মুসহাফ - পর্ব: ১১ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ১১
সে চামচ নেড়ে পাতিলের ঢাকনা বন্ধ করল, ঝুঁকে চুলার আঁচ কিছুটা কমাল এবং আবার কাটিং বোর্ডের দিকে ফিরে এল, যেখানে সালাদের সবজির স্তূপ ছিল।
সে সেখানেই দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে খটখট শব্দে সবজি কাটতে লাগল।
"এদিকে শোনো মেহমিল," রাজিয়া ফুপ্পু ভেতরে উঁকি দিলেন।
মেহমিল মাথা তুলল। আজ সে চুল বাঁধেনি, দীর্ঘ বাদামী চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে ছিল, যা সে কানের পেছনে গুঁজে রেখেছিল।
"জি ফুপ্পু?" সে নিচু স্বরে বলল। এটি মেহমিলের ভেতরে এক স্পষ্ট পরিবর্তন ছিল; সে আগের মতো বেয়াদব ছিল না, নয়তো আগে তাকে সম্বোধন করতেও লোকে ভয় পেত।
"ভাবলাম, তোমাকে একটু সাহায্য করে দিই। মুসাররাতকে তো ভাবী অন্য কাজে লাগিয়ে রেখেছেন।
এর কোনো মানে হয়?
যখনই দেখো, বেচারিকে দিয়ে শুধু কাজই করিয়ে নিচ্ছেন।"
"তাতে কিছু যায় আসে না ফুপ্পু, এটি আমাদের দায়িত্ব।" সে মৃদু হেসে আবার সবজি কাটায় মন দিল।
"এই ফাওয়াদ ছাড়া পেল কবে?" ফুপ্পু সামনের কাউন্টারে হেলান দিয়ে গোপনীয়তার স্বরে বললেন।
"জানি না।"
"হুহ... বড়ই অন্যায় করেছে ও তোমার সাথে।
সত্যি বলতে, আমার ওর মুখ দেখতেও ইচ্ছে করে না।"
সে মাথা নিচু করে খটাখট পেঁয়াজ কেটে যাচ্ছিল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
"আমার কত শখ ছিল ওকে নিজের ফায়িকার জন্য নেব।
কিন্তু মন এমনভাবে ভেঙেছে যে এদিকে আসতেই মন চায় না। মানুষের কত রূপ বেরোয় না মেহমিল!"
"থাক ফুপ্পু! ইন্না লিল্লাহ পড়ে নিন।
ফায়িকা বাজি কি কম কিছু নাকি? তিনি কোনো ভালো মানুষের যোগ্য। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে।"
ফুপ্পুর বিষণ্ণ মুখ দেখে তার খারাপ লাগছিল।
এই প্রথমবার তিনি তার সাথে এভাবে কথা বলছিলেন, নতুবা আগে মেহমিল মাঝখানে এমন দেয়াল তুলে রেখেছিল যে তাকে খুঁজে পাওয়া ছিল দায়।
তিনি তার আব্বার একমাত্র বোন। কেনই বা সে মানুষের নামে অভিযোগ করবে?
সে নিজেও তো কখনো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেনি।
"হ্যাঁ, সেটি তো ঠিক কিন্তু—"
ঠিক সেই মুহূর্তে ফাওয়াদ রান্নাঘরের দরজা খুলল।
তারা দুজনেই চমকে ওদিকে তাকাল। মেহমিলের ঠোঁট শক্ত হয়ে কুঁচকে গেল। সে দ্রুত সবজি কাটতে লাগল।
"মেহমিল! এক কাপ চা পাওয়া যাবে?"
"ও এখন ব্যস্ত। তোমার বোনদের বলো।
ওরা বাইরে তো বেকারই বসে আছে," ফুপ্পু অত্যন্ত অবহেলার সাথে বললেন।
ফাওয়াদ কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফিরে গেল।
"হুন! হুকুম দেখো কীভাবে চালাচ্ছে। তুমি ওর একটা কথাও শুনবে না। আমারও কত স্বপ্ন ছিল। আমাদের কি কোনো অভাব আছে নাকি? ফায়িকার বাবার ব্যবসার কথা তো তুমি জানোই, কোটি টাকা নিয়ে খেলেন।
এদের মতো এতিমদের মাল তো খান না।"
"আমি এতিম নই ফুপ্পু! আমি প্রাপ্তবয়স্ক।
আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এতিম বলে কিছু থাকে না।" সে এখন সালাদে লেবু নিংড়াচ্ছিল।
"হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি জানো, এই তো ফায়িকার বাবা নতুন বাড়ি বানিয়েছেন। দ্বিতীয় বাড়িটি আবার নতুন করে ফার্নিশ করে ফায়িকাকে যৌতুক হিসেবে দেবেন।"
মেহমিলের লেবু নিংড়ানো আঙুলগুলো থেমে গেল। একটি চিন্তার উদয় হতেই সে চমকে মাথা তুলল।
"ফুপ্পু!" তার মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করছিল।
"আপনার তো সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তাই না? নতুন বাড়ি শিফট করেছেন। আপনি একা কীভাবে সব করবেন? চাকরদের ওপর তো ভরসাই করা যায় না। আমি আপনার কাছে চলে আসব সাহায্য করতে।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই!" ফুপ্পু তো মহা খুশি হয়ে গেলেন। "আমি তোমাকে বলতে যাচ্ছিলাম, তারপর ভাবলাম তোমার পড়াশোনা আছে।"
(তাহলে এই জন্যই এত ভালোবাসা দেখাচ্ছিলেন, যাই হোক)।
"সমস্যা নেই, উইকেন্ড (Weekend) আছে, আর... আপনার সাহায্যও তো করতে হবে।"
ফাওয়াদ থেকে দূরে থাকার এটিই তার কাছে একমাত্র উপায় মনে হয়েছিল। ফুপ্পু সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন। সে দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছাতে লাগল।
গোছানোর আর কী ছিল—দুই জোড়া কাপড় রাখল, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। আর তারপর কুরআন রাখতে গিয়ে সে থেমে গেল।
'কুরআন তো ওখানে অনুবাদেরটা পেয়েই যাব, দুই দিনের তো ব্যাপার, এখন সাথে আর কী রাখব? কোনো দরকার নেই।' সে ব্যাগের চেইন বন্ধ করে দিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ফুপ্পুর মালামাল শিফট হয়ে গিয়েছিল, সব শুধু কার্টনবন্দি ছিল। মেহমিল পৌঁছানো মাত্রই কাজে লেগে পড়ল। ফায়িকা তো টিভিতেই মগ্ন ছিল।
ডিশও লাগানো হয়ে গিয়েছিল এবং সে খুব আগ্রহ নিয়ে কিছু একটা দেখছিল। ফুপ্পু তাকে কিছু বললেন না, মেহমিলই সবকিছু নিপুণভাবে গুছিয়ে দিচ্ছিল।
রাত এগারোটা বাজল যখন সে আজকের মতো কাজ শেষ করল।
তারপর গোসল করে নতুন কাপড় পরল। পুনরায় অজু করে ওড়না মাথায় জড়িয়ে সে ফুপ্পুর কাছে এল।
"ফুপ্পু! আপনার কাছে কি অনুবাদসহ কোনো মুসহাফ (কুরআন) হবে?"
"কী, অনুবাদসহ?" তিনি নিজের কাপড়ের আলমারি গোছাচ্ছিলেন।
"কুরআন... কুরআন আছে কি?" সে দ্রুত পরিষ্কার করে বলল।
"অনুবাদসহ তো... ফায়িকার দাদির ছিল আগের বাড়িতে।
কিন্তু সেটি কেউ চেয়ে নিয়ে গিয়েছিল, অনুবাদ ছাড়াটা হবে বোধহয়।"
"আচ্ছা ঠিক আছে, ওটাই দিন।"
"বইয়ের কার্টুন থেকে বের হয়নি?"
"না তো। আমি নিজে সব বই এখানে রেখেছি।"
"তবে হয়তো কোথাও মিসপ্লেস (Misplace) হয়েছে।
ফায়িকাকে জিজ্ঞেস করো।" তিনি আবার কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন।
সে নিস্পৃহ মনে ফায়িকার কাছে এল।
"ফায়িকা বাজি! আপনার কাছে কুরআন হবে?"
"আমার কাছে? আমার ও দিয়ে কী কাজ?" সে উল্টো অবাক হলো।
"আম্মাকে জিজ্ঞেস করো, তিনিই জানবেন।"
সে হতাশ হয়ে নিজেই খুঁজতে লাগল। বইয়ের র্যাকটি আবার দেখল, প্রতিটি জিনিস তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু কুরআন ছিল না, পাওয়া গেল না।
সে নিজের কামরায় এল এবং নিজের ব্যাগটি আবার খুলল। হয়তো কোনো মোজেজা হয়ে যাবে আর হয়তো সে কুরআনটি ব্যাগে রেখে দিয়েছে—সব কাপড় ওলটপালট করল। কিন্তু সেটি থাকলে তো পাওয়া যেত।
সে আবার লাউঞ্জে গেল।
"ফায়িকা বাজি! আপনার কাছে তিলাওয়াতের কোনো ক্যাসেট হবে?"
"না।" ফায়িকা উদাসীনভাবে কাঁধ ঝাকালো।
"এমন কোনো চ্যানেল হবে কি, যাতে তিলাওয়াত প্রচার হয়?"
"বিরক্ত কোরো না মেহমিল! আমি মুভি (Movie) দেখছি।" সে বিরক্ত হয়ে মুখ পুরোপুরি টিভির দিকে ঘুরিয়ে বসল।
মেহমিল ক্লান্ত পায়ে ফিরে এল এবং বিছানায় আছড়ে পড়ে না জানি কেন কাঁদতে লাগল।
রাতটা সে অস্থির ঘুমে কাটাল। পরের সারাদিন কাজ করাতে করাতে সে বিষণ্ণ ও অস্থির ছিল। খাবারেরও মাত্র কয়েক লোকমা নিতে পারল। তার যেন কিছুই খাওয়া হচ্ছিল না।
শনিবার ও রবিবারের এই দুই দিন যেন তার জীবনের নিকৃষ্টতম দিন ছিল। তার মন চাচ্ছিল সে উড়ে গিয়ে বাড়ি পৌঁছে যাক এবং নিজের কুরআনটি হাতে তুলে নিক।
কাকতালীয়ভাবে রাজিয়া ফুপ্পুর ড্রাইভার ছুটিতে চলে গিয়েছিল, আর সে ওনার স্বামী নাফিস আঙ্কেলকে কিছু বলতেও পারছিল না। বাড়ি থেকেও কেউ তাকে দিয়ে যাবে না, সে জানত।
আল্লাহ আল্লাহ করে রবিবার রাতে বাড়ি থেকে গাড়ি তাকে নিতে এল।
তারপর যে মুহূর্তে সে বাড়িতে প্রবেশ করল, অন্য কোথাও যাওয়ার বদলে, কারো সাথে দেখা করার বদলে সে দৌড়ে নিজের কামরায় গেল।
শেলফের ওপর ব্যাগটি একপাশে ছুড়ে মারল এবং শেলফ থেকে কুরআনটি তুলে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। তার মনে হলো, এখন সে সারাজীবনে কুরআন ছাড়া কোথাও যেতে পারবে না।
মানুষ চাবি, মানিব্যাগ আর মোবাইলের জন্য ফিরে আসে, কুরআনের জন্য কেউ ফিরে আসে না। না জানি কেন।
"মেহমিল!" আম্মা ডাকতে ডাকতে এলেন, সে দ্রুত চোখের জল মুছল এবং নিজের মুসহাফটি সাবধানে শেলফে রাখল।
"মেহমিল! এই নাও—" আম্মা দরজা খুললেন এবং একটি চিঠির খাম তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "তোমার ডাক (চিঠি) এসেছিল কাল।"
"আমার ডাক?" সে অবাক হয়ে খামটি নিল। মুসাররাত তাড়াহুড়োয় ছিলেন, খামটি দিয়ে ফিরে গেলেন।
সে দ্বিধাভরে খামটি ছিঁড়ল এবং ভেতরে থাকা কাগজগুলো বের করল।
সেটি ছিল স্কলারশিপ (Scholarship), যা তাকে দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ।
সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সেটির দিকে তাকিয়ে রইল।
'মেহমিল! তোমার ডাক এসেছিল।'
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"এটি কি সেই স্কলারশিপ ছিল?"
খাবারের টেবিলে আগা জান জিজ্ঞেস করতেই একমুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। মেহমিল নিজের নত মাথা তুলল।
সবাই হাত থামিয়ে তাকেই দেখছিল।
"জি।" নিজের কণ্ঠস্বর তার কাছেই অনেক দূর থেকে আসা কোনো শব্দের মতো মনে হলো—আনন্দ বা উচ্ছ্বাসহীন এক কণ্ঠ।
"হুম। তো ক্লাস কবে শুরু হবে?" আগা জান কথা বলার পাশাপাশি চামচ দিয়ে প্লেটে শব্দ করছিলেন।
বাকি সবাই দম বন্ধ করে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিঃসন্দেহে এটি ছিল অনেক বড় এক খবর।
"সেপ্টেম্বরে।"
"সব খরচ কি তারাই বহন করবে?"
"জি।" সে-ও উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে খেতে শুরু করল।
ডাইনিং হলে তখন তার চাচাদের গলার আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল।
"ভেরি গুড (Very good)!"
"ইংল্যান্ডে?"
"স্কলারশিপ?"
"মেহমিল কি ইংল্যান্ড চলে যাবে?"
ফিসফাস আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল।
সে মাথা নিচু করে নীরবে খাওয়া শেষ করল, তারপর চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল এবং কোনো কথা না বলে ডাইনিং হল থেকে চলে গেল।
সে জানত না যে সে খুশি নাকি অখুশি। সে এক নতুন জীবন গড়ার সুযোগ পাচ্ছিল, তার খুশি হওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু তবে এই বিষণ্ণতা কেন? বুক ফেটে যাওয়ার মতো এই অনুভূতি কেন? হয়তো এর কারণ ছিল এই যে, ইংল্যান্ডে গেলে তাকে 'ইলমুল কিতাব' আর মসজিদ ছাড়তে হবে।
কুরআনের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। (কিন্তু সেটি তো আমি পরেও করতে পারি। ইংল্যান্ড যাওয়ার সুযোগ তো আর পরে আসবে না।)
এই সব চিন্তায় মগ্ন থাকতেই একসময় ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সকালে ক্লাসে সিপারা খোলার সময় সে আশা করেছিল যে, আজকের পাঠে নিশ্চয়ই তার স্কলারশিপ পরবর্তী চিন্তাভাবনা সংক্রান্ত কোনো আয়াত আসবে।
কিন্তু আজকের আয়াতগুলো ছিল সূরা বাকারায় বর্ণিত বনী ইসরাঈলের কোনো এক প্রাচীন কাহিনীর।
এই প্রথমবার এমন হলো যে সে তার উত্তর পাচ্ছিল না এবং যে ঘটনাটি বর্ণনা করা হচ্ছিল, সেটিও কিছুটা বোধগম্য ছিল না। আসলে সেটি অবোধগম্য ছিল না, তার কাছে তেমন মনে হয়েছিল। সে স্কলারশিপের কথা ভুলে গিয়ে সেই ঘটনার মাঝেই হারিয়ে গেল।
ঘটনাটি ছিল এমন যে, যখন তালুতের সৈন্যদল জালুতের সাথে যুদ্ধের জন্য বের হলো, তখন পথে আসা একটি নহরের (ছোট নদী) মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করা হলো। আল্লাহ সেই নহরের পানি পান করা নিষেধ করলেন—কেবল এক আঁজলা পানি বাদে। যারা পেট ভরে পানি পান করল তারা নহরের তীরেই রয়ে গেল, আর যারা পানি পান করল না তারা সামনে এগিয়ে গেল। তাদের মধ্যেই ছিলেন হযরত দাউদ (আ.), যিনি জালুতকে হত্যা করে তাকে পরিণতির দিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
পুরো তাফসির শোনার পরও সে বুঝতে পারল না যে, কেন নহরের পানি পান করা যাবে না? পানি তো হারাম নয়, তবে কেন?
সে সারা দিন এটিই ভাবতে লাগল।
এমনকি রাতে যখন মিষ্টি নিতে রান্নাঘরে এল, তখনও সে এটিই ভাবছিল। রান্নাঘর খালি ছিল, সে ফ্রিজার খুলে সুইট ডিশের বাটিগুলো বের করল, বড় ট্রে-তে রাখল এবং ট্রে তুলে বাইরে এল।
তিলাওয়াতের সেই সুর তার কানে তখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—
সূরা আল-বাকারার :২৪৯
فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِالْجُنُودِ
("ফালাম্মা- ফাসলা ত্ব-লূতু বিল-জুনূদ")
"তারপর তালুত যখন তার সৈন্যদলসহ পৃথক হলো..."
সে ট্রে হাতে ডাইনিং হলে এল। উঁচু পনিটেইলটি নত মাথা থেকে আরও উঁচিয়ে ছিল। কাঁধে ওড়না আর স্বচ্ছ চেহারায় গাম্ভীর্য নিয়ে সে ট্রে-টি বড় টেবিলে রাখল। সবাই বিরতি দিয়ে তাকেই দেখছিল—কিছুটা মুগ্ধ, কিছুটা ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে।
২:২৪৯
قَالَ إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيكُم بِنَهَرٍ
("ক্ব-লা ইন্না আল্লা-হা মুব্তালীকুম বিনাহার")
"সে বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নহরের মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন।"
সে নীরবে ট্রে থেকে বাটিগুলো বের করছিল। প্রথম বাটিটি সে আগা জানের সামনে রাখল।
২:২৪৯
فَمَن شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْسَ مِنِّي
("ফামান শারিবা মিনহু ফালাইসা মিন্নী")
"অতঃপর যে ব্যক্তি এই নহর থেকে পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
দ্বিতীয় বাটিটি দুই হাতে তুলে সে টেবিলের মাঝখানে রাখল।
২:২৪৯
اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ
("ওয়ামান লাম ইয়াত্ব’আমহু ফা-ইন্নাহূ মিন্নী ইল্লা- মানিগ তারাফা গুর্ফাতাম বিয়াদিহ্")
"আর যে ব্যক্তি এই নহর থেকে পান করবে না, কেবল নিজের হাতের এক আঁজলা ছাড়া, সে নিশ্চয়ই আমার দলভুক্ত।"
সে শেষ বাটিটি টেবিলের শেষ প্রান্তে রাখল এবং নিজের চেয়ারে ফিরে এল।
২:২৪৯
فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ
("ফাশারিবূ মিনহু ইল্লা- ক্বালীলাম মিনহুম")
"অতঃপর অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা সবাই সেই নহর থেকে পান করল।"
সবাই সুইট ডিশ খাওয়া শুরু করেছিল। কাঁচের বাটি আর চামচের ঠোকাঠুকির শব্দ বিরতি দিয়ে কানে আসছিল। এই শব্দগুলোর মাঝে সেই ধীর ও দয়ালু কণ্ঠস্বরটিও তার কানে বাজছিল—সে তখনও দূরে কোথাও সেই আওয়াজের মাঝে হারিয়ে ছিল।
"অতঃপর অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা সবাই তা থেকে পান করল।"
সে বাটি সামনে টেনে নিল এবং কিছুটা ক্ষীর নিজের বাটিতে ঢালল।
"অতঃপর অল্প সংখ্যক ছাড়া তারা সবাই তা থেকে পান করল।"
সে এখন খুব ধীরে ধীরে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছিল।
"তো তোমাকে কবে নাগাদ যেতে হবে মেহমিল?"
আগা জান জিজ্ঞেস করতেই আবারও হলে নীরবতা নেমে এল। চামচের শব্দ থেমে গেল। অনেকগুলো ঘাড় তার দিকে ফিরল। সে মাথা তুলল। সবাই তার দিকে মনোযোগী ছিল।
"আগস্টের শেষ নাগাদ।"
"অর্থাৎ তুমি সেপ্টেম্বরের আগে
থাকছ না।"
"না!"
"মানে কী?" আগা জান চমকে উঠলেন।
"আমি যাচ্ছি না।" সে চামচটি বাটিতে রেখে দিল এবং ন্যাপকিন(রুমাল) দিয়ে ঠোঁট মুছল।
"মানে কী? তুমি এত বড় স্কলারশিপ ছেড়ে দেবে?" ফিজা চাচি বিস্ময়ে বলে উঠলেন।
"আমি ছেড়ে দিয়েছি।"
"কেন? কেন?"
সে ন্যাপকিন একপাশে রেখে উঠে দাঁড়াল।
"কারণ সব জায়গা থেমে যাওয়ার জন্য নয়। আমি যদি সেই নহর থেকে পানি পান করি, তবে আমি সারাজীবন ওখানেই বসে থেকে যাব, আর তালুতের সৈন্যদল অনেক দূরে চলে যাবে।
কিছু হালাল জিনিস বিশেষ সময়ে হারাম হয়ে যায়। সেই সময় আপনি যদি নিজের নফসকে (ইচ্ছা) প্রাধান্য দেন, তবে কল্যাণের পথে চলা মানুষগুলো দূরে চলে যাবে।
আমি নহরের পাড়ে সারাজীবন বসে থাকতে চাই না। আমাকে সেই 'দাউদ' হতে হবে যে জালুতকে মারতে পারে।"
সে যা ভেবেছিল তার মধ্য থেকে কেবল এতটুকুই বলল।
"আমাকে এখনও কুরআন পড়তে হবে।" এবং দ্রুত পায়ে সে বাইরে বেরিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
বিকেলের ঠান্ডা বাতাস তার আপন ছন্দে বইছিল। সে চায়ের কাপ হাতে টেরাসে চেয়ার পেতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেখানে বিকেলের পাখিরা তাদের নীড়ের দিকে উড়ে যাচ্ছিল।
টেরাস থেকে সামনের বাড়িটি দেখা যেত। সেই ব্রিগেডিয়ার সাহেবের বাড়ি যার বাড়িতে একদিন সে কুরআনখানি দেখেছিল।
কুরআনকেও আমরা না জানি কী থেকে কী বানিয়ে ফেলেছি।
সে একটি চিন্তার বশবর্তী হয়ে কাপটি একপাশে রাখল এবং উঠে দাঁড়াল। ঘুরতেই সামনে ফাওয়াদের চেহারা দেখতে পেল। সে ঘাবড়ে গিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
ফাওয়াদ ঘরে ঢোকার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল—বুকের ওপর হাত বেঁধে, ঠোঁট কামড়ে তাকে দেখছিল।
"তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ। অথচ তুমি জানো, এতে আমার কোনো দোষ নেই।" মেহমিল চুপ করে রইল।
"কাল দুপুর তিনটায় আমি স্টপে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তোমার সাথে খুব জরুরি কথা আছে। আই হোপ (I hope) তুমি নিশ্চয়ই আমার কথা শুনতে আসবে।"
এ কথা বলে সে একপাশে সরে গেল।
মেহমিলের পথ খুলে গেল। সে তার দিকে না তাকিয়েই দ্রুত চৌকাঠ পার হয়ে গেল।
একটি কসম ছিল যা সে খেয়েছিল, সেটি সে ভাঙতে পারত না। কিন্তু সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার মনে হলো যে, হয়তো সে সেই কসমের বোঝা থেকে এখন মুক্তি পেতে চায়।
এখন আর সেই কসম রক্ষা করা যাচ্ছে না। (একবার ফাওয়াদের সাথে বাইরে দেখা করলে আর কী হবে? কাল দুপুর তিনটায়। না, আমি কসম ভাঙব না।) সে ঘাবড়ে গিয়ে মাথা ঝাকালো। তার ভেতরের চিন্তাগুলো তাকে আতঙ্কিত করতে শুরু করল।
তারপর তার মনে পড়ল—সে টেরাস থেকে কেন নিচে আসছিল? ওহ হ্যাঁ, সেই কুরআনখানির বাড়িটি। সে কিছু ভেবে বাড়ি থেকে বাইরে এল।
পাশের বাংলোটি লতায় ঘেরা এক চমৎকার বাংলো ছিল। সে গেটের ওপর জন্মানো লতার ওপর হাত রাখল। ওড়নাটি কাঁধের চারপাশে জড়িয়ে, উঁচু করে বাঁধা পনিটেইলটি নাড়াতে নাড়াতে সে চারপাশটা দেখছিল।
পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। তারপর গেট খুলল। সেই একই চাকরের মুখ সামনে ভেসে এল।
"জি?"
"ব্রিগেডিয়ার সাহেব কি বাড়িতে আছেন?"
"না, কিন্তু আপনি কে?"
"আমি মেহমিল ইব্রাহিম, পাশের বাড়িতে থাকি—আগা হাউসে। এই কিছু প্যামফ্লেট (Pamphlets) আছে, ব্রিগেডিয়ার সাহেবকে দিয়ে দিও।
তিনি যেন পড়ে আমাকে ফেরত দেন। আমি এগুলো নিতে অবশ্যই আসব। এই দায়িত্ব আমি তোমাকে দিচ্ছি, আর দায়িত্ব হলো একটি আমানত।
যদি আমানতে খেয়ানত করো, তবে পুলসিরাত পার হতে পারবে না। বুঝেছ?"
কয়েকটি প্যামফ্লেট আর কার্ড তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে হুঁশিয়ারি দিলে চাকরটি ঘাবড়ে গিয়ে "আচ্ছা জি" বলে মাথা ভেতরে নিয়ে নিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সেই বিকেল, সেই রাত এবং তার পরের সকালটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। সে মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারেনি। সারা রাত বিছানায় ছটফট করে কেটে গেল।
ভবিষ্যৎ অনেক আশঙ্কার কুয়াশায় ঢাকা মনে হচ্ছিল। সে কী করবে, কার পরামর্শ নেবে, কাকে জিজ্ঞেস করবে?
আর উত্তরের জন্য তো তার ভাবার প্রয়োজনই ছিল না।
সকালের কাছাকাছি সময়ে যখন সে কসম ভাঙার কথা ভাবল, তখন বিছানা থেকে উঠল এবং বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
গতকাল তাদের ক্লাসে সূরা বাকারা শেষ হয়েছিল, আর আজ আল-ইমরান শুরু হওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত প্রথম এগারোটি আয়াত পড়ার কথা। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আজকের পাঠে অবশ্যই কোনো সমাধান থাকবে। তাই সে আজকের আয়াতগুলো খুলল।
তারপর সেই সমস্ত আয়াত সে দুই-তিনবার পড়ল।
মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা সৃষ্টি হলো। সেখানে কোনো উল্লেখ ছিল না—না কসমের, না কসম ভাঙার কাফফারার।
"কাফফারা?" সে চমকে উঠল, "তাহলে কি আমি কসম ভাঙতে চাই?"
"হ্যাঁ!" মন স্পষ্ট উত্তর দিল। তখন সে নিজের কাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মুসহাফ (কুরআন) বন্ধ করল এবং ওপরে রেখে দিল।
ফারিস্তে একটি ফাইলের ওপর দায়সারা নজর বুলিয়ে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই মেহমিল প্রায় দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে এল।
"ফারিস্তে! আমাকে আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে।"
ফাইলের পৃষ্ঠার কোণ ফারিস্তের আঙুলের মাঝে ছিল, সে মাথা তুলল।
"আসসালামু আলাইকুম! কী ব্যাপার?"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম।" সে হাঁপাতে
হাঁপাতে দ্রুত বলে যাচ্ছিল,
"একটি ফতোয়া নিতে হবে।"
"আমি তো মুফতি নই।"
"কিন্তু এটি শুধু একটি ফিকহী মাসআলা।"
"অবশ্যই জিজ্ঞেস করো, তবে আজকের তাফসির শুনে নাও, ওতেই তোমার সমস্যার সমাধান আছে।" মেহমিল ধাক্কা খেল।
"আপনি আমার সমস্যার কথা জানেন?"
"আরে না, আমি তো আজকের আয়াতগুলোও জানি না। ম্যাডাম মিসবাহ ইদানিং তোমাদের ক্লাস নিচ্ছেন না?"
"তবে আপনি কীভাবে জানলেন যে..."
"কারণ এটাই সবসময় হয়। তাফসিরের জন্য অপেক্ষা করো, তোমার সমস্যা পরিষ্কার ভাষায় চলে আসবে।" সে ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টালো এবং দায়সারাভাবে ওপর-নিচ দেখতে লাগল।
"কিন্তু আমি আজকের আয়াতগুলো পড়েছি, সেগুলোতে আমার সমস্যা নেই, আমি জানি।"
"সবর করো মেয়ে! ইলম সবরের সাথে আসে, তাফসিরের পর জিজ্ঞেস করে নিও। তবে নিশ্চিতভাবে তার প্রয়োজন পড়বে না।" সে হালকাভাবে মেহমিলের গাল চাপড়ে ফাইল দেখতে দেখতে এগিয়ে গেল।
মেহমিল নিজের গাল স্পর্শ করল, তারপর মাথা ঝাকিয়ে করিডোর দিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
এমন কখনোই হয়নি যে সে যা ভাবছে তা কুরআনে লেখা নেই। মানুষ তার কথা শুনত না। শুনলেও গুরুত্ব দিত না, আর গুরুত্ব দিলেও বুঝত না। আর এক কুরআন ছিল, যাকে বলতেও হতো না আর সে মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত, খেয়াল করত, বুঝত এবং তারপর প্রজ্ঞা ও হিকমতের সাথে তাকে বোঝাত; আর তার মতো করে কেউ বোঝাত না।
কিন্তু তার মনে হলো, আজকের আয়াতে এমন কোনো কথা নেই যা তার সাথে সম্পর্কিত।
খুব অনীহা আর দুঃখ নিয়ে সে সিপারা খুলল। সে সাদা চাদরের ওপর দু’জানু হয়ে বসে ছিল, সামনে ডেস্কে সিপারা খোলা, একপাশে রেজিস্টার ছিল যার ওপর ঝুঁকে সে দ্রুত লিখছিল।
এখন ম্যাডাম মিসবাহ মুহকাম (সুস্পষ্ট) আয়াত এবং মুতাশাবিহ (রূপক) আয়াতের অর্থ বোঝাচ্ছিলেন।
"মুহকামাত হলো সেই সব আয়াত যার অর্থ আমরা বুঝতে পারি। যেমন বিধি-বিধান, এই দুনিয়ার কথা, দুনিয়ার কোনো বাগানের উদাহরণ, ঐতিহাসিক ঘটনা।
আর মুতাশাবিহ হলো সেই সব আয়াত যা আমরা কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু সেগুলোর ওপর ঈমান বিল গায়ব (অদৃশ্যে বিশ্বাস) আনা জরুরি। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম, আল্লাহর হাত, ফেরেশতাদের আকৃতি। মুতাশাবিহাতের পেছনে পড়া উচিত নয়।
আর যে পড়ে, তার থেকে দূরে থাকা উচিত।" ম্যাডাম মিসবাহ এটাই বোঝাচ্ছিলেন।
মেহমিল মন্থর গতিতে সমস্ত পয়েন্ট রেজিস্টারে লিখছিল।
"মুতাশাবিহাত... এই ঈমান বিল গায়ব এমন হওয়া উচিত যেমন—" ম্যাডামের কণ্ঠ হলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। "যেমন পরবর্তী আয়াতে উল্লেখ আছে যে,
'রাসিকুনা ফিল ইলম' (জ্ঞানে যারা সুগভীর) তারা এগুলোর ওপর ঈমান আনে।
এখন রাসিকুনা ফিল ইলম কারা?
একজন হয় ছাত্র, একজন জ্ঞানী। আর তার চেয়ে বড় মর্যাদা হলো সুগভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির।
এরা কারা? এদের সম্পর্কে নবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রাসিকুনা ফিল ইলম কারা, তখন আপনি (সা.) বলেছিলেন—"
"যারা কসম পূর্ণ করে।"
মেহমিলের হাত থেকে কলম পড়ে গেল। কালির কয়েক ফোঁটা চাদর ভিজিয়ে দিল।
ম্যাডাম সামনে আরও বলছিলেন, "যাদের অন্তর সরল-সঠিক।"
কিন্তু সে পলকহীন চোখে সিপারায় লেখা
"রাসিকুনা ফিল ইলম" শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। একটিই প্রতিধ্বনি তার কানে বারবার বাজছিল।
"যারা কসম পূর্ণ করে।"
সে স্তব্ধ হয়ে সিপারার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"রাসিকুনা ফিল ইলম"—সিপারার শব্দগুলো ঝাপসা হয়ে গেল।
তার চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল।
শতাব্দী আগে আরবের মরুভূমিতে কিছু মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিল যে, পুষ্ট জ্ঞানের অধিকারী কারা। আর তখন তিনি বলেছিলেন যে—যারা কসম পূর্ণ করে।
তার মনে হলো, শতাব্দী আগে বলা কথাটি অন্য কারো জন্য নয়, কেবল তারই জন্য ছিল। সে আঙুলের ডগা দিয়ে এই শব্দগুলো বারবার স্পর্শ করছিল, অনুভব করছিল। অশ্রু তার গাল বেয়ে ঘাড়ের ওপর গড়িয়ে পড়ছিল।
এই শব্দগুলো আজকের আয়াতেই ছিল; সে কীভাবে ভেবে বসল যে সমস্যার সমাধান আজকের আয়াতে পাওয়া যাবে না?
"আমরা শুনলাম এবং আমরা আনুগত্য করলাম।" সে আত্মসমর্পণ করেছিল।
কসম খাওয়া পছন্দনীয় ছিল না, কিন্তু এখন সে এটি আজীবন রক্ষা করবে। আর জানত যে এটাই তার জন্য মঙ্গলজনক।
সেদিন সে তিনটার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সেই সকালটি খুব ফ্যাকাসে হয়ে উদিত হয়েছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখছিল। আজ সে উঁচু পনিটেইল না করে সাধারণ একটি বিনুনি করেছিল। স্বচ্ছ চেহারায় কিছুটা মলিনতা ছেয়ে ছিল। সে কয়েক মুহূর্ত নিজেকে দেখল, তারপর কালো চাদর মাথায় দিল এবং চিবুক পর্যন্ত পেঁচিয়ে আঁচল অন্য কাঁধে ফেলল।
আজ তাকে সাক্ষ্য দিতে হবে। ফাওয়াদের বিরুদ্ধে অথবা নিজের বিরুদ্ধে।
লাউঞ্জে তিন চাচাই অপেক্ষা করছিলেন। মাড় দেওয়া সাদা সালোয়ার-কামিজে আগা জান কোমরে হাত বেঁধে অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন। তাকে করিডোর দিয়ে আসতে দেখে থেমে গেলেন।
"চলুন।" সে ভাবলেশহীন মুখে তাদের দিকে না তাকিয়ে দরজার দিকে এগোল এবং সেটি খুলে বাইরে বের হলো। তারা সবাই একসাথে বাইরে এল।
গেট খুলল, একে একে দুটি গাড়ি পোর্চ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলতে লাগল। সেই উঁচু বাড়ির অনেক জানলায় অনেক মহিলাই তাদের যাওয়া দেখছিল। গাড়িগুলো আড়ালে চলে গেলে মেয়েরা পর্দা ছেড়ে দিল।
আদালতের করিডোরে সে জড়সড় হয়ে, দৃষ্টি নিচু করে আগা জানের সাথে সাথে হাঁটছিল।
এদিক-ওদিক পুলিশ, উকিল এবং আরও কত মানুষ আসছিল-যাচ্ছিল।
জায়গাটি খুব বিভীষিকাময় ছিল। সে মাথা তুলতে পারছিল না। কেবল মুহূর্তের জন্য সে মুখ ওপরে তুলল—করিডোরের শেষ প্রান্তে সে দাঁড়িয়ে ছিল; নিজের কোনো এক সিপাইকে কঠোর ভঙ্গিতে রেগে কিছু বলছিল।
ইউনিফর্ম পরা, মাথায় ক্যাপ। সে খুব তেজোদীপ্ত ছিল। আর জীবনে প্রথমবার মেহমিলের তার ওপর রাগ হয়নি। এই সমস্ত মানুষের ভিড়ে কেবল তাকেই নিজের শুভাকাঙ্ক্ষী মনে হচ্ছিল।
সে দৃষ্টি নিচু করে নিল।
করিডোরের মোড়ের কাছাকাছি ছিল, যখন হুমায়ুনের দৃষ্টি তার ওপর পড়ল এবং সে থমকে গেল। আগা করিমের বাম কাঁধের পেছনে লুকিয়ে থাকা, ঘাড় নিচু করে আসা, কালো চাদরে মোড়ানো মেয়েটি যার চেহারায় যুগের ক্লান্তি লেখা ছিল। সে মাথা তোলেনি, হুমায়ুন তাকে দেখতে লাগল যতক্ষণ না সে তার পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল।
হ্যাঁ, আগা করিম তার ওপর একটি ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টি অবশ্যই দিয়েছিলেন।
হুমায়ুন এখন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে লাগল। হয়তো সে তার চোখ দেখতে চেয়েছিল, সেগুলো পড়তে চেয়েছিল।
করিডোরের মাঝপথে হঠাৎ সেই কালো চাদর পরা মেয়েটি ঘাড় পেছনে ঘুরাল। দুজনের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য মিলিত হলো; হুমায়ুন মেহমিলের চোখে যুগের ক্লান্তি দেখতে পেল। তারপর সে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং একইভাবে মাথা নিচু করে নিজের চাচাদের বেষ্টনীতে সামনে এগিয়ে গেল।
আদালত কক্ষে সে বাম সারির সব পেছনের আসনে বসে ছিল। আগা জান তার ডান দিকে ছিলেন, তার বাম দিকে কেউ ছিল না, সারিটি খালি ছিল। সে মাথা নিচু করে সমস্ত কার্যক্রম শুনতে লাগল। সে চোখ পর্যন্ত তুলতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল সবাই যেন তাকেই দেখছে।
আর তারপর এক মুহূর্তের জন্য যেমনই সে মাথা তুলল, হুমায়ুন অন্য স্ট্যান্ডে বসে ঘাড় কাত করে তাকেই দেখছিল। তারা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
হুমায়ুনের চোখে প্রশ্ন ছিল—বিদ্ধ করা, যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্ন। সে আর বেশিক্ষণ দেখতে পারল না।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে আগা জানকে দেখতে লাগল, যারা দাঁত চেপে উকিলদের যুক্তি শুনছিলেন। গভীর মনোযোগ অনুভব করে আগা জান মেহমিলের দিকে তাকালেন।
"কী?" সে যেভাবে তাদের দেখছিল, তারা কিছুটা বিভ্রান্ত হলেন।
"সম্পত্তিতে আমার অংশ কি আমি পেয়ে যাব?" সে ফিসফিস করল, তাদের ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই।
"হ্যাঁ, কেন নয়?"
"এটাই যদি আমি জিজ্ঞেস করি যে কেন নয়—তবে?"
"মানে কী?"
"আমি এখনই গিয়ে হুমায়ুন দাউদের বিরুদ্ধে বয়ান দেব, কিন্তু কী গ্যারান্টি (Guarantee) আছে যে আপনি নিজের কথা থেকে সরে দাঁড়াবেন না?"
"তুমি আমাকে সন্দেহ করছো?"
"যদি করি তবে?"
আগা জানের কপালে রাগের রেখা ফুটে উঠল, যা তিনি চেপে গেলেন।
"তুমি এখন কী চাও?"
"এটি।" সে কালো চাদরের ভেতর থেকে ব্যাগ বের করল, চেইন খুলল এবং একটি কাগজ ও পেন বের করে তাদের দিকে বাড়িয়ে দিল।
"আমার শুধু ফ্যাক্টরির শেয়ারের মূল্য প্রায় নয় কোটির কাছাকাছি।
বাকি হিসাব আমি এখন চাইছি না। এটি আপনার চেক বইয়ের চেক। অংক আমি লিখে দিয়েছি, এটি সই করে দিন।" সে পেনটি তাদের সামনে ধরল। তারা কখনো তাকে দেখছিলেন, কখনো পেনকে।
"আগা জান! মেহমিল এখন আর বাচ্চা নেই। আপনি আমার থেকে আমার আখেরাত কিনছেন। আমি যদি মিথ্যা সাক্ষ্য দিই, তবে আমি পুলসিরাত পার হওয়ার আগেই পড়ে যাব।
যদি পড়তেই হয় তবে তার তো কিছু মূল্য থাকতে হবে, আপনি এটি সই করুন। আমি এখনই গিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছি।"
সে পেন আর চেক তাদের হাতে দিল।
"এই হলে কেউ আমার ইশারার অপেক্ষায় আছে। আমি এই চেক সই করিয়ে এখনই তাকে ব্যাংকে পাঠাব। যেমনই এই চেক ক্যাশ (Cash) হবে, সে আমাকে সিগন্যাল (Signal) দেবে, তখন আমি সাক্ষ্য দেব, নতুবা নয়।"
তিনি চেকের দিকে একবার তাকালেন এবং তারপর পেনটির দিকে।
অন্যদিকে মেহমিলের নাম ডাকা হলো। সে তাদের সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে উঠে দাঁড়াল এবং মাথা উঁচু করে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে গেল।
আগা করিম কখনো চেকের দিকে তাকাচ্ছিলেন আর কখনো তার দিকে, যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল এবং তার সামনে গিলাফে মোড়ানো কুরআন আনা হয়েছিল। সে দৃষ্টি তাদের ওপর জমিয়ে রেখে পলক না ফেলে কুরআনের ওপর হাত রেখে কয়েকটি বাক্য আওড়ালো।
আগা জান শেষবারের মতো চেকটি দেখলেন, এবং তারপর রাগে সেটি দুমড়ে-মুচড়ে দুই টুকরো করে ফেললেন।
মেহমিল তিক্তভাবে হাসল, মাথা ঝাকালো এবং উকিলের দিকে মনোযোগী হলো। তিনি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করছিলেন।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ফাওয়াদের জামিন নাকচ হয়ে গেল। তার বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণ ছিল। তাকে পুনরায় জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
ফেরার পথটি খুব নীরবতায় কাটল। সে আগা জানের ল্যান্ড ক্রুজারের পেছনের সিটে খুব শান্তভাবে সারা পথ বাইরে তাকিয়ে এসেছিল।
যখন গাড়ি পোর্চে থামল, সে সবার আগে নামল।
লনে অনেক মহিলা দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
"কী হয়েছে?"
সে কারো দিকে না তাকিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে গেল।
"এই অকৃতজ্ঞ মেয়েটি ফাওয়াদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে দিয়েছে।"
"নির্লজ্জ না হলে—"
"কিন্তু চিন্তার কিছু নেই, ও শীঘ্রই বাইরে চলে আসবে। কেস (Case) অতটা শক্তিশালী নয়।"
গুফরান চাচা আর আসাদ চাচা তাদের সান্ত্বনা দিতে লাগলেন কিন্তু তায়ি মেহতাবের চেহারা সাদা হয়ে গেল।
"হায় আমার ফাওয়াদ!" তিনি বুকে চড় মেরে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন যখন ফিজা আর নায়েমা এগিয়ে এসে তাঁকে ধরলেন। মুহূর্তের মধ্যে লনে কান্নার রোল পড়ে গেল।
নিজের কামরায় পর্দার আড়াল থেকে সামান্য ফাঁক দিয়ে সে দৃশ্যটি দেখছিল, সে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। কালো চাদর মাথা থেকে পিছলে পেছনে ঘাড়ের ওপর পড়ে থাকা চুলের ওপর চলে গিয়েছিল। বাদামী চুলগুলো চেহারার দুই পাশে ছড়িয়ে ছিল। সে কাঁচের মতো সোনালী চোখ জোড়া কুঁচকে গভীর চিন্তিত দৃষ্টিতে বাইরের দৃশ্যটি দেখছিল।
চলবে,,,,,

Comments
Post a Comment