মুসহাফ - পর্ব: অন্তিম পর্ব (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- অন্তিম পর্ব
তিনি আংটিটি উনার নিজের পুত্রবধূর জন্য... রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন।
তিনি সেটি আমাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। আমার মা তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতেন, কিন্তু চুপ ছিলেন। তিনি সময় সুযোগমতো হুমায়ুনের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই সময় আর আসেনি। আসতে পারেনি।
মা মারা যাওয়ার পর আমি চুপচাপ মসজিদে চলে গেলাম। আমি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি যে হুমায়ুন কখনও তো এই আংটিটির কথা জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সে করেনি। এরপর আমি সবর (ধৈর্য) করলাম, কিন্তু অপেক্ষা তো আমার ছিলই। আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের নামের সাথে ওর নাম শুনেছিলাম, আমার মনে হতো ওর ওপর শুধু আমারই হক।
আর যখন একদিন হুমায়ুন আমাকে বলল যে আমার বিয়ের কথা ভাবা উচিত, তখন আমি ওকে খালার ইচ্ছার কথা জানানোর কথা ভাবলাম।
সেই রাতে আমি অনেকক্ষণ মসজিদের ছাদে বসেছিলাম এবং যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না, তখন দোয়ায়ে নূর পড়তে লাগলাম। তুমি কি জানো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়ার একটি অংশ সেজদায় পড়তেন।
আর এই দোয়া কুরআন বুঝতে সাহায্য করে। আমি যখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারতাম না, এই দোয়াটি পড়তাম। সেই রাতেও আমি পড়ে শেষ করেছি মাত্র, অমনি তুমি আমাদের ছাদে এলে এবং এরপর তুমি আমাদের জীবনেও চলে এলে।
আমি আজ পর্যন্ত তোমার জন্য যা কিছু করেছি, তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছি। আমার মনেও নেই যে আমি কী কী করেছিলাম। এরপর যখন আমি হুমায়ুনকে তোমার জন্য হাসতে দেখলাম আর ওর জন্য তোমার চোখে এক বিশেষ ঔজ্জ্বল্য দেখলাম, তখন আমি ভাবলাম তোমাকে সব জানিয়ে দিই।
তোমার মনে আছে, যখন হাসপাতালে তুমি হুমায়ুনকে দেখতে এসেছিলে, তখন আমি তোমাকে বলতে যাচ্ছিলাম? কিন্তু তুমি শোনোনি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি পেছনে সরে যাব।
কুরবানি দিয়ে দেব। তখন আমার জীবন, আমার মরণ, আমার নামাজ আর আমার কুরবানি ছিল শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। আমি সবকিছু খুব স্বচ্ছ হৃদয়ে করেছি।
নিজে দাঁড়িয়ে তোমাদের বিয়ে করিয়েছি এবং নিজের জায়গায় আমি সন্তুষ্ট ছিলাম, কিন্তু...
যখন তোমার এক্সিডেন্ট (Accident) হলো আর আমি পাকিস্তানে ফিরে এলাম, তখন আমার প্রথমবার মনে হলো যে হয়তো তুমি বেঁচে থাকবে না, আর হুমায়ুন আমার নসিব (ভাগ্য)। এর বাইরে কিছু ভাবতেও আমি ভয় পেতাম। তাই ফিরে গেলাম।
কিন্তু হুমায়ুন যখনই কল (Call) করত আর তোমার হতাশাজনক অবস্থার খবর দিত, তখন আমার মনে হতো এটাই হয়তো তকদীর। হয়তো তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। তখন হুমায়ুন আমার কাছে ফিরে আসবে।
আমার মনে হলো, আমার কুরবানি কবুল হয়ে গেছে। এর ইনাম (পুরস্কার) আমাকে দেওয়া হচ্ছে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে সেই কুরবানি তো আল্লাহর জন্য ছিল, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ছিল; দুনিয়া বা হুমায়ুনের জন্য তো ছিল না।
কিন্তু তোমার দিক থেকে আমরা এতটাই হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম যে ধীরে ধীরে আমি সবকিছু ভুলতে লাগলাম। আমি প্রতিটি নামাজে, প্রতিদিন তিলাওয়াতের পর হুমায়ুনকে আল্লাহর কাছে চাইতে লাগলাম। আমি ধীরে ধীরে দুনিয়ার (মাটির) দিকে ঝুঁকতে শুরু করলাম আর আমার সাথে শয়তান লেগে গেল।”
ফারিস্তের উঁচু সরু ঘাড় বেয়ে চোখ থেকে ঝরা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তার দৃষ্টি এখনও ওপরের চাঁদের দিকে ছিল। সম্ভবত সে এখনও মেহমিলের চোখের দিকে তাকাতে চাচ্ছিল না।
“যখন আমি আবারও ফিরে এলাম, তখন নিজের দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে থাকা মন নিয়েই এলাম।
এই আশায় তোমার সেবা করতে এলাম যে হয়তো এটাই দেখে হুমায়ুনের মন আমার দিকে ঘুরে যাবে। আমার এই অক্লান্ত সেবার মধ্যে রিয়া (লোকদেখানো ভাব) মিশে গেল। আমার সেই সময়ের কথা ভেবে ভয় লাগল না, যখন হাশরের বড় দিনে আমি আমার রবের সামনে আমলনামায় এই বড় বড় নেকিগুলোর ওপর কাটা চিহ্ন দেখব যে—এগুলো তো রিয়ার কারণে বরবাদ হয়ে গেছে, কবুলই করা হয়নি,আমার ভয় লাগল না। আমি রিয়াকারি করতে থাকলাম।
কিন্তু বিশ্বাস করো, কুরআন আমার কাছ থেকে ছোটেনি। আমি তখনও প্রতিদিন তা পড়তাম। কিন্তু আমার জীবন-মরণ, নামাজ আর কুরবানি হুমায়ুনের জন্য হয়ে গেল।”
হঠাৎ মেঘ জোরে ডেকে উঠল এবং পরের মুহূর্তেই বৃষ্টির টুপটাপ ফোঁটা পড়তে শুরু করল, কিন্তু তারা দুজনই বেখবর হয়ে বসে ছিল।
“এরপর একদিন মুয়িয চলে এল। তাকে আরজু পাঠিয়েছিল। সে এই গত বছরগুলোতে বহুবার হুমায়ুনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হুমায়ুন যখন পাত্তা দেয়নি, তখন সে মুয়িযকে পাঠাল।
তার কাছে ছবিগুলো ছিল আর ওই কাগজটি। হুমায়ুন আমাকে জিজ্ঞেস করলে কাগজের ব্যাপারে আমি সত্যিটাই বললাম, কিন্তু যখন সে ছবিগুলো আমার সামনে ছুড়ে মারল তখন আমি চুপ হয়ে গেলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম ওগুলো জাল, কিন্তু টেকনিক্যালি (Technically) আমি জানতাম না ওগুলো আসল কি না, আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না।
কিন্তু আমার মন... বারবার আমার ভেতরে কেউ একজন সেই আয়াতটি পুনরাবৃত্তি করছিল যে—
সূরা নূর :১৬
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ
(লাওলা ইয সামি‘তু-মুহু ক্বুলতুম মা ইয়াকুনু লানা আন নাতাকাল্লামা বি-হাযা, সুবহানাকা হাযা বুহতানুন ‘আযীম।)
"তোমরা যখন এটি শুনলে, তখন কেন বললে না যে— ‘এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ অত্যন্ত পবিত্র! এটি তো এক গুরুতর অপবাদ!’"
[সূরা নূর: ১৬]
ওই আয়াতটি এমন এক সম্মানিত সত্তার (আয়েশা রা.) জন্য নাজিল হয়েছিল যার ওপর দেওয়া অপবাদের বাস্তবতা সম্পর্কে মুমিনরা বেখবর ছিল, তবুও আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছিলেন যে—এটি জেনেও যে তার চরিত্র কতটা পবিত্র, তোমরা কেন তাকে সমর্থন করলে না?
আমি হুমায়ুনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে আমার ওপর চিৎকার করছিল আর অনবরত আমার ভেতরে কেউ বলছিল 'হাযা ইফকুন মুবীন' (এটি এক স্পষ্ট অপবাদ)।
আমি মাথা তুললাম, একবার হুমায়ুনের দিকে তাকালাম—যাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। আর এরপর আমি বলে দিলাম যে আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
তখন হঠাৎ আমার ভেতর ও বাইরে নীরবতা ছেয়ে গেল। সেই আওয়াজটি আসা বন্ধ হয়ে গেল।
এরপর হুমায়ুন কোত্থেকে জানি সেই টেপ (Tape) বের করল আর আমাকে শোনাল। তাতে কোনো এক আংটির উল্লেখ ছিল। সে মুয়িযের বলা কথাটিই আওড়াল যে—সেদিন কি ফাওয়াদ তোমাকে প্রপোজ করার ছলে বাইরে নিয়ে গিয়েছিল? তখন আবারও কেউ আমার ভেতর বলল—
সূরা ইউসুফ: ৫২
وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ
(ওয়া আন্নাল্লাহা লা ইয়াহদী কাইদাল খা-ইনীন।)
"...এবং আল্লাহ খিয়ানতকারীদের (বিশ্বাসঘাতকদের) ষড়যন্ত্র সফল হতে দেন না।" (বা কৌশলে হেদায়েত করেন না)।
[সূরা ইউসুফ: ৫২]
কিন্তু এখন সেই আওয়াজটি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আমি আমানতদারির সব সবক ভুলে গেলাম। আমি তাকে তা-ই বলে দিলাম যা তুমি আমাকে বলেছিলে। তখন সে আমার ওপর খুব চিৎকার করল। সে বলল যে আমি নিজের বোনকে বাঁচানোর জন্য দোষ তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছি। সে অনেক কষ্টে মন বড় করে এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছিল যে তোমাকে প্রথমবার কীভাবে তার বাড়িতে আনা হয়েছিল।
কিন্তু এই কথাটি যে ফাওয়াদের সাথে তোমার কোনো অ্যাফেয়ার (Affair) ছিল—তা তার জন্য অসহ্য ছিল। আমার একটি বাক্য সবকিছুতে সত্যতার মোহর লাগিয়ে দিল। সে কখনও আমার ওপর এমনভাবে খেপে যায়নি যেমনটা সেই রাতে গিয়েছিল।
আমি সারা রাত কাঁদলাম। জানি না কোন ব্যথার বেশি ছিল—খিয়ানতের, নাকি হুমায়ুনের আচরণের। আমি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু হুমায়ুন পরদিন সকালে আমার কাছে ক্ষমা (Excuse) চেয়ে নিল। আমি চুপচাপ শুনতে থাকলাম।
তখন শেষবারের মতো আমার মন থেকে আওয়াজ এল যে—ওকে বলে দাও তুমি মিথ্যা বলেছিলে।
কিন্তু আমি চুপ রইলাম। আমি নিজের খাহেশাত বা প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে শুরু করলাম এবং আমি পথভ্রষ্ট হলাম। সে করাচি চলে গেল আর আমি অনেক দিন পর্যন্ত তোমাকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারিনি।
এরপর আমি মসজিদেও যেতে পারিনি। সেদিন আমি খিয়ানত করেছি মেহমিল! সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত তিন সাড়ে-তিন বছর হতে চলল, আমি কুরআন খুলতে পারিনি। হ্যাঁ, নামাজ আমার আজও আগের মতোই দীর্ঘ।
আমি সেজদায় পড়ে হুমায়ুনকে আজও চাই, কিন্তু কুরআন পড়ার সময় আর পাইনি।”
বৃষ্টি অঝোরে ঝরছিল। ফারিস্তের বাদামী চুল ভিজে গিয়েছিল। মোটা ভিজে চুলের গুছিগুলো মুখের চারপাশে লেপ্টে গিয়েছিল। সে এখনও ওপরের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“সে করাচি থেকে ফিরলে বদলে গিয়েছিল। এরপর একদিন সে আমাকে প্রপোজ করল। হঠাৎ... একদম হঠাৎ করে।
আর আমার মনে হলো আমার সব কুরবানি কবুল হয়ে গেছে। এরপর পেছনে ফিরে দেখার সুযোগই পাইনি। সে তোমার ওপর খুব বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে বাধ্য করেছিলাম যেন সে তোমার চিকিৎসা করানো বন্ধ না করে।”
মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে বারবার বিদ্যুৎ চমকালে মুহূর্তের জন্য পুরো লন আলোকিত হয়ে যাচ্ছিল।
“ফাওয়াদ অনেকবার ফোন করে তোমার কথা জানতে চেয়েছিল, আমি তাকে কখনও কিছু বলিনি। শুধু তার কথা শুনে কিছু না বলেই কেটে দিতাম।
সে অনেক বদলে গেছে। আমার মনে হতো যদি একবার সে এই সব খেলার কথা জানতে পারে, তবে সে হুমায়ুনের কাছে এসে সব বলে দেবে।
হুমায়ুন তাকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, কিন্তু এই ভয়ে আমি তাকে কখনও কিছু জানতে দিইনি।”
মেহমিল কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে ফারিস্তেকে দেখল, যে এখনও ওপরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আপনি কি এখনও তাকে চান?”
ফারিস্তে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ! আমি আজও তাকে চাই। কিন্তু আমি জানি সে আমার নসিবে নেই। সে শুধু তোমার। সে ফিরে আসবে মেহমিল। সে অবশ্যই ফিরে আসবে। আমিই মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজ সেই দেয়াল ধসে গেছে। তোমার হক তোমাকে ফিরে পাওয়া উচিত।”
“আমার হুমায়ুনকে চাই না ফারিস্তে!” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল। “আমার নিজের বোনকে চাই!”
“আমারও হুমায়ুনকে চাই না। আমারও নিজের বোনকেই চাই!” সে এবার প্রথমবার মেহমিলের মুখের দিকে তাকাল।
মেহমিল তার হাঁটুতে রাখা হাতগুলো ধরে নিল। সেই হাতে আজ রূপার আংটিটি ছিল না।
বৃষ্টি তাদের ওপর সজোরে ঝরছিল।
“আমি ফাওয়াদকে ফোন করে দিয়েছি, সে পৌঁছাতে যাচ্ছে। সে যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক। এমন সব প্রমাণ আনবে যে হুমায়ুন তাকে অস্বীকার করতে পারবে না। সে এখনই এসে হুমায়ুনকে সব বলে দেবে।
কাল দুপুর হতে এখনও অনেক সময় বাকি, তোমার ইদ্দত শেষ হয়নি। আমি জানি সে সত্য জানতে পারলে থাকতে পারবে না এবং তোমাকে ফিরে পেতে চাইবে।
এসো, ভেতরে চলো।” ফারিস্তে নিজের হাত মেহমিলের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল, উঠল এবং এরপর হুইলচেয়ারের পিছন ধরল।
“শুধু আমার ওপর একটি এহসান করো। হুমায়ুনকে বলো না যে আমি খিয়ানত করেছি। আমি তার নজরে ছোট হতে চাই না। আপাতদৃষ্টিতে আমি মিথ্যা বলিনি, কিন্তু আমার তোমার গোপন কথা ফাঁস করা উচিত হয়নি।
আমি তাকে বলে দেব যে আমার ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, আমি ফাওয়াদের সামনে তোমার পক্ষ নেব। কিন্তু তুমি... তুমি আমার সম্মান রেখো।
সে জানে ফারিস্তে মিথ্যা বলে না, খিয়ানত করে না। সে ওই ছবিগুলোর ওপর নয়, আমাকে বিশ্বাস করেই তোমাকে তালাক দিয়েছিল। তুমি আমার মান রেখো।”
সে হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে আচ্ছন্ন অবস্থায় কথাগুলো বলছিল। মেহমিল মাথা নিচু করে নিল। সে ফারিস্তেকে বলতে পারল না যে—আজ সে আবারও দুনিয়ার (মাটির) দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
কিন্তু সে তা জানে না।
“তুমি হুমায়ুনকে ফিরে নাও মেহমিল! সে তোমার, তাকে তোমারই থাকা উচিত।” সে মেহমিলকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে ফিরে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ঘরে আগের মতোই আবছা অন্ধকার ছিল। জানালার পর্দা সরানো ছিল। টেবিল ল্যাম্পটি এখনও জ্বলছিল। মেহমিল নিজেকে টেনে সামনে এগিয়ে ল্যাম্পের সুইচ বন্ধ করল। মুহূর্তেই ঘরে অন্ধকার ছেয়ে গেল। কেবল জানালার বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে দেখা যাচ্ছিল।
সে সেখানেই জানালার সামনে বসে ঝরতে থাকা বৃষ্টি দেখতে লাগল।
অনেক আগে শেখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর পড়া একটি উক্তি তার মনে পড়ল—
“মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে তার হাত দিয়েই ভাঙেন। মানুষকে সেই ভাঙা পাত্রের মতো হওয়া উচিত, যার ভেতর দিয়ে মানুষের ভালোবাসা আসবে এবং বেরিয়ে যাবে।”
আল্লাহ তাকে সেই সব মানুষের হাত দিয়েই ভেঙেছিলেন যাদের সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত—হুমায়ুন, ফারিস্তে এবং তৈমুর!
ঠিক তখনই গাড়ির হর্ন শোনা গেল। সে নীরবে দেখতে লাগল।
গাড়িটি বারবার হর্ন দিচ্ছিল। তখন সে অঝোর বৃষ্টির মাঝে হুমায়ুনকে গেটের দিকে যেতে দেখল। সে গেট খুললে একটি গাড়ি দ্রুত ভেতরে ঢুকল। ড্রাইভিং সিটের (Driving seat) দরজা খুলে একজন দ্রুত বেরিয়ে এল। সে ফাওয়াদ-ই ছিল, মেহমিল চিনে ফেলল।
সে আগের মতোই ছিল। শুধু চোখে ফ্রেমলেস গ্লাস (Frameless glasses) আর চুল আরও ছোট করে ছাঁটা।
হুমায়ুন কি তার কথা শুনবে? কখনোই না!
ঠিক তখনই ফাওয়াদ ঝুঁকে সামনের সিটের দরজা খুলল এবং কাউকে হাত ধরে টেনে বের করল। মেহমিল আঁতকে উঠল। সে মুয়িয ছিল।
রোগা, লম্বা যুবকটি যার চোখের মণি ভিজে ছিল। ফাওয়াদ তাকে ধরে হুমায়ুনের সামনে নিয়ে এল যে কিছুটা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঝরঝর বৃষ্টির শব্দ খুব তীব্র ছিল। তাদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল না। তারা
তিনজন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দাঁড়িয়ে ছিল। ফাওয়াদ জোর গলায় কিছু বলছিল।
হুমায়ুন বুকে হাত বেঁধে শুধু চুপচাপ শুনছিল।
তার পিঠ ছিল মেহমিলের দিকে। মেহমিল তার চেহারার অভিব্যক্তি দেখতে পাচ্ছিল না।
আর তখনই সে মুয়িযকে হাত জোড় করতে দেখল। হয়তো তার চেহারায় বৃষ্টির ফোঁটা ছিল, অথবা হয়তো সে কাঁদছিল। কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলতে বলতে সে হুমায়ুনের কাছে ক্ষমা চাচ্ছিল।
আর তখনই সে ফারিস্তেকে বাইরে আসতে দেখল। সেও কিছু বলছিল।
মেহমিল হাত বাড়িয়ে পর্দা টেনে দিল। সে এই দৃশ্য আর দেখতে চাইছিল না।
অনেকক্ষণ পর সে ফারিস্তের কণ্ঠ শুনতে পেল, সে ফাওয়াদ আর মুয়িযকে এদিকে নিয়ে আসছিল।
তার ঘরের দরজা খুলল। মেহমিলের পিঠ ছিল সেদিকে।
“মেহমিল...” ফাওয়াদের ভারি কণ্ঠ শোনা গেল। “মুয়িয হুমায়ুনকে সবকিছু বলে দিয়েছে।
যদি আমি আগে জানতাম তবে মেহমিল! আমাকে ক্ষমা করে দিও।
আমরা তোমার সাথে অনেক বড় অন্যায় করেছি।”
“আপা! আমাদের মাফ করে দিন।” সে মুয়িয ছিল, সে কাঁদছিল। “আম্মা আর আরজু আপা আমাকে এই সব করতে বলেছিলেন। আপা! আম্মা খুব অসুস্থ। তিনি এখন আগের মতো নেই। তিনি সারাদিন চিৎকার করেন। আপা! আমাদের...” সে বলছিল আর ধীর স্বরে মেহমিলের ভেতরে কেউ কথা বলে উঠল—
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
ফা আম্মাল ইয়াতীমা ফালা তাক্বহার।
“সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।” [সূরা দুহা: ৯]
“আপা... আরজু আপা আত্মহত্যা করেছেন। আজ হুমায়ুন ভাই তাকে রিজেক্ট (Reject) করে দিয়েছেন। আম্মা সামলাতে পারছেন না। আমাদের বদদোয়া দেবেন না আপা...”
“যাও মুয়িয! আমি তোমাকে মাফ করলাম... সবকিছু মাফ করলাম।”
সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতেই বলল।
“আপা! দোয়া করবেন আরজু আপা যেন বেঁচে যান। উনার জন্য বদদোয়া করবেন না।”
“আমি দোয়া করব। তুমি যাও মুয়িয! ওদের খেয়াল রেখো। আমার তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, বরং তুমিই তো আমাকে মানুষের ভালোবাসা আর বিশ্বস্ততার আসল রূপ দেখিয়েছ।
তোমাকে ধন্যবাদ।”
“মেহমিল...” ফারিস্তে তাকে ডাকল।
“মুয়িয! তুমি যাও।”
আর সে একইভাবে উল্টো পায়ে ফিরে গেল।
“তুমি কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে মেহমিল?” সেই পরাজিত, ভেঙে পড়া মানুষটি আগা ফাওয়াদই ছিল।
“আমি মাফ করেছি... সব মাফ করেছি।” সে এখনও পেছনে ফেরেনি।
“আগা জান-এর শরীরের অর্ধেক অংশ প্যারালাইজড (Paralyzed) হয়ে গেছে। তিনি তোমাকে খুব মনে করেন।
আম্মি উনার কষ্টের কারণে না জীবিতদের মাঝে আছেন, না মৃতদের মাঝে। সিদরার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে আর তার সেই বংশীয় শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে বাপের বাড়ি আসতে দেয় না।
সে আর তার এতিম বাচ্চারা নিজের বাড়িতে তার চেয়েও খারাপ জীবন কাটাচ্ছে যা তুমি আর মুসাররাত চাচি কাটিয়েছিলে। মেহরিনকে...”
“আমাকে কিছু বলবেন না ফাওয়াদ ভাই, প্লিজ! আমি মাফ করেছি... সব মাফ করেছি। আমাকে এসব বলে আর কষ্ট দেবেন না। এখন আমাকে একা থাকতে দিন।” তার নরম গলায় মিনতি ছিল।
“ঠিক আছে। আর এটি তোমার অংশ। এই সব বছরের মুনাফাসহ। ফারিস্তের অংশ আমি তাকে দিয়ে দিয়েছি। পারলে আমাদের জন্য দোয়া কোরো।” সে একটি ফাইল (File) আর একটি সিল করা খাম তার বিছানার ওপর রেখে ফিরে গেল।
মেহমিল ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। সে মাথা নিচু করে, লজ্জিত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় চলে যাচ্ছিল।
সে সবসময় ভাবত আগা ফাওয়াদের পরিণতি কী হবে? কিন্তু এই পৃথিবী কি পরিণতির জায়গা? এটি তো পরীক্ষার জায়গা;
নিজের গুনাহ দেখতে পাওয়াও একটি পরীক্ষা। আসল ফয়সালা তো হাশরের দিনই হবে।
তার বিছানার পাশে কিছু কাগজ রাখা ছিল। সেই কাগজগুলো যা একসময় তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু আজ সে সেগুলোর দিকে দ্বিতীয়বার তাকিয়েও দেখল না।
এই কাগজগুলোর জন্যই সে ফুয়াদের প্রলোভন গ্রহণ করেছিল, আজ ফাওয়াদ নিজে সেগুলো এনে দিয়ে গেল। কিন্তু কত বড় মূল্য দিতে হয়েছিল সেই ভুলের, যা তাকে চুকাতে হয়েছে।
কাঁচা বয়সের কাঁচা কারবার...
বৃষ্টি থেমে এসেছিল। জানালার জালিগুলো ভিজে গিয়েছিল। সেগুলো থেকে মাটির সোঁদা গন্ধ আসছিল।
অনেকক্ষণ ধরে সে সেখানে বসে সেই ঘ্রাণ নিতে লাগল। সে অবচেতনভাবে তার অপেক্ষায় ছিল। সে জানত যে এখন সে নিশ্চয়ই তার ঘরে আসবে।
বেশ অনেক মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে সে দরজায় পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে ধীরে ধীরে ফিরল।
হুমায়ুন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অবস্থায় দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। এটি সেই দরজা যা সে মেহমিলের উপস্থিতিতে কখনও পার করেনি। এটি সেই চৌকাঠ, যেখানে সে কখনও সাহায্যপ্রার্থী হয়ে আসেনি। কিন্তু আজ সে এসেছে।
তার পরিশ্রান্ত, ভাঙা কদমগুলো ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।
“মেহমিল...” ভাঙা গলায় সে ডাকল এবং এরপর সে স্বশরীরে হাঁটু গেড়ে তার পায়ের কাছে বসে পড়ল।
“আমাকে মাফ করে দাও মেহমিল...” তার চোখগুলো লাল ছিল এবং চেহারায় ছিল দীর্ঘদিনের ক্লান্তি।
“আমাকে মাফ করে দাও। আমি অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম।”
সে পরিতাপের সাথে হুমায়ুনকে দেখল। আগেও তারা সবাই তার থেকে তার সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আজও তারা চাইতেই এসেছে। সবাই স্বার্থপর।
প্রত্যেকের নিজের বিবেকের বোঝা থেকে মুক্তি চাই। মেহমিল ইব্রাহিম তো কোথাও ছিল না!
“আমি শুধু ফারিস্তের কথায়... আর আজ সে বলছে তুমি তাকে শুধু একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করেছিলে, সে নিজে ভুল বুঝেছিল।
আমি শুধু ফারিস্তের কারণে...”
“আপনি কি আগে জীবনের সব ফয়সালা ফারিস্তের মাথা দিয়ে করেছিলেন, এসপি (SP) সাহেব?” সে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল।
“আপনি কি ছোট বাচ্চা ছিলেন যে জানতেন না আমার আত্মীয়রা আমার প্রকাশ্য শত্রু? আপনি কি অশিক্ষিত ছিলেন যে এটা বুঝতেন না এমন ছবি তো প্রতিটি অলি-গলিতে বানানো যায়?”
“মেহমিল! বিশ্বাস করো, আমি...”
“এক মিনিট এসপি সাহেব! আমি অনেক মাস শুধু আপনার কথা শুনেছি। আজ আপনি আমার কথা শুনবেন।
আপনি বলছেন ফারিস্তের কথায় বিশ্বাস করে নিয়েছেন? আজ আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি—আপনি ফারিস্তেকে জিজ্ঞেসই করতে গেলেন কেন? আপনি আমার ওপর এতটাই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন যে আপনাকে অন্যের কাছে জিজ্ঞেস করতে হলো? কেন আপনি ওই ছবিগুলো মুয়িযের মুখে ছুড়ে মারলেন না? আপনি কি খুব যোগ্য পুলিশ অফিসার (Police Officer) ছিলেন না? আপনি কি আসল আর নকল আলাদা করতে পারতেন না? আপনি কি আরজুর স্বভাব জানতেন না? না কি সম্ভবত আপনার আগ্রহ একজন অসুস্থ, জ্ঞানহীন নারীর ওপর থেকে শেষ হয়ে গিয়েছিল?... সম্ভবত আপনার আমার সেবা থেকে দূরে পালানোর একটি বাহানা দরকার ছিল।
আপনি আজাদ হতে চেয়েছিলেন। যদি তা না হতো তবে আপনি আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি সুযোগ তো দিতেন।
একবার তো জিজ্ঞেস করতেন যে—তুমি কি এমনটা করেছ? কিন্তু আপনি নিজেও আমার ওপর ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
আপনি এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেননি হুমায়ুন! যে আমার জায়গায় আপনি যদি এভাবে অসুস্থ হতেন আর আমি আপনার সাথে এমনটা করতাম তবে আপনার কী অবস্থা হতো?”
বলতে বলতে তার শ্বাস আটকে আসছিল।
তখনই খোলা দরজা দিয়ে তৈমুর দৌড়ে ভেতরে এল। শোরগোল শুনে সে ঘুম থেকে জেগে গিয়েছিল। সে দৌড়ে মেহমিলের কাছে এল এবং তার হাঁটু জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু হুমায়ুন আর মেহমিল তার দিকে তাকাচ্ছিল না।
“মেহমিল! আমাকে মাফ করে দাও। আমি আবার সবকিছু আগের মতো করতে চাই (রজু করতে চাই)। আমার সাথে চলো।”
হুমায়ুন তার হাত ধরার জন্য হাত বাড়িয়েছিল কিন্তু মেহমিল হঠাৎ পিছিয়ে গেল।
“কিন্তু এখন আমি এমনটা চাই না। ছেঁড়া সুতো যদি আবার জোড়া দেওয়া হয় তবে তাতে একটি গিঁট থেকে যায়। আমাদের মাঝেও সেই গিঁটটি থেকে গেছে; তাই এই সুতোটিকে ছেঁড়াই থাকতে দিন।”
“মেহমিল!” সে অবিশ্বাসের সাথে তাকাল।
ক্ষমার জন্য জোড়া হাতগুলো তার নিচে পড়ে গেল। মেহমিল দীর্ঘশ্বাস নিল।
“আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি হুমায়ুন! মন থেকে মাফ করেছি। কিন্তু এখন আগের সম্পর্কে ফিরে যাওয়া আমার সাধ্যে নেই।
যদিও রজু করার জন্য আপনার আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি আমার খুশির কথা ভাবেন তবে এটি করবেন না। আপনি ফারিস্তেকে বিয়ে করে নিন। আপনারা দুজনেই একে অপরের জন্য তৈরি। মাঝখানে আমি চলে এসেছিলাম।”
“কিন্তু মেহমিল! তুমি...” সে কিছু বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু আজ মেহমিল শুনছিল না।
“আমার আর কোনো সাহারার প্রয়োজন নেই হুমায়ুন!... আমার ছেলে আমার কাছে আছে। ফাওয়াদ আমাকে আমার অংশও ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি আর মানুষের মুখাপেক্ষী নই। আপনি ফারিস্তেকে বিয়ে করে নিন। সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
সে দরজার দিকে ইশারা করল। হুমায়ুন ঘাড় ফিরিয়ে দেখল।
ফারিস্তে সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। হুমায়ুনকে তাকাতে দেখে সে মুখে হাত দিয়ে বাইরে দৌড়ে পালাল।
“আপনি তার আর পরীক্ষা নেবেন না। তাকে বিয়ে করে নিন।
আমি আর তৈমুর একে অপরের জন্য যথেষ্ট। আমাদের তৃতীয়জন আল্লাহ আছেন। আপনি আমাদের যেতে দিন। এখন আমাদের আর একসাথে থাকা অসম্ভব।”
সে সজল চোখে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আমি তোমার মর্যাদা বুঝিনি মেহমিল!” সে মাথা নেড়ে উঠল এবং বিধ্বস্ত কদমে বাইরের দিকে হাঁটা দিল।
“দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাবেন।”
তার এই কথায় সে একটু থামল, কিন্তু ফিরল না।
এখন হয়তো ফেরার হিম্মত সে নিজের ভেতর পাচ্ছিল না। খুব ধীরে সে বাইরে বের হলো এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
সে মেহমিলের জীবন থেকে চলে গিয়েছিল।
দুটি অশ্রুবিন্দু মেহমিলের চোখের কোণ থেকে ঝরে গলায় গড়িয়ে পড়ল।
ফারিস্তে বলত সে শোনেনি, যখন বছরের পর বছর আগে সে হাসপাতালে কিছু বলতে চেয়েছিল। অথচ সেই দৃশ্যটি মেহমিলের আজও মনে আছে—যখন ফারিস্তে নার্সের ডাকে উঠে গিয়েছিল। ফারিস্তের অসম্পূর্ণ কথা শুনেই সে উঠেছিল।
সে সবসময় জানত যে ফারিস্তে হুমায়ুনকে পছন্দ করে। কিন্তু যখন ফারিস্তে নিজে তার আচরণ দিয়ে বিশ্বাস করাল, তখন মেহমিলও ওপর ওপর নিজেকে শান্ত করতে লাগল যে—ফারিস্তে এমন অনুভূতি কেনই বা রাখবে। কিন্তু মনের গভীরে সে সবসময় জানত; যদি আরজুকে মাঝখানে না দেখত তবে সে কখনও এই ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতো না যে হুমায়ুন কাকে বিয়ে করছে। হ্যাঁ, সে জানত কেন ফারিস্তে তাদের বিয়ের পর বিদেশে চলে গিয়েছিল।
সে সব জানত। এটাও যে এখন সে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। এক আকর্ষণহীন নারীতে পরিণত হয়েছিল। হুমায়ুন অনুতপ্ত হয়ে ফিরে তো এসেছিল; কিন্তু সে তো পুরুষই ছিল। কতক্ষণ তার সাথে বাঁধা থাকত? যে কানে এতটাই কাঁচা ছিল যে সেই ফোন কলে একটি আংটির কথা তার মাথায় ঢুকল, আর মেহমিলের অনবরত 'ফাওয়াদ ভাই, ফাওয়াদ ভাই' জপে 'ভাই' শব্দটি তার কানে গেল না। সে কতক্ষণ মেহমিলের হয়ে থাকত? একদিন না একদিন সে আবার অন্য কোনো নারীর দিকে চলে যেত। তখনও মেহমিল একাই থেকে যেত। কিন্তু তখন সে হয়তো সহ্য করতে পারত না। তার মধ্যে বারবার ভেঙে যাওয়ার সাহস ছিল না। তাই সে 'ভাঙা পাত্র' হওয়ার কথা ভাবল।
ফারিস্তে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল কিন্তু ক্ষমা চায়নি। হুমায়ুন ক্ষমা চেয়েছিল কিন্তু স্বীকারোক্তি দেয়নি।
আর তারা দুজনেই ভাবত যে তারা দায়মুক্ত হয়ে গেছে। যাই হোক!
সে কোলে মাথা রাখা তৈমুরের নরম বাদামী চুলে আদরের সাথে হাত বুলিয়ে দিল।
“মাম্মা! আমি কি ঘুমিয়ে পড়ব?” সে কাঁচা ঘুমে ছিল।
“তুমি একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে যে আমি ইউসুফ (আ.)-এর বর্ণনায় কেন বিষণ্ণ হয়ে যাই, তাই না?”
“হ্যাঁ মাম্মা!” সে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বলল।
“জানো কেন বিষণ্ণ হয়ে যাই?” সে নিজের চোখের জল মুছল। “কারণ তিনি অনেক ধৈর্যশীল ছিলেন এবং তিনি তার বাবার খুব প্রিয় ছিলেন।” বলতে বলতে তার আরও কিছু মনে পড়ছিল।
“কিন্তু তার নিজের ভাইয়েরাই তাকে এক অন্ধকার কূপে ফেলে দিয়েছিল।” মেহমিলের চোখের সামনে কিছু দৃশ্য দ্রুত ভেসে উঠছিল।
“এরপর তাকে কয়েক দিরহামের বিনিময়ে মিশরে বিক্রি করে দেওয়া হলো। তার ওপর অপবাদ দেওয়া হলো। তাকে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা হলো। এরপর একদিন এল যখন তিনি সেই মিশরের অর্থমন্ত্রী হলেন যেখানে তাকে একসময় বিক্রি করা হয়েছিল।
তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে ফিরে পেলেন। আর যারা তার ওপর অপবাদ দিয়েছিল এবং যারা তাকে তার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, তারা তার কাছে ক্ষমা চাইতে এল।
কিন্তু সেই মহান ব্যক্তিত্ব কিছুই মনে করিয়ে দেননি, কাউকেই ছোট করেননি, সবাইকে মাফ করে দিয়েছেন। আমি এইজন্য বিষণ্ণ হই তৈমুর! যে আমি সবরের (ধৈর্যের) সেই উচ্চতায় কোনোদিন পৌঁছাতে পারিনি... তুমি কি শুনছ?”
সে কয়েক মুহূর্ত তার উত্তরের অপেক্ষা করল এবং এরপর ঝুঁকে তার চুলে চুমু খেল।
তৈমুর গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
টিভি লাউঞ্জের কেন্দ্রীয় দেয়ালে একটি বড় প্লাজমা স্ক্রিন লাগানো ছিল। তাতে একটি চমৎকার দৃশ্য পূর্ণ আভা নিয়ে ঝলমল করছিল।
আলোকোজ্জ্বল এক বিশাল হলরুম, হাজার হাজার মানুষের ভিড়। স্টেজে বসা প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণ এবং রোস্ট্রামে (Rosstrum) দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি লেকচার দিচ্ছিলেন।
টিভির সামনে সোফায় বসা হুমায়ুন দাউদ রিমোট তুলে নিয়ে আওয়াজ বাড়িয়ে দিলেন।
ভলিউম বাড়ার বিন্দুগুলো স্ক্রিনে থাকা ব্যক্তির কোটের ওপর ফুটে উঠল।
হুমায়ুন রিমোট রেখে দিলেন। এখন তিনি পলক না ফেলে স্থির হয়ে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
"এটি আজ নির্ধারিত হয়নি, বরং বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল যে—কুরআন কেবল আরবি ভাষার কুরআন। এর অনুবাদগুলো কুরআন নয়।"
উজ্জ্বল চেহারার সেই ব্যক্তি তার চমৎকার ইংরেজি বাচনভঙ্গিতে বলছিলেন। তিনি থ্রি-পিস সুট পরিহিত ছিলেন। চেহারায় পরিপাটি করে ছাঁটা দাড়ি এবং মাথায় সাদা জালি টুপি। তার চোখগুলো ছিল অত্যন্ত সুন্দর। কাঁচের মতো বাদামী, উজ্জ্বল।
আর হাসি ছিল খুব মনোমুগ্ধকর। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বে এমন কিছু ছিল যে, হাজারো মানুষে ঠাসা হলরুমে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। সবাই দম বন্ধ করে তার কথা শুনছিল।
"আজকের যুগের মুসলিম যখন কুরআন খোলে তখন বলে যে, এতে সে সেই বাচনভঙ্গি খুঁজে পাচ্ছে না যার গল্প সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে। সেই বাচনভঙ্গি যা শুনেই আরবের কাফেররা নির্বাক হয়ে যেত, সেজদায় পড়ে যেত, তৎক্ষণাৎ ঈমান নিয়ে আসত।
আসল কারণটা কী যে, এই কুরআনের ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও আবু জাহেল বিন হিশামের মতো লোকেরাও লুকিয়ে লুকিয়ে এটি শুনতে আসত? আর কারণটাই বা কী যে আমরা এতে সেই জিনিস দেখতে পাই না যা ওই আরববাসীরা দেখতে পেত? আমাদের কাছে কেন এটিকে কেবল গল্পের সংকলন মনে হয়, যার মাঝে কিছু উপদেশ আর নামাজ-রোজার বিধান দেওয়া আছে?"
হুমায়ুন রিমোট তুলে নিয়ে আবারও আওয়াজ বাড়ালেন এবং অস্থিরভাবে সেটি আবার রেখে দিলেন।
"আপনারা কি ডাক্তার মরিস বুকাইলির (Dr. Maurice Bucaille) ঘটনা শুনেছেন?" তিনি মুহূর্তের জন্য থামলেন এবং পুরো হলের ওপর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে তাকে শুনছিল।
"ডাক্তার মরিস বুকাইলি একজন ফরাসি ডাক্তার ছিলেন। তিনি তার কাছে আসা প্রত্যেক মুসলিম রোগীকে বলতেন যে কুরআন সত্য নয়, বরং এটি একটি মনগড়া কিতাব। রোগীরা বেচারা মুখ বুজে সহ্য করত। এরপর একবার যখন বাদশাহ ফয়সাল তার অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তিনি একই কথা বাদশাহ ফয়সালকে বললে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কুরআন পড়েছ?' ডাক্তার বুকাইলি বললেন, 'হ্যাঁ পড়েছি।' বাদশাহ ফয়সাল জিজ্ঞেস করলেন, 'কী পড়েছ?' তখন তিনি জানালেন যে তিনি কুরআনের অনুবাদ পড়েছেন। এতে বাদশাহ ফয়সাল বললেন, 'তাহলে তুমি কুরআন পড়োনি, কারণ কুরআন কেবল আরবিতে হয়'।"
"ডাক্তার বুকাইলি এরপর দুই বছর সময় নিয়ে আরবি শিখলেন এবং তারপর যখন তিনি মূল কুরআন পড়লেন, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলিম হয়ে গেলেন। আসল কথা হলো, আমাদের অধিকাংশ মানুষই কুরআন পড়ে থাকে না।
আমরা যে আরবি পড়ি তার শাব্দিক অর্থ (Literal word meaning) আমরা জানি না এবং এর যে উর্দু অনুবাদ আমরা পড়ি, তা আল্লাহ নাজিল করেননি। কিছুটা হলেও এই অনুবাদগুলো প্রভাব ফেলে, কিন্তু কেউ যদি কুরআনের প্রকৃত রূপ জানতে চায়, তবে তাকে আরবিতেই কুরআন পড়তে হবে।"
হুমায়ুনের সোফার পেছনে কখন যে ফারিস্তে এসে দাঁড়িয়েছিল, তিনি তা টেরও পাননি। ফারিস্তে পলকহীন দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
"এখন এর দুটি উপায় আছে। হয় আপনি পুরো আরবি ভাষা শিখবেন, অথবা আপনি কেবল কুরআনের আরবি শিখবেন। কেবল কুরআনের আরবি শিখেও আপনি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মূল কুরআন বুঝতে পারেন। এনি কোয়েশ্চেন (Any Question)?"
তিনি থেমে হলের দিকে দৃষ্টি দিলেন।
স্টেজের সামনে নিচে থাকা মাইকের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক পাকিস্তানি তরুণী তৎক্ষণাৎ সামনে এগিয়ে এসে মাইক হাতে নিলেন।
"আসসালামু আলাইকুম ডক্টর তৈমুর!"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম!" তিনি মাথার সামান্য ইশারায় জবাব দিয়ে তার দিকে মনোযোগী হলেন।
"স্যার! আপনার কথা শুনে এসব খুব কঠিন মনে হচ্ছে। আরবি খুব কঠিন এবং জটিল ভাষা। এটি আমাদের মাতৃভাষা নয়। সাধারণ মানুষ এটি কীভাবে শিখতে পারে?"
তিনি সামান্য হাসলেন, নিজের মুখ মাইকের কাছে আনলেন।
"ঠিক সেভাবে যেভাবে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জনের জন্য ইংরেজি শিখেছে। সেটিও আমাদের ভাষা নয়, কিন্তু আমরা তা পারি। পারি না কি? আরবি শেখা তো আরও সহজ এই কারণে যে, এটি উর্দু/বাংলার খুব কাছাকাছি।"
মেয়েটি নিরুত্তর হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেছনে পুরো হলরুমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
"আমার একটি প্রশ্ন আছে স্যার!" এক অল্পবয়সী লম্বা ছেলে মাইকের কাছে এল।
"আমি আপনার আগের লেকচার শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে কুরআন শেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু কুরআন পড়ার সময় এখন আমার ওপর আগের মতো অবস্থা সৃষ্টি হয় না। হৃদয়ে সেই আবেগ তৈরি হয় না। আমি কুরআন পড়ি কিন্তু আমার মন অন্য কোথাও ঘুরে বেড়ায়।"
তৈমুর মাইক কাছে নিলেন, এরপর গভীরভাবে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কোথাও মিথ্যা তো বলেন না?"
"জি?" সে হকচকিয়ে গেল।
"একটি কথা মনে রাখবেন, কুরআন কেবল 'সাদিক' (সত্যবাদী) এবং
'আমিন' (আমানতদার)-এর হৃদয়ে অবতীর্ণ হয়।
আমি এই কিতাবের বড় বড় আলেমদের দেখেছি, যারা আমানতের পথ থেকে সামান্য বিচ্যুত হয়েছেন আর অমনি তাদের থেকে কুরআনের স্বাদ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর তারা আর কখনও এই কিতাব স্পর্শ করার তৌফিক পাননি।"
কথা বলার সময় তৈমুরের (হুমায়ুনের মতো) কাঁচের মতো বাদামী চোখে এক যাতনা ফুটে উঠেছিল। সোফার পিঠে হাত রেখে ফারিস্তে নিথর দাঁড়িয়ে ছিল। তার পেছনে দেয়ালে একটি শেলফ ছিল। এক পাশে টেবিল ছিল।
টেবিলে সদ্য ভাঁজ করা জায়নামাজ মাত্রই রাখা হয়েছে।
পাশের শেলফের সবচেয়ে ওপরের খোপে সাবধানে গিলাফে মোড়ানো একটি কিতাব রাখা ছিল। তার গিলাফটি ছিল খুব সুন্দর। লাল ভেলভেটের ওপর রুপালি তারা খচিত।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় গিলাফের ওপর ধুলোর একটি আস্তরণ জমে গিয়েছিল। আর সেই শেলফটি এতই উঁচুতে ছিল যে টুলের ওপর না দাঁড়ালে সেখানে হাত পৌঁছাত না।
"যে ব্যক্তির মধ্যে সত্যবাদিতা ও আমানতদারি থাকে এবং সে যদি সত্যিই কুরআন অর্জন করতে চায়, তবে কুরআন তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।"
স্ক্রিনে সেই উজ্জ্বল চেহারার ব্যক্তিটি বলছিলেন।
"আমরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলের আরব সমাজ সম্পর্কে এই সাধারণ ধারণা রাখি যে, তারা খুব জাহেল, মূর্খ ছিল এবং মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলা বন্য লোক ছিল। কিন্তু ওই মানুষগুলোর মাঝে অনেক গুণও ছিল। তারা মেহমানদার ছিল, অঙ্গীকার রক্ষা করত। মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলার যে বিষয়, তা আরবের কিছু দরিদ্র গোত্র করত এবং তখনও মানবাধিকার সংস্থা ছিল যারা মুক্তিপণ দিয়ে সেই মেয়ে শিশুদের ছাড়িয়ে নিত। আর সত্যবাদিতার কথা বললে—আরব সমাজে মিথ্যা বলাকে চরম ঘৃণ্য কাজ মনে করা হতো এবং মানুষ ওই ব্যক্তির ওপর অবাক হতো যে মিথ্যা বলত।
এজন্যই ওই মানুষগুলোকে কুরআন দেওয়া হয়েছিল এবং এ কারণেই আমরা এর বোধশক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কারণ আমরা না সত্যি বলি, আর না আমানতের খেয়াল রাখি; হোক সেটি কোনো দায়িত্বের আমানত, কারও সম্মানের আমানত অথবা কারও গোপনীয়তার আমানত।"
মেহমিল মুচকি হেসে টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেই সেমিনার দোহা থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল। সেমিনার শেষ করেই তৈমুরের ফ্লাইট ধরার কথা ছিল। আর মেহমিল জানত যে রাতের খাবারে সে তাদের সাথেই থাকবে। এখন তাকে তৈমুরের জন্য বিশেষ রাতের খাবারের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে, তাই সে প্রোগ্রাম দেখা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
তৈমুরের জন্য খাবার সে সবসময় নিজের হাতেই তৈরি করত। প্রতিটি সবজি নিজে কাটত। হ্যাঁ, আগা জান-এর পথ্য বা হালকা খাবার পরিচারিকা বানিয়ে নিত।
সে সিঁড়ির এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে আগা জান-এর ঘরের দরজার বাইরে থামল এবং আলতো করে টোকা দিয়ে দরজা খুলল। "আগা জান! আপনি কি নাস্তা করেছেন?"
তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন। পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিসের (Stroke) কারণে তার ঠোঁট সামান্য বেঁকে গিয়েছিল। মেহমিলের আওয়াজ শুনে তিনি চোখ খুললেন এবং এরপর হাসার চেষ্টা করলেন। যখন থেকে তিনি তার সন্তানদের ওপর বোঝা হয়ে পড়েছিলেন, মেহমিল তাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল।
"তৈমুর বলছিল ও রাত নাগাদ পৌঁছে যাবে।"
সে সামনে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার হাতটি নরমভাবে ধরে বলতে লাগল।
"আমি রাতে স্পেশাল কিছু রান্না করার কথা ভাবছি। কত দিন পর আমরা তিনজন একসাথে ডিনার করব, তাই না?"
আগা জান আবারও হাসার চেষ্টা করলেন। সেই চেষ্টায় তার চোখ থেকে দুটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
"আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আছি না আপনার কাছে? যেভাবে আল্লাহ তাআলা আমাকে সুস্থ করেছেন, আপনাকেও করবেন।" সে নরমভাবে তার চোখের জল মুছে দিল।
"আচ্ছা, আমাকে মসজিদে একটি লেকচার দিতে হবে, বড়জোর এক ঘণ্টা লাগবে। আমি এখনই বের হচ্ছি, দ্রুত ফেরার চেষ্টা করব। এরপর ডিনারের প্রস্তুতিও নিতে হবে।" সে ঘড়ি দেখে যাওয়ার জন্য ফিরল।
আগা জান এখন ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।
বাইরে এসে সে সিঁড়ির পাশের আয়নার সামনে দাঁড়াল। সামনে হুকের ওপর তার মাথার ব্যান্ড (Pony) ঝোলানো ছিল। সে ব্যান্ডটি নিল এবং লম্বা চুলগুলো গুছিয়ে উঁচু করে বাঁধল। এরপর একবার আয়নায় নিজেকে দেখে হাসল।
সে আজও ঠিক ততটাই উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত
এবং সুন্দরী ছিল যতটা বছর দুয়েক আগে ছিল। সেই উঁচু করে বাঁধা চুল আজও তাকে ততটাই মানিয়ে যাচ্ছিল যতটা আগে লাগত। আর আজও প্রতিদিন সকালে সে সেখানেই যেত যেখানে আগে যেত।
সে টিভি বন্ধ করল। (তৈমুরের প্রোগ্রাম শেষ হয়ে গিয়েছিল) এবং টেবিল থেকে নিজের ব্যাগ ও সাদা মলাটের কুরআনটি তুলে নিয়ে "আগা হাউস" থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
মসজিদে যাওয়ার আগে সে পনেরো মিনিটের জন্য বাস স্টপে অবশ্যই যেত।
সে বেশ কয়েক বছর ধরে সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটিকে খুঁজছিল যে তার কাছে কুরআন পৌঁছে দিয়েছিল।
সে একবার তার সাথে দেখা করে তাকে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিল।
সোনালি রোদেলা সকাল নেমে এসেছিল। দূরে কোথাও পাখিরা ডাকছিল। সে ধীরলয়ে হেঁটে গিয়ে সাদা মলাটের কুরআনটি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বেঞ্চে গিয়ে বসল। প্রতিদিন সকালের মতো আজও সে সেই ক্ষীণ আশা নিয়ে এখানে এসেছে যে হয়তো মেয়েটি আসবে।
রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। ধূসর রাস্তাটি এখনও ভেজা। সে মাথা নিচু করে বিষণ্ণ মনে রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া পিঁপড়া দেখছিল।
পনেরো মিনিট শেষ হতে চলল, কিন্তু সেই মেয়েটি কোথাও নেই।
হতাশ হয়ে মেহমিল যাওয়ার জন্য ব্যাগ তুলে নিল।
ঠিক তখনই সে রাস্তায় পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা তুলল।
এক তরুণী দূর থেকে হেঁটে আসছিল।
কাঁধে কলেজের ব্যাগ, হাতে মোবাইল, মাথার চুলগুলো ক্লাচার দিয়ে আটকানো, জিন্সের ওপর কুর্তা পরা, চুইংগাম চিবোতে চিবোতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে সে ধপাস করে এসে মেহমিলের পাশে বেঞ্চে বসল।
মেহমিল পলকহীন দৃষ্টিতে তাকে দেখে যাচ্ছিল। মেয়েটি প্রতিদিন এই সময়ে এখানে আসত, কিন্তু আজকের আগে সে তাকে দেখে চমকে ওঠেনি। এখন সে পা দোলাতে দোলাতে বিরক্ত হয়ে মোবাইলের বোতাম টিপছিল।
"জানি না নিজেকে কী ভাবে!" বিড়বিড় করে রাগে গজগজ করতে করতে সে বোতাম জোরে টিপল এবং মোবাইল ব্যাগে ছুড়ে মারল।
মেহমিল তখনও ঠিক একইভাবে সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিল। খুব ধীরে তার কিছু মনে পড়ল।
মেয়েটি এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে সমালোচকের দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। হঠাৎ মেহমিলের স্থির দৃষ্টি অনুভব করে সে চমকে উঠল।
মেহমিল নিজেকে সামলে নিয়ে দৃষ্টি নিচু করল। নিচে মেয়েটির ব্যাগ পড়ে ছিল, যাতে জায়গায় জায়গায় চক দিয়ে তার নাম লেখা ছিল—
"এশা হায়দার"
মেহমিল মনে মনে হাসল। অনেক কিছু মনে পড়ে গিয়েছিল।
"এক্সকিউজ মি!" সে চুইংগাম চিবানো থামিয়ে হঠাৎ মেহমিলকে সম্বোধন করল। মেহমিল নরমভাবে চোখ তুলল।
"আমি প্রতিদিন আপনাকে দেখি এবং..." সে মেহমিলের কোলে ব্যাগের ওপর রাখা সাদা মলাটের কুরআনের দিকে ইশারা করল।
"আর আপনার এই বইটিকেও। আপনি এত যত্ন করে এটি রাখেন। এতে বিশেষ কী আছে?"
মেহমিল মাথা নিচু করে সাদা কুরআনটি দেখল, যার পরিষ্কার মলাটটি এখন পুরনো হয়ে গেছে এবং পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে। সেটি দেখতে কোনো অতি প্রাচীন বইয়ের মতো লাগছিল।
"বিশেষ তো বটেই।" সে হেসে মাথা তুলল।
"আচ্ছা? হোয়াটস সো স্পেশাল (What's so special)?" সে কৌতূহলী হলো।
"এতে কোনো এক এশা হায়দারের উল্লেখ আছে, তার জীবনের গল্প আছে এবং তার জন্য কিছু মেসেজ (Message) আছে। তাই স্পেশাল তো বটেই।"
মেয়েটি পলকহীন চোখে হাঁ করে তাকে দেখে যাচ্ছিল।
"কে... কে এশা হায়দার?" অনেকক্ষণ পর অনেক কষ্টে সে বলতে পারল।
"সে এই পৃথিবীতে বসবাসকারী একটি মেয়ে, যাকে মানুষের কথা ব্যথিত করে, যার বলার আগেই কেউ তার মনের কথা বোঝে না এবং যাকে জীবন থেকে নিজের অংশ বুঝে নিতে হয়।"
ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের হর্ন বাজল। মেহমিল কথা থামিয়ে দূর থেকে আসা বাসের দিকে তাকাল।
"আমি চলি, তোমার বাস এসে গেছে।" সে সাদা মলাটের কিতাব আর ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটি তখনও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বসে ছিল।
বাস কাছে আসছিল।
মেহমিল ছোট ছোট কদম ফেলে বেঞ্চ থেকে দূরে যেতে লাগল।
"শুনুন! কথা শুনুন! এক মিনিট থামুন!" হঠাৎ মেয়েটি অস্থির হয়ে উঠল এবং দ্রুত মেহমিলের পেছনে দৌড়ে এল।
( সমাপ্ত )

Comments
Post a Comment