মুসহাফ - পর্ব: ১৬ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ১৬
সে সেই বিশাল আকৃতির বিছানার মাঝখানে হাঁটুতে মাথা গুঁজে নিথর হয়ে বসে ছিল। ফারিস্তে কিছুক্ষণ আগেই তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে জানি না কোথায় চলে গিয়েছিল।
আর হুমায়ুনকে তো সে গাড়ি থেকে নামার পর দেখেইনি। সে দ্রুত ভেতরে চলে গিয়েছিল এবং তারপর আর সামনে আসেনি। মেহমিলের মনে বিচিত্র সব চিন্তা আসছিল।
সে বারবার 'আউযুবিল্লাহ' পড়ছিল, কিন্তু কু-চিন্তা আর সন্দেহ তাকে তাড়া করে ফিরছিল। সম্ভবত হুমায়ুন তাকে বিয়ে করতে চায়নি, সম্ভবত তাকে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত সে ক্ষুব্ধ। সম্ভবত সে তাকে পছন্দই করে না।
এমনকি হতে পারে সে কথাও বলবে না, হয়তো তাকে ছেড়ে দেবে—হয়তো সে... হয়তো।
অনেকগুলো 'হয়তো' ছিল, যার আগে ছিল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বারবার সেই 'হয়তো'গুলো তার মনের পর্দায় ভেসে উঠছিল আর তার বুক দুরুদুরু করছিল। সে হতাশ হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই দরজা খুলল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সবকিছু ভুলে সে মাথা তুলে তাকাল।
হুমায়ুন ভেতরে প্রবেশ করছিল। মেহমিলের হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল। জানি না সে এখন কী করবে? সে দরজা বন্ধ করে মেহমিলের দিকে ফিরল, তারপর তাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে সামান্য হাসল।
"আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছো?" সে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশের টেবিলের ড্রয়ার খুলল। মেহমিল কোনো কথা না বলে চুপচাপ তাকে দেখে যাচ্ছিল। হুমায়ুন ড্রয়ারের জিনিসপত্র ওলটপালট করছিল।
"তুমি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, অনেক বড় একটা মানসিক আঘাতের (Trauma) মধ্য দিয়ে গিয়েছ। দুশ্চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।" সে এখন নিচের ড্রয়ারে কিছু একটা খুঁজছিল।
তার কণ্ঠস্বর ছিল ভারসাম্যপূর্ণ আর কথাগুলো... কথাগুলোর দিকে তো মেহমিল খেয়ালই করেনি। সে শুধু হুমায়ুনের হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল, যা ড্রয়ারে নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল এবং সে দেখল হুমায়ুন তার হাতে একটি ম্যাগাজিন (Magazine) ধরে আছে।
(এর ভেতরে কি গুলিও আছে? সে কি আমাকে মেরে ফেলবে?)
সে বিচিত্র সব কথা ভাবছিল।
হুমায়ুন ম্যাগাজিনটি বের করে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"আই অ্যাম সরি (I am sorry) মেহমিল! আমাদের সবকিছু খুব তাড়াহুড়ো করে করতে হয়েছে। আর আমি জানি, তুমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলে না।"
সে বলছিল আর মেহমিল দম বন্ধ করে তার হাতে ধরা ম্যাগাজিনটি দেখছিল।
"আমি এখন অন-ডিউটি (On duty) এবং আমাকে একটি অভিযানের (Raid) জন্য কোথাও যেতে হবে।
রাতে ফারিস্তে তোমার সাথে থাকবে, আমি পরশু সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসব। তুমি দুশ্চিন্তা করো না।"
সে ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত বিয়ে, অদ্ভুত রাত আর অদ্ভুত এক বর। মেহমিলের কাছে কথাগুলো খুব বিচিত্র মনে হচ্ছিল।
"তুমি কি শুনছো?" সে মেহমিলের সামনে বিছানায় বসে নিবিড়ভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেহমিল কিছুটা চমকে উঠল।
"উমম... জি, জি।" অজান্তেই সে চোখ নামিয়ে নিল।
তারপর জানি না সে আর কী কী বলল, মেহমিল মাথা নিচু করে শুনে গেল। কথাগুলো তার কানে বাড়ি খেয়ে যেন ফিরে আসছিল। কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। সে কখন কথা থামাল, কখন উঠে চলে গেল—মেহমিলের হুঁশ তখন ফিরল যখন বারান্দা থেকে গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল।
সে শূন্য দৃষ্টিতে ঘরটির দিকে তাকাল। এটিই সেই ঘর যেখানে একসময় হুমায়ুন তাকে বন্দি করেছিল, তখন সে কালো শাড়ি পরা ছিল। আজ সে লাল সালোয়ার কামিজ পরে আছে। বিয়ের পোশাক, বিয়ের গহনা, সে কনে। আর জানি না কেমন কনে। সে তো ভাবতেও পারেনি যে সে এই ঘরে কোনোদিন হুমায়ুনের কনে হয়ে আসবে।
হ্যাঁ, ফাওয়াদকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু সেটি ছিল তার হৃদয়ের এক গোপন রহস্য, যার খবর হয়তো খোদ ফাওয়াদও জানত না।
আর হাসান? ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে উঠল।
হাসানের জন্য তার মনে কোনোদিন কোনো আবেগ জন্মায়নি। আর ভালোই হয়েছে। সন্ধ্যায় যখন ফাওয়াদ মেহমিলের নামের সাথে হুমায়ুনের নাম নিল, তখন হাসান কীভাবে একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল।
যে মানুষটি প্রতিটি মুহূর্তে মেহমিলের হকের জন্য কথা বলত, লড়াই করত, সে এত বড় এক সন্ধিক্ষণে কেন এভাবে পিছিয়ে গেল? মেহমিল কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। আর ফারিস্তে—সে মেহমিলের জন্য কত বড় কোরবানি দিয়েছে। সে কখনোই ফারিস্তের ঋণ শোধ করতে পারবে না, তা সে জানত। ফারিস্তে নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়েছে; হায়!
ফারিস্তেও যদি কোনোদিন মেহমিলকে সুযোগ দিত আর সে-ও ফারিস্তের জন্য নিজের অধিকার ছেড়ে দিতে পারত।
সে ক্লান্ত হয়ে বিছানার ব্যাকরেস্টে মাথা হেলিয়ে দিল এবং চোখ বুজে ফেলল। তার মন উদাস ছিল, আত্মা ছিল ভারাক্রান্ত।
এখন তার প্রশান্তি চাই, শান্তি চাই। নিজের পরিবারের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসার অনুভূতিকে অনুভব করার শক্তি চাই। তার দুঃখ থেকে মুক্তি চাই। সে আলতো করে ঠোঁট নাড়ল এবং চোখ বুজে নিচু স্বরে দোয়া করতে লাগল।
"হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দি এবং আপনার বান্দার কন্যা এবং আপনার বান্দির কন্যা। আমার কপাল আপনার নিয়ন্ত্রণে, আমার ব্যাপারে আপনার নির্দেশ কার্যকর, আমার সম্পর্কে আপনার ফয়সালা ন্যায়সংগত। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনার প্রতিটি নামের উসিলায়—যা আপনি নিজের জন্য পছন্দ করেছেন বা আপনার কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন, অথবা আপনার সৃষ্টির কাউকে শিখিয়েছেন কিংবা আপনার অদৃশ্যের জ্ঞানে নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন—আপনি মহান কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত এবং আমার চোখের নূর (আলো) বানিয়ে দিন এবং আমার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ দূর করার মাধ্যম বানিয়ে দিন।"
সে দোয়ার শব্দগুলো বারবার আওড়াতে থাকল, যতক্ষণ না হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে এল। তার চোখ বুজে এল এবং সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সেই দুই দিন ফারিস্তে তার সাথেই ছিল। এই দুই দিনে তারা অনেক কথা বলল, শুধু সন্ধ্যার সেই নাটকীয় ঘটনাটি বাদে। ওটি এমন এক বিষয় ছিল যা তারা দুজনেই এক নীরব সমঝোতার মাধ্যমে এড়িয়ে যাচ্ছিল।
ফারিস্তে তাকে অনেক কিছু জানাল। আব্বার সম্পর্কে, নিজের মায়ের সম্পর্কে, হুমায়ুনের আম্মুর সম্পর্কে, নিজের জীবন, বাড়ি আর পুরনো স্মৃতিগুলো নিয়ে। তারা দুজনে চায়ের মগ হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লনে বসে কথা বলত। চা ঠান্ডা হয়ে যেত, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতো, কিন্তু তাদের কথা ফুরোত না।
"জানো মেহমিল!" লনের বারান্দার সিঁড়িতে তারা দুজনে বসে ছিল, হাতে ছিল চায়ের মগ; ফারিস্তে হাত বাড়িয়ে সামনের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল।
"সেখানে একটা দোলনা ছিল, একদম কোণায়।"
মেহমিল ঘাড় ঘুরিয়ে সেখানে দেখল, যেখানে এখন কেবল ঘাস আর ফুলের বাগান।
"আমরা ছোটবেলায় ওই দোলনায় অনেক খেলতাম আর তার ওই পাশে টিয়া পাখির খাঁচা ছিল। একটা টিয়া আমার ছিল আর একটা হুমায়ুনের। যদি আমার টিয়া ওর দেওয়া খাবার খেয়ে ফেলত তবে হুমায়ুন খুব ঝগড়া করত। সে বরাবরই খুব রাগী ছিল, কিন্তু রাগ কমে গেলে ওর চেয়ে বেশি ভালোবাসার আর যত্নশীল মানুষ আর কেউ নেই।"
মেহমিল মৃদু হাসিমুখে মাথা নিচু করে শুনছিল।
"যখন আমার বয়স বারো বছর হলো, তখন আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি ওনার সাথে থাকতে চাই নাকি আম্মার সাথে? আমি সাময়িকভাবে আব্বার সাথে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেলাম, কিন্তু সেদিন হুমায়ুন আমার সাথে খুব ঝগড়া করল। সে এত হট্টগোল পাকাল যে আমি সিদ্ধান্ত বদলে ফেললাম।" চায়ের মগটি ফারিস্তের দুই হাতে ছিল এবং সে যেন দূর কোনো অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল।
"তারপর যখন আমরা বড় হলাম এবং আমি কুরআন পড়লাম, তখন হুমায়ুন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলাম। সে নিজেও বুদ্ধিমান ছিল, আমাকে খুব একটা পরীক্ষায় ফেলত না। তারপর যখন আমার আম্মা মারা গেলেন তখন—"
হঠাৎ গাড়ির হর্ন বাজল। তারা দুজনে চমকে সেদিকে তাকাল। পরের মুহূর্তেই গেট খুলল এবং সাঁ করে একটি কালো গাড়ি ভেতরে ঢুকল।
"চলো, তোমার বর এসে গেছে। তুমি তোমার সংসার সামলাও। আমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিই।" সে হেসে বলতে বলতে উঠে ভেতরে চলে গেল।
মেহমিল দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বসে রইল। হুমায়ুন গাড়ি থেকে নেমে তার দিকে আসছিল। ইউনিফর্ম পরা, হাতে ক্যাপ—খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। মেহমিলকে দেখে সে হাসল।
"তাহলে তুমি আমার অপেক্ষায় বসে আছো, তাই না?" সে হাসিমুখে বলতে বলতে মেহমিলের সামনে এসে দাঁড়াল আর মেহমিল ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াল।
গোলাপি সালোয়ার কামিজের সাথে বাদামি চুলের উঁচু পনিটেইল (Ponytail) করা অবস্থায় তাকে উদাস সন্ধ্যার একটি অংশ মনে হচ্ছিল।
"ওহ্ আমি..."
"বলো যে তুমি আমার অপেক্ষা করছিলে
না।"
"না... আমি... চা নিয়ে আসব?"
"উমম, এটাই যথেষ্ট।" সে মেহমিলের হাত থেকে মগটি নিল। এক চুমুক খেল এবং মগটি নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর যাওয়ার সময় একবার ফিরল।
"ফারিস্তে আছে?"
"জি, উনি ভেতরে আছেন।"
"ওকে। আমি শাওয়ার (Shower) নিয়ে খাবার খাব, তুমি টেবিল রেডি (Table ready) করো।" এ কথা বলে সে দরজা খুলে ভেতরে চলে গেল।
মেহমিল কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। সে দরজা বন্ধ করে যায়নি। এর মানে কি সে ভেতরে যাবে? আগেও তো সে বিনানুমতিতে মেহমিলের জীবনে প্রবেশ করেছিল। এখন গেলেও আর ক্ষতি কী?
সে তিক্ততার সাথে মাথা ঝাকিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে এল।
লাউঞ্জের শেষে সিঁড়ির কাছে ফারিস্তে আর হুমায়ুন দাঁড়িয়ে ছিল। ফারিস্তে তার ব্যাগের হ্যান্ডেল ধরে ছিল এবং কালো হিজাব মুখে জড়িয়ে থুতনির নিচে পিন লাগাচ্ছিল।
"না থাক, এবার আমি যাই। কাল আমার ক্লাস আছে।"
"অন্তত আরও কয়েকটা দিন তো তোমার এখানে থাকা উচিত।"
তারা দুজনে কথা বলছিল। তাদের কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত নিচু। মেহমিলের নিজেকে সেখানে অপ্রয়োজনীয় মনে হলো, তাই সে মাথা নিচু করে রান্নাঘরে চলে এল।
বিলকিস চলে গিয়েছিল। রান্নাঘর একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সে চুলা জ্বালাল এবং খাবার গরম করতে শুরু করল। সম্ভবত সে-ও এই বাড়িতে বিলকিসের মতোই ছিল। একজন পরিচারিকা।
"মেহমিল!" ফারিস্তে খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল। মেহমিল কাজ থামিয়ে তার দিকে তাকাল। সে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
"আপনি যাবেন না ফারিস্তে! প্লিজ—" সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কান্নাসুরে ওর কাছে এল।
"ওহোহো, আমার কাজিন খুব ভালো মানুষ। তুমি কেন দুশ্চিন্তা করছো পাগল!" সে আলতো করে মেহমিলের গাল চাপড়ে দিল।
মেহমিল কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ তার বাদামি চোখ জলে ভরে গেল। সে নিচু হয়ে চুলার আঁচ বাড়িয়ে দিল।
"মেহমিল! কী হয়েছে? তোমাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে?" সে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে মেহমিলের পেছনে এল।
মেহমিলের পিঠ ছিল ওর দিকে, তাই ফারিস্তে ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিল না।
"কারো বিয়ে কি এভাবেও হয়, যেভাবে আমার হলো?" অনেকক্ষণ পর মেহমিল বলল এবং ওর কণ্ঠে ছিল শতাব্দী প্রাচীন হাহাকার। ফারিস্তে কিছু বলল না দেখে সে ঘুরে দাঁড়াল।
ফারিস্তে অবিশ্বাসের সাথে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিল। মেহমিলের মনে হলো সে বোধহয় কিছু ভুল বলে ফেলেছে।
"কী?" সে থতমত খেয়ে গেল।
"মেহমিল!" বিস্ময়ের জায়গা এখন রাগে নিয়ে নিল।
"কী হয়েছে?"
"তুমি খুব খুব অকৃতজ্ঞ মেহমিল!... অনেক বেশি।" সে যেন রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে করতে দ্রুত ঘুরে চলে গেল।
"ফারিস্তে! থামুন।" মেহমিল হকচকিয়ে ওর পেছনে ছুটল। সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
মেহমিল ওর বাহু ধরলে সে থামল, কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহমিলের দিকে ফিরল।
"তুমি হুমায়ুনকে পেয়ে গেলে মেহমিল! তুমি এখনো অখুশি?" সে খুব ব্যথিত হয়ে কথাটি বলল।
মেহমিল অস্থির হয়ে ঠোঁট কামড়াল। ফারিস্তে তাকে ভুল বুঝছিল।
"না, আমি কেবল এই খুশিকে অনুভব করতে—"
"জাস্ট স্টপ ইট (Just stop it)!" সে খুব ক্ষুব্ধ ছিল। মেহমিল চুপ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত দুজনের মাঝে নীরবতা বিরাজ করল, তারপর ফারিস্তে এগিয়ে এসে মেহমিলের দুই কাঁধে হাত রেখে তাকে একদম নিজের সামনে আনল।
"তুমি কি সত্যিই অখুশি?"
"না... কিন্তু এসবের কারণে আমার মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।"
"মানুষের আত্মা পর্যন্ত চুরমার হয়ে যায় মেহমিল! সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া হয়, তবুও তারা সন্তুষ্ট থাকে। আর তুমি—তুমি এখনো শুকরিয়া আদায় করছ না?"
ফারিস্তের সোনালি চোখে লালচে জল জমেছিল। তার হাত তখনও মেহমিলের কাঁধে ছিল।
"না, আমি অনেক শুকরিয়া করি, কিন্তু... ব্যাস সবকিছু খুব বিচিত্র মনে হচ্ছে, যেন..."
"ব্যস করো মেহমিল!" সে আফসোসের সাথে মাথা নেড়ে হাত সরিয়ে নিল এবং দ্রুত দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। মেহমিলের মনে হলো সে কাঁদছে।
সে মনমরা হয়ে রইল। সম্ভবত সে ফারিস্তেকে রাগান্বিত করে ফেলেছে। কিন্তু ফারিস্তে ঠিকই বলেছে, সে সত্যিই অকৃতজ্ঞতা করছিল।
শুধু মুখ দিয়ে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা যথেষ্ট নয়, আসল প্রকাশ তো আচরণে হয়।
"কোথায় হারিয়ে গেলে?"
কণ্ঠস্বরে সে চমকে উঠল। হুমায়ুন সামনের কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিবিড়ভাবে তাকে দেখছিল। মেহমিল কিছুটা জড়সড় হয়ে গেল।
"ফারিস্তে চলে গেছে?" হুমায়ুন কাউন্টার থেকে সরে ফ্রিজের দিকে গেল এবং তা খুলে পানির বোতল বের করল।
"জি।"
"ফারিস্তে... মেয়েটা খুব ভালো। তাই না?" সে ঢাকনা খুলে বোতল মুখে দিল।
"বসে পান করুন প্লিজ!" সে নিজেকে বলা থেকে আটকাতে পারল না। হুমায়ুন বোতল মুখ থেকে সরিয়ে হাসল।
"ফারিস্তে তোমাকেও ভালো মেয়ে বানিয়ে দিয়েছে।"
"তবে আগে কি আমি খারাপ ছিলাম?" সে মনে কষ্ট পেল।
"আরে না, তুমি তো বরাবরই ভালো ছিলে।" হাসিমুখে বলে সে আবার বোতল মুখে দিল। মেহমিল দেখল, সে বসেনি, এখনো দাঁড়িয়েই পানি পান করছে। নিজেকে বদলানোও সহজ নয়। কিন্তু অন্যকে বদলানো তো আরও কঠিন।
"আচ্ছা এটা বলো, তোমার মন কেন চুরমার হয়ে গেল?"
উফ! সে ভীষণ চমকে উঠল। হুমায়ুন তো শাওয়ার নিতে গিয়েছিল। কখন এসে সব শুনে ফেলল, সে তো টেরই পায়নি।
"আমি... আসলে—" তার বুক জোরে ধকধক করছিল। "বাড়ি থেকে কেউ কল করেনি তো—"
"ওরা কেন কল করবে? এই বিয়েতে তাদের মত ছিল না। ফারিস্তে অনেক কষ্টে তাদের রাজি করিয়েছিল। তারা এখনো এই ব্যাপারে ক্ষুব্ধ, আই থিঙ্ক (I think)।"
মেহমিল একমুহূর্ত থমকে গেল।
"ফারিস্তে...!" সে বাক্যটি অসম্পূর্ণ রেখে দিল।
"সে কত কষ্টে তাদের রাজি করাল, তুমি তো জানো।" হুমায়ুন আবার বোতল থেকে এক চুমুক দিল।
মেহমিল স্তব্ধ হয়ে তাকে দেখতে লাগল।
হুমায়ুন কি কিছুই জানে না? তাকে কি জানানো হয়নি যে কীভাবে সেই দুজন ফাওয়াদের দেওয়া কাগজে সই করেছিল? ফারিস্তে তাকে কিছুই বলেনি? কিন্তু কেন?
"তুমি চিন্তা করো না। আমরা জোর করে তাদের দিয়ে এই বিয়ে করিয়েছি। তাদের কিছুদিন রাগ করে থাকতে দাও। ডোন্ট ওরি (Don't worry)।"
তবে সে সত্যিই কিছু জানে না। মেহমিল কি বলবে নাকি বলবে না? সে মুহূর্তের জন্য ভাবল এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। যদি ফারিস্তে কিছু না বলে থাকে তবে সে কেন বলবে? থাক, ছেড়ে দাও।
"শুধু তাদের সাথেই জবরদস্তি হয়েছে নাকি আপনার সাথেও?"
"তবে তুমি কি এই জন্য চিন্তিত ছিলে?" সে হাসিমুখে মাথা ঝাকালো। "তোমার কী মনে হয়, কেউ হুমায়ুন দাউদকে বাধ্য করতে পারে?"
"বাধ্য হয়ে রাজি তো করাতে পারে।"
"পারে না। একদমই পারে না।"
"তবে আপনি... আপনি আমাকে বিয়ে করলেন কেন?"
"যদি তুমি চাও যে আমি বলি যে আমি তোমাকে খুব ভালোবাসতাম, অমুক-তমুক—তবে আমি তা বলব না।
কারণ সত্যি বলতে তোমার প্রতি আমার কোনো জলোচ্ছ্বাসপূর্ণ প্রেম ছিল না। হ্যাঁ, তোমাকে আমার ভালো লাগে এবং আমি নিজের ইচ্ছায় তোমাকে বিয়ে করেছি। আর আমি এই সিদ্ধান্তে খুব খুশি।"
তার ভঙ্গি এতই নম্র ছিল যে মেহমিল ধীরে ধীরে হাসল। মনের ওপর চেপে থাকা বোঝা হালকা হয়ে গেল।
"অর্থাৎ আপনি খুশি?"
"অফকোর্স (Of course) মেহমিল!
প্রতিটি মানুষ তার বিয়েতে খুশি হয়। মূলত আমি খুব প্র্যাকটিক্যাল (Practical) মানুষ। লম্বা কথা বলি না এবং অকারণে অতিরঞ্জন আমার পছন্দ নয়। আমি কোনো দাবিও করব না, কোনো ওয়াদাও দেব না। এটি তুমি সময়ের সাথে সাথে দেখে নেবে যে তুমি এই বাড়িতে সুখে থাকবে।"
সে যেন প্রাণ খুলে হাসল। স্বস্তি আর প্রশান্তি তার শিরায় শিরায় বয়ে গেল।
"তুমি এর ওপর কিছু বলবে না?"
"আমি কী বলব?"
"আমি বলব?"
"জি, বলুন।" সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল।
"তরকারি পুড়ে যাচ্ছে।"
"ওহ্ মা!" সে হকচকিয়ে ফিরল। কড়াই থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করেছিল। হালকা পোড়া গন্ধও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। সে দ্রুত চুলা বন্ধ করল।
"ওয়েলকাম টু প্র্যাকটিক্যাল লাইফ (Welcome to practical life)।" সে হাসিমুখে বলতে বলতে বাইরে চলে গেল।
মেহমিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে কড়াইয়ের দিকে মনোযোগী হলো।
তরকারি পুড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরে বসন্তের সুবাতাস বয়ে যাচ্ছিল। সে হাসি চেপে কড়াই তুলে সিঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"মেহমিল! মেহমিল!" সে নিচের লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে অনবরত তাকে ডাকছিল। "জলদি করো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"আসছি। জাস্ট এক মিনিট—" সে ড্রেসিং টেবিল থেকে লিপগ্লস তুলে নিল এবং সামনের আয়নায় তাকিয়ে ঠোঁটে বুলিয়ে নিল; লিপস্টিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"মেহমিল!" সে আবারও চিৎকার করে ডাকল।
"এই তো আসছি।" সে দ্রুত একবার প্রসাধন টেবিলের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। টি-পিঙ্ক (Tea pink) বেনারসি শাড়িতে মোড়ানো তনুদেহ, লম্বা সোজা চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে, কানে হীরের দুল আর চুলে হীরের একটি সূক্ষ্ম ক্লিপ যা তৈমুরের জন্মের সময় হুমায়ুন তাকে উপহার দিয়েছিল।
কবজিতে হোয়াইট গোল্ডের মুক্তো বসানো কঙ্কণ আর মানানসই মেকআপ। সে তৃপ্ত হলো।
বিছানায় শুয়ে থাকা তৈমুরকে কোলে তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
"তুমি এত দেরি করছো যে আমার মনে হচ্ছিল তোমার মত বদলে গেল কি না।" শেষ বাক্যটি বলার সময় সে মৃদু হাসল।
তৈমুরকে কোলে নিয়ে স্বযত্নে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মেহমিলও হাসল।
"কখনোই না। শেষমেশ নিজের বাপের বাড়ি যাচ্ছি, মত বদলাবো কেন?" সে নিচে নেমে এল।
হুমায়ুন মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখছিল। কালো ডিনার স্যুটে (Dinner suit) পেছনে জেল দিয়ে সেট করা চুলে তাকে অত্যন্ত চমৎকার লাগছিল।
"তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।"
"তোমাকেও!"
"ব্যাস, এইটুকুই প্রশংসা?" মেহমিলের মুখ ভার হয়ে গেল।
"বিয়ের এক বছর পর আমি আর কী-ই বা বলব?" তারা দুজনে একসাথে বাইরে এল।
"একটা বছর কেটে গেল হুমায়ুন! টেরই পেলাম না। তাই না?" সদর দরজা খুলতে খুলতে সে যেন কোনো স্মৃতিতে হারিয়ে গেল।
"হ্যাঁ, সময় খুব দ্রুত চলে যায়।" গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে অনেকক্ষণ পর সে উত্তর দিল। "মনে হয় যেন কালকের কথা।"
"হুম।" মেহমিল সিটের পেছনে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল।
একটা বছর কেটে গেল, অথচ মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। ঠিক এক বছর আগে সে কনে হয়ে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছিল, আর আজ এক বছর পর হুমায়ুন তাকে বিয়ের বার্ষিকীতে এই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার উপহার দিল।
পুরো বছর তারা মেহমিলের কোনো খবর নেয়নি, মেহমিলও কোনো ফোন করেনি। শুরুতে তার মনে রাগ ছিল, যা পরে দুঃখে রূপ নিয়েছিল আর এখন... এখন তার নিজের দায়িত্বের কথা মনে পড়ল। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার ধর্মীয় নির্দেশ মনে আসতেই সে সংকল্প করল যে সে তার আত্মীয়দের সাথে আবার যোগাযোগ স্থাপন করবে।
আগেও এই চিন্তা অনেকবার এসেছিল, কিন্তু হুমায়ুন যেতে রাজি হতো না।
তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে ফাওয়াদের মামলাটি ভেতরের দিকে থিতিয়ে এল এবং একদিন হুমায়ুনই তাকে জানাল যে ফাওয়াদ দেশের বাইরে চলে গেছে, সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ায়।
মেহমিলও যেন অনেকটা শান্ত হলো। কেন জানি না।
এক সপ্তাহ আগে হুমায়ুনের সাথে আগা করিমের কোথাও দেখা হয়েছিল। সে মেহমিলকে বলেছিল যে তারা খুব আন্তরিকভাবে দেখা করেছেন এবং বাড়িতে আসার দাওয়াতও দিয়েছেন। মুনাফেকি, দুনিয়াদারী নাকি এখন চেহারায় আর কোন আক্রোশ সাজিয়ে রাখত তারা? ফাওয়াদ তো বাইরে চলে গেছে আর সম্পত্তি তো তারা পেয়েই গেছে, তবে হুমায়ুন দাউদের মতো একজন মানুষকে জামাই বলতে তাদের আপত্তি কীসের? বরং এটি তো গর্বের বিষয় ছিল।
আরেকটি পরিবর্তনও এসেছিল। ফারিস্তে স্কটল্যান্ড চলে গিয়েছিল। তাকে পিএইচডি (PhD) করতে হতো। অনেক জ্ঞান অর্জন করতে চেয়েছিল সে। তারপর তার থিসিস আর... আরও অনেক কিছু। সে চলে যাওয়ার পর মসজিদে তার জায়গায় অন্য কেউ দায়িত্ব নিয়েছিল।
আর মেহমিলের কথা বললে, সে আজও তৈমুরকে নিয়ে ফজরের নামাজের পরপরই মসজিদে যেত। তার 'ইলমুল কিতাব' কোর্সের (Al-Kitab) আরও অর্ধেক বছর বাকি ছিল।
গাড়ি থামলে সে বর্তমানে ফিরে এল। সে এখন আগা হাউজের বারান্দায়। তৈমুরকে কোলে নিয়ে সে বাইরে বের হলো এবং নিথর হয়ে চারপাশটা দেখল।
লনের কোণায় কৃত্রিম ঝর্ণা তৈরি করা হয়েছে, বাড়ির রং বদলে গেছে, বারান্দার আসবাবগুলোও নতুন এবং দামী।
লাউঞ্জের দরজায় মেহতাব তায়ি আর আগা জান দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেহমিল আর হুমায়ুন একে অপরের দিকে তাকাল এবং এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। মেহমিল এক কাঁধে শাল ঝরিয়ে নিয়েছিল।
বাদামি-সাদা চুল কানের পেছনে গোঁজা। বারান্দার অস্পষ্ট আলোতেও তার হীরের সেটের দ্যুতি ছড়াচ্ছিল।
"মেহমিল! এটা তুমি? কেমন আছো?" মেহতাব তায়ি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলেন।
"মেহমিল! আমার বেটি!" আগা জান তার মাথায় হাত রাখলেন।
মেহমিলের চোখের কোণ ভিজে উঠল। সম্ভবত তারা এখন উপলব্ধি করেছেন যে তারা তার সাথে কত বড় জুলুম করেছিলেন।
নিদা আর বাকি মেয়েরাও সেখানে চলে এল। সে তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ভেতরে ঢুকল।
একদিকে হুমায়ুনের চমৎকার ব্যক্তিত্ব, তার ওপর মেহমিলের এই বদলে যাওয়া—সাজানো গোছানো, ঐশ্বর্য আর বিলাসিতায় ভরপুর অবয়ব। ফিজা তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি সুরে প্রশংসা করল, কিন্তু নাঈমা চাচ্চির কপালে ভাঁজ যেন আরও বেড়ে গেল।
তিনি নিজের ঈর্ষা লুকোতে পারছিলেন না।
লাউঞ্জটিও বদলে ফেলা হয়েছে। দামী ঝাড়লণ্ঠন, পর্দা, বহুমূল্য ডেকোরেশন পিস (Decoration piece)—যদিও আগেও সবকিছু দামী ছিল, কিন্তু এখন যেন টাকার বন্যা বয়ে গেছে। প্রতিটি কোণা ঝলমল করছিল। হয়তো এখন তারা সবকিছু ব্যবহারের অবাধ অধিকার পেয়ে গিয়েছিল।
"সিদরা বাজি কোথায়?... আর আরজু?" সোফায় বসতে বসতে সে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল।
"সিদরার তো ডিসেম্বরে বিয়ে হয়ে গেল, সে কানাডা চলে গেছে।" তায়ি মেহতাব গর্বের সাথে জানালেন।
চেহারায় তাকে দাওয়াত না দেওয়ার কোনো অনুশোচনা ছিল না। মেহমিলের মনটা যেন একবার ডুবে আবার ভেসে উঠল। সে অবাক হলো, তাদের কোনো লজ্জা ছিল না বরং নেয়ামতের এই বৃষ্টি তাদের আরও বেশি অহংকারী করে তুলেছে।
"মেহরীনের নিকাহ্ গত মাসে হয়েছে। ছেলে ডাক্তার, ইংল্যান্ডে থাকে। এই বছরই বিয়ে দিয়ে দেব।"
"আচ্ছা... মাশাআল্লাহ।" সে মন থেকে খুশি হলো।
কিন্তু একটা দ্বিধা রয়েই গেল—তারা তার সাথে এত জুলুম করল, তবুও তাদের সুখ কেন এভাবে বেড়েই চলেছে?
"নিদারও বাগদান হয়ে গেছে।" ফিজা চাচ্চি কেন পিছিয়ে থাকবেন? "সেও ডাক্তার।
সৌদি আরবের রয়্যাল ফ্যামিলির ডাক্তারদের একজন।
সামিয়ার কথা নিয়েও আজকাল আলোচনা চলছে।"
"আর আরজু?" হঠাৎ তার মুখ থেকে ফসকে বেরিয়ে এল। তার নজর আলাদা হয়ে বসে থাকা নাঈমা চাচ্চির ওপর পড়ল। ওনার বিরক্তি যেন আরও বেড়ে গেল।
"আমার মেয়ের জন্য পাত্রের লাইন লেগে আছে, প্রতি দ্বিতীয় দিন কোনো না কোনো রাজপুত্রের সম্বন্ধ আসে।" তিনি হাত নেড়ে দম্ভের সাথে বললেন।
"কিন্তু ও যদি রাজি হয় তবেই তো—" ফিজা চাচ্চি নিচু স্বরে ফিসফিস করলেন; কথাটি নিশ্চয়ই নাঈমা চাচ্চির কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
তিনি মেহমিলকে উদ্দেশ্য করেই বলেছিলেন, মেহমিল শুনে কিছুটা চমকে উঠলে ফিজা চাচ্চি অর্থপূর্ণভাবে হাসলেন।
"আরজু বাজি কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না।" মেহমিল দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নাঈমা চাচ্চি উঠে দাঁড়িয়ে পা আছড়াতে আছড়াতে সেখান থেকে চলে গেলেন।
"কী হয়েছে ওনার?" সে বিস্ময়ে তায়ি মেহতাবকে দেখল, যিনি উপহাসের হাসিতে কাঁধ ঝাঁকালেন।
"মেয়ের মন বসেছে কারো ওপর, এখন সে কিছুতেই মানছে না।"
"আচ্ছা!" সে অবাক হলো। ওই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কেউ একজন থামল। শব্দ শুনে মেহমিল মাথা তুলল এবং অজান্তেই ওড়নার আঁচল মাথায় টেনে নিল।
হাসান বিমূঢ় হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। কাফলিঙ্ক লাগাতে গিয়ে তার হাত ওখানেই থেমে গেল।
"আসসালামু আলাইকুম হাসান ভাই!" সে হাসিমুখে সালাম দিলে হাসান চমকে উঠল। তারপর মাথা ঝাকিয়ে শেষ ধাপটি নেমে এল।
"ওয়ালাইকুম আসসালাম! কেমন আছো মেহমিল? কখন এলে?" সে তাদের দিকে এগিয়ে এল। "এটি তোমার ছেলে নাকি মেয়ে?"
"ছেলে, তৈমুর।"
সে নিচু হয়ে তৈমুরকে আদর করল, তারপর সোজা হলো।
"একা এসেছো?"
"আরে না, হুমায়ুন ওর সাথে এসেছে। তোমার আগা জানের সাথে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। যাও দেখা করো।" তায়ি মেহতাবের কথায় সে মাথা নেড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল।
"হাসান ভাইয়ের কি কোথাও বাগদান হয়নি চাচ্চি?" সে সাধারণ স্বরে ফিজাকে জিজ্ঞেস করল।
তার মনে হয়েছিল হাসান হয়তো এখনো তার শোকে কাতর হয়ে বসে আছে।
"আরে না! হাসানের তো বিয়েও হয়ে গেছে। আমার ভাগ্নি তালাতকে মনে আছে তোমার? ওর সাথেই হয়েছে। আজ কাল সে বাপের বাড়ি গেছে। সামিয়া! সামিয়া!" তিনি মেয়েকে ডাকলেন।
"যাও হাসানের বিয়ের অ্যালবাম (Album) নিয়ে এসো।"
মেহমিল সত্যিই এক বিশাল ধাক্কা খেল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। সে শোকে কাতর হয়ে বসে থাকার মতো লোক ছিল না। সেই দুর্বল পুরুষ যে কখনোই তার জন্য শক্তিশালী অবলম্বন হতে পারত না। কিন্তু মেহমিলের তার অবলম্বনের প্রয়োজনই বা কী ছিল? কখনোই না।
হাসানের সাথে তার কোনোদিন কোনো আবেগীয় সম্পর্ক ছিল না, তাই কোনো আফসোসও হলো না।
তারপর তারা তাকে হাসান আর সিদরার
বিয়ের অ্যালবাম দেখাল। সে তো জাকজমক আর ধুমধাম দেখে অবাক হয়ে গেল। কনেদের বিয়ের পোশাক আর গহনা তো একপাশে, কেবল ইভেন্ট ডিজাইনিং (Event designing)-এ জলের মতো টাকা ওড়ানো হয়েছে।
মেহমিল তো তাদের সবকিছু নিজেই দিয়ে দিয়েছিল, এখন তারা কেনই বা তাকে আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবে না?
ডিনার (Dinner) ছিল রাজকীয়। আগা জান আর হুমায়ুনের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল তাদের মাঝে দীর্ঘদিনের গভীর বন্ধুত্ব।
কে বলতে পারে যে একসময় আগা জান এই লোকটির নামও শুনতে পারতেন না? ব্যাস, মেহমিলের একটি সই পুরো পৃথিবীই বদলে দিয়েছে। তবুও সে খুশি ছিল। সে বাপের বাড়ির সেই মর্যাদা খুঁজে পেয়েছে, হোক তা মুনাফেকিতে ঘেরা বা মিথ্যে, কিন্তু মর্যাদা তো ছিল।
ব্যাস কয়েক মুহূর্তের জন্য সে তৈমুরের ব্যাগ আনতে গাড়ির কাছে এসেছিল এবং তখনই সে লনের চেয়ারে বসে থাকা আরজুকে দেখে থমকে গেল। আরজুও তাকে দেখেছিল, তাই দ্রুত উঠে তার কাছে এল।
"খুব চমৎকার মিসেস হুমায়ুন! বেশ আয়েশ করছ দেখছি।"
আরজু তার সামনে বুকের ওপর হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল আর বিদ্রুপের সুরে কথা বলছিল। মেহমিল অনেক কষ্টে নিজেকে কড়া কথা বলা থেকে বিরত রাখল।
"আল্লাহর রহমত আরজু বাজি! নয়তো আমি এর যোগ্য কোথায় ছিলাম?"
"যোগ্য তো তুমি এখনও নও। এটা তো যার যার চালাকির বিষয়।"
"আমার যদি চালাকি জানা থাকত তবে এই বাড়ি থেকে ওভাবেই বিদায় নিতাম যেমন সিদরা বাজি নিয়েছে।"
"ওহ্ ডোন্ট প্রিটেন্ড টু বি ইনোসেন্ট! (বেশি নির্দোষ সাজার চেষ্টা করো না)" সে দ্রুত ধমক দিয়ে বলল।
"তুমি জানতে যে হুমায়ুন কেবল এবং কেবলই আমার, তবুও তুমি ওকে বিয়ে করলে। তোমার কী মনে হয়, আমি তোমাকে এমনিই ছেড়ে দেব?"
"হুমায়ুন আপনার কবে থেকে হয়ে গেলেন আরজু বাজি? নাম পর্যন্ত তো আপনি ওনার জানতেন না। সেটাও তো আমার থেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন।"
"নিজের ছোট বুদ্ধিতে বেশি জোর দিও না মেহমিল ডিয়ার!" সে আঙুল দিয়ে মেহমিলের চিবুক উঁচু করল।
"আর মনে রেখো, আরজু একবার কাউকে চাইলে তাকে হাসিল করেই ছাড়ে।"
"কেন? আরজু কি খোদা নাকি?"
মেহমিলের ভেতরে রাগ উপচে পড়ল। সে এক ঝটকায় নিজের চিবুক থেকে ওর আঙুল সরিয়ে দিল।
"সেটা তো তোমাকেই সময় বলে দেবে কে খোদা আর কে নয়।" সে অবজ্ঞার স্বরে বলে ঘুরে বড় বড় পা ফেলে ভেতরে চলে গেল।
অদ্ভুত মেয়ে দেখি বাবা! অন্যের স্বামীর ওপর অধিকার ফলাচ্ছে। উফ! সে ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে ভেতরে ফিরে এল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
"তোমার এই কাজিন আরজু, ওর কি কোনো মানসিক সমস্যা আছে?" ফেরার পথে গাড়ি চালাতে চালাতে হুমায়ুন জিজ্ঞেস করল। মেহমিল ভীষণভাবে চমকে উঠল।
"কেন, ও কি কিছু বলেছে?" ওর বুকটা ভয়ে ধক করে উঠল।
"হ্যাঁ, অদ্ভুত সব কথা বলছিল।"
"আপনার সাথে কখন দেখা হলো? ও তো লাউঞ্জে আসেইনি।"
"জানি না, কেমন অদ্ভুতভাবে সব
পুরুষদের মাঝখানে এসে বসে পড়ল আর আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করল। খুব অস্বস্তিকর লাগছিল, কিন্তু ওর বাবার তাতে কিছু যায় আসছিল না।"
"তারপর?" সে রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল।
"তারপর হাসানের খারাপ লাগল এবং সে ওকে ধমক দিল যে ভেতরে যাও। কিন্তু ও উল্টো উত্তর দিল যে আমি কি তোমার চাকরানি যে ভেতরে যাব? অদ্ভুত একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
আমি তো ফোনের বাহানা করে উঠে এলাম। ফিরে এসে দেখি ও নেই। কোনো সমস্যা আছে কি ওর সাথে?"
"জানি না।" সে ঠোঁট কামড়ে রইল।
"একটা কথা বলি মেহমিল!"
"হুম, বলুন।"
"তুমি এটা ভেবো না যে আমি লোভী। কিন্তু হক তো হকই হয়। তুমি দেখলে, ওই লোকগুলো কীভাবে তোমার সম্পত্তিতে আয়েশ করছে। তোমার ওদের কাছে নিজের অংশ চাওয়া উচিত।"
"থাকতে দিন। আমার কিছু চাই না।" সে জানালার বাইরে তাকাতে লাগল। হুমায়ুন কাঁধ ঝাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল।
সে হুমায়ুনকে কীভাবে বোঝাত যে, তার জন্য সে নিজের হক অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। ফারিস্তে যদি এটা গোপন করে থাকে, তবে তার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কারণ আছে।
সে ভেতর থেকে হঠাৎ খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। তাই ব্যাগ থেকে ছোট কুরআনটি বের করল, যার সাদা কভারে 'মীম' লেখা ছিল।
(আমি এখানে এটা কেন লিখেছি?) সে যতবারই কুরআন খোলে, নিজের হাতে লেখা 'মীম' দেখে ভাবে আর মনে না আসায় কাঁধ ঝাকিয়ে সামনে পড়তে শুরু করে।
সে সকালের তিলাওয়াতের বুকমার্ক থেকে পাতাটি খুলল। একদম উপরে লেখা ছিল:
"আর তিনি তোমাদের দান করেছেন সেই সব কিছু যা তোমরা তাঁর কাছে চেয়েছিলে। আর যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে তা শেষ করতে পারবে না।" অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
"কেন হাসছো?" গাড়ি চালাতে চালাতে হুমায়ুন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"না, কিছু না।" তার মন শান্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই কুরআন বন্ধ করে রাখতে যাচ্ছিল। সে সত্যিই সেই সব কিছু পেয়ে গিয়েছিল, যা সে কখনো চেয়েছিল।
"বলো না।"
"আসলে আমার জন্য আল্লাহ তায়ালা খুব সুন্দর একটি আয়াত নাজিল করেছিলেন, ওটাই পড়ে ওনার ওপর খুব ভালোবাসা আসছিল।"
সে মাথা ঝাকিয়ে হেসে দিল।
"হাসলে কেন?"
"কাম অন মেহমিল! ইটস অল ইন ইয়োর মাইন্ড (It's all in your mind)!"
"কী?" সে অবাক হলো এবং এখনো আছে।
"মেহমিল, ওই আয়াত তোমার জন্য ছিল না, এটা একটি ঐশী কিতাব। ওকে? এটাকে এত ক্যাজুয়ালি (Casually) নিও না। এটা কুরআনে পাক।
এতে নামাজ, রোজার বিধান আছে। ইটস নট অ্যাবাউট ইউ (It's not about you)।" সে মোড় ঘুরল। রাতের এই প্রহরে রাস্তা একদম নির্জন ছিল।
সে স্তম্ভিত হয়ে হুমায়ুনের চেহারা দেখছিল।
"তুমি দেখো মেহমিল! একই ছবি একেকজন একেক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে। যেমন সমালোচক তার ত্রুটি খুঁজবে, কবি তার সৌন্দর্যে হারিয়ে যাবে, বিজ্ঞানী অন্যভাবে দেখবে।
ইটস অল ইন ইয়োর মাইন্ড।"
"না হুমায়ুন! কুরআনে সেটাই থাকে যা আমি ভাবি।"
"কারণ তুমি সেটাই পড়তে চাও। তোমার মনে হয় সবকিছু তোমার সাথে সম্পর্কিত কারণ তুমি সেটাকে নিজের সাথে রিলেট (Relate) করতে চাও। মেহমিল! এ সব তোমার মনের কল্পনা, এটি একটি ঐশী কিতাব।
এতে তোমার উল্লেখ নেই। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড (Try to understand)।"
হঠাৎ হুমায়ুনের মোবাইলের ঘণ্টি বেজে উঠল।
সে ড্যাশবোর্ড থেকে মোবাইল তুলল, উজ্জ্বল স্ক্রিনে নম্বর দেখল এবং বাটন চেপে কানে ধরল।
"জি রানা সাহেব—" সে কথা বলায় মগ্ন হলো।
মেহমিল শূন্য দৃষ্টিতে কোলে ঘুমন্ত তৈমুরের দিকে তাকাল এবং তারপর হাতে ধরা কুরআনের দিকে, যা সে এইমাত্র ব্যাগে রাখতে যাচ্ছিল।
তার মনে হলো হুমায়ুনের কথাটি তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, আত্মা ছিঁড়ে নিয়েছে। সে মুহূর্তের মধ্যে অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেল। তার মন, চিন্তা, আশা—সব যেন ফাঁপা হয়ে গেল।
তবে কি এতকাল সে এসব কল্পনা করে এসেছে? সে কি সেটাই পড়ত যা সে পড়তে চাইত? তার কি সেটাই মনে হতো যা তার আকাঙ্ক্ষা ছিল? সে কি সবকিছুর নিজের মনমতো অর্থ বের করত?
তার মন যেন পাতালে তলিয়ে যেতে লাগল। হুমায়ুন এখনো ফোনে ব্যস্ত ছিল, কিন্তু সে তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল না। সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সে স্তব্ধ হয়ে হাতে ধরা কুরআনের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মাঝখান থেকে খুলে ফেলল। দুটি পাতা সামনে আলোকিত হয়ে উঠল।
প্রথম পাতার মাঝামাঝি জায়গায় লেখা ছিল:
"আর অবশ্যই আমি তা নাজিল করেছি এবং নিশ্চয়ই এই (কুরআন)-এ উল্লেখ আছে তোমাদেরই..." এর বেশি সে পড়তেই পারল না। সে যেন আবার জীবিত হয়ে উঠল।
সব বিষণ্ণতা, একাকীত্ব উধাও হয়ে গেল। মন আবার আলোকিত হয়ে উঠল। এখন তাকে কারো তত্ত্ব বা মতামত নিজের ওপর চাপিয়ে নিতে হবে না। সে তার উত্তর পেয়ে গিয়েছে। দলিল পেয়ে গিয়েছে।
ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে সে সাবধানে কুরআন পাকটি তুলে ব্যাগে রাখল এবং জিপ বন্ধ করল। তারপর সিটের পেছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজল।
হুমায়ুনের সাথে কোনো তর্কে যাওয়ার দরকার ছিল না তার। তাকে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন ছিল না। সে তাকে বোঝাতে পারত না যে—অনেক মানুষই জানে না, মানে না।
চলবে,,,,,

Comments
Post a Comment