মুসহাফ - পর্ব: ১৮ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ১৮
সেদিন সকালে অনেক দেরি করে তার ঘুম ভাঙল। সারারাত ঘুমাতে পারেনি, ভোরের দিকেই কেবল চোখ লেগেছিল।
সিস্টার মেরিন বেডসাইড টেবিলের ওপর ওষুধ রাখছিলেন, মেহমিলকে জেগে উঠতে দেখে তিনি হাসলেন।
"গুড মর্নিং (Good morning), মিসেস হুমায়ুন! হাউ আর ইউ (How are you)?"
"ফাইন (Fine)!" সে জোর করে হাসল। কার নাম তার নামের সাথে জুড়ে দেওয়া হচ্ছিল—যে কি না নিজেই তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে।
"আপনার বোন সকালে এসেছিলেন, আপনি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তিনি এই বইটা দিয়ে গেছেন।" তিনি সাইড টেবিলের ওপর রাখা একটি বইয়ের দিকে ইশারা করলেন।
"ফারিস্তে এসেছিল?" সে চমকে উঠল।
তারপর ইশারা করা বইটির দিকে তাকিয়ে সে যেন পাথর হয়ে গেল। সাদা, সাধারণ কভারের একটি ভারী বই। তার শ্বাস যেন আটকে এল। হৃদয় স্পন্দন ভুলে গেল।
"আল মুসহাফ..... কুরআন..." সে বিড়বিড় করে বলল।
"এটি আপনার কুরআন, ম্যাডাম।"
সিস্টার মেরিন তাকে মনোযোগী দেখে সাবধানে কুরআনটি তুলে তার সামনে ধরলেন। সে ব্যাকুল হয়ে সেটি হাতে নিল এবং বুকে জড়িয়ে ধরল।
"ইউ লাভ ইয়োর হোলি বুক টু মাচ, রাইট (You love your holy book too much, right)? (আপনি আপনার পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে খুব ভালোবাসেন, তাই না?)"
তিনি হেসে মেহমিলকে উঠে বসতে সাহায্য করতে করতে বললেন।
"অফকোর্স সিস্টার (Of course sister)!" সে অত্যন্ত খুশি ছিল।
সে বসে পড়লে সিস্টার মেরিন তার পেছনে বালিশ সেট করে দিলেন। এরপর সিস্টার কখন সেখান থেকে চলে গেলেন, সে টেরও পেল না। সে তখন নিজের কুরআনের মাঝে ডুবে গিয়েছিল।
সে ধীরে ধীরে প্রথম পাতাটি খুলল;
আরবি লিপিতে সাজানো পৃষ্ঠাগুলো সামনে ভেসে উঠল। তার মন এক অপার্থিব সম্ভ্রমে ভরে গেল। হাত সামান্য কাঁপছিল, ঠোঁট থরথর করে কাঁপছিল এবং চোখের কোণ ভিজে উঠল।
ওহ্ খোদা...! আল্লাহ্ তাকে কতটা নেয়ামত দান করেছেন। আল্লাহ্ তাকে তাঁর বাণী আঁকড়ে ধরার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ্ তার কথা শোনেন এবং তার সাথে কথা বলেন। বছরের পর বছরের এই সম্পর্ক কীভাবে ভাঙতে পারে?
তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল।
আল্লাহ্ তাকে ভুলে যাননি, তিনি তাকে মনে রেখেছেন।
মেহমিল ইব্রাহিম তার রবের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। এর চেয়ে বেশি কি তার আর কিছু চাওয়ার আছে?
সে শুরুর কয়েকটি পৃষ্ঠা ওল্টালো। বুঝতে পারছিল না কোত্থেকে পড়া শুরু করবে। এরপর শুরুতে রাখা একটি বুকমার্ক (Bookmark) দেখে সেটি খুলল।
সূরা বাকারার মাঝখান থেকে পাতাটি খুলে গেল—দ্বিতীয় পারার শুরুতে। বছরের পুরনো এই বুকমার্ক সে জানি না কবে ওখানে রেখেছিল!
সে দুরুদুরু বুকে পড়তে শুরু করল।
সূরা আল-বাক্বারাহ্, আয়াত: ১৫২
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
(ফাযকুরূনী আযকুরকুম ওয়াশকুরূ লী ওয়ালা তাকফুরূন।)
"অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব; আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।"
অশ্রু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছিল। সে বলতে চাইল—আমি আপনাকে সুখের দিনে মনে রেখেছি, আপনি আমাকে কষ্টের দিনে ভুলে যাবেন না। কিন্তু তার ঠোঁট ফুটল না।
সে আরও পড়ল।
সূরা আল-বাক্বারাহ্, আয়াত: ১৫৩
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
(ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানুস্তা‘ঈনূ বিস-সবরি ওয়াস-সলা-তি; ইন্নাল্লা-হা মা‘আস-স-বিরীন।)
"হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।"
পাশেই মার্জিনে কলম দিয়ে ছোট ছোট করে কিছু লেখা ছিল। সে কুরআনটি কাছে এনে পড়ার চেষ্টা করল। ওগুলো ছিল তার নিজের লেখা তাফসিরের নোটস।
"বিপদে ধৈর্য ও নামাজ হলো সেই দুটি চাবিকাঠি, যা আপনাকে আল্লাহর সঙ্গ পাইয়ে দেয়। এগুলো ছাড়া সেই সঙ্গ পাওয়া যায় না। তাই কোনো বিপদ এলে নামাজে আরও বেশি মনোযোগ ও একাগ্রতা থাকা উচিত। বিপদের সময় নীরব থেকে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং যা আছে তার ওপর শুকরিয়া আদায় করা ও আল্লাহর কাছে সুধারণা পোষণ করাই হলো প্রকৃত ধৈর্য।"
এই সব সে লিখেছিল? সে নিজের লেখায় নিজেই অবাক হয়ে গেল। ক্লাসে সামনে বসা, শিক্ষকের প্রতিটি কথা নোট করা—এগুলো যে একদিন তার এত কাজে আসবে, তা সে কল্পনাও করেনি।
সে একটু সামনে থেকে পড়ল।
"আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান ও মালের ক্ষতি এবং ফল-ফসলের ঘাটতির মাধ্যমে... আর সুসংবাদ দাও সেই ধৈর্যশীলদের। যারা কোনো বিপদে পড়লে বলে—নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত; আর তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।"
সে মার্জিনে লেখা নিজের কথাগুলো পড়ল।
"ধৈর্যশীলদের বিপদের সময় কেবল 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলাটাই যথেষ্ট নয়, বরং এই শব্দগুলো মূলত সেই দুটি বিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত করে, যা ছাড়া কেউ ধৈর্য ধরতে পারে না।
'ইন্না লিল্লাহি' (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য)—এটি হলো তওহিদের বিশ্বাস। আর 'ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' (নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব)—এটি হলো আখেরাতের ওপর বিশ্বাস যে, প্রতিটি দুঃখ ও বিপদ একদিন শেষ হয়ে যাবে এবং যদি কিছু সাথে থাকে, তবে তা কেবল আপনার ধৈর্য।"
সে পরবর্তী আয়াতটি পড়ল।
"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করে..."
ধৈর্যের আলোচনার ঠিক পরেই
সাফা-মারওয়া এবং হজের উল্লেখ... সে কিছুটা অবাক হলো, তারপর হাতে লেখা নোটটি পড়ল।
"সাফা ও মারওয়া মূলত একজন নারীর ধৈর্যের প্রতীক। যখন আপনাকে নিরপরাধ অবস্থায় একটি জনশূন্য মরুভূমিতে ফেলে আসা হয় এবং আপনি এই ভরসায় (তাওয়াক্কুল) ধৈর্য ধরেন যে আল্লাহ্ আমাদের কখনো ধ্বংস করবেন না, তখনই জমজমের মিষ্টি পানির ঝর্ণাধারা উৎসারিত হয়।"
তার ব্যাকুল হৃদয়ে যেন প্রশান্তি নেমে এল। কান্নায় বিরাম এল। ভেতর-বাইরে এক গভীর শান্তি বিরাজ করতে লাগল। এরপর যেন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল।
সব আহাজারি স্তিমিত হয়ে গেল। তার ধৈর্য চলে এসেছে। কান্নার প্রহর শেষ হয়েছে। আল্লাহর কিতাব তার সাথে আছে, সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মত, দ্বীনের ইলম তাকে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো অভিযোগের অবকাশ নেই। জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের হওয়া মানুষের জীবনে মক্কার কঠোরতা, মদিনার হিজরত, বদরের জয় আর ওহুদের পরাজয় আসেই। তায়েফের পাথরও আসে, আবার ইসরা ও মেরাজের উচ্চতাও আসে।
কিন্তু সবশেষে একটি 'মক্কা বিজয়' অবশ্যই আসে। এই সফরে কারো 'মক্কী জীবন' পরে আসে আবার কারো 'মাদানী জীবন' আগে চলে আসে।
হুমায়ুনের সাথে নিজের বাড়িতে কাটানো ওই একটি বছর ছিল এক প্রশান্ত ও কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের মতো। সেই সময়টি ফুরিয়ে গেছে। তার 'মক্কা' এখন শুরু হয়েছে। তায়েফের পাথর এখন লাগার কথা। কিন্তু সে জানে যদি সেই 'অসহায়দের রব' তার সাথে থাকেন, তবে সে-ও কোনো এক বাগানে আশ্রয় পেয়ে যাবে। সে-ও আঙুরের থোকা পাবে।
তার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তায়েফের দোয়াটির কথা মনে পড়ল এবং সে দোয়ার জন্য হাত তুলল। ঠিক তখনই দরজা খুলে সিস্টার ভেতরে ঢুকলেন। তাকে জেগে থাকতে দেখে হাসলেন এবং এগিয়ে এলেন।
"কেমন বোধ করছেন আপনি?" তিনি ড্রিপ চেক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন।
"হুম—" সে যেন কোনো ঘোর থেকে জেগে উঠল। "ফাইন (Fine)। আলহামদুলিল্লাহ্!"
"আপনি অনেক দীর্ঘ সময় পর জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।"
"জানি না—" সে কিছুটা অসহায়ভাবে হাসল। "আমি তো সময়ের হিসাবও হারিয়ে ফেলেছিলাম।"
"হতাশার কথা বলবেন না ম্যাম (Ma'am)! God আপনাকে সাহায্য করবেন।"
সে কিছুটা চমকে উঠল। (এই আঙুরের থোকা(খোঁসা) নিয়ে সবসময় নিনাওয়ার আদ্দাসরাই কেন আসে?) সে অবচেতনভাবে ভাবল।
"হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত তিনি আমাকে সাহায্য করবেন।" সে প্রাণখুলে হাসল।
সম্ভবত এই প্রথমবার সে এভাবে হাসল।
"তাঁর সাহায্যের ওপর তোমার কতটা বিশ্বাস আছে সিস্টার?"
"অনেক বেশি ম্যাম! খ্রিস্ট (Christ) সাহায্যপ্রার্থীদের খালি হাতে ফেরান না।"
"হুম—" সে কোমল হাসি দিয়ে তাঁর বিশ্বাসী চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি কি জানো, ঈসা (আ.) সম্পর্কে এই কুরআন কী বলে?"
সুঁই ধরে থাকা সিস্টার মেরিনের হাত এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। তিনি চোখের পলক তুলে মেহমিলের দিকে তাকালেন; তার কালো চোখে বিস্ময়ভরা প্রশ্ন জেগে উঠল।
মেহমিল এক সেকেন্ড তাঁর চোখের দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে বলল।
"এন্ড হি ওয়াজ ভেরি হ্যান্ডসাম ম্যান। হি ওয়াজ মসিহ ঈসা ইবনে মারিয়াম (And he was very handsome man. He was Masih Isa bin Maryam)।"
সিস্টার মেরিনের চোখে যেন প্রদীপ জ্বলে উঠল।
"অবশ্যই! আমাদের কিতাবে লেখা আছে যে তিনি অত্যন্ত সুশ্রী ছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর লেখার শক্তিও (Writing power) ছিল। কলমের শক্তি। তিনি খুব ভালো লিখতেন। আর জানো, তিনি নিজের এই সব অলৌকিক ক্ষমতা (Miracles) আর প্রতিভা (Talents) সম্পর্কে কী বলতেন?"
"কী?" সিস্টার পলকহীনভাবে শুনছিলেন।
"তিনি বলতেন—এটি আমাকে আমার রব শিখিয়েছেন।" সে শ্বাস নেওয়ার জন্য থামল, তারপর মনে করে বলতে লাগল।
"যখন থেকে আমি এটি জানতে পেরেছি, আমি নিজের যেকোনো প্রশংসা শুনলে ঈসা (আ.)-কে উদ্ধৃত করি। কেউ আমার প্রশংসা করলে আমি বলি—এটি আমাকে আমার রব শিখিয়েছেন।"
"বিউটিফুল (Beautiful)!" সিস্টার মেরিন মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলেন। তারপর আস্তে আস্তে জিনিসপত্র গোছাতে লাগলেন।
"মিসেস হুমায়ুন! আপনিই প্রথম মুসলিম, যিনি বললেন যে আপনাদের পবিত্র গ্রন্থ যিশু খ্রিস্ট সম্পর্কে কী বলে। নতুবা মুসলিমরা সবসময় খুব কঠোরভাবে বলে যে তোমাদের বিশ্বাস ভুল।"
"আসসালামু আলাইকুম!" ফারিস্তে উঁকি দিল। "তুমি উঠে গেছ?"
"হ্যাঁ, অনেক আগেই।" সে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নিজেকে সামলাল। ফারিস্তে ভেতরে এল। আবায়া আর কালো হিজাব মুখে জড়িয়ে সে বরাবরের মতোই স্নিগ্ধ ও সুন্দর।
"আপনি বিয়ে করেননি ফারিস্তে?" মেহমিলের এই কথায় ফারিস্তের সোনালি চোখে যেন একটি বিষণ্ণ ছায়া খেলে গেল।
"বিয়েতে কী রাখা আছে মেহমিল?" সে ম্লান হাসল।
"সুন্নত মনে করে করে নিন।"
ফারিস্তে মাথা নিচু করে চাদরের ওপর আঙুল দিয়ে অদৃশ্য রেখা টানতে লাগল।
"তাহলে... আপনি বিয়ে করবেন তো?"
"যতক্ষণ না তুমি সুস্থ হচ্ছ, আমি বিয়ে করব না।"
"আর যদি আমি কখনো সুস্থ না হই, তবে?"
"তবে আমার জন্য তুমি, হুমায়ুন আর তৈমুরই যথেষ্ট। আমার আর কারো প্রয়োজন নেই। চলো, তোমার ফিজিওথেরাপিস্ট আসার সময় হয়েছে। ওর সাথে ভাব জমিয়ে রাখো, এখন ওকে আর তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
বাড়ি শিফট হওয়ার পরও তো রোজ ওর মুখ দেখতে হবে।" ফারিস্তে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
সেই একটি চিন্তা মেহমিলকে প্রশান্তি দিল।
বাড়ি। তার বাড়ি। নিজের বাড়ি। এই সপ্তাহেই সে ফিরে যাবে।
সে তৃপ্তির সাথে ভাবল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সিস্টার মেরিন ফাইল হাতে নিয়ে কলম দিয়ে কিছু এন্ট্রি (Entry) করছিলেন।
মেহমিল বালিশে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। তার বাদামি লম্বা সোজা চুল কাঁধ বেয়ে পিঠে পড়ছিল। এই চুলগুলো একসময় খুব ঘন আর রেশমি ছিল, কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতা সেগুলোকে খুব পাতলা আর শুকিয়ে যাওয়া ফুলের পাপড়ির মতো করে দিয়েছে।
"ম্যাডাম—" লিখতে লিখতে সিস্টার হঠাৎ মাথা তুললেন। তাঁর চেহারায় হঠাৎ গভীর চিন্তার ছাপ দেখা দিল।
"হুম—" মেহমিল চমকে উঠল। আজকাল কেউ ডাকলেই সে এভাবে চমকে ওঠে।
"অনেক দিন হয়ে গেল, তিনি আসেননি।"
"কে?"
"এক ভদ্রলোক। অনেক দিন ধরে তিনি আপনাকে দেখতে আসছেন। বেশ বয়স্ক, লম্বা দাড়ি আছে। খুব দয়ালু আর ভদ্র (Gentle)।"
"কবে থেকে আসছেন?"
"আমি তিন বছর ধরে এখানে আছি, তখন থেকেই তাঁকে আসতে দেখি।
সাধারণত ফ্রাইডেতে (Friday) আসেন। এখান দিয়ে উঁকি দিয়ে কেবল আমাকে আপনার অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করে চলে যান। কখনো আপনার কাছে বসেননি।"
"আমার কি কোনো আত্মীয়?" প্রশ্ন করার সাথে সাথেই তার মনের পর্দায় অনেকগুলো মুখ ভেসে উঠল। আঘা হাউসের সুখী ও তৃপ্ত মুখগুলো। হৃদয়ে এক চিমটি ব্যথা অনুভব করল। তাদের কি মেহমিলের কথা মনে আছে? কখনো কি নিজেদের বিলাসিতার মাঝে অবসর পেয়ে তারা মেহমিলের জন্য কয়েক মুহূর্ত ব্যয় করেছে?
"না... তিনি বলতেন যে তিনি আপনার আত্মীয় নন। স্রেফ পরিচিত।"
"ফারিস্তে আর আমার হাজব্যান্ড (Husband) কি তাঁকে চেনেন?"
"ওরা যখন থাকে তখন তিনি কখনো আসেন না। সবসময় ওদের অনুপস্থিতিতে আসেন। কিন্তু এখন অনেক দিন হলো তিনি আসছেন না।"
"কোনো নাম বা ঠিকানা?"
"কখনো বলেননি।" সিস্টার আবার ফাইলের ওপর ঝুঁকে এন্ট্রি করতে লাগলেন।
মেহমিল হতাশ হলো। জানি না কে ছিলেন তিনি? কেন আসতেন?
রাতে ফারিস্তে এলে সে এমনিতেই জিজ্ঞেস করল।
"আমাকে এখানে কে কে দেখতে আসে ফারিস্তে?"
"আমরা সবাই।" সে মেহমিলের বাদামি চুলে ব্রাশ করছিল।
"আঘা জানরা কখনো আসেননি?"
"জানি না।" দুই হাতে চুল মুঠো করে ধরে সে উঁচু করে পনিটেইল (Pony tail) বাঁধল, তারপর সাবধানে ধীরে ধীরে ওপর থেকে নিচে ব্রাশ করতে লাগল।
"নিশ্চয়ই কেউ তো এসেছে।"
"আমি ওই লোকগুলোর ব্যাপারে কথা বলতে চাই না মেহমিল! প্লিজ, আমাকে কষ্ট দিও না।"
ফারিস্তের কণ্ঠে অনুনয়ভরা প্রতিবাদ ছিল। মেহমিল আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। মাথা নিচু করে চুল বাঁধতে দিল।
"এই দেখো।" ফারিস্তে একটি পকেট মিরর (Pocket mirror) তার মুখের সামনে ধরল। সে মাথা তুলে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখল এবং মুহূর্তের জন্য নিজেকে চিনতেই পারল না।
ভীষণ রুগ্ন চেহারা, বসে যাওয়া গাল, ফ্যাকাশে গায়ের রঙ, চোখের নিচে গাঢ় বেগুনি কালি, এক মলিন ও শুষ্ক মুখ। ওপরে উঁচু করে বাঁধা পনিটেইল, যা একসময় সতেজ মেহমিল ইব্রাহিমের চেহারায় খুব মানাত, এখন এই অসুস্থ ও জীর্ণ মেহমিলের চেহারায় তা খুব বেমানান লাগছিল।
"থাকতে দিন, আমার এই চুল বাঁধার দরকার নেই।" সে হাত দিয়ে পনিটেইলটা ধরে টেনে খুলে দিল।
চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে পড়ল এবং হেয়ার ব্যান্ডটি তার হাতে চলে এল।
"কেন খুলে দিলে?" ফারিস্তে আফসোস করল।
"আমি এভাবে চুল বাঁধতে চাই না। প্লিজ! আমাকে কষ্ট দেবেন না।" না চাইতেও সে ফারিস্তের কথাগুলোই তাকে ফিরিয়ে দিল। ফারিস্তে চুপ হয়ে গেল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সম্ভবত সে জানত যে এই মুহূর্তে মেহমিলকে একা ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
হুমায়ুনের বাড়ি,,,মেহমিলের বাড়ি,,,, হুমায়ুন আর মেহমিলের বাড়ি।
বাড়িটি তেমনই ছিল, যেমনটি সে ছেড়ে গিয়েছিল। সুনিপুণভাবে সাজানো, ঝাড়বাতির আলো, ঝলমলে বাতি, দামী পর্দা। এই সব আগেও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু রঙ বদলে গেছে। লাউঞ্জের সোফা, পর্দা, এমনকি টবগুলোও বদলে গেছে। জিনিসপত্র সাজানোই ছিল, কিন্তু সেগুলোর রঙ আগের মতো ছিল না।
প্রতিটি জিনিস নতুন ছিল। ঠিক যেমন হুমায়ুন ছিল—নিজের জায়গায় আগের মতোই বিদ্যমান, কিন্তু তবুও বদলে গেছে।
"কেমন লাগছে তোমার নিজের বাড়ি?" তার হুইলচেয়ার (Wheelchair) পেছন থেকে ঠেলতে ঠেলতে ফারিস্তে হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল।
সে নির্লিপ্ত হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। সাত বছর আগে এটি তার বাড়ি ছিল। এখন এটি সম্ভবত কেবলই হুমায়ুনের।
ডাক্তাররা হাসপাতালে থাকা আর ফলপ্রসূ হবে না বলে তাকে বাড়িতে শিফট করে দিয়েছিলেন। তার অসুস্থতা তো সেখানেই ছিল। ডান হাত ঠিক, বাম হাত ও বাহু কিছুটা দুর্বল এবং শরীরের নিচের অংশ সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
তারা বলতেন সে হঠাৎ সুস্থ হয়ে যেতে পারে আবার সারা জীবনও এভাবে থাকতে পারে। "কেবল আপনারা দোয়া করুন।" মেহমিল এখন কী বলত—আপনাদের কি মনে হয় আমরা দোয়া করি না? কিন্তু এসব কথা তো আর মুখে বলা যায় না।
ফারিস্তে তাকে লাউঞ্জের পাশের একটি ঘরের দিকে নিয়ে গেল। সে এটি মেহমিলের সুবিধা অনুযায়ী গুছিয়ে রেখেছিল।
"কিন্তু আমার ঘর তো ওপরে ছিল ফারিস্তে!"
"মেহমিল! সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এই হুইলচেয়ার নিয়ে..." সে কথাটি অসম্পূর্ণ রাখল। মেহমিল বুঝে নিয়ে মাথা নাড়াল।
"আর হুমায়ুনের জিনিসপত্র?" কিছুক্ষণ পর চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে সে জিজ্ঞেস করল।
"হুমায়ুন... আমি ওকে বলেছিলাম। কিন্তু আই থিঙ্ক (I think), সে নিজের ঘরে বেশি কমফর্টেবল (Comfortable)।"
"তাহলে সে এখানে আসবে না?" মেহমিল স্তম্ভিত হয়ে গেল।
"কিছু হবে না মেহমিল! সে তো এই বাড়িতেই থাকে, যেকোনো সময় আসা-যাওয়া করতে পারে।" ফারিস্তে অযথাই লজ্জিত হচ্ছিল।
"না ফারিস্তে! তুমি ওকে বলো সে যেন আমাকে এভাবে একা না রাখে।"
সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফারিস্তের হাত ধরে ফেলল। মেহমিলের জ্ঞান ফেরার পর সে মাত্র একবার দেখা করতে এসেছিল, তারপর আর কখনো আসেনি।
"মেহমিল! প্লিজ, আমার কাছে তোমরা দুজনেই খুব প্রিয়। সে কাজিন আর তুমি বোন, তাই আমি চাই না আমার কোনো কথায় সে বা তুমি হার্ট (Hurt) হও। প্লিজ, আমার ভালো লাগে না তোমাদের
পার্সোনাল (Personal) বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। আমার সে অধিকার নেই।" সে খুব কোমলভাবে মেহমিলকে বোঝাল।
সে মেহমিলের হাত ধরে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসেছিল।
মেহমিল নিরুত্তর হয়ে রইল।
"আর তৈমুর—ওর ঘর কোথায়?" হঠাৎ তার মনে পড়ল।
"লাউঞ্জের ওই পাশের ঘরটি।"
"হুমায়ুন কি ওকে নিজের সাথে শোয়ায় না? ও তো খুব ছোট, ও একা কীভাবে ঘুমাবে?" মেহমিলের বুক ফেটে যাচ্ছিল।
"যে শিশুদের শৈশবেই মা-বাবা দুজনকেই কেড়ে নেওয়া হয়, তারা অভ্যস্ত হয়ে যায় মেহমিল! ও যদি আমাকে পছন্দ করত তবে আমি ওকে সাথে নিয়ে ঘুমাতাম কিন্তু... সে আমাকে পছন্দ করে না।"
"কেন?" সে না ভেবেই বলে উঠল। উত্তরে ফারিস্তে বিষণ্ণ হাসি হাসল।
"সে তো তোমাকেও পছন্দ করে না। তাতে কি তোমার কোনো দোষ আছে?"
মেহমিল ধীরে ধীরে নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়াল।
"সো (So), এতে আমারও কোনো দোষ নেই যদি সে আমাকে পছন্দ না করে..........
আচ্ছা তুমি বসো, আমি কিছু খাবার নিয়ে আসি। এখন তুমি নরমাল ফুড (Normal food) খেতে পারবে, আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিয়েছি।" সে যাওয়ার জন্য উঠলে মেহমিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠল—
"আপনি খুব ভালো ফারিস্তে! আমি আপনার এই যত্নের প্রতিদান দিতে পারব না।"
"আমি কি কখনো প্রতিদান চেয়েছি?" সে আলতো করে মেহমিলের গাল চাপড়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
দিনগুলো বিষণ্ণতায় কাটতে লাগল।
সে সারা দিন ঘরেই পড়ে থাকত, অথবা ফারিস্তের জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে বাইরের লনে আসত এবং সেখানেও স্তব্ধ হয়ে বসে থাকত।
ফারিস্তেই কোনো না কোনো কথা বলে তার মন ভোলানোর চেষ্টা করত, তবে এই কথাগুলো ফারিস্তে সাধারণত সরাসরি তার সাথে বলত না। বরং তার হুইলচেয়ার (Wheelchair) ঠেলতে ঠেলতে কখনো সে গাছের কেয়ারিতে নিড়ানি দেওয়া মালির সাথে কথা বলত, তো কখনো বারান্দার মেঝেমুছা কাজের মেয়ের সাথে।
ফারিস্তে এখন আর আগের মতো অত কথা বলত না। তার ভঙ্গি আগের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। আর এটি ছিল সময়ের প্রভাব। সেই প্রভাব যা না চাইতেও সময় প্রতিটি মানুষের ওপর রেখে যায়।
ফারিস্তে ঘরদোর খুব ভালোভাবে সামলে রেখেছিল। যদিও প্রতিটি কাজের জন্য খণ্ডকালীন কাজের মেয়ে রাখা ছিল, কিন্তু সব তদারকি ছিল তার হাতে। তা সত্ত্বেও সে কারো ওপর হুকুম চালাত না কিংবা এই ঘরের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় (Privacy) হস্তক্ষেপ করত না।
মেহমিল বা কাজের লোকেদের সাথে কথা বলা ছাড়া সে খুব একটা কথা বলত না। তৈমুর আর হুমায়ুনের ঘরের ভেতরেও সে যেত না, বরং দরজায় দাঁড়িয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করাত। কাজের লোকেদের বেতন হুমায়ুনই দিত।
ফারিস্তে গেস্টরুমে (Guest room) থাকত। তাও আবার খুব প্রয়োজন হলে। আর তৈমুর তো এমনিতেই প্রতিটি জিনিসের ওপর খিটখিটে মেজাজ দেখানো এক ছেলে ছিল।
তাই সে তাকে ডাকত না। কখনো ডাকলে তৈমুর এতই অভদ্রভাবে কথা বলত যে, 'আল-আমান' (আল্লাহ্ রক্ষা করুন)।
মেহমিল লক্ষ্য করেছিল যে, কিছুক্ষণ অভদ্রতা করার পর তৈমুর
চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করত এবং তাকে আরও কিছু বললে সে জিনিসপত্র তুলে ভাঙচুর করতেও দ্বিধা করত না।
ফারিস্তে খুব সতর্কভাবে এই বাড়িতে থাকছিল, যেন তার মনে গেঁথে ছিল যে তাকে খুব শীঘ্রই এখান থেকে চলে যেতে হবে। কাজের মেয়ে বিলকিস তাকে জানিয়েছিল যে ফারিস্তে নিজের জমানো টাকা দিয়ে মাসের রেশনের জিনিসপত্র কিনে আনত। বিশেষ করে মুরগি এবং গোশত সবসময় সে নিজেই কিনত।
যখন হুমায়ুন বিষয়টি জানতে পারল এবং তাকে বাধা দিতে চাইল, তখন ফারিস্তে পরিষ্কার বলে দিল যে—যদি সে তাকে বাধা দেয় তবে সে সোজা স্কটল্যান্ড (Scotland) ফিরে যাবে। ফলস্বরূপ হুমায়ুন চুপ হয়ে গেল। এটা স্পষ্ট ছিল যে ফারিস্তে তাদের ওপর বোঝা হতে চায় না। সম্ভবত তার মনে এই ভয় ছিল যে কেউ যেন তাকে 'পরান্নভোজী' না ভাবে। নিজের আত্মসম্মান আর মর্যাদা সে সবসময় বজায় রাখত। মেহমিল নিজেকে তার কাছে ঋণী অনুভব করতে শুরু করেছিল।
হুমায়ুনের সাথে তার দেখা হওয়া ছিল না বললেই চলে। সে কখনো দুপুরে বাড়ি আসত আবার কখনো রাতে। খাবার সে নিজের ঘরেই খেত এবং সেখানেই থাকত। প্রায়ই খুব রাতে সে বাড়ি ফিরত। মেহমিল অপেক্ষায় লাউঞ্জে হুইলচেয়ারে বসে থাকত। সে আসত, ভাসা-ভাসাভাবে কুশল জিজ্ঞেস করত এবং ওপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেত; আর মেহমিল সজল চোখে তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকত।
তৈমুর দুপুরে স্কুল থেকে আসত। সে ডাইনিং টেবিলে একা খাবার খেত। যদি মেহমিলকে সেখানে বসে থাকতে দেখত তবে তৎক্ষণাৎ ফিরে যেত। ফলে বিলকিস তাকে তার ঘরেই খাবার দিয়ে আসত। সে জাঙ্ক ফুড (Junk food) খেত।
বার্গার-প্যাটিস আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের জন্য ফ্রিজার আর সবজির ঝুড়ি সবসময় ভরা থাকত। খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। স্কুল থেকে আনা চিপসের প্যাকেট আর চকলেটই
সাধারণত তাকে খেতে দেখা যেত। সন্ধ্যায় সে টিভি লাউঞ্জে কার্টুন লাগিয়ে বসে থাকত। যদি মেহমিলকে আসতে দেখত তবে উঠে চলে যেত।
সে বুঝতেই পারছিল না যে ছেলেটি কিসের ওপর এত রাগ করে আছে? আসলে সে কী-ই বা করেছে? মানুষ কেন এত অচেনা হয়ে যায়? এই সাতটি বছর যেন সাতটি শতাব্দীর মতো ছিল এবং এখন এই চতুর্থ মানুষটি (মেহমিল) তাদের সেই অচেনা পরিবেশে ভাগ বসাতে এসেছিল।
ফারিস্তে সন্ধ্যায় সম্ভবত মসজিদে যেত। সে সম্ভবত এখন সন্ধ্যায় ক্লাস নিচ্ছিল। মেহমিল একবার জিজ্ঞেস করলে সে বিষণ্ণ হাসল।
হাসপাতালের ঝামেলার কারণে সকালের ক্লাস নেওয়া সম্ভব ছিল না। সংক্ষেপে এটি জানিয়ে সে হিজাব ঠিক করতে করতে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সে মেহমিলের খুব খেয়াল রাখত। তার ওষুধ, মালিশ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে মিলে তার ওপর পরিশ্রম করা, তারপর খাবারের যত্ন—সে ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যেত। কোনো প্রতিদান বা উপকারের খোটা দেওয়া ছাড়াই।
সেদিন সন্ধ্যায়ও ফারিস্তে মসজিদে গিয়েছিল, যখন আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল।
হুমায়ুন তো সন্ধ্যায় কখনোই বাড়িতে থাকত না। তৈমুর জানি না কোথায় ছিল। মেহমিল নিজের ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল।
দেখতে দেখতে দিনের বেলাতেই রাতের আঁধার নেমে এল, মেঘ সজোরে ডাকতে শুরু করল। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা টপটপ করে পড়তে লাগল। বিদ্যুৎ চমকালে এক মুহূর্তের জন্য ভয়ংকর আলো ছড়িয়ে যেত।
বৃষ্টির আগে তার কখনো ভয় লাগেনি। কিন্তু আজ লাগছিল। হুমায়ুন ছিল না, ফারিস্তেও ছিল না—তার মনে হলো সে খুব একা, বড্ড নিঃসঙ্গ।
বিদ্যুৎ বারবার চমকাচ্ছিল। সেই সাথে তার হৃদস্পন্দনও বেড়ে গিয়েছিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার ঘাম হতে লাগল। সে কী করবে? কাকে ডাকবে?
সে দ্রুত হুইলচেয়ারের চাকা দুই হাতে ঘুরিয়ে লাউঞ্জে এল। ফোনটি একপাশে টিপয়ের ওপর রাখা ছিল। তার সাথে একটি চিরকুটও ছিল, যাতে হুমায়ুন আর ফারিস্তের নম্বর লেখা ছিল। সেগুলো সম্ভবত তৈমুরের জন্যই লেখা হয়েছিল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে রিসিভার তুলে ফারিস্তেকে ফোন করল, তারপর কানে লাগাল।
রিং হচ্ছিল, কিন্তু সে তুলছিল না—সম্ভবত ক্লাসে ছিল। সে হতাশ হয়ে ফোন রেখে দিল। তখনই নজর আবার সেই চিরকুটটির ওপর পড়ল।
কিছু ভেবে সে দুরুদুরু বুকে রিসিভার আবার তুলল। নম্বর ডায়াল (Dial) করার সময় তার আঙুলগুলো কাঁপছিল।
তৃতীয় রিং-এ হুমায়ুন 'হ্যালো' (Hello) বলল।
"হ্যা... হ্যালো হুমায়ুন!" সে কোনোমতে বলতে পারল।
"কে?"
"আমি মেহমিল—"
ওপাশে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল।
"হ্যাঁ বলো!" ব্যস্ত এবং শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
"আপনি... আপনি কোথায়?"
"প্রবলেম (Problem) কী?" কিছুটা বিরক্তি নিয়ে সে বলল।
"বাইরে... বাইরে স্টর্ম (Storm/ঝড়) আসছে। আমার খুব ভয় লাগছে। প্লিজ! আপনি বাড়িতে চলে আসুন।" তার গলা ধরে এল, চোখ ভিজে উঠল।
"ওহো... আমি মিটিংয়ে (Meeting) বসে আছি। এখন কোত্থেকে আসব?"
"আমি জানি না, প্লিজ চলে আসুন, যেভাবে হোক।" বাইরে ঝড়ের গর্জন বাড়ছিল। সেই সাথে তার কান্নার বেগও বেড়ে গেল।
"আমি আসতে পারব না। ফারিস্তে বা কোনো কাজের মেয়েকে ডাকো।" সে ধমকে উঠল।
"ফারিস্তে বাড়িতে নেই। আপনি আসুন হুমায়ুন! প্লিজ—"
"কী আজেবাজে কথা! যদি তোমার মনে হয় তুমি পঙ্গুত্বের নাটক করে আমার সহানুভূতি পেতে পারো, তবে এই চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলো এবং আমাকে আমার জীবন বাঁচতে দাও। খোদার কসম, এখন আমার পিছু ছাড়ো!" এবং সজোরে ফোনটি কেটে গেল।
সে স্তব্ধ হয়ে রিসিভার হাতে নিয়ে নিথর হয়ে বসে রইল। কত মুহূর্ত কাটল, কত মেঘ ডাকল, কত বিদ্যুৎ চমকাল, কত বৃষ্টি ঝরল—সে সবকিছু থেকে গাফেল হয়ে, পলকহীনভাবে পাথর হয়ে বসে রইল।
মুখ আধা খোলা, চোখ ছানাবড়া আর হাতে ধরা রিসিভার কানে লাগানো... সে যেন কোনো এক মূর্তি, যা টেলিফোন স্ট্যান্ডের সাথে হুইলচেয়ারে অনুভূতিহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
খানিকক্ষণ পর রিসিভারটি তার হাত থেকে ফসকে নিচে পড়ে গেল। মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দে সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পলক ফেলল এবং চোখের পলকে তার চোখ অশ্রু প্লাবিত হলো... তার হেঁচকি উঠে গিয়েছিল এবং পুরো শরীর কাঁপছিল।
সে ছোট বাচ্চার মতো হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগল।
হুমায়ুন তাকে ওই কথাগুলো বলল? এত রাগ আর বিরক্তি নিয়ে, যেন সে তাকে নিয়ে তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে। হ্যাঁ, সে পুরুষ ছিল।
সুশ্রী, শানদার এক পুরুষ—কতক্ষণই বা এক কোমায় পড়ে থাকা, অর্ধমৃত স্ত্রীর সাথে জড়িয়ে থাকবে? তার এখন আর মেহমিলের প্রয়োজন ছিল না। মেহমিলের অস্তিত্ব তাকে এখন বিরক্ত করে।
সম্ভবত সে এখন ওকে বিয়ে করার জন্য অনুতাপ করছিল। নিজের সাময়িক আবেগের জন্য লজ্জিত ছিল।
হঠাৎ কোনো পদশব্দে সে চোখ খুলল।
তৈমুর সামনে সোফার ওপাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল। তীক্ষ্ণ, শান্ত দৃষ্টি... যাতে এক অদ্ভুত ঘৃণা ছিল।
"তৈমুর—" তার আহত মাতৃত্ব ডুকরে উঠল। "এদিকে আমার কাছে এসো বেটা!" সে দুই হাত প্রসারিত করল—হয়তো ছেলেটি তাকে জড়িয়ে ধরবে, হয়তো হুমায়ুনের আচরণের তপ্ত জ্বালা কিছুটা প্রশমিত হবে।
"আই হেট ইউ (I hate you/আমি তোমাকে ঘৃণা করি)।" সে তিক্তস্বরে বলল এবং তার দিকে তাকিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল।
হুমায়ুনের কথাগুলোই কি কম ছিল যে ওপর থেকে এই সাত বছরের ছেলের আচরণ! তার আত্মা পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল।
"আমি কী করেছি তৈমুর? তুমি আমার সাথে এমন কেন করছ? কেন রাগ করে আছ আমার ওপর?"
"ইউ লেফট মি হোয়েন আই নিডেড ইউ (You left me when I needed you)। (আপনি আমাকে তখন ছেড়ে দিয়েছিলেন যখন আমার আপনাকে প্রয়োজন ছিল।)"
সে সজোরে চেঁচিয়ে উঠল। "আই হেট ইউ ফর এভরিথিং (I hate you for everything)!"
সে ঘুরে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। মুহূর্তকাল পরে সে সজোরে তৈমুরের ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনতে পেল।
তোমাকে ছেড়ে যাওয়ায় কি আমার নিজের কোনো হাত ছিল তৈমুর? তুমি এতটুকু কথা বুঝছ না? হয়তো তোমার বাবা তোমাকে আমার বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিয়েছে।
সে ব্যথিত হৃদয়ে ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে ফিরে এল। তার রিপল বেডের (Ripple bed) সাইড টেবিলে সাদা কভার লাগানো কুরআন রাখা ছিল। সে ধীরে ধীরে সেটি তুলল এবং দুই হাতে ধরে নিজের সামনে রাখল।
সাদা কভারের ওপর অস্পষ্ট, মোছা মোছা অক্ষরে 'মীম' লেখা ছিল। জানি না সে কেন আর কখন ওখানে ওটা লিখেছিল?
অনেক চেষ্টা করেও সে মনে করতে পারল না। তারপর মাথা ঝেড়ে সেটি ওখান থেকেই খুলল যেখানে ফজরের পর তিলাওয়াত থামিয়েছিল। সে সেই আয়াতটি দেখল যেখানে বুকমার্ক রাখা ছিল, তারপর আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ পড়ে পরবর্তী আয়াত থেকে পড়া শুরু করল।
"আমি জানি যে তাদের কথা তোমাকে দুঃখিত করে।"
সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আয়াতটির দিকে তাকাল।
সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৩৩
قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ ۖ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللَّهِ يَجْحَدُونَ
(ক্বদ না’লামু ইন্নাহূ লাইয়াহযুনুকাল্লাযী ইয়াক্বুলূনা ফাইন্নাহুম লা ইয়ুকাযযিবূনাকা ওয়ালা-কিন্নায য-লিমীনা বিআ-য়া-তিল্লা-হি ইয়াজহাদূন।)
"আমি জানি যে তাদের কথা তোমাকে দুঃখিত করে, তবে তারা তো তোমাকে অস্বীকার করে না, বরং এই জালিমরা আল্লাহর নিদর্শনগুলোকেই অস্বীকার করে।" সে আবার পড়ল এবং অভিভূত হয়ে প্রতিটি হরফ আঙুল দিয়ে ছুঁতে লাগল। এটি কি সত্যিই ওখানে লেখা ছিল?
ওহ্... আল্লাহ্ তায়ালা? তার চোখ আবারও জলে ভরে উঠল। আপনি... আপনি সবসময় জেনে যান... আমি... আমি কখনো আপনার কাছে কিছু লুকাতে পারি না। সে অঝোরে কেঁদে দিল। এবার আর এগুলো দুঃখের অশ্রু ছিল না, বরং আনন্দের ছিল। প্রশান্তির ছিল, সন্তুষ্টির ছিল।
যদি আপনি এভাবেই আমার সাথে কথা বলতে থাকেন, তবে আমাকে যে অবস্থাতেই রাখুন না কেন—আমি রাজি! আমি রাজি! আমি রাজি! সে মাথা উঁচু করল এবং হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল।
এখন আর তার কান্নার কিছু নেই। এখন তাকে ধৈর্য ধরতে হবে। তায়েফের পাথর মূলত এখন থেকেই লাগতে শুরু করেছে।
ধৈর্য আর শুকরিয়া—সে এই দুটি অবলম্বনকেই শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সন্ধ্যাটি খুব চমৎকারভাবে নেমে এসেছিল। কলোনির পরিষ্কার রাস্তার দুপাশের সবুজ গাছের তাজা পাতার সুবাস ঠান্ডা বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিলকিস তার হুইলচেয়ার ঠেলে রাস্তার ধার দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে সাথে সাথে এদিক-ওদিকের ছোটখাটো গল্পও করছিল। কিন্তু মেহমিলের মনোযোগ অন্য কোথাও ছিল। সে নির্লিপ্তভাবে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল, যেখানে পাখির ঝাঁক উড়ছিল।
সেই ঝড়ের পর আবহাওয়া খুব ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল এবং এই ঠান্ডা বাতাসে বাইরে বের হওয়া খুব ভালো লাগছিল।
বিলকিস হুইলচেয়ার ঠেলে পার্ক পর্যন্ত নিয়ে এল।
এর সামনেই তাদের সেক্টরের সেন্টার ছিল। সেখানে বুটিকস, শপ আর রেস্টুরেন্টের ভিড় থাকত। এমন জায়গায় যেতে তার মন ভয় পাচ্ছিল, তাই সে বিলকিসকে আগে যেতে নিষেধ করল।
"না, পার্ক পর্যন্ত ঠিক আছে, এখানেই ঘুরি।"
বিলকিস মাথা নেড়ে হুইলচেয়ার ভেতরে নিয়ে এল।
"যখন আপনার একসেডেন্ট (Accident) হয়েছিল না মেহমিল বিবি! তখন সাহেব খুব কেঁদেছিলেন। আমি নিজে তাঁকে কাঁদতে দেখেছি। খুব বড় ধাক্কা লেগেছিল তাঁর।"
"কে... হুমায়ুন?" সে চমকে উঠল।
"হ্যাঁ। তিনি ছুটি নিয়ে নিয়েছিলেন। বেশ কয়েক মাস তো তিনি হাসপাতালেই আপনার পাশে থাকতেন। তৈমুর বাবাকে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। আমিই বড় করেছি তৈমুর বাবাকে। বড় লক্ষ্মী ছেলে ছিল আমাদের। যখন চার বছরের ছিল, তখন আপনার জন্য ফুল নিয়ে যেত এবং হাসপাতালে আপনার মাথার কাছে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত।"
"তবে এখন কী হয়েছে ওর বিলকিস?" সে দুঃখভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
বিলকিস ধীরে ধীরে পার্কের পাথুরে রাস্তায় হুইলচেয়ার চালাচ্ছিল।
দূরে ঘাসের ওপর শিশুরা খেলছিল। একপাশে একটি শিশু মায়ের আঙুল ধরে কাঁদছিল। মেহমিল প্রতিটি শিশুর মধ্যে নিজের তৈমুরকে দেখছিল।
"তৈমুর বাবা এমন ছিল না বিবি! সে তো খুব ভালোবাসত সবাইকে। কিন্তু গত দুই এক বছর ধরে সে খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। সাহেবও তো ওকে সময় দেন না। আগে তো ছোট ছিল, এখন খুব বুঝদার হয়ে গেছে। সব কথা বোঝে, তাই সবার ওপর রাগ করে থাকে।"
"আর তোমার সাহেব? তিনি এমন কেন করেন?"
"জানি না বিবি! শুরুতে তিনি আপনার খুব খেয়াল রাখতেন, তারপর আপনার দুর্ঘটনার চতুর্থ বছরে তাঁর করাচি পোস্টিং হয়ে গিয়েছিল। তিনি সোয়া এক বছর ওখানে ছিলেন।
ওখান থেকে ফিরে আসার পর খুব বদলে গেছেন। এখন তো দেড় বছর হয়ে গেছে তিনি ফিরে এসেছেন, কিন্তু এখন তিনি আপনার বা তৈমুর বাবার খবরও নেন না।"
"করাচিতে এমন কী হয়েছিল যে তিনি বদলে গেলেন?" সে যেন নিজের মধ্যেই হারিয়ে গিয়ে বলল।
"জানি না বিবি! তবে—" সে মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করল। "তাঁর করাচি যাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে আমার মনে আছে, এই বাড়িতে আপনার এক আত্মীয় এসেছিলেন।
তাঁদের সাথে সাহেবের খুব ঝগড়া হয়েছিল।"
"কে? কে এসেছিল?" সে আতঙ্কিত হয়ে ঘাড় ঘোরাল। বিলকিসের চেহারায় দ্বিধা দেখা দিল।
"আসলে বিবি! আপনার আত্মীয়রা কখনো আসেননি তো, তাই যিনি মাত্র একবার এসেছিলেন তাঁর কথা আমার মনে আছে। তিনি আপনার চাচার ছেলে ছিলেন।"
"কে? ফা... ফাওয়াদ?" তার বুক দুরুদুরু করে উঠল।
"নামধাম তো জানি না, তবে সাহেব তাঁর সাথে খুব ঝগড়া করেছিলেন। দুজন অনেকক্ষণ ধরে উঁচু গলায় ঝগড়া করছিলেন।"
"কিন্তু হয়েছিলটা কী? ঝগড়া কেন হয়েছিল?" সে অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে পড়ল।
"আমি রান্নাঘরে ছিলাম বিবি! কিছু বুঝতে পারিনি কেন তারা লড়ছিলেন, তবে সম্ভবত কোনো কোর্ট-কাছারির (Lawsuit) ব্যাপার ছিল। আর দুজনই আপনার নাম বারবার নিচ্ছিলেন। তারপর সাহেব ফারিস্তে বিবিকেও ওখানে ডাকলেন।
তিনি জানি না কিছু বললেন কি না, তাঁর
মুখে কোনো শব্দই আমি শুনতে পাইনি।
তারপর আপনার চাচাতো ভাই চলে গেলেন আর সাহেব অনেকক্ষণ ফারিস্তে বিবির ওপর চিৎকার করলেন। আমি খাবারের কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখলাম ফারিস্তে বিবি কাঁদছিলেন এবং নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন তিনি চলে যাচ্ছেন।
কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করলে বললেন—জানি না। তিনি কেঁদেই যাচ্ছিলেন। তারপরের দিন রশিদ জানাল সাহেব নিজের ট্রান্সফার করাচি করিয়ে নিচ্ছেন। এরপর সাহেব চলে গেলেন আর ফারিস্তে বিবি থেকে গেলেন।"
সে রুদ্ধশ্বাসে সব বিবরণ শুনছিল। তার অগোচরে পেছনে কী কী ঘটে গেছে, সে টেরই পায়নি। ফাওয়াদ কি হুমায়ুনকে তার বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিয়েছিল? আর ফারিস্তেকে সে এমন কী বলেছিল যে সে কাঁদল? ফারিস্তে তো খুব শক্ত মেয়ে ছিল, এভাবে কখনো কাঁদত না। সে তো ওর চোখে কখনো জল দেখেনি।
ওহ্ খোদা! সে দুই হাতে মাথা চেপে ধরল।
সে এখন কী করবে? কাকে জিজ্ঞেস করবে? ফারিস্তে তো কখনো বলবে না। হুমায়ুনের কাছেও কোনো আশা নেই। আর তৈমুর তো তাকে দেখতেই রাজি নয়। তবে? কী করবে?
"ধৈর্য আর নামাজের সাহায্য নাও।"
তার মন থেকে এক আওয়াজ এল।
বিলকিস পরিচিত একজনকে পেয়ে তার সাথে গল্প করতে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।
মেহমিল কুরআন হাতে তুলে নিল।
সে কুরআন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতো না। সে সাবধানে এটি খুলল। গতকাল যেখান থেকে তিলাওয়াত থামিয়েছিল সেখানে চিহ্ন দেওয়া ছিল। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে পরবর্তী আয়াত পড়তে লাগল।
সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১০১ (অংশবিশেষ)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ
(ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানূ লা তাসআলূ ‘আন আশইয়া-আ ইন তুব্দা লাকুম তাসু’কুম।)
"হে মুমিনগণ! যারা ইমান এনেছ। তোমরা এমন সব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।" (মায়েদা: ১০১)
মুহূর্তের জন্য তার মাথা ঘুরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দিল।
এটি তো ভাগ্য গণনা করার বই নয়, তাই এটি আমাকে এমন প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছে। আমি অযথাই... সে মাথা ঝেড়ে ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করতে লাগল।
পরের আয়াতগুলো অন্য বিষয় সম্পর্কিত ছিল। তার চিন্তাভাবনাগুলো শান্ত হয়ে এল, শব্দগুলো তার মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে নিল এবং তার ভারাক্রান্ত মনে শান্তি নামাতে লাগল। যা-ই হয়ে থাকুক, কখনো না কখনো প্রকাশ পাবেই—তার বিচলিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
সে অনুচ্চ স্বরে সুর করে তিলাওয়াত করতে লাগল।
চলবে,,,,

Comments
Post a Comment