মুসহাফ - পর্ব: ২১ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)


পর্ব:- ২১


পরদিন সকালে সে আগে থেকেই লনে উপস্থিত ছিল। লন থেকে লাউঞ্জের জানালা খোলা দেখা যেত এবং তার সামনেই ছিল তৈমুরের ঘর। আওয়াজ যাওয়ার পথ ছিল একদম পরিষ্কার ও খোলা।



গত পুরোটা দিন সে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈমুরের সামনে যায়নি। তৈমুরও ঘর থেকে বের হয়নি। সম্ভবত তার স্কুল ছুটি ছিল, তাই আজকাল সে বাড়িতেই থাকত। মেহমিল জানত যে গতকাল কুরআন শুনিয়ে সে তৈমুরকে মানসিকভাবে কিছুটা নাড়িয়ে দিয়েছে। 


তৈমুরের ভেতর যদি সত্যিই কুরআনের প্রতি টান থাকে, তবে আরও শোনার তৃষ্ণা তার ভেতর অবশ্যই জেগে উঠবে এবং সে নিজেই এগিয়ে আসবে। সে নয় মাস ধরে (গর্ভকালীন) তাকে কুরআন শুনিয়েছিল; সাত বছরে সে তা ভুলে যাবে কীভাবে?

বিলকিস লনেই তাকে টেপ রেকর্ডার সেট করে দিয়েছিল। তৈমুর জেগেছে নাকি এখনও ঘুমাচ্ছে তা মেহমিলের জানা ছিল না, তবুও সে প্লে (Play) বাটন টিপে আওয়াজ বাড়িয়ে দিল।


ক্বারী মিশারির কণ্ঠে সূরা কাহাফ বাজতে শুরু করল। যদিও অন্যান্য ক্বারীরাও অনেক ভালো ছিলেন, তবে ক্বারী মিশারির সেই ধীর ও আবেগপূর্ণ সুর মেহমিল দুনিয়ার আর কোথাও খুঁজে পায়নি। সূরা কাহাফ শুরু হতেই তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল।


প্রথম রুকু শেষ হওয়ার আগেই বারান্দার দরজা খুলে গেল এবং তৈমুর দৌড়ে বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে ঘাসে নেমে এল। তারপর মেহমিলকে বসে থাকতে দেখে তার পায়ের গতি ধীর হয়ে গেল।


সে তার শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রেখেছিল, যার কিনারা আর তার হাত ভেজা ছিল। চেহারায় আর কপালের ধূসর চুলগুলোও ছিল ভেজা। পা ধোয়া দেখে মনে হচ্ছিল সে ওজু করে এসেছে।


মেহমিল মুচকি হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে সামনে বসার ইশারা করল। তৈমুর মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল এবং সামনের চেয়ারে বসল।


দুজনে নিরবে মাথা নিচু করে বসে সেই 

সুমধুর ছন্দময় কণ্ঠস্বর শুনতে লাগল, যা গুহাবাসী আর তাদের কুকুরের গল্প বলছিল। সেই কয়েকজন যুবকের গল্প যারা কোথাও চলে গিয়েছিল। 


আর দুই বাগানের মালিকের গল্প, যার নিজের ধন-সম্পদ আর সন্তানের ওপর খুব অহংকার ছিল; আর মূসা (আ.)-এর গল্প, যিনি আল্লাহর এক বান্দার সাথে দেখা করার জন্য সেই জায়গা খুঁজছিলেন যেখানে মাছ সমুদ্রে রাস্তা তৈরি করেছিল; আর সেই বিশ্বভ্রমণকারী (যুল-কারনাইন)-এর গল্প, যিনি সফর করতে করতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পৌঁছে গিয়েছিলেন।


কুরআনের ঠিক মাঝখানে এই চারটি গল্প রাখা হয়েছিল। তিলাওয়াত শেষ হলে তৈমুর মাথা তুলল। মেহমিল তখন স্টপ (Stop) বাটন চাপছিল।


"তুমি জানো, এটি কার কণ্ঠস্বর?"

তৈমুর মাথা নেড়ে না বলল।


"এটি ছিলেন ক্বারী মিশারি। তুমি জানো তিনি কে?"


সে আবার ডানে-বামে মাথা নাড়াল।


"প্রথমে তিনি একজন সিঙ্গার (Singer) ছিলেন। তারপর যখন তিনি কুরআন পড়লেন, তখন গান গাওয়া ছেড়ে দিয়ে ক্বারী হয়ে গেলেন। ১১টি ভিন্ন সুরে তার তিলাওয়াত আছে, তবে আমার এই সুরটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ। তোমার পছন্দ হয়েছে?"


"জি!" সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠল। কে বলবে এটি সেই চিৎকার করা, অভদ্র আচরণ করা বাচ্চা, যার রাগ এখন ফেনার মতো থিতিয়ে পড়েছে।


কয়েক মুহূর্ত সে নিরবে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। (যাই হোক সে তো বাচ্চাই, আর কতক্ষণই বা রাগ করে থাকতে পারে?) তারপর খুব নিচু স্বরে বলল—


"এখনও আমার ওপর রাগ করে আছো?"

তৈমুর চোখ তুলে নিরবে তাকিয়ে রইল, মুখ ফুটে কিছু বলল না।


"কেন আমার ওপর রাগ করেছিলে?"

সে চুপ থাকল। একদম চুপ।


"তোমার কি আমাকে খুব খারাপ মনে হয়? তোমার কি মনে হয় যে আমাকে মেরে ফেলবে?"


"No, never!" সে ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠল, তারপর হঠাৎ চুপ হয়ে ঠোঁট কামড়াতে লাগল।


"তুমি তো আগে এমন ছিলে না। তুমি আমার জন্য হাসপাতালে ফুল নিয়ে আসতে, আমার সাথে কত কথা বলতে, আমার হাতে চুমু খেতে... তুমি কি ভুলে গেছো?"


তার বাদামী চোখে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল।


"আপনি কি সব শুনতে পেতেন?" জীবনে প্রথমবারের মতো সে মেহমিলের সাথে এভাবে কথা বলল।


মেহমিলের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।


"তোমার কি মনে হয়েছিল যে আমি আমার তৈমুরের কথা শুনব না? এমন কি হতে পারে?" সে পাল্টা প্রশ্ন করল।


 সে অস্বীকার করল না, মিথ্যাও বলতে চাইল না, আবার তাকে হতাশও করতে চাইল না।


"আপনি... আপনি তবে ওই রাতে কথা বলেননি কেন যখন ড্যাডি আমাকে মেরেছিলেন? আপনি যদি সব শুনতেন তবে কথা বলেননি কেন?" তার আওয়াজ চড়ে যাচ্ছিল। রাগে নয়, অভিমানে।


"আমি কথা বলতে পারতাম না। আমি অসুস্থ ছিলাম। আর... ড্যাডি তোমাকে কেন মেরেছিলেন?"


সে ভেতরে ভেঙে পড়লেও বাইরে নিজেকে সংযত রাখল।


"তিনি ওই ডাইনির (Witch) সাথে বিয়ে করছিলেন। আমি উনার সাথে অনেক ঝগড়া করেছিলাম।


" তৈমুরের বড় বড় বাদামী চোখ ছলছল করে উঠল।


 "তিনি বলতেন তিনি ওই ডাইনির সাথে বিয়ে করে নেবেন। 


আপনাকে ডিভোর্স (Divorce) দিয়ে দেবেন। আমি উনার সাথে অনেক লড়েছিলাম।


" আর হঠাতই সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।


"তৈমুর!" সে হতবাক হয়ে গেল। সে কখনো তাকে কাঁদতে দেখেনি।


"এদিকে এসো আমার কাছে।"

সে তার ছোট ছোট হাত মুখে চেপে কাঁদছিল। মেহমিল অজান্তেই হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরল।


"আমার কাছে এসো।" তাকে হাত ধরে দাঁড় করাল এবং নিজের কাছে টেনে নিল।


"ড্যাডি কেন মেরেছিলেন তোমাকে?"

"আমি বলেছিলাম যে আমি উনাকে আর ওই ডাইনিকে বাড়িতে থাকতে দেব না। তিনি বললেন তোমার মা খুব খারাপ মেয়ে। আমি উনার ওপর খুব শাউট (Shout) করেছিলাম তো উনি আমাকে এখানে চড় মারলেন।" সে হাত দিয়ে নিজের চোখের জলে ভেজা গাল দেখাল। 


মেহমিল পরম মমতায় তার গালে চুমু খেল। সে বসে ছিল আর তৈমুর তার সাথে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।


"তুমি কি তবে তারপর আমার কাছে এসেছিলে?"


"হ্যাঁ, আমি অনেকক্ষণ আপনার কাছে বসে কাঁদছিলাম, but you were sleeping (কিন্তু আপনি ঘুমাচ্ছিলেন)। 


আপনি আমাকে জবাব দেননি। আপনি আমাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আপনি কথা বলছিলেন না। আপনি আমাকে আদর করেননি।"


"আর তুমি আমার ওপর রাগ করলে?" সে হেঁচকি তুলে চোখ মুছছিল।


"আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। কথা বলতে পারতাম না, কিন্তু এখন তো আমি তোমার কাছে আছি না? এখন তো আর রাগ নেই?"


হাতের তালুর উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে মাথা নেড়ে না বলল। মেহমিল তাকে জড়িয়ে ধরল।


নিমিষেই মেহমিলের শূন্য অস্তিত্বে এক শীতল প্রশান্তি নেমে এল। তার মনে হলো সে পূর্ণ হয়ে গেছে; এখন তার হুমায়ুন দাউদ নামের আর কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন নেই। সে তার তৈমুরকে ফিরে পেয়েছে।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



সেই দিনটি ছিল খুব সুন্দর। তারা দুজনে যেমন প্রাণভরে কাঁদল, তেমনি বসে অনেক কথা বলল। কখনো লনে, কখনো ডাইনিং টেবিলে, কখনো লাউঞ্জে আর তারপর তৈমুরের ঘরে।


তৈমুরের সাথে কথা বলে মেহমিল বুঝতে পারল যে, তার এই আচরণ ছিল ওই রাতের প্রতিক্রিয়া—যে রাত সে হুমায়ুনের চড় খাওয়ার পর মেহমিলকে ডাকতে ডাকতে কাটিয়েছিল। 


সম্ভবত সে সারা রাত কেঁদেছিল, কিন্তু তার মা কোনো উত্তর দেয়নি বলে সে অভিমানী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাচ্চা তো, শেষ পর্যন্ত কতক্ষণ রাগ থাকতে পারে? ভেতরের সব লাভা বের করে দিয়ে সে এখন শান্ত। 


আর এই ভুল বোঝার স্বভাবটি তো সে তার বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এতে তার দোষ ছিল না।


তৈমুরের কথা শুনে মনে হচ্ছিল যে সে আরজু আর হুমায়ুনের সম্পর্কের কথাও জানে, কিন্তু মেহমিল ইচ্ছাকৃতভাবে ওই প্রসঙ্গ তুলত না। 


মেহমিল এখন বুঝতে পারল যে তৈমুর অসাধারণ মেধাবী আর বুদ্ধিমান ছিল। সে প্রতিটি জিনিসের খবর রাখত। সে জানত কখন হুমায়ুন তাকে তালাক দিয়েছে, কখন তাকে বকেছে, কখন চিল্লাইছে; তাদের দুজনের মাঝের প্রতিটি বিষয় সে জানত। 


সে প্রকাশ করত যে সে মেহমিলকে ঘৃণা করে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখত।


"ড্যাডি যদি আপনার ডিভোর্স ফিরিয়ে না নেন তবে আপনি কি এখান থেকে চলে যাবেন?" তারা দুজনে তৈমুরের ঘরে বসে ছিল যখন সে খুব বিষণ্ণ মনে এ কথা বলল।


"যেতে তো হবেই।"


"কিন্তু আরও আড়াই মাস তো আপনি এখানেই আছেন, তাই না? আপনার ডিভোর্সের তিন মাস পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তো আপনি এখানেই থাকবেন?"


সে তার কথাবার্তায় মেহমিলকে অবাক করে দিত। তার বয়স এত ছিল না, কিন্তু সে সব বুঝত।


"হ্যাঁ।"


"এখনও তো হাফ মান্থ (Half month) হয়েছে। এখনও অনেক সময় আছে, কে জানে ড্যাডি হয়তো ডিভোর্স ফিরিয়ে নেবেন।"


মেহমিল ভাবল তাকে বোঝাবে যে প্রথম তালাক ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, বরং এতে 'রুজু' হতে পারে; কিন্তু তার এইটুকু মাথায় অযথাই এত জটিলতা ঢোকাতে চাইল না। তাই কথা ঘুরিয়ে দিল।


"আমাকে তোমার বইগুলো দেখাও।"


"আপনি টপিক (Topic) চেঞ্জ করবেন না। আমি আপনাকে সব বই দেখিয়ে দিয়েছি।"


"ওহ... আমার মানে ছিল খাতাগুলো দেখাও।"


"মেহমিল! মেহমিল!" তৈমুর জবাব দেওয়ার আগেই মেহমিল ফারিস্তের কণ্ঠ শুনতে পেল যে বাইরে থেকে ডাকছিল। 


তার হুইলচেয়ার দরজা থেকে কিছুটা দূরে ছিল বলে সে তৈমুরকে ইশারা করল।


"বেটা! দরজা খোলো।"


"Please no!" সে বিরক্তিকর মুখভঙ্গি করে বিছানায় বসে রইল।


"মেহমিল!" ফারিস্তের কণ্ঠে অস্থিরতা ছিল।


"তৈমুর! প্লিজ দরজা খোলো, খালামণি ডাকছেন।" সে চাইলে ফারিস্তেকে আওয়াজ দিতে পারত, কিন্তু এই মুহূর্তে সে তৈমুরকে রাগাতে চাইল না।


"She is not my Khala (উনি আমার খালা নন)" সে বিড়বিড় করতে করতে উঠল, দরজা আধাআধি খুলে মাথা বের করে রেগে বলল—


"What's wrong with you? (আপনার সমস্যা কী?)"


"ওহ, সরি সানি! আমি মেহমিলকে খুঁজছিলাম।" ফারিস্তের লজ্জিত কণ্ঠ শোনা গেল।


"She is with me. Please don't disturb us. (উনি আমার সাথে আছেন, আমাদের ডিস্টার্ব করবেন না)" সে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। 


তারপর ফিরে এলে মেহমিল কিছুটা রেগে তার দিকে তাকাল।


"উনি আমার বোন। তুমি তাকে আমার সাথে কথাও বলতে দেবে না বেটা?"


"আপনি কেন ওই উইচ নাম্বার টু (Witch Number 2)-কে পছন্দ করেন? আমার তো মন চায় উনাকে বলি নিজের ঝাড়ু নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে।" রেগে বলতে বলতে সে আবার দরজা খুলল।


"চলে আসুন।" ফারিস্তের চেহারা দেখা গেলে মেহমিল হেসে তাকে ডাকল।

ফারিস্তে অবাক হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল।


"তুমি আর সানি... ওহ গড! এসব কীভাবে হলো?" সে যেমন অবাক হয়েছিল, তেমনি 

খুশিও ছিল।


"ব্যাস, আল্লাহর শুকরিয়া।" মেহমিল হাসি চেপে কাঁধ ঝাঁকাল, যেন সে নিজেও এই সুন্দর ঘটনায় অভিভূত।


"I am so happy Mehmil!" আবেগের আতিশয্যে ফারিস্তের চোখ ছলছল করে উঠল। আর মেহমিল কিছু বলার আগেই তৈমুর চিৎকার করে উঠল—


"No, you are not! আপনি মিথ্যা বলছেন। আমি সব জানি।"


ফারিস্তের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।


"সানি! আমি..."


"You can go now, just go away!" সে হুট করে সজোরে চিল্লিয়ে উঠল। ফারিস্তে ঠোঁট কামড়ে হুট করে ঘুরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।


তৈমুরও রাগে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে বসে ছিল। সে চলে গেলে তৈমুর সজোরে দরজা বন্ধ করল এবং কাছে রাখা একটি কাগজ তুলে ছিঁড়ে ফেলল। 


তারপর তার টুকরোগুলো দরজার দিকে ছুড়ে মারল।


মেহমিল নিবিড়ভাবে তার আচরণ লক্ষ্য করছিল। সে ফিরে এসে বিছানায় বসলে মেহমিল তার খাতাটি তুলল, তিনটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ল এবং তৈমুরের দিকে এগিয়ে দিল।


"নাও, এগুলোকেও ছিঁড়ো।" তৈমুর প্রথমে অবাক হয়ে তাকে দেখল, তারপর ছোঁ মেরে কাগজগুলো নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।


"এটিও ছিঁড়ো।" সে তার খাতা থেকে একটি একটি করে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তাকে দিতে থাকল এবং তৈমুর হিংস্রভাবে সেগুলো ছিঁড়তে থাকল। একসময় সে ক্লান্ত হয়ে মাথা নিচু করল।


মেহমিল খাতাটি বন্ধ করে বিছানায় রেখে দিল।


"ওঠো! পানি খাও আর আমাকেও খাওয়াও।"


তার ভেতরের সব লাভা বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই সে চুপচাপ উঠে বাইরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলে তার হাতে এক গ্লাস পানি ছিল। মেহমিল গ্লাসটি নিল, পানি খেল এবং গ্লাসটি আবার তার দিকে বাড়িয়ে দিল।


"এটিও দেয়ালে ছুড়ে মেরে ভেঙে ফেলো।"

তৈমুর ঠোঁট কামড়ে তাকে দেখতে লাগল, গ্লাসটি নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল না।


"এটি কি ভাঙতে চাও?"


"না।" সে এখন শান্ত হয়ে গেছে।


"চলো, লনে যাই। আমি তোমাকে একটি স্টোরিও শোনাব।"


তার কথায় তৈমুর মুচকি হাসল এবং গ্লাসটি নিয়ে দরজা খুলে একপাশে সরে তাকে পথ দিল। মেহমিল তৃপ্তির হাসি হেসে হুইলচেয়ার চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


তারা দুজনে লাউঞ্জে বসে ছিল। মেহমিলের হাতে কুরআনের গল্পের বই ছিল এবং সে মূসা (আ.)-এর গল্প তৈমুরকে শোনাচ্ছিল।


 গত কয়েক দিনে সে ধীরে ধীরে তাকে অনেক গল্প শুনিয়েছে। সে চাইছিল তৈমুরের মাঝে কুরআনের প্রতি আগ্রহ জন্মানুক।


"এবং তারপর মূসা (আ.)-এর মায়ের মন শূন্য হয়ে গেল..."


দরজা খোলার শব্দে সে অবচেতনে থেমে গেল। সে জানত এই সময়ে কে আসতে পারে। ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। সে মাথা তুলল না।


"আরও বলুন না মাম্মা!" তৈমুর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষার পর অস্থির হয়ে উঠল; ঠিক সেই মুহূর্তেই হুমায়ুন ভেতরে প্রবেশ করল। মেহমিল অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা তুলল।


সে ক্লান্ত অবস্থায় লাল চোখ নিয়ে শার্টের হাতা গুটিয়ে আসছিল। তাদের দুজনকে এভাবে একসাথে বসে থাকতে দেখে সে হুট করে থমকে দাঁড়াল।


 তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় ও বিভ্রান্তি ফুটে উঠল। গত কয়েক দিন সে বেশ দেরিতে বাড়ি ফিরছিল, তাই এই নতুন বন্ধুত্বের ব্যাপারে সে কিছুই জানতে পারেনি।


মেহমিল আবার বইয়ের দিকে নজর দিল এবং পড়তে শুরু করল।


ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনের ঘণ্টি বাজল। তৈমুর সোফা থেকে উঠে রিসিভার (Receiver) তুলল।



"হ্যালো!" কিছুক্ষণ সে ওপাশের কথা শুনল, তারপর মাথা নাড়ল। "জি, উনি আছেন। এক মিনিট।"


রিসিভার হাতে নিয়ে সে মেহমিলের দিকে ফিরল। ঠিক সেই মুহূর্তে হুমায়ুনের ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো।


"মাম্মা! আপনার ফোন।"


"কে?" সে অবাক হলো। তার জন্য আবার কে ফোন করবে?


"উনি বলছেন উনার নাম আগা ফাওয়াদ।" তৈমুর রিসিভারটি তার দিকে বাড়িয়ে দিল।


 তারটি লম্বা ছিল বলে রিসিভার তার কাছে পৌঁছে গেল।


"আগা ফাওয়াদ?" সে অবিশ্বাসের সুরে বিড়বিড় করল, তারপর রিসিভার ধরল।

অনেকক্ষণ সে রিসিভারটি কানে লাগিয়ে চুপ করে বসে রইল।


"হ্যাঁ... হ্যালো!" আর তারপর খুব কষ্টে শব্দগুলো ঠোঁট দিয়ে বের হতেই কেউ একজন হ্যাঁচকা টানে রিসিভারটি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। মেহমিল প্রচণ্ড চমকে পেছনে তাকাল।


"আমার বাড়িতে এসব চলবে না। এখান থেকে গিয়ে যা ইচ্ছা তা করো।" রিসিভার হাতে নিয়ে কর্কশ স্বরে এ কথা বলে হুমায়ুন কেবল মেহমিলকেই নয়, আগা ফাওয়াদকেও শুনিয়ে দিয়েছে।


মেহমিল পাথর হয়ে বসে রইল। হুমায়ুন তার ওপর একবার আগ্নেয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রিসিভারটি আছাড় দিয়ে ক্রেডেল-এ (Cradle) রাখল। তারপর যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।


তৈমুর নিরবে কিন্তু নিবিড়ভাবে সবকিছু দেখছিল। হুমায়ুন ওপরে চলে গেলে সে ধীরে ধীরে মেহমিলের দিকে এগিয়ে এল।

"মাম্মা!" সে আলতো করে মেহমিলের হাত ছুঁল, তারপর নাড়াল।


মেহমিল তখন নিস্পন্দ হয়ে বসে ছিল।


"এর আগেও একবার উনার ফোন এসেছিল আপনার জন্য, ড্যাডি তখন উনাকে বলেছিলেন যে এখানে কোনো মেহমিল থাকে না। 


মাম্মা! ড্যাডি উনার সাথে এমন কেন করেন? উনি তো আপনার কাজিন (Cousin), তাই না?"


মেহমিল তখনও আচ্ছন্ন ছিল। 


প্রথমবারের মতো হুমায়ুন এত বিষাক্ত কথা বলেছে। এত বিষ তার ভেতর কে ঢুকিয়েছে?


"আচ্ছা ছাড়ুন না, আমাকে স্টোরিটা আরও শোনান।" তৈমুর তার সাথে সোফায় বসে পড়ল এবং তার হাত নেড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করল। মেহমিল মাথা ঝাড়া দিয়ে আবার বইটি তুলে নিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


সে লনে বসে ছিল আর তৈমুর পানির পাইপ নিয়ে ঘাসে পানি দিচ্ছিল। পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো সবুজ ঘাসের ওপর পড়ছিল। মেহমিল প্রশান্ত মনে তাকে দেখছিল।


ইমাম শাফি (র.) বলতেন—পরীক্ষা যখন খুব কঠিন হয়ে যায়, তখন সেখান থেকেই মুক্তির পথ খুলে যায়। তিনি ঠিকই বলতেন। 



যখন জীবনে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছিল, তখনই ফজর বা ভোরের প্রথম আলো ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল। হুমায়ুনের দেওয়া অবিশ্বস্ততার দুঃখ এখন আর আগের মতো তীব্র নয়। তৈমুরের ভালোবাসা এখন ক্ষতের মলম হিসেবে কাজ করছিল।


সন্ধ্যা নেমে আসছিল, গেটে আওয়াজ শুনে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ফারিস্তে বাইরে থেকে হাত ঢুকিয়ে গেটের লকিং সিস্টেম (Locking system) খুলল এবং ভেতরে প্রবেশ করল। তার হাতে হ্যান্ডব্যাগ (Handbag) ছিল এবং সে তার নির্দিষ্ট কালো রঙের আবায়া ও স্কার্ফ (Scarf) পরা ছিল, যাতে তার চেহারা উজ্জ্বল লাগছিল। 


সে সম্ভবত মসজিদ থেকে আসছিল, যেখানে সে পড়াতে যেত।


"আসসালামু আলাইকুম! জলদি চলে এলেন?" তাকে আসতে দেখে মেহমিল হেসে সম্বোধন করল।


"হ্যাঁ, আসলে একটু ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।" সে ক্লান্ত মুখে হেসে মেহমিলের কাছে এল।


"খাবার খেয়ে নিন। আপনি দুপুরেও খাননি।"


"হ্যাঁ, খাবো।" সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে আঙুল দিয়ে কপালের পাশটা টিপছিল। তার সরু আঙুলে রূপার সেই আংটিটি ছিল যা মেহমিল প্রায়ই দেখত।


 জানি না কেন, আজ ফারিস্তেকে মেহমিলের কিছুটা চিন্তিত মনে হলো।

"সব ঠিক আছে তো ফারিস্তে? আপনাকে টেন্স (Tense) মনে হচ্ছে।"


"না তো।" সে ফ্যাকাশে হাসল। ঠিক তখনই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তৈমুর পাইপ ফেলে তাদের দিকে এগিয়ে এল।


"উনি টেন্স থাকলেও আপনার কেয়ার (Care) করার দরকার কী? জাস্ট লিভ হার অ্যালোন (Just leave her alone)!" সে খুব রাগান্বিত হয়ে অভদ্রভাবে কথাগুলো বলল।


 মেহমিল দেখল ফারিস্তের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, মেহমিলের খুব খারাপ লাগল।


"তৈমুর বেটা! উনি তোমার খালামণি, এভাবে কথা..."


"Just go away (জাস্ট গো অ্যাওয়ে)... চলে যান আপনি এখান থেকে।" সে পা আছড়ে চিৎকার করে উঠল। একদম হুমায়ুনের মতো মেজাজ।


"সরি সানি!" সে ভগ্ন হৃদয়ে উঠল, ব্যাগ হাতে নিল এবং দ্রুত পায়ে লনের পথ পেরিয়ে চলে গেল।


"আর যেখানে আমার মাম্মা থাকবেন, সেখানে আসবেন না।" সে পেছন থেকে চিৎকার করে বলল।


 মেহমিল আক্ষেপের সাথে বারান্দার দিকে তাকাল যেখানে ফারিস্তে দরজা বন্ধ করে আড়ালে চলে গেছে।


তৈমুর তখনও ঠোঁট কামড়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিল।


"উফ... এই ছেলেটাকে কীভাবে বোঝাই যে তোমার বড়রা তোমার শত্রু নয়।" সে মাথা ঝাড়া দিয়ে হতাশ হয়ে বসে রইল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


মেহমিল রান্নাঘরে হুইলচেয়ারে বসে ছিল। তার কোলে মটরের ঝুড়ি ছিল। তৈমুর বিলকিসের সাথে মার্কেটে গিয়েছিল। সে মটর ছুড়তে ছুড়তে অবচেতনভাবে তৈমুরের জন্য অপেক্ষা করছিল।



রান্নাঘরের দরজা আধখোলা ছিল। সে এমন এক কোণে বসে ছিল যে লাউঞ্জ (Lounge) থেকে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। তখনই সে বাইরের দরজা খোলার শব্দ পেল এবং সাথে পদশব্দও।


তারপর কাছে আসতে থাকা কণ্ঠস্বরগুলো শুনে মটর ছুড়তে থাকা মেহমিলের হাত থেমে গেল।


"এমন আর কতদিন চলবে হুমায়ুন?" এটি আরজু ছিল এবং সে বেশ বিরক্ত হয়ে বলছিল।


"কী?"


"অজান্তে থাকার ভান করো না... আমরা কবে বিয়ে করছি?"


তাদের আওয়াজ কাছে আসছিল। মেহমিল দম বন্ধ করে বসে রইল। মটরের দানাগুলো তার হাত থেকে পড়ে গেল।


"করে নেব। এত তাড়াহুড়ো কিসের?"


"তাড়াহুড়ো মানে কী?... তাকে তালাক দিয়েছ কতদিন হয়ে গেল।"


"তার ইদ্দত শেষ হতে দাও।"


"আর কবে শেষ হবে সেটা?"


"আর এক-দুই সপ্তাহ বাকি আছে।" সে খুব শান্ত গলায় বলছিল। তারা দুজনেই লাউঞ্জের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।


"তার ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে কি আমরা বিয়ে করতে পারি না?"


"না।" তার ভঙ্গি এত শীতল ও চূড়ান্ত ছিল যে মুহূর্তের জন্য আরজুও চুপ হয়ে গেল।


"কিন্তু হুমায়ুন..." সে কিছু বলতে চাইল।


"বললাম তো না।" সে এবার কঠোর স্বরে বলল। 


"যদি তোমার পছন্দ না হয় তবে বিয়ে করো না। যাও, চলে যাও।" সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।


"না, হুমায়ুন..." আরজু ঘাবড়ে গিয়ে তার পেছন পেছন দৌড়াল।


সিঁড়ি বেয়ে ওঠার শব্দ অস্পষ্ট হয়ে গেল। তারা দুজন এখন তার থেকে দূরে চলে গেছে।


"মাম্মা..." কতক্ষণ পর তৈমুর তাকে ডাকলে সে চমকে মাথা তুলল। সে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।


"তুমি কখন এলে?" সে নিজেকে সামলে নিল।


"মাম্মা!" সে ধীরে ধীরে তার কাছে এল। 


"আপনি কাঁদছেন?" সে তার ছোট ছোট হাত মেহমিলের চেহারায় গড়িয়ে পড়া চোখের জলের ওপর রাখল। মেহমিল অবাক হলো। 


জানত না কখন এই চোখের জল ঝরতে শুরু করেছিল।


"আপনি কাঁদবেন না।" সে এখন আলতো করে মেহমিলের চোখের জল মুছে দিচ্ছিল। মেহমিল সজল চোখে হাসল এবং তার হাত ধরল।


"আমি তো কাঁদছি না।"


"আপনি কাঁদছেন। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি?" সে মেহমিলের মিথ্যা বলায় রাগ করল।


"আচ্ছা, এখন তো আর কাঁদছি না? আর দোকান থেকে কী এনেছ?"


"চিপস (Chips)।" সে লেজ (Lays)-এর প্যাকেটটা সামনে ধরল।


"আর আমি এতক্ষণ বাইরে ছিলাম অথচ আপনি এখনও মটর ছাড়াতে পারেননি। 


ইউ আর টু স্লো মাম্মা (You are too slow, Mama)!" সে মটরের ঝুড়িটা মেহমিলের কোল থেকে সরিয়ে কাউন্টারে (Counter) রেখে দিল।


 "চলুন বাইরে যাই।"


"থাক তৈমুর! আমার ভালো লাগছে না।"


"বিলকিস বু!" তার কথা না শুনেই সে বিলকিসকে ডাকতে লাগল। "মাম্মাকে বাইরে নিয়ে এসো।"


আর মেহমিল নিজের অবহেলার দুঃখ মনের গহীন কোণে চেপে রাখল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


অনেকদিন ধরে লাইব্রেরি (Library) পরিষ্কার করা হয়নি। সে কত সপ্তাহ ধরে ভাবছিল কোনো একদিন করিয়ে নেবে, আজ সাহস করেই ফেলল।


বিলকিসকে বলতে দেরি, সে কাজ শুরু করতে দেরি করল না। মেহমিল দরজার চৌকাঠে হুইলচেয়ারে বসে নির্দেশনা দিচ্ছিল।


"এই বইগুলো ভেতরে রাখো, ওইদিকেরগুলো সামনে দাও।


 টেবিল থেকে সব সরিয়ে ওই শ্যালফে রেখে দাও।"


ঝাড়পোঁছ করার সময় ধুলো উড়ছিল। বহু বছর কেউ বইগুলো পরিষ্কার করেনি।


"বিবি! এগুলোতে তো পোকা লেগে গেছে।" বিলকিস চিন্তিত হয়ে কিছু পুরনো বইয়ের কোণা দেখাচ্ছিল। ইতিহাসের পুরনো সব বই।


"এগুলো আলাদা করো। আর ওই ড্রয়ারটা খালি করো, ওতে এগুলো রেখে দেব।"


"আচ্ছা জি!" বিলকিস এবার স্টাডি টেবিলের (Study table) ড্রয়ার থেকে বই বের করতে লাগল।


"এগুলোকে কি ওই শেষ শ্যালফে গুছিয়ে দেব?" সে ড্রয়ার থেকে বের হওয়া বইয়ের স্তূপের দিকে ইশারা করল।


"হ্যাঁ দিয়ে দাও।" মেহমিলের তাতে কী আপত্তি। বিলকিস মনোযোগ দিয়ে বইগুলো পরিষ্কার করে ওপরে সাজাতে লাগল।


স্তূপ কিছুটা কমলে বইগুলোর মাঝখানে একটি ফোলা খাকি খাম (Envelope) দেখতে পেল।


"এই খামটি দাও তো। হয়তো হুমায়ুনের কোনো দরকারি জিনিস।"


বই গোছাতে গোছাতে বিলকিস থামল এবং খাকি খামটি তুলে তাকে দিল।

খামটি ওজনে ভারী ছিল না, কিন্তু ফোলা ছিল। 


সে উল্টেপাল্টে দেখল। ওপরে কোনো নাম-ঠিকানা ছিল না, একটি ছেঁড়া টেপ (Tape) লাগানো ছিল, যেন কেউ খুলে আবার লাগিয়ে দিয়েছে।


কার খাম কে জানে—কোনো কৌতূহল ছাড়াই মেহমিল টেপটি খুলল এবং খামটি নিজের কোলের ওপর উপুড় করল। একটি আদালতের কাগজ আর সাথে একটি সাদা চিঠির কভার (Cover) কোলের ওপর পড়ল।


সে হলুদ রঙের আদালতের কাগজটি তুলল, তার ভাঁজ খুলল এবং চোখের সামনে ধরল।


স্ট্যাম্প পেপারের (Stamp paper) নিচে খুব স্পষ্ট দুটি স্বাক্ষর ছিল।


"মেহমিল ইব্রাহিম।"


"ফারিস্তে ইব্রাহিম।"


সে প্রচণ্ড চমকে উঠল এবং দ্রুত ওপরের লেখার ওপর চোখ বুলাল।


এটি সেই কাগজ ছিল যা ফাওয়াদ তার আর ফারিস্তের কাছ থেকে সই করিয়ে নিয়েছিল। ওয়াসিমের সাথে মেহমিলের বিয়ে না করানোর শর্তে, তার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে।


কিন্তু এটি এখানে হুমায়ুনের লাইব্রেরিতে কী করছিল? সে তো এই ব্যাপারে কিছুই জানত না।


 এই বিষয়টি কখনো আলোচনাতেই আসেনি। শুধু একবার আগা জানের বাড়ি থেকে ফেরার পর হুমায়ুন তাকে নিজের অংশ নিতে বলেছিল, কিন্তু সে এড়িয়ে গিয়েছিল।


 যদি সে সরাসরি জিজ্ঞেস করত তবে মেহমিল সব বলে দিত। আবার ফারিস্তেও বলেনি যে এই কাগজ তার হাতে কীভাবে এল? আর সে কি এরই কারণে মেহমিলের ওপর রাগান্বিত ছিল? কিন্তু এটি তো এত বড় কোনো কারণ নয়। 


আর এই কাগজ হুমায়ুনের হাতেই বা এল কীভাবে? এটি তো ফাওয়াদের কাছে ছিল।


সে দ্বিতীয় সাদা খামটি তুলল। সেটি খুব নির্দয়ভাবে ছিঁড়ে খোলা হয়েছিল। সে খামের খোলা মুখের ভেতরে উঁকি দিল। ভেতরে কিছু ফটোগ্রাফ (Photographs) ছিল সম্ভবত।


মেহমিল খামটি কোলের ওপর উপুড় করল। কয়েকটি ছবি তার হাঁটু থেকে পিছলে মেঝেতে পড়ে গেল। 


সে হাত নিচু করে ছবিগুলো তুলল এবং সোজা করল।


সেগুলো ফাওয়াদ আর মেহমিলের ছবি ছিল... ফাওয়াদ আর মেহমিল!


সে নিথর হয়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সেগুলোতে এমন কিছু ছিল যা কখনো ঘটেনি। গাড়ির ফ্রন্ট সিটে (Front seat) বসা ফাওয়াদ আর তার কাঁধে মাথা রাখা মেহমিল...


রেস্টুরেন্টে ডিনার (Dinner) করতে থাকা ফাওয়াদ আর মেহমিল... একসাথে কোনো বিয়ে বাড়িতে নাচতে থাকা... আপত্তিকর ছবি... আপত্তিকর দৃশ্য। সে সব কিছু যা কখনো হয়নি।


সে আবারও ছবিগুলো উল্টেপাল্টে দেখল। তার পোশাক আর চেহারা... প্রতিটি ছবিতে কিছুটা আলাদা ছিল। কোনো ছোট বাচ্চাও বলে দিতে পারত যে এগুলো ফটোশপ (Photoshop) বা ওই জাতীয় কোনো কারসাজি। প্রথম নজরে হয়তো বোঝা যেত না, কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে সব নকল। 


হুমায়ুন নিজে একজন পুলিশ অফিসার (Police Officer) ছিলেন, তিনি এসব বাচ্চাদের কারসাজিতে বিশ্বাস করতে পারেন না। আর কে তাকে এই ছবিগুলো এনে দিল?


তবে কি মুয়িজ যে একবার এসেছিল, সে কি এই কারণেই এসেছিল? তার মাথায় হঠাতই বিদ্যুৎ খেলে গেল।


পাজল (Puzzle)-এর সব টুকরো একসাথে জোড়া লাগতে শুরু করল।

আরজু বলেছিল যে সে মেহমিলের কাছ থেকে হুমায়ুনকে কেড়ে নেবে। মেহমিলকে সাজগোজ করা আর হাসিখুশি দেখে সে হয়তো তীব্র হিংসার আগুনে জ্বলতে শুরু করেছিল।


 সে মেহমিলের সুখ সহ্য করতে পারছিল না। তারপর আসাদ চাচার আকস্মিক মৃত্যুর পর নিশ্চয়ই তারা আর্থিক সংকটে (Financial crisis) পড়েছিল। এমন সময় মেহমিলের দীর্ঘদিনের জ্ঞানহীন অবস্থা আরজুকে আশা জাগিয়েছিল।


 আর সম্ভবত এই সবকিছু ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্ল্যান (Plan)।


এই জাল ছবিগুলো বানিয়ে মেহমিল আর ফারিস্তের সই করা কাগজ হুমায়ুনকে দেখিয়ে সে হয়তো তাকে উসকে দিয়েছে। কিন্তু হুমায়ুন কি ছোট বাচ্চা যে তাদের কথায় বিশ্বাস করে নেবে? একজন ঝানু পুলিশ অফিসার কি এই ধরনের খেলনার শিকার হতে পারেন? শুধু এইটুকু বিষয় নিয়ে কি হুমায়ুন এত বড় ভুল বুঝতে পারেন? নিজের স্ত্রীর থেকে দূরত্ব আর আরজুর প্রতি বাড়তে থাকা টান... পাজলের কোনো একটি টুকরো তার জায়গা থেকে নিখোঁজ ছিল। 


পুরো ছবিটা স্পষ্ট হচ্ছিল না।


সে অবচেতনভাবে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। তার মাথা ঘুরতে শুরু করেছিল।


"বিবি, আপনি ঠিক আছেন তো?" বিলকিস তার কাঁধ নাড়ালে সে বাস্তবে ফিরল।


"হ্যাঁ, আমাকে বাইরে নিয়ে চলো।" সে দ্রুত ছবিগুলো খামে ঢুকিয়ে নিল, পাছে বিলকিস সেগুলো দেখে ফেলে।

পাজলের কোনো একটি টুকরো সত্যিই নিখোঁজ ছিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



বিকেলের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছিল যখন বাইরের গেটে হর্নের শব্দ শোনা গেল।

সে যে ইচ্ছাকৃতভাবে লাউঞ্জে বসে ছিল, হুট করে সতর্ক হয়ে উঠল।


হুমায়ুনের গাড়ি তীব্র বেগে ভেতরে ঢোকার আওয়াজ... তারপর লকের শব্দ। সে মাথা নিচু করে সব শব্দ শুনতে থাকল যতক্ষণ না দরজার ওপাশ থেকে ভারী জুতোর পদশব্দ কাছে এল। সে অস্থির হয়ে মাথা তুলল।


সে ভেতরে ঢুকছিল। ইউনিফর্মে (Uniform) সজ্জিত, হাতে ক্যাপ (Cap) নিয়ে সে কয়েক কদম এগিয়ে এল। মেহমিলকে সেখানে বসে থাকতে দেখে মুহূর্তের জন্য থামল।


"আসসালামু আলাইকুম! আমাকে আপনার সাথে কথা বলতে হবে।" সে নিচু স্বরে বলল।


"বলো।" হুমায়ুন রুক্ষ মেজাজে সামনে এসে দাঁড়াল।


"আপনি বসুন।"


"আমি ঠিক আছি। বলো।"


মেহমিল দীর্ঘশ্বাস নিল এবং মনের মাঝে কথাগুলো গুছিয়ে নিল।



"আমি শুধু একটি কথার উত্তর চাই হুমায়ুন! শুধু একবার আমাকে বলে দিন যে আপনি আমার সাথে এমন কেন করছেন?" তার গলায় কান্নার দলা পাকিয়ে এল।


"কী করছি?"


"আপনার মনে হয় যে আপনি কিছুই করছেন না?"


"আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই, এটি কি কোনো অপরাধ?" সে গম্ভীর ও নির্বিকার ছিল।


"কিন্তু... আপনি কেন এত বদলে গেছেন? আপনি তো আগে এমন ছিলেন না।" না চাইতেও সে অভিযোগ করে বসল।


"আগে আমি কাঠের পুতুল ছিলাম যার চোখে পট্টি বাঁধা ছিল। জ্ঞান এখন ফিরেছে, দেরি হয়ে গেছে কিন্তু ক্ষতি নেই!"


"হতে পারে এখন কেউ আপনার চোখে পট্টি বেঁধে দিয়েছে। আপনি আমাকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের একটি সুযোগ তো দিন।"


সে ভেবেছিল সে তাকে মিনতি করবে না, কিন্তু এখন সে তাই করছিল। 


এটি সেই ব্যক্তি ছিল যাকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসত। সে তাকে হারাতে চায়নি।

"নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ তাদের দেওয়া হয় যাদের ওপর সন্দেহ থাকে।


 কিন্তু যাদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস (নেতিবাচক অর্থে) থাকে, তাদের ওপর কেবল দণ্ড কার্যকর করা হয়।" সে দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলল।


"এগুলো আপনার নিজের তৈরি করা দণ্ড এসপি (SP) সাহেব! মানুষকে তাদের ওপর ভিত্তি করে বিচার করবেন না। খাঁটি আর ভেজালের পার্থক্য করার পরিমাপক মনে থাকে, হাতে নয়। কোথাও যেন আপনাকে পস্তাতে না হয়।"


"খাঁটি আর ভেজালের পার্থক্য আমি অনেক দেরিতে বুঝতে পেরেছি মেহমিল বিবি! তাড়াতাড়ি বুঝলে এত বড় লোকসান হতো না।"


এই তিন মাসের মধ্যে প্রথমবার সে মেহমিলের নাম নিল। মেহমিল বিষণ্ণ মনে হাসল।


"যদি আমি ভেজাল হই, তবে যার জন্য আমাকে ছাড়ছেন, তার খাঁটি হওয়ার পরিমাপটাও দেখে নেবেন। কোথাও যেন আবার দেরি না হয়ে যায়।"


"সে তোমার চেয়ে উত্তম।" কয়েক মুহূর্ত নিরব থেকে সে শীতল কণ্ঠে বলল এবং একটি তীক্ষ্ণ নজরে তাকে বিঁধিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।


মেহমিল সজল চোখে তাকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দেখতে লাগল।


আজ হুমায়ুন তার অবিশ্বস্ততার ওপর চূড়ান্ত সিল মেরে দিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


সে ড্রেসিং টেবিলের (Dressing table) সামনে ব্রাশ (Brush) নিয়ে বিষণ্ণ মনে বসে ছিল যখন ফারিস্তে খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল।


"আমার ছোট বোন কী করছে?" সে চৌকাঠে হেলান দিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল।


"বিশেষ কিছু না।" মেহমিল হেসে ঘাড় ঘুরাল। তার খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর ছড়িয়ে ছিল।


"তবে চলো বিশেষ কিছু করি।" সে ভেতরে চলে এল। ফিরোজা রঙের সালোয়ার কামিজের সাথে সুন্দর করে মাথায় ওড়না জড়িয়ে সে বরাবরের মতোই সতেজ লাগছিল।


"তোমার চুলগুলো বেঁধে দিই। দাও!" সে মেহমিলের হাত থেকে ব্রাশটি নিয়ে নিল এবং তার খোলা চুলগুলো দুই হাতে গুছিয়ে নিল।


"ব্যাস, এখন তুমি খুব জলদি ঠিক হয়ে যাবে।" সে আদরের সাথে মেহমিলের চুলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ব্রাশ করছিল। সে মেহমিলের হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, মেহমিল আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছিল।


"তুমি ভবিষৎ নিয়ে কী ভাবলে?"


"জানি না, যখন ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে তখন চলে যাব।" সে উদাসীন হলো।


"কিন্তু কোথায়?" ফারিস্তে তার চুলগুলো গুছিয়ে উঁচু করে ধরল।


"আল্লাহর দুনিয়া অনেক বড়, প্রথমে আগা জানকে খুঁজব। যদি তাকে না পাই তবে মসজিদে চলে যাব। আশা করি আমাকে হোস্টেলে (Hostel) থাকতে দেওয়া হবে।"


"হুম।" সে উঁচু করে পনিটেইল (Ponytail) বাঁধল, তারপর চুলগুলো আবার ব্রাশ করল।


"আর আপনি কী ভাবলেন... আমার পর তো আপনাকেও যেতে হবে।"


"আমি হয়তো ওয়ার্কিং ওম্যান হোস্টেলে (Working Women Hostel) চলে যাব। জানি না, এখনও কিছু ডিসাইড (Decide) করিনি। 


যাই হোক, ছাড়ো। আজ আমি চাইনিজ (Chinese) রান্না করেছি। তোমার মাঞ্চুরিয়ান (Manchurian) পছন্দ না? এখন চটপট চলো, খাবার খাই।" সে মেহমিলের হুইলচেয়ারের পেছন থেকে ধরে ঘুরিয়ে দিল।


সে এখন কী করে বলবে যে অনেকদিন হলো সে স্বাদ অনুভব করা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এমন হতাশাজনক কথা আল্লাহকে রাগান্বিত করে দেয়, তাই সে চুপ রইল। হুমায়ুনের দিক থেকে মন এতটাই ভেঙে ছিল যে ফারিস্তের এই সঙ্গ তার মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে ভালো লাগল।


ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো ছিল। গরম ভাতের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।


"তৈমুর কোথায়?" সে জিজ্ঞেস করতে করতে থেমে গেল। তারপর ক্লান্ত স্বরে বলল, "আমি কী করব যাতে সে আপনাকে অপছন্দ করা ছেড়ে দেয়?"


"এই ভাতগুলো খাও। খুব ভালো হয়েছে।" ফারিস্তে হেসে ডিশটি তার সামনে রাখল; তার ধৈর্যও ছিল অসাধারণ।


"তৈমুরের সব অভদ্রতার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।" না চাইতেও মেহমিলের কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।


"উহুম, থাকতে দাও। আমি কিছু মনে করিনি। খালামণিও তো মায়ের মতোই হয়।"


মেহমিল সজল চোখে আলতো করে হাসল।


ফারিস্তে থেমে তার দিকে তাকাল। "কেন? হয় না কি?"


"আমার তো ভাগ্নে নেই, থাকলে অবশ্যই নিজের মতামত দিতাম। কিন্তু যেহেতু রসূলুল্লাহ (সা.) এটাই বলেছেন, তাই অবশ্যই ঠিক।"


"কী?" ফারিস্তে বিভ্রান্ত হলো।


"এটাই যে—খালামণি মায়ের মতো হয়। এটি একটি হাদিস না?"


"ওহ আচ্ছা! আমি তো ভুলে গিয়েছিলাম।" ফারিস্তে মাথা ঝাড়া দিয়ে হাসল এবং নিজের প্লেটে ভাত নিতে লাগল।




চলবে,,,,




 

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)