মুসহাফ - পর্ব: ১৯ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)


পর্ব:- ১৯



রাত তখন দুটো বাজে, কিন্তু হুমায়ুন এখনও বাড়ি ফেরেনি। মেহমিল অস্থির হয়ে লাউঞ্জে বসে ছিল।


 বারবার সে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল, আবার দরজার দিকে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও দরজা ছিল নিথর ও স্থির। বাইরেও পিনপতন নীরবতা।


তার মনে নানা কুসংস্কার আর দুশ্চিন্তা দানা বাঁধতে লাগল। জানি না সে ঠিক আছে কি না, হয়তো গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে, অথবা কোনো বিপদে পড়েছে। 


সে অবচেতনভাবেই তার জন্য প্রার্থনা করল।


হঠাৎ গাড়ির হর্ন শোনা গেল এবং তারপর গেট খোলার শব্দ। সে তৃষ্ণার্ত নয়নে দরজার দিকে ফিরে তাকাল।


পদশব্দ এবং তারপর... ভারী ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে দরজা খুলল। হাতে ক্যাপ আর স্টিক (Stick) নিয়ে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় সে পরিশ্রান্ত ভঙ্গিতে ভেতরে এল। ভেতরে ঢুকে সে পিছন ফিরে দরজা বন্ধ করল এবং কয়েক কদম সামনে এগোল।


 হঠাৎ মেহমিলকে সেখানে বসে থাকতে দেখে হুমায়ুনের পা থমকে গেল। চেহারায় এক বিস্ময়ভরা বিরক্তি ফুটে উঠল।


"তুমি এখানে কেন বসে আছো?"


"আসসালামু আলাইকুম! আপনার অপেক্ষা করছিলাম। আপনি অনেক দেরি করে ফেললেন।" সে নিচু স্বরে বলল।


"আমি দেরি করে আসি বা তাড়াতাড়ি আসি, খোদার কসম, আমার অপেক্ষায় এখানে বসে থেকো না।"


সে খুব ধৈর্য ধরে হুমায়ুনের বিরক্তিকর সুর শুনল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, 


"আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম যে সব ঠিক আছে তো—"


"আমি মরে যাইনি, হাজারটা কাজ থাকে। ভবিষ্যতে যদি তোমাকে এখানে বসে থাকতে দেখি, তবে আমি আর বাড়িই ফিরব না।


 খোদার জন্য আমার পিছু ছাড়ো মেহমিল!" সে ঝমক দিয়ে কথাগুলো বলল এবং দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।


সে অসীম ধৈর্যের সাথে চোখের জল সংবরণ করল। হুমায়ুন নিজের ঘরের দরজার আড়ালে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত সে নড়ল না। 


তারপর সে কোলে রাখা হাতগুলো তুলল এবং হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।


কখনো তো তার মনে হবে যে—এটি সেই মেহমিল যে একসময় তার কাঙ্ক্ষিত স্ত্রী ছিল। আর যখন সে এটি অনুভব করবে, সে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে।


 মেহমিল নিশ্চিত ছিল। আর এই বিশ্বাস দিয়েই সে হৃদয়ের গভীরে জেগে ওঠা তীব্র ব্যথাকে চেপে ধরল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


আজ আবার সে বিলকিসের সাথে পিচঢালা রাস্তায় হুইলচেয়ারে করে যাচ্ছিল। 


বাইরের আবহাওয়া তার মনের ওপর খুব ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এটি ভিন্ন কথা যে তার শারীরিক 


অক্ষমতায় তিলমাত্র কোনো পরিবর্তন আসেনি।


বিলকিস এদিক-ওদিকের গল্প করতে করতে হুইলচেয়ার ঠেলছিল। আজও সে তার কথা শুনছিল না।


 কেবল শান্ত ও স্থির দৃষ্টিতে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। ধীরে ধীরে এই গাম্ভীর্য তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠছিল।


"বিলকিস! তুমি কি আমার চাচার বাড়ির ঠিকানা জানো?" হঠাৎ কোনো এক ভাবনায় সে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল।


"না বিবি, আমি তো ওদিকে কখনো যাইনি।"


"আচ্ছা, কিন্তু আমার রাস্তা মনে আছে। তুমি কি আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে?"


"পায়ে হেঁটে?" বিলকিস অবাক হলো।


"হ্যাঁ, খুব বেশি দূরে নয়। এখান থেকে সেন্টারের (Center) দূরত্ব যতটুকু, ততটুকুই।


 আমি তো হেঁটেও চলে আসতাম।" তার অবচেতনভাবে সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ল, যখন ওয়াসিমের সাথে বিয়ের কথা শুনে সে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে মসজিদের সামনের রাস্তায় চলে এসেছিল। 


আর  হুমায়ুন তাকে বলেছিল যে—সে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার মতো মানুষ নয়। আর তারপর...


"ঠিক আছে তাহলে। আপনি রাস্তা বলুন।" 


বিলকিসের কথায় সে স্মৃতির অরণ্য থেকে বাস্তবে ফিরল এবং রাস্তা বলতে শুরু করল। 


একটি ছোট রাস্তা ব্রিজ হয়ে তাদের সেক্টরে গিয়ে মিশত, যেখান দিয়ে ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব ছিল।

আজ সেই ২০ মিনিটকে পুরো এক শতাব্দী মনে হচ্ছিল। 


সেই রাস্তায় যেতেই সে যেন অতীতে হারিয়ে গেল। জানি না তারা সবাই কেমন আছে? আগের মতোই বিলাসিতায় দিন কাটছে কি? কেউ কি তাকে মনে রেখেছে? কখনো কি তারা হাসপাতালে এসেছিল? আর জানি না ফাওয়াদ গিয়ে হুমায়ুনকে কী বলেছিল যার জন্য ফারিস্তে কেঁদেছিল? অনেক চেষ্টা করেও সে এমন কিছু মনে করতে পারল না যা হুমায়ুনকে ওভাবে বলা যায়; হয়তো তার চিন্তা করার ক্ষমতা এখন নিস্তেজ হয়ে আসছিল।


"এটিই কি আপনার বাড়ি? খুব সুন্দর তো!"


বিলকিস গল্প করছিল। আর মেহমিল চমকে উঠে সেই রাজপ্রাসাদময় বাড়ির দিকে তাকাল। এর রঙ, জানালার কাঁচ এবং মেইন গেট বদলে গেছে। 


এটি আগের চেয়েও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছিল।


এই সেই বাড়ি, যেখানে সে তার জীবনের ২১টি বছর কাটিয়েছিল এবং যেখান থেকে এক রাতে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। 


আপাতদৃষ্টিতে 'বিদায়' বা রুকসতির ছলে তাকে এই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।


"বেল বাজাও বিলকিস!"


বিলকিস এগিয়ে গিয়ে বেল বাজাল। কয়েক মুহূর্ত পরই পায়ের শব্দ শোনা গেল, যেন কেউ দৌড়ে গেট খুলতে আসছে। তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল। এত বছর পর সে কাকে দেখতে যাচ্ছে?... ফাওয়াদ? হাসান? আগা জান?

দরজাটি ধীরে ধীরে খুলল এবং কেউ মাথা বের করে দেখল।


"জি, কার সাথে দেখা করবেন?" তার বেশভূষা আর কথা বলার ঢঙে মনে হলো সে একজন গৃহকর্মী।


বিলকিস উত্তরের জন্য মেহমিলের দিকে তাকাল, তখন মেহমিল সাহস সঞ্চয় করে বলল—


"আগা করিম কি বাড়িতে আছেন?"

গৃহকর্মীর চেহারায় কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা দিল।


"কোন আগা করিম?"


"আ... আগা করিম। যিনি এই বাড়ির মালিক। যাঁর এই বাড়ি এবং... এটি ২৩০ নম্বর বাড়ি তো, তাই না?"


"হ্যাঁ জি, এটি ২৩০ নম্বর। কিন্তু এটি তো চৌধুরী নজির সাহেবের কুঠি। এখানে তো কোনো আগা করিম থাকেন না।"


"বিবি! আমরা কি ভুল বাড়িতে চলে এলাম?" বিলকিস নিচু স্বরে বলল। তখন মেহমিল দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।


"না, এটিই সেই বাড়ি। আগা করিম সাত বছর আগে এখানেই থাকতেন।"


"সাত বছর তো দীর্ঘ সময় ম্যাডাম জি! খোদা জানে তাঁরা এখন কোথায় 

গিয়েছেন।


 আচ্ছা, আপনি দাঁড়ান, আমি বেগম সাহেবার কাছে জিজ্ঞেস করে আসছি।" সে তাদের ওখানেই রেখে ভেতরে চলে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর সে এক যুবকের সাথে ফিরে এল।


"জি বলুন?" ছেলেটি ছিল বছর ২০-২১-এর একজন মার্জিত ও ভদ্র যুবক।


"এখানে আগা করিম আর তাঁর পরিবার থাকত, তাঁরা কোথায় গিয়েছেন?"


"ম্যাম! আমরা দু'বছর হলো এখানে থাকছি। দু'বছর আগে আমরা আমির সাহেব নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এই বাড়ি কিনেছিলাম। 


হতে পারে আগা করিম তাঁর কাছে এই বাড়ি বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।"


"আগা জান এই বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন? কিন্তু কেন?" সে স্তম্ভিত হয়ে গেল।


"জানি না ম্যাম! আমি কি আপনার জন্য কিছু করতে পারি?"


মেহমিল ডানে-বামে মাথা নাড়ল। ছেলেটি ক্ষমা চেয়ে ভেতরে চলে গেল এবং সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় বসে রইল।


"বিবি! প্রতিবেশীদের কাছে জিজ্ঞেস করি।" বিলকিসের তার নিষেধ করার আগেই পাশের বাড়ির কলিং বেল টিপে দিল। এই বাড়িতে কে থাকত? খুব চেনা চেনা বাড়ি, কিন্তু মনে পড়ছিল না।


মাত্র এক মিনিট পরেই গেট খুলে গেল। মেহমিল ঘাড় উঁচু করে দেখল।

খোলা গেটের ওপাশে ব্রিগেডিয়ার ফুরকান দাঁড়িয়ে ছিলেন।


সালোয়ার কামিজে সজ্জিত, মুখে সুন্দর করে ছাঁটা দাড়ি এবং এক গাল হাসি নিয়ে তিনি মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখে মেহমিলের অনেক কিছু মনে পড়ে গেল।


"আসসালামু আলাইকুম মেহমিল গার্ল (Girl)! আমি অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে টেরেস থেকে দেখছিলাম। 


এসো, ভেতরে এসো।" তিনি গেট পুরোপুরি খুলে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালেন।


বিলকিস হুইলচেয়ার ঠেলে ভেতরে নিয়ে এল।


"এখানে চলে এসো।" তিনি লনের ঘাসে রাখা চেয়ারগুলো এমনভাবে সাজাতে লাগলেন যাতে হুইলচেয়ার রাখার জায়গা হয়।


"কেমন আছো তুমি?" তিনি সামনের চেয়ারে বসলেন এবং খুব মার্জিতভাবে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর একই রকম ছিল, তবে কঠোরতার বদলে সেখানে ছিল কোমলতা।


"ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ!" সে সামান্য হাসল এবং মাথা নিচু করল। তারপর কিছু ভেবে নিচু মাথায় বলতে লাগল—


"বেটা!" (বেটা বলে সম্বোধন করলেন ফুরকান)।


"আমার কয়েক বছর আগে একসেডেন্ট হয়েছিল, তাই—"


"আমি জানি। আমি তোমাকে দেখতে হাসপাতালে যেতাম।"


সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। সোনালি চোখে বিস্ময় নেমে এল।


"তাই? আর তারপর তার মনে পড়ে গেল—"হ্যাঁ, আমাকে নার্স বলেছিল। তাহলে আপনিই ছিলেন তিনি?"


"জি হ্যাঁ।" তিনি মৃদু হাসলেন। "তোমার আমানত ( pamphlets) আমার জীবন বদলে দিয়েছে।"


সে পলকহীন নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।


"আমি দু'বছর সেই প্যামফলেটগুলো খুলিনি। তারপর জীবনে এমন এক মোড় এল যে সবখানে অন্ধকার দেখতে লাগলাম, তখন না চাইতেও আমি সেগুলো খুললাম। আমার ধারণা ছিল কোনো সংগঠনের লিটারেচার (Literature) হবে বা কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার, কিন্তু সেগুলোতে তো কেবল কুরআনের আয়াত আর তার সহজ অনুবাদ ছিল। আমি পড়তে থাকলাম এবং তারপর... সব বদলে গেল... সব ঠিক হয়ে গেল।"


সংক্ষেপে তিনি সব কথা গুছিয়ে বললেন। মেহমিল নিঃশব্দে তাঁর কথা শুনছিল।


"তুমি কিছুদিন আগে বাড়ি শিফট করেছ, আমি খবর পেয়েছিলাম। এখন শরীরের অবস্থা কেমন?"


"আই এম ফাইন (I'm fine)।" তারপর মুহূর্তের বিরতির পর বলল, "আগা জানরা কোথায়? তাঁরা বাড়ি কেন বিক্রি করলেন?"


"যেদিন তাঁরা চলে গিয়েছিলেন, আমি দেশের বাইরে ছিলাম। কেবল গৃহকর্মীর কাছে শুনেছিলাম যে সম্ভবত তিন ভাই সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন এবং বাড়ি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে আলাদা আলাদা জায়গায় শিফট হয়ে গেছেন। 


তোমার একসেডেন্টের খবরও আমার গৃহকর্মীই দিয়েছিল।"


"এটি কবেকার কথা? কবে বিক্রি করেছেন তাঁরা বাড়ি?"


"তোমার দুর্ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর।"


"ওহ—" তার ঠোঁট কুঁচকে এল এবং সে দীর্ঘশ্বাস নিল। 


"আপনার কি কোনো ধারণা আছে তাঁরা কোথায় গিয়েছেন? এখন আমি তাঁদের কোথায় পাব?"


"একেবারেই না।" তিনি দুঃখ প্রকাশ করে মাথা নাড়লেন। "আমাদের কখনো অত ধারনা ছিল না। তবে আগা আসাদের ব্যাপারে আমি এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। সে ক্লাবে আগা আসাদের সাথে থাকত।"


তাঁর কথায় সে চমকে উঠল। হৃদপিণ্ড সজোরে ধড়ফড় করতে লাগল।


"কী শুনেছিলেন?"


"এটুকুই যে তাঁর ক্যান্সার হয়েছিল এবং পরে তিনি মারা যান। তুমি জানতে না?"


সে শ্বাস রুদ্ধ করে পাথরের মতো বসে রইল।


"আই এম ভেরি সরি (I am very sorry) মেহমিল!" তিনি সমবেদনা জানালেন।


"এটি... এটি কবে হয়েছে?" কয়েক মুহূর্ত পর তার ঠোঁট কাঁপল। চোখ যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে গিয়েছিল।


"সম্ভবত পাঁচ বছর আগে। তাঁদের বাড়ি বিক্রির ছ'সাত মাস পর।"


"আর... আর তাঁর বাচ্চারা? মুয়াজ আর মুইজ তো খুব ছোট ছিল।"


"জানি না। এতিম বাচ্চারা তো শেষ পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজনদের কর্তৃত্বেই থাকে। আল্লাহ তাঁদের ওপর রহম করুন।"


আর সেই 'এতিম বাচ্চা' শব্দটি মেহমিলের মনে বিঁধে গেল। অনেক আগে পড়া একটি আয়াত মনে পড়ল—


"এই লোকদের  ভয় পাওয়া উচিত যে, তারা যদি নিজেদের পেছনে অসহায় সন্তান রেখে যেত..." (আন-নিসা: ৯)



"এতিম বাচ্চা? আসাদ চাচার বাচ্চারা এতিম হয়ে গেছে? আরজু, মুয়াজ, মুইজ—" সে এখনও অবিশ্বাসে ডুবে ছিল।



এরপর সে কখন ব্রিগেডিয়ার ফুরকানকে বিদায় জানিয়ে বিলকিসের সাথে বাইরে এল, সে কিছুই বুঝতে পারল না। তার হৃদপিণ্ড আর মস্তিষ্ক কেবল একটি বিন্দুতেই থমকে গিয়েছিল—আসাদ চাচার বাচ্চারা এতিম হয়ে গেছে।


অবচেতনভাবে তার লাউঞ্জের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ল। সোফায় পড়ে থাকা মেহমিল এবং তাকে চড় আর জুতো দিয়ে মারতে থাকা আসাদ চাচা আর গুফরান চাচা।


গুফরান চাচা... জানি না তিনি কোথায় গিয়েছেন? আর আগা জান...

সবাই কোথায় হারিয়ে গেল?

সে তাঁদের কোথায় খুঁজবে?

কিন্তু সে তাঁদের কেনই বা খুঁজছে? সে নিজেকে প্রশ্ন করল—সে কি দেখতে চাচ্ছে যে তাঁরা তাঁদের কর্মের শাস্তি পেয়েছে কি না? যে এটিই প্রকৃতির নিয়ম? নাকি রক্তের সম্পর্কের টানে তাঁদের মনে করছে? সম্ভবত রক্তের টানই জয়ী হয়েছে।


 অথবা হয়তো স্বামী আর পুত্রের অবহেলার পর তার এখন একটি সম্পর্কের প্রয়োজন ছিল। হ্যাঁ, হয়তো এটিই কারণ।


সে এই চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে বাড়ি ফিরল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



পুরো অঞ্চলে ভোরের আলো ফুটে উঠেছিল, যখন সে হুইলচেয়ার নিজেই চালিয়ে লনে এল। ঘাসের ওপর শিশিরবিন্দু ছড়িয়ে ছিল। দূরে কোথাও পাখিদের কিচিরমিচির বা তসবিহ পাঠের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বিভিন্ন সুর, কিন্তু কথা একই—মানুষ তা না বুঝলে সেটি আলাদা কথা।

তখনই সে ধীরে ধীরে হুইলচেয়ার চালিয়ে 


দেয়ালের পাশ দিয়ে এগোতে লাগল। দেয়ালের ওপাশে মসজিদের ভবন। সকালে মসজিদের আঙিনায় শিশুদের নাজেরা ক্লাস হতো। 


সেখানে বাচ্চারা উচ্চস্বরে কুরআন পড়ত। তাদের তিলাওয়াতের সেই মৃদু আওয়াজ লনেও শোনা যাচ্ছিল।



সেই আওয়াজ আজও আসছিল। সে দেয়ালের পাশে হুইলচেয়ার থামিয়ে কান পেতে শুনতে লাগল। তারা সবাই 

​وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ نَّغْفِرْ لَكُمْ خَطَايَاكُمْ ۚ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ



​ওয়াদখুলুল বা-বা সুজ্জাদান ওয়া ক্বূলূ হিত্তাতুন নাগফির লাকুম খাতা-ইয়া-কুম; ওয়া সানাযীদুল মুহসিনীন।


*অনুবাদ: 


"এবং সিজদাহাবনত অবস্থায় প্রবেশ করো এবং বলো 'হিত্তাতুন' (ক্ষমাহ)। আমি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করব এবং অতি শীঘ্রই সৎকর্মশীলদের আরও বাড়িয়ে দেব।"


আজ সে দীর্ঘ সময় পর এই আয়াতটি শুনল। অবচেতনভাবেই সে কোলে রাখা কুরআনের পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগল।

এটি ছিল বনী ইসরায়েলের উপাসনালয়ে প্রবেশের গল্প।


 সূরা আল-বাকারার ৫৮ নম্বর আয়াত। যখন তারা 'হিত্তাতুন'-এর পরিবর্তে 

'হিন্তাতুন' বলেছিল। মেহমিল কখনোই এই গল্পটি পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। এখনও সে বিভ্রান্ত হয়ে সেই পৃষ্ঠাটি বের করল।

সেখানে সে বিশেষ কোনো নোট লেখেনি। হয়তো পুরনো রেজিস্ট্রারে (Register) আছে, যা আলাদা রাখা ছিল। 


সে হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। স্টাডিতে এক জায়গায় সে তার পুরনো নোটগুলো রেখেছিল। সে সেগুলো খুঁজতেই স্টাডিতে এল।


দরজা আধখোলা ছিল। সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।


হুমায়ুন পিছন ফিরে তাক থেকে কোনো বই বের করছিল। শব্দ শুনে ফিরে তাকাল। একবার দেখল এবং পুনরায় নিজের কাজে মন দিল। সেই অচেনা ভাব, শীতলতা আর উদাসীনতা—মেহমিল তাকে আর পাত্তা না দিয়ে ঘরের নির্দিষ্ট অংশের দিকে এগিয়ে গেল।

তার নোটগুলো সেখানেই রাখা ছিল। 


ওগুলোর ওপর ধুলোর আস্তরণ জমে ছিল, যেন গত কয়েক বছরে স্রেফ দায়সারাভাবে ঘরটি পরিষ্কার করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, ফারিস্তে একা আর কতটুকু দেখবে। তাকে কোনো একদিন স্টাডি রুম পরিষ্কার করাতে হবে। সে ভাবতে ভাবতে কাঙ্ক্ষিত রেজিস্টারটি খুঁজতে লাগল।


অনায়াসেই রেজিস্টারটি তার সামনে চলে এল। ওটার ওপর হালকা ধুলোর স্তর ছিল। মেহমিল সেটি বাঁকা করে মুখের সামনে আনল এবং ফুঁ দিল। ধুলো উড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।


"আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাই (I want to leave you)।" হুমায়ুন কোনো ভূমিকা ছাড়াই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কথাটি বলল।


মুহূর্তের জন্য মেহমিলের মনে হলো—সেই ধুলোবালি রেজিস্টার থেকে উড়ে সবখানে অন্ধকার সৃষ্টি করছে।


 সে কষ্টে ঘাড় ফিরিয়ে হুমায়ুনের দিকে তাকাল। হুমায়ুন নিরাসক্তভাবে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল।


"আমার মানে হলো পূর্ণ বিচ্ছেদ। আমি আর এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাই না, তাই আমাকে আমার পায়ের বেড়ি খুলতে দাও। 



সানি (তৈমুর) আমাদের দুজনেরই ছেলে এবং তার বয়স সাত বছর হয়েছে। তার কাস্টডির (Custody) সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দাও।"


ধুলো সম্ভবত তার চোখেও পড়েছিল। চোখ লাল হয়ে আসছিল। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে শুনছিল।


"যদি সানি তোমার সাথে থাকতে চায়, তবে আমি তাকে আমার সাথে থাকার জন্য বাধ্য করব না। আর যদি সে আমার সাথে থাকতে চায়, তবে তুমি তাকে বাধ্য করো না। 


যা-ই সিদ্ধান্ত নাও, আমাকে জানিয়ে দিও। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।" সে বই শ্যালফে রাখল এবং মেহমিলের দিকে না তাকিয়েই লম্বা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


সে তীব্র মানসিক আঘাতে পাথরের মতো বসে রইল। অসীম নিষ্ঠুরতার সাথে সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল।




সে মাথা ঝাড়া দিল।

হুমায়ুন কি এভাবেই তাকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে?

যদি করে তবে করতে দাও, আমি তাকে ছাড়া মরে যাব না। হঠাৎ সে মাথা ঝাড়া দিল।


*চোখ অশ্রু ঝরায়*


*এবং হৃদয়*


*দুঃখিত*


*আমরা মুখ দিয়ে কেবল তাই বলব, যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন।*

হাদিসের অংশ: > "চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে তা-ই বলি যা আমাদের রবের পছন্দ। হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই শোকাহত।"

উৎস: > * সহীহ বুখারী: হাদিস নং ১৩০৩

  • সহীহ মুসলিম: হাদিস নং ২৩১৫

নিজের অজান্তেই সেই নিচু স্বরটি তার কানে প্রতিধ্বনিত হলো। তার হৃদয় যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থিরতা পেল।

সে রেজিস্টারটি খুলল। 



নোটসে সেই ঘটনার ব্যাপারে কেবল এটুকু লেখা ছিল যে—হায়কল-এ প্রবেশের পূর্বে বনী ইসরাইলকে যখন বলা হলো যে, সওয়ারি থেকে ঝুঁকে পড়ে বিনম্রতার সাথে হিত্তাতুন (Hitta'tun) অর্থাৎ "ক্ষমা" বলতে বলতে প্রবেশ করো, তখন তারা উপহাস করে জিহ্বা বাঁকিয়ে হিন্তাতুন (Hinta'tun) বলতে বলতে দরজা দিয়ে প্রবেশ করল।



হিন্তাতুন (Hinta'tun) মানে হলো গম। এরপর পৃষ্ঠাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।

সে মন থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে এই শব্দগুলোর ওপর মনোযোগ দিল এবং পুনরায় বিভ্রান্তিতে পড়ল।


 সেই ঘটনাটি তার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছিল। বনী ইসরাইলের মতো মেধাবী আর বুদ্ধিমান জাতি কেন এমন করল? তারা গম কাকে বলল? যখন তাদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তখন তারা গম গম কেন বলল? একদিকে তারা এতটাই প্রখর ছিল যে হিত্তাতুন-এর সাথে মিল রেখে শব্দ খুঁজে এনেছিল, আর অন্যদিকে সেই শব্দটি বলার কোনো অর্থই হয় না। শেষ পর্যন্ত কেন তারা সঠিক শব্দটি বলল না? হিন্তাতুন কেন বলল?



সে কিছুই বুঝতে পারল না এবং কুরআন বন্ধ করে রেখে দিল। হৃদয় এতটাই রিক্ত ছিল যে তাফসির খুলে বিস্তারিত পড়ার ইচ্ছাও হলো না। কানে তখনও হুমায়ুনের শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।


একটি অশ্রুবিন্দু তার চোখ থেকে গড়িয়ে গাল বেয়ে নিচে নেমে এল।


"তুমি যে অবস্থায় রাখো আমার মালিক! আমি তাতেই সন্তুষ্ট।" 


আর অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল।



🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


তৈমুর পাউরুটির ছোট ছোট টুকরো খাচ্ছিল। ডাইনিং টেবিলে সে ছাড়া আর কেউ ছিল না।


মেহমিল হুইলচেয়ার চালিয়ে ডাইনিং হলে ঢুকলে সে শব্দ শুনে চমকে উঠল। লোকমা ভাঙা ছোট ছোট হাত থেমে গেল এবং সে মাথা তুলল। 


মেহমিলকে আসতে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে পাউরুটির অবশিষ্ট অংশ প্লেটে ছুড়ে মারল এবং চেয়ার পেছন দিকে ঠেলে দিল।


"বসো তৈমুর! তোমার সাথে আমার কথা আছে।"


"আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টক টু ইউ (I don't want to talk to you)। (আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই না)" সে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।


"কিন্তু আমাকে বলতে হবে। আর এটি তোমার ড্যাডের (Dad) মেসেজ, আমার নয়।"


"what(কি)?" সে এক মুহূর্তের জন্য থামল, কপালে ভাঁজ আর ভ্রু কুঁচকে রইল।


"হয়তো আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাব। হয়তো আমরা আর একসাথে থাকব না। আমি আর তোমার ড্যাডি।"


"আই ডোন্ট কেয়ার (I don't care)।"


"তৈমুর! তুমি কার সাথে থাকতে চাইবে? আমার সাথে নাকি ড্যাডির সাথে?" সে জানত তৈমুরের উত্তর তার পক্ষে হবে না, তবুও জিজ্ঞেস করল।


"কারো সাথেই না।" সে বিরক্তি নিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।


"কিন্তু বেটা! তোমাকে তো কারো সাথে থাকতেই হবে।"


"আমি কি আপনার চাকর যে কারো সাথে থাকব? জাস্ট লিভ মি অ্যালোন (Just leave me alone)।" সে হঠাৎ উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল এবং চেয়ারে লাথি মেরে ভেতরে চলে গেল।


সে আফসোসের সাথে ছেলেকে দূরে চলে যেতে দেখল। এই তিক্ত কণ্ঠস্বর, এই বদমেজাজ, এই অন্তরে জমা বিষ—এগুলো তৈমুরের ভেতরে কে ঢুকিয়ে দিল?


আর তার বাবাকে দোষারোপ করার আগেই, একটি দৃশ্য তার চোখের সামনে ফুটে উঠল—


জিন্স আর কুর্তা পরা, উঁচু করে পনিটেইল বাঁধা এক মেয়ে, চেহারায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে চেঁচাচ্ছে—


"আমি কি আপনার বাবার চাকর যে এটি করব?"


মেহমিলের সামনে তখন অনেকগুলো মুখ ছিল—কখনো মেহতাব তায়ি আম্মা, কখনো মুসররাত, কখনো কাজিনরা, তো কখনো কোনো চাচা।


তার সেই ঠোঁটকাটা, বদমেজাজি আর তিক্ত মেয়েটির কথা মনে পড়ল এবং তার শরীর শিউরে উঠল।


কথায় আছে—কেউ তার বড়দের সাথে যা করে, তার ছোটরাও তার সাথে তাই করে। কেউ একজন তার ভেতরে কথা বলে উঠল।


পথ তো একটাই, মানুষ তাতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হাঁটে এবং শেষে আবার নিজের পায়ের ছাপ অনুসরণ করেই ফিরে আসে। 


যারা বিষবৃক্ষ রোপণ করে যায়, তারা রক্তাক্তকারী কাঁটাই পায়। আর যারা ফুল ছিটিয়ে যায়, তাদের জন্য বাগান অপেক্ষা করে।


"মেহমিল!" কেউ ডাকলে সে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরল এবং জোরে চোখ রগড়াল।


"আমি কি ঠিক শুনেছি?" ফারিস্তে যেন অবিশ্বাসে মেহমিলের সামনে এল।


"কী?" সে নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা তুলল।


"মেহমিল! তুমি আর হুমায়ুন... তোমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছ?" সে অবাক হয়ে মেহমিলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল এবং মেহমিলের কোলে রাখা হাত দুটির ওপর নিজের হাত রাখল।


"হ্যাঁ... হয়তো।"


"কিন্তু... তুমি এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলে?" সে অস্থির হয়ে মেহমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর খুঁজছিল।


"আমি নিইনি। হুমায়ুন নিয়েছে।"


"সে কি নিজে তোমাকে এটি বলেছে?"


"হ্যাঁ।"


"তবে তুমি মেনে নিলে?" সে অবিশ্বাসে ছিল।


"আমার কাছে কি আর কোনো চয়েস (Choice) আছে?"


ফারিস্তে একদৃষ্টে তার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।


"ফারিস্তে! আমার ইখতিয়ারে না কাল কিছু ছিল, না আজ আছে। হুমায়ুন সিদ্ধান্ত জানানোর ছিল, জানিয়ে দিয়েছে। সে যদি আমার সাথে থাকতে না চায়, তবে কি আমি তাকে বাধ্য করব? না।" সে দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।


 "সে যদি বিচ্ছেদই চায়, তবে ঠিক আছে। আমি মিটমাটের শেষ চেষ্টা অবশ্যই করব। কিন্তু তার কাছে ভিক্ষা চাইব না।"


"তারপর... তারপর কী করবে? কোথায় যাবে?"


"ফারিস্তে! আমি হুমায়ুনের মুখাপেক্ষী নই। আল্লাহর দুনিয়া অনেক বড়। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যেকোনো জায়গায় চলে যাব।"


"তুমি তাকে ছাড়া থাকতে পারবে?"


"সে কি আমাকে ছাড়া থাকছে না?" সে ম্লান হাসল।


"কিন্তু তুমি কি খুশি থাকতে পারবে?"


"যদি আল্লাহ আমার তকদিরে খুশি লিখে রাখেন, তবে তা আমি পাবই। হুমায়ুন আমার সাথে থাকুক বা না থাকুক।"


ফারিস্তে আফসোসের সাথে তার দিকে তাকিয়ে রইল।


"আই এম ভ্যারি সরি (I am very sorry) মেহমিল! যদি তুমি বলো তবে আমি তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলাতে—"


"না।" সে দ্রুত ফারিস্তের কথা থামিয়ে দিল। "আপনি এই বিষয়ে কিছু বলবেন না।"


"কিন্তু একবার মিটমাটের চেষ্টা তো—"


"প্লিজ ফারিস্তে! আমাকে ভিখারি বানাবেন না।" সে এতটাই অসহায়ভাবে কথাটি বলল যে ফারিস্তে ঠোঁট কামড়ে চুপ হয়ে গেল।


"কিন্তু সে এমন কেন করছে? সে কি তোমাকে কোনো কারণ বলেছে?"


"আমি কি জানি না? হুহ্!" সে তিক্ততা নিয়ে মাথা ঝাড়া দিল।


 "সে একজন পঙ্গু নারীর সাথে কতদিন থাকবে? কতদিন আমার সেবা করবে? সে আমার অসুস্থতায় তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে। আমি জানি।"


"এটাই কি একমাত্র কারণ?"


"তাছাড়া আর কী হতে পারে?"


"ওয়াল্লাহু আলাম (আল্লাহ ভালো জানেন)। যাই হোক, যা-ই করবে ভেবেচিন্তে করবে। 


যদি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলো, তবে নিজের মনকেও রাজি করিও।" এই বলে ফারিস্তে মেহমিলের হাত থেকে হাত সরিয়ে নিল এবং আলতো করে তার গাল চাপড়ে উঠে দাঁড়াল।


"কেবল এটুকু মনে রেখো যে আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি এবং যতক্ষণ না তুমি সুস্থ হচ্ছ, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না, ওকে!"


মেহমিল সজল চোখে হেসে ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়ল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


হুমায়ুন যখন থেকে বিচ্ছেদের কথা বলেছিল, সে ফারিস্তের সামনে নিজেকে যতই ধৈর্যশীল আর কৃতজ্ঞ হিসেবে প্রকাশ করার চেষ্টা করুক না কেন, ভেতর থেকে সে অনবরত ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। 


তার স্মৃতিতে হুমায়ুনের সাথে কাটানো মাত্র একটি বছরই অবশিষ্ট ছিল। বাকি মাস আর বছরগুলো মনের পর্দায় দাগ না কেটেই যেন সরে গিয়েছিল।


আর সেই একটি বছর যা সে এই বাড়িতে ভালোবাসা আর আদরের মাঝে 


কাটিয়েছিল... যখন তারা দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। সেই ক্যান্ডল লাইট ডিনার (Candlelight dinners), সেই লং ড্রাইভ (Long drives), প্রতিদিন হুমায়ুনের জন্য সাজগোজ করা, রাতে ছাদে গিয়ে গল্প করা, একসাথে শপিং (Shopping) করা... প্রতিটি বিষয় তার স্মৃতিতে কোনো সিনেমার মতো বয়ে যাচ্ছিল এবং প্রতিটি স্মৃতি তার হৃদয়ে নতুন করে অশ্রু ঝরাচ্ছিল।


আর তৈমুরও যদি তার সাথে না থাকে, তবে সে কী করবে? কোথায় যাবে? যদি হুমায়ুন তাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তবে সে কোথায় থাকবে? তার চাচাদের কাছে? তারা কি তাকে রাখবে? নাকি ফারিস্তের সাথে থাকবে? কিন্তু ফারিস্তে তো নিজেই একা। 


হুমায়ুনের বাড়িতে সে একজন অতিথি। তবে মেহমিল কী করবে?


মনে হচ্ছিল প্রখর রোদের মাঝে তাকে এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। না আছে ছাদ, না আছে ছায়া। ভবিষ্যতের ভয় কোনো এক ভয়ানক প্রেতের মতো তার হৃদয়ে সেঁটে গিয়েছিল। 


বারবার এই প্রশ্নগুলো মনে জাগছিল এবং সে খুব কষ্টে সেগুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল।


আর শেষ পর্যন্ত সে আর কতদিন এভাবেই এড়িয়ে চলবে? কখনো না কখনো তো তাকে এগুলোর জবাব পেতে হবে। আর যে বই থেকে সবসময় জবাব মিলত, তার পাতাগুলো বারবার একই আয়াতের ওপর খুলে যাচ্ছিল। 


কখনো এক জায়গায় খুলত তো কখনো অন্য জায়গায়। আর সেই একই কাহিনী সামনে আসত।


*"এবং সিজদাহাবনত অবস্থায় প্রবেশ করো এবং বলো 'হিত্তাতুন' (ক্ষমা)।"*



কিন্তু হায়কল-এ-সুলাইমানির (Solomon's Temple) সেই প্রবেশদ্বার কোথায় ছিল? সে তো নির্বাসিত হয়ে শহর থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিল। তবে সে ভেতরে ঢুকবে কীভাবে?



সেই বিকেলটি ছিল বড্ড ফ্যাকাসে। বিলকিস তাকে বিছানা থেকে হুইলচেয়ারে (Wheelchair) বসিয়ে বাইরে নিয়ে এল।


তৈমুর লাউঞ্জে (Lounge) সোফার ওপর বইপত্র ছড়িয়ে বসে ছিল। মেহমিলকে আসতে দেখে সে একবার নিঃশব্দে তাকাল এবং পরক্ষণেই আবার বইয়ে নজর নিবদ্ধ করল। মেহমিল তৃষ্ণার্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না বিলকিস হুইলচেয়ার লাউঞ্জের প্রধান ফটকের কাছে নিয়ে এল।



দরজার কাঁচের ওপর আঁকা নকশা আর কারুকার্যের ফাঁক দিয়ে সে সোফায় বসা তৈমুরের মুখটি দেখতে পেল, যে খুব নিবিড়ভাবে তাকে বাইরে যেতে দেখছিল।

বিলকিস হুইলচেয়ার লনে নিয়ে এল। তাজা বাতাসের ঝাপটা মুখে লাগতেই মেহমিলের বাদামী চুলগুলো পেছনে উড়তে লাগল। 


সে চোখ বুজে মুহূর্তের জন্য আবহাওয়ার সতেজতা নিজের ভেতরে অনুভব করতে চাইল। তখনই দেয়ালের ওপাশ থেকে একটি অস্পষ্ট গুঞ্জন কানে এল।



*"আর শপথ রাতের যখন তা ছেয়ে যায়।"*


সে চমকে চোখ খুলল। তার বাড়ি আসার প্রায় এক মাস হতে চলল, কিন্তু সে কখনো মসজিদে যায়নি। জানি না কেন?


"বিলকিস! আমাকে মসজিদে নিয়ে চলো।" হঠাতই তার মন চঞ্চল হয়ে উঠল।

বিলকিস বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে হুইলচেয়ারের মুখ ঘুরিয়ে দিল।


"ফারিস্তে কোথায়?" সে ভাবল তাকেও সাথে নিয়ে নেবে।


"তিনি খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।"


"আচ্ছা ঠিক আছে।" সে জানত ফারিস্তে ক্লান্ত হয়ে থাকবে। সকালেও সে ফিজিওথেরাপিস্টের (Physiotherapist) সাথে মেহমিলের ব্যায়াম এবং মালিশ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারপর বাজার করা আর ঘরের তদারকি। সে সন্ধ্যায় মসজিদে যাবে। তাই এখন কেন তাকে অযথা কষ্ট দেওয়া? সে ফারিস্তেকে ডাকার ইচ্ছা ত্যাগ করল।


মসজিদের সবুজ ঘাসে ঢাকা লনটি আগের মতোই সুন্দর ছিল, যেমনটি সে ছেড়ে গিয়েছিল। সাদা স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আলিশান ও উঁচু ইমারত। ঝকঝকে মার্বেল পাথরের বারান্দা... কোণায় রাখা সতেজ সবুজ টব। কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী থেকে দূরে, হাঙ্গামামুক্ত এক নিথর ও শান্ত পরিবেশ।


মসজিদের ভেতরে যেন এক অন্য জগত। শীতল, সতেজ আর মর্যাদাপূর্ণ এক জগত। এর দেয়াল থেকে যেন প্রশান্তি ঝরে পড়ছিল।


সে ছোট বাচ্চার মতো আনন্দে প্রফুল্ল হয়ে উঠল। চোখে এক নতুন দ্যুতি ফুটে উঠল এবং সে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিটি জিনিস দেখে নিতে চাইল।


 বিলকিস ধীরে ধীরে হুইলচেয়ার সামনে এগিয়ে নিয়ে গেল।



বারান্দার ঝকঝকে মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে অনবরত মেয়েরা ওঠানামা করছিল। সাদা ইউনিফর্মের ওপর হালকা সবুজ হিজাব (Scarf) পরা সেই হাস্যোজ্জ্বল মেয়েগুলো হাতে কুরআন আর বই নিয়ে একে অপরকে হাসিমুখে সালাম দিচ্ছিল।


"ওয়ালাইকুম আসসালাম, ওয়ালাইকুম আসসালাম।" সে হাসিমুখে প্রত্যেকের সালামের জবাব দিচ্ছিল। সে সেখানে কাউকে চিনত না এবং কেউ তাকে চিনত না। 


তবুও সালাম করা এবং সালামে আগে হওয়ার আকুলতা নিয়ে প্রত্যেকেই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সালাম দিচ্ছিল। তার প্রতিটি শিরা-উপশিরা খুশিতে ভরে উঠছিল। 


এই পরিবেশ, এই দেয়াল... এগুলো তো তার সত্তার অংশ ছিল। সে কীভাবে এতদিন এগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল?

সে সজল চোখে হাসতে হাসতে হুইলচেয়ারে বসে সবার সালামের জবাব দিচ্ছিল। কেউ থেমে গিয়ে দয়া করে জিজ্ঞেস করেনি তার কী হয়েছে। কেউ করুণার দৃষ্টিতে তাকায়নি। 


না ছিল কোনো কৌতূহল, না ছিল কোনো অনধিকার চর্চা। সে কোণায় হুইলচেয়ারে বসে সব কোলাহল দেখছিল।


বেশ অনেকক্ষণ সে সেখানেই বসে রইল, যতক্ষণ না বিলকিস বাজারে (Center) যাওয়ার অনুমতি চাইল।


"রাতে সাহেবের কোনো সরকারি মেহমান আসার কথা আছে। ফারিস্তে বিবি আমাকে গোশত কাটতে বলেছিলেন, আমি ভুলেই গেছি। আপনি বসুন, আমি নিয়ে আসছি।"


"না, আমিও তোমার সাথে যাব। আজ খুব ইচ্ছে করছে দুনিয়াটাকে আবার দেখার।"

মেহমিলের চেহারায় এক ঐশ্বরিক আভা ছড়িয়ে ছিল। এই পরিবেশে এসে সে যেন খুব আনন্দিত হয়েছিল এবং সেই আনন্দকে বুকে মেখে সে এখন পৃথিবীর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।


 আজ তার বাজার যেতে ভয় লাগছিল না।


বিলকিস অভ্যাসবশত ছোটখাটো গল্প করতে করতে হুইলচেয়ার ঠেলে সেন্টারে নিয়ে এল। সেন্টারটি সেখান থেকে বেশ কাছে ছিল। সে গোশত আনতে দোকানের ভেতরে চলে গেল আর মেহমিল বাইরে বসে রইল।



গাড়িগুলো খুব দ্রুতগতিতে যাচ্ছিল। মানুষ খুব চিৎকার করে কথা বলছিল। মোটরসাইকেলগুলো বিকট শব্দ করছিল।


 আলোগুলো ছিল খুব তীব্র।

অল্প সময়ের মাঝেই সব প্রশান্তি উবে গেল। তার মন অস্থির হয়ে উঠল।


"তাড়াতাড়ি করো বিলকিস!" সে প্যাকেট হাতে দোকান থেকে বের হতেই মেহমিল অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।


"এই তো হয়ে গেছে। এই সামনের প্লাজা (Plaza) থেকে তৈমুর বাবার জন্য পরোটা নিয়ে নিই, নয়তো বাবা খাবে না। বিবি! মাত্র পাঁচ মিনিট।"


বিলকিস দ্রুত হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে বলছিল। মেহমিল বিরক্তি আর অস্থিরতা নিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। সেই দ্রুতগামী গাড়িগুলো তার খুব খারাপ লাগছিল। এমন কোনো এক গাড়িই তাকে ধাক্কা দিয়েছিল।



বিলকিস একটি ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টের (Fast food restaurant) সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে চলে গেল। 


সে রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সেই গাড়িটির কথা মনে করতে লাগল যা তাকে ধাক্কা দিয়েছিল। জানি না সে কে ছিল? ধরা পড়েছে কি না? হুমায়ুন কি মামলা করেছে? তাকে কি জেলে পাঠানো হয়েছে? কিন্তু মামলা করে তো তার ক্ষতিপূরণ সম্ভব ছিল না।


"যাক গে... আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি।"


সে মাথা ঝাড়া দিল এবং অস্থির প্রতীক্ষায় রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকাল। বিলকিস জানি না কোথায় হারিয়ে গেল।



সে এভাবেই উদাসীনভাবে নজর এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছিল এবং হঠাতই প্রবলভাবে থমকে গেল।


রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়ালের ওপাশের দৃশ্য ছিল একদম পরিষ্কার।


কোণার টেবিলে বসে হাসিমুখে মানিব্যাগ (Wallet) খুলছে—সে তো হুমায়ুনই ছিল। 


সে পলকহীন চোখে তার সেই হাসি দেখতে লাগল। তার কি হাসির কথা মনে ছিল? সে কি হাসতেও জানত?


আর তখনই তার নজর হুমায়ুনের বিপরীতে বসা মেয়েটির ওপর পড়ল। 


কাঁধ পর্যন্ত ছোট করে ছাঁটা চুল (Shoulder-cut hair), হাতাকাটা কামিজ (Sleeveless shirt), ওড়নার বালাই নেই, ধনুকের মতো প্লাক করা ভ্রু (Eyebrows)... সে হাসতে হাসতে কিছু বলছিল আর হুমায়ুন মাথা ঝাড়া দিয়ে অনবরত হেসে যাচ্ছিল।


এই মেয়েটিকে সে খুব ভালোভাবে চিনত। সে ছিল আরজু... এবং সত্যিই আরজুই ছিল। 


হুমায়ুন এখন মানিব্যাগ থেকে কয়েকটা নোট বের করে কিছু বলছিল আর মেয়েটি হাসতে হাসতে মাথা নাড়ছিল। দুজনের মাঝে ঘনিষ্ঠতা ছিল স্পষ্ট।



তো এই ছিল কথা হুমায়ুন দাউদ! তুমি শেষ পর্যন্ত আরজুকেই খুঁজে পেলে?



সে দুঃখে ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাড়া দিল। ফারিস্তে ঠিকই বলত—নিশ্চয়ই কারণ অন্য কিছু ছিল। 


তার পঙ্গুত্ব তো কেবল একটি বাহানা ছিল। আসল কারণ তো সেই ধনুকাকৃতির ভ্রু ওয়ালি ধূর্ত মেয়েটি, যে তার স্বামীর সাথে প্রকাশ্যে ফ্লার্ট (Flirt) করছিল।



সে বলেছিল যে সে হুমায়ুনকে মেহমিলের কাছ থেকে কেড়ে নেবে, সে ঠিকই বলেছিল—মেহমিল যন্ত্রণার সাথে ভাবল।


মাগরিবের আজান হচ্ছিল যখন বিলকিস হুইলচেয়ার ঠেলে বাড়ির গেটে ঢুকল।


মেহমিলের সামনে একটি দৃশ্যই ভাসছিল—কোণার টেবিলে বসা হাসিখুশি দুটি মানুষ। একজন চেনা পুরুষ, আর একজন চেনা নারী।


সে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে স্তব্ধ হয়ে হুইলচেয়ারে বসে ছিল। 


বিলকিস কখন তাকে ঘরে নিয়ে এল, সে কিছুই টের পেল না।


কেউ তার কাঁধ স্পর্শ করলে সে চমকে উঠল এবং ঘাড় তুলে সামনে তাকাল।

ফারিস্তে অবাক হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হলুদ সালোয়ার কামিজ পরা, ওড়না কাঁধে ছড়ানো, ভেজা বাদামী চুলগুলো গুছিয়ে ডান কাঁধে রাখা। 


সম্ভবত সে মাত্রই গোসল করে এসেছে।


"কোথায় হারিয়ে গেলে মেহমিল? কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোমাকে!" সে হাঁটু গেড়ে কার্পেটের ওপর বসল এবং মেহমিলের দুই হাত নিজের হাতে নিল।


 ডান কাঁধে রাখা ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরে তার জামা ভিজিয়ে দিচ্ছিল।


"আপনি ঠিকই বলতেন ফারিস্তে!" সে যেন হেরে গিয়েছিল। 


ফারিস্তের মনে হলো মেহমিল কাঁদছে, কিন্তু তার চোখের জল বাইরে নয়, ভেতরে ঝরছিল।


"আমি আজ নিজে তাদের দুজনকে দেখেছি।"


"কাদের দুজনকে?" সে ভীষণ চমকে উঠল।


"হুমায়ুন আর... আর আরজুকে।"


"আরজু... আসাদ আঙ্কেলের মেয়ে আরজু?"


"হ্যাঁ ওই-ই। আচ্ছা আসাদ চাচা কি মারা গেছেন?"


"তুমি তাদের কোথায় দেখলে?" সে মেহমিলের প্রশ্ন এড়িয়ে গেল।


"সেন্টারের একটা রেস্টুরেন্টে। তারা লাঞ্চ (Lunch) করছিল বা হয়তো হাই-টি (High tea)। 


ফারিস্তে! হুমায়ুন হাসছিল। আমি তো ভেবেছিলাম সে হাসতেই ভুলে গেছে।"


"কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে... জানি না—" সে দ্বিধান্বিত ছিল, কিছু বলতে বলতে থেমে গেল।


"আমি জানি, সে আরজুর কারণেই আমার সাথে এমন করছে। সে বলেছিল সে হুমায়ুনকে আমার থেকে কেড়ে নেবে। আর সে তা করে দেখিয়েছে।


 আচ্ছা সে কি কখনো এই বাড়িতে এসেছে?"


"হ্যাঁ, সে প্রায়ই আসত। কিন্তু তুমি বাড়ি শিফট করার পর সে আর কখনো আসেনি।"


"তাই?" সে অবাকও হলো আবার রাগও লাগল। শেষ পর্যন্ত কোন অধিকারে সে এই বাড়িতে আসত?


"আপনি তাকে বের করে দেননি কেন? ভেতরে আসতে দিলেন কেন?"


"এটি আমার বাড়ি নয় মেহমিল! আমার সেই অধিকার নেই।"


মেহমিল চুপ হয়ে গেল। তার আর কিছু বলার ছিল না।


"হুমায়ুনের কিছু অতিথি আসবে ডিনারে। এখনই এসে পড়বে হয়তো, আমি একটু রান্নাঘরটা দেখে নিই।" সে মেহমিলের হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভেজা চুল কাঁধ থেকে গড়িয়ে পিঠে পড়ল।


"আপনি... আপনি খুব ভালো ফারিস্তে!" সে না বলে পারল না।


"সেটা তো আমি জানি।" সে মৃদু হাসল এবং হলুদ ওড়নার আঁচল মাথায় দিল, তারপর মুখমণ্ডলের চারপাশ দিয়ে ওড়নাটা এমনভাবে পেঁচিয়ে কাঁধে রাখল যাতে চুল আর কান ঢেকে যায়।


"তুমি বিশ্রাম নাও।" সে বাইরে চলে গেল আর মেহমিল বিষণ্ণ ও রিক্ত মনে সেখানেই বসে রইল।


বাইরে থেকে কোলাহলের মৃদু আওয়াজ আসছিল। অনেকক্ষণ পর সে জানালা দিয়ে দেখল হুমায়ুনের গাড়ি আসছে। সাথে দুই-তিনজন সম্মানিত ব্যক্তিও ছিলেন।


 হুমায়ুন সেই পোশাকেই ছিল যে পোশাকে বিকেলে আরজুর সাথে বসে ছিল। অর্থাৎ সে সত্যিই সে-ই ছিল, মেহমিলের কোনো ভুল ছিল না।


সে আক্ষেপের সাথে জানালা দিয়ে তাদের ভেতরে যাওয়া দেখছিল। তার ঘরে অন্ধকার নেমে এসেছিল। বাইরের আলোতে তারা মেহমিলকে দেখতে পাচ্ছিল না, আর সেই মানুষটি (হুমায়ুন) তো হয়তো আর কখনো তাকে দেখবেও না। তার কাছে এখন ভালো বিকল্প আছে—তরুণী, স্টাইলিশ (Stylish), প্রাণবন্ত এক নারী। যদিও সে মেহমিলের মতো সুন্দরী ছিল না, তবুও তার পরিপাটি সাজসজ্জা 'বর্তমান' মেহমিলের চেয়ে রূপবতী মনে হচ্ছিল।


কখনো কি পরিস্থিতি বদলাবে? কখনো কি হুমায়ুন ফিরে আসবে? কখনো কি তার পঙ্গুত্ব দূর হবে? কখনো কি তৈমুর তার কাছে আসবে? এই বাড়ি কি তার থাকবে? নাকি সে গৃহহীন হয়ে যাবে? সে কি নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে?



ভেতরের ভয় আর অসহায়ত্ব চোখের জল হয়ে গাল বেয়ে পড়তে লাগল। ভবিষ্যৎ এক ভয়ানক কালো পর্দার মতো চারদিকে ছেয়ে যাচ্ছিল। সে যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করল।


*"আল্লাহ সেই সবকিছুর চেয়ে বড়, যাকে আমি ভয় পাই।"*


রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার এই একটি বাক্য সে বারবার মনে মনে আওড়াচ্ছিল। যতক্ষণ না ভেতরের যন্ত্রণা কিছুটা কমল এবং প্রশান্তি এল, সে দোয়ার জন্য হাত তুলল।


"যদি এই মানুষগুলো আমাকে ছেড়ে দেয়, বের করে দেয়, তবে আমাকে কোনো মূল্যহীন মানুষের হাতে সোপর্দ করো না মালিক! কোনো আশার পথ দেখাও, কোনো আলো দেখাও।" সে ঠোঁট না নাড়িয়েই দোয়ার জন্য তোলা হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখের জল একইভাবে বয়ে যাচ্ছিল।


কাঁদতে কাঁদতে যখন বুক হালকা হলো, সে মুখ মুছল এবং সাইড টেবিল থেকে সেই সাদা কভারের কুরআনটি তুলল। এর সামনে সেই অস্পষ্ট 'মীম' অক্ষরটি একইভাবে লেখা ছিল।


তার মনে ছিল না সে শেষবার কোথায় তিলাওয়াত থামিয়েছিল। কোনো চিহ্ন দেওয়া আছে কি না তাও জানত না। কেবল যেখান থেকেই পৃষ্ঠাটি খুলল, সে পড়া শুরু করল।


 অবচেতনভাবে সে আল্লাহর কাছ থেকে পথনির্দেশ চাচ্ছিল।

সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩


​وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ


​​ওয়া মান আহসানু ক্বাওলাম মিম্মান দা‘আ- ইলাল্লা-হি ওয়া ‘আমিলা স-লিহাও ওয়া ক্ব-লা ইন্নানী মিনাল মুসলিমীন।

*"আর কার কথা সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকে, নেক আমল করে এবং বলে—নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।"*


সে পরবর্তী আয়াতটি পড়ল।

সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪

​وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هي أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ


​ওয়ালা- তাস্তাওয়িল হাসনাতু ওয়ালাস্ সাইয়িআতু; ইদফা‘ বিল্লাতী হিয়া আহসান, ফাইযাল্লাযী বাইনাকা ওয়া বাইনাহূ ‘আদা-ওয়াতুন কাআন্নাহূ অলিয়্যুন হামীম।

*"আর ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না। সুতরাং (মন্দকে) সেই পদ্ধতিতে দূর করো যা সর্বোত্তম। ফলে হঠাতই সেই ব্যক্তি যার আর তোমার মাঝে শত্রুতা ছিল, সে এমন হয়ে যাবে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু (Hamim)।"*


সে বিস্ময়ের সাথে আয়াতগুলো দেখল। এখনও কি কোনো আশা ছিল যে সেই মানুষটি তার অন্তরঙ্গ বন্ধু হতে পারে? এখন তো আর কিছুই বাকি নেই, সব শেষ হয়ে গেছে।


সে আয়াতটি আবার পড়ল।


বড্ড অদ্ভুত এক ব্যাপার। আজই সে তার স্বামীকে অন্য এক নারীর সাথে আনন্দ করতে দেখে এসেছে। সেই স্বামীকে যে তাকে স্পষ্টভাবে বিচ্ছেদের কথা বলে দিয়েছে। তার নিজের সন্তান তাকে ঘৃণা করে। তার অতিমাত্রায় আশাবাদী বোনটিও আজ চুপ ছিল, সেও আজ কোনো আশা দেয়নি কারণ হুমায়ুনের আচরণ সবার সামনে স্পষ্ট ছিল।

সে আবার পড়ল।

সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৪-৩৫

​...فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ (৩৪) وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ (৩৫)



​৩৪. ...ফাইযাল্লাযী বাইনাকা ওয়া বাইনাহূ ‘আদা-ওয়াতুন কাআন্নাহূ অলিয়্যুন হামীম।

৩৫. ওয়ামা- ইয়ুলাক্ক্ব-হা- ইল্লাল্লাযীনা স-বারূ; ওয়ামা- ইয়ুলাক্ক্ব-হা- ইল্লা- যূ হায্ যিন ‘আযীম।

*"ফলে হঠাতই সেই ব্যক্তি যার আর তোমার মাঝে শত্রুতা ছিল, সে এমন হয়ে যাবে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়। আর এই (গুণ) তারা ছাড়া আর কেউ অর্জন করতে পারে না যারা চরম ধৈর্যশীল এবং এই (গুণ) তারা ছাড়া আর কেউ পায় না যারা মহা ভাগ্যবান।"*


"আমি কি এতটা ধৈর্যশীল আর ভাগ্যবান আল্লাহ তায়ালা?" সে আক্ষেপের সাথে ভাবল। 


সে কি সত্যিই কখনো এই শত্রুতাগুলো গলিয়ে দিতে পারবে না? তার কি নিরাশ হওয়া উচিত?


বাইরে থেকে কোলাহলের আওয়াজ অনবরত আসছিল।


 মেহমিলের ঘরের সামনেই ছিল ড্রয়িং হল (Drawing hall) আর ডাইনিং রুম (Dining room)।


সে কুরআন বন্ধ করে শ্যালফে রাখল এবং হুইলচেয়ার টেনে জানালার কাছে এল। বিশাল জানালার স্বচ্ছ কাঁচের ওপাশে অস্তগামী সন্ধ্যার দৃশ্য ফুটে উঠছিল। দূরে উপরে কোথাও আধফালি চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছিল। সন্ধ্যা নেমে এল এবং জোছনার আলোয় জানালার কাঁচ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।


 সে অন্ধকারে ডুবে থাকা ঘরে একা বসে ঘাড় তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল।


*"ইদফা' বিল্লাতি হিয়া আহসান" (মন্দকে সেই উপায়ে দূর করো যা সর্বোত্তম)*


যা সর্বোত্তম।


যা সর্বোত্তম।


একটি কণ্ঠস্বর বারবার তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।


সে নিঃশব্দে চাঁদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটার কথা ভাবতে লাগল।




চলবে,,,,,



 

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)