মুসহাফ - পর্ব: ০৯ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:-০৯
লাউঞ্জে সব বড়রা উপস্থিত ছিলেন। সে মাথা নিচু করে, কার্ডটিকে সাবধানে পকেটে লুকিয়ে নিজের কামরার দিকে যেতে লাগল।
"মেহমিল!" গুফরান চাচা কিছুটা দম্ভভরে ডাকলেন। আগা জান তো তাকে দেখামাত্রই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
সেই দিন থেকে তিনি মেহমিলের সাথে কথা বলেননি।
"জি?" সে বিরক্তির সাথে থামল।
"কোথা থেকে আসছ?"
"মামলা করতে গিয়েছিলাম থানায়।"
"কী?" গুফরান চাচা ক্রুদ্ধ হয়ে তার দিকে এগিয়ে এলেন।
"জি। আপনাদের ফাওয়াদ আগার বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিলাম।
কেন, করতে পারি না?" সে তার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বেয়াদবির সাথে বলেছিল।
"আর আমাকে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন করবেন না, আমি যেখানেই যাই, সেটা আমার মর্জি। আপনারা আমাকে বাধা দেওয়ার কে?"
হঠাৎ একটি চড় সজোরে তার মুখে এসে পড়ল।
সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুই কদম পিছিয়ে গেল এবং মুখে হাত রেখে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে গুফরান চাচার দিকে তাকাল।
"মামলা দিবি তুই, হ্যাঁ?" তিনি তার চুল ধরে সজোরে একটি ঝটকা দিলেন।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ। দেব। আপনারা কেউ আমাকে আটকাতে পারবেন না।" সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল।
পরের মুহূর্তেই আসাদ চাচা উঠলেন এবং তারপর এই দুই ভাই হিতাহিত জ্ঞান হারালেন (হিংস্র হয়ে উঠা)। ক্রমাগত তার ওপর চড়ের বৃষ্টি শুরু হলো।
আগা জান বড় সোফায় নিশ্চুপে পা তুলে বসে তাকে মা*র খেতে দেখছিলেন।তায়ি মেহতাব, নাঈমা এবং ফিজাও কাছেই একেবারে চুপচাপ বসে ছিলেন। সামিয়া রান্নাঘরের খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।
ওপরের সিঁড়ি থেকে নিদা উঁকি দিচ্ছিল।
তারা তাকে অত্যন্ত জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে মারতে থাকলেন। সে সোফায় আধমরা হয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদছিল, কিন্তু তারা দুজন তাকে ছাড়লেন না।
"বল, মামলা দিবি?" তারা বারবার এটাই জিজ্ঞেস করছিলেন, যতক্ষণ না বিধ্বস্ত মেহমিলের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা ফুরিয়ে এল। সোফায় একটি লাথি মে*রে গুফরান চাচা বাইরে চলে গেলেন।
"আম্মি! আম্মি!" সে সোফায় পড়ে মুখে হাত দিয়ে চাপা কান্নায় ডুকরে মরছিল। মুসাররাত সেখানে কোথাও ছিলেন না।
আস্তে আস্তে সব বড়রা একে একে উঠে বাইরে চলে গেলেন। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে থাকা মেয়েরাও নিজ নিজ কামরায় চলে গেল।
"ম*রে যা তোরা সব। আল্লাহ করুক তোদের সবার বাচ্চাগুলো মরে যাক, ছাদ ভেঙে পড়ুক তোদের ওপর।
গলা কে*টে ফেলব তোদের বাচ্চাদের।" সে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে গুমরে গুমরে বদদোয়া দিচ্ছিল।
কতক্ষণ পর লাউঞ্জের দরজা খুলল এবং দিনভর ক্লান্ত হাসান ভেতরে প্রবেশ করল। কোট কাঁধে ফেলে, টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে সে 'আম্মি আম্মি' বলে ডাকতে ডাকতে কিছুটা সামনে আসতেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
কার্পেটে ছড়িয়ে থাকা কুশন এবং একটি সোফা যা লাথি মেরে জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাতে অগোছালো চুলে মেহমিল পড়ে আছে—মুখে কালশিটে, দুই হাতে লাল দাগ। সে হাত দিয়ে অর্ধেক মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
সে বিস্মিত হয়ে কয়েক কদম এগিয়ে এল।
"মেহমিল!" সে পলকহীন চোখে তাকে দেখছিল।
"কে... কে করেছে এটা?"
"মরে যা তুই।" হঠাৎ হাত সরিয়ে সে হাসানের দিকে তাকাল এবং চিৎকার করে উঠল।
"খোদা করুক তোরা সব মরে যা। এতিমদের ওপর জুলুম করিস, খোদা করুক তোদের সব বাচ্চা মরে যাক।"
"মেহমিল! আমাকে বলো, কে এটা করেছে? আমি..."
"মরে যা তোরা সব।" সে পুরো শক্তি দিয়ে চিৎকার করল, তারপর হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল এবং টলমল পায়ে নিজের কামরার দিকে চলে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রাতের শেষ প্রহরে সে আস্তে করে দরজা খুলল। সামান্য একটু ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শোনা গেল এবং তারপর আবার নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। লাউঞ্জটি ছিল জনশূন্য এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত।
সে তার ব্যথিত শরীরটাকে জোর করে টেনে টেনে টিভি পর্যন্ত এল। পাশেই ফোন স্ট্যান্ড রাখা ছিল। সে কর্ডলেস ফোনটি বের করল এবং সাবধানে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল।
মুসাররাত আজ বাড়িতে ছিলেন না।
সকালে সে যখন মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল তখন মুসাররাত বাড়িতেই ছিলেন, কিন্তু সম্ভবত মেহমিল বেরিয়ে যাওয়ার পরেই তাকে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত রাজিয়া ফুপ্পুর বাড়িতে।
সে দরজার খিল লাগিয়ে বিছানায় বসল। লাইট জ্বালানো ছিল। সামনের দেওয়ালে আয়না লাগানো ছিল। সে নিজের প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখতে পাচ্ছিল।
মুখের চারপাশে ঝুলে থাকা লম্বা চুল,
ফোলা ঠোঁট, কপাল এবং গালে লালচে দাগ যা কালশিটে হয়ে নীল হয়ে আসছিল। সে অবলীলায় চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজল।
সেই কার্ডটি তখনও তার জিন্সের পকেটে ছিল। সে কুঁচকে যাওয়া সেই কার্ডটি বের করল এবং নম্বর ডায়াল করতে লাগল।
প্রথম রিংটি পুরো হওয়ার আগেই সতর্ক এক কণ্ঠ শোনা গেল— "হ্যালো"।
"এ... এএসপি সাহেব?" তার কণ্ঠস্বর লড়খড়িয়ে উঠল।
"কে?" সে চমকে উঠল।
"আ... আমি মেহমিল।" নিজের অহংকারী স্বভাবের কথা মনে করে তার কান্না পেল।
"মেহমিল... কোথায় তুমি? সব ঠিক আছে তো?"
সে চুপ করে রইল। চোখের জল তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল।
"মেহমিল বলো।"
"আমাকে... আমাকে ওরা টর্চার (Torture) করেছে। মেরেছে।"
"ওহ..." এবার সে চুপ হয়ে গেল।
তারপর ধীরস্বরে বলল, "এখন কেমন আছো?"
"আমি জানি না।" সে কাঁদতে লাগল।
"আমাকে বলুন, ফাওয়াদ ভাই কি জেলে আছেন?"
"আছে তো। কিন্তু সম্ভবত খুব শীঘ্রই তার জামিন হয়ে যাবে। ওরা খুব শীঘ্রই তোমাকে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য উসকানি দেবে।"
"তবে আমি কী করব?"
"মেনে নাও।"
"কী?" সে অবিশ্বাস্যভাবে ফোনের দিকে তাকাল। অদ্ভুত খ্যাপাটে এক মানুষ ছিল সে।
"তুমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দাও যে তুমি আমার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেবে। নতুবা ওরা তোমাকে আদালতে পৌঁছাতে দেবে না।"
"আর আদালতে গিয়ে কথা ঘুরিয়ে দেব?"
"হ্যাঁ, সেখানে সব সত্যি বলে দিও।"
"আর এই ধোঁকার কারণে ওরা আমার কী দশা করবে, আপনার কোনো ধারণা আছে?"
"তুমি সেটার পরোয়া—"
"আপনারা সবাই আমাকে নিজ নিজ স্বার্থের জন্য ব্যবহার করছেন, আপনাদের আমার প্রতি কোনো প্রকৃত সহানুভূতি নেই।"
কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা ছেয়ে রইল,
তারপর হুমায়ুন সোজাসুজি ফোন কেটে দিল।
সে দুঃখিত মনে ফোনটি হাতে নিয়ে বসে রইল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
মুসাররাত পরের দিন সকালেই ফিরে এলেন। তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না, কোনো উত্তরও চাইলেন না। শুধু মেহমিলকে দেখে এক পাথুরে নীরবতা তাঁর ঠোঁটে লেগে রইল। অনেকক্ষণ পর নিচু স্বরে শুধু এইটুকুই বললেন—
"তুমি ফাওয়াদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাক্ষ্য দেবে। ওরা আমার মেয়ের সঙ্গে ভালো করেনি।" আর তারপর চুপচাপ কাজে লেগে পড়লেন।
পুরো বাড়িতে মেহমিলের সঙ্গে এক ধরণের সামাজিক বয়কট চলছিল। সে নিজের ঘরে খাবার খেত এবং সারাদিন ভেতরেই বসে থাকত। বাইরে বেরোত না। যদি বেরোতও, কেউ তার সঙ্গে কথা বলত না।
সেদিন অনেক ভেবেচিন্তে সে ফারিস্তের সঙ্গে দেখা করতে মসজিদে চলে এল। আপাতত তার কোথাও আসা-যাওয়ার ওপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।
কলোনির রাস্তাটি ঘন গাছের বেড়া দিয়ে ঢাকা ছিল। গাছগুলো পুরো পথের ওপর শীতল ছায়া ফেলে রেখেছিল। লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে ঘাড় উঁচু করে তাকাল।
সাদা উঁচু স্তম্ভওয়ালা সেই আলিশান ভবনটি তার চিরাচরিত আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
পাশেই সবুজ লতায় ঘেরা বাংলোটি ছিল, যার বাইরের দেওয়ালে একটি পাথরের খালি বেঞ্চ বসানো ছিল।
মেহমিল যখনই এদিকে আসত, বেঞ্চটি জনশূন্য দেখা যেত। তাকে দেখে অবলীলায় সেই বাস স্টপের বেঞ্চ আর সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির কথা মনে পড়ে যেত। না জানি কেন।
সাদা মার্বেলের ঝকঝকে উজ্জ্বল করিডোরগুলো আজও তেমনই শান্ত ছিল যেমনটি সে আগে দেখে গিয়েছিল। সে এদিক-ওদিক ক্লাসের খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিতে দিতে সামনে এগিয়ে গেল।
"অধ্যায়: দাজ্জাল মদীনা তায়্যিবায় প্রবেশ করতে পারবে না।"
শেষ খোলা দরজাটি থেকে সে ফারিস্তের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। সে সামান্য উঁকি দিল।
ফারিস্তে বই হাতে নিয়ে তন্ময় হয়ে পড়াচ্ছিল। কালো আবায়ার ওপর ধূসর স্কার্ফে তার চেহারা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল এবং সেই সোনালি স্ফটিকের মতো চোখগুলো... সে তো কোথাও দেখেছে, কিন্তু কোথায়?
সে এসব চিন্তায় ডুবে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই ফারিস্তে বাইরে এল।
"আরে মেহমিল! আসসালামু আলাইকুম।"
এবং তাকে দেখে ফারিস্তেও খুব খুশি হয়েছিল।
"কেমন আছ মেহমিল? এসো, বরং এক কাজ করো, আমার সঙ্গে ভেতরের অফিসে চলো।"
ফারিস্তে আলতো করে তার হাত ধরল এবং সেই হাত ধরেই তাকে বিভিন্ন করিডোর পার করে নিজের অফিস পর্যন্ত নিয়ে এল।
"আর একি হাল করে রেখেছ নিজের?"
"জানি না।" বসতে বসতে সে টেবিলের কাঁচের উপরিভাগে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। বাদামী পনিটেইল থেকে বেরিয়ে আসা এলোমেলো চুল, চোখের নিচে গাঢ় কালি, কপালে আর গালে গাঢ় কালশিটে আর ঠোঁটের কোণগুলো ফোলা।
হঠাৎ আলো তার চেহারার ওপর পড়লে সে চোখ কুঁচকে মুখ সরিয়ে নিল। ফারিস্তে নিজের চেয়ারের পেছনের জানালার ব্লাইন্ডস খুলছিল।
"হুমায়ুন বলেছিল, তুমি তাকে কল করেছিলে?"
সে কিছুটা চমকে উঠল। হুমায়ুন কেন তাকে সব কথা বলে? তার এটি বলা উচিত হয়নি।
"হুমায়ুন তোমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল।" ফারিস্তে আবার চেয়ারে এসে বসল।
"উনি আমাকে নিয়ে নয়, নিজেকে নিয়ে চিন্তিত। আপনার কাজিন খুব স্বার্থপর।"
"বাদ দাও।" সে ম্লান হাসল। "কারও অগোচরে তার নিন্দা করতে নেই।"
"যাই হোক।" মেহমিল কাঁধ ঝাঁকাল।
নিশ্চিতভাবেই ফারিস্তে তার কাজিনের নিন্দা শুনতে পারবে না।
"আচ্ছা এটি আগে বলো," ফারিস্তে চেয়ারে কিছুটা ঝুঁকে বসল।
"সামনে পড়াশোনার কী পরিকল্পনা?"
"সেপ্টেম্বরে ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করতে হবে।"
"তবে এখন গরমের ছুটিতে এখানে স্কুলে চলে এসো, কুরআন পড়তে।"
"না একচুয়ালি... আমার কাছে অনুবাদের কুরআন আছে। বাড়িতেই পড়ে নেব।"
"বিএসসি-তে কোন সাবজেক্ট ছিল?"
"ম্যাথস।"
"কার কাছে পড়তে?"
"কলেজে প্রফেসরের কাছে আর সন্ধ্যায় এক বাজির (আপু) কাছে টিউশন নিতে যেতাম।"
"ম্যাথস বই তো তোমার কাছে ছিলই, তবে দুই জায়গায় কেন পড়তে? ঘরে বসে পড়ে নিতে পারতে।"
"ঘরে নিজে নিজে কীভাবে পড়া যায়? আর..." মেহমিল থেমে গেল, তারপর যেন কিছু বুঝে নিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"কুরআন আর পাঠ্যবইয়ের মধ্যে তফাৎ আছে।"
"এজন্যই আমরা চার বছর বয়স থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠ্যবই পড়ি, আর কুরআনকে বৃদ্ধ বয়সের জন্য তুলে রাখি।"
"কিন্তু কুরআনকে তো আল্লাহ সহজ করে নাজিল করেছেন যাতে সবাই বুঝতে পারে। ম্যাথস শিক্ষক ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।"
"কুরআন বোঝা যায়?"
"হ্যাঁ, কেন নয়?"
ফারিস্তে গভীর শ্বাস নিল এবং নিচু হয়ে ড্রয়ার থেকে কালো মলাটের এক মোটা বই বের করল।
"এটি পবিত্র ইঞ্জিলের একটি প্রাচীন উদ্ধৃতি। এতে মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী আছে। এটি বেশ কৌতুহল উদ্দীপক, পড়ো।" সে একটি পৃষ্ঠা খুলে মেহমিলের সামনে ধরল। মেহমিল বইটি নিজের দিকে টেনে নিল।
"পরে এটি বাদ দেওয়া হয়েছিল।"
"তার উম্মতের ইঞ্জিল তাদের অন্তরে থাকবে।" সে পড়তে পড়তে হঠাৎ থামল।
"আনাজিল?" সে জিজ্ঞেস করল।
"ইঞ্জিলের বহুবচন। অর্থ হলো মুরাদে কুরআন মাজিদ।
এটি এখান থেকে পড়ো।" ফারিস্তে এক জায়গায় আঙুল রাখল। সরু লম্বা আঙুল যার গোলাপি নখগুলো সুন্দর করে ছাঁটা ছিল। তার আঙুলে পান্না বসানো একটি রুপোর আংটি ছিল।
"ওহ আচ্ছা!" সে ওখান থেকে পড়তে লাগল।
"তিনি বাজারে শোরগোলকারী হবেন না, অশালীন ভাষীও হবেন না। নাম হবে আহমদ। জন্ম মক্কায়, হিজরত তায়্যিবায় এবং রাজত্ব হবে সিরিয়া (শাম) পর্যন্ত।
তিনি সূর্যের ছায়ার ওপর নজর রাখবেন। তার আজান প্রদানকারীর ডাক দূর পর্যন্ত শোনা যাবে।" সে থেমে গেল, যেন বিভ্রান্ত হয়ে আবার শুরু থেকে দেখতে লাগল।
"রাজত্ব সিরিয়া (শাম) পর্যন্ত হবে?" সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ফারিস্তের দিকে তাকাল।
"পরবর্তীকালে মুসলমানদের শাসন সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, এটি তারই ইঙ্গিত।"
"আর সূর্যের ছায়ার ওপর নজর রাখা?"
"নামাজের ওয়াক্তের জন্য।"
"আর আজান প্রদানকারী?"
"বিলাল।" ফারিস্তে উত্তর দিতে দিতে হাসল। "ঘরে বসে পড়লে এই প্রশ্নগুলো কাকে জিজ্ঞেস করতে?"
"কুরআনের তাফসিরও তো পড়া যেতে পারে।"
"জ্ঞান পড়ার মাধ্যমে নয়, শোনার মাধ্যমে আসে।"
"আসলে ঘরে বসে পড়লে সমস্যা কী?"
"মুসাকে খিজিরের কাছে যেতে হয় আমার জান! খিজির মুসার কাছে আসেন না।
উচ্চমানের জ্ঞানের জন্য এতটা সফর করতেই হয়।"
"আপনার... আপনার সব কথা ঠিক আছে কিন্তু... কিন্তু আমার কথাটাও ঠিক।"
আরবি পাঠ:নিসা(৪:১৪৩)
مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذٰلِكَ لَاۤ اِلٰى هٰۤؤُلَاۤءِ وَ لَاۤ اِلٰى هٰۤؤُلَاۤءِ
**মুযাবযাবীনা বাইনা যালিকা, লা ইলা-হা-উলায়ি ওয়া লা ইলা-হা-উলায়ি।**
ফারিস্তে কলমটি আঙুলের ফাঁকে ঘোরাতে ঘোরাতে হেসে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল।
("তারা (মুনাফিকরা) এর মধ্যে দোদুল্যমান; না এদের (মুমিনদের) দিকে, আর না ওদের (কাফিরদের) দিকে।")
"আপনি আরবিতে কিছু বললেন না?
এখন সাধারণ মানুষ আরবি কোথায় বুঝবে? কুরআন উর্দুতে (বা বাংলায়) কেন নাজিল হয়নি?"
"চমৎকার প্রশ্ন।" সে নিজের আসন থেকে উঠল এবং সামনের বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল।
তারপর সোজা দাঁড়িয়ে বইয়ের মলাটের ওপর আঙুল বুলিয়ে একটি বই খুঁজতে লাগল।
"তাহলে তোমার পয়েন্ট হলো, শুধু আক্ষরিক অনুবাদ দেখে কুরআন পড়া যথেষ্ট।" সে একটি বইয়ের ওপর আঙুল থামাল এবং সেটি টেনে বের করল।
"এটি সূরা বনী ইসরাঈলে ইবলিস কর্তৃক আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করার কাহিনী। এখানে ইবলিস আদমের বংশধরদের জন্য কী শব্দ ব্যবহার করেছে, এটি পড়ো।" সে একটি বড় অনুবাদের কুরআন তার সামনে খুলে ধরল এবং পান্না বসানো আংটি পরা আঙুলটি একটি শব্দের ওপর রাখল।
মেহমিল অবলীলায় কুরআনের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
"লা-আহতানিকান্না—অবশ্যই আমি কবজা করব (বশে আনব)।" সে শব্দ এবং অনুবাদ উভয়ই পড়ল।
"রাইট। যদি 'অবশ্যই' এবং 'আমি' এর সর্বনামগুলো বের করে দাও, তবে তিন অক্ষরের একটি মূল শব্দ থাকে
—'হা-নুন-কাফ' অর্থাৎ 'হানাক'। এর তিনটি অর্থ হয়—কোনো বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে বোঝা, পঙ্গপালের খেত উজাড় করে দেওয়া এবং ঘোড়ার চোয়ালের মাঝখান দিয়ে লাগাম পরিয়ে ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণে আনা।
উর্দুতে (বা বাংলায়) শুধু লেখা আছে 'কবজা করা' বা 'নিয়ন্ত্রণে আনা'। যাকে ইংরেজিতে 'কন্ট্রোল' (Control) বলে।
অথচ আরবির ব্যাপকতা আমাদের জানায় যে শয়তান কীভাবে আমাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে, আমাদের ইমান উজাড় করে আমাদের লাগাম পরায়—আর সেই লাগাম সাধারণত মুখের মাধ্যমে পরানো হয়... আর কুরআন এজন্যই আরবিতে নাজিল হয়েছে।
আর তুমি আমার কথায় বোর হচ্ছ। ঠিক আছে, থাক। এখন তোমার কাছে সময় আছে এজন্য বলছিলাম, নইলে পরে দুনিয়াবি শিক্ষায় হারিয়ে গিয়ে তুমি এর জন্য সময় পাবে না।"
"মানে আপনিও কি সেই সেকেলে মৌলভীদের মতো সাধারণ শিক্ষাকে গুনাহ মনে করেন?"
"আমি দুনিয়াবি শিক্ষায় হারিয়ে গিয়ে বস্তুবাদী হওয়াকে গুনাহ মনে করি।"
"আচ্ছা, আমি আসি।" সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
"হ্যাঁ। তোমার দেরি হচ্ছে, বাড়িতে সবাই দুশ্চিন্তা করবে।"
"দুশ্চিন্তা-টুশ্চিন্তা কেউ করে না। এতিমদের পরোয়া কারও নেই।"
"কে এতিম?" ফারিস্তে বিস্ময়ে তাকে দেখল।
"আমি। আমার বাবা নেই।"
"বয়স কত তোমার?"
"বিশ বছর।"
"তবে তো তুমি এতিম নও। এতিম তো সেই নাবালক শিশুকে বলে যার বাবা মারা যায়।
সাবালক হওয়ার পর কোনো এতিমত্ব থাকে না। নিজের এই করুণা পাওয়ার মানসিকতাটি নিজের ভেতর থেকে বের করে দাও মেহমিল!"
"আপনি কী বলছেন?" মেহমিল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে পিছিয়ে গেল এবং কয়েক মুহূর্ত তাকে অবিশ্বাসের চোখে দেখে কিছু না বলে দ্রুত বাইরে দৌড়ে চলে গেল।
ফারিস্তের কথাটি হঠাৎ তাকে খুব বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল।
"চুলোয় যাক ডিকশনারি আর আক্ষরিক অর্থ। আমি এতিম।" সে দ্রুত করিডোর পার হয়ে বারান্দায় এল।
কিন্তু বেরোতে পারল না, রিসেপশনিস্ট তাকে থামিয়ে দিল।
"আসসালামু আলাইকুম! এটি আপনার অ্যাডমিশন ফর্ম। ফারিস্তে বাজি বলেছিলেন যে এটি আপনার প্রয়োজন হবে।"
"উফ!" সে গভীর শ্বাস নিয়ে ডেস্কের কাছে এল।
"দেখি।"
'শুধু দেখে ফেরত দিয়ে দেব। আমাকে মৌলভী হতে হবে না, মাস্টার্স করতে হবে।'—সে ভাবল।
"কোর্স কোনটা?" সে এখন প্রসপেক্টাসের পাতা উল্টে দেখছিল।
"ইলমুল কিতাব। পরশু প্রথম ক্লাস।"
'আমি ফারিস্তেকে সরাসরি না করে দেব, সে খারাপ ভাবলেও ভাবুক। শুধু পুরোটা দেখে ফেরত দিয়ে দেব।'—সে ভাবছিল।
"আর এই ফর্ম ফিল-আপ করে কোথায় দিতে হয়?"
"এই ডেস্কের ওপরেই।"
"আর ফিস?"
"জ্ঞানের কোনো ফিস হয় না।"
"তবুও, কিছু চার্জেস তো থাকবে।"
"আমরা কুরআন পড়ানোর কোনো চার্জ নিই না।"
"তবে নেবেন না। আমার এখানে ভর্তি হওয়ার কোনো শখ নেই। আমি সারাদিন স্কার্ফ জড়িয়ে কুরআন পড়তে পারব না।
আই এ্যাম সরি ফারিস্তে! কিন্তু আমি এটি করব না।" সে মনে মনে বিড়বিড় করল।
কিন্তু দশ মিনিট পর সে ফর্মটি পূরণ করছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে ব্যাগের স্ট্র্যাপ ধরে হাত নামিয়ে এমন ক্লান্ত পায়ে হাঁটছিল যে, ব্যাগটি ঝুলে মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কলোনির ঘন গাছগুলো নিঃশব্দে নুয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে আস্তে করে সেই বেঞ্চটিতে গিয়ে বসল যা আজও উদাস ছিল। সে ফর্ম জমা দিয়ে ফারিস্তের সাথে দেখা না করেই সেখান থেকে বেরিয়েছিল। তখনও সে একই কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই দূর থেকে কারো দৌড়ে আসার শব্দ তার কাছে এসে থেমে গেল।
"কেমন আছো?" কেউ একজন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
সে ধীরে মাথা তুলল।
হুমায়ুন খুব গুরুত্বের সাথে তাকে দেখছিল। কালো ট্রাউজারের ওপর সাদা ক্যাজুয়াল শার্ট পরা, কপালের চুলগুলো ভেজা আর মুখে ঘাম, হাঁপাচ্ছিল সে—যেন দ্রুত জগিং করতে করতে এদিকে এসেছে।
"তাতে আপনার কী যায় আসে?"
"যায় আসে তো বটেই। তোমাকে এভাবে দেখে আমার বিশ্বাস হচ্ছে যে, তুমি আমার বিরুদ্ধে আদালতে হাজির হতে রাজি হয়ে গেছ।"
"হতে তো হবেই, কিন্তু এখন আর কী-ই বা করার আছে?"
"কিছু করার নেই।" সে তার পাশে বসল। মেহমিল মুখ ঘুরিয়ে তাকে দেখতে লাগল, যে সামনের ঘন গাছের বেড়ার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"যতক্ষণে তুমি আদালতে যাবে, আমাদের ফাঁস ফাওয়াদের ঘাড়ের চারপাশে আরও শক্ত হয়ে বসবে। আপাতত ওদের কথা মেনে নাও আর কোর্টে গিয়ে সত্যিটা বলে দিও।"
"ব্যবহার করে নিন সবাই আমাকে নিজের নিজের স্বার্থে।" সে দুঃখের সাথে মাথা ঝাকিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মাটিতে পড়ে থাকা ব্যাগটি স্ট্র্যাপ ধরে টেনে তুলল।
"খুব দুর্বল হয়ে গেছ। নিজের খেয়াল রেখো।"
"আপনার এই চিন্তার পেছনেও কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। আফসোস, আমি যদি আপনার বিরুদ্ধে বয়ান দিতে পারতাম!"
সে দ্রুত পায়ে রাস্তা দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে গেটের দিকে এল। গেট
বন্ধ করার সময় সে মুহূর্তের জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে একবার দেখল, যে মাথা নিচু করে দ্রুত রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
তার উঁচুতে বাঁধা বাদামী পনিটেইলটি ঘাড়ের ওপর বারবার দুলছিল।
হুমায়ুন ঘুরে ড্রাইভওয়ে দিয়ে জগিং করার ভঙ্গিতে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।
গাছের বেড়া আর পাথরের বেঞ্চটি আবার জনশূন্য হয়ে পড়ল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"হ্যালো!"
সে বিছানায় হেলান দিয়ে, হাঁটুর ওপর প্রসপেক্টাস রেখে ভাসা ভাসাভাবে পড়ছিল যখন দরজা খুলল।
আওয়াজ শুনে মেহমিল মাথা তুলল।
চৌকাঠে আরজু দাঁড়িয়ে ছিল।
লাল ট্রাউজারের ওপর স্লিভলেস সাদা শার্ট—এটি তার ব্যায়ামের বিশেষ পোশাক।
ছাঁটা চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত আসছিল।
ধনুকের মতো সরু ভ্রু কুঁচকে সে হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"কেমন আছ?" ভঙ্গিটি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল।
মেহমিল নিজেকে কিছুটা সামলে নিল।
"ভালো। আপনি কেমন আছেন?" সে সোজা হয়ে বসল এবং প্রসপেক্টাসটি অলক্ষ্যে একপাশে সরিয়ে দিল।
"গ্রেট!" সে স্বচ্ছন্দ্যে বিছানার কিনারায় এসে বসল। ভেতরে আসার সময় সে দরজাটি পুরো বন্ধ করে দিয়েছিল।
মেহমিল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল, যে অভ্যাসবশত চুলে আঙুল চালাতে চালাতে সরু ভ্রু কুঁচকে কামরাটি পর্যবেক্ষণ করছিল।
"তোমার কামরাটা কত ছোট মেহমিল! অন্তত আগা জানের উচিত ছিল তোমাকে একটা ভালো বেডরুম দেওয়া।
মাঝে মাঝে আগা জান খুব বেশি অন্যায় করে ফেলেন। তাই না?" সে মতামত চাইল।
মেহমিল একবার দরজার দিকে তাকাল। সেটি বন্ধ ছিল।
"জানি না।"
"তুমি বললে আমি আব্বাকে বলে তোমাকে একটা বড় রুমের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।"
'এই খেয়াল তো এত বছর আপনাদের আসেনি। আজ কেন?'
"ইটস ওকে (It’s okay)। আমি খুশি।" সে আবারও বন্ধ দরজার দিকে তাকাল।
"আগা জানের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।"
"যাই হোক, আগা জানের কথা বাদ দাও।
খোদ ফাওয়াদ তোমার সঙ্গে কত বড় অন্যায় করল। অন্তত ঘরের সম্মানের কথা তো ভাবতে পারত।"
"আপনি... আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন?" সে চমকে উঠল।
"অবশ্যই। ফাওয়াদকে কে না চেনে। আর এখন তো এরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।"
"কেমন ষড়যন্ত্র?" সে সতর্ক হলো।
"ওরা তোমাকে দিয়ে ওই এএসপি-র বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়াবে। কী যেন নাম ছিল তার... হুমায়ুন?" তার ভঙ্গিটি ছিল অত্যন্ত উদাসীন।
"হুমায়ুন দাউদ।" ব্যাপারটি মেহমিলের কাছে কিছুটা পরিষ্কার হতে শুরু করল।
"হ্যাঁ, ওর বাড়িতেই তো ফাওয়াদ তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল, তাই না?
কোথায় থাকে সে?" এবার আরজু অত্যন্ত অবহেলার সাথে বলতে বলতে
এদিক-ওদিক বেশি তাকাচ্ছিল।
"সেটি তো আমি জানি না আরজু বাজি! যে ওটি কার বাড়ি ছিল।"
"ফোন নম্বর তো নিশ্চয়ই আছে তোমার কাছে?"
"জি আছে। আপনার চাই?"
"হ্যাঁ বলো।" আরজু হঠাৎ সতর্ক হয়ে উঠল। তার সব উদাসীনতা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল।
"ওয়ান-ফাইভ (১৫) নম্বরে কল করে নিন, পুলিশওয়ালাদের তো এই নম্বরই হয়।" সে হাসি চেপে প্রসপেক্টাসটি আবার হাতে তুলে নিল।
"ঠিক আছে থাক। আমার কাজ আছে, আমি আসি।" আরজু বিরক্তির সাথে বলে দ্রুত উঠে বাইরে বেরিয়ে গেল।
'ওদের মনটাও কেমন যেন ফুটবলের মতো। ফাওয়াদ আর হুমায়ুনের মাঝখানে গড়াগড়ি খায়, হুহ।' সে তাচ্ছিল্যের সাথে মাথা ঝাকিয়ে আবারও প্রসপেক্টাসে মন দিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
আজ কতদিন পর সে নিজে থেকে নাস্তার টেবিলে উপস্থিত ছিল। কেউ তাকে সম্বোধন করল না। সে নিজেও চুপচাপ দ্রুত মুখে লোকমা তুলছিল। ইউনিফর্মের সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা আর বেবি পিঙ্ক স্কার্ফ গলায় ঝোলানো, চুলে উঁচুতে পনিটেইল বাধা অবস্থায় সে নিজের প্লেটের ওপর ঝুঁকে ছিল।
"মেহমিল!" ফিজা চাচি নিজেই তাকে ডাকলেন।
তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছিলেন।
"কলেজ জয়েন করেছ নাকি?"
টোস্টে জ্যাম লাগাতে লাগাতে হাসান চমকে তার দিকে তাকাল, যে মাথা নিচু করে নাস্তায় মগ্ন ছিল।
বাদামী উঁচুতে বাধা পনিটেইল থেকে এক গুচ্ছ চুল বেরিয়ে গাল স্পর্শ করছিল। ফিজার ডাকে সে ঘাড় তুলল।
"না। একটি ইনস্টিটিউটে অ্যাডমিশন নিয়েছি।"
"সেখানে কী পড়ো?"
"আমি বলাটা জরুরি মনে করি না।" সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। হাসান অনেকক্ষণ তাকে বাইরে যাওয়ার পথ পর্যন্ত দেখছিল।
স্কুলের এক করিডোরে রাখা প্রমাণ সাইজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে স্কার্ফটি মাথায় দিল এবং চেহারার চারপাশে নিপুণভাবে পেঁচিয়ে পিন লাগাল—যাতে তার উজ্জ্বল সোনালি চেহারাটি বেবি পিঙ্ক রঙের এক ডিম্বাকৃতি বৃত্তে বন্দি হয়ে গেল।
উঁচু পনিটেইলের কারণে পেছন থেকে স্কার্ফটি কিছুটা উঁচিয়ে ছিল।
"উম... নাইস (Nice)!" নিজেকে নিজেই প্রশংসা করে সে বারান্দায় ফিরে এল।
বাড়ি থেকে স্কার্ফ পরে আসাটা তার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল, তাই এখানে এসেই মাথায় পরে নিল।
বারান্দা থেকে চওড়া সিঁড়ি নিচে হলের দিকে চলে গেছে। পাশেই জুতার র্যাক রাখা ছিল। সে জুতা খুলে একপাশে রাখল এবং খালি পায়ে মার্বেলের শীতল সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
বিশাল বড় প্রেয়ার (Prayer) হলটি কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। কার্পেটের ওপর সাদা চাদর বিছানো। সেগুলোর ওপর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ ডেক্স পাতা। সেই ডেক্সগুলো মাটি থেকে মাত্র এক হাত পরিমাণ উঁচু ছিল, যেমনটা সাধারণত মাদ্রাসায় দেখা যায়।
ডেক্সগুলোর পেছনে সাদা ইউনিফর্ম আর বেবি পিঙ্ক স্কার্ফে ঢাকা মাথার মেয়েরা সাদা চাদরের ওপর দু’জানু হয়ে আদবের সাথে বসে ছিল।
মেহমিল আস্তে করে শেষ সিঁড়িতে পা রাখল। সে হলের একদম শেষ প্রান্তে ছিল। তার সামনে ওই সব সারিবদ্ধ মেয়েদের পিঠ দেখা যাচ্ছিল। সামনে উঁচু প্ল্যাটফর্মে ম্যাডামের চেয়ার আর টেবিল ছিল। তাদের পেছনের দেওয়ালে একটি ক্যালিগ্রাফি ঝুলছিল:
🌼
"কুরআন ওই সব জিনিসের চেয়ে উত্তম, যা মানুষ জমা করছে।"
🌼
তার মনে হলো সে ওই মেয়েদের মতো নিচে বসতে পারবে না। তাই হলের শেষে দেওয়ালঘেঁষা চেয়ারগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
তার বইগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং (Interesting) ছিল।
কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুজ জাকাত, কিতাবুল ইলম, কিতাবুস সালাত, কিতাবুস সিয়াম, কিতাবুল হজ ও উমরা। ছোট ছোট পুস্তিকা ছিল।
বাকি একটি সিপারা ছিল। প্রথম সিপারা, আকারে বেশ বড়। প্রতিটি পৃষ্ঠায় বড় বড় পাঁচটি আরবি লাইন ছিল আর প্রতি দুটির মাঝখানে তিনটি খালি লাইন ছিল—সম্ভবত নোট নেওয়ার জন্য। আরবির প্রতিটি শব্দের নিচে তার উর্দু (বা বাংলা) অনুবাদ একটি চৌকো খোপের মধ্যে লেখা ছিল, যাতে প্রতিটি শব্দ আলাদাভাবে চেনা যায়।
সে দশ মিনিট লেট (Late) ছিল।
ম্যাডাম মিসবাহর লেকচার শুরু হয়ে গিয়েছিল।
"সবার আগে আপনারা এটি মাথায় রাখুন যে, এখানে আপনাদের দীন (Deen) পড়ানো হবে, ধর্ম (Religion) নয়। দীন এবং ধর্মের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। দীন বলা হয় Religion-কে আর ধর্ম বা মাজহাব হলো বিশ্বাস বা স্কুল অফ থট (School of thought)। দীন পড়ার আগে একটি কথা মনে গেঁথে নিন—দীনের ক্ষেত্রে দলিল শুধু কুরআনের আয়াত বা হাদিস (সা.) থেকে দেওয়া যাবে।"
এখন তিনি সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করছিলেন।
"আলহামদুলিল্লাহ, আরবির শব্দগুলো তিন বা চার অক্ষর দিয়ে তৈরি হয়, যেগুলোকে আমরা রুট ওয়ার্ড (Root word) বলি। 'আল-হামদু' তে 'হামদ' এর রুট ওয়ার্ড হলো হা-মিম-দাল (হ-ম-দ)। অর্থাৎ প্রশংসা।
এই 'হামদ' থেকেই হামিদ, হাম্মাদ, আহমদ, মুহাম্মদ, হামিদ, মাহমুদ তৈরি হয়েছে।
হামিদ—প্রশংসাকারী।
আহমদ—অত্যধিক প্রশংসিত।
হামিদ—অপার প্রশংসার অধিকারী...
যখন আপনারা কুরআনকে আক্ষরিক সংজ্ঞায় (Literal word definition) পড়বেন, তখন আপনারা এতটাই এনজয় (Enjoy) করবেন যে বলার মতো নয়।
যেমন 'সিজদা'র রুট ওয়ার্ড হলো 'স-জ-দ'। এ থেকে মসজিদ, সাজিদ, সিজদা তৈরি হয়।"
পড়ানোর ভঙ্গিটি আকর্ষণীয় ছিল।
মেহমিল দ্রুত নোট নিচ্ছিল। সে বারবার ভাবছিল এই সিদ্ধান্তটি সঠিক না ভুল, তবে মনের ভেতরে সে দ্বিধাগ্রস্তই ছিল।
পরবর্তী কয়েক দিন সে পড়াশোনায় এতটাই ব্যস্ত ছিল যে ফারিস্তের সাথে দেখাই করতে পারল না।
তাজবিদ, তাফসির, হাদিসের পড়াশোনা ঠিকঠাকই ছিল—ব্যস ঠিকঠাকই। কোনো অলৌকিক কিছু সে এখন পর্যন্ত দেখেনি।
তবে তার নিজের ধারণাটিই সঠিক মনে হলো যে, কুরআনে তো ঠিক ওইসবই আছে যা সে ভেবেছিল—নামাজের হুকুম, জাকাত দেওয়া, সম্পদ ব্যয়ের তাগিদ, মুমিন, কাফের ও মুনাফিকের সংজ্ঞা এবং মদিনার মুনাফিকদের বর্ণনা।
ভাই, মুসলমান হিসেবে এতটুকু তো জানাই ছিল। হ্যাঁ, ওই সব কথা তো একদমই ছিল না যা সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি বলত।
তবে সে কুরআন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ত, শব্দের অর্থ মনে রাখার চেষ্টা করত, নোট নিত এবং রুট ওয়ার্ডগুলো বুঝত। আস্তে আস্তে সে অনুভব করল যে সে কত ভুলভাবে কুরআন পড়ত। শব্দগুলোর উচ্চারণ ছিল অস্পষ্ট ও অশুদ্ধ।
যেমন—'বা জের (বে)' পড়ত, অথচ সেটি হওয়া উচিত ছিল 'বা জের (বি)'। সে ভাবত, এই সব মা, নানি, দাদিরা যারা আমাদের কুরআন শেখায়, তারা সাধারণত ভুল উচ্চারণে অস্পষ্টভাবেই পড়ায়।
'সিন' (س) আর 'সা' (ث) আর সোয়াদ(ص) এর পার্থক্যই বোঝা যায় না।
যখন আমরা হরকত (জের-যবর) খুব লম্বা করি তখন আমরা বুঝতেই পারি না যে আমরা কুরআনে একটি অক্ষর বাড়িয়ে দিচ্ছি।
যবর টেনে আলিফ বাড়িয়ে দিচ্ছি, কুরআনের শব্দ বিকৃত করছি, অর্থ বদলে দিচ্ছি। ইংরেজি তো দারুণ ব্রিটিশ বা আমেরিকান উচ্চারণে বলার চেষ্টা করি, আর কুরআন—যা আরবি ঢঙে পড়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে এবং যেটিতে হরকতকে আসলের চেয়ে বেশি টানা হারাম পর্যায়ের ভুল হিসেবে গণ্য হয়—তার শেখার ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বই দিই না।
মসজিদে আরও একটি অদ্ভুত রীতি ছিল। শুরুতে এটি তার কাছে আজব লাগলেও পরে ভালোই লাগল।
সেখানে সবাইকে সালাম দেওয়ার এক রীতি ছিল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় যে মেয়ের সাথেই দেখা হতো, তাকেই হাসিমুখে সালাম দেওয়া হতো।
কাউকে আপনি চেনেন কি চেনেন না সেটা বড় কথা ছিল না, সালাম দেওয়া ছিল এক প্রকার অলিখিত নিয়ম।
কাউকে ডাকার জন্য 'এক্সকিউজ মি'-র বদলে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে সম্বোধন করা হতো।
"এক্সকিউজ মি বলে এমন কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবেন কেন যা আপনি করেননি? তার চেয়ে দোয়া দেওয়াই তো ভালো!"—ফারিস্তে অনেক আগে হেসে এই কথাটি বলেছিল, যা শুনে মেহমিল অনেকক্ষণ ভেবেছিল।
এই সমস্ত ভাবনার বাইরেও মেহমিল কুরআনকে খুব সম্মান করত। সেই সময়েও সে তার কামরায় বিছানায় বসে সকালের নোটগুলো পড়ছিল, তখনই দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। সে অবাক হয়ে মাথা তুলল।
তার কামরায় আবার কে কড়া নেড়ে আসবে?
"জি?"
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলল। সে দ্বিধাভরে ধীরে ধীরে খুলতে থাকা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
দরজাটি পুরোপুরি খোলার পর মুহূর্তের জন্য সে যেন পাথর হয়ে গেল, তারপর অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নিচে নামল।
"আগা জান... আপনি?"
তিনি চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে পিঠের পেছনে হাত বেঁধে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
"আপনি... আপনি বসুন আগা জান!" ছোট একটি কামরা, তাকে সে কোথায় বসাবে? দ্রুত সিপারাটি ওপরের তাকে রাখল এবং বিছানার চাদর ঠিক করে দিল। তিনি নীরবে বিছানায় বসলেন।
"এদিকে এসো মা! তোমার সাথে আমার কথা আছে।"
সেই ঘটনার পর এই প্রথমবার তিনি তার সাথে কথা বলছিলেন এবং তাঁর কণ্ঠস্বরে বেশ কোমলতা ছিল। সে যন্ত্রচালিত মানুষের মতো তাঁর সামনে এসে বসল।
"জি।"
"মেহমিল!" তিনি গভীরভাবে তার মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললেন। মেহমিল দম বন্ধ করে তাঁর দিকে চেয়ে রইল।
"ফাওয়াদ তোমার সাথে খুব খারাপ করেছে। অনেক খারাপ। আমি ওর পক্ষ থেকে তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।"
"না না আগা জান! প্লিজ।" সে দুই হাত ওপরে তুললে তিনি মোমের মতো গলতে শুরু করলেন। অবলীলায় মেহমিল তাঁর হাত ধরে ফেলল।
"তোমার সাথে অনেক অন্যায় হয়েছে, আমি জানি। আর এখন আমি সেটির প্রতিকার করতে চাই।"
"জি?" সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।
"আমি সম্পত্তি থেকে তোমার অংশ আলাদা করে দিতে চাই যাতে তুমি সেটির দেখাশোনা করতে পারো।
ফিফটি পারসেন্ট (Fifty percent) এর মালিক তুমি। তুমি সেই অংশ নিয়ে নাও।
আমি উকিলকে পেপারস (Papers) তৈরি করতে বলে দিয়েছি।"
সে অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি কি তোমার অংশ নিতে চাও?"
"জি... যেমন আপনি বলেন।" মেহমিল ভাবল—মাঝে মাঝে নিজের অধিকারের কথা একান্তে বলা সহজ হয় বিরোধীদের সামনে বলার চেয়ে। সে আর কিছুই বলতে পারল না। শুধু একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, যিনি তার বিছানার পাশে বসে ছিলেন।
"আমি আজ সম্পত্তির কাগজে সই করে দিচ্ছি, কিন্তু তুমি... আমার একটি শর্ত আছে।"
এখানে তিনি মুহূর্তের জন্য থামলেন। তাঁর নজর মেহমিলের চেহারায় নিবদ্ধ ছিল, তিনি পলক ফেলছিলেন না; তাকে দেখছিলেন যে দম বন্ধ করে তাঁর অপেক্ষায় ছিল।
"কিন্তু তুমি ফাওয়াদের বিরুদ্ধে নয়, বরং এএসপি হুমায়ুন দাউদের বিরুদ্ধে অপহরণের অপরাধের জবানবন্দি দেবে আদালতে।"
সে আধা-খোলা ঠোঁট আর বিস্ফারিত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
"আদালত আমাদের তারিখ দিয়ে দিয়েছে। আগামী মাসের তারিখ। আমি চাই তুমি আদালতে নিজের জবানবন্দি থেকে না ফেরো, যাতে আমি সম্পত্তির কাগজ তোমার হাতে তুলে দিতে পারি। যেই তুমি কোর্টে জবানবন্দি দেবে, আমি স্বাক্ষর করে দেব।"
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সে তাকে দেখার জন্য ঘাড় পর্যন্ত তুলতে পারল না।
"তোমার কাছে সময় আছে, খুব ভালো করে ভেবে নাও। আর এটিকে একটি বিজনেস ডিলিং (Business dealing) হিসেবেই দেখো।"
"ভেবে নাও, এটি তোমাকে ভবিষ্যতে ইব্রাহিমের বিজনেস এম্পায়ার (Business empire) সামলাতে সাহায্য করবে।" তিনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
"আমার মঞ্জুর (রাজি)।" সে দ্রুত বলে উঠল। সিদ্ধান্ত নিতে তার এক পলক সময় লেগেছিল। চুলোয় যাক হুমায়ুন।
অন্যায়ভাবে আটকে তো সেও আমাকে রেখেছিল।
তিনি ফিরে তাকিয়ে এক বিজয়ের হাসি নিয়ে তাকে দেখলেন।
"তুমি ভালো বিজনেস ওম্যান (Businesswoman) হতে পারবে।
টেইক কেয়ার (Take care)।" এবং দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
এতে কি তবে হুমায়ুন গ্রেফতার হয়ে যাবে? আর... আর ফাওয়াদ—সে কি বাড়ি চলে আসবে?
না। যদি সম্পত্তি পাওয়া যায়... নিজের হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
এক সময় সেও তায়ি-এর ওপর এভাবে হুকুম চালাতে পারবে। সবাই তাকে সম্মান করবে। তার হুকুমে বাড়িতে কাজ হবে, তার উপস্থিতি সব জায়গায় জরুরি মনে করা হবে। সে এক দ্বিধায় পড়ে রইল।
সে কি সঠিক কাজ করল? কিছুই বুঝতে পারছিল না।
চলবে,,,,,,

Comments
Post a Comment