#মুসহাফ - পর্ব: ২০ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (#ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (#হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)
পর্ব:- ২০
সে দেয়ালের ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাল। একটা বাজতে তখন কয়েক মিনিট বাকি ছিল আর হুমায়ুন সাধারণত দেড়টার মধ্যে বাড়ি চলে আসত।
সে হুইলচেয়ার (Wheelchair) চালিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এল এবং বিশাল আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। হুইলচেয়ারে বসা এক শীর্ণকায় মেয়ে যার হাঁটুর ওপর চাদর পড়ে আছে আর ভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়ানো। চেহারার ফর্সা রঙে ফ্যাকাশে ভাব ফুটে উঠেছিল আর বাদামী চোখের নিচে কালি জমেছিল।
সে হেয়ার ব্রাশ (Hairbrush) তুলে নিল এবং ধীরে ধীরে চুলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চিরুনি করতে লাগল। ভেজা চুল থেকে মুক্তোর মতো চুইয়ে পড়া পানির ফোঁটাগুলো তার লাল কামিজকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
ফারিস্তে তার জন্য এই সুন্দর পোশাকটি বানিয়েছিল আর আজ সে খুব শখ করে এটি পরেছিল।
চুল গোছানো হলে সে চেহারায় হালকা ফাউন্ডেশন (Foundation) লাগাল, তারপর গোলাপি রঙের ব্লাশ-অন (Blush-on) বুলিয়ে দিল, চোখে গাঢ় কাজল আর চোখের ওপর লাইট পিঙ্ক (Light pink) আইশ্যাডো; এরপর পিঙ্ক আর রেড লিপস্টিক মিশিয়ে ঠোঁটে এমনভাবে লাগাল যাতে খুব চড়া না লাগে আবার খুব ফ্যাকাশেও না লাগে।
চুল কিছুটা শুকোতে শুরু করেছিল। সে ব্রাশ দিয়ে চুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে দুহাত দিয়ে উঁচুতে তুলে পনিটেইল (Ponytail) বাঁধল, যার ফলে তার ঘাড়ের ওপর একটি উঁচু পনিটেইল দুলতে লাগল।
সে আয়নায় নিজেকে দেখে বিষণ্ণ মনে হাসল।
তারপর ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা জুয়েলারি বক্স (Jewelry box) খুলে লাল চুনীর (Ruby) সোনার সেটটি বের করল; কানে দুল পরল আর গলায় সূক্ষ্ম একটি নেকলেস (Necklace)। এখন নিজের প্রতিবিম্ব দেখল তো সুখদ এক বিস্ময় জাগল। তাকে সত্যিই খুব ভালো লাগছিল—সতেজ এবং সুন্দরী।
জুয়েলারি বক্সের পাশেই তার লাল কাঁচের চুড়িগুলো রাখা ছিল। সে একে একে চুড়িগুলো হাতে পরতে লাগল। একসময় তার দুই কবজি ভরে গেল এবং যখন সে বড় লাল চুনীর আংটিটি তুলে নিল, তখন সেটি পরার সময় চুড়িগুলো বারবার বেজে উঠছিল।
দেড়টা বাজতে চলেছিল। সে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল এবং পারফিউম (Perfume) স্প্রে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
হুমায়ুন তখনও আসেনি। সে অস্থির হয়ে লাউঞ্জে (Lounge) বসে ছিল। কখনো কানের দুল ঠিক করছিল, কখনো চুড়ি গোছাচ্ছিল আর বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
দুটো বাজতে চলল যখন সে গাড়ির আওয়াজ শুনল। হঠাৎ তার হৃদপিণ্ড সজোরে ধড়ফড় করতে লাগল।
তার কাছে এই পদ্ধতিটিই সর্বোত্তম মনে হয়েছিল, তাই সে এটিই অবলম্বন করেছিল।
পায়ের শব্দ কাছে আসতে শোনা গেল। সে অযথাই কোলে রাখা হাতের দিকে তাকাতে লাগল। সে নার্ভাস (Nervous) হয়ে পড়ছিল এবং সে তা জানত।
দরজা খুলল এবং সে হুমায়ুনের ভারী বুটের আওয়াজ শুনতে পেল। কিন্তু না, সাথে চিকন হিলের 'টিক-টিক' শব্দও ছিল।
সে বিস্ময়ে মাথা তুলল এবং পরের মুহূর্তেই এক তীব্র ধাক্কা খেল।
হুমায়ুন আর আরজু আগে-পিছে ভেতরে ঢুকছিল।
হুমায়ুন ইউনিফর্মে ছিল, হাতে একটি খাকি খাম ছিল এবং সে আরজুর কথা না শুনেই গটগট করে ভেতরে আসছিল। আরজু তার পাশে পাশে গর্বিত ভঙ্গিতে হাঁটছিল।
সাদা ট্রাউজারের ওপর গোলাপি রঙের হাঁটু পর্যন্ত কামিজ, ওড়নার বালাই নেই, ধনুকের মতো প্লাক করা ভ্রু আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
সামনে মেহমিলকে বসে থাকতে দেখে এবং ঘাড় তুলে তাদের দিকে তাকাতে দেখে দুজনের পায়ের গতি কিছুটা ধীর হলো।
কয়েক মুহূর্ত সে চরম শোকগ্রস্ত অবস্থায় থাকল কিন্তু তারপর নিজেকে সামলে নিল।
বাইরে থেকে শান্তভাবে তাদের আসা দেখল এবং সেই শান্ত স্বরেই সালাম দিল—
"আসসালামু আলাইকুম!"
"ওয়ালাইকুম আসসালাম," হুমায়ুন জবাব দিয়ে আরজুর দিকে একবার তাকাল, যে বুকের ওপর হাত বেঁধে তীক্ষ্ণ নজরে মেহমিলকে দেখছিল।
আরজুর দৃষ্টিতে স্পষ্ট অবজ্ঞা ছিল।
"আমি আপনার অপেক্ষা করছিলাম হুমায়ুন! আমাকে আপনার সাথে কথা বলতে হবে।" সে আরজুকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিরাসক্ত স্বরে হুমায়ুনকে উদ্দেশ্য করে বলল।
"আমাকে তোমার সাথে কথা বলতে হবে।" গম্ভীর স্বরে এ কথা বলে সে মেহমিলের সামনের সোফায় বসল, খাকি খামটি তখনও তার হাতে ছিল।
"ঠিক আছে, আপনি বলুন।"
তারা দুজন মুখোমুখি বসে ছিল আর আরজু একইভাবে বুকের ওপর হাত বেঁধে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করল। হুমায়ুন হাতের খাকি খামটির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু বলার জন্য শব্দ খুঁজছে। সে মাথা তুলল এবং সেই গম্ভীর দৃষ্টিতে মেহমিলের চেহারার দিকে তাকাল।
"আমি বিয়ে করছি।"
মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল, কিন্তু আকাশ ভেঙে পড়ল না, মাটি ফেটে গেল না, কোনো তুফানও এল না।
সে খুব ধৈর্যের সাথে তার কথা শুনল এবং জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভ্রু তুলল—
"তো?"
"তো এটাই যে আমাদের দুজনের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত।
এই নাও।" সে খাকি খামটি মেহমিলের দিকে বাড়িয়ে দিল, যা মেহমিল ডান হাত বাড়িয়ে ধরল। দুজনেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, দুজনই তখন খাকি খামটি ধরে ছিল। কিন্তু তা ছিল মাত্র এক মুহূর্তের জাদু। তারপর হুমায়ুন হাত সরিয়ে নিল এবং মেহমিল নিষ্ঠুরভাবে খামটি ছিঁড়ে ফেলল।
"এর ভেতরে কী আছে হুমায়ুন সাহেব? এটি কি আমার ডিভোর্স পেপার (Talaq-nama)?" ভেতর থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করতে করতে সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল।
হুমায়ুন চুপ করে রইল। মেহমিল কাগজের ভাঁজ খুলল।
সেটি সত্যিই তালাকনামা ছিল। হুমায়ুনের স্বাক্ষর আর মেহমিলের নাম।
তার হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল না, সে জ্ঞান হারিয়ে পড়েও গেল না। শুধু এক নজরে পুরো পৃষ্ঠাটি পড়ে নিল এবং মাথা তুলল—কয়েক মুহূর্তেই সে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।
"এই প্রথম তালাকের (First divorce) জন্য ধন্যবাদ হুমায়ুন দাউদ... যে আলেম আপনাকে এটি বলেছেন যে একসাথে তিন তালাক দেওয়া একটি নিকৃষ্ট কাজ, তাই একটি তালাক দেওয়া ভালো, তিনি নিশ্চয়ই এটিও বলে থাকবেন যে এখন ইদ্দতের তিন মাস আমি এই বাড়িতেই কাটাব। কি, বলেননি?"
"আমি জানি। তুমি তিন মাস এখানে থাকতে পারো, এরপর আমি বিয়ে করে নেব।" সে দাঁড়িয়ে গেল।
মেহমিল ঘাড় উঁচিয়ে তার দিকে তাকাল; হুমায়ুনের বিশ্বাসঘাতক চেহারায় কোনো অনুশোচনা বা দুঃখ ছিল না।
"জানতে পারি কি, আপনি দ্বিতীয় বিয়ে কাকে করছেন?"
হুমায়ুন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরজুর দিকে একবার তাকাল এবং কাঁধ ঝাঁকাল।
"এটি বলা জরুরি নয়। আমি একটু চেঞ্জ (Change) করে আসছি।" শেষ কথাটি আরজুকে বলে সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।
সে কয়েক মুহূর্ত তাকে ওপরে যেতে দেখল। জীবনে প্রথমবারের মতো হুমায়ুন দাউদের প্রতি তার ঘৃণা বোধ হলো। তীব্র ঘৃণা।
"আপনি পঙ্গু হয়েও বেশ সেজেগুজে থাকেন তো!" আরজুর ব্যঙ্গাত্মক কথায় সে মুখ ওদিকে ঘুরাল।
"যদি চেহারা ভালো হয় তবে পঙ্গু হলেও ভালোই লাগে আরজু বিবি! নয়তো অনেকে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘষামাজা করার পরও সুন্দরী হতে পারে না।"
"যাক গে... অহংকার এখনও যায়নি দেখছি।" আরজু মেহমিলের সামনের সোফায় বসল। ডান পা বাম পায়ের ওপর তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে সাইড টেবিল থেকে হুমায়ুনের মোবাইলটি তুলল, যা সে বসার সময় সেখানে রেখে গিয়েছিল।
মেহমিল চুপ থাকল।
"আমি তোমাকে বলেছিলাম না মেহমিল! আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি, লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ( love first sight)। আমি তাকে পেয়েই ছাড়ব।"
"আর আমিও তখন বলেছিলাম আরজু! যে তুমি খোদা নও যে সবকিছু তোমার মর্জিতে হবে। আজ সে তোমার জন্য আমাকে ছাড়ছে, কাল অন্য কারো জন্য তোমাকেও ছেড়ে দেবে, তখন আমি তোমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে অবশ্যই আসব।"
আরজু অবচেতনভাবে মজাই পেল এবং হেসে উঠল।
"জেলাস (Jealous) হচ্ছ... তাই না?"
তার এই ভঙ্গি মেহমিলের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিল।
কিন্তু সে সেই আগুন চেহারায় আসতে দিল না। সেটি ছিল চরম আত্মসংবরণের সময়।
"তোমার কাছে এমন কিছুই নেই যা দেখে আমি জিউলাস হব। আর রইল হুমায়ুন, তো তাকে শখ করে নিয়ে নাও; আমার এই ঝনঝন করা মাটির পুতুলের কী কাজ যার ভেতরে কোনো বিশ্বস্ততাই নেই।"
"তোমার অহংকার এখনও গেল না মেহমিল?"
"আর আমার এই অহংকার যাবেও না। তোমার কী মনে হয়, মেহমিল হুমায়ুনকে ছাড়া মরে যাবে? হুহ্।" সে তিক্ততা নিয়ে মাথা ঝাড়া দিল।
"আমি সাত বছর কোমায় (Coma) পড়ে ছিলাম, তখন আমার কাছে হুমায়ুন ছিল না, আমি তখনও মরিনি; তবে এখন কেন তার জন্য মরব? যাই হোক, যদি বসতে চাও তো বসো, আর যদি কিছু খেতে এসে থাকো তো সামনে কিচেন (Kitchen)।
এমনিতে অন্যের মাল খাওয়ার তোমাদের পারিবারিক অভ্যাস আর হুমায়ুনের হলো খয়রাত করার অভ্যাস। যা খাওয়ার খেয়ে নিও। টেক কেয়ার (Take care)।"
সে ইচ্ছা করেই সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকল। অন্তত এই মুহূর্তে সে আরজুর ওপর শান্তি (সালাম) বর্ষণ করতে পারছিল না এবং হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ভাঁজ করা হলুদ কাগজটি আধখোলা অবস্থায় তার কোলে পড়ে ছিল।
সে আরজুর বিড়বিড় করা, উঠে দাঁড়ানো এবং সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার শব্দ শুনতে পেল। সে পেছন ফিরে তাকাল না।
সে এখন আর কিছু দেখতে চাইছিল না। তার সাজানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন আর কিছুই বাকি নেই।
ঘরে এসে সে দরজা বন্ধ করে দিল। লক করল না। এখন আর কার এখানে আসার ছিল? সবকিছু তো শেষ হয়ে গেছে।
সে হুইলচেয়ার চালিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এল।
ঘরের বাতি নিভানো ছিল। জানালার পর্দা টানা ছিল, তবে কোথাও কোথাও ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো উঁকি দিচ্ছিল, যার ফলে ঘরে একটা আবছা অন্ধকার ছিল।
সে সেই আধো-অন্ধকারে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে লাগল।
সবকিছু উজাড় হয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেছে। ছাইয়ের স্তূপ হয়ে আছে আর তার মাঝে কোনো আগুনের স্ফুলিঙ্গ অবশিষ্ট নেই।
নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মন চাইল—সে কান থেকে দুলগুলো ছিঁড়ে ফেলুক, নেকলেসটি খুলে দেয়ালে মারুক, চুড়িগুলো ভেঙে ফেলুক।
জোরে জোরে চিৎকার করুক, হাউমাউ করে কাঁদুক।
সে কানের দুলের দিকে হাত বাড়াতেই হঠাৎ সেই আধো-অন্ধকার ঘরে একটি নিচু স্বর প্রতিধ্বনিত হলো—
"চোখ অশ্রু ঝরায়।"
"এবং হৃদয় দুঃখিত হয়।"
"কিন্তু আমরা মুখ দিয়ে কেবল তাই বলব
যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন।"
কানের দুল ধরা অবস্থায় তার হাতটি নিস্তেজ হয়ে নিচে পড়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন—ধৈর্য হলো বিপদের প্রথম আঘাতেই। আর তিনি এটিও বলেছিলেন যে—যে ব্যক্তি জামার কলার ছিঁড়ে ফেলে, গালে চড় মারে এবং জাহেলিয়াতের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সে হুইলচেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে ঝরতে লাগল। সে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
অন্ধকার ঘরে বসা এক পঙ্গু, দুর্বল মেয়ে যে নিঃশব্দে কেবল একটি শব্দই বারবার আওড়াচ্ছিল—
"ইয়া রাব্বাল মুস্তাদ'আফীন" (হে দুর্বলদের রব... হে দুর্বলদের রব)।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, সন্ধ্যা ডুবল এবং চারদিকে রাত নেমে এল। জানি না রাতের কোন প্রহর ছিল, যখন কেউ দরজায় করাঘাত করল এবং তারপর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে দরজা খুলল।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল না। তার আর কোনো মোহ ছিল না যে হুমায়ুন কখনো তার কাছে আসবে।
পায়ের শব্দ শোনা গেল এবং একটি অবয়ব তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"মেহমিল!" এটি ফারিস্তের কণ্ঠস্বর ছিল।
সে চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
"মেহমিল! কী হয়েছে? এভাবে কেন বসে আছো?"
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর ফারিস্তের চিন্তিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
"মেহমিল! তুমি ঠিক আছো তো?"
সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল এবং ফোলা চোখে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিস্তেকে দেখল। ফারিস্তে কালো পোশাক পরে ছিল।
কালো ওড়নার ঘেরের মাঝখানে তার চেহারাটি চমকাচ্ছিল।
"মেহমিল—"
"হুমায়ুন আমাকে তালাক দিয়েছে।" সে খুব ধীর স্বরে বলল, কণ্ঠে কান্নার আর্দ্রতা মিশে ছিল।
কয়েক মুহূর্ত এক নিস্তব্ধতা ছেয়ে রইল।
"কবে?"
"আজ দুপুরে... আমি ইদ্দত এই বাড়িতেই কাটাব, তারপর চলে যাব আর সে বিয়ে করে নেবে।" সে ফারিস্তের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল যাতে সে তার চোখের জল দেখতে না পায়।
"আই এম ভেরি সরি (I am very sorry) মেহমিল!" ফারিস্তে দুঃখ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
"ইদ্দতের পর তুমি কোথায় যাবে?"
"আল্লাহর দুনিয়া অনেক বড়। যেকোনো জায়গায় চলে যাব।"
"তুমি কি নিজেকে এতটাই স্ট্রং (Strong) মনে করো যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে?"
"হ্যাঁ, আমি পারব। আপনি যান, আমাকে একা থাকতে দিন প্লিজ।"
ফারিস্তে বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল এবং ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজে মেহমিল আবার মুখ ঘুরাল।
ঘরটি আবার নিঝুম হয়ে গেল, ফারিস্তে চলে গেছে।
সেই রাতটি ছিল খুব অদ্ভুত এক রাত। মেহমিল এত বিরান রাত কখনো কাটায়নি। তখনও নয় যখন সে মসজিদের দেয়াল টপকাচ্ছিল।
তখনও নয় যখন তাকে তার সম্পত্তি আর বাড়ি থেকে বঞ্চিত করে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তখনও নয় যখন তার মা মারা গিয়েছিল আর তখনও নয় যখন সে সাত বছর পর কোমা থেকে জেগেছিল। এমন রাত আগে কখনো আসেনি।
সে হুইলচেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে সজল চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে আসা জোছনার আলোয় পর্দাগুলো এমনভাবে চমকাচ্ছিল যেন জোছনার পাতা।
জীবন যেন এক নিমেষে শেষ হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে অন্ধকার। তার সামনে চলার মতো কোনো আশা অবশিষ্ট ছিল না। হুমায়ুন তার থাকেনি, তৈমুর তার থাকেনি, এমনকি কোনো আত্মীয়ের আশ্রয়ও ছিল না।
আর রইল ফারিস্তে, তো মেহমিল চলে যাওয়ার পর সে মসজিদে শিফট হয়ে যেত। সে কতদিন ফারিস্তেকে নিজের কারণে আটকে রাখত?
সে এই ভরা দুনিয়ায় একা হয়ে গিয়েছিল। তার কেউ ছিল না। কেউ না, কেউ না।
রাত এভাবেই নিস্তব্ধতায় কেটে গেল। সে একইভাবে বরফ-শীতল মূর্তির মতো হুইলচেয়ারে পড়ে রইল।
পর্দার চমক ফিকে হয়ে এল এবং ঘরে এক গভীর অন্ধকার ছেয়ে গেল।
সে অন্ধকারে ভয় পেতে লাগল। সে চোখ বড় বড় করে অন্ধকারের মাঝে কিছু দেখার চেষ্টা করতে লাগল।
আর তখনই জানালার পাশে ভোরের আভা দেখা দিতে লাগল। দূরে কোথাও ফজরের আজান শোনা যাচ্ছিল।
তার বরফ হয়ে যাওয়া অস্তিত্বে প্রথমবারের মতো স্পন্দন জাগল। সে তার অবশ হয়ে আসা হাত দুটো তুলল এবং হুইলচেয়ারের চাকা ঘোরাল। শ্যালফে একপাশে ওজু করার পানির পাত্র রাখা ছিল।
মেহমিল ওজু করল এবং নামাজ পড়ল। তারপর যখন দোয়ার জন্য হাত তুলল, কোনো দোয়া মাথায় এল না, কেবল সেই একটি শব্দই ঠোঁটে এল—
"হে দুর্বলদের রব!" সে বারবার এটি আওড়াতে লাগল। চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল, তখন সে আমিন বলে মুখে হাত বুলিয়ে নিল।
ঘরে হালকা নীলচে আভা ছড়িয়ে পড়ছিল।
সে হুইলচেয়ার চালিয়ে শ্যালফের কাছে এল যেখানে টেপ রেকর্ডার (Tape recorder) আর সাথে ক্যাসেটের বক্স রাখা ছিল। সে না দেখেই একটি ক্যাসেট বের করে টেপে ঢুকিয়ে প্লে (Play) বাটন চাপল।
তিলাওয়াত মাঝপথ থেকে শুরু হয়েছিল—
*"আর কার কথা সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকে?"*
সে বিস্ময়ে চমকে উঠল। এই আয়াতটি তো সে পরশু দিন পড়েছিল, তবে এটিই কেন বাজল?
*"আর ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না।"*
সে অবাক হয়ে শুনছিল।
আল্লাহ তাকে এই আয়াতগুলো কেন আবার শোনাচ্ছেন? এই আয়াতগুলো তো চলে গেছে, তবে আবার কেন?
*"মন্দকে সেই পদ্ধতিতে দূর করো, যা সর্বোত্তম।"*
ক্বারীর কণ্ঠস্বর পড়ার সময় ভিজে এল।
সে বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। আল্লাহ তাকে কেন আবার একই কথা বলছিলেন? সেই মানুষটি তো এখন সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, এখন তো কোনো আশাই বাকি নেই। তবে কেন তাকে মন্দকে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে দূর করতে বলা হচ্ছে?
"সে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু (Hamim) হতে পারবে না, আল্লাহ তায়ালা! সে আমাকে তালাক দিয়েছে, সে আমাকে তিন মাস পর বাড়ি থেকে বের করে দেবে। এখন তো মাঝের কোনো পথ বাকি নেই, তবে কেন আপনি আমাকে এই শত্রুতা দূর করতে বলছেন?" সে হুট করে কেঁদে ফেলল।
পর্দার ওপাশ থেকে আলো উঁকি দিচ্ছিল। সে হাত বাড়িয়ে পর্দা সরিয়ে দিল।
বাইরে লনে সকাল নামছিল। গভীর কালো রাতের পর আসা সকাল।
*"মন্দকে সেই পদ্ধতিতে দূর করো, যা সর্বোত্তম।"*
ঘাসের ওপর তৈমুর বসে ছিল। হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরা, ঘুম ঘুম চোখে সে ঘাসে বসে থাকা একটি বিড়ালের পিঠে আদরের হাত বুলাচ্ছিল। সম্ভবত তার হাতে কিছু ছিল যা সে বিড়ালটিকে খাওয়াতে এনেছিল।
*"তারপর হঠাতই সেই ব্যক্তি—"*
*"তারপর হঠাতই সেই ব্যক্তি—"*
*"তারপর হঠাতই সেই ব্যক্তি—"*
ক্বারীর কণ্ঠস্বর আর মেহমিলের চিন্তাগুলো একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল।
তৈমুর এখন বিড়ালের মুখে রুটির টুকরো দেওয়ার চেষ্টা করছিল।
*"সেই ব্যক্তি যার আর তোমার মাঝে শত্রুতা রয়েছে।"*
সেই শব্দগুলো ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
সে পলকহীন নয়নে তৈমুরকে দেখছিল। এই নীল সকালে হঠাতই তার ওপর কিছু একটা উন্মোচিত হলো।
সেই ব্যক্তি হুমায়ুন ছিল না, ছিল না, ছিল না।
হুমায়ুন ছিল না।
সেই ব্যক্তি ছিল তৈমুর।
তার ছেলে, তার রক্ত, তার শরীরের অংশ। সে কি তার অন্তরঙ্গ বন্ধু (Hamim) হতে পারে? সত্যিই কি? সে কি এতটাই ভাগ্যবান? এমন কি হওয়া সম্ভব?
সে এক নতুন উপলব্ধির অনুভূতি নিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল।
তৈমুর এখন রুটির ছোট ছোট টুকরো করে সামনের ঘাসে ফেলছিল। বিড়ালটি এগিয়ে গিয়ে ঘাসে মুখ দিতে লাগল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
বিলকিস একটি চেয়ারের ওপর চড়ে ওপরের ক্যাবিনেট (Cabinet) খুলে দাঁড়িয়ে ছিল, আর মেহমিল সামনে হুইলচেয়ারে (Wheelchair) বসে ঘাড় উঁচু করে তাকে নির্দেশনা দিচ্ছিল।
তার আর হুমায়ুনের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের কথা এখনও চাকর-বাকরদের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
"নীল রঙের ভেলভেটের কভার দেওয়া অ্যালবাম (Album) হবে। সাইডে দেখো।"
"এইটা কি বিবি?" সে একটি অ্যালবাম বের করে ওপর থেকেই নাড়াল।
"ওটা মেরুন বরণ বিলকিস! আমি নীল বলছি। আসমানি নীল রঙ।" সে ওই অ্যালবামের খোঁজে স্টাডির (Study) অনেক ড্রয়ার আর শ্যালফ ঘাঁটাঘাঁটি করিয়েছে।
এবার ওপরের ক্যাবিনেটগুলোর পালা ছিল।
"এক মিনিট জি।" বিলকিস সম্ভবত কিছু দেখতে পেয়েছিল।
কিছুক্ষণ ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে হাতড়াতে লাগল, তারপর একদম পেছন থেকে টেনে একটি অ্যালবাম বের করল।
"এইটাই তো, দাও আমাকে দাও।" মেহমিল স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
"এই নিন জি।" বিলকিস খালি পা মাটিতে রাখল এবং অ্যালবামটি তাকে দিয়ে চটি স্যান্ডেল পরতে লাগল।
"আমি একটু হাঁড়িটা দেখে নিই।"
"হ্যাঁ যাও।" সে অ্যালবামটি দুহাতে নিল, তার ওপর জমে থাকা ধুলো ঝাড়ল এবং প্রথম পৃষ্ঠা খুলল।
এটি আগা হাউসে (Agha House) তোলা বিভিন্ন ছবির অ্যালবাম ছিল; যখন সে বিয়ের পর আগা হাউসে গিয়েছিল, তখন ফেরার সময় নিজের অন্যান্য জিনিসের সাথে এটিও নিয়ে এসেছিল।
এতে বেশিরভাগ ছবিই ছিল তার নিজের। কোথাও সে তেরো বছরের, কোথাও উনিশ বছরের।
কিছু ছবি পরিবারের বিভিন্ন বিয়েরও ছিল। সে মগ্ন হয়ে সেগুলো দেখতে দেখতে পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।
জানা নেই এই মানুষগুলো এখন কে কোথায়। আরজু ছাড়া কারো কোনো খবর ছিল না।
আর আরজুর কাছে তাদের খবর সে জিজ্ঞেস করতে চায়নি। এমনিতে ওই দিনের পর আরজু আর এদিকে আসেনি। হ্যাঁ, প্রতি সন্ধ্যায় হুমায়ুন কোথাও বাইরে বেরিয়ে যেত।
একবার জিজ্ঞেস করায় বিলকিস জানিয়েছিল যে সে কোনো বন্ধুর সাথে ওই সময় বিকালের চা খায়। আর বন্ধুত্বের একটি দৃশ্য তো সে ওইদিন সেন্টারের রেস্টুরেন্টে দেখেই নিয়েছিল, তাই এখন আর বেশি খুঁতখুঁত করার প্রয়োজন ছিল না।
আর রইল এই মানুষগুলো, তো তাদের ছবি দেখতে দেখতে সে বরাবরের মতোই ভাবছিল—তাদের কী হলো? তারা কি এখনও লাগামহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে নাকি আল্লাহ তাদের রশি টেনে ধরেছেন? জুলুম আর মা-বাবার অবাধ্যতা তো এমন দুটি গুনাহ যার সাজা দুনিয়াতেও অবশ্যই পেতে হয়। তবে তারা কি সাজা পেয়েছে? তাদের কি অনুশোচনা হয়েছে? আর সবকিছুর ওপরে—সেই ব্যক্তি কি সাজা পেয়েছে যে এই মুহূর্তে তার সামনে ছবিতে হাসছে?
আগা ফাওয়াদ করিম—আগা জানের উত্তরাধিকারী, যে মেহমিলকে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করেছিল।
ব্ল্যাকমেইল (Blackmail) করে সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিল এবং তারপর তার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ফারিস্তেকে ধমকেছিল, বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে জানি না সে হুমায়ুনকে এসে কী বলে গিয়েছিল যে হুমায়ুন মেহমিলের মুখ দেখতেও রাজি ছিল না।
"হাঁড়ি লেগে যায়নি, মালিকের শুকরিয়া।" বিলকিস দ্রুতবেগে আবার ভেতরে ঢুকল।
সে চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে মাথা তুলল।
"হায়! কত সুন্দর ফটো। এগুলো কি আপনার বাড়ির লোকেদের জি?" সে খোলা অ্যালবাম দেখে আগ্রহ নিয়ে মেহমিলের কাঁধের পাশে এসে দাঁড়াল এবং মাথা নিচু করে দেখতে লাগল।
"হ্যাঁ, আমার আত্মীয়রা।" সে পৃষ্ঠা উল্টাল। পরের পৃষ্ঠায় আরজু আর ফাওয়াদ, বড় মামীমণির (Tai Amma) সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। এটি পরিবারের কোনো এক বিয়ের ছবি ছিল।
"এনারা তো তারা!" বিলকিস যেন অবাক হয়ে গেল।
তখন মেহমিলের মনে পড়ল—বিলকিসই তো তাকে ফাওয়াদের আসার কথা বলেছিল, সম্ভবত সে তাকে চিনে ফেলেছিল।
"এনারা কি আপনার আত্মীয় জি? এনারা তো এদিকে আসতেই থাকেন। কামাল (আশ্চর্য), আমার তো জানাই ছিল না।"
"কে? এই মেয়েটি?" মেহমিল অবাক হলো। সে ভেবেছিল বিলকিস ফাওয়াদের কথা বলছে।
"হ্যাঁ জি, এই আরজু বিবি!" সে আরজুর চেহারায় আঙুল রাখল।
"হ্যাঁ, সে আমার কাজিন (Cousin) আর এই পাশে ফুয়াদ যে হুমায়ুনের কাছে এসেছিল।"
"এসে থাকবে জি।" বিলকিস তখনও আগ্রহ নিয়ে আরজুর পোশাক দেখছিল। তার ভঙ্গিতে সামান্য অবহেলা ছিল। হঠাৎ মেহমিলের মনে খটকা লাগল।
তার মনে হলো সে কোনো ভুল বোঝাবুঝির শিকার হচ্ছে।
"বিলকিস! এটি কি সেই লোক যে ওই দিন হুমায়ুনের কাছে এসেছিল, যখন হুমায়ুন ফারিস্তেকে বকেছিল?" সে অ্যালবামটি তার কিছুটা কাছে নিল।
"তোমার মনে আছে, তুমি আমাকে বলেছিলে?"
"না জি, এ তো কখনো আসেনি।"
"এ—এ কখনো আসেনি?" সে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। "তবে সে কে ছিল?"
"জানি না জি। আপনার কোনো আত্মীয় ছিল। আপনার চাচা, তায়া কারো ছেলে ছিল।"
"আমার চাচার ছেলে? এক মিনিট, এই... এইটা... এইটা দেখো।" সে দ্রুত অ্যালবামের পৃষ্ঠাগুলো পেছনের দিকে উল্টাতে লাগল। তারপর হাসানের ছবির ওপর থামল।
"এই ছিল?"
"না জি, এ তো বড় বাবারা বিবি! সে তো বয়সে ছোট ছিল।"
"মানে কী ছোট ছিল?" সে বিভ্রান্ত হলো। বিলকিস ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন নিজের কথা ঠিকমতো বোঝাতে পারছে না।
"আচ্ছা, এ নয় তো?" সে পাশে থাকা ওয়াসিমের ছবির দিকে ইশারা করল।
বিলকিস প্রথমে না বোধক মাথা নাড়ল, তারপর হঠাৎ থেমে গেল এবং মুখ নিচু করে গভীরভাবে ছবিটি দেখল।
বেশ কিছুক্ষণ সে নিবিড়ভাবে ছবিটি দেখল।
"হ্যাঁ জি, এইজনই ছিল। এই সেই লোক।"
"তবে কি ওয়াসিম?..." সে এখনও অবাক হতেও পারেনি যে বিলকিস মুয়িযের চেহারায় আঙুল রাখল, যে ছবিতে ওয়াসিমের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। এটি সিদরার বাগদানের (Engagement) ছবি ছিল।
"মুয়িয? সে মুঈয ছিল? মুয়িয এসেছিল?" সে হতবাক হয়ে গেল।
"এই লোকই ছিল বিবি! আমার ভালো করে মনে আছে। এখন একটু বাচ্চা লাগছে, কিন্তু এটি হয়তো পুরনো ছবি জি; যখন এখানে এসেছিল তখন এর চেয়ে বড় ছিল।
আমি আপনাকে বলছিলাম না যে বয়সে ছোট ছিল।"
আর মেহমিল তো এমনভাবে থমকে বসে ছিল যে কিছুই বলতে পারল না। ছবিতে মুয়িযের বয়স ছিল বারো বছর। এখন বিশের কোঠায় হবে আর যখন সে এখানে এসেছিল তখন নিশ্চয়ই সতেরো বছর বয়স ছিল।
কিন্তু সে কেন এল? সে কেন হুমায়ুনের সাথে লড়ল? তারা দুজন কেন উচ্চস্বরে ঝগড়া করছিল?
অনেকগুলো প্রশ্ন ছিল যার উত্তর তার জানা ছিল না। বিলকিসকে জিজ্ঞেস করা বৃথা ছিল। সে আগে যখন তার কাজিনের উল্লেখ করেছিল তখন এমন সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করেছিল যে মেহমিল একদম ভুল বুঝে বসেছিল।
কিন্তু যাই হোক, বিলকিসের দোষ ছিল না। আর জানি না কার দোষ ছিল।
সে বিমর্ষ মনে অ্যালবাম বন্ধ করল এবং টেবিলের ওপর রেখে দিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
ঝকঝকে সকাল বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ছিল। বিলকিস পাইপ লাগিয়ে সাদা মার্বেলের উজ্জ্বল বারান্দা ধুইয়ে দিচ্ছিল।
সেটি ছিল সকালের নাস্তার সময়।
হুমায়ুনকে তার ঘরে নাস্তা দিয়ে বিলকিস এখন এখানে ব্যস্ত। তৈমুর কোথায় ছিল, মেহমিলের জানা ছিল না।
সে আজ ফজরের তিলাওয়াত করতে পারেনি এবং এখন এখানে হুইলচেয়ারে বসে সেটাই করতে চাইছিল। কিন্তু বারবার ধ্যান ভেঙে যাচ্ছিল।
বিলকিস পাইপ নিয়ে বারান্দা থেকে নিচে নেমে গেল। এখন সে ড্রাইভওয়েতে (Driveway) পানি দিচ্ছিল। বারান্দার মেঝের কোথাও কোথাও পানি চিকচিক করছিল।
হঠাৎ দরজা খুললে সে চমকে তাকাতে লাগল।
হুমায়ুন তাড়াহুড়ো করে ব্যস্ত ভঙ্গিতে শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে বাইরে আসছিল।
সে মেহমিলকে এখানে বসে থাকতে দেখেছে কি না—তার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে তা বোঝা মুশকিল ছিল। সে সরাসরি নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
বিলকিস ঝাড়ু তুলল এবং দৌড়ে পাইপ ড্রাইভওয়ে থেকে সরাল।
দারোয়ান যে ঘাস কাটছিল, সে দ্রুত সামনে এগিয়ে গেটের দুই পাল্লা খুলে দিল।
হুমায়ুন গাড়িতে বসল, সজোরে দরজা বন্ধ করল এবং পেছনে তাকিয়ে গাড়ি বের করে নিয়ে গেল।
গেটের দুই পাল্লা খোলা রয়ে গেল। দারোয়ান এখনও সেগুলো বন্ধ করেনি। সে আবার নিড়ানি (Sickle) তুলে ঘাসের দিকে চলে গেল।
বিলকিস আবার পাইপের পানির ফোয়ারা সাদা কাঁকরের ড্রাইভওয়েতে ফেলতে লাগল।
মেহমিল মাথা ঝাড়া দিয়ে নিজের আয়াতের দিকে মনোনিবেশ করল।
কিন্তু পড়তে পড়তে হঠাৎ নজর ফসকে গেল—প্রথমে নখের কোণা দেখল, তারপর হাত দেখল, তারপর হাত থেকে দৃষ্টি পায়ের ওপর গিয়ে স্থির হলো এবং আবার পাইপের পানির দিকে চলে গেল।
খোলা গেটের ওপাশে সামনের বাড়ির গেটটিও খোলা দেখা যাচ্ছিল। সে আনমনে কোনো এক চিন্তায় মগ্ন হয়ে ওদিকে তাকাতে লাগল। সামনের বাড়ির গেটের কাছে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তার কাঁধে মিষ্টি ফোলা গালের একটি বাচ্চা ছিল। পাশেই গাড়ির দরজা খুলে একজন সুদর্শন (Good-looking) ব্যক্তি হাসিমুখে তাদের কিছু বলছিল। মেয়েটি হাসছিল। তারপর সেই লোক—যে সম্ভবত তার স্বামী ছিল—গাড়িতে বসে পড়ল এবং মেয়েটি বাচ্চার হাত ধরে 'বাই বাই' (Bye bye) করার ভঙ্গিতে গাড়ির দিকে নাড়াতে লাগল। বাচ্চাটি খুশিতে চিৎকার করছিল। লোকটি হেসে হাত নাড়াল এবং গাড়ি স্টার্ট (Start) করতে লাগল।
একটি সম্পূর্ণ এবং সুন্দর পরিবার (Family)।
সে চুপচাপ ওই তিনজনকে দেখতে থাকল, যতক্ষণ না গাড়িটি তীব্র গতিতে রাস্তায় বেরিয়ে গেল এবং মেয়েটি বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে গেট বন্ধ করতে লাগল।
সে হালকা করে মাথা ঝাড়া দিল এবং নিজের নিস্তব্ধ নজর আবার কুরআনে নিবদ্ধ করল এবং পড়ল যে আগে কী লেখা আছে।
*"তাদের দিকে তাকাবে না যা আমরা অন্যান্য দম্পতিদের দান করেছি।"*
মেহমিল অবচেতনভাবে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা তুলল। তারপর এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরাল। বিলকিস নিজের কাজে মগ্ন ছিল আর দারোয়ান নিজের কাজে। সেখানে কেউ তার মুহূর্তের সেই দৃষ্টি ধরতে পারেনি কিন্তু... কিন্তু...
সে সামান্য ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাল।
কিন্তু কেউ একজন ছিল যে তার মুহূর্তের জন্য পথভ্রষ্ট হওয়া নজরটিও ধরে ফেলত এবং অন্য কাউকে বলতও না; নিঃশব্দে তাকে সতর্ক করে দিত, বুঝিয়ে দিত। তার ওপর সেই সত্তার অনেক এহসান (উপকার) ছিল। সে তো শুকরিয়াও আদায় করতে পারবে না।
"বিলকিস! আজ কী বার?" হঠাতই মনে পড়ায় সে তাকে ডাকল।
"জুম্মা বার জি।" সে এখন পাইপ বন্ধ করে সেটি গুছিয়ে রাখছিল।
"ও আচ্ছা!" তার মনে পড়ল। আজ তো সূরা কাহাফ (Surah Kahaf) পড়তে হতো। জানি না সে কীভাবে ভুলে গেল। সে নিজেকে তিরস্কার করতে করতে কুরআনের পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।
দারোয়ান গেট বন্ধ করে নিজের কোয়ার্টারে চলে গিয়েছিল আর বিলকিস ভেতরে। সে বারান্দায় একা রয়ে গিয়েছিল।
প্রথমে কুরআন দেখে পড়ার কথা ভাবল, কিন্তু সূরা কাহাফ মুখস্থই ছিল, তাই কুরআন টেবিলের ওপর রাখল এবং চেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।
মাঝে মাঝে তার মনে হতো, তার জীবন কুরআনের আয়াতের চারপাশেই ঘুরতে শুরু করেছে। তার কোনো দিন এমন কাটে না যাতে এর ভূমিকা নেই। প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি সময় সে কুরআনকে নিজের সাথে রাখত। এখন এটি ছাড়া তার চলাও অসম্ভব ছিল।
চোখ বন্ধ করে সে বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা কাহাফ পড়তে লাগল।
এই শীতল সকালে চারদিকে এক নীরবতা আর স্নিগ্ধ মাধুর্য ছড়িয়ে পড়েছিল। সে চোখ বুজে তিলাওয়াত করছিল।
*"আম হাসিফতা আন্না আস-হাবাল কাহাফি..."*
*"ওয়ার-রাক্বীম..."*
সে যখন কেবল নবম আয়াতের
"আস-হাবাল কাহাফি" পর্যন্ত পড়েছে, অমনি কেউ পরবর্তী শব্দ
"ওয়ার-রাক্বীম" (Wal-Raqeem) পড়ে দিল।
তার নড়তে থাকা ঠোঁট থেমে গেল। অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে চমকে উঠে সে চোখ খুলল।
সামনের খোলা দরজায় তৈমুর দাঁড়িয়ে ছিল।
নাইট স্যুট (Night suit) পরা, অসম্পূর্ণ ঘুমের রেশ মাখা চোখ নিয়ে সে
পলকহীনভাবে মেহমিলের দিকে তাকিয়ে ছিল।
মেহমিল নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকে দেখতে লাগল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য চারদিকে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। তারা দুজন চোখের মণি নড়াচড়া না করে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এবং এভাবেই তৈমুরের বাদামী চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে ধীরে ঠোঁট খুলল এবং আবার সেই আয়াতটি পুনরাবৃত্তি করল।
"আম হাসিফতা আন্না আস-হাবাল কাহাফি..."
সে ইচ্ছাকৃতভাবে থামলে তৈমুরের ছোট লাল ঠোঁট দুটি নড়ে উঠল।
"ওয়ার-রাক্বীম..."
"কানু মিন আ-য়াতিনা আজাবা" সে তাকে নিজের নজরের সীমানায় রেখে আয়াতটি পূর্ণ করল।
তৈমুর একইভাবে নিথর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল, যেন বারান্দা আর লনের এই স্তব্ধ পরিবেশের একটি অংশ।
"এদিকে এসো।" মেহমিল পলক না ফেলে তাকে দেখতে দেখতে বলল।
সে কোনো আচ্ছন্ন ব্যক্তির মতো ধীর পায়ে ছোট ছোট কদম ফেলে মেহমিলের কাছে এল।
সে তৈমুরের হাত ধরার জন্য দুই হাত বাড়িয়ে দিল এবং কোনো এক জাদুমুগ্ধ মানুষের মতো তৈমুর তার ছোট ছোট হাত দুটো মেহমিলের হাতে দিয়ে দিল।
"তুমি কীভাবে জানলে যে 'আস-হাবাল কাহাফি'-র পর 'ওয়ার-রাক্বীম' আসে?"
তৈমুর চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন সে নিজেও জানে না।
"তুমি কি সূরা কাহাফ পারো?" কোমলভাবে তার হাত ধরে মেহমিল জিজ্ঞেস করলে সে আস্তে করে মাথা নেড়ে না বলল।
"তবে তুমি কীভাবে জানলে?"
"It just slipped... (এমনিতেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল)" সে আটকে আটকে বলছিল। চোখ তখনও মেহমিলের চেহারায় স্থির ছিল।
মেহমিলের মনে পড়ল যে তৈমুরের গর্ভকালীন সময়ে সে প্রতি জুম্মাবার এভাবেই বসে চোখ বুজে উচ্চস্বরে সূরা কাহাফ পড়ত, যাতে জন্মের পূর্বেই সে কুরআনের সাথে পরিচিত হয়; এবং সম্ভবত সে সত্যিই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল এবং হয়তো সাত বছর পর সে এই আওয়াজটি শুনেছে।
"তুমি কি অন্য সূরা পারো?"
সে আবার মাথা নেড়ে না বলল। সে নিজের হাত তখনও মেহমিলের হাতে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
"তুমি কি কুরআন পড়তে পারো?"
সে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়াল।
"মসজিদে যাও নাকি অন্য কোথাও থেকে শিখেছ?"
"ড্যাডি বাড়িতে ক্বারী সাহেব রেখে দিয়েছিলেন।"
"কতবার কুরআন খতম করেছ?"
"টু টাইমস (Two times)।"
"ওহ! তুমি কি ক্বারী সাহেবের কুরআনও এভাবেই শুনতে যেমন আমার শুনছ?"
"না। উনি একদম ভালো বলতেন না।"
"আর আমি?"
"আপনি... আপনি ভালো বলেন।" সে এখনও আটকে আটকে বলছিল।
"আর ফারিস্তের (তিলাওয়াত) ভালো লাগে?"
"She never reads." (তিনি কখনো পড়েন না)
সে 'Recite' (তিলাওয়াত) কে
'Read' (পড়া) বলছিল। কিন্তু সেই সময়টি তার ভুল সংশোধন করার ছিল না, আর না এটি বলার ছিল যে—তিনি কেনই বা তোমার সাথে পড়বেন; ওই মুহূর্তগুলো ছিল খুব বিশেষ, সেগুলোকে নষ্ট করা যেত না।
"তুমি কি এমন পড়তে পারো?"
সে মাথা নেড়ে না বলল।
"পড়তে চাও?"
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে লাগল।
মেহমিল ধীরে ধীরে তার হাত ছেড়ে দিল।
"চলো, কাল সকালে আবার পড়ব।" এবং চেয়ারের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। সে ভাবল তাকে স্বাধীন ছেড়ে দিই। যদি সে মেহমিলের হয়, তবে ফিরে আসবে; না হলে আসবে না।
অনেকক্ষণ পর সে চোখ খুলল তো তৈমুর সেখানে ছিল না। মেঝের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। চড়ুইগুলো উড়ে গিয়েছিল। লাল ফড়িংগুলো নিজের গর্তে চলে গিয়েছিল, পিঁপড়েগুলো চলে গিয়েছিল, সাদা বিড়ালটিও ফিরে গিয়েছিল।
আর আল্লাহর দিকে ডাকার মতো কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে?
সে অবচেতনভাবে ভেবেছিল। শত্রুকে বন্ধু বানানোর সর্বোত্তম উপায় তো এই আয়াতেই দেওয়া আছে, তার বুঝতে একটু দেরি হয়েছিল।
চলবে,,,,

Comments
Post a Comment