মুসহাফ - পর্ব: ১০(অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:-১০
সকাল আটটায় সে মসজিদের গেটে ছিল। ভেতরে ঢোকার আগে সে থমকে দাঁড়িয়ে লতায় ঘেরা বাংলোটির দিকে তাকাল, যার পাথরের বেঞ্চটি আজও জনশূন্য পড়ে ছিল।
"বাবা! আপনার সাহেব কি বাড়িতে আছে?" কিছু একটা ভেবে সে ইউনিফর্ম পরা গার্ডকে সম্বোধন করল।
"তিনি তো শহরের বাইরে গেছেন।"
"কবে ফিরবেন?"
"জানি না।"
"আচ্ছা।" সে পায়ের গোড়ালি কিছুটা উঁচিয়ে গেটের ওপাশে দেখল।
হুমায়ুনের গাড়ি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।
"বি বি... তিনি বিমানে গেছেন।" গার্ড কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
"চুলোয় যাক তোমার সাহেব এটা আমার পক্ষ থেকে। এই সাদা চুলে মিথ্যা তো অন্তত বলো না।
দেখা করতে না চাইলে সরাসরি মানা করে দাও।
মিথ্যা বলা মুনাফিকের লক্ষণ, ইমানের নয়। খোদার ভয় করো।" সে শেষের বাক্যগুলো কিছুটা উপদেশের ভঙ্গিতে বলে স্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
(জানি না হুমায়ুন তাকে এমনটি বলতে কেন বলেছিল... আর জানি না আমি সঠিক করলাম না ভুল। কিন্তু তারা তো এভাবে আমার সম্পত্তি কখনো দেবে না, তবে আর কী-ই বা করতাম?)
বিরক্তির ছাপ মুখে নিয়ে ব্যাগ হাতে সে মন্থর পায়ে বারান্দার দিকে হাঁটছিল।
(আর এটি তো মিথ্যা নয়, সে তো আমাকে অন্যায়ভাবে আটকে রেখেছিল।)
সে চটিগুলো র্যাকে রাখল এবং নিজেকে টেনে টেনে নিচে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।
(কিন্তু অপহরণ তো করেনি, আমি তো ওখানে নিজের ইচ্ছাতেই গিয়েছিলাম, তবে তার ওপর এভাবে অপহরণের দায় চাপানো কি মিথ্যা হবে না?)
সে মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। (না, মিথ্যা কোথায়? সে তো ডিল করেছিল। অপহরণ আর কেনা—একই কথা। যদি সামান্য শব্দের হেরফের করি তবে তাতে কী আসে যায়?)
সে চেয়ারে বসে বইগুলো সাইডবোর্ডে রাখল এবং পাশে বসা মেয়েটির সিপারার দিকে উঁকি দিল, তারপর নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাটি খুলতে লাগল।
তাফসির শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে আজও লেট (Late) ছিল।
(ফাওয়াদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিলেও সে শাস্তি পাবে, আর সে এত বড় এএসপি, আমার জবানবন্দিতে তার কি আর এমন শাস্তি হবে? শুধু শব্দগুলোকে একটু ইন্টারচেঞ্জ (Interchange) করে দিলে ক্ষতি কী? আমার নিয়ত তো পরিষ্কার।)
নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাটি খুলে সে পেনের ক্যাপ খুলল এবং আজকের তারিখ লিখতে লাগল।
আল-বাকারার-২:৪২
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
(**ওয়া লা তালবিসুল হাক্কা বিল বা-ত্বিলি ওয়া তাকতুমুল হাক্কা ওয়া আনতুম তা'লামুন।**)
"আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং সত্যকে গোপন করো না, অথচ তোমরা তা জানো।"
ম্যাডাম মিসবাহর কণ্ঠ শুনে সে যেন কারেন্ট (Current) খেয়ে মাথা তুলল। তিনি টিচার চেয়ারে বসে বই থেকে পড়ছিলেন। সে অবলীলায় নিজের সিপারার দিকে তাকাল। সেই পৃষ্ঠার একদম ওপরে ঠিক এটিই লেখা ছিল।
(আল-বাকারা ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষ)
وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ ﴿٤١﴾
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿٤٢﴾
(**ওয়া লা তাশতারূ বি-আ-য়া-তি ছামানান ক্বালীলাঁও, ওয়া ইইয়া-ইয়া ফাত্তাকু-ন।***)৪১
(***ওয়া লা তালবিসুল হাক্কা বিল-বা-ত্বিলি ওয়া তাকতুমুল হাক্কা ওয়া আনতুম তা’লামু-ন।**)৪২
"তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে নগণ্য মূল্য গ্রহণ করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় করো।) ৪১
"আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং হককে গোপন করো না, অথচ তোমরা তা জানো।"৪২
সে নিথর হয়ে গেল, একদম স্থির হয়ে বিস্ফারিত চোখে এই শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ম্যাডাম সামনে পড়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু সে কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না। সব আওয়াজ যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে পলকহীন চোখে ওই শব্দগুলোই দেখে যাচ্ছিল।
সূরা আল-বাকারা,২:৪৪
۞ أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
(***আ-তা’মুরু-নান না-সা বিল বিররি ওয়া তানসাওনা আনফুসাকুম ওয়া আনতুম তাতলূনাল কিতা-ব; আ-ফালা তা’ক্বিলূন***)
"তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও আর নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করো। তবে কি তোমরা বিবেক বুদ্ধি খাটাও না?"
তার ঠান্ডা ঘাম ছুটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ আগে গার্ডকে দেওয়া সেই উপদেশ তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তার মনে হলো, এই কিতাব তার সম্পর্কে তার চেয়েও বেশি জানে।
(তবে... তবে এখন আমি কী করব?) তার বুক কাঁপতে শুরু করল। অবলীলায় সে একটি রশি ধরতে চাইল। কালামের (বাণীর) রশি। সে জানত না অন্য প্রান্তে কে আছে, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল অন্য প্রান্তে অবশ্যই কেউ আছে।
সূরা আল-বাকারা,২:৪৫
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ
(**ওয়াসতাঈনূ বিস-সবরি ওয়াস-সালাহ; ওয়া ইন্নাহা লাকাবীরাতুন ইল্লা আলাল খা-শিঈন।**)
"ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই এটি (নামাজ) অত্যন্ত কঠিন কাজ, কিন্তু তাদের জন্য নয় যারা (আল্লাহকে) ভয় করে।"
সে আতঙ্কিত হয়ে মাথা তুলল। পিঙ্ক স্কার্ফ পরা অনেকগুলো মাথা নিজ নিজ বইয়ের ওপর ঝুঁকে ছিল। কেউ তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করছিল না।
সে আবারও ওই শব্দগুলো পড়ল। ওটি কোনো প্রবন্ধ রচনা ছিল না, ওটি ছিল কথোপকথন।
ওহ মাই গড (Oh my God), তার হৃৎপিণ্ড সজোরে ধড়ফড় করছিল।
"ইটস টকিং টু মি (It's talking to me)"।
পাশে বসা মেয়েটি মাথা তুলল।
"তবে এটি তো টক (Talk)-ই,,,কালাম। এজন্যই তো আমরা একে কালাম পাক বলি।" সে সহজভাবে বলে নিজের সিপারার ওপর ঝুঁকে পড়ল।
মেহমিল সিপারা বন্ধ করে দিল এবং কিছু না নিয়েই দ্রুত দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
ফারিস্তে যখন নিজের অফিসে এল, মেহমিল তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
"মেহমিল তুমি?"
"আমি... আমি ভবিষ্যতে আর আসব না, আমি মসজিদ ছেড়ে দিচ্ছি।" সে যে চেয়ারে বসে ছিল, অস্থিরভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখে এক অদ্ভুত ভয় ও অস্থিরতা ছিল।
ফারিস্তে শান্তভাবে ফাইলটি টেবিলের ওপর রাখল এবং চেয়ারের অপর প্রান্তে বসল। জানালার ব্লাইন্ডস বন্ধ ছিল। কামরায় এক ধরণের ছায়া ঘন হয়ে ছিল।
"আপনি কি আমার কথা শুনছেন?"
"বসো।" সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে নিচু হয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। মেহমিল অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে চেয়ারে বসে রইল। তার মন চাইছিল সে এখান থেকে পালিয়ে যাক।
"আমি আর আসব না ফারিস্তে!" সে আবারও বলল। ফারিস্তে তখনও ড্রয়ার নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে মাথা তুলে মেহমিলের দিকে তাকাল।
"তবে কোথায় যাবে?"
"ব্যস, কুরআন ছেড়ে দিচ্ছি।"
"এটি ছেড়ে কোথায় যাবে মেহমিল!" সে কিছু কাগজপত্র বের করে সোজা হয়ে বসল এবং তাকে দেখল।
"আমার নরমাল লাইফে (Normal life)।"
"তোমার কি এটিকে অ্যাবনরমাল (Abnormal) লাইফ মনে হয়?"
"এটি আমার সাথে কথা বলে ফারিস্তে!" সে চাপা স্বরে চিৎকার করে উঠল।
"আপনি বুঝতে পারবেন না আমি কত বড় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমার পক্ষে এসব সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। আপনি বুঝতে পারবেন না।"
"আমি বুঝতে পারি, যখন কুরআন সম্বোধন করতে শুরু করে তখন সবাই এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়।"
"না।" সে দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।
"এটি কারো সাথে হতে পারে না, কারো সাথেই হতে পারে না।"
"আমার সাথে হয়েছে, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।"
"তোমার কি মনে হয় তুমিই প্রথম?"
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল এবং দুই হাতের মাঝে মাথা নুইয়ে দিল।
"আমরা মানুষরাই তো এই বোঝা বইবার যোগ্য, তবে তুমি কেন এত দুর্বল হয়ে পড়ছ? আমরা পাহাড় হলে সইতে পারতাম না। ফেটে যেতাম।"
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ফারিস্তের কাছে তাকে মুহূর্তেই খুব অসুস্থ মনে হলো।
"কেউ কি আমার চিন্তাগুলো পড়ছে ফারিস্তে?"
"তিনি কোনো সৃষ্টি নন, এটা তার কালাম (বাণী), কথা। আল্লাহর কথা, আর আল্লাহই তো চিন্তা পড়তে পারেন।"
সে দিশেহারা হয়ে গেল।
"আমি... আমি কি আল্লাহ তায়ালার সাথে কথা বলছিলাম?"
"তোমার কি কোনো সন্দেহ আছে?"
"কিন্তু... এটি চৌদ্দশ বছরের পুরনো কিতাব, এটি কীভাবে সম্ভব যে এটি পাস্ট (Past বা অতীত)-এ হয়েও আমাদের সাথে চৌদ্দশ বছর পরের ফিউচার (Future বা ভবিষ্যৎ)-এর সাথে নিজেকে কানেক্ট (Connect) করে নেয়? ইটস লাইক এ মিরাকল (It's like a miracle বা এটি তো অলৌকিক বা মোজেজার মতো)।"
"এজন্যই তো আমরা একে বলি মোজেজা!"
"আর যখন এটি শেষ হয়ে যাবে?"
"তবে আবার শুরু করো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, কুরআনের মোজেজা বারবার আবৃত্তি করলেও পুরনো হবে না।
ফাহমা (বোঝিয়ে) দেওয়া।"
"আমি... আমি যদি এটি ছেড়ে দিই?"
ফারিস্তে আক্ষেপের সাথে তার দিকে তাকাল।
"মেহমিল! কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ আসমান-জমিনকে ডাকবেন তখন প্রতিটি জিনিস দৌড়ে আসবে। স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, খুশিতে হোক বা অখুশিতে।
যখন আমরা আল্লাহর ডাকে নামাজ ও কুরআনের দিকে আসি না, তখন আল্লাহ আমাদের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করে দেন, এই দুনিয়াকে এতটাই সংকীর্ণ করে দেন যে আমাদের বাধ্য হয়ে, চরম অনিচ্ছার সাথে আসতে হয়।
আর তখন আমরা দৌড়েই আসি, কারণ এছাড়া আমাদের আর কোথাও আশ্রয় মেলে না। তাঁর দিকে স্বেচ্ছায় চলে এসো মেহমিল! নতুবা তোমাকে বাধ্য হয়ে আসতে হবে।"
তারপর সে আর কোনো বিতর্ক করতে পারল না।
ফারিস্তের কথায় সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। তার মনে হলো সে এখন আর কখনো কুরআন ছাড়তে পারবে না।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে যদি জানত যে এই একটি শব্দের আড়ালে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা লুকিয়ে আছে, তবে সে কখনোই এটি এড়িয়ে যেত না; আর তা না হলে এর অর্থ অভিধানেই খুঁজে নিত।
কিন্তু কোনোভাবে শব্দটি লিখে রাখা হয়নি।
আজকের রুকু ম্যাডাম মিসবাহর বদলে অন্য একজন শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন। ম্যাডাম জাকিয়া বনী ইসরাঈলের হাইকেলে (পবিত্র উপাসনালয়) প্রবেশের কাহিনী বর্ণনা করছিলেন।
সূরা আল-বাকারা,২:৫৮
وَّادۡخُلُوا الۡبَابَ سُجَّدًا وَّقُوۡلُوۡا حِطَّةٌ نَّغۡفِرۡ لَكُمۡ خَطٰیٰكُمۡ ؕ وَسَنَزِیۡدُ الۡمُحۡسِنِیۡنَ
(***ওয়াদখুলুল বা-বা সুজ্জাদান ওয়া ক্বূলূ 'হিত্তাতুন' নাগফির লাকুম খাতা-ইয়া-কুম; ওয়া সানাযীদুল মুহসিনী-ন।**)
> "আর দরজায় প্রবেশ করো সিজদাবনত অবস্থায়, এবং বলো 'হিত্তাতুন' (حِطَّةٌ)—আমরা তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেব এবং শীঘ্রই আমরা মহসিনদের (সদাচারী) আরও বাড়িয়ে দেব।"
>
তিনি আয়াতটি পড়ে এখন শব্দের গভীরতায় যাচ্ছিলেন।
"হিত্তাহ" (حِطَّةٌ) শব্দের অর্থ হলো ঝরিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ গুনাহ ঝরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এখন বনী ইসরাঈলরা করল কী, পরবর্তী আয়াতে যেমন উল্লেখ আছে—তারা মুখ বাঁকিয়ে কথাটি বদলে দিল। তারা সিজদাবনত হয়ে অর্থাৎ নুয়ে পড়ে 'হিত্তাতুন' বলে প্রবেশের বদলে, 'হিনতাতুন' (حِنْطَةُ) বলে প্রবেশ করল। 'হিনতাহ' বলতে বোঝায়...
সে দ্রুত কলম চালিয়ে লিখছিল, ঠিক তখনই কেউ রাগতভাবে কলমটি তার রেজিস্টারের ওপর রাখল। সে হকচকিয়ে মাথা তুলল।
একজন ক্লাস ইনচার্জ তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন।
"কিছু মানুষ কুরআন পড়ে এবং কুরআন তাদের জন্য দোয়া করে। আর কিছু মানুষ কুরআন পড়ে এবং কুরআন তাদের ওপর লানত করে।"
"কী হয়েছে ম্যাম?"
"আপনি রেজিস্টার কুরআনের ওপর রেখে লিখছেন।" ইনচার্জ ব্যথিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে ঘাবড়ে গিয়ে নিচ থেকে কুরআনটি বের করল। এটি ছিল তার তাজবীদের কুরআন, সাধারণ অফ-হোয়াইট মলাটের।
"সরি ম্যাম!" সে কুরআনটি সাবধানে একপাশে রাখল এবং রেজিস্টারে ঝুঁকে পড়ল।
তারপর এদিক-ওদিক পাশে বসা মেয়েটির রেজিস্টারে উঁকি দিল যাতে দেখতে পারে ম্যাডাম 'হিনতাহ' শব্দের কী অর্থ লিখিয়েছেন, কিন্তু সে কিছুই লেখেনি।
কুরআনের ক্লাস ছিল, সে কথা বলতে পারছিল না; তাই হতাশ হয়ে নিজের নোটের দিকে তাকাল। পৃষ্ঠার লাইন যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখানে সে লিখে রেখেছিল—"হিনতাহ অর্থাৎ গন্ধ..."
'গন্ধ'-র দাল (দ)-এর আগে পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
মাঝে মাঝে আমরা যান্ত্রিকভাবে কিছু লিখতে লিখতে পৃষ্ঠা শেষ হয়ে গেলে সামনে যা থাকে—তা নিচের বই হোক বা ডেক্সের কাঠ—তার ওপরেই লিখে ফেলি এবং পরে আর মনে থাকে না।
"গন্ধ (ময়লা/বাজে), এটিই কি এর মানে?" সে এই অসম্পূর্ণ শব্দটির ওপর অবাক হলো।
কোনো মানে হচ্ছিল না, তবে সে সামনে লিখতে লাগল। ভাবল পরে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবে, কিন্তু পরে আর মনে রইল না।
ছুটির সময় সে হুমায়ুনকে তার গেটের দরজা বন্ধ করতে দেখল। সে হুক লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই মেহমিল সামনে এসে দাঁড়াল।
পিঙ্ক স্কার্ফে আবৃত মুখ, কাঁধে ব্যাগ, সাদা ইউনিফর্ম আর বুকের ওপর হাত বেঁধে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
"এই পরিবর্তন কীভাবে এল?" হুমায়ুন অবলীলায় হেসে ফেলল। সম্ভবত সে ভালো মেজাজে ছিল। মেহমিল তার চিরাচরিত কঠোর দৃষ্টিতে তাকে দেখে যাচ্ছিল।
"সব ঠিক আছে তো?" সে দু-পা সামনে এগিয়ে এল। তার পেছনে কালো গেটের বাইরে সতর্ক দারোয়ান আড়চোখে দুজনকে দেখছিল, যারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল।
হুমায়ুন পকেটে হাত দিয়ে আর মেহমিল কঠোর ভঙ্গিতে বুকের ওপর হাত বেঁধে।
"আপনার সমস্যাটা কী ফাওয়াদ ভাইয়ের সাথে?"
"ধূর্ত অপরাধীরা যেকোনো পুলিশ অফিসারের জন্য চ্যালেঞ্জ, আর আমার চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো লাগে।"
"এই ভালো লাগার চক্করে যদি আপনি উল্টো ফেঁসে যান তবে?"
"আমি কেন ফাঁসতে যাব? তুমি তো কোর্টে নিজের কথা থেকে সরে দাঁড়াবে, তাই না?"
"আপনাকে কে বলল যে আমি সরে দাঁড়াব?"
"মানে কী?" সে হঠাৎ চমকে উঠল।
সে একইভাবে তাকে বিদ্ধ করা নজরে দেখে ঘুরে দাঁড়াল এবং বুকের ওপর হাত বেঁধে, মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল।
বিবেকের সব পথ এক অদ্ভুত ধোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছিল, সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
কত দিন পর আজ সে বিকেলের চা পরিবেশন করতে ট্রলি ঠেলে বাইরে নিয়ে এল। লনে সব বড়রা এভাবেই বসে ছিলেন। চলত এদিক-ওদিকের খোশগল্প আর ভাব বিনিময়।
"মেহমিল! আমার চায়ে ক্যান্ডেরল (Canderal) দিও তো মা!" আগা জান এমন সাবলীলভাবে বলে গুফরান চাচার সাথে কথা বলায় মগ্ন হয়ে গেলেন যে, নাঈমা আর ফিজা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাল।
যখন থেকে ফাওয়াদ জেলে গিয়েছিল, তাদের দুজনের জোট তায়ি মেহতাব থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তাকে জামাই বানানোর যে স্বপ্ন তারা দেখেছিল, তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আর এখন তারা তায়ির তোষামোদ করার বদলে তাকে অবহেলা করতে শুরু করেছিল।
"এই নিন আগা জান!" সে-ও পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে কাপটি তাঁর হাতে ধরিয়ে দিল এবং তারপর তায়ি মেহতাবকে দিল, যিনি একপাশে বিমর্ষ হয়ে বসে ছিলেন।
"থ্যাংক ইউ (Thank you) মেহমিল।" জানি না কোন মন থেকে তিনি লোক দেখানো হেসে এটি বললেন। ফিজা চোখের ইশারায় নাঈমাকে হালকা সংকেত দিল।
নাঈমা 'হুন' বলে মাথা ঝাকালো। তাদের মাথায় আসছিল না যে, হঠাৎ তিনি মেহমিলের ওপর এত সদয় কেন হয়ে উঠলেন।
সে খালি ট্রে নিয়ে ভেতরে আসতেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা হাসান, যে শার্টের কাফ লাগাচ্ছিল, তাকে দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
"মেহমিল!"
একটি পুরনো দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ফাওয়াদের এভাবে নেমে আসা, তারপর মেহমিলের তাকে চা দেওয়া এবং আঙুলের সেই ছোঁয়া।
ফাওয়াদ কি তখন ভেবেছিল যে, এই মেয়েটি তার হাতিয়ারও হতে পারে? সে কি এতটাই সস্তা ছিল?
দৃশ্যটি একই ছিল, শুধু চেহারা বদলে গিয়েছিল। তার চোখে যেন কাঁচের টুকরো বিঁধতে লাগল।
"মুমিন এক গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।" সে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে এল।
"মেহমিল! দাঁড়াও, শোনো।" হাসান দ্রুত তার পেছনে ছুটল এবং রান্নাঘরের দরজায় এসে থামল।
ভেতরে মুসাররাত কাপড় দিয়ে স্ল্যাব পরিষ্কার করছিলেন। মেহমিল পাশেই চেয়ারে মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল।
বাদামী উঁচু পনিটেইল, যার কারণে পেছন থেকে তার লম্বা ঘাড় নুয়ে ছিল; আর কামিজের ওপর ওড়নাটি কাঁধের ওপর সুন্দর করে ছড়িয়ে রেখে, পায়ের ওপর পা তুলে সে মুখ ফিরিয়ে বসে ছিল।
তার এই সাইড পোজ (Side pose) থেকেও হাসান তার নত চোখের বিষণ্ণ রঙ দেখতে পাচ্ছিল; হাসানের মনে হলো সে খুব বদলে গেছে।
"মেহমিল! আমাকে তোমার সাথে কথা বলতে হবে।"
মুসাররাতের স্ল্যাব ঘষার হাতটি থেমে গেল, তিনি বিস্ময়ে ঘাড় ঘোরালেন।
"হাসান?"
"জি, মেহমিলকে বলুন যেন আমার কথা একটু শোনে।"
তিনি মেহমিলের দিকে তাকালেন, যে নিস্পৃহভাবে ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে চেয়ারে বসে ছিল। "মেহমিল! হাসান ডাকছে।"
'আমি কি ওদের বাপের চাকর যে আসব?'—তার মনে হলো এটি বলে দেয়, কিন্তু সকালেই তো ফারিস্তে তাকে কিছু বলেছিল।
"মেহমিল!" মুসাররাত আবারও ডাকলেন।
"ওনার যা বলার আছে, এখানেই বলুন। মনঃপূত না হলে বলার দরকার নেই।" সে মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেই ভোরের আলোয় সে একটি কসম খেয়েছিল, সেই কসম তাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রক্ষা করতে হবে।
"মেহমিল! তুমি বুঝছ না কেন?" সে অসহায়ভাবে তার সামনে এল। "ওরা তোমাকে ফাওয়াদের জন্য ব্যবহার করছে। তুমি নিজেকে এই কেসে (Case) জড়িয়ো না।"
সে ঘাড় তুলল। হাসান তার সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখে তাকে দেখছিল।
মেহমিলের চেহারা ছিল আবেগহীন, একদম নিস্পৃহ।
"আপনার যা বলার ছিল বলা হয়ে গেছে? এখন আপনি যেতে পারেন।"
সে আলুর ঝুড়িটি কাছে টেনে নিয়ে টেবিল থেকে ছুরি তুলল। হাসান কয়েক মুহূর্ত অসহায়ভাবে তাকে দেখল, তারপর দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল। মুসাররাত দ্বিধাভরে তার কাছে এলেন।
"হাসান কোন কেসের কথা বলছে?"
"আলু-গোশত আমি রান্না করে দেব, আপনি কোরমাটা দেখে নেবেন আর ক্ষীরটাও; কারণ আমি চাই না কেউ কোনো অভিযোগ করুক।" সে এখন নিবিষ্ট মনে আলু ছিলছিল।
মুসাররাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ল্যাব পরিষ্কার করতে লাগলেন। তিনি জানতেন, মেহমিল এখন আর কিছুই বলবে না।
আর সে আলু ছিলতে ছিলতে সেই অদ্ভুত কথাটি ভাবছিল, যা সকালে ফারিস্তে তাকে বলেছিল।
যখন সে আত্মীয়-স্বজন এবং এতিমদের সাথে সদাচরণের আয়াতগুলো পড়ে অস্থির হয়ে গিয়েছিল এবং জিজ্ঞেস করেছিল—যারা এতিমদের সম্পদ গ্রাস করে, তাদের জন্য কী শাস্তির কথা বলা হয়েছে?
"এতিমদের আগে আত্মীয়-স্বজন বা নিকটাত্মীয়দের কথা উল্লেখ আছে মেহমিল।"
"আমি আর আমার মা যেভাবে এই আত্মীয়দের সেবা করি, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।"
"তবে এই সেবার কথা কি কখনো তাদের অনুভব করিয়েছ?"
"আম্মা তো সারাক্ষণ খাটতেই থাকেন, কিন্তু আমি ধার রাখায় বিশ্বাসী নই। ওরা একটা বললে আমি দশটা শুনাই, যা যা রান্না করি এক একটা আইটেম (Item) গুনে দেই।"
সে গর্বের সাথে কথাটি বলল এবং ফারিস্তের গম্ভীর চেহারা দেখে মনে হলো সে বোধহয় ভুল কিছু বলে ফেলেছে।
"অর্থাৎ যা কিছু করো সব ধূলিসাৎ করে দাও, এটি তো তাদের ওপর জুলুম।"
"জুলুম? আমি জুলুম করি ওদের ওপর?" সে অবাক হয়ে গেল।
"জুলুমের সংজ্ঞা কী? কারো হকের বা অধিকারের কমতি করা। কেউ একটা বললে একটা শোনানো সমান সমান বদলা, কিন্তু দশটা শোনানো হলো বাড়াবাড়ি, এটি তার হকের কমতি।"
"ওরা আমাকে যা খুশি বলবে আর আমি সামনে থেকে চুপ করে থাকব? একটাও শোনাব না?"
"তুমি যদি শুনিয়ে দাও তবে সব সমান করে দিলে, তখন তুমি তাদের আচরণের অভিযোগ কারো কাছে করার অধিকার রাখবে না। ক্ষমা করে দিতে শেখো। আর জানো, ক্ষমা করা মানে কী?"
সে মাথা নেড়ে না বলল।
"তাকে কষ্ট না দেওয়া যে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, তাকে তার আচরণের কথা অনুভব পর্যন্ত না করানো। কিছুই না জানানো—এটাই হলো ক্ষমা করা। তুমি ক্ষমা করে দিও, সবর করো।"
"সারা জীবন তো সবরই করে এসেছি।"
"তুমি যা করো সেটি সবর নয়। সবর হলো এমন যে, মাথায় যদি ভারি পাথরও এসে পড়ে তবে ঠোঁট দিয়ে যেন 'উফ' শব্দটি না বের হয়।
সবর হলো সেটি, যা তোমার মা করেন।"
"আর এহসান বা অনুগ্রহ?"
"সবর ও ক্ষমা করার পর তাদের খারাপ আচরণের জবাবে খুব ভালো আচরণ করা।"
"আমি কেন করব এসব? ওরা কেন করে না? আত্মীয়দের সাথে তেমনই আচরণ করা উচিত যেমনটা ওরা আমাদের সাথে করে।"
সহীহ বুখারী
অধ্যায়: কিতাবুল আদাব (আদব বা শিষ্টাচার অধ্যায়)
হাদিস নম্বর: ৫৯৯১
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا
লাইসাল ওয়া-সিলু বিল মুকা-ফিয়ি, ওয়া লা-কিননাল ওয়া-সিলুল্লাযী ইযা ক্বুত্বি’আত রাহিমুহু ওয়াসালাহা।
"কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তো বলতেন যে, বিনিময়ে রক্তসম্পর্ক বজায় রাখা ব্যক্তি আসলে সুসম্পর্ক স্থাপনকারী নয়।
মেহমিল! এতে তো তুমি কোনো প্রতিদানই পাবে না। প্রতিদান তো তখন মিলবে যখন তুমি মন্দের জবাবে ভালো করবে। তুমি তাদের ক্ষমা করো আর তোমার হক আল্লাহর কাছে চাও।"
"ওরা আমার সম্পত্তি গ্রাস করেছে।" সে চিৎকার করে উঠেছিল। "আব্বা তার সব প্রপার্টি (Property) আমার নামে করে দিয়ে গিয়েছিলেন।"
"তবে তিনি খুব ভুল করে গিয়েছিলেন। সব প্রপার্টি অসিয়ত করার কোনো অধিকার তাঁর ছিল না। তাঁর অধিকার ছিল মাত্র এক-তৃতীয়াংশের ওপর, সেটি তিনি যাকেই খুশি অসিয়ত করতে পারতেন; কিন্তু বাকি দুই-তৃতীয়াংশ শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টনের অনুমতি দিয়ে যেতেন, তবে হয়তো তোমার চাচারা নিজেদের অংশ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। ওয়ারিশ তো আল্লাহ বানিয়েছেন। মৃত ব্যক্তিকে মন্দ বলছি না, কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত অনেকের জীবন নষ্ট করে দেয়। মেহমিল! তুমি কিছু মানুষের ভুল সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে নিজের আত্মীয়দের ওপর জুলুম করলে ভুলে যেয়ো না যে, পুলসিরাতে 'রেহেম' (আত্মীয়তা) এবং 'আমানত'-এর কাঁটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রতিটি খাইন (বিশ্বাসঘাতক) এবং আত্মীয়তা ছিন্নকারীকে তারা পুল থেকে নিচে জাহান্নামে ফেলে দেবে, আর প্রতিটি আমানতদার ও আত্মীয়তা বজায় রাখা ব্যক্তি পুল পার হয়ে যাবে। তুমি কি সেই পুল পার হতে চাও না?"
সে মাথা ঝাকিয়ে দ্রুত আলু ছিলতে লাগল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"ম্যাডাম! আমি একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।" সেদিন ক্লাসের পর সে ম্যাডাম মিসবাহর কাছে গিয়েছিল।
"জি অবশ্যই, জিজ্ঞেস করুন।" ম্যাডাম খুব মনোযোগ দিয়ে তার দিকে ফিরলেন।
"ম্যাম, আমার দ্বারা নামাজ পড়া হয়ে ওঠে না, তো এতে কি কোনো সমস্যা আছে?"
"হ্যাঁ, কেন সমস্যা থাকবে না? ইটস ওকে (It’s okay), যদি আপনি না পড়তে পারেন—" মেহমিলের মনে হলো, মস্ত বড় এক বোঝা যেন তার কাঁধ থেকে নেমে গেল।
সে এক নিমেষে কোনো এক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলো।
"ঠিক তাই ম্যাম! আমি বাকি সব নেক কাজ করে নেব, কুরআন পড়ে নেব, ঠিক আছে না? নামাজ পড়া কি খুব বেশি জরুরি?"
"না, অতটা জরুরি তো নয়। আপনি যদি না পড়তে চান তবে পড়বেন না।"
"ম্যাম! এতে কোনো পার্থক্য তো তৈরি হবে না, তাই না?"
"একদমই কোনো তফাৎ হবে না। এটি পুরোপুরি আপনার মর্জির ওপর।"
"আহ... ওকে (Okay)?" সে বেশ স্বস্তির সাথে হাসল।
কিন্তু ম্যাডাম মিসবাহর কথা তখনও শেষ হয়নি।
"বিশ্বাস করুন মেহমিল! তাঁর এতে কোনো তফাৎ হবে না। আপনি নামাজ না পড়লে পড়বেন না, সিজদা না করলে করবেন না।
তাঁর কাছে যে মহান সত্তারা আছেন, তাঁরা তাঁর ইবাদতে কোনো অহংকার করেন না।
যদি আপনি ইবাদত করেনও, তাতে তাঁর কী আসে যায়? এই আসমানের এক বিঘত জায়গাও খালি নেই যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা সিজদাবনত হয়ে নেই।
আর জানেন, ফেরেশতা কত বড় হতে পারে? যখন সেই পাহাড়ে জিবরাঈল (আ.)-এর ডাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিরে তাকিয়েছিলেন, তখন জিবরাঈল (আ.)-এর উচ্চতা ছিল জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত।
তাঁর বিশালত্বের আড়ালে রাসুলুল্লাহ (সা.) আসমান দেখতে পাচ্ছিলেন না। ফেরেশতারা এমনই হন।
৭০ হাজার ফেরেশতা প্রতিদিন কাবা শরিফ তওয়াফ করেন। এই সংখ্যাটি সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু জানেন কি—যে ৭০ হাজার ফেরেশতা আজ তওয়াফ করছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের দ্বিতীয়বার তাওয়াফ করার পালা আর আসবে না।
সেই রবের কাছে ইবাদত করার জন্য অগণিত সত্তা রয়েছে।
আপনি নামাজ না পড়লেও তাঁর কী আর এমন তফাত হবে?"
ম্যাডাম মিসবাহ চলে গিয়েছিলেন আর সে বিবর্ণ মুখে বইগুলো বুকে জড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, সে এখন আর কখনো নামাজ ছাড়তে পারবে না।
বিকেলে সে খুব যত্নের সাথে আসরের নামাজ পড়ল। পড়ার পর লাউঞ্জে ফোন স্ট্যান্ডের পাশে বসল নাদিয়াকে ফোন করার জন্য।
নাঈমা চাচি মাআজকে কান ধরে বকুনি দিচ্ছিলেন, আর সে কান ছাড়িয়ে ভেংচি কাটতে কাটতে পালিয়ে গেল।
"ছেলেটা একদম শয়তান হয়ে গেছে।
আমি কী করি ওকে নিয়ে?" তিনি কোমড়ে হাত দিয়ে দুশ্চিন্তার সাথে বললেন আর মেহমিলের ফোন নম্বর ডায়াল করতে থাকা আঙুলগুলো থেমে গেল।
'ছেলেটা শয়তান হয়ে গেছে'—সে মনে মনে আওড়াল।
'শয়তান' শব্দের রুট ওয়ার্ড (Root word) কী ছিল?
শিন-তওয়া-নুন (শ-ত-ন)—'শাতানা'।
অর্থাৎ রহমত থেকে দূরে, আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্যুত, বিতাড়িত।
ওহ গড (Oh God)! তিনি নিজের সন্তানকে আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্যুত বলে দিলেন?
"চাচি!" সে নিচু স্বরে তাঁকে ডাকল।
ফোনের রিসিভার তখনও তার হাতে ছিল।
"কী?" নাঈমা চাচি বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকালেন।
"মাআজকে শয়তান বলবেন না চাচি! আল্লাহ না করুক ও শয়তান হোক। শয়তান তো তাদের বলে যারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে গেছে।"
"আচ্ছা, আচ্ছা! হয়েছে, থামো এবার। দুই সিপারা কী পড়েছ, এখন আমাদের জ্ঞান দিতে আসবে? হুন, এদের তো কিবলাই বদলে গেছে।" তিনি তাচ্ছিল্যের সাথে বলতে বলতে বাইরে চলে গেলেন আর মেহমিল যেখানে ছিল সেখানেই পাথর হয়ে বসে রইল।
সকালেই তো দ্বিতীয় সিপারার প্রথম আয়াতে সে পড়েছিল
আল-বাকারা:- ২:১৪২
سَيَقُولُ السُّفَهَاءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلَّاهُمْ عَن قِبْلَتِهِمُ الَّتِي كَانُوا عَلَيْهَا
("সাইয়াক্বূলুস সুফাহাউ মিনান-না-সি মা- ওয়াল্লা-হুম ‘আন ক্বিবলাতিহিমুল্লাতী কা-নূ ‘আলাইহা-।")
(—'অচিরেই নির্বোধ লোকেরা বলবে যে, কিসে তাদেরকে তাদের বর্তমান কিবলা থেকে ফিরিয়ে দিল?')
'এদের তো কিবলাই বদলে গেছে'—
বাক্যটি বারবার তার মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
অনেক আগে দেখা হওয়া সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটির কথা হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল।
"এতে তোমার অতীত আছে, বর্তমান আছে এবং ভবিষ্যৎ লেখা আছে।" সে ঠিকই বলেছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে মাথা নিচু করে নীরবে বাসন ধুয়ে র্যাকে সাজিয়ে রাখছিল।
ধোয়া প্লেটগুলো থেকে টুপটাপ করে পানির ফোঁটা পড়ছিল। তার হাতগুলো খুব মন্থর গতিতে কাজ করছিল। সে রান্নাঘরে একা ছিল, আম্মা জানি কোথায় ছিলেন।
বাকিরা তো কাজের সময় রান্নাঘরে আসাকে আভিজাত্যের পরিপন্থী মনে করত, কিন্তু যাই হোক। সে মাথা ঝাকালো। সে এখন চেষ্টা করত এই ধরনের চিন্তাকে মনে জায়গা না দিতে। এখন তার মনে হতো যে, নিজের কুরুচিপূর্ণ আচরণের কারণে সে নিজের আর তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখেনি; আগে সে সবকিছু এই দুনিয়াতেই সমান সমান মিটিয়ে নিতে মরিয়া ছিল, কিন্তু এখন সে সবর করতে শুরু করেছে।
জীবন এমনিতেও এখন কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
এখন মসজিদের শিক্ষিকারা তাকে দেরি করে আসার জন্য আল্টিমেটাম (Ultimatum) দিয়ে দিয়েছিলেন।
সে নিজেও নিজের তাজবিদ শুদ্ধ করার জন্য ফজরের পরপরই আসতে চাইত, কারণ তখন মেয়েরা একসঙ্গে বসে তাজবিদের প্র্যাকটিস (Practice) করত। সমস্যা শুধু একটাই ছিল যে, ফজরের সময় ফ্রিজ লক (Lock) করা থাকত; তার শত অনুরোধেও কারও মনে দয়া হতো না। তার কাছে নিজের নাস্তার টাকা ছিল না—হয় সে যাতায়াতের ভাড়া দিত নতুবা নিজের নাস্তা কিনে রাখত। নাস্তা বিসর্জন দিয়ে সে দীনের পথে ফিস দিল।
আর প্রতিদিন ভোরে তাহাজ্জুদে উঠে সে আধা ঘণ্টা নিজের হোমওয়ার্ক (Homework) করত, তারপর ফজর পড়ে বেরিয়ে যেত। আসরের কাছাকাছি সময়ে তার ফেরা হতো।
আমাদের বড়রা বলতেন, 'কষ্ট আর ত্যাগ ছাড়া ইলম আসে না'—ঠিকই বলতেন।
সে শেষ প্লেটটি র্যাকে রাখল, কল বন্ধ করল এবং হাত মুছতে মুছতে নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল। ঠিক তখনই রান্নাঘরের খোলা দরজায় কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থমকে গেল এবং পরের মুহূর্তেই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"কেমন আছো?" ফাওয়াদ বুকের ওপর হাত বেঁধে হাসিমুখে তাকে দেখছিল।
সে পলকহীন চোখে নির্বাক হয়ে তাকে দেখতে লাগল।
ও কখন ফিরে এল?
"তোমাকে আমার খুব মনে পড়ছিল মেহমিল! আমি এক বিশাল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।"
"আম্মা! আম্মা!" সে হঠাৎ উচ্চস্বরে ডাকতে শুরু করল।
তার রক্ত টগবগ করে ফুটছিল; সে অনুভব করল তার শরীর কাঁপছে।
"কী হয়েছে?" মুসাররাত অপ্রস্তুত হয়ে ভেতরে এলেন এবং ফাওয়াদকে দেখে চুপ হয়ে গেলেন।
"ফাওয়াদ বাবা! তুমি?"
"চাচি!" সে ব্যাকুল হয়ে তাঁর দিকে ফিরল।
"আমার সাথে অনেক বড় ষড়যন্ত্র হয়েছে। এই সব ওই এএসপির কারসাজি। আমি কি মেহমিলের সাথে এমনটা করতে পারি? মেহমিল!" সে এবার তার দিকে ঘুরল।
"তুমি জানো, আমি নির্দোষ। ওরা তোমাকে যে রেকর্ডিং শুনিয়েছে, সেটা ওদের কোনো শিল্পীর তৈরি ছিল। আমরা ওই পুলিশদের ঘুষ দিই না, তাই ওরা এমনটা করেছে।
তুমি মনে করে দেখো, তুমি নিজেই বলেছিলে যে তুমি সই করানোর জন্য যেতে চাও। আমি যদি কোনো লেনদেন করতাম, তবে কি তোমাকে বাধ্য করতাম?"
সে হঠাৎ চমকে উঠল। ও ঠিকই বলছে। কিন্তু...
"আপনি... আপনি আমার ওপর দোষ চাপিয়েছেন যে আমাকে আপত্তিকর অবস্থায় ধরেছেন..." এর বেশি সে বলতে পারল না।
"ওসব আমাকে এএসপি রাতে বলেছিল যে, আমি যেন তোমার আর তার মাঝখানে আসার চেষ্টা না করি। আপনিই বলুন, আমি কি এমনটা করতে পারি?
তখন আমার বিশ্বাস হয়ে গেল যে তোমার মতো চরিত্রবান ও পবিত্র মেয়ে এমনটা করতে পারে না।
আমি পুরো পরিবারের সামনে তোমার চরিত্রের কসম খেতে রাজি আছি চাচি! আপনি আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন।"
সে অসহায়ভাবে মুসাররাতের সামনে নুয়ে পড়ল এবং তাঁর দুই হাত ধরে ফেলল।
"বিশ্বাস করুন, আমি কিছু করিনি। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন মেহমিল আমার কারণে বদনাম হয়েছে, তবে আমি মেহমিলকে বিয়ে করতে প্রস্তুত।
আপনি যখন বলবেন, আগা জান ধুমধাম করে মেহমিলকে নিজের ছেলের বউ করে ঘরে তুলবেন।
আপনি শুধু 'হ্যাঁ' বলুন। একবার মেহমিলের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যাক, তারপর পুরো বংশে কার সাহস হবে যে মেহমিলের দিকে আঙুল তুলবে? আমরা সেই আঙুল কেটে দেব।
আল্লাহ সাক্ষী আছেন চাচি! আমরা তাই করব।"
"ফাওয়াদ! তুমি সত্যি বলছো...?"
আবেগের আতিশয্যে মুসাররাতের চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।
সে, যে এতক্ষণ স্লাবের সাহায্য নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, এক মুহূর্তেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সে রাতে রাতের খাবার খেল না, মুখ ঢেকে শুয়ে রইল। বাইরে থেকে মানুষের আনাগোনার শব্দ আসছিল। হাসি-ঠাট্টা, আলাপ-আলোচনা, শোরগোল—একদম দাওয়াতের মতো পরিবেশ ছিল।
সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ তার ঘর পর্যন্ত আসছিল, কিন্তু কোনো কিছুর প্রতিই তার আগ্রহ ছিল না।
সে চিত হয়ে শুয়ে দীর্ঘক্ষণ ছাদের ঘুরতে থাকা ফ্যানটির দিকে তাকিয়ে রইল।
ফ্যানের তিনটি পাখা গোল গোল ঘুরছিল। বারবার একই কক্ষপথে চক্কর দিয়ে অবশেষে সেখানেই পৌঁছে যাচ্ছিল যেখান থেকে শুরু করেছিল।
সে নিজেও যেন ঠিক সেখানেই পৌঁছে গেছে।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ভোরে প্রেয়ার হলের প্রশস্ত সাদা সিঁড়ি দিয়ে সে খালি পায়ে মন্থর গতিতে নেমে আসছিল।
সাদা সালোয়ার-কামিজের ওপর পিঙ্ক স্কার্ফ নিপুণভাবে জড়ানো, এক হাত রেলিংয়ের ওপর রাখা—সে যেন জলের ওপর দিয়ে হেঁটে অন্যমনস্কভাবে নিচে এল।
প্রেয়ার হলের গ্লাস ডোরগুলো বন্ধ ছিল। কাঁচের ওপারে সতেজ ভোর নামছিল। আজ তার কিছুই ভালো লাগছিল না, সে নিঃশব্দে নিজের জায়গায় এল।
ব্যাগটি ডেস্কে রাখল এবং ভেঙে পড়ার মতো ভঙ্গিতে বসল।
যদি কলেজ হতো, তবে সে নিশ্চিতভাবে আজ আসত না। সে এতটাই ডিপ্রেসড (Depressed) হয়ে পড়েছিল যে কিছু পড়তে পারছিল না।
কিন্তু এটি কোনো কলেজ ছিল না, আর সে এখানে পড়তে আসেনি। সে এসেছিল শুনতে।
কিছু জিনিস এতটাই আশ্চর্যজনক হয় যে মানুষ সেগুলোর ওপর অবাক হওয়া ছেড়ে দেয়। সেই অলৌকিক কিতাবটিও ছিল তেমনই। আজব করে দেওয়া, স্তব্ধ করে দেওয়া।
সে যা ভাবত, এই কিতাবে ঠিক তা-ই লেখা থাকত। এখন মেহমিল অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, সে হয়তো আর কখনোই অবাক হতে পারবে না।
কিন্তু আজকের আয়াতগুলো দেখে সে আবার চমকে উঠল।
সূরা আল-বাকারা,২:২০৪ (প্রথম অংশবিশেষ)
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
(ওয়া মিনান-না-সি মাই ইয়ু’জিবুকা ক্বওলুহু ফিল হায়া-তিদ্দুনইয়া
"আর মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে, যার কথাবার্তা পার্থিব জীবন সম্পর্কে তোমাকে মুগ্ধ করে—"
সে নিজের মাথা হাঁটুর ওপর রাখল এবং দুই হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরল।
সূরা আল-বাকারা, ২:২০৪ (শেষাংশ)
وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَىٰ مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ
(ওয়া ইয়ুশহিদুল্লাহি আ’লা মা ফী ক্বলবিহী, ওয়া হুওয়া আলাদ্দুল খি-সাম।)
"—এবং সে নিজের মনের কথার ওপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে ঘোরতর ঝগড়াটে।"
সে মাথা তুলল, মুখটি ডান দিকে ঘোরাল—পিঙ্ক স্কার্ফ পরা মেয়েরা মাথা নিচু করে দ্রুত কলম চালাচ্ছিল।
সেখানে কেউ জানত না যে তার মনের ওপর দিয়ে কী বয়ে যাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারছিল না সে কী অনুভব করছে।
কেবল তিনিই জানতেন, যিনি এই কিতাব তার জন্য অবতীর্ণ করেছিলেন। তার মাঝে মাঝে মনে হতো, এটি কেবল তারই গল্প, অন্য কারো পক্ষে এটি বোঝা সম্ভবই নয়।
"আর মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে—
সে আঙুল দিয়ে দুই রগ টিপে ধরল।
"তোমাকে মুগ্ধ করে—"
সে ধীরে ধীরে উঠল, সিপারা বন্ধ করল এবং কিছুই না নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
"তার কথা—"
সে মন্থর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল।
"পার্থিব জীবন সম্পর্কে—"
সে শেষ ধাপটি অতিক্রম করে
করিডোরের দিকে এগোল।
"এবং সে নিজের মনের কথার ওপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ প্রকৃতপক্ষে সে ঘোরতর ঝগড়াটে।"
সে ক্লান্ত হয়ে বাইরের বারান্দার সিঁড়িতে বসে পড়ল। সামনে ছিল সবুজ লন। সে পিলারে মাথা ঠেকিয়ে লনের সবুজের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সে তো নিজের মনের কাছেও স্বীকার করেনি যে ফাওয়াদের কথা তার ভালো লেগেছিল।
ফাওয়াদের অফারটি ছিল প্রলুব্ধকর, আকর্ষণীয়। সে নিজের মনের কাছে এটি স্বীকার করতে ভয় পেত, কিন্তু তিনি তো চোখের খিয়ানতও জানেন, তাঁর কাছে কোনো কথা কীভাবে লুকিয়ে থাকবে? কিন্তু তিনি তাকে বকলেন না, অন্যদের মতো অপমানও করলেন না। তার তমাশা বানালেন না যেমনটা বংশের লোকেরা বানায়। তার কথা না শোনার ভান করলেন না যেমনটা নাদিয়া করত—কোনো বকাঝকা বা ধিক্কার নেই। কেবল সেই এক কোমল, দয়ালু ভঙ্গি যেটির তৃষ্ণায় সে কুরআন শুনতে আসত। তিনি বকেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর মতো করে কেউ তো বোঝাতও না। তাঁর মতো কেউ ছিলই না।
সে সেখানে বসে ছিল, যখন পাশেই সেই মেয়েটি এসে বসল। সম্ভবত এটি ব্রেক (Break) ছিল।
অন্য মেয়েরা এই সময়েও বসে বসে তাজবিদ করত।
সে চিবুক হাতের তালুর ওপর রেখে মুখ ঘুরিয়ে একইভাবে তাকে দেখতে লাগল।
সেই মেয়েটি হাঁটুর ওপর কুরআন রেখে বাঁ হাত দিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিল, ডান হাতটি অবশ হয়ে একপাশে পড়ে ছিল।
নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা খুলে সে বাঁ হাত দিয়ে পড়ে থাকা হাতটি উঠিয়ে কোলের ওপর রাখল, তারপর সুস্থ হাত দিয়ে পৃষ্ঠার কিনারা ধরে পড়তে শুরু করল।
"ইন্নাল মুসলিমিনা ওয়াল মুসলিমাতি..."
সে থেমে থেমে, আটকে আটকে পড়ছিল, বারবার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
সে আবারও শুরু করত কিন্তু তোতলামি ভরা জিহ্বা তাকে সঙ্গ দিচ্ছিল না।
মাখরাজগুলো ঠিকমতো বের হচ্ছিল না; সে অনেক কষ্টে একটি শব্দ উচ্চারণ করলে সাথে গোঁ-গোঁ শব্দও হচ্ছিল।
হঠাৎ মেহমিলের মনে হলো, মেয়েটি কাঁদছে। তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত ডান হাতটি বারবার নিচে পড়ে যাচ্ছিল। সে বাঁ হাত দিয়ে সেটি তুলছিল আর তাজবিদের সাথে পড়ার চেষ্টা করছিল।
তার চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল এবং অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। সে বাঁ হাত দিয়ে চোখের জল মুছছিল আর চাপা কান্নার শব্দে আবারও চেষ্টা করছিল।
মেহমিল পাথর হয়ে তাকে দেখছিল। সেই পঙ্গু মেয়েটি তার আল্লাহর সাথে কথা বলছিল, আল্লাহ তার খুব বড় সহমর্মী ছিলেন।
সেই মুহূর্তে মেয়েটির মেহমিলের সহমর্মিতার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এক মুহূর্তের জন্যও মেহমিলের তার ওপর করুণা হয়নি, বরং ঈর্ষা হয়েছে।
"কেউ কি এভাবেও তড়পিয়ে কুরআন পড়ে যেমন সে পড়ছে?
আর আমরা আছি যারা বছরের পর বছর এই মুসহাফটিকে পেঁচিয়ে সবচেয়ে উঁচু তাকে সাজিয়ে রাখি—আর কেবল সাজিয়েই রাখি।"
সে একইভাবে হাতের তালুতে চিবুক রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে পলকহীন চোখে তাকে দেখে যাচ্ছিল।
সে আবার তোতলাতে থাকা জিহ্বা নিয়ে পড়তে লাগল, কিন্তু ঠিকমতো পড়া হচ্ছিল না, চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছিল। চাপা কান্নার মাঝে সে অনবরত 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলে যাচ্ছিল।
সাধারণ চেহারার এক পঙ্গু মেয়ে। তার অবলীলায় সেই কৃষ্ণাঙ্গ পঙ্গু মেয়েটির কথা মনে পড়ল।
তিনি কতজনকে যে সাহারা দিয়ে রেখেছেন! আর তারা কতই না হতভাগ্য যারা তিলাওয়াতের শব্দ শুনে কান বন্ধ করে নেয়।
"কখনো আমিও সেই হতভাগাদের দলেই ছিলাম।"
সে ধীরে ধীরে উঠল এবং মাথা নিচু করে চলে গেল।
বারান্দার সিঁড়িতে বসে সেই পঙ্গু মেয়েটি তখনও একইভাবে কাঁদছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে গেট বন্ধ করে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল লনে চেয়ার পেতে প্রায় সব কাজিনরা বসে আছে।
ফাওয়াদও তাদের সাথেই ছিল। সে কোনো এক কথায় হাসছিল। শার্টের ওপরের বোতাম খোলা, দামী রিস্টওয়াচ পরা—তার পারফিউমের ঘ্রাণ এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল।
তারা চেয়ারগুলো বৃত্তাকারে সাজিয়ে বসেছিল। এটি ছিল নিদা, যে খুব আগ্রহ নিয়ে তার কথা শুনছিল।
আরজু আর ফায়িকাও সেই বৃত্তে উদাসীনভাবে বসে ছিল। রাজিয়া ফুপ্পুর মেয়ে ফায়িকা। সে-ও যেন ফাওয়াদকে এড়িয়ে চলছিল।
জেলে যাওয়ার পর তায়ি মেহতাব যত অজুহাতই দেখান না কেন, ফাওয়াদের গুরুত্ব এখন আর আগের মতো ছিল না।
সে বইগুলো বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত হাঁটতে লাগল।
"মেহমিল!" সে বারান্দার ধাপে পা রেখেছে, ঠিক তখনই ফাওয়াদ হঠাৎ তাকে ডাকল।
সে এক পা সিঁড়িতে রেখেই ঘাড় ঘোরাল। ফাওয়াদ হাসিমুখে তাকে দেখছিল।
"এসো বসো।"
"আমার কাজ আছে।" শুষ্ক কণ্ঠে এ কথা বলে সে বারান্দার দরজা পার হয়ে গেল। লনে বসে থাকা অনেকের মাঝে তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হলো।
"ওর সাহস হয় কী করে সবার সামনে আমাকে ডাকার! মাই ফুট।" সে পা আছড়ে ভেতরে এল।
লাউঞ্জে হাসানকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল, তারপর মাথা ঝাকিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগল।
"মেহমিল!" তার পা থেমে গেল, কিন্তু সে ঘুরল না।
"ফাওয়াদের প্রতিটি কথা কি তোমার বিশ্বাস হয়?"
"আমার তো আপনার ওপরও বিশ্বাস নেই।" তার গলা বুজে এল; দ্রুত এ কথা বলে সে দরজা খুলল এবং সজোরে নিজের পেছনে তা বন্ধ করে দিল।
হাসান আক্ষেপ ও অসহায়ত্বের সাথে কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মন্থর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
চলবে,,,,,,,

Comments
Post a Comment