মুসহাফ - পর্ব: ১২ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ১২
সে পিলারে হেলান দিয়ে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে ছিল। জুতো পাশে খোলা ছিল। সাদা সালোয়ার-কামিজ আর মাথায় গোলাপি স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধা; সে ঘাড় নিচু করে দুই হাতে ছোট কুরআন নিয়ে পড়ছিল।
ছুটি হয়ে গিয়েছিল এবং মেয়েরা এদিক-ওদিক দিয়ে বাইরে যাচ্ছিল। তাকে সূরা কাহাফ পড়তে হবে, আজ শুক্রবার ছিল।
"আসসালামু আলাইকুম!" সারা ধীরে ধীরে এল এবং তার সাথে পা ঝুলিয়ে সিঁড়িতে বসল।
সে পৃষ্ঠার কোণ ধরে মাথা নেড়ে সালামের উত্তর দিল এবং পৃষ্ঠা উল্টালো।
সারা নিজের কোলের ওপর রাখা অ্যাসাইনমেন্ট (Assignment) সমাধান করতে লাগল।
গেটের কাছে ফারিস্তে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সাথে কথা বলছিল। মেয়েটি মিনমিন করে কিছু বলছিল, কিন্তু ফারিস্তে না-সূচক মাথা নাড়ছিল।
তার সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় এবং অটল অথচ কোমল ভঙ্গি।
"কী করছ সারা?"
"ফারিস্তে বাজির অ্যাসাইনমেন্ট সলভ (Solve) করছি, ফারিস্তে বাজি দিয়েছেন।" সারা বিভ্রান্ত হয়ে মাথা তুলল।
"এই দীন আর মাযহাবের মধ্যে পার্থক্য কী?"
"দীন হলো রিলিজিয়ন (Religion), যেমন ইসলাম।
আর মাযহাব হলো কোনো দীনের নির্দিষ্ট কোনো 'স্কুল অফ থট' (School of thought)।
যেমন ইসলামের মধ্যে দুটি প্রধান মাযহাব রয়েছে—আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এবং আহলুত তাশাইয়ু (শিয়া)। মাসলাক হলো কোনো মাযহাবের ভেতরে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা পথ, যেমন ফিকহী মাসলাক—শাফেয়ি, হানাফি ইত্যাদি। বুঝেছ?"
"হুম। তোমার বোধশক্তি বেশ ভালো মেহমিল!"
"ফারিস্তে বাজি বুঝিয়েছিলেন সেদিন।" মেহমিল সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল।
ফারিস্তে তখনও একইভাবে কথা বলছিল। সারাও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদিকে তাকাল।
"ফারিস্তের আইজ (Eyes/চোখ) আমার খুব পছন্দ।" মেহমিলের ঠোঁট গলে কথাটি বেরিয়ে এল।
"হ্যাঁ, অনেক মিল আছে। আই নো (I know)।" সে ভীষণভাবে চমকে উঠল।
"মিল?" সে এক নিমেষে খুব উৎসুক হয়ে সারার দিকে ঘুরল।
"মিল আছে না সারা? ফারিস্তের চোখ দেখে আমার সবসময় মনে হয়েছে এগুলো কারোর সাথে খুব মেলে।
তুমি জানো কার সাথে মেলে?"
"তবে কি তুমি জানো না?" রাবেয়া অবাক হলো।
"ওদের কাজিনের সাথে?"
"কাজিন কে?"
"আরে ছাড়ো, তুমি বলো তো কার কার সাথে মেলে?"
রাবেয়া কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকে দেখল, তারপর হেসে দিল।
"তোমার সাথে মেলে মেহমিল! একদম তোমার মতো। তুমি কি আয়না দেখো না?"
"আমার সাথে—" মেহমিল স্তব্ধ হয়ে গেল।
নিজের চেহারা সবসময় চোখের সামনে থাকে না, সম্ভবত তাই সে এতদিন আন্দাজ করতে পারেনি।
মেয়েটির কোনো কথায় ফারিস্তে সামান্য হাসল। হাসার সময় তার চোখগুলো কোণা দিয়ে সামান্য ছোট হয়ে গেল। ঠিক তার নিজের মতো একধম হুবহু। সে পলকহীন চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
সে বেড ক্রাউনে হেলান দিয়ে, হাঁটুর ওপর বই রেখে চিন্তায় মগ্ন ছিল। বাদামী চুলগুলো খোলা কাঁধের ওপর ছড়িয়ে ছিল।
মুসাররাত ভেতরে ঢুকলেন, কিন্তু সে তখনও শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। শব্দ পেয়ে সে চমকে উঠল।
"আম্মা!...... কথা শুনুন।"
"হ্যাঁ বলো।" মুসাররাত আলমারি খুলে কিছু খুঁজছিলেন।
"আপনি মামুদের সাথে আর কখনো দেখা করেননি?"
"না।" তাঁর হাত মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর আবার কাপড় ওলটপালট করতে লাগলেন।
"মামুর তো একটাই মেয়ে, তাই না?"
"হ্যাঁ, সম্ভবত।"
"তার নাম কী?"
"জানি না, ও আমার বিয়ের পরে হয়েছিল।" তিনি প্রয়োজনীয় কাপড়টি নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
আর এটি তো সে জানত যে আম্মা বিয়ের পর মামাদের সাথে কখনো দেখা করেননি। এমনকি সে নিজেও কখনো তাঁদের সাথে মেলেনি।
সে তো তাঁদের দেখেনি পর্যন্ত। আম্মা আর আব্বার এটি পছন্দ করে করা বিয়ে ছিল। আর আম্মার পরিবারের লোকেরা তারপর আর কখনো যোগাযোগ রাখেনি। আজ ফারিস্তের চোখ দেখে তার কেন জানি মনে হয়েছিল যে হয়তো—কিন্তু থাক।
"আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।" বাইরে তায়ির উচ্চস্বরে বলার আওয়াজ শুনে হঠাৎ তার বুক ধড়ফড় করে উঠল।
সে বই বন্ধ করে লেপ সরিয়ে দ্রুত খালি পায়ে বাইরে এল। দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দেখল।
আগা জান এবং মেহতাব তায়ি বড় সোফায় অহংকারী ভঙ্গিতে বসে ছিলেন আর মুসাররাত তাঁদের সামনে যেন এক অসহায় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। দরজা খোলার আওয়াজে মুসাররাত তার দিকে তাকালেন। চোখে চরম অসহায়ত্ব আর জল।
"নিজের মেয়েকেও বলে দিও।" তায়ি তার দিকে এক গর্বিত দৃষ্টি দিলেন। "আমরা ওকে নিজের ঘরের বউ করছি, আমাদের এই এহসান (উপকার) তোমরা দুজনে মিলে সারা জীবন চাইলেও শোধ করতে পারবে না।"
সে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তবে কি ফাওয়াদ সত্যিই জেল থেকে বাইরে আসবে?
"কিন্তু ভাই......" মুসাররাতের অশ্রুসিক্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
"মেহমিল... মেহমিল কখনো মানবে না, ওয়াসিমের জন্য।"
"ওয়াসিম?" সে এক ঝটকায় দুই পা পিছিয়ে গেল।
আর এটি তো মাত্র কয়েক দিন আগের কথা, যখন ফরিদা ফুপ্পু বাড়িতে এসে খুব মজা নিয়ে ওয়াসিমের নিজের চোখে দেখা কিছু ঘটনা শুনিয়েছিলেন।
ফরিদা ফুপ্পু মেহমিলের আব্বার কাজিন ছিলেন এবং সব খবর পুরো বংশে সবার আগে তাঁর কাছেই পৌঁছাত। বাড়িতে তো তায়ি তাঁকে চুপ করিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এক সপ্তাহ পরেই এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি আবারও সেই কাসুন্দি ঘাটতে শুরু করলেন।
ফাওয়াদের গ্রেফতারির আলোচনা তখনও পুরনো হয়নি, এরই মাঝে বংশের লোকেরা আরেকটি নতুন রসদ পেয়ে গেল।
পুরো অনুষ্ঠানটি যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। তায়ি মেহতাব ওই মহিলাদের যত গালি দিতে পারতেন দিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন একা আর বিপরীতে ছিল পুরো দল। অর্থপূর্ণ দৃষ্টি আর বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গি।
"কিছু মনে করবেন না মেহতাব ভাই! কিন্তু ওয়াসিমকে আমার সামি-ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাত দুইটায় রাস্তা থেকে তুলে আপনার বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল।"
"হ্যাঁ, তো সামি নিজে ওই সময়ে ওখানে কী করছিল?" তায়ি হাত নেড়ে রাগে দিশেহারা হয়ে বলেছিলেন।
ওয়াসিমের কথা ছোটবেলা থেকেই আগা জানের চাচাতো ভাই আগা সিকান্দারের মেয়ের সাথে ঠিক করা ছিল। কিছুদিন ধরে আগা সিকান্দারের ফ্যামিলি (Family) কিছুটা দূরে দূরেই থাকছিল। আর যখন এই সব কথা জানাজানি হলো, তখন তারা ফোনেই সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করে দিল।
"অতীতের এক নির্বুদ্ধিতা ছিল মেহতাব ভাই! আমরা আমাদের মেয়েকে কীভাবে ওই ছেলের কাছে বিয়ে দিই যাকে পুরো বংশের কেউ নিজের মেয়ে দিতে রাজি নয়?"
"আর আমিও আপনাদের বংশের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে ওয়াসিমের কনের সাজে সাজিয়ে দেখাব।" তায়িও ক্ষিপ্ত হয়ে ফোনে জবাব দিয়েছিলেন।
মেহমিলকে কাবু করা, তার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া আর ওয়াসিমকে বিয়ে দিয়ে বংশের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শ্রেষ্ঠ সমাধান তায়ি পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এক তীরে তিন শিকার করে ফেলেছিলেন।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে মাথা নিচু করে দ্রুত রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চোখ দিয়ে টুপটুপ করে জল পড়ছিল। লম্বা সোজা বাদামী চুলগুলো কাঁধ থেকে পিঠের ওপর গড়িয়ে পড়ছিল। কোথায়, কোন দিকে—তার কিছুই জানা ছিল না।
জীবন তার সাথে এমনও করতে পারে, সে তো কল্পনাও করেনি। এক মরণফাঁস যেন তার গলার চারপাশ চেপে বসছিল।
বিষণ্ণ গাছগুলোর ঘন সারি আজও ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের পাখিরা ডালে ফিরে এসেছিল। রাস্তাটি তার পরিচিত ছিল। সে দ্রুত পা ফেলছিল, যখন তার কানে সেই আওয়াজটি এল।
"মেহমিল!"
কিন্তু সে থামল না, তাকে থামলে চলবে না, এটি থামার মতো কোনো পথ ছিলও না।
"মেহমিল!" সে দ্রুত দৌড়ে তার সাথে এসে মিলল। "কথা তো শোনো।"
হাঁপাতে হাঁপাতে তার বাম পাশে তার গতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিল হুমায়ুন।
ট্র্যাকস্যুট (Tracksuit) পরা ছিল সে, সম্ভবত জগিং থেকে ফিরছিল।
"কী হয়েছে মেহমিল? আমাকেও বলবে না?"
তার পা থেমে গেল। খুব ধীরে সে ঘাড় তুলল; সিক্ত সোনালী চোখ থেকে অনবরত জল পড়ছিল।
"আমার আর আপনার কী এমন সম্পর্ক যে আপনাকে বলব?"
"মানবতার কি কোনো সম্পর্ক নেই?"
"কিছুই নেই।" সে আবার দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
"কিন্তু হয়েছেটা কী?"
"আমার তায়ি আমার বিয়ে তাঁর বখাটে ছেলের সাথে ঠিক করে দিয়েছেন।"
"তো তুমি কাঁদছ কেন?"
"তবে কি আনন্দ করব?" সে পুরোপুরি তার দিকে ঘুরল।
তীব্র রাগ উথলে উঠেছিল। এই লোকটাই ছিল তার প্রতিটি বিপদের জন্য দায়ী।
"ঠিক আছে, তুমি সরাসরি না বলে দাও। অন্য কিছু করো, কিন্তু এভাবে নিজের ওপর জুলুম সহ্য করে কাঁদতে থাকলে তুমি গুমরে গুমরে মরে যাবে।" সে সিক্ত চোখে হুমায়ুনের চেহারা দেখল।
অহংকারী, কিন্তু চিন্তিত এক মুখ।
"আমি মরি বা বাঁচি, আপনার তাতে কী আসে যায়?"
তার এই ভঙ্গিতে সে কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর একটি গভীর শ্বাস নিল।
"হ্যাঁ, আমার কিছু আসে যায় না।" সে ফিরে চলল।
"হুহ," মেহমিল তাচ্ছিল্যের সাথে মাথা ঝাকালো।
"আপনি তো সেই মানুষই না, যে মাঝপথে ফেলে চলে যায়।" হুমায়ুন যেন চমকে ফিরে তাকাল।
সেই মুহূর্তে বাতাসের একটি তীব্র ঝাপটা এল। তার সিক্ত চেহারার চারপাশে ঝুলে থাকা চুলগুলো পেছনের দিকে উড়তে লাগল।
"আর আপনি জানেন হুমায়ুন! এই জন্যই আমি আপনার ওপর কখনো আশাই রাখিনি, তবে কি আমি কাঁদব না?" এ কথা বলে সেও ঘুরে দাঁড়াল।
বাতাসও ফিরে গেল, বিকেলের পাখিগুলোও ফিরে গেল।
সে নিথর হয়ে পিচ ঢালা নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। গাছগুলোর সারি তখনও বিষণ্ণ মনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে স্টাফ রুমের দরজায় হালকা টোকা দিল। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল, তারপর উত্তর না পেয়ে ভেতরে উঁকি দিল। স্টাফ রুম খালি ছিল।
সে বইগুলো বুকে জড়িয়ে দ্বিধাভরে ফিরে আসছিল। ঠিক তখনই সামনে থেকে এক গ্রুপ ইনচার্জকে (Group Incharge) আসতে দেখা গেল।
"আসসালামু আলাইকুম ম্যাম! ফারিস্তে কোথায়?"
"ফারিস্তে সম্ভবত লাইব্রেরিতে আছে, ওর কিছু কাজ ছিল তাই সে আজ আসেনি।"
"আচ্ছা।" সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।
লাইব্রেরির গ্লাস ডোর খোলা ছিল। সে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ভেতরে পা রাখল। বইয়ের উঁচু র্যাক আর দেয়াল জোড়া ফ্রেঞ্চ উইন্ডো (French window);
লাইব্রেরির সেই চিরচেনা নিস্তব্ধ পরিবেশ।
"ফারিস্তে?" সে নিচু স্বরে ডাকল। নিস্তব্ধ লাইব্রেরির পবিত্রতা যেন ক্ষুণ্ণ হলো, সে অপ্রস্তুত হয়ে চুপ হয়ে গেল।
"এদিকে।" লাইব্রেরিয়ান কোনো এক কোণ থেকে বেরিয়ে এসে এক দিকে ইশারা করলেন, সে লজ্জিত ভঙ্গিতে সেদিকে এগিয়ে গেল।
কয়েকটি র্যাক পার হয়ে সে অন্যদিকে উঁকি দিল।
সে বই হাতে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল;
হালকা গোলাপি সালোয়ার-কামিজে ধূসর ওড়না কাঁধের ওপর জড়ানো, ফারিস্তের পিঠ তার দিকে ফেরানো ছিল।
মেহমিল তার কোমরের ওপর ছড়িয়ে থাকা সোজা বাদামী চুলগুলো দেখতে পেল।
সে কিছুটা অবাক হয়েছিল। সে সবসময় ফারিস্তেকে হিজাব পরা অবস্থায় দেখেছে। মাথা ঢাকা ছাড়া সে সম্পূর্ণ আলাদা লাগছিল।
"ফারিস্তে?" সে চমকে ফিরল। মেহমিলকে দেখে হাসল। "আরে মাশাআল্লাহ! আজ তো লোকে লাইব্রেরিতে এসেছে।"
"কিন্তু শুধুমাত্র আপনার সাথে দেখা করতে।"
"বসো।" সে জানলার পাশের একটি চেয়ারে বসল, যার সামনে টেবিল ছিল। টেবিলের ওপাশে একটি খালি চেয়ার রাখা ছিল।
মেহমিল সেটি নিল এবং বইগুলো টেবিলের ওপর রাখল।
"হুমায়ুন আমাকে কিছু একটা বলেছিল।" সে কথা শুরু করতেই মেহমিল নীরবে তাকে দেখতে লাগল।
লম্বা সোজা বাদামী চুল যা সে কানের পেছনে গুঁজে রেখেছিল। দীপ্তিময় চেহারার মুখ আর কাঁচের মতো সোনালী চোখ—তার শারীরিক গঠন ভিন্ন ছিল, কিন্তু চোখ আর চুলগুলো এমন ছিল যেন সে আয়না দেখছে।
"তো তোমার বিয়ে কি তারা নিজের ছেলের সাথে ঠিক করে দিয়েছে?"
মেহমিল হালকা করে মাথা নেড়ে সায় দিল।
"তবে তুমি না বলে দাও।"
"না কার জন্য বলব? তার জন্য যে মাঝপথে ছেড়ে চলে যায়?" সে বলতে চাইল, কিন্তু পারল না। এটি তো সে এখনও নিজের মনের কাছেও বলেনি, ফারিস্তেকে কীভাবে বলবে?
"আমি কেন না বলব? আমি কি সবর করে প্রতিদান পাব না?"
"মেহমিল! মজলুম হওয়া আর সবর করার মধ্যে পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্য হলো নিজের জীবন নষ্ট করার বদলে প্রতিবাদ করার অধিকার রাখা। তুমি একটি ভালো পথ বেছে নাও, সরাসরি না বলে দাও।"
"আমার তাঁদের রিঅ্যাকশন (Reaction) নিয়ে ভয় লাগে।"
"এতে তুমি সবর করতে পারো।" সে মৃদু হাসল।
"আত্মীয়স্বজনের সাথে খুব সবরের সাথে মানিয়ে চলতে হয় মেয়ে।"
"আপনি কি সবর করেন?"
"মানে কী?"
"আপনার কি কোনো আত্মীয়স্বজন আছে ফারিস্তে? আপনার প্যারেন্টস (Parents)? আর হুমায়ুনের প্যারেন্টস..."
সে প্রশ্নটি অসম্পূর্ণ রাখল। জানত, ফারিস্তে অসম্পূর্ণ প্রশ্ন পড়তে জানত।
"আমার আম্মার একটাই বোন ছিলেন, হুমায়ুন তাঁরই ছেলে। তাঁর মৃত্যুর পর আম্মা হুমায়ুনকে দত্তক নিয়েছিলেন। এটি অনেক পুরনো কথা।
দেড় বছর আগে আমার আম্মা মারা যান। এরপর আমি আর হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নিলাম যে বাড়িতে হুমায়ুন থাকবে আর আমি হোস্টেলে থাকব।"
"আর আপনার আব্বু?"
"আমি যখন ম্যাট্রিকে পড়ি, তখন তিনি মারা যান।"
"আপনার আব্বুর কোনো বোন তো নিশ্চয়ই আছে?" সে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ল।
"হ্যাঁ। এক বোন আছেন।" ফারিস্তে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
"কোথায় থাকেন তিনি?"
"এই শহরেই থাকেন।"
"তিনি কি আপনার সাথে দেখা করেন?"
"না, কিছু সমস্যার কারণে তাঁরা আমার সাথে দেখা করেন না।"
"আর আপনি?"
"আমি তো চেষ্টা করি প্রতি ঈদে তাঁদের বাড়িতে যেতে, কিন্তু তাঁরা আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন।"
তারপর সে পলকহীন চোখে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে একটু এগিয়ে এল।
"তারপর আমি কেক আর ফুল দিয়ে ফিরে আসি। আমার সামর্থ্য এতটুকুই, এর বেশি আর কী করতে পারি?" সে সহজভাবে হাসল।
(কেক আর ফুল? ঈদগুলোতে অনেক জায়গা থেকে মিষ্টি, কেক আর ফুল আসত, সেগুলো কি তবে সে-ই পাঠাত?)
"আপনার ফুপ্পুর কয়টি সন্তান?"
"একটিই মেয়ে।" আর মেহমিল জানত, ফারিস্তে মিথ্যা বলে না। তার কৌতুহল যেন বাড়তেই থাকল।
"তার বয়স কত হবে?"
"আমার থেকে তো কয়েক বছরের ছোটই।"
"নাম কী?"
"এটি তো জরুরি নয় মেহমিল!" ফারিস্তে যেন কিছুটা অস্থির হয়ে উঠল।
"হতে পারে আমি আপনাদের ফ্যামিলিগুলোকে মেলাতে কোনো সাহায্য করতে পারি?"
"না।" ফারিস্তে গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে না-সূচক মাথা নাড়ল।
"তুমি আমার ফুপ্পুর মেয়েকে চেনো না।"
"তবুও..."
"আমরা কি টপিক চেঞ্জ (Topic change) করতে পারি?"
তার চিরচেনা অনড় আর চূড়ান্ত ভঙ্গির সামনে মেহমিল একটি গভীর শ্বাস নিয়ে দমে গেল।
"এই জানলাগুলো খুব সুন্দর।" এ কথা বলে সে চিন্তিত ভঙ্গিতে জানলার বাইরে নামতে থাকা ভোরের আলো দেখতে লাগল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
রাতে খাবারের পর সে সবার নিজ নিজ কামরায় চলে যাওয়ার অপেক্ষা করল। এমনকি লাউঞ্জে টিভির সামনে জমে বসা মেয়েরাও যখন একে একে উঠে যেতে লাগল এবং লাউঞ্জ খালি হয়ে গেল, তখন সে পা টিপে টিপে বাইরে বের হলো।
আজ তাকে আগা জানকে সরাসরি 'না' বলে দিতে হবে।
লাউঞ্জ অন্ধকারে ডুবে ছিল। আগা জানের বেডরুমের দরজার নিচ দিয়ে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে পা ফেলে দরজার কাছে এল। ঠিক যখন সে করাঘাত করতে যাবে, ভেতর থেকে আসা আওয়াজ তার হাত থামিয়ে দিল।
"এই মেয়ের পক্ষে সব সম্ভব। আজ আবার আমার অফিসে চলে এসেছিল।"
আগা জানের চিন্তামগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল।
"কে, ফারিস্তে?" তায়িয়ের অবাক করা সুর। "আবার কি সেই পুরনো কথা বলতে যে মেহমিলের সম্পত্তিতে তারও অংশ বের করে দিন?"
মেহমিলের মনে হলো, পুরো ছাদ বুঝি তার ওপর ধসে পড়েছে।
"হ্যাঁ, আজ সে অফিসে এসেছিল এবং এটিও বলছিল যে আমরা যদি ওয়াসিমের সাথে মেহমিলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি তবে..."
তায়া জান কিছু বলছিলেন এবং কয়েকদিন আগে পড়া একটি হাদিস তার কানে প্রতিধ্বনিত হলো, যার মর্মার্থ ছিল অনেকটা এমন—যদি কেউ তোমার বাড়িতে উঁকি দেয় এবং তুমি পাথর মেরে তার চোখ ফুটিয়ে দাও, তবে তোমার কোনো গুনাহ নেই।
"না!" সে ঘাবড়ে গিয়ে উঠল। তার দেখা উচিত নয়। সে ভুল করছে। সে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে উঁকি দিচ্ছে।
পরের মুহূর্তেই সে নিজের কামরার দিকে ছুটল। দরজার খিল লাগিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বিছানায় আছড়ে পড়ল এবং দুই হাতে মাথা চেপে ধরল।
'মেহমিলের সম্পত্তিতে ফারিস্তের অংশ?'
যদিও তার সন্দেহ ছিল যে ফারিস্তের সাথে তার কোনো সম্পর্ক অবশ্যই আছে এবং সম্ভবত—বরং নিশ্চিতভাবেই—সে তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মাতুলালয়ের আত্মীয়দের একজন।
কিন্তু তবুও তায়িয়ের মুখে তার নাম শুনে সে অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তার চেয়েও বড় ধাক্কা ছিল ফারিস্তের দাবিটি জেনে।
ফারিস্তে কি দাবি করেছে যে মেহমিলের অংশ থেকে তাকেও কিছু দেওয়া হোক? কিন্তু কেন? ফারিস্তে এমন কেন করবে?
তার চোখের সামনে একটি অবয়ব ভেসে উঠল।
কালো আবায়ায় আবৃত, ধূসর স্কার্ফে কোমল চেহারাটি বন্দি করে রাখা সোনালী চোখ জোড়া নিচু করা, দুই হাতে ছোট কুরআন ধরা, বলপয়েন্ট দিয়ে পৃষ্ঠায় কিছু একটা মার্ক (Mark) করছে ফারিস্তে।
সে কে ছিল? তার পুরো নাম কী ছিল? হুমায়ুনের সাথে তার খুব একটা মিল ছিল না কিন্তু মেহমিলের যাবতীয় খবর তার কাছে থাকত। সে কেন তার খবর রাখত? আর সে কেনই বা আগা জানের সাথে দেখা করত?
অনেক জট সে খুলতে পারছিল না, কিন্তু একটি কথা নিশ্চিত ছিল—ফারিস্তে সম্পর্কে যে মহৎ ধারণা সে মনে মনে তৈরি করেছিল, তা ধুলোয় মিশে চুরমার হয়ে গেল। না জানি কেন!
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে চিনা মাটির প্লেটগুলো সাবধানে ক্যাবিনেট থেকে বের করে কাউন্টারে রাখছিল, যখন কারো পায়ের শব্দে চমকে পেছনে ফিরল।
রান্নাঘরের খোলা দরজায় ফিজা চাচি দাঁড়িয়ে গভীরভাবে তাকে দেখছিলেন।
"জি চাচি?" সে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো।
তারপর এক নজর নিজের দিকে তাকাল। সাধারণ গোলাপি সালোয়ার-কামিজের ওপর কালো ওড়না কাঁধের চারপাশে জড়ানো, সিল্কি চুলগুলো উঁচু পনিটেইলে বন্দি—সে তো প্রতিদিনের মতোই লাগছিল, তবে চাচির কী হয়েছে?
"কিছু লাগবে চাচি?" সে আবার জিজ্ঞেস করল। ওনার দৃষ্টি এখন তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।
"হুম, না।" ফিজা চাচি মাথা ঝাকিয়ে ফিরে গেলেন। যাওয়ার সময় মেহমিল ওনার চেহারায় হালকা ঘৃণার আভাস দেখতে পেল।
'ওনার কী হয়েছে?' সে কাপড় দিয়ে প্লেটগুলো মুছতে মুছতে ভাবতে লাগল, তারপর কাঁধ নাচিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ডিনারের (Dinner) সময় হয়ে আসছিল এবং তাকে টেবিল সাজাতে হবে। সবাই এখনই চলে আসবে।
"আমি এবং মুসাররাত ওয়াসিম আর মেহমিলের বিয়ে ঠিক করেছি, আপনারা সবাই নিশ্চয়ই তা জানেন।" সে রাইতার বাটি টেবিলে রাখছিল, তখন আগা জান সবাইকে সম্বোধন করে কথাটি বললেন।
ডাইনিং হলে নীরবতা নেমে এল। যদিও সবাই জানত, তবুও সবাই চুপ ছিল। সে মাথা নিচু করে নিজের শেষ চেয়ারটিতে এসে বসল এবং প্লেটটি নিজের দিকে টেনে নিল।
"এই সিদ্ধান্ত কি আপনারা নিজেদের মধ্যেই নিয়ে নিয়েছেন নাকি মুসাররাত চাচিকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করেছেন?"
হাসানের বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠ সবাইকে চমকে দিল। মেহমিলও অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা তুলে তাকে দেখল, যে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে আগা জানের দিকে তাকিয়ে ছিল।
"মানে কী? মুসাররাতের মর্জিতেই কি এই বিয়ে হচ্ছে?" আগা জান রাগান্বিতও হলেন আবার অবাকও হলেন।
"কেন চাচি?" সে নীরবে মাথা নিচু করে বসে থাকা মুসাররাতকে সম্বোধন করল।
"আপনি কি এই ওয়াসিমের সাথে বিয়েতে রাজি, যাকে বংশের কেউ নিজের মেয়ে দিতে রাজি নয়?"
মুসাররাতের নত মাথা আরও নুয়ে গেল। ফিজা বিরক্ত হয়ে নড়েচড়ে বসলেন।
"বলুন চাচি! আপনি যদি চুপ থাকেন তবে তার মানে হলো আগা জান আপনার ওপর জোর খাটিয়েছেন।"
"কী আবোল-তাবোল বকছ হাসান?"
"আগা জান! আমাকে মুসাররাত চাচির সাথে কথা বলতে দিন।" হাসানের কণ্ঠস্বর চড়ছিল। সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকে দেখছিল।
"বলুন চাচি! আপনার কি এই বিয়ে পছন্দ?"
"না।" মেহমিল দৃঢ়ভাবে বলল। সে জানত তার মা কিছু বলতে পারবে না।
সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। এমনকি হাসানও কিছুটা থমকে গেল।
"তুমি মাঝখানে কথা বোলো না।" আগা জান ক্ষিপ্ত হলেন।
"মা যদি এখনও না বলেন তবে নিকাহর সময় আমি অস্বীকার করে দেব। এই
অধিকার আমার দীন আমাকে দিয়েছে। আপনারা যদি আমার ওপর জবরদস্তি করেন তবে আমি আদালত পর্যন্ত চলে যাব।"
"কিন্তু ওয়াসিমকে নিয়ে তোমার সমস্যা কী?" গুফরান চাচা বিরক্ত হলেন। একই বিরক্তি ফিজার চেহারায়ও ছিল।
"ওয়াসিম যদি এতই ভালো হয় তবে গুফরান চাচা! আপনি নাদিয়া বা সামিয়া বাজির বিয়ে কেন তার সাথে দিয়ে দিচ্ছেন না?"
অনেক দিন পর পুরো পরিবার পুরনো মেহমিলকে দেখেছিল।
"শাট আপ (Shut up)!"
"আমি মানা করে দিয়েছি। আপনাদের যদি আরও অপমানিত হওয়ার শখ থাকে তবে আমি নিকাহর অনুষ্ঠানে এর চেয়েও জোরালোভাবে মানা করব।"
"আরে শোকর করো যে আমরা তোমাকে ঘরের বউ করছি।" অনেকক্ষণ চুপ করে থাকা মেহতাব তায়ি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। "যে মেয়ে এক রাত ঘরের বাইরে থেকেছে তাকে কেউ গ্রহণ করে না। আমরা বউ না বানালে কে গ্রহণ করবে তোমাকে?"
"আমি।" হাসান যেন ফেটে পড়ল। "আমি মেহমিলকে গ্রহণ করব। সে ওয়াসিমকে বিয়ে করতে চায় না, আমি নিজের নাম মুসাররাত চাচির সামনে রাখছি। আর চাচি! আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকব।"
"কখনোই নয়।" ফিজা ফেটে পড়লেন।
"আমি এই মেয়েকে কখনোই মেনে নেব না যে কারো সাথে পালিয়ে গিয়েছিল।"
"আম্মি!" সে জোরে চিৎকার করে উঠল।
মেহমিলের পক্ষে আর শোনা সম্ভব হলো না, সে চেয়ার ঠেলে দৌড়ে ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ব্রিগেডিয়ার ফুরকানের বাংলো, যার টেরাসে বোগানভিলিয়া লতার রাজত্ব ছিল—আজও সেটি তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষণ্ণ আর জনমানবহীন মনে হলো।
আসলে বাসিন্দার নিজে কুরআন পড়া আর বাড়িকে কেবল সাজিয়ে রাখার মধ্যে তো পার্থক্য থাকেই।
আজ আবারও সে হাতে কয়েকটি প্যামফ্লেট নিয়ে তাদের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল।
বেলে চাপ দিতেই চাকরটি দৌড়ে ছোট দরজা খুলল।
"জি বিবি?" সে মাথা বাইরে বের করল।
"আমাকে ব্রিগেডিয়ার ফুরকানের সাথে দেখা করতে হবে, তিনি ভেতরে আছেন?"
"জি, তিনি কাজ করছেন।"
"তাঁকে বলো মেহমিল এসেছে।" কিছুটা দৃঢ় কণ্ঠে বলে সে বুকের ওপর হাত বেঁধে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। চাকরটি তৎক্ষণাৎ ভেতরে দৌড়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই সে ফিরে এল।
"সাহেব বলছেন আপনি আপনার কাগজগুলো নিয়ে নিন।" সে পুরনো প্যামফ্লেটগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
"তিনি কি এগুলো পড়েছেন?"
"না জি, তিনি ব্যস্ত আছেন।"
"আপনার সাহেবকে বলো, এগুলো তাঁর কাছে আমার আমানত ছিল। যখন তিনি নিয়েছিলেন তখন আমার দেওয়া দায়িত্বও তাঁকে পালন করতে হতো, নয়তো নেওয়ার সময়ই মানা করে দিতেন।
তিনি খেয়ানত করে এগুলো ফেরত দিয়েছেন। আর আমি যদি ক্ষমা না করি তবে তিনি ক্ষমা পাবেন না।"
চাকরটি বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ভেতরে ছুটল।
"সাহেব আপনাকে ভেতরে ডাকছেন।" সে সংবাদ নিয়ে শীঘ্রই ফিরে এল।
"ধন্যবাদ।" সে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে ভেতরে এল।
স্টাডি রুমের দরজা খোলা ছিল। মেহমিল দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আঙুলের উল্টো পিঠ দিয়ে টোকা দিল।
স্টাডি টেবিলের পেছনে রিভলভিং চেয়ারে (Revolving chair) বসা ব্রিগেডিয়ার ফুরকান বই থেকে মাথা তুললেন এবং চশমার ওপর দিয়ে তাকে দেখলেন যে দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইউনিফর্মের সাদা সালোয়ার-কামিজ আর চেহারার চারপাশে নিপুণভাবে জড়ানো সতেজ গোলাপি স্কার্ফ যা পেছনের উঁচু পনিটেইলের কারণে সামান্য উঁচিয়ে ছিল।
হাতে কয়েকটি প্যামফ্লেট ধরা সেই দীর্ঘাঙ্গী, সোনালী চোখের মেয়েটি অপেক্ষমাণ দাঁড়িয়ে ছিল।
"কাম ইন (Come in)।" ব্রিগেডিয়ার ফুরকান চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন, বই বন্ধ করলেন এবং চেয়ারে কিছুটা পেছনে হেলান দিলেন।
"আমি কিছু প্যামফ্লেট দিয়ে গিয়েছিলাম।"
"আর আমি সেগুলো ফেরত দিয়েছিলাম। আর কিছু?" তাঁর গম্ভীর চেহারায় কিছুটা বিরক্তি ছিল।
"জি, এগুলো আরও কিছু।" সে সামনে এগিয়ে গিয়ে কয়েকটি প্যামফ্লেট তাঁর টেবিলে রাখল।
"এগুলো আপনি পড়ে আমাকে ফেরত দেবেন।"
"কিন্তু আমার এগুলোর প্রয়োজন নেই।" তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন।
"আমি আপনাকে চয়েস (Choice) দিইনি স্যার! আপনাকে এগুলো নিতেই হবে। আমি কিছুদিন পর এসে ফেরত নিয়ে যাব।
পড়ে সাবধানে রাখবেন, এগুলোতে আল্লাহর নাম লেখা আছে। আশা করি আপনি এগুলো ফেলে দেবেন না।" সে দাঁড়িয়ে থেকেই কথাগুলো বলে দ্রুত ফিরে চলল।
ব্রিগেডিয়ার ফুরকান বিরক্ত হয়ে প্যামফ্লেটগুলোর দিকে একবার তাকালেন, তারপর ড্রয়ারে রেখে নিজের চশমাটা তুললেন এবং বিড়বিড় করতে করতে আবার বই খুলে বসলেন।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে আপন মনে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, হঠাৎ অন্য দিক থেকে আসা ফারিস্তের ওপর নজর পড়তেই তার ঠোঁট কামড়ে ধরল এবং অজান্তেই পেছনে সরে গেল।
ফারিস্তে তাকে দেখেনি। সে তার সাথে থাকা একজন শিক্ষিকার সাথে চিন্তিত ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে আসছিল। মেহমিল উল্টো পায়ে ফিরে গেল এবং বারান্দায় মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার প্রত্যাশা মতোই ফারিস্তে তার উপস্থিতি খেয়াল করেনি। সাথী শিক্ষিকার সাথে সে নিচে প্রেয়ার হলের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছিল।
প্রেয়ার হলে দেশের প্রখ্যাত দ্বীনি স্কলার ডক্টর সরওয়ার মির্জার লেকচারের আয়োজন ছিল। সে-ও মন্থর গতিতে হেঁটে গিয়ে মাঝখানের সারির একটি আসনে বসল। লেকচার তখনও শুরু হয়নি। মেহমিল হাতে থাকা পকেট সাইজ কুরআনটি খুলল এবং পড়ার জন্য পাতা ওল্টাতে লাগল।
'ফারিস্তে এমন কেন করল?'—এই প্রশ্নটি অনবরত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে কেন আগা জানের কাছে মেহমিলের সম্পত্তি থেকে অংশ চাইল? ফারিস্তের মতো মেয়ে এত বস্তুবাদী হতে পারে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
সে নির্ধারিত পৃষ্ঠা উল্টে সেই আয়াতগুলো বের করল যা আজ পড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু ডক্টর সরওয়ারের লেকচারের কারণে আজ তাফসির ক্লাস হওয়ার কথা ছিল না।
মেহমিলের নজর একটি আয়াতের ওপর গিয়ে স্থির হলো:
সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ১০১ (অংশবিশেষ)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ
(**ইয়া-আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানূ লা তাসআলূ আ’ন আশইয়া-আ ইন তুবদা লাকুম তাসু’কুম।**)
> "হে মুমিনগণ! তোমরা ওইসব জিনিস সম্পর্কে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের সামনে প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।"
>
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহমিল কুরআন বন্ধ করল। 'আমার তো কোনো কিছুই ব্যক্তিগত (private) নেই।' সে ধীরে ধীরে ঘাড় ওপরের দিকে তুলল এবং ওপরের দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা ঝাকালো। যখনই এমন কিছু হতো, কুরআনের ওপর তার প্রচণ্ড ভালোবাসা আসত।
তার মনে হতো, পৃথিবীতে এর চেয়ে দ্রুততর কোনো যোগাযোগ মাধ্যম (communication mode) আবিষ্কৃত হয়নি।
'কিন্তু এমন কী আছে যে প্রশ্নের উত্তর শুনলে আমার খারাপ লাগবে?' সে না চাইতেও আবার ভাবতে লাগল।
ডক্টর সরওয়ার লেকচার শুরু করেছেন। পুরো হল কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। দূর দূর পর্যন্ত গোলাপি স্কার্ফে ঢাকা মাথা দেখা যাচ্ছিল। স্টেজের কাছে চেয়ারে স্টাফরা বসা ছিলেন।
ফারিস্তেও সেখানে একটি চেয়ারে বসে ডায়েরিতে দ্রুত লেকচার নোট করছিল। তাকে নোট নিতে দেখে মেহমিল নিজেও চমকে ডক্টর সরওয়ারের দিকে মনোযোগী হলো, যিনি রোস্ট্রামে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথায় জিন্নাহ ক্যাপ, সাদা দাড়ি, সালোয়ার-কামিজ ও কটি (waistcoat) পরা তিনি বেশ অভিজ্ঞ একজন স্কলার ছিলেন। সে প্রায়ই তাকে টিভিতে দেখত।
চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলে সে মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনতে লাগল।
"কিছু মানুষ কুরআন পড়ে পথভ্রষ্ট হয়, বাস্তবে এমনটা ঘটে থাকে," তিনি তার বিশেষ ভঙ্গিতে বলছিলেন। "তাই ভালো হয় যদি জীবনে অন্তত একবার কোনো নিরপেক্ষ আলেমের কাছে কুরআন পড়া যায়।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে কারও আঁচল ধরে থাকা জরুরি। না, বরং কোনো নিরপেক্ষ তাফসির পড়েও কিছুটা হলেও কুরআনের বোধশক্তি অর্জন করা সম্ভব। কুরআন পড়ে আমরা প্রতিটি আয়াতের নিজ নিজ পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেক অর্থ বের করি; সেই অর্থ বের করা ভুল নয়, তবে জাহিরকে (প্রকাশ্য) বাতিনের (গোপন) সাথে তুলনা করা একেবারেই ভুল। যেমন—বনী ইসরাঈলকে গরু জবাই করার যে আদেশ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মূসা (আ.)-এর মাধ্যমে দিয়েছিলেন, তা আমরা সবাই জানি।
এই ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা নিতে পারি যে অতিরিক্ত প্রশ্ন করলে আদেশ অস্পষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু এর মানে এই নয় যে ওখানে 'গরু' বলতে জনৈক নারী সাহাবীকে বোঝানো হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ, কিছু মানুষ আসলেই এখানে 'গরু' বলতে একজন সাহাবীকে বুঝিয়েছেন।
আরেকটি উদাহরণ, সূরা হিজরের শেষ আয়াতে আছে যে—'তোমার রবের ইবাদত করো যতক্ষণ না তোমার কাছে ইয়াকীন (নিশ্চয়তা) আসে।'
এখন এখানে 'ইয়াকীন' বলতে 'মৃত্যু' বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যু আসা পর্যন্ত ইবাদত করতে থাকো। কিন্তু কিছু মানুষ এখানে 'ইয়াকীন' বলতে 'বিশ্বাস' (belief) বুঝে নিজের ইবাদতকে যথেষ্ট মনে করে ক্ষান্ত দেয় যে—আমাদের ইবাদতের ওপর বিশ্বাস চলে এসেছে, তো সব ইবাদত এখন শেষ।"
'সূরা হিজর কোথায় যেন?' সে ধীরে ধীরে নিজের ছোট কুরআনটি খুলল এবং পাতা উল্টাতে লাগল। সূরা হিজর পেলে সে তার শেষ আয়াতগুলো বের করল। আয়াতটি তাই ছিল যা তিনি বলছিলেন। কিন্তু শেষ তিনটি শব্দ আরবিতে ছিল—*হাত্তা ইয়াতিয়াকাল ইয়াকীন* (যতক্ষণ না ইয়াকীন আসে)।
'ইয়াকীন?' সে 'আল-ইয়াকীন' শব্দের ওপর আঙুল বুলালো, তারপর মাথা তুলে ডক্টর সরওয়ারকে দেখল। তিনি বলছিলেন—
"এখানে ইয়াকীন বলতে ইয়াকীন নয় বরং মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। সুতরাং এই ধরনের শব্দের মনগড়া অর্থ বের করা মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। এনি কোশ্চেন (Any question)?" তিনি থেমে হলের ওপর এক গভীর দৃষ্টি বুলালেন।
মেহমিল শূন্যে হাত তুলল।
"বলুন," তিনি মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন।
সে হাতে কুরআন নিয়ে নিজের আসন থেকে উঠল।
"স্যার! আমার একটি কথা বোধগম্য হয়নি। আমার কাছে অনুবাদ ছাড়া মুসহাফ আছে।
এতে উল্লিখিত আয়াতে প্রকৃতপক্ষে 'ইয়াকীন' শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর অর্থ 'মৃত্যু' কীভাবে হলো? দুটি শব্দের মধ্যে তো বেশ পার্থক্য রয়েছে।"
"এর অর্থ মৃত্যু এ কারণে যে—" তিনি একটু থামলেন এবং গভীরভাবে তাকে দেখলেন।
"আমি এর অর্থ মৃত্যু বের করেছি।"
"জি স্যার! আমার ঠিক এটাই প্রশ্ন যে কীভাবে? এর দলিল কী?"
"দলিল হলো আমি, অর্থাৎ ডক্টর সরওয়ার মির্জা এর অর্থ মৃত্যু নিয়েছি।
আমি এই দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামিক স্কলার। আপনি আমার ক্রেডেনশিয়ালস (credentials) দেখুন, আমার ডিগ্রিগুলো দেখুন। আমার কথা কি একটি অকাট্য দলিল হিসেবে যথেষ্ট নয়?"
আগের সারিতে বসা মেয়েরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে লাগল যে হাতে ছোট কুরআন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
"স্যার! আপনার কথা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কুরআনের কিছু অংশ অন্য অংশের তাফসির করে, হাদিসও তাই করে।
কুরআন বা হাদিসে কি কোথাও উল্লেখ আছে যে এখানে 'ইয়াকীন' বলতে মৃত্যু বোঝানো হয়েছে?" সে অত্যন্ত বিনয় ও শিষ্টাচারের সাথে জিজ্ঞেস করছিল। ডক্টর সরওয়ারের চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠল।
"অর্থাৎ আমি যদি আপনাকে এই অর্থের দলিল না দিই, তবে একে স্রেফ আমার কথা মনে করে আপনি প্রত্যাখ্যান করবেন? অর্থাৎ আপনার আমার কথার ওপর আরও কোনো দলিল চাই?"
"জি!" সে মৃদুভাবে মাথা নাড়ল।
পুরো হলে অস্থিরতার ঢেউ বয়ে গেল। মেয়েরা কিছুটা চিন্তিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল।
"অর্থাৎ আপনি একজন দ্বীনি স্কলারকে চ্যালেঞ্জ (challenge) করছেন?"
"স্যার! আমি খুব বিনয়ের সাথে শুধু দলিল চাচ্ছি।"
"যদি এর দলিল কুরআন ও হাদিসে না থাকে, তবে কি আপনি 'ইয়াকীন' মানে 'মৃত্যু' মেনে নেবেন না?"
"না স্যার! কখনোই না।"
"হুম।" ডক্টর সরওয়ার একটি গভীর শ্বাস নিয়ে হলের ওপর নজর বুলালেন। "আর কেউ আছে কি যে নিজের বয়সের চেয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন স্কলারকে চ্যালেঞ্জ করবে? আর কারও দলিল লাগবে?"
অনেক মাথা না-সূচক নড়ল। সে একাই দাঁড়িয়ে ছিল।
"অর্থাৎ তিনশ মেয়ের মধ্যে কেবল
একজনের দলিল চাই? এই কি শেখাচ্ছেন আপনারা এই মসজিদে? আপনাদের ক্লাস ইনচার্জ কে?"
ম্যাডাম মিসবাহ উঠে দাঁড়ালেন।
"আপনি কি এই ব্যর্থ ক্লাস রিপোর্টের দায়িত্ব নিচ্ছেন? ওয়ান আউট অফ থ্রি হান্ড্রেড (One out of three hundred)?"
"জি স্যার," ম্যাডাম মিসবাহর মাথা কিছুটা নুয়ে গেল। ডক্টর সরওয়ার মেহমিলের দিকে তাকালেন।
"আপনার কি এখনও দলিল চাই?"
"জি স্যার!"
তিনি কিছুক্ষণ নীরবে তার চেহারা দেখলেন, তারপর হালকা হাসলেন।
"সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত ৪৩-৪৭ এ 'ইয়াকীন' শব্দটি মৃত্যুর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। সেখান থেকেই আমরা দলিল নিই যে এখানেও ইয়াকীন বলতে মৃত্যু বোঝানো হয়েছে।
আমি আনন্দিত যে আপনি প্রভাবিত না হয়ে আদবের গণ্ডিতে থেকে আমার কাছে দলিল চেয়েছেন, আর আমি দুঃখিত যে কেবল একটি মেয়ে এই সাহস দেখাল।
বাকি সবাই চুপ রইল। দুইশ নিরানব্বইজন মেয়ের মধ্যে নিশ্চয়ই এখনও এই অভাব রয়েছে যা একটি কুরআন ক্লাসের ব্যর্থ পারফরম্যান্সের প্রমাণ।
কেউ যদি ডিগ্রির পাহাড় নিয়ে আপনার সামনে আসে, নিজেকে সবচেয়ে বড় দ্বীনি স্কলার দাবি করে, তবে কি আপনি তার কথাকে দলিল হিসেবে মেনে নেবেন?
আপনাদের কি প্রথম দিনই বলা হয়নি যে দলিল শুধু কুরআন বা হাদিস হয়?
কোনো আলেমের কথা দলিল নয়, তবে?"
অনেক গোলাপি স্কার্ফ পরা মাথা নিচু হয়ে গেল। মেহমিল গর্বের সাথে নিজের আসনে বসল। ডক্টর সরওয়ার আরও অনেক কিছু বলছিলেন, কিন্তু সে সূরা মুদ্দাসসির খুলে সেই আয়াতটি কাউন্টার চেক (counter-check) করছিল।
(সূরা মুদ্দাসসিরের ৪৩-৪৭ আয়াতের অনুবাদ ডক্টর সরওয়ারের কথার সত্যতা নিশ্চিত করছিল।)
"মেহমিল!"
লেকচারের পর সে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল, যখন ফারিস্তে তাকে পেছন থেকে ডাকল। তার পা সেখানেই থেমে গেল কিন্তু সে ঘুরল না। ফারিস্তে দ্রুত হেঁটে তার কাছে এল।
"আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মেহমিল (I am proud of you Mehmil)!" সে নিশ্চয়ই খুব খুশি ছিল। ধূসর স্কার্ফে বন্দি তার চেহারাটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
মেহমিল অপরিচিত দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগল।
"ডক্টর সরওয়ার তোমার ওপর খুব খুশি। তিনি একটি সেমিনারের জন্য তোমার নাম দিয়েছেন, আর তুমি আমার সাথে ওখানে গিয়ে স্পিচ (speech) দেবে।"
"আপনার সাথে...?" সে যখন কথা বলল, তার কণ্ঠে শরৎের মতো শুষ্কতা ছিল।
"তবে আমাকে আপনি চেনেন না।"
"মানে কী?" ফারিস্তের হাসি প্রথমে ফিকে হয়ে গেল, তারপর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
"আমি মিথ্যাবাদী মানুষকে একদম পছন্দ করি না।"
"মেহমিল!" সে হতভম্ব হয়ে গেল। "আমি কোন মিথ্যা বলেছি?"
"এই প্রশ্নটি আপনি নিজেকে কেন করছেন না?"
"তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?"
"আমি ছোট বাচ্চা নই ফারিস্তে!" সে যেন ফেটে পড়ল। ভেতরে জমে থাকা লাভা বাইরে বের হওয়ার রাস্তা পেয়ে গিয়েছিল।
"আপনি কেন গিয়েছিলেন আমার আগা জানের কাছে? তিনি আপনার কী হন?
আমি একজন এতিম মেয়ে, আপনি কি এতিমের সম্পদ থেকে অংশ চান? কেন করলেন এমন কাজ? আপনাকে না জানি কোন উঁচাসনে বসিয়ে রেখেছিলাম আমি, খুব বিশ্রিভাবে নিজেকে নিচে নামিয়েছেন আপনি।
আমি ভাবতেও পারিনি আপনি এমন করবেন। আপনার সাথে আমার কী সম্পর্ক? আপনি মিথ্যা বলেন না কিন্তু সত্য গোপন করাও তো মিথ্যারই শামিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার ফুপ্পুর মেয়ের নাম কী, আপনি বলেননি। কেন? কেন শেষে?"
ফারিস্তের চেহারা সাদা হয়ে গিয়েছিল। আবেগহীন, একদম নিথর, স্থির। সে পলক না ফেলে মেহমিলকে দেখছিল। কতক্ষণ সে কিছুই বলতে পারল না, তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট খুলল।
"কারণ আমার ফুপ্পুর মেয়ের নাম ফায়িকা।"
"জি?" তার মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠল।
"আমি বলেছিলাম না যে তুমি জানো না।
আমার ফুপ্পুর মেয়ের নাম ফায়িকা। আমি ফারিস্তে ইব্রাহিম, আগা ইব্রাহিমের মেয়ে।
যাও, নিজের বাড়িতে কাউকে জিজ্ঞেস করো। কিন্তু তারা কেন বলবে? তারা যখন আমার অস্তিত্বই স্বীকার করে না, তবে বলবে কীভাবে?"
সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে কথাটি বলে তার একপাশ দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
মেহমিল ঘুরে তাকে যেতেও দেখতে পারল না। সে যেন ওখানেই বরফের মূর্তিতে পরিণত হয়েছিল।
ধোঁয়ার মতো অন্ধকার হয়ে আসা চেহারায় সে করিডোরের মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
'ফারিস্তে ইব্রাহিম।'
'আগা ইব্রাহিমের মেয়ে।'
পুরো মসজিদে সে এই কয়েকটি শব্দের প্রতিধ্বনি বারবার ফিরে শুনতে পাচ্ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে জানে না কোন পায়ে ভর করে সে মসজিদের গেট পর্যন্ত এসেছিল। সে কেবল একটি পাথরের মূর্তির মতো নিজেকে টেনেহিঁচড়ে সব কিছু থেকে উদাসীন হয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।
তার ব্যাগ আর বইপত্র ক্লাসেই রয়ে গিয়েছিল। সে সেগুলো সাথে নেয়নি। তার মনে হচ্ছিল যে তার অনেক কিছু মসজিদে হারিয়ে গেছে, সে আর কী কী গুছিয়ে নিত?
পাশের বাংলোর দেয়ালের সাথে লাগানো বেঞ্চের ওপর সে ধপাস করে বসে পড়ল।
"আগা ইব্রাহিমের মেয়ে ফারিস্তে ইব্রাহিম।"
তার মস্তিষ্ক এই দুটি বাক্যের ওপরই জমে গিয়েছিল। না সামনে বাড়ছিল, না পেছনে সরছিল।
সুদূর কোনো স্মৃতির পর্দায় আগা জানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"এই মেয়ের পক্ষে সব সম্ভব। আজ আবার আমার অফিসে চলে এসেছিল।"
'আবার এসেছিল।' তার মন যেন চমকে উঠে জাগ্রত হতে লাগল।
'আবার' মানে হলো সে আগেও সেখানে যেত। তারা সবাই তাকে চিনত। আর হয়তো তাকে ভয়ও পেত।
তবে কি সে সত্যিই আগা ইব্রাহিমের মেয়ে ছিল?
"না!" সে চরম ঘৃণায় মাথা ঝাকালো।
"আগা ইব্রাহিমের শুধু একটিই মেয়ে আছে, আর সে হলো মেহমিল ইব্রাহিম।
আমার কোনো বোন নেই। আমি মানি না।"
সে সজোরে না-সূচক মাথা নাড়ছিল। তার মনে হচ্ছিল আজ বুঝি তার মস্তিষ্কের শিরা ফেটে যাবে। রাগ যেন তার ভেতর থেকে উথলে উঠছিল।
'সত্যিই কি সে আব্বার মেয়ে? কিন্তু তার মা কে? আমার মা তো নয়। কিন্তু আমাকে কে বলবে?
আগা জান আর তায়ি তো কক্ষনো বলবে না। আম্মা হয়তো জানেনও না। তবে কাকে জিজ্ঞেস করব?'
সে দিশেহারা হয়ে দুই হাতের ওপর মাথা এলিয়ে দিল। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই এক ঝটকায় মাথা তুলল।
"হুমায়ুন!" এরপর সে আর কিছুই ভাবল না এবং গেটের দিকে ছুটল।
চলবে,,,,,,,

Comments
Post a Comment