাঁ, অবশ্যই।"
সে একদম চুপ করে বসে ছিল, বুঝতে পারছিল না কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
ফাওয়াদ কোনো আংটি পছন্দ করতে পারছিল না, সে মেহমিলের মতামতও নিচ্ছিল না। শুধু একের পর এক আংটি বাতিল করে দিচ্ছিল।
"এক কাজ করো, তুমি আগে তৈরি হয়ে নাও, আংটি পরে নিয়ে নেব।" দোকান থেকে বেরোনোর সময় ফাওয়াদ ঘড়ি দেখল।
"ছয়টা থেকে সাতটা আমার একটি মিটিং আছে, খুব জরুরি, মিস করা যাবে না। ছয়টা থেকে সাতটা তোমাকে আমার সাথে অফিসে বসতে হবে আর তারপর সাতটায় আমরা একসাথে ম্যারিয়টের উদ্দেশ্যে বের হব। তাই তুমি এখনই তৈরি হয়ে নাও।"
"কোথায়?" সে সত্যিই অবাক হয়েছিল।
"পার্লারে। আর কোথায়? আমি তোমার জন্য এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিলাম, তুমি শুধু ভেতরে যাবে আর তারা তোমাকে তৈরি করে দেবে।"
সে তাকে কাছের একটি পার্লারে নিয়ে এল এবং ঠিক তেমনই হলো যেমনটি সে বলেছিল। মাত্র এক ঘণ্টা পর যখন সে পার্লারের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল, তখন তার নিজের ওপরই হিংসে হচ্ছিল।
কালো মুকেশের ঝিলমিলে শাড়িতে তার দীর্ঘ দেহ কালো-সিলভার পেন্সিল হিলের কারণে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। লম্বা গ্রীবটি উঁচু খোপার কারণে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লাগছিল।
খোপা থেকে কয়েক গোছা চুল কুঁকড়ে তার ঘাড় আর গালে দুলছিল। হালকা লিপস্টিকের সাথে ব্ল্যাক স্মোকি আইজ আর কালো ব্লাউজের ছোট হাতা থেকে ঝিলিক দেওয়া তার অত্যন্ত ফর্সা হাতগুলো। সামান্য পরিশ্রমে সে এত সুন্দর লাগছিল যে নিজেকে দেখে তার মন ভরছিল না।
সে বাইরে এলে ফাওয়াদ, যে তার অপেক্ষায় গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মেহমিল শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়িয়ে সাবধানে সেলুনের বাইরের সিঁড়ি দিয়ে নামছিল।
"তুমি এত সুন্দর মেহমিল? আমি এতদিন জানতামই না।" সে যেন আক্ষেপ করল। মেহমিল আনমনে হাসল।
"থ্যাঙ্ক ইউ, চলি?" সে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল।
"হ্যাঁ, আমার মিটিং শুরু হতে বেশি সময় নেই। চলো।" এক পূর্ণ হাসিমাখা দৃষ্টি মেহমিলের ওপর দিয়ে সে গাড়ির লক খুলতে যাবে অমনি তার সেলফোন বেজে উঠল।
"এই সময়ে কে?" বলতে বলতে সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল এবং চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ কানে ধরল।
"জি মালিক সাহেব!
সব ঠিক তো?
জি, মানে কী?" সে ঠোঁট চেপে ধরে কিছুক্ষণ ওপার থেকে কথা শুনল।
"কিন্তু আপনি কি ওদের বলেছিলেন যে আপনাকে আমিই পাঠিয়েছি? কিন্তু কেন? তারা সই কেন করেনি?" আর হঠাৎ মেহমিল ফাওয়াদের মুখে রাগের ছাপ দেখতে পেল।
"আপনি সিনিয়র অফিসার না কি জুনিয়র, তাতে তাদের কী আসে যায়?
আপনি জানেন মালিক সাহেব! তারা যদি ফাইলে সই না করে তবে সকালের মধ্যে আমাদের ফ্যাক্টরি ডুবে যাবে, আমরা বরবাদ হয়ে যাব।" সে থেমে কিছু শুনল এবং হঠাৎ যেন আঁতকে উঠল।
"কী বলছেন? আমি এই সময়ে কীভাবে আসতে পারি, এত দূরে? সিদ্দিক সাহেবের সাথে আমার মিটিং ছয়টা থেকে সাতটা। আমি এখন এএসপি (ASP) সাহেবের সাথে কীভাবে দেখা করতে আসি? কী আজেবাজে কথা!" সে রাগে ফোন কেটে দিল।
"কী হয়েছে?" সে ঘাবড়ে গিয়ে কাছে এল।
"জানি না এখন কী হবে!" সে দুশ্চিন্তায় অন্য কোনো নম্বর প্রেস করতে লাগল, মুহূর্তের জন্য সে যেন ভুলেই গেল যে মেহমিল তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
"জি রাও সাহেব! আমি মালিক ইলিয়াসকে পাঠিয়েছিলাম আপনার কাছে... কিন্তু রাও সাহেব! এত অবিশ্বাস কিসের? সে থেমে ওপার থেকে কিছু শুনল এবং তারপর যেন ধৈর্য ধরে অসহায়ভাবে বলল—"আপনার এএসপির কি মাথা ঠিক আছে? তার বাপ হয়তো নিজের গ্রামের জমিদার হবে, আমরা তাদের প্রজা নই।
বোর্ড অব ডিরেক্টরসদের কারো এত সময় নেই যে তাদের এক কলে চলে আসবে, না কি..." সে মুহূর্তের জন্য থামল এবং
তারপর— "আমি কিছুক্ষণ পর আপনাকে জানাচ্ছি।" বলে সে এখন অন্য নম্বর মেলাতে লাগল।
"এএসপি হুমায়ুন দাউদ, জানি না কী সমস্যা এই লোকটার।"
মেহমিল বিষণ্ণ মনে তার সাথে গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। জানি না কী হয়েছিল, মনে বিচিত্র সব সংশয় জাগছিল।
"সব ঠিক আছে তো ফাওয়াদ ভাই?"
"ঠিক আর নেই। এএসপির বাচ্চা জান নিয়ে টানাটানি করছে। বলছে, কোম্পানির মালিকদের পাঠাও তবে ফাইল অ্যাপ্রুভ (Approve) হবে, আমি কর্মচারীদের সাথে কথা বলি না। এখন কাকে পাঠাই ওদিকে? সে এখনই ডাকছে আর তার বাড়িতে পৌঁছাতে আগা জান বা হাসানের দেড় ঘণ্টা তো লেগেই যাবে।
আর যদি না পৌঁছায় তবে আমার কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট ডুবে যাবে।" সে বিরক্ত হয়ে বারবার কাউকে ফোন মেলাচ্ছিল, তাকে খুব অসহায় লাগছিল।
"এখন একটাই উপায় যে আমি এখনই তার কাছে চলে যাই আর ফিরে এসে সিদ্দিকী সাহেবের সাথে মিটিং করি।"
"আর ডিনার ক্যান্সেল?" তার বুকটা যেন কেউ মুচড়ে ধরল।
"করতে হবে মেহমিল!" সে হাত থামিয়ে মেহমিলের অন্ধকার হয়ে আসা মুখটি দেখল।
"আই অ্যাম সরি আমি তোমাকে এভাবে কষ্ট দিতে চাইনি, কিন্তু আমার বাধ্যবাধকতা আছে। সে কর্মচারীদের সাথে কথা বলবে না, বাড়ির কাউকেই যেতে হবে।"
"আমিও কি কর্মচারী ফাওয়াদ ভাই?" একটি চিন্তা তার মনে উদয় হলো।
"মানে কী?" সে চমকে উঠল।
"যদি... যদি আমি আপনার দুটি কাজের মধ্যে একটি করে দিই, তবে তো আমরা ডিনারে যেতে পারি, তাই না?" সে ইতস্তত করে বলল পাছে ফাওয়াদ কিছু মনে করে।
"আরে, আমার এই চিন্তা কেন এল না? তুমিও তো কোম্পানির মালিকদের একজন, তুমিও তো এই ফাইল সই করিয়ে আনতে পারো।
বরং এক কাজ করি, তুমি ড্রাইভারের সাথে ফাইল নিয়ে চলে যাও, ততক্ষণ আমি সিদ্দিকী সাহেবের কাজ শেষ করে ফেলি, আর তারপর ড্রাইভার তোমাকে হোটেলে নিয়ে আসবে, ঠিক?" সে কয়েক মিনিটের মধ্যে সব পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলল। মেহমিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায় দিল।
"ঠিক আছে, আমি তবে চেঞ্জ করে নিই।"
"না না। এভাবেই ঠিক আছে। এভাবে তো তোমাকে সত্যিই একজন আত্মবিশ্বাসী এক্সিকিউটিভ (Executive) মনে হচ্ছে। এই সব বিজনেস উইম্যানরা ফরমালি এভাবেই ড্রেস আপ হয়।
আমি ড্রাইভারকে কল করি।" সে সন্তুষ্ট ছিল কিন্তু মেহমিলের কিছুটা অদ্ভুত লাগছিল।
সে এত দামি আর ঝিলমিলে শাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি মনে হচ্ছিল, কোনো অফিশিয়াল বিষয়ের জন্য উপযুক্ত নয়।
কিন্তু ফাওয়াদ যেহেতু বলছে তবে ঠিকই বলছে। এই চিন্তা যে তারা ডিনারে যাচ্ছে, তাকে আবার আনন্দিত করে তুলল।
সারা রাস্তা সে পেছনের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে সেই হীরার আংটির কথা ভাবছিল, যা ফাওয়াদ নিশ্চয়ই নিয়ে নিয়েছে।
আর যখন সে তায়ি আম্মার সামনে দাঁড়িয়ে মেহমিলের সাথে বিয়ের কথা বলবে তখন তো মনে করো বাড়িতে তুফান এসে যাবে। কিন্তু ভালোই হবে। এমন একটি তুফান এই ফেরাউনদের কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য আসা দরকার।
সে শান্ত, সন্তুষ্ট আর আত্মবিশ্বাসী ছিল।
গাড়ি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বারান্দার পোর্চে থামল, তখন সে একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টি সুন্দর লনের ওপর ফেলে নিচে নামল।
মেইন ডোরে সুট-বুট পরা এক প্রৌঢ় ব্যক্তি যেন প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
"এএসপি হুমায়ুন দাউদ।" সে মনে মনে আন্দাজ করল এবং ফাইল শক্ত করে ধরে আত্মবিশ্বাসের সাথে হেঁটে তাদের কাছে এল।
"আমি আগা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে..."
"জি ম্যাডাম মেহমিল ইব্রাহিম! আসুন, এএসপি সাহেব ভেতরে আপনার জন্যই অপেক্ষা করছেন।" সে দরজা খুলে রাস্তা দিল।
মেহমিল মুহূর্তের জন্য ইতস্তত হলো এবং তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ভেতরে কদম রাখল।
আলোকিত সেই অত্যন্ত পরিপাটি আর দামি আসবাবপত্রে সাজানো বাড়িটি ভেতর থেকে এত সুন্দর ছিল যে নিজেকে গম্ভীর রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তার দৃষ্টি বারবার এদিক-ওদিক ঘুরে দেখছিল।
"এএসপি সাহেব কোথায়?"
"তিনি ভেতরে আপনার অপেক্ষা করছেন।" সে মেহমিলের আগে আগে দ্রুত হেঁটে লাউঞ্জে নিয়ে এল।
"স্যার, ইনি পৌঁছে গেছেন।"
সে লাউঞ্জে কদম রাখল তখন সামনে বসা ব্যক্তিটিকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল।
সে পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় বসে ছিল। হ্যান্ডসাম কিন্তু অহংকারী চেহারার গড়ন, জেল দিয়ে চুল পেছনে ফেরানো, ব্ল্যাক কোট পরা যার ভেতরে সাদা শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা ছিল।
এক হাতে কমলালেবুর জুস ভরা ওয়াইন গ্লাস নিয়ে সে গভীরভাবে মেহমিলকে ভেতরে আসতে দেখছিল।
এক মুহূর্তের জন্য মেহমিলের পা টলে উঠল। তার পাল্লা বেশিরভাগই ঘরের ছেলেদের সাথেই পড়েছে।
ফাওয়াদ আর হাসান সুশ্রী ছিল, কিছু অর্থের চাকচিক্যে স্টাইলিশ লাগত, বাকি তার ছায়াতেও কেউ এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল না যেমনটা সোফায় বসে থাকা সেই অহংকারী দর্শন ব্যক্তিটি ছিল।
হ্যান্ডসাম—অত্যন্ত হ্যান্ডসাম, এত সুপুরুষ সে প্রথমবার দেখল।
সে না চাইতেও প্রভাবিত হয়ে গেল।
সে চুপচাপ মেহমিলকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল, যতক্ষণ না সে এসে সরাসরি সামনের সোফায় বসল এবং ফাইল সামনের টেবিলে রাখল।
এখন মেহমিলের আত্মবিশ্বাস কিছুটা ফিরে আসছিল।
"এই ফাইল অ্যাপ্রুভ করাতে হবে এএসপি সাহেব!" সে পায়ের ওপর পা তুলে তার সামনে বসে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললে হুমায়ুন সামান্য হাসল, তারপর সামনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সুট-বুট পরা লোকটিকে দেখল।
"একে কি আগা ফাওয়াদ করিম-ই পাঠিয়েছে রাও সাহেব?" হাসিমুখে বলতে বলতে সে জুসের গ্লাস ঠোঁটে ঠেকাল।
মেহমিল কিছুটা চমকে রাওয়ের দিকে তাকাল।
"জি।" সে-ও হাসল।
তাদের দুজনের সেই অর্থপূর্ণ হাসির মধ্যে কিছু একটা ছিল যা মেহমিলের মনের গহীনে বিপদের সংকেত দিচ্ছিল।
"তো আপনি ফাইল অ্যাপ্রুভ করাতে এসেছেন?" সে উপহাসমাখা হাসিতে জিজ্ঞেস করল। মেহমিলের অস্বস্তি হতে লাগল।
"জি, এটি আগা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ফাইল এবং..."
"আর আপনার নিজের ফাইল? সেটি কোথায়?" সে গ্লাস একপাশে রাখল এবং সামান্য ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে ফাইলটি তুলল।
"আমার কোন ফাইল?" কিছু একটা ছিল যা মেহমিলের কাছে ভুল মনে হচ্ছিল, কোথাও কিছু খুব ভুল হচ্ছে।
"আপনি যান রাও সাহেব!" সে ফাইলের পাতা ওল্টে এক পলক দেখল এবং তারপর ফাইল তার দিকে বাড়িয়ে দিল। মেহমিল নেওয়ার জন্য উঠল কিন্তু খুব দ্রুত রাও সাহেব এগিয়ে এসে ফাইলটি ধরলেন।
"আর গিয়ে আগা ফাওয়াদের ড্রাইভারকে বলুন যে ফাইল অ্যাপ্রুভড, সকালে তারা রসিদ পেয়ে যাবে।"
"উত্তম স্যার।" রাও সাহেব ফাইল নিয়ে ফিরলে মেহমিল উঠে দাঁড়াল।
"আমাকে দিন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।"
তারা দুজন হঠাৎ চমকে উঠল এবং তারপর থেমে একে অপরকে দেখল। হুমায়ুন ইশারা করলে রাও সাহেব মাথা নেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
"আপনি বসুন ম্যাডাম! ড্রাইভার দিয়ে আসবে।"
হঠাৎই তার কানে বিপদের ঘণ্টা সজোরে বাজতে লাগল। তার মনে হলো সে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় আর ভুল মানুষের মাঝে চলে এসেছে। তার সেখানে আসা উচিত হয়নি।
"না, আমি চলি।" সে ফিরতে যাবে অমনি হুমায়ুন দ্রুত উঠে এল এবং জোরে তার বাহু ধরে নিজের দিকে ঘোরাল।
মেহমিলের ঠোঁট থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল।
"বেশি ওভার স্মার্ট হওয়ার দরকার নেই। যা বলা হচ্ছে, তেমনই করো।" মেহমিলের বাহু নিজের মুঠোয় পিষে সে গর্জে উঠল। মুহূর্তের জন্য মেহমিলের চোখের সামনে আকাশ-জমিন ঘুরতে লাগল।
"ছাড়ুন আমাকে।" সে নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই হুমায়ুন দাউদ তার দুই বাহু দুই হাতে ধরে এক ঝটকা দিয়ে তাকে নিজের একদম সামনে আনল।
"বেশি চালাকি দেখালে নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারবে না।"
"আ... আমাকে ছাড়ুন। আমাকে বাড়ি যেতে হবে।" মেহমিল তাকে সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু তার মুঠি ছিল খুব শক্ত।
"বাড়ি যেতে হবে? বাড়িই যদি যেতে হতো তবে এত সাজগোজ কেন করেছিলে, হুম?" সে আলতো করে মেহমিলের চিবুক আঙুল দিয়ে ওপরে তুলল, অন্য হাত দিয়ে কনুই এত শক্ত করে ধরে রেখেছিল যে সে নড়তে পারল না এবং ঘাবড়ে গিয়ে মুখ সরিয়ে নিল।
"আমি অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলাম, আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি তেমন মেয়ে নই।
আপনি ফাওয়াদ ভাইয়ের সাথে আমার কথা বলিয়ে দিন, তাকে জানান যে—"
"ভাই?" সে চমকে উঠল। "আগা ফাওয়াদ তোমার ভাই?"
"জি... জি তিনি আমার ভাই, আপনি প্রয়োজনে তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
আমার এখানে আসার কথা ছিল না, ফাওয়াদ ভাইয়েরই আসার কথা ছিল, কিন্তু তার মিটিং ছিল।" সে হঠাৎ কাঁদতে লাগল।
"আপনি প্লিজ আমাকে বাড়ি যেতে দিন। আমি ওসবের মেয়ে নই, আমি তার বোন।"
"মিথ্যে বলছে। রাও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। একেই এদিকে আসার কথা ছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেই তো ডিল (Deal) হয়েছিল স্যার! আর এর নামেই হয়েছিল।
অল্পবয়সী, সুন্দর আর আনকোরা। আগা বলেছিল, এ আমাদের ডিমান্ড পূরণ করবে।" রাওয়ের কণ্ঠস্বর ছিল আবেগহীন।
"মেহমিল ইব্রাহিম নাম তো তোমার? তুমি আগার বোন কীভাবে হতে পারো? সে তিন কোটি টাকার লাভের জন্য নিজের বোনকে এক রাতের জন্য বেচতে পারবে না।"
মেহমিলের চারপাশে যেন বিস্ফোরণ ঘটছিল।
তার খুব জোরে মাথা ঘুরল। সে পড়েই যাচ্ছিল কিন্তু হুমায়ুন তার অন্য কনুই ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখল।
"এখন সোজা পথে বলো যে তুমি আমাদের বোকা বানাচ্ছ নাকি আগা তোমাকে বোকা বানিয়েছে? তুমি মেহমিল ইব্রাহিম আর সে ফাওয়াদ করিম! সে কি তোমার আপন ভাই? এতকাল ধরে মেয়ে সরবরাহ করছে, আগে তো কখনো নিজের বোনের সওদা করেনি।"
"না!" সে অবিশ্বাস্যভাবে মাথা নাড়ল।
"আপনি মিথ্যে বলছেন। ফাওয়াদ ভাই আমার সাথে এমনটা করতে পারেন না। আপনি... আপনি আমার সাথে তার কথা বলিয়ে দিন, আপনি নিজেই শুনতে পাবেন, সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমাদের অনুষ্ঠানে যেতে হবে।"
সাধারণ মানুষের মতো মেহমিলেরও ছোটখাটো মিথ্যে বলার অভ্যাস ছিলই আর সেই পুরনো অভ্যাসেরই গুণ ছিল যে সয়ংক্রিয়ভাবে তার ঠোঁট থেকে ডিনারের জায়গায় 'অনুষ্ঠান' শব্দ বের হলো।
হয়তো অবচেতনে সে বুঝতে পেরেছিল যে যদি সে তার আর ফাওয়াদের বিশেষ ডিনারের কথা বলে তবে তারা তাকে খারাপ মেয়ে ভাববে।
"রাও সাহেব! আগা ফাওয়াদকে ফোন দিন।"
"রাইট স্যার!" রাও মোবাইলে নম্বর মেলাতে লাগল।
"আর স্পিকার অন রাখুন।" হুমায়ুন বলে মেহমিলের ওপর এক গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, যে ব্যাকুল আর আতঙ্কিত হয়ে রাওয়ের হাতে ধরা ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।
"জি রাও সাহেব!" হঠাৎ ঘরে ফাওয়াদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো। "মাল কি পৌঁছেছে?"
"মাল পৌঁছে তো গেছে, কিন্তু যন্ত্রাংশ খুব শব্দ করছে। আপনি কথা বলুন।" সে ফোন সামনে বাড়িয়ে মেহমিলের কানে ধরল।
"হ্যালো ফাওয়াদ ভাই!" সে কেঁদে ফেলল।
"ফাওয়াদ ভাই! এই লোকগুলো আমাকে ভুল বুঝছে, আপনি প্লিজ তাদের—"
"বাজে বকো না আর আমার কথা মন দিয়ে শোনো। তোমার সেই ডায়মন্ড আংটি চাই কি না? চাই তো! তবে এএসপি সাহেব যা বলেন, করতে থাকো।"
"ফাওয়াদ ভাই—" সে চিৎকার করে উঠল।
"এরা আমার সাথে কিছু ভুল করে বসবে।"
"ওরা যা করে, করতে দাও। শুধু এক রাতেরই তো কথা।
এখন বেশি বকবক কোরো না, সকালে ড্রাইভার তোমাকে নিতে আসবে।"
সপ্ত আকাশ যেন মেহমিলের মাথায় ভেঙে পড়ল। সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"শুধু এক রাতেরই তো কথা... শুধু এক রাতেরই তো কথা।"
ফাওয়াদের কণ্ঠস্বর তার মাথায় হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল।
"ব্যাস একটি ডায়মন্ড আংটিতে তোমাকে বেচে দিয়েছে সে? আর তুমি তো বলছ যে সে তোমার ভাই?" ফোন তার কান থেকে সরিয়ে বন্ধ করতে করতে হুমায়ুন বিদ্রূপাত্মক হাসি নিয়ে তাকে দেখল।
সে ওভাবেই পাথরের এক প্রাণহীন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক, হৃদয়, কান, চোখ—সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
"রাও সাহেব! খবর নিন যে এ সত্যিই ফাওয়াদ করিমের বোন কি না। আর এর কথার মধ্যে কতটুকু সত্য আছে, তা আমরা পরে নিজেই জেনে নেব। শামস! বিচল!" সে জোরে আওয়াজ দিল।
তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। নিথর দাঁড়িয়ে থাকা দেহ থেকে যেন সবটুকু প্রাণ ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তার চোখের সামনে অন্ধকার মেঘ ঘনিয়ে আসতে শুরু করল।
দুজন গানম্যান দৌড়ে ভেতরে এল।
"শামস! একে ওপরের ঘরে বন্ধ করে দাও, আর খেয়াল রেখো যেন পালিয়ে না যায়। আর চল..." তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই মেহমিল চক্কর খেয়ে পড়ে গেল; আর যদি হুমায়ুন তাকে দুই বাহু দিয়ে ধরে না রাখত তবে সে নিচে আছড়ে পড়ত।
"মেহমিল! মেহমিল!" হুমায়ুন তার মুখ চাপড়াচ্ছিল। মেহমিলের চোখ বুজে আসতে লাগল আর তার মস্তিষ্ক গভীর অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগল।
চলবে,,,,,,

Comments
Post a Comment