মুসহাফ - পর্ব: ২য় শেষ পর্ব (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ২য় শেষ পর্ব
সেই দিনটি মেহমিলের জানামতে হুমায়ুনের বাড়িতে তার শেষ দিন ছিল।
আগামীকাল দুপুরে তার ইদ্দতের (তিনটি চন্দ্র মাস) সময় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল এবং তখন সে শরীয়ত মোতাবেক হুমায়ুনের স্ত্রী থাকত না; আর তখন এই বাড়িতে থাকার যৌক্তিকতাও শেষ হয়ে যেত। তার বর্তমান শারীরিক অবস্থার (মেডিকেল কন্ডিশন) পরিপ্রেক্ষিতে তার ইদ্দত এই সময়টুকুই নির্ধারিত ছিল।
আজ ভোর হতেই সে লনে এসে বসেছিল। চড়ুইগুলো তাদের নিজস্ব ভাষায় কিছু গুণগুণ করছিল। ঘাস শিশিরে ভেজা ছিল। আশা ছিল যে আজ রাতে বৃষ্টি অবশ্যই হবে।
সম্ভবত এই বাড়িতে কাটানো তার শেষ বৃষ্টি।
ফারিস্তে সকালে জলদি কোনো কাজে বাইরে গিয়েছিল। হুমায়ুন রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরেছিল এবং সাতসকালেই বেরিয়ে গিয়েছিল। তৈমুর ভেতরে ঘুমাচ্ছিল। আর বিলকিস ছিল তার কোয়ার্টারে। তাই সে লনে একা ও বিষণ্ণ মনে বসে চড়ুইদের বিষাদমাখা গান শুনছিল। কাঁচের মতো বাদামী চোখ থেকে টপ টপ করে অশ্রু ঝরছিল।
এই বাড়ির সাথে তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।
জীবনের এক অতি সুন্দর এবং তারপর এক অতি তিক্ত সময় সে এই বাড়িতে কাটিয়েছিল।
এখানে এই ড্রাইভওয়েতেই (Driveway) সে প্রথমবার কালো শাড়িতে গাড়ি থেকে নেমেছিল—সেই রাতে যখন তার কষ্টের শুরু হয়েছিল। আবার এখানেই সে লাল কারুকাজ করা পোশাকে বধূ সেজে এসেছিল।
কখনো সে এখানে রানীর মর্যাদায়ও ছিল, কিন্তু সুখের দিন দ্রুত ফুরিয়ে যায়; তারও ফুরিয়ে গিয়েছিল। একটি কালো, অন্ধকার ঘুমের সফর ছিল এবং তাকে অনেক নিচে এনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।
"মাম্মা!" তৈমুর ঘুমন্ত চোখে তার কাঁধ ঝাঁকাচ্ছিল। সে চমকে তার দিকে তাকাল, তারপর হাসল।
"হ্যাঁ বেটা!" সে অবচেতনেই আদরের সাথে তার গাল ছুঁল।
"এতক্ষণ ধরে কেন কাঁদছেন? কতক্ষণ ধরে দেখছি।" সে নিষ্পাপ দুশ্চিন্তা নিয়ে মেহমিলের পাশে এসে বসল।
সে নাইট স্যুট (Night suit) পরে ছিল। সম্ভবত এইমাত্র জেগেছে।
"না, কিছু না।" মেহমিল দ্রুত চোখ মুছল।
"আপনি অনেক কাঁদেন মাম্মা! সারাক্ষণ কাঁদতেই থাকেন।" সে খাপা ছিল।
"আমার মনে হয়, আপনি দুনিয়ার সব মানুষের চেয়ে বেশি কাঁদেন।"
"না তো! আর তুমি কি জানো দুনিয়ার সব মানুষের চেয়ে বেশি চোখের জল কোন মানুষ ফেলেছিলেন?"
"কে?" সে কৌতূহল নিয়ে মেহমিলের কাছে ঘেঁষে বসল।
"আমাদের আদি পিতা আদম (আ.), যখন তার মাধ্যমে সেই গাছ স্পর্শ করার ভুল হয়েছিল।"
সে পরম মমতায় তৈমুরের বাদামী চুলগুলো নাড়তে নাড়তে বলছিল।
সে তৈমুরকে নিজের কারণে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইছিল না; তার মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে সে কিছুটা সফল হয়েছিল।
"আচ্ছা!" সে অবাক হলো। "আর উনার পর?"
"উনার পর দাউদ (আ.), যখন একটি বিচারে উনার সামান্য ত্রুটি থেকে গিয়েছিল...।"
"আর উনার পর?"
"উনার পর?" মেহমিল দীর্ঘশ্বাস নিল।
"জানি না বেটা! এটি তো আল্লাহ ভালো জানেন।"
"আপনিও অনেক কাঁদেন মাম্মা! তবে আপনি কি জানেন, আপনার মতো মাদার (Mother) কারো নেই।
আমার কোনো ফ্রেন্ডের (Friend) নেই, কোনো টিচারের (Teacher) নেই।"
"আমার মতো কেমন?" সে অবাক হলো।
"আপনার মতো নোবেল (Noble) আর অনারেবল (Honourable)। আপনি জানেন, আপনি আমার জন্য পুরো দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি অনারেবল আর নোবেল।"
মেহমিল একটি দীর্ঘশ্বাস নিল।
"অথচ আমি এমন নই। তুমি কি জানো, দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি নোবেল কে ছিলেন?"
"কে?"
"ইউসুফ (আ.), যিনি নবীর ছেলে, নবীর নাতি এবং নবীর প্রপৌত্র ছিলেন।"
"কেন মাম্মা?"
"কেন?" সে নিচু স্বরে প্রশ্নটি আওড়াল।
অজান্তেই চোখে বিষাদ নেমে এল। "কারণ সম্ভবত তিনি খুব ধৈর্যশীল ছিলেন এবং..."
কথাগুলো ঠোঁটে এসে থমকে গেল। সে বুঝতে পারল না কী বলবে। সব কথা তো বোঝানোর মতো হয় না।
"বলুন না মাম্মা!" সে অস্থির হলো।
"আমি যখনই আপনার কাছে হযরত ইউসুফের স্টোরি (Story) শুনি, আপনি অমনি বিষণ্ণ হয়ে যান।"
"পরে কখনো বলব। তোমার স্কুল কবে খুলছে?" সে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিল।
"মানডে (Monday) তে।"
"আর তোমার হোমওয়ার্ক (Homework) শেষ হয়েছে?"
"এইসব কথা ছাড়ুন, আমি জানি আপনি আপসেট (Up-set)।
কাল আপনি আর ড্যাডি চিরকালের জন্য আলাদা হয়ে যাবেন, তাই না?" সে হাতের তালুতে মুখ ঠেকিয়ে বিষণ্ণ মনে বলল।
"হ্যাঁ! হয়ে তো যাব... তুমি কি আমার সাথে আসবে নাকি ড্যাডির কাছে থাকবে?" সে নিজেকে ভাবলেশহীন দেখানোর চেষ্টা করল।
"আমি আপনার সাথে যাব, ওই ডাইনির সাথে থাকব না। আমি জানি, ড্যাডি তাড়াতাড়ি (দ্রুত) বিয়ে করে নেবেন।" তার সম্ভবত আরজুকে খুব খারাপ লাগত। সে মেহমিলকে তার ওপর প্রাধান্য দিচ্ছিল।
মেহমিলের মনে পড়ল হুমায়ুন বলেছিল,
'সে তোমার চেয়ে ভালো'।
"সে আমার চেয়ে ভালো তৈমুর!" সে হুমায়ুনের সেই বিষাক্ত কথা মনে করে আবার দুখী হয়ে গেল।
"কে?" তৈমুরের সাদা বিড়ালটি দৌড়ে এসে তার পায়ে বসল। সে নিচু হয়ে সেটিকে তুলতে লাগল।
"আরজু...।" অনেকবার ভেবেছিল বাচ্চার সাথে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে না, কিন্তু থাকতে পারল না।
"আরজু আন্টি?" তৈমুর বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"ওই যে, যিনি আপনার কাজিন (Cousin), যিনি এখানে আসেন?"
"হ্যাঁ, তিনিই।"
"তিনি আপনার চেয়ে ভালো নন। না... একদমই না।" সে ভেবে মাথা নেড়ে না বলল।
"তবে তোমার ড্যাডি কেন তাকে বিয়ে করতে চান? তুমি কি তাকে মায়ের রূপে গ্রহণ করতে পারবে?" নিজেকে কত বুঝিয়েছিল যে বাচ্চাকে এর মাঝে জড়াবে না, কিন্তু হুমায়ুনের ওই দিনের কথা এখনও ভেতরে কোথাও বিঁধছিল। তবে বলার পরই সে নিজেই অনুতপ্ত হলো।
"ছাড়ো, থাকতে দাও। এই বিড়ালটি এদিকে দেখাও।"
কিন্তু তৈমুর বিভ্রান্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিড়ালটি তখনও তার বাহুডোরে ছিল।
"ড্যাডি আরজু আন্টিকে বিয়ে করছেন?" তার কণ্ঠে প্রচণ্ড বিস্ময় ছিল।
"তুমি জানো না?"
"আপনাকে এটি কে বলেছে?" সে কনফিউজড (Confused) আর অবাক ছিল।
"তোমার ড্যাডি বলেছিলেন এবং এইমাত্র তুমি নিজেও বলছিলে যে তিনি তাকে বিয়ে করে নেবেন।"
তৈমুর একইভাবে বিভ্রান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মোটাসোটা বিড়ালটি তার ছোট ছোট হাত থেকে পিছলে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল।
"আরজু আন্টিকে? না মাম্মা! ড্যাডি তো তাকে বিয়ে করছেন না।"
"কিন্তু তুমি তো...।" মেহমিলের কথা এখনও পূর্ণ হয়নি।
"তিনি তো ফারিস্তেকে বিয়ে করছেন।
আপনি জানেন না?"
মেহমিলের মনে হলো কেউ যেন অনেকগুলো পাথর তার গায়ের ওপর ফেলে দিয়েছে।
"তৈমুর!" সে কঠোর স্বরে চিৎকার করে উঠল।
"তুমি এমন কথা ভাবলে কী করে?"
বিড়ালটি ভয় পেয়ে তৈমুরের হাত থেকে নিচে নেমে গেল।
"আপনি জানেন না মাম্মা?" সে মেহমিলের চেয়েও বেশি অবাক ছিল।
"তুমি এমন কথা বললে কী করে?... মাই গড (My God), সে আমার বোন।
তুমি তার সম্পর্কে এত ভুল কথা কেন বললে?" রাগ তার ভেতর থেকে উপচে পড়ল। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে তৈমুর এমন কথা বলতে পারে।
"মাম্মা! আপনি চাইলে ড্যাডিকে জিজ্ঞেস করুন, ফারিস্তেকে জিজ্ঞেস করুন। তারা দুজনে বিয়ে করছেন।"
"শাট আপ! জাস্ট শাট আপ (Shut up, just shut up)! তুমি ওই মেয়েটির সম্পর্কে এমন কথা বলছ, যে আমার বোন?"
"জি মাম্মা! এইজন্যই তো ড্যাডি আপনাকে ডিভোর্স (Divorce) দিয়েছেন, বিকজ (Because) তিনি আপনার সিস্টার (Sister), আর মুসলিমরা এক টাইমে (Time) দুই সিস্টারকে বিয়ে করতে পারে না।"
মেহমিলের মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। সে নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল।
"আই থট (I thought) আপনি জানেন। আমি তো আপনাকে বলেছিলাম যে ড্যাডি ওই ডাইনির সাথে বিয়ে করছেন।"
আর তৈমুর ফারিস্তেকেও 'ডাইনি' বলত, সে কেন ভুলে গিয়েছিল? তার মাথা প্রচণ্ড ঘুরতে শুরু করেছিল।
"না তৈমুর! সে আমার বোন।" তার কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছিল।
"তিনি তো এইজন্যই আমাদের সাথে এখানে থাকেন, যাতে আপনি যখন চলে যাবেন তখন ড্যাডিকে বিয়ে করতে পারেন।"
"কিন্তু তৈমুর! সে আমার বোন।" তার কণ্ঠ ভেঙে আসছিল।
"আপনি দেখেননি, যখন তিনি ড্যাডির সাথে সন্ধ্যায় বাইরে যান? একবার তারা আমাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা ভাবেন আমি বাচ্চা, আমি কিছু বুঝি না।"
"কিন্তু তৈমুর! সে তো আমার বোন।" সে বিধ্বস্ত, পরাজিত এবং রুদ্ধকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।
তার মনে হচ্ছিল কেউ ধীরে ধীরে তার জান কবজ করছে। তৈমুর কী বলছিল, তার কিছুই মাথায় ঢুকছিল না।
"এইজন্যই আমার তাকে ভালো লাগে না—উইচ নাম্বার ওয়ান (Witch Number 1)।
তার কারণেই ড্যাডি আপনাকে সেপারেট (Separate) করছেন। আপনি দেখেননি, যখন তিনি সন্ধ্যায় ড্যাডির সাথে বাইরের রেস্টুরেন্টে (Restaurant) যান?"
"তুমি... তুমি ভুল বলছ। সন্ধ্যায় তো সে মসজিদে যায়। সে সেখানে পড়ায়।" মেহমিলের মনে পড়ল ফারিস্তে সন্ধ্যায় মসজিদে যেত। নিশ্চিত তৈমুরের কোনো ভুল হচ্ছে, সে ভুল বুঝেছে।
"মসজিদ?" তৈমুর অবাক হয়ে চোখের পলক ফেলল। "এই পাশের মসজিদ?"
"আপনি কোথায় থাকেন? ফারিস্তে তো কখনো মসজিদে যায়নি।"
"সে... সে সেখানে কুরআন পড়ায়, তুমি জানো না তৈমুর...।"
"তিনি তো কখনো কুরআন পড়েন না, আমি তো আপনাকে বলেছিলাম।"
"না! সে আমার এবং তোমার চেয়ে বেশি কুরআন পড়ে। সে... সে-ই তো আমাকে কুরআন শিখিয়েছিল।
তুমি ভুল বলছ, সে এমন করতে পারে না।" সে মাথা নেড়ে তৈমুরকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল।
"আপনি কখনো তাকে কুরআন পড়তে দেখেছেন? মসজিদে যেতে দেখেছেন?"
সে ফারিস্তের পক্ষ নিয়ে তৈমুরকে ভুল প্রমাণ করার জন্য কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সে ফারিস্তেকে নামাজ পড়তে দেখেছিল, কিন্তু কখনো কুরআন পড়তে দেখেনি।
হ্যাঁ, সে সব ওয়াক্তের নামাজই পড়ত।
"কাম অন মাম্মা (Come on, Mama)!
আপনি বিলকিস বুয়াকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি মসজিদে যান না। আপনাকে কি তিনি নিজে বলেছেন যে তিনি মসজিদে যান?" তৈমুরের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না।
হাসপাতালের কারণে সকালের ক্লাস নেওয়া সম্ভব ছিল না। ফারিস্তে মেহমিলের প্রশ্নের অস্পষ্ট উত্তর দিয়েছিল। বাকি সব মেহমিল নিজে ধরে নিয়েছিল।
তবে কি তৈমুর সত্যি বলছিল? না, কখনোই না। ফারিস্তে তার সাথে এমন করতে পারে না। সে তো তার খুব আদরের, খুব যত্নশীল বোন ছিল; সে কীভাবে পারে?
"তিনি মসজিদে যান না। তিনি ড্যাডির সাথে যান। প্রথমে ড্যাডি গাড়িতে বের হন, তারপর তিনি বাইরে বের হন এবং কলোনির শেষ মাথায় ড্যাডি তাকে পিক (Pick) করে নেন, যাতে বিলকিস বুয়া জানতে না পারে।
আমি টেরেস ( বারান্দা)(Terrace) থেকে অনেকবার দেখেছি। আজও সকালে তিনি ড্যাডির সাথেই গিয়েছেন।"
সে পাথরের মতো নিথর হয়ে শুনছিল।
"যখন আপনি হাসপাতালে ছিলেন, তখনও তারা এভাবেই করতেন। কিন্তু আমি তো কোনো ছোট বেবি (Baby) নই, আমি সব বুঝি।"
এসব কবে হলো? কীভাবে হলো? সে হতভম্ব ও অবিশ্বাসের ঘোরে নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। তৈমুর সামনে আরও অনেক কিছু বলছিল, কিন্তু সে শুনছিল না। সব আওয়াজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সব চেহারা মুছে গিয়েছিল। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা।
"মাম্মা! আপনি ঠিক আছেন তো?" তৈমুর চিন্তিত হয়ে তার হাত নাড়াল। সে কিছুটা চমকে উঠল। চোখের সামনে যেন কুয়াশা ছেয়ে যাচ্ছিল।
"আমাকে... আমাকে একা ছেড়ে দাও বেটা!" সে অবচেতনভাবে দুই হাতে নিজের ঘুরতে থাকা মাথা চেপে ধরল।
"এখনই যাও এখান থেকে... প্লিজ...।"
কয়েক মুহূর্ত সে বিষণ্ণ মনে মেহমিলকে দেখল, তারপর নিচু হয়ে ঘাসের ওপর বসা মোটাসোটা সাদা বিড়ালটিকে তুলে নিয়ে ফিরে গেল।
"এটাই কি একমাত্র কারণ?"
"তোমার কি একদমই আশা নেই যে তিনি ফিরে আসবেন?"
"তুমি কি নিজেকে এত স্ট্রং (Strong) মনে করো যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে?"
তার মাথায় ফারিস্তের কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
প্রতি সন্ধ্যায় হুমায়ুন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত, কোনো বন্ধুর কাছে। প্রতি সন্ধ্যায় ফারিস্তেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। সে কখনো বলেনি যে সে কোথায় যায়। সে কখনো বলেনি যে মেহমিলের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর সে কোথায় যাবে।
আর সে কেনই বা এখনও এখানে থাকছিল? শুধু কি মেহমিলের যত্নের জন্য? সেই যত্ন তো কোনো নার্সও (Nurse) করতে পারত। তবে সে কেন তাদের বাড়িতে ছিল?
সে কখনো ফারিস্তেকে কুরআন পড়তে দেখেনি। যেদিন সে মসজিদে গিয়েছিল, ফারিস্তে সেখানে ছিল না। মেহমিল সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই ছিল, কিন্তু সে সেখানে আসেনি।
সে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে ছিল আর ফারিস্তে তার সেই ভুল ভাঙায়নি।
আর আরজু? তার কাহিনি কী ছিল? সে সাক্ষী ছিল যে হুমায়ুন তাকে বিয়ে করছিল।
হুমায়ুন নিজেই আরজুকে একথা বলেছিল; কিন্তু যখন মেহমিল জিজ্ঞেস করেছিল, তখন সে কী বলেছিল...।
বলার প্রয়োজন মনে করেনি। সে কখনও বলেনি যে সে আরজুকে বিয়ে করছে।
ফারিস্তেও কখনও তার এবং আরজুর অস্পষ্ট সম্পর্কের ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।
ওসবই কোনো সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ ছিল; তারা দুজনেই জানত আর মেহমিলকে তারা অন্ধকারে রেখেছিল।
'সে তোমার চেয়ে ভালো'—হুমায়ুন এটাই বলেছিল এবং সে নিশ্চিতভাবেই ফারিস্তের কথা বলছিল।
কিন্তু সে এমনটা কীভাবে করতে পারল? সে তার সংসারে কীভাবে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারল? সে তো কুরআনের ছাত্রী ছিল, সে তো বাচ্চা ছিল, সে তো আমানতদার ছিল। তবে কেন সে বদলে গেল? যে অন্যের আমানতের খেয়াল রাখত, সে সম্পর্কের আমানতে খেয়ানত কীভাবে করল?
ভেবে ভেবে মেহমিলের মাথা ফেটে যাচ্ছিল। বুকটা যেন ডুবে যাচ্ছিল। আজ তার মনে হচ্ছিল সবাই প্রতারক ছিল, সবাই স্বার্থপর ছিল। প্রতিটি মানুষ নিজের স্বার্থের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিল। তার কেউ নেই, কেউ না। সে অনেকক্ষণ হাতের ওপর মাথা রেখে বসে রইল।
যখন অনেক মুহূর্ত পেরিয়ে গেল, তখন তার মনে পড়ল যেখানে সবাই বদলে গেছে, সেখানে কেউ একজনও ছিল যে বদলায়নি। যেখানে সবাই ধোঁকা দিয়েছে, সেখানে কেউ একজন তার খেয়ালও রেখেছিল। যেখানে সবাই সঙ্গ ছেড়ে চলে গেছে, সেখানে কেউ একজন তাকে সাহারাও দিয়েছে।
ওহ... সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল এবং এরপর আলতো করে হুইলচেয়ারের চাকা ভেতরের দিকে ঘুরাল।
তার ঘরের শেলফের ওপরে সাদা মলাটের কুরআনের পাণ্ডুলিপি (মুসহাফ) রাখা ছিল। সে দ্রুত সেটি তুলে নিল। এই মুহূর্তে তার এর বড় প্রয়োজন ছিল।
মুসহাফের নিচে তার পুরোনো রেজিস্টার (Register) রাখা ছিল। সে যখন কুরআনটি তুলল তখন রেজিস্টারটি পিছলে নিচে পড়ে গেল।
মেহমিল এক হাতে কুরআন ধরে নিচু হয়ে রেজিস্টারটি তুলল। সেটি মাঝখান থেকে খুলে গিয়েছিল। সেটি বন্ধ করে ফিরিয়ে রাখার সময় সে থমকে গেল। খোলা পৃষ্ঠায় সূরা বাকারার সেই আয়াতের ব্যাখ্যা লেখা ছিল যা নিয়ে সে সবসময় বিভ্রান্ত হতো—'হিত্তাতুন' (Hittahtun) এবং 'হিনতাতুন' (Hintahtun)। এই পৃষ্ঠাটি অনেকবার খোলার কারণে এখন রেজিস্টারটি খুললেই সেটি বেরিয়ে আসত।
খোলা রেজিস্টারটি তার ডান হাতে ছিল এবং কুরআন বাম হাতে। দুটোর অবস্থানই ছিল ঠিক তার চোখের সামনে। রেজিস্টারের পঙ্ক্তি 'হিনতাতুন' (Hintahtun) এর অর্থ হয় গম—এর সামনে পৃষ্ঠাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল।
সে অবচেতনেই সেই পঙ্ক্তিটি কুরআনের সাদা মলাটের কাছে নিয়ে এল যেখানে একটি অস্পষ্ট 'মীম' (Mim) লেখা ছিল।
সে 'গন্দ' (Ganda/গম এর উর্দু প্রতিশব্দ) এবং 'মীম' কে মেলাল। উভয়ের মাঝখানে একটি ছোট বিন্দু ছিল।
সে বিন্দুগুলোকে জুড়ল, অসম্পূর্ণ শব্দটি পূর্ণ হয়ে গেল।
'গন্দম' (Gandam/গম)।
তার মনে পড়ল, সে ভুলবশত কুরআনের ওপর রেজিস্টার রেখে লিখছিল। পৃষ্ঠা শেষ হওয়ায় অবচেতনভাবে সে শব্দটি কুরআনের কভারে পূর্ণ করেছিল। ঠিক সেই সময় ক্লাস ইনচার্জের (Class Incharge) কাছে বকা খাওয়ার কারণে বিষয়টি মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল।
সে নিজেও কখনও জানতে পারেনি যে এই অস্পষ্ট 'মীম' টি সেই অসম্পূর্ণ শব্দেরই অংশ ছিল।
আজ বহু বছর পর সেই গল্পটি পূর্ণ হলো। তার মনে হঠাত এক আলোর ঝলকানি দেখা দিল এবং সব জট খুলে গেল।
বনী ইসরায়েলকে শহরের প্রবেশদ্বারে প্রবেশের পূর্বে ক্ষমা (হিত্তাতুন) চাওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা গম (হিনতাতুন) চাইতে লাগল, ক্ষমা চাইল না।
এটি ছিল বনী ইসরায়েলের স্বভাব এবং সেই একই স্বভাবের পুনরাবৃত্তি সে নিজেও করেছিল।
আমরা জাহেলিয়াত থেকে ইসলামের আলোতে এসে এক বারই তওবা করি, সারা জীবন এরপর নেক আমল তো করতে থাকি, কিন্তু বারবার তওবা করার কথা ভুলে যাই। আমরা একটা খাদ থেকে বেঁচে গিয়ে ভাবি জীবনে আর কখনও খাদ আসবে না। আর যদি আসেও তবে আমরা বেঁচে যাব। আমরা সবসময় নেয়ামতগুলোকে নিজেদের নেক আমলের ইনাম (পুরস্কার) মনে করি আর বিপদকে গুনাহের সাজা।
এই দুনিয়ায় প্রতিদান খুব কম মেলে আর তাতেও পরীক্ষা থাকে। নেয়ামত হলো শোকরের পরীক্ষা আর বিপদ হলো সবরের।
জীবনের যেকোনো নতুন পরীক্ষায় প্রবেশ করার সময় মুখ থেকে প্রথম শব্দ 'হিত্তাতুন' (ক্ষমা) বের হওয়া উচিত।
কিন্তু আমরা সেখানেও গম অর্থাৎ (দুনিয়ার সুখ) চাইতে শুরু করি।
আল্লাহ যখন তাকে জীবনের এক অন্য পর্যায়ে (Phase) নিয়ে এলেন, তখন তার ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু সে 'হুমায়ুন ও তৈমুর' কে চাইতে শুরু করল। 'হিনতাতুন হিনতাতুন' বলতে লাগল।
গম চাওয়া মন্দ ছিল না, কিন্তু প্রথমে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।
সে প্রথম সিঁড়ি না চড়েই দ্বিতীয় সিঁড়ি টপকাতে চাচ্ছিল; এভাবে কি কূল পাওয়া যায়?
সে জানে না কতক্ষণ টেবিলের ওপর মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকল।
আজ তার নিজের সব গুনাহ আবার মনে পড়ছিল। আজ সে আবার তওবা করছিল।
সেই তওবা যা বারবার করতে আমরা 'নেক' হওয়ার পর ভুলে যাই।
জীবনে কিছু মুহূর্ত এমন আসে যখন আপনি নিজে কুরআন পড়তে পারেন না।
তখন আপনি অন্য কারও কণ্ঠ থেকে কুরআন শুনতে চান। আপনার মন চায় যে কেউ আপনার সামনে কিতাবুল্লাহ পড়ে যাক আর আপনি কাঁদতে থাকুন।
কখনও কখনও আপনি শান্ত হওয়ার জন্য তার কাছে যান, আবার কখনও কাঁদার জন্য।
তার মন চাইছিল যে সে খুব কাঁদবে।
কুরআন শুনতে থাকবে আর কাঁদতে থাকবে।
তেলাওয়াতের ক্যাসেটের (Cassettes) বাক্সটি কাছেই রাখা ছিল। টেপ রেকর্ডারটিও (Tape Recorder) সাথে ছিল। সে না দেখেই শেষ দিক থেকে একটি ক্যাসেট বের করল এবং না দেখেই সেটি লাগিয়ে দিল।
এখন সে না মানে জানতে চাইছিল, না মর্ম বুঝতে চাইছিল। এখন সে শুধু শুনতে চাইছিল, শুধু কাঁদতে চাইছিল।
সে প্লে (Play) বোতামটি টিপল এবং মাথা টেবিলের ওপর রেখে দিল। চোখের জল টেবিলের কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ছিল।
ক্বারী সুহাইব আহমদের সেই সুরিল এবং বেদনাঘন কণ্ঠ ধীরে ধীরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ১১
وَالضُّحَىٰ (১)
'ওয়াদ দুহা'
(শপথ পূর্বাহ্নের রৌদ্রোজ্জ্বল সময়ের)।
সে নীরবে শুনতে লাগল। তার জীবনের সেই উজ্জ্বল দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল যখন সে এই বাড়ির রানী ছিল।
وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ (২)
'ওয়াল লাইলি ইযা সাজা'
(এবং শপথ রাতের, যখন তা নিঝুম হয়ে যায়)।
তার সেই নিস্তব্ধ রাতটির কথা মনে পড়ল যখন হুমায়ুন তাকে তালাক দিয়েছিল, যে রাতে সে এখানে বসে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَىٰ (৩)
'মা ওয়াদ্দাআকা রাব্বুকা ওয়ামা ক্বালা'
(আপনার পালনকর্তা আপনাকে ত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি)। [সূরা দুহা: ৩]
তার অশ্রু ঝরা আরও বেড়ে গেল। কে এই সত্তা যিনি তার প্রতিটি চিন্তা পড়ে নিতে পারছিলেন? কে ইনি?
৪. وَلَلْآخِرَةُ خَيْرٌ لَّكَ مِنَ الْأُولَىٰ
'ওয়ালাল আখিরাতু খাইরুল লাকা মিনাল উলা'
(অবশ্যই আপনার জন্য পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম হবে)। [সূরা দুহা: ৪]
সে জোরে চোখ বন্ধ করে নিল। সত্যিই কি এখন সবকিছুর শেষটা ভালো হতে যাচ্ছিল?
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَىٰ(৫)
'ওয়ালা সাওফা ইয়ু’তিকা রাব্বুকা ফাতারাদা'
(এবং আপনার পালনকর্তা শীঘ্রই আপনাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন)। [সূরা দুহা: ৫]
মেহমিল কিছুটা চমকে খুব ধীরে মাথা তুলল।
আল্লাহর কি তার এতই চিন্তা ছিল যে তিনি তার বিষণ্ণ মনকে সান্ত্বনা দিতে এসব বলছিলেন? সত্যিই কি তিনি তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন না? সত্যিই কি তিনি তাকে ছেড়ে দেননি?
৬. أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ
'আলাম ইয়াজিদকা ইয়াতীমান ফাআওয়া'
(তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি, অতঃপর আশ্রয় দেননি?) [সূরা দুহা: ৬]
সে নিথর হয়ে গেল। এসব কি এত স্পষ্টভাবে তার জন্যই নাজিল হচ্ছিল? সে কি এর যোগ্য ছিল?
৭. وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَىٰ
'ওয়াওয়াজাদাকা দ্বাল্লান ফাহাদা'
(এবং তিনি আপনাকে পথহারা অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর পথ দেখিয়েছেন)। [সূরা দুহা: ৭]
সে স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। হ্যাঁ, এটাই তো হয়েছিল।
৮. وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَىٰ
'ওয়াওয়াজাদাকা আইলান ফাআগনা'
(এবং তিনি আপনাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেয়েছেন, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন)। [সূরা দুহা: ৮]
তার চোখের জল ঝরা থেমে গেল। কম্পিত ঠোঁট স্থির হলো।
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ(৯)
'ফাম্মাল ইয়াতীমা ফালা তাক্বহার।
১০. وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
ওয়াআম্মাস সা-ইলা ফালা তানহার।
১১. وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
ওয়াআম্মা বিনি’মাতি রাব্বিকা ফাহাদ্দিস।'
(সুদরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।
সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দেবেন না।
এবং আপনার পালনকর্তার নেয়ামত প্রকাশ করতে থাকুন)। [সূরা দুহা: ৯-১১]
সূরা দুহা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার জীবনের পুরো গল্প এগারোটি আয়াতে গুছিয়ে তাকে শুনিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সূরাটি যেন এখনই আসমান থেকে নাজিল হয়েছে—তার জন্য... শুধু তার জন্য।
সে পরিশ্রান্ত হয়ে চেয়ারের পিঠে মাথা এলিয়ে দিল এবং চোখ বন্ধ করল। সে কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিল।
এরপর উঠে তাকে ফারিস্তের সাথে দেখা করতে হবে।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
মেঘ জোরে ডেকে উঠল।
মেহমিল একবার জানালার বাইরে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার দিকে তাকাল এবং অন্যবার বন্ধ দরজার দিকে। ওপাশ থেকে পদশব্দ শোনা যাচ্ছিল। মাত্র কয়েক মিনিট আগে সে ফারিস্তেকে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখেছিল।
তার আসার কিছুক্ষণ পরই হুমায়ুনের গাড়ি ভেতরে এসেছিল। অবশ্য সে বড়জোর এক মিনিট পরই কিছু কাগজ নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তার গাড়ি এইমাত্র চলে গেল।
সে জানালার এপাশে দাঁড়িয়ে দারোয়ানকে গেট বন্ধ করতে দেখছিল, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
"মেহমিল!" ফারিস্তে তার চেনা নরম স্বরে ডাকল, এরপর আস্তে দরজা খুলল। এখন সে খুব একটা সালাম দেয় না। মেহমিল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
সে দরজার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। দীর্ঘাঙ্গী, কাঁচের মতো সোনালি চোখের মেয়েটি, যে হালকা গোলাপি রঙের পোশাকে মাথায় ওড়না জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কে ছিল? মেহমিলের মনে হলো সে তাকে চেনে না।
"কেমন আছো?" চেহারায় নরম হাসি নিয়ে সে ভেতরে ঢুকল।
"বিলকিস বলছিল তুমি আমাকে খুঁজছিলে।" সে এগিয়ে এসে অভ্যাসবশত শেলফে থাকা বই, রেজিস্টার আর টেপ (Tape) গুছিয়ে রাখতে লাগল।
তার বাদামী চুলগুলো খোলা ছিল এবং সেভাবেই সে ওড়না মাথায় দিয়েছিল যাতে কিছু লট (চুলের গুছি) বাইরে বেরিয়ে ছিল।
গোলাপি ওড়নার আড়ালে তার চেহারা উজ্জ্বল লাগছিল।
"জি, আমি জানতাম না আপনি কোথায় ছিলেন।" মেহমিল তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল, যে তার সামনে মাথা নিচু করে বই গোছাচ্ছিল।
তৈমুরের কথায় তার এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল না। ফারিস্তে এমনটা করতে পারে না। কখনোই না। নিশ্চয়ই তৈমুরের বুঝতে ভুল হয়েছে।
"আমি এক বন্ধুর সাথে ছিলাম, কিছু শপিং (Shopping) করার ছিল।" খুব শান্ত গলায় জানিয়ে সে রেজিস্টারগুলো একটার ওপর একটা রাখল।
সে মিথ্যাও বলেনি, আবার সত্যিটাও বলেনি। মেহমিলের বিশ্বাস টলতে লাগল।
"আপনি ভবিষ্যতের কী ভাবলেন ফারিস্তে? আমার যাওয়ার পর আপনি কী করবেন?"
"এখনও কিছু ঠিক করিনি। তোমার যাওয়ার পর ইনশাআল্লাহ প্ল্যান (Plan) করব। দেখি কী হয়।" সে এখন ফুলদানিতে রাখা তোড়া থেকে শুকনো ফুলগুলো সাবধানে বের করছিল।
তার উত্তরগুলো ছিল অস্পষ্ট। না সত্যি, না মিথ্যা।
"আর তুমি সারা দিন কী করলে?" সে শুকনো ফুলগুলো ডাস্টবিনে (Dustbin) ফেলল।
"বিশেষ কিছু না।"
দুজনই চুপ হয়ে গেল, নিজ নিজ ভাবনায় ডুবে।
এখন মেহমিলের কাছে সত্য জানার একটাই উপায় ছিল এবং সে সেটি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল।
"ফারিস্তে! ওই শরীরটি কার ছিল যা চেয়ারের (কুরসি) ওপর ফেলে রাখা হয়েছিল?"
"কোন শরীর?" ফারিস্তে ঘুরে তার দিকে তাকাল। ফেরার সাথে সাথে তার মাথার ওড়না কিছুটা সরে গেল এবং বাদামী চুল উঁকি দিল।
"কুরআনে এক জায়গায় একটি শরীরের কথা উল্লেখ আছে যা কারো কুরসির ওপর ফেলে রাখা হয়েছিল।
আপনার মনে আছে ওটি কার শরীর ছিল?" মেহমিলের ভঙ্গি এমন ছিল যেন সে ভুলে গেছে।
ফারিস্তে বিভ্রান্ত হয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবল, এরপর মাথা নেড়ে না বলল। "না, আমার মনে পড়ছে না।"
আর মেহমিল তার সব উত্তর পেয়ে গেল। ফারিস্তে কুরআন ভুলে গিয়েছিল। যদি সে নিয়মিত কুরআন পড়ত তবে তার মনে থাকত; কিন্তু সে পড়া ছেড়ে দিয়েছিল।
আর কুরআন তো কয়েক দিনের জন্যও ছেড়ে দিলে তা মানুষের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়।
এটি আল্লাহর কিতাবের রীতি এবং এটি কখনও পরিবর্তন হবে না। মেহমিল দীর্ঘশ্বাস নিল।
"সেটি সুলাইমান (আ.)-এর কুরসি ছিল, যার ওপর একটি শরীর রাখা হয়েছিল।"
"ওহ আচ্ছা।" ফারিস্তে টেবিলের ওপর পড়া পানির ফোঁটা টিস্যু (Tissue) দিয়ে মুছল।
"কেন করলেন আপনি এমনটা, ফারিস্তে?" সে খুব দুঃখের সাথে বলল।
এখন সময় এসেছিল চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ করার।
"কী?" ফারিস্তে মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। তার চেহারায় কেবল জিজ্ঞাসু ভাব ছিল।
"এই বাড়িতে যা যা হচ্ছে, আমি সে সব জানতে চাই।"
"যেমন?" সে ভ্রু কুঁচকাল। তার চেহারায় সেই একই নরম অভিব্যক্তি ছিল।
"সবকিছু!"
"সবকিছু? কোন বিষয়ে? আমার আর হুমায়ুনের বিয়ের বিষয়ে?"
তার ভঙ্গিতে কোনো লজ্জিত ভাব ছিল না, না ছিল ধরা পড়ার ভয়। সে খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করছিল।
"সবকিছু!" মেহমিল ধীরে পুনরাবৃত্তি করল।
"হুমায়ুন যখন করাচি থেকে এল তখন সে আমাকে প্রপোজ (Propose) করল। সে তোমার সাথে থাকতে চায়নি, কিন্তু তালাকের আগে সে আমাকে বিয়েও করতে পারত না।
তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে তোমার যখন জ্ঞান ফিরে আসবে তখন সে তোমাকে ডিভোর্স (Divorce) দিয়ে দেবে আর আমরা বিয়ে করে নেব।"
সে যেন আবহাওয়ার সংবাদ শোনাচ্ছিল।
"সে বলত যে আলেমদের থেকে ফতোয়া নিয়ে নিই, কিন্তু আমার মন সায় দেয়নি।
আমি ভাবলাম আরও কিছু সময় অপেক্ষা করা যাক। এরপর তোমার জ্ঞান ফিরে এল। তাই সে ডিভোর্স পেপার (Divorce papers) সই করে দিল।
আমাকে প্রপোজ করার আগেই সে তোমাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
যদি এর প্রয়োজন নাও হতো তবুও সে তাই করত, কারণ সে এই বিয়ে টিকিয়ে রাখতে রাজি ছিল না।"
সে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ও শান্তভাবে টেবিলের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মেহমিলের অব্যক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছিল।
"আমি তার প্রপোজল এইজন্য গ্রহণ করেছি কারণ তালাকের পর তাকেও কারও না কারও সাথে বিয়ে করতে হতো আর আমাকেও।
যেহেতু আমরা একে অপরকে ভালো করে চিনতাম এবং বুঝতাম, তাই তার প্রস্তাব আমার জন্য সেরা পছন্দ ছিল।
আমি তাকে তোমার সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য বাধ্য করতে পারতাম না, আর সে কারও কথা শুনতও না।
তাই শরীয়তের দিক থেকে প্রস্তাব গ্রহণ করার অধিকার আমার ছিল, আর আমি সেটি ব্যবহার করেছি।"
তার কাছে যুক্তি ছিল, ব্যাখ্যা ছিল এবং মজবুত শরয়ী ভিত্তি ছিল। মেহমিল নীরবে তার সব কথা শুনছিল।
সে কিছুক্ষণ চুপ থাকলে মেহমিল মুখ খুলল।
"আর যখন হুমায়ুন আপনাকে আমার ও ফাওয়াদের সম্পর্কের ধরন এবং ওই ছবিগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন আপনি কী বলেছিলেন?" সে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ল।
"সেটাই যা সত্য ছিল।" সে এখনও শান্ত।
"মুয়িয তাকে কিছু ছবি আর সেই এগ্রিমেন্ট (Agreement) এনে দেখিয়েছিল যা আমরা ফাওয়াদের সাথে ঠিক করেছিলাম।
আমি ভেবেছিলাম তুমি এই বিষয়ে হুমায়ুনকে জানিয়ে দিয়েছ; আমি তার রাগের ভয়ে নিজে বলিনি।
কিন্তু তুমিও বলোনি, তাই তার রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। সে আমাকে ডাকল, এরপর সে আমার ওপর চিৎকার করল। আমি চুপ করে শুনছিলাম। সে জিজ্ঞেস করল এই এগ্রিমেন্ট সত্যি না কি মিথ্যা? আমি সত্যিটাই বললাম।
সে রাগে চিল্লাতে থাকল। তার কষ্ট ছিল যে আমরা দুজনেই তাকে বিশ্বাস করিনি।
এরপর সে আমাকে ছবিগুলো দেখাল এবং জিজ্ঞেস করল ওগুলো সত্যি না কি মিথ্যা? আমি সত্যিটাই বললাম।"
"কী বললেন?" মেহমিল দ্রুত তার কথা থামিয়ে দিল।
"এটাই যে—আমি জানি না। আর আমি সত্যিই জানতাম না।"
মেহমিল তার দিকে তাকিয়ে রইল। এটিই ফারিস্তের সত্য ছিল?
"এরপর সে জিজ্ঞেস করল মুয়িয তাকে যেসব কথা বলেছে সেগুলো সত্যি না কি মিথ্যা? মুয়িয তাকে বলে গিয়েছিল যে তোমার আর ফাওয়াদের এফেয়ার (Affair) ছিল।
সেই রাতে ফাওয়াদ তোমাকে প্রপোজ করতে চেয়েছিল, সম্ভবত কোনো আংটিও (Ring) ছিল।
আর এরপর সে কৌশলে হুমায়ুনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। ওই আংটির কথা ফাওয়াদের সেই ফোন কলেও ছিল যা হুমায়ুন ট্যাপ (Tap) করেছিল। এই কথাটি সে আগে ইগনোর (Ignore) করেছিল, কিন্তু মুয়িয মনে করিয়ে দেওয়ায় সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি সত্যিটাই বললাম।"
এবার মেহমিল চুপ রইল। সে জিজ্ঞেস করল না যে ফারিস্তের সত্য কী ছিল। সে জেনে গিয়েছিল যে ফারিস্তে কী বলতে যাচ্ছে।
"আমি তাকে বলে দিয়েছিলাম যে আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না, আর তুমিও কখনও আমাকে এই বিষয়ে আস্থায় নাওনি।
সে সেই রাতটির কথা জিজ্ঞেস করলে আমি সত্যটাই বললাম যে—ফাওয়াদ তোমাকে প্রপোজ করার অছিলাতেই ডিনারে নিয়ে যাচ্ছিল।
তুমি আমাকে এটাই বলেছিলে, তাই আমি তাকে সেটাই বললাম।"
সে চুপচাপ অপলক দৃষ্টিতে সামনে
দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত মেয়েটিকে দেখছিল। যার চেহারায় একটুও আক্ষেপ ছিল না।
সে মেহমিলের একটি গোপন কথা পর্যন্ত আগলে রাখতে পারেনি।
যেখানে কোনো আমানতের রক্ত মিশে থাকে তা কীভাবে সত্য হতে পারে? সে তো মেহমিলকে চিনত, সে তার বোন ছিল।
সে কি মেহমিলের দোষ গোপন করতে পারত না? ফাওয়াদ কখনও বলেনি যে সে তাকে প্রপোজ করতে যাচ্ছে। এসবই তো মেহমিল নিজে ভেবে নিয়েছিল। তার একটি ভুল হয়েছিল। সে ভেবেছিল সময়ের ধুলো সেই ভুলকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মেয়েদের কাঁচা বয়সের বোকামিগুলো এত সহজে কি পিছু ছাড়ে!
"সেই টেপে কোনো আংটির কথাও ছিল। হুমায়ুন বারবার সেটি শুনেছে। সে আমার ওপর রাগ করছিল যে আমি কেন তাকে অন্ধকারে রেখেছি।
এরপর সে তার ট্রান্সফার (Transfer) করাচিতে করিয়ে নিল।"
সে এখন জানালার বাইরে লনের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিল।
"সেখানে করাচিতে আরজু এল। তার বাবার মৃত্যুর পর করীম চাচা এবং গুফরান চাচা তার অংশও গ্রাস করেছিলেন, তাই আরজু ভাবল এক ঢিলে দুই পাখি মারবে।
সে ফাওয়াদের কাছ থেকে তোমার আর আমার সই করা কাগজ নিল এবং মুয়িযের মাধ্যমে হুমায়ুনের কাছে পাঠাল।
ফাওয়াদ আরজুকে পছন্দ করতে শুরু করেছিল, সে এখন তাকে বিয়ে করতে চাইছিল। কিন্তু আরজুর কাছে হুমায়ুনকে বেশি যোগ্য মনে হলো। তাই আরজু চাইল হুমায়ুন যেন আইনিভাবে তোমার অংশ আগা করীমের কাছ থেকে ফেরত নেয় এবং তার (আরজুর) অংশ নিতেও সাহায্য করে; যাতে সে যখন হুমায়ুনকে বিয়ে করবে তখন তোমার অংশের ওপরও সে কবজা করতে পারে যা হুমায়ুনের মালিকানায় থাকবে।
আর স্বাভাবিকভাবেই তোমার বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিল যে তুমি কখনও সেরে উঠবে না।"
মেঘ আবার জোরে ডাকল। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাল। সন্ধ্যার নীল আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল।
সে তখনও চুপচাপ ফারিস্তের কথা শুনছিল।
"কিন্তু হুমায়ুনের ফাওয়াদের ওপর জেদ চেপে গিয়েছিল।
শুধু এই জন্য যে ফাওয়াদ আরজুকে পছন্দ করে, হুমায়ুন আরজুকে নিজের কাছে আসতে দিল।
ফাওয়াদ হুমায়ুনকে মিনতি করতে থাকল যেন সে আরজুকে ছেড়ে দেয়, কিন্তু হুমায়ুন তার থেকে সব প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল।
সে বলত ফাওয়াদ তার ভালোবাসাকে কেড়ে নিয়েছে, সেও ফাওয়াদের ভালোবাসাকে সেভাবেই কেড়ে নেবে।
সে আরজুকে কখনও বিয়ে করছিল না, কিন্তু তাকে ধোঁকায় রেখেছিল। এইমাত্র আমাকে ড্রপ (Drop) করে সে আরজুর কাছেই গেছে তাকে এটা জানাতে যে—আরজু তাকে যেভাবে ব্যবহার করছিল, হুমায়ুনও তাকে সেভাবেই ব্যবহার করছিল। আরজু চরমপন্থী মেয়ে, কে জানে রাগে কী করে বসে! কিন্তু যা-ই হোক, আজ সে তাকে আয়না দেখিয়েই ফিরবে।"
জানালার বন্ধ কাঁচের ওপর কোনো এক উড়ন্ত পাখি সজোরে ঠোকর মারল, এরপর চক্কর খেয়ে পেছনে পড়ে গেল। মেঘ থেকে থেকে গর্জন করছিল।
"হয়তো তুমি ভাবছ আমি তোমার সাথে মন্দ করেছি। অথবা আমার এমনটা করা উচিত হয়নি। কিন্তু তুমি ভেবে দেখো আমি আর কী-ই বা করতাম?
আমি হুমায়ুনকে খুব ভালোবাসতাম এবং বাসি। কিন্তু যখন আমার মনে হলো তোমরা একে অপরকে চাও তখন আমি মাঝখান থেকে সরে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সে তোমাকে চায় না আর আমাকেও তো কারও না কারও সাথে বিয়ে করতে হতো।
বলো, আমি কী ভুল করেছি? আমার দ্বীন আমাকে প্রস্তাব নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে, তাই আমি সেটি ব্যবহার করেছি।
তুমি যেকোনো মুফতিকে জিজ্ঞেস করো, যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর প্রয়োজন পূরণে সক্ষম না থাকে তবে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে; এতে কারও হক নষ্ট করার বিষয় নেই।
মনে করে দেখো, সূরা নিসায় আমরা কী পড়েছিলাম যে—যদি কেউ হক আদায় করতে না পারে তবে সে নিজের হক ছেড়ে দেবে, আলাদা হয়ে যাবে যাতে আল্লাহ উভয়ের জন্য প্রশস্ততা দান করেন।"
নিজের স্বার্থের আয়াতগুলো তার আজও মনে ছিল।
"আমি আশা করি এখন তোমার কনফিউশন (Confusion) আর অভিযোগ দূর হয়ে গেছে।
আমি সাত বছর তোমার সেবা করেছি, যদিও এটি আমার ফরজ দায়িত্ব ছিল না; কিন্তু এই জন্য যাতে তুমি কখনও মনে না করো আমি তোমাকে ভালোবাসি না।
আমি আজও তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি একবার আমাকে কথা দিয়েছিলে যে প্রয়োজনে তুমি আমার জন্য তোমার হক ছেড়ে দেবে। ফাওয়াদ তোমার ঘাড়ে পিস্তল রেখেছিল, তোমাকে বাঁচাতে আমি আমার হক ছেড়েছিলাম। এই কথাগুলো আমি আজকের দিনের জন্য জমিয়ে রেখেছিলাম যাতে আজ আমি তোমার কাছ থেকে তোমার ওয়াদা পূরণের দাবি করতে পারি।"
সে চুপ হলো, এবার মেহমিলের কথা বলার অপেক্ষা করছিল।
মেহমিল কয়েক মুহূর্ত তার মুখ দেখল, এরপর ধীরে ধীরে ঠোঁট খুলল।
"আপনার যা বলার ছিল তা কি বলা শেষ হয়েছে?"
"হ্যাঁ।"
"এখন কি আপনি আমার কথা শুনবেন?" তার কণ্ঠস্বর ছিল নিরুত্তাপ।
"হ্যাঁ।"
"তবে শুনুন।
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
"আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।"
সে আউযুবিল্লাহ পড়লে ফারিস্তে কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু সে থামল না; খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে সে আরবিতে কিছু শোনাতে লাগল। সেই আরবি যা তারা দুজনেই বুঝত।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৪
وَكَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
(ওয়া কাযা-লিকা নুফাসসিলুল আ-ইয়া-তি ওয়া লা'আল্লাহুম ইয়ারজি'ঊন।)
"এবং এভাবেই আমি নিদর্শনসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে... যাতে তারা ফিরে আসে।"
ফারিস্তের চোখে বিভ্রান্তির ছাপ ফুটে উঠল।
মেহমিল চোখের পলক না ফেলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে পড়ে যাচ্ছিল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৫
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغاوِينَ
(ওয়াতলু ‘আলাইহিম নাবাআল্লাযী আ-তাইনা-হু আ-ইয়া-তিনা- ফানসালাখা মিনহা- ফাআতবা‘আহুশ শাইত্ব-নু ফাকা-না মিনাল গা-ওয়ীন।)
"আপনি তাদের সেই ব্যক্তির খবর শুনিয়ে দিন যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দিয়েছিলাম। যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দিয়েছিলাম। এরপর সে তা থেকে বেরিয়ে গেল (বিচ্যুত হলো), তখন শয়তান তার পেছনে লাগল, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হলো।"
ফারিস্তের বাদামী চোখে অস্থিরতা ফুটে উঠল।
"মেহমিল! আমার কথা শোনো।"
কিন্তু মেহমিল শুনছিল না। সে চোখের মণি স্থির রেখে তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে যাচ্ছিল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৫ (শেষাংশ)
...فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ
...ফাকা-না মিনাল গা-ওয়ীন।
"ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হলো।"
তার কণ্ঠস্বর চড়ছিল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৬ (অংশবিশেষ)
وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَٰكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ...
ওয়া লাও শি’না- লারাফা’না-হু বিহা- ওয়া লা-কিন্নাহূ আখলাদা ইলাল আরদ্বি...
"এবং আমি যদি চাইতাম তবে আমি তাকে এই আয়াতসমূহের মাধ্যমেই উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে মাটির (দুনিয়ার) দিকে ঝুঁকে পড়ল।"
"মেহমিল! চুপ করো।" সে ফিসফিসিয়ে বলল, কিন্তু মেহমিলের কণ্ঠ আরও চড়া হচ্ছিল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৬ (অংশবিশেষ)
وَلَٰكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ ۚ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِن تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَث ۚ
(ওয়া লা-কিন্নাহূ আখলাদা ইলাল আরদ্বি ওয়াত্তাবা‘আ হাওয়া-হু; ফামাসালুহূ কামাসালিল কালবি ইন তাহমিল ‘আলাইহি ইয়ালহাস আও তাতরুকহু ইয়ালহাস।)
"কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করল। তার উদাহরণ হলো কুকুরের মতো। তার উদাহরণ কুকুরের মতো—যদি তুমি তাকে তাড়া করো তবুও সে জিহ্বা বের করে হাঁপায়, আর যদি তুমি তাকে ছেড়ে দাও তবুও সে জিহ্বা বের করে হাঁপায়।"
"চুপ করো!... খোদার কসম চুপ করো।"
সে ছটফট করে মেহমিলের মুখে হাত চাপা দিতে চাইল। তার ওড়না কাঁধ থেকে পড়ে গিয়েছিল, খোলা চুল কাঁধে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মেহমিল শক্তভাবে তার হাত ঝেঁটে দিল। সেই একই যান্ত্রিক ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে পড়ে যাচ্ছিল—
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৮
مَن يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي ۖ وَمَن يُضْلِلْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
মাই ইয়াহদিল্লাহু ফাহুয়াল মুহতাদী, ওয়ামাই ইয়ুদলিল ফাউলাইকা হুমুল খা-সিরুন।
"যাকে আল্লাহ হেদায়েত দেন সেই হেদায়েতপ্রাপ্ত, আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।"
তার হাতগুলো নিস্তেজ হয়ে কোলের ওপর পড়ে গেল। সে আতঙ্কিত চোখে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে হাঁটু গেড়ে তার পায়ের কাছে বসে পড়ল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৯
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
(ওয়া লাক্বদ যারা’না- লিজাহান্নামা কাসীরাম মিনাল জিন্নি ওয়াল ইনসি লাহুম কুলূবুল লা- ইয়াফক্বহূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ’ইউনুল লা- ইয়ুবসিরূনা বিহা- ওয়া লাহুম আ-যা-নুল লা- ইয়াসমা‘ঊনা বিহা-; উলা-ইকা কাল আন‘আ-মি বাল হুম আদল্ল; উলা-ইকা হুমুল গা-ফিলূন।)
"নিশ্চয়ই আমি জাহান্নামের জন্য অনেক জ্বিন ও অনেক মানুষ সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা কিছুই বোঝে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা কিছুই দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা কিছুই শোনে না। এরা হলো চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তারা আরও বেশি পথভ্রষ্ট। এরাই হলো তারা যারা গাফেল (উদাসীন)। যারা গাফেল, যারা গাফেল।"
সে কোনো সম্মোহিতের মতো বারবার একই শব্দ পুনরাবৃত্তি করছিল।
ফারিস্তে ফ্যাকাশে মুখে নিস্পন্দ হয়ে বসে ছিল। তার ঠোঁটগুলো থরথর করে কাঁপছিল। মেহমিল আলতো করে চোখের পলক ফেলল এবং দুটি অশ্রুবিন্দু তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল।
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৭৪
وَكَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
ওয়া কাযা-লিকা নুফাসসিলুল আ-ইয়া-তি ওয়া লা'আল্লাহুম ইয়ারজি'ঊন।
"এবং এভাবেই আমি নিদর্শনসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে।"
সে হুইলচেয়ারের দুই পাশের চাকা ধরল এবং সেটির মুখ জানালার দিকে ঘুরাল। সে ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারটি জানালার দিকে এগিয়ে নিতে লাগল।
ফারিস্তে পেছনে বসে রইল। মেহমিল ফিরে তাকাল না। সে এখন ফিরতে চাচ্ছিল না।
"এবং এভাবেই আমি নিদর্শনসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে।" সে জানালার ওপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল।
ফারিস্তে আর কিছু শুনতে পারল না। সে দ্রুত উঠল এবং মুখে হাত চাপা দিয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
মেহমিল একইভাবে সজল চোখে বাইরের চমকাতে থাকা বিদ্যুৎ দেখতে লাগল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
সে তখনও জানালার সামনে বসে ছিল যখন হুমায়ুনের গাড়ি ভেতরে ঢুকল। আর তখনও, যখন রাত চারদিকে ঘনিয়ে এল। এই বাড়িতে কাটানো তার শেষ রাত... আর সে এটিকে শান্তিতে কাটাতে চেয়েছিল।
তখন সে বিলকিসকে ডাকল, যে তাকে বিছানায় শুতে সাহায্য করল। এরপর সে চোখে হাত রেখে কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে নিজেও জানতে পারল না।
তার মনে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার যখন সে সেই আওয়াজটি শুনতে পেল।
অন্ধকারকে চিরে আসা এক গম্ভীর কণ্ঠ... যা তাকে নিজের দিকে টানছিল।
মেহমিল এক ঝটকায় চোখ খুলল। ঘরে নাইট বাল্ব (Night bulb) জ্বলছিল।
জানালার পর্দা সরানো ছিল। সে রাতের বেলা জানালার কাঁচের পাল্লা খোলা রাখত যাতে জালি দিয়ে বাতাস ভেতরে আসে। সেখান থেকেই বাইরে থেকে কোনো শব্দ আসছিল।
সে বেডসাইড টেবিলের (Bedside table) ওপর হাতড়ে বোতাম টিপল। টেবিল ল্যাম্পটি জ্বলে উঠল। দেয়ালে থাকা ঘড়ির ওপর আলো পড়ল। রাত একটা বাজে।
সেই মৃদু, বিষাদমাখা কণ্ঠ এখনও আসছিল। সে থেমে শুনতে চাইল। শব্দগুলো স্পষ্ট হতে লাগল।
সহীহ মুসলিম: হাদিস নম্বর ৭৬৩ (অধ্যায়: মুসাফিরদের নামায ও কসর)।
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا
'আল্লাহুম্মাজ’আল ফী ক্বালবী নূরান'
(হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর দান করুন)
মেহমিল অবচেতনভাবে সাইড টেবিলে রাখা বেলটি (Bell) টিপল।
وَفِي لِسَانِي نُورًا
'ওয়া ফী লিসানি নূরান'
(এবং আমার জিহ্বায় আলো দিন)
পড়ে বলতে লাগলে----
وَفِي بَصَرِي نُورًا
'ওয়া ফী বাসারী নূরান'
(এবং আমার দৃষ্টিতে নূর দান করুন)
বিলকিস দ্রুত দরজা খুলে ভেতরে এল। মেহমিলের সুবিধার জন্য সে রান্নাঘরেই ঘুমাত। "জি বিবি জি?"
"আমাকে বসিয়ে দাও বিলকিস!" সে ভারী গলায় হুইলচেয়ারের দিকে ইশারা করল। বিলকিস মাথা নেড়ে এগিয়ে এল, ঠিক তখনই জানালার ওপাশ থেকে আওয়াজ এল—
وَفِي سَمْعِي نُورًا
'ওয়া ফী সাম’ঈ নূরান'
(এবং আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে নূর দান করুন)
বিলকিস চমকে জানালার দিকে তাকাল, এরপর মাথা ঝেঁটে মেহমিলের দিকে এল।
'وَعَنْ يَمِينِي نُورًا وَعَنْ يَسَارِي نُورًا'
'ওয়া আন ইয়ামীনি নূরান ওয়া আন ইয়াসারী নূরান'
(এবং আমার ডানে ও বামে নূর দান করুন)
খুব সাবধানে বিলকিস তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিল।
"এখন তুমি যাও।" মেহমিল ইশারা করল। বিলকিস দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরে গেল।
وَمِنْ فَوْقِي نُورًا وَمِنْ تَحْتِي نُورًا
'ওয়া ফাওক্বী নূরান ওয়া তাহতী নূরান'
(এবং আমার ওপরে ও নিচে নূর দান করুন)
মৃদু জ্যোৎস্নার আলোয় সিক্ত সেই কণ্ঠস্বর প্রতিটি সত্তার ওপর ছেয়ে যাচ্ছিল। মেহমিল হুইলচেয়ারের মুখ বাইরের দিকে ঘুরাল।
وَمِنْ أَمَامِي نُورًا وَمِنْ خَلْفِي نُورًا
'ওয়া আমামী নূরান ওয়া খালফী নূরান'
(এবং আমার সামনে ও পেছনে নূর দান করুন)
কণ্ঠস্বরে এখন কান্নার সুর ফুটে উঠল।
সে হুইলচেয়ারটি কষ্ট করে টেনে বাইরে নিয়ে এল।
وَاجْعَلْ لِي نُورًا
'ওয়াজ’আল লী নূরান'
(এবং আমার জন্য নূর বানিয়ে দিন)
জ্যোৎস্নায় ভেজা বারান্দাটি শুনশান পড়ে ছিল। সেই ছন্দোময়, বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠ লন থেকে আসছিল।
وَفِي لِسَانِي نُورًا وَفِي عَصَبِي نُورًا
'ওয়া ফী লিসানী নূরান ওয়া আসাবী নূরান'
(এবং আমার জিহ্বা ও স্নায়ুতে নূর দান করুন)
সে সুরে সুর মিলিয়ে পড়তে পড়তে কিছুটা হেঁচকি তুলল।
মেহমিল ধীরে ধীরে বারান্দার সেই ঢালু পথ দিয়ে হুইলচেয়ার নামাতে লাগল। এই ঢালটি ফারিস্তে-ই তার জন্য তৈরি করিয়ে দিয়েছিল।
**وَفِي لَحْمِي نُورًا وَفِي دَمِي نُورًا**
'ওয়া লাহমী নূরান ওয়া দামী নূরান'
(এবং আমার মাংসে ও রক্তে নূর দান করুন)
লনের শেষ প্রান্তে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে একটি মেয়ে বসে ছিল। তার মাথাটি দেয়ালের সাথে ক্লান্তভাবে ঠেকে ছিল, চোখ বন্ধ ছিল যেখান থেকে টপ টপ করে অশ্রু গড়িয়ে গালে পড়ছিল। দীর্ঘ বাদামী চুল কাঁধে ছড়িয়ে ছিল।
**وَفِي شَعْرِي نُورًا وَفِي بَشَرِي نُورًا**
'ওয়া শা’রী নূরান ওয়া বাশারী নূরান'
(এবং আমার চুলে ও চামড়ায় নূর দান করুন)
মেহমিল ঘাসের ওপর হুইলচেয়ার এগিয়ে নিতে লাগল। চাকার নিচে ঘাসের কচি ডগাগুলো মড়মড় শব্দ করছিল।
**وَاجْعَلْ فِي نَفْسِي نُورًا وَأَعْظِمْ لِي نُورًا**
'ওয়াজ’আল লী নাফসী নূরান ওয়া আজ্জিম লী নূরান'
(এবং আমার নফসে নূর দান করুন এবং আমার জন্য নূরকে বাড়িয়ে দিন)
সে একইভাবে চোখ বন্ধ করে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে অনবদ্যভাবে পড়ে যাচ্ছিল।
মেহমিল হুইলচেয়ারটি ঠিক তার সামনে নিয়ে এল।
اللَّهُمَّ أَعْطِنِي نُورًا
'আল্লাহুম্মা আ’তিনী নূরান'
(হে আল্লাহ! আমাকে নূর দান করুন!)
জ্যোৎস্নায় তার চোখের জল মুক্তোর মতো চকচক করছিল।
"ফারিস্তে?" সে নিচু স্বরে ডাকল।
ফারিস্তের চোখের পাতায় কম্পন হলো। সে চোখের পলক ফেলল এবং সামনে তাকাল। সে সম্ভবত অনেক কেঁদেছিল। তার চোখ দুটি ছিল ফোলা ও লাল।
"কেন কাঁদছেন?" মেহমিলের নিজের চোখ থেকেও জল পড়তে শুরু করল। এই সেই মেয়েটি যে তাকে কুরআন শুনিয়েছিল, কুরআন পড়িয়েছিল।
তার জীবন ওই মানুষদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সাত বছর ধরে তার সেবা করেছিল। মেহমিলের ওপর তার অনেক এহসান ছিল। আর আজ মেহমিল তাকে কাঁদিয়ে দিল!
"আমার তো কাঁদাই উচিত।" সে মাথা তুলে চাঁদের দিকে তাকাতে লাগল। "আমি অনেক অন্যায় করেছি মেহমিল! অনেক অন্যায়।"
সে নীরবে তার কথা শুনতে লাগল। হয়তো ফারিস্তের আরও অনেক কিছু বলার ছিল, সেই সব যা সে আগে বলতে পারেনি।
"আমি সাত বছর ধরে অজুহাত সাজিয়েছি, যুক্তি জোগাড় করেছি, আর তুমি সাতটি আয়াতে সেগুলোকে বালুর স্তূপের মতো উড়িয়ে দিলে।
আমি নিজেকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, বিশ্বাস করিয়েছিলাম যে এটাই সঠিক।
কিন্তু আজ আমার সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে মেহমিল! আমি স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম, সেই কুকুরের মতো স্বার্থপর যে হাড় না দিলেও জিহ্বা বের করে হাঁপায়।"
তার চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখগুলো থেকে অশ্রু ঝরছিল।
"কখনও কি তুমি আমার রূপার সেই আংটিটি দেখেছ মেহমিল? তুমি কখনও জিজ্ঞেস করোনি সেটি আমাকে কে দিয়েছিল? জানো, এটি আমাকে আমার খালামণি দিয়েছিলেন।
চলবে,,,,

Comments
Post a Comment