#নামাল-(Namal) অধ্যায়:০১ পর্ব ০৩, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
#নামাল-(Namal)
#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi)
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
অধ্যায়:০১
পর্ব ০৩,,,,,
সে পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে দিয়েছিল, অথচ তখনো পরীক্ষার সময় শেষ হতে পনেরো মিনিট বাকি ছিল। ততক্ষণ পর্যন্ত হল পরিদর্শক শিক্ষিকারা তাকে ওখানেই বসে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হানিন পরীক্ষার খাতাটি উল্টো করে টেবিলের ওপর রেখে, একটানা লিখতে লিখেতে ব্যথায় টনটন করতে থাকা আঙুলগুলোকে আলতো করে মর্দন করছিল; আঙুলের দু-এক জায়গায় কালির দাগও লেগে ছিল।
পরীক্ষা শেষ করে পুনরায় খাতা রিভিশন দেওয়ার কোনো অভ্যাস তার কোনোকালেই ছিল না, আর পরীক্ষা শেষে বাইরে মেয়েদের জটলায় দাঁড়িয়ে একটি একটি করে উত্তর মেলানোর অভ্যাস থেকে তো সে সবসময় দূরে পালাত।
ওভাবে মেলাতে গেলে অর্ধেক উত্তর এমনিতেই ভুল প্রমাণিত হয়ে যেত।
"আর মাত্র তিনটা পরীক্ষা... তারপর এই বিএ শেষ!
শুকর আলহামদুলিল্লাহ..." সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল।
তারপর এদিক-ওদিক তাকাল। অন্য মেয়েরা মাথা নিচু করে অনবরত খাতার পাতায় ঝড় তুলে লিখে যাচ্ছিল। পরীক্ষা পরিদর্শক দলের নারীরা তীক্ষ্ণ নজরে সবার দিকে তাকাতে তাকাতে হলের ভেতর পায়চারি করছিলেন।
হানিনের দৃষ্টি দেওয়ালের ওপরের ভেন্টিলেটরের দিকে চলে গেল। তিন, তিন, তিন,এক—সব মিলিয়ে মোট হলো দশ... সে এভাবেই ক্লাস বা হলের জানালা, দরজা কিংবা রাস্তার ধারের গাছপালা গুনতে ভালোবাসত; তাও আবার দশ দশটির গ্রুপ বানিয়ে গোনা শেষ করে নতুন করে শুরু করত।
সবগুলো দরজা গোনা শেষ করে সে তার ব্যাগ থেকে একটি শুকনো কালির কলম বের করল। সেটির নিব চেয়ারের হাতলে ঘষে ঘষে সে অদৃশ্য কিছু শব্দ লিখতে লাগল। সে সাধারণত পাতার কোণে ফুল কিংবা ত্রিভুজ আঁকত, আর তারপর নিজের নাম লিখতে শুরু করে দিত— Haneen Yousuf হানিন ইউসুফ,
হানিন হানিন... আর অবচেতনভাবেই তার সেই কালিশূন্য কলমটি কাগজের বুকে লিখতে শুরু করল:
"হাশিম কারদার... হাশিম... হাশিম।"
সে এক ঝটকায় চমকে উঠল। তারপর কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত এদিক-ওদিক তাকাল। লজ্জায় ও অস্বস্তিতে তার ফর্সা চেরাটা সামান্য লালচে হয়ে উঠল। সে বেশ ব্যাকুল হয়ে কপালে এসে পড়া চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করল। যে কথা কখনো কারও কাছে বলা হয়নি, তা যদি আচমকা এভাবে বাইরে বেরিয়ে আসে—ঠিক যেমন কানায় কানায় ভরা গ্লাস থেকে জল ছিটকে পড়ে—তখন মানুষ নিজের হাত দুটোকে নিয়েও ভয় পেতে শুরু করে।
সে কলমটি নামিয়ে রাখল, তারপর চোখ দুটো বন্ধ করল।
চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই চেনা কিছু মুহূর্ত, সামান্য কিছু স্মৃতি... যখন সে কখনো হাশিমকে দেখেছিল কিংবা তার মুখোমুখি হয়েছিল। পারিবারিক কোনো দাওয়াত... কোনো উৎসব... সে ছিল তার মায়ের সৎ ভাইয়ের ফার্স্ট কাজিন।
সবসময় মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি লেগে থাকা এক শানদার ও ভীষণ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব... কিন্তু সম্পর্কে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাকে দেখা আর আইফেল টাওয়ারের নিচে কোনো এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকানো যেন একই কথা ছিল।
কিন্তু এখন আইফেল টাওয়ার পর্যন্ত যাওয়া বন্ধ হয়েছে কতকাল হলো! পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে দূর-দূরান্তেও এমন কোনো অনুষ্ঠান হয়নি, যেখানে তার একটি ছোট্ট ঝলকও চোখে পড়তে পারত।
কে জানে, আবার কবে সে তাকে দেখতে পাবে?
সে বেশ উদাস মনে ভাবল এবং শুকনো নিবটি দিয়ে আবারও কাগজের বুকে ত্রিভুজ আঁকতে লাগল... তারপর কিছু ফুল, তারপর ‘হানিন’... আর তার ঠিক পরপরই আবারও ‘হাশিম’...
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
হাশিম দরজায় মৃদু দস্তক দিল এবং হাতল ঘুরিয়ে ভেতরের দিকে ঠেলে দিল।
ভেতরে অফিসের মধ্যে এক অদ্ভুত ও প্রশান্ত নীরবতা বিরাজ করছিল। সে নিজের চেয়ারে বসে থার্মোফ্লাস্ক থেকে ধোঁয়া ওঠা চা পেয়ালিতে ঢালছিল। কাছেই কিছু ফাইল এবং মোটা কালো বাঁধাই করা আইন-সংক্রান্ত বই খোলা অবস্থায় রাখা ছিল। জুমার কেবল এক পলক তার দিকে তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে টেবিল থেকে সুগার পটটি তুলে নিল।
"উঁহু... আমি চিনি ছাড়া চা পছন্দ করি।" হাশিম মৃদু হেসে তাকে বারণ করল।
সে দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে এল এবং জুমার সামনের একটি চেয়ার টেনে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসল। কোটের বোতামটি খুলে সে জুমার ঠিক সামনে থেকে চায়ের পেয়ালিটি তুলে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়াল।
জুমার নিজের ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে সুগার পটটি যথাস্থানে রেখে দিল এবং আবার ফাইলের পাতা ওল্টাতে মনোযোগ দিল।
চায়ের কাপে দু-তিনটি চুমুক দিয়ে হাশিম সেটি টেবিলের ওপর রাখল এবং এক মনোরম ও মনকাড়া হাসি নিয়ে তার দিকে চেয়ে বলল,
"So... we are good now?"
"আপনার কী মনে হয়?" ফাইলের ওপর মুখ নিচু রেখেই সে বেশ গম্ভীর গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল।
"হয়তো না... কারণ এইমাত্র যেভাবে আপনি বাইরে সবার সামনে আমার হেয়ারকাট আর স্যুটকে টেনে আনলেন..." হাশিম নিজের কাঁধ দুটো সামান্য ঝাঁকাল।
"তার জবাবে আমি শুধু এতটুকুই বলব যে, আপনি অত্যন্ত প্রতিশোধপরায়ণ এক নারী।"
সে ফাইলের পাতা থেকে চোখ তুলে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে হাশিমের দিকে তাকাল।
"যদি পরবর্তী সময়ে আপনি আমার সামনে এভাবে কাউকে হেনস্তা বা হ্যারাস করার চেষ্টা করেন... তবে আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক এরপর আর বিন্দুমাত্র ভালো থাকবে না, Is that clear?"
"Crystal!" হাশিম চায়ের কাপে আবার চুমুক দিতে দিতে হেসে তার মুখের দিকে তাকাল।
জুমার কোঁকড়ানো চুলগুলোর অর্ধেকটা পেছনে একটি ক্লিপ দিয়ে আলতো করে বাঁধা ছিল। নাকের হিরের নাকফুলটি চকমক করছিল এবং তার সংকুচিত চোখ দুটোর ভেতরে এক শীতল ও নির্মম কাঠিন্য খেলা করছিল।
"আমি কেবল আমার জব করছিলাম, তবুও আমি দুঃখপ্রকাশ করছি।"
"আপনার দুঃখপ্রকাশ করাটাই উচিত।" সে আবারও ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য হাশিম কোনো কথা বলল না, তখন জুমার মাথা তুলে তার দিকে তাকাল।
"আমি নিশ্চিত আপনি এখানে শুধু ‘সরি’ বলতে আসেননি। আপনার কোনো একটা ফেভার চাই।" ফাইলটি বন্ধ করে সে চেয়ারে কিছুটা পেছন হেলান দিয়ে বসল।
"বলুন! আমি শুনছি।"
হাশিম মৃদু হেসে একটি পেপার ব্যাগ টেবিলের ওপর তার সামনে রাখল। জুমার সেটি খুলে ভেতর থেকে একটি জমকালো কার্ড বের করল।
"আপনি কি আবার বিয়ে করছেন?" ঠিক একই রকম শীতল ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে হেসে জুমার কার্ডটি তার সামনে মেলে ধরল। হাশিম মৃদু শব্দে হেসে উঠল।
"উঁহু... আমার মেয়ে সোনিয়ার ষষ্ঠ জন্মদিন, আর আপনি সেখানে আমন্ত্রিত।"
জুমার কার্ডটি দেখল। সেটি একটি চারকোনা বক্সের ভেতর রাখা ছিল, দেখতে কোনো শীল্ড বা স্মারকের মতো লাগছিল। পুরো বক্সটি ছিল কালো রঙের, যার সামনের সোনালি ফিতে দিয়ে ঢাকনাটি বন্ধ করা হতো। ভেতরে একটি ছোট আরএসভিপি (RSVP) কার্ডও রাখা ছিল; যার একটি লাইনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সম্মতি এবং অন্যটিতে অপারগতা প্রকাশের অপশন ছিল এবং দুটোর আগেই খালি ঘর বা বক্স বানানো ছিল।
"থ্যাঙ্ক ইউ হাশিম... আমি চেষ্টা করব, তবে কথা দিচ্ছি না। কিন্তু নিমন্ত্রণ আর ফেভারের মধ্যে একটা বড় তফাত থাকে।" সে কার্ডটি বেশ অবহেলার সাথে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে আগের মতোই শীতল ও শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
হাশিম চোখের ইশারায় পেপার ব্যাগের ভেতরের দিকে ইঙ্গিত করল। জুমার উঁকি দিয়ে দেখল সেখানে আরেকটি কার্ড রয়ে গেছে। সে ওটা বাইরে বের করল। তার ওপর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল—‘সা’দি ইউসুফ অ্যান্ড হিজ্ ফ্যামিলি’।
হাশিম খুব নিপুণভাবে জুমার মুখের পরিবর্তন হতে থাকা অভিব্যক্তিগুলো লক্ষ্য করছিল।
জুমার চোখের কোণে এক তীব্র যন্ত্রণার আভাস ফুটে উঠল, মুখমণ্ডলে এক চরম ব্যাকুলতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর সেখানে আবারও সেই চিরচেনা নীরবতা নেমে এল। সে একদম ভাবলেশহীন চোখে হাশিমের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল।
"আপনি এটি তাকে কুরিয়ার করে দিতে পারেন অথবা নিজে গিয়ে হ্যান্ড ডেলিভার করতে পারেন।"
"সে আমার কুরিয়ার করার কারণেও আসবে না, আর আমি নিজে ডাকলেও আসবে না। কিন্তু আপনি যদি তাকে বলেন, তবে সে নিশ্চয়ই আসবে।"
জুমার আলতো করে কাঁধ ঝাঁকাল। "আমি ওকে এটি পাঠিয়ে দেব। মুখেও বলে দেব। কিন্তু সে নিজের ইচ্ছার মালিক। আপনি কাউকে জোর তো করতে পারেন না, তাই না?"
সে আগের মতোই স্বাভাবিক সুরে কথা বলছিল, কিন্তু শান্ত সমুদ্রে পাথর ছুঁড়ে মারার পর সৃষ্ট তরঙ্গের বৃত্তগুলো যেমন ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তার মনের ভেতরের অস্থিরতাও ঠিক তেমনি ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
"না আমি আজ জন্মেছি, আর না আপনি। আমরা দুজনেই খুব ভালো করে জানি যে সে আপনার কোনো কথা ফেলবে না।"
হাশিম টেবিলের ওপর সামান্য সামনে ঝুঁকে এল। তার চোখের মণি জোড়ায় এক গভীর গম্ভীরতা ভর করেছিল। "সা’দিকে আমার এই পার্টিতে উপস্থিত থাকতেই হবে।
যেকোনো উপায়ে হোক, আপনি তাকে সেখানে নিয়ে আসবেন।"
জুমার কোনো জবাব দিল না। সে শুধু কার্ড দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। হাশিম চায়ের কাপটি রেখে আবার পেছনে হেলান দিয়ে বসল এবং জুমার মুখের ভাব পড়ার চেষ্টা করতে করতে বেশ নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,
"সে আজকাল কী করছে?"
"হুঁহ্... জব।" সে কোনো এক গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল।
হাশিম চুপ করে রইল। চা ততক্ষণে সম্পূর্ণ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, তবুও সে শেষ চুমুকটুকু গিলে নিল এবং খট করে একটা শব্দ করে কাপটি টেবিলে রাখল।
জুমার চোখ তুলে তার দিকে তাকাল এবং হালকা মাথা নেড়ে সায় দিল।
"আপনি এখনো এখানে বসে আছেন, তার মানে আপনার আরও একটি ফেভার চাই।"
হাশিম হেসে মাথা সামান্য নিচু করল এবং কিছু বলার জন্য কেবল ঠোঁট জোড়া খুলেছিল যে...
"আমার উত্তর হলো—না।"
সে কিছু বলতে গিয়েও মাঝপথে থমকে গেল।
"আমি তো এখনো কিছুই বলিনি।"
"আমি খুব ভালো করেই জানি আপনি কী বলতে চান।"
মনের ভেতরের তরঙ্গের বৃত্তগুলো ততক্ষণে মিলিয়ে গিয়েছিল এবং সে নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়েছিল।
"আপনার ‘সরকার বনাম আবদুল গফুর হায়দার’ মামলায় একটি রফাদফা বা সেটেলমেন্ট চাই। কিন্তু তা হচ্ছে না। আমরা এই কেস নিয়ে সরাসরি ট্রায়ালে যাচ্ছি।"
হাশিমের মুখের সেই চতুর হাসি এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। সে সত্যি ভীষণ অবাক হয়ে নিজের ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে তাকাল। "কিন্তু ওটা তো একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল!
ভুলটা তো ড্রাইভারের ছিল না। তবুও সে ভুক্তভোগী পরিবারকে রক্তের বিনিময় বা ‘দিয়ত’ (ক্ষতিপূরণ) দিতে রাজি আছে।"
"এই অ্যাক্সিডেন্টে যে মারা গেছে, সে মাত্র ষোলো বছরের একটি কিশোরী মেয়ে ছিল হাশিম! আমরা ট্রায়ালেই যাচ্ছি।"
"যদি মেয়েটির পরিবার সেই ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে রাজি হয়ে যায়, তবে তখন আমাদের মাননীয় প্রসিকিউটরের কী রায় হবে?"
"তখন প্রসিকিউটর নিজের পকেট থেকে সেই দিয়তের সমপরিমাণ অর্থ ওই পরিবারকে দিয়ে দেবে এবং তাদের বাধ্য করবে যেন তারা ট্রায়ালের পথেই হাঁটে।"
"ওহ্... আপনি নিজে এই বিশাল অঙ্কের টাকা ওদের পে করবেন?" সে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে নিজের ভ্রু উঁচাল।
জুমার এবার প্রথমবারের মতো মনেপ্রাণে এক চিলতে হাসল।
"আমি বলেছি আমরা ট্রায়ালে যাচ্ছি, আমি নিজে যাচ্ছি না।
দুঃখিত, তবে আপনি বোধহয় জানেন না যে এই কেসটি আমি লড়ছি না। এটি প্রসিকিউটর বাসিরাতের কেস।"
সে এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে গেল। চোখের ভ্রু জোড়া কুঁচকে সে অত্যন্ত বিস্ময় ও অচমকা ধাক্কা নিয়ে জুমার দিকে তাকাল এবং পুরো বিষয়টি বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
"পঞ্চাশ হাজারের হেয়ারকাট আর আড়াই লাখের স্যুট... আপনি আসলেই এক চরম প্রতিশোধপরায়ণ নারী।" সে মুখে এক কৃত্রিম হাসি বজায় রেখে বলল
"আপনি জানত-বুঝে এই কেসটি ওনাকে ট্রান্সফার করেছেন, কারণ ওনার যখনই জানতে পারবেন যে ডিফেন্স সাইডে হাশিমের হাত আছে, উনি জীবনেও এই কেসটি সেটেলমেন্টের টেবিলে আনবেন না। "
"গুড, ভেরি গুড!"
জুমার মুচকি হেসে নিজের কাঁধ ঝাঁকাল।
"আমি কখনো মানুষকে ক্ষমা করি না হাশিম, ইউ নো দ্যাট।
তা,আমি কি এখনো আপনার মেয়ের বার্থডে পার্টিতে আমন্ত্রিত?"
"অবশ্যই! এবং আপনি সা’দি ও তার ফ্যামিলিকেও সাথে নিয়ে আসবেন। আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এই সব আদালতের ঝামেলার কারণে কখনোই প্রভাবিত হতে পারে না।" সে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কোটের বোতামটি আটকে নিল। বারবার বেজে ওঠা নিজের মোবাইল ফোনটি সাইলেন্ট করল। তারপর অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "আমি এই কেসটার একটা গতি করেই ছাড়ব।
হাশিম সবকিছু সামলাতে পারে, ইউ নো দ্যাট... যদিও বাসিরাত সাহেবের কাছে আজকের পর থেকে হাতে অগাধ সময় থাকবে।" সে শান্ত সমুদ্রে তার দ্বিতীয় পাথরটি ছুঁড়ে মারল।
"কেন? আজ আবার কী হলো?" সে পুনরায় নিজের টেবিলের ফাইলগুলো খুলতে শুরু করল।
"ওনার সেই বিখ্যাত কেসের রায় যে আজ চলে এসেছে।"
"কোন কেসের?" সে ফাইলের একটি লাইনের নিচে পেনসিল দিয়ে দাগ টানছিল। হাশিম কোনো জবাব দিল না। জুমার দ্বিতীয় লাইনের নিচেও দাগ টানল। তারপর এক আচমকা ধাক্কায়...
সে চমকে উঠে মাথা তুলল।
"কোন... কোন কেসের কথা বলছেন?" এবার তার প্রশ্নের ধরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। চোখের মণি জোড়ায় এক অতল বিস্ময়, শক্ আর তীব্র ব্যাকুলতা ফুটে উঠল এবং তার ফর্সা ফেসটি এক মুহূর্তে ফ্যাকাসে সাদা হয়ে গেল—ঠিক যেন তপ্ত সোনালি মরুভূমির বুকে হঠাৎ করে তীব্র তুষারপাত শুরু হয়েছে।
"আর আপনি এটা জানতেন না? আমি নিজেই এইমাত্র খবরটা পেলাম।" হাশিম এমন এক ভাব ফুটিয়ে তুলল যেন সে সত্যি ভীষণ আফসোস করছে।
"কী রায় এসেছে?" সে নিজের পরবর্তী শ্বাসটুকু আটকে রেখে জিজ্ঞেস করল। সে নিজের আসন থেকে এক চুলও নড়ল না। কেবল ঘাড় উঁচিয়ে হাশিমের দিকে তাকিয়ে সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল।
"নট গিল্টি! সমস্ত অভিযোগ থেকে সসম্মানে খালাস।" হাশিম সমবেদনা জানানোর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
"আই অ্যাম সরি।"
তারপর আবারও অনবরত বেজে চলা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে দ্রুত রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। করিডোরে এসে সে এক চরম তিক্ত ও কুটিল হাসি নিয়ে জুমার অফিসের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল।
"আমিও কাউকে ক্ষমা করি না, ইউ লিটিল বিচ!" আর এক ঝটকায় মাথা সোজা করে সে সামনে এগিয়ে গেল।
ভেতরে জুমার তখনো ঠিক একই ভঙ্গিতে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। মরুভূমির বুকে সেই আচমকা শুরু হওয়া তুষারপাত তখনো অবিরাম ঝরে যাচ্ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
(Yehi junoon ka yehi tauq-o-daar ka mausam)
(এটাই উন্মাদের সেই ঋতু, এটাই ফাঁসির মঞ্চ আর শিকল পরার মৌসুম)
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছিল, কিন্তু এই কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই বিশাল লোহার গেটটি দুপুরের মতোই তপ্ত লোহার মতো উত্তাপ ছড়াচ্ছিল।
জেলের সেই প্রাচীর ভেদ করে বাইরে পা রাখতেই ফারিস নিজের সোনালি চোখের মণি জোড়া সামান্য সংকুচিত করে কড়া আলোয় এদিক-ওদিক কাউকে খুঁজতে লাগল, আর ঠিক তখনই সে তাকে দেখতে পেল। একটি সাদা গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সা’দি।
তাকে আসতে দেখে সা’দিও মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে এল। দুজনেই কদম কদম দূরত্ব পার হয়ে একে অপরের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ফারিস নিজের ভাগ্নের চেয়ে উচ্চতায় প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা ছিল।
সে মুসাফিরের জন্য নিজের হাতটি এমনভাবে বাড়িয়ে দিল, ঠিক যেভাবে মানুষ ‘আর্ম রেসলিং’ বা পাঞ্জা লড়ার জন্য হাত বাড়ায়। সা’দিও এক গাল জয়ের হাসি নিয়ে তার সেই হাতের সাথে নিজের পাঞ্জা মেলালো।
জয়ের এক অনাবিল আনন্দ সা’দির মুখে স্পষ্ট ছিল, তবে ফারিস ছিল সম্পূর্ণ গম্ভীর।
"কোথায় যাব?" গাড়িতে গিয়ে বসার পর সা’দি প্রথম প্রশ্নটি করল। "আমাদের বাড়ি, নাকি কারদারদের প্রাসাদের দিকে?"
"কবরস্থান।"
সা’দি শুধু "হুঁ" বলে গাড়ি স্টার্ট দিল। ফারিস এক পলক দুই সিটের মাঝখানে গিয়ারের পাশের বক্সে রাখা সা’দির মোবাইলের দিকে তাকাল এবং তারপর মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে চেয়ে রইল।
"আমি কি সাথে আসব?" কবরস্থানের প্রবেশদ্বারে গাড়ি থামিয়ে সা’দি জিজ্ঞেস করল।
"আমার একাকী থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে, বেশ সময় লাগবে।" তার গলার আওয়াজে স্পষ্ট কোনো উত্তর ছিল না। কথাটি বলেই সে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
সা’দি নিঃশব্দে তাকে চলে যেতে দেখল। তবে সে এটি খেয়াল করেনি যে, তার সাধের মোবাইলটি এখন আর সেই গিয়ারের পাশের বক্সে রাখা নেই।
কবরস্থানের ভেতরে সেই দুটি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ করে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর বড় একটি গাছের আড়ালে এসে দাঁড়াল, যেখান থেকে সা’দি তাকে কোনোভাবেই দেখতে পাবে না। সে সা’দির মোবাইল থেকে একটি চেনা নম্বরে ডায়াল করল।
"হ্যাঁ স্ট্যানি... গাজী বলছি।" কথা বলার সময় সে নিজের পুরোনো অভ্যাস বশত কানের লতিটা দুই আঙুল দিয়ে মর্দন করছিল।
"হ্যাঁ, আমি বাইরে চলে এসেছি।
আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শোনো। আমার কিছু জিনিসপত্রের প্রয়োজন। আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে যেন সবকিছু রেডি থাকে।
আমার পার্সোনাল গান (বন্দুক), আমার ছুরি, একটি ব্লু পাসপোর্ট (Blue Passport)। দুটি আলাদা আলাদা আইডেন্টিটি কার্ড—ছবি আমার থাকবে কিন্তু নাম অন্য হবে, তবে ওগুলো গভর্মেন্ট ইস্যু করা জেনুইন কার্ড হতে হবে।"
এর বাইরে সে আরও বেশ কিছু আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের নাম গড়গড় করে বলে গেল। তারপর ওপাশের কথা শোনার জন্য কিছুটা বিরক্ত হয়ে থামল।
"যা বলেছি, ঠিক ততটুকুই করো। বেশি প্রশ্ন করতে যেও না।" কলটি কেটে দিয়ে সে দ্রুত কল রেকর্ড থেকে হিস্ট্রি মুছে দিল এবং শেষবারের মতো সেই দুটি কবরের দিকে এক পলক তাকাল
—‘জারতাশা ফারিস গাজী’ এবং ‘ওয়ারিস গাজী’।
কয়েক মুহূর্ত সে সেখানে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর সেই মৃত আত্মাদের কিছু না বলেই ধীর পায়ে গাড়ির দিকে ফিরে এল।
গাড়ির ভেতরে সা’দি বেশ অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক হাতড়ে কিছু একটা খুঁজছিল।
"কী হয়েছে?"
"বুঝতে পারছি না, মোবাইলটা কোথায় যে রেখে দিলাম!"
"ওটা তোমার সিটের ঠিক পেছনে পড়ে আছে।" সা’দি চমকে উঠে পেছনের দিকে তাকাল। তার মোবাইলটি সত্যি পেছনের সিটের নিচে পড়ে ছিল; যেন সামনের বক্স থেকে পিছলে কোনোভাবে পেছনে পড়ে গেছে। সা’দি মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে ফোনটি তুলে নিল এবং গাড়ি স্টার্ট দিল।
"তোমার কি বিন্দুমাত্র বিস্ময় লাগেনি যে জজ সাহেব আমাকে এভাবে ছেড়ে দিলেন?" ফারিস জানালার বাইরে চোখ রেখেই কথাটি বলল। সা’দি আলতো করে কাঁধ ঝাঁকাল।
"আপনি ওই খুনগুলো করেননি, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি।"
"তাতে কী আসে যায়? পুরো দুনিয়া তো এটাই বিশ্বাস করে যে আমিই খুনি।
আর সে (হাশিম) এত সহজে এই রায় মেনে নিল কী করে... এটাই আমার আশ্চর্য লাগছে।"
কথাটি বলতে বলতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে খুব তীক্ষ্ণ নজরে সা’দির মুখের ভাব লক্ষ্য করতে লাগল।
"যদি এর পেছনে তোমার কোনো হাত থেকে থাকে সা’দি, তবে এখনই বলে দাও। আমি শুনছি।"
"এর পেছনে আমার হাত কী করে থাকবে? জজ সাহেব আমার কথা শুনবেনই বা কেন, আর মানবেনই বা কেন?" সে অত্যন্ত উদাসীনভাবে আবার কাঁধ ঝাঁকাল এবং ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিল।
ফারিস সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। "কিন্তু তুমি আমার কথার সরাসরি কোনো প্রতিবাদ বা অস্বীকার করলে না। ঠিক আছে..." আর সে আবারও জানালার বাইরে দ্রুত গতিতে পেছনে ছুটে যাওয়া গাছপালাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সা’দি কোনো জবাব দিল না, একদম চুপ করে রইল।
"তুমি নিজে মুখে বলবে, নাকি আমাকে অন্য কোনো উপায়ে তোমার মুখ থেকে কথা বের করতে হবে?" এবার ফারিস কিছুটা নিচু অথচ অত্যন্ত কঠোর ও ভারী গলায় কথাটি বলতেই সা’দি কিছুটা বিরক্ত হয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মোড় নিল।
"আমি কোনো ভুল কাজ করিনি। যা কিছু হয়েছে, তা স্বয়ং প্রকৃতি বা নিয়তিই করেছে।"
"আচ্ছা! তা তোমার সেই নিয়তি হুট করে এমন কী করে ফেলল?"
"যা যুগের পর যুগ ধরে হয়ে আসছে—হামানকে ফেরাউনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া।"
"কী?" ফারিস নিজের চোখের ভ্রু জোড়া কুঁচকে বেশ আকস্মিক ও বিরক্তিকর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল। সা’দি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমার অন্যতম প্রিয় কিসসা বা কাহিনীগুলোর একটি হলো—হযরত মূসা (আঃ) এবং ফেরাউনের কিসসা।
এর পেছনের আসল কারণটা না হয় অন্য কোনোদিন বলব। কিন্তু আপনি যদি জীবনে কোনোদিন কোনো বই পড়ার সামান্যতম কষ্টটুকু করতেন—যা নিশ্চিতভাবেই আপনি এই চার বছরে জেলের ভেতরে করেননি, কারণ অন্যের হাড়গোড় আর দাঁত ভাঙা থেকে ফুরসত তো আর পাননি—তাহলে আপনি জানতে পারতেন যে ‘হামান’ ছিল ফেরাউনের প্রধান উজির বা মন্ত্রী। অত্যন্ত চতুর, মহাবলশালী এবং ফেরাউনের ডান হাত। তার প্রতিটি হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালনকারী। এই দুনিয়ার সমস্ত ফেরাউনেরা আসলে তাদের নিজ নিজ হামানদের ওপর নির্ভরশীল বা মুখাপেক্ষী থাকে। আমরা যদি কোনোভাবে সেই হামানকে নিজেদের মুঠোয় পুরে নিতে পারি, তবে অনেক অসম্ভব কাজই খুব সহজে হাসিল করা যায়। আমিও ঠিক এই কাজটিই করেছি।"
সে নিজের কথার পেছনে এক রহস্যময় ধোঁয়াশা বজায় রেখে আবারও সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেল। ফারিস এক ঝটকায় নিজের মাথা সোজা করে জানালার বাইরে চেয়ে রইল। তার সেই অদ্ভুত সোনালি চোখ দুটোর গভীরে তখন এক গভীর ও জটিল চিন্তার ছায়া খেলা করছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
(Dil ko lahoo karein ke gareban rafoo karein)
(হৃদয়কে রক্তে রঞ্জিত করব, নাকি বুকের ছেঁড়া জামা সেলাই করব)
সেই সুউচ্চ অট্টালিকার একদম শীর্ষ তলার (Top Floor) সুপ্রশস্ত এবং অত্যন্ত বিলাসবহুলভাবে সাজানো অফিস কক্ষটি আলোয় ঝলমল করছিল।
পাওয়ার সিটের ওপর জওয়াহেরাত আরাম করে হেলান দিয়ে বসেছিল এবং মুখে এক চিলতে নরম হাসি নিয়ে তার সামনের চেয়ারে বসেন হাশিমকে লক্ষ্য করছিল, যে মাথা নিচু করে নিজের মোবাইলে কিছু একটা টাইপ করে যাচ্ছিল।
পেছনে নওশেরওয়াঁন এক তীব্র ব্যাকুলতা ও চরম বিরক্তিতে অনবরত পায়চারি করছিল; ঠিক দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো—ডান থেকে বামে, আবার বাম থেকে ডানে।
"আমার একটা ব্যাখ্যা চাই হাশিম!" জওয়াহেরাত মুখে হাসি বজায় রেখেই তাকে সম্বোধন করল।
"তুমি এতটা বেখবর কী করে হতে পারলে যে ফারিস খালাস পাওয়ার আগে তুমি বিন্দুমাত্র টের পর্যন্ত পেলে না?"
"আমি জমির কিছু মামলার কাজ নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলাম এবং এই সবকিছু খুব আচমকা ঘটে গেছে।" হাশিম নিজের ফোনটি টেবিল পাশে রেখে কাঁধ দুটো সামান্য ঝাঁকিয়ে বলল।
"জাস্টিস সিকান্দারের মুখের অভিব্যক্তি আমি খুব ভালো করে দেখেছি। সে মনস্থির করেই এজলাসে এসেছিল। নিশ্চিতভাবেই এই কাজের জন্য তাকে আগে থেকেই রাজি করিয়ে নেওয়া হয়েছিল।"
"ওই সাধারণ মানুষগুলোর এত বড় সাহস বা ক্ষমতা নেই যে তারা আমাদের মতো প্রভাবশালী এক জজ সাহেবকে টাকা দিয়ে কিনে নেবে।"
"জজদের শুধু টাকা দিয়েই কেনা যায় না, তাদের বাধ্য করার আরও অনেক পথ থাকে।"
নওশেরওয়াঁন এক ঝটকায় ঘুরে হাশিমের সামনে এসে দাঁড়াল।
"আর যদি কেউ সেই জজ সাহেবকে ব্ল্যাকমেইল করে থাকে ভাইয়া! তবে সে ওই সা’দি ছাড়া আর কেউ হতে পারে না!"
"Please Sheru... আমরা কি সা’দিকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো কথা বলতে পারি?" মুচকি হাসতে থাকা জওয়াহেরাতের চোখের কোণে এবার এক কঠোর ও সতর্কবার্তা ফুটে উঠল।
"সে ওখানে দশটা মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে চরম অপমান করেছে, আর আপনি চাচ্ছেন আমি ওটা ভুলে যাই?"
নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নওশেরওয়াঁ এবার বেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ল।
"তোমার মোটেও ওভাবে ওখানে যাওয়া উচিত হয়নি।" কিন্তু সে হাশিমের কথার দিকে বিন্দুমাত্র কান দিচ্ছিল না।
"সে আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে সে ইংল্যান্ডে হওয়া আমার সেই চালানের (Chalan) বিষয়টাও খুব ভালো করে জানে! সে নিজেকে ভাবে কী? মাম্মি!
আমি আপনাকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, আপনি ওকে এই পার্টিতে ইনভাইট করছেন না। আমি ওনাকে নিজের বাড়িতে কোনোভাবেই বারদাশত (সহ্য)করব না।"
"আমি অলরেডি কার্ড দিয়ে এসেছি... Sorry!" হাশিম নিজের দু-হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে বলল।
"শেরু... সা’দি কোনো বড় সমস্যা নয়। সে যখন এই পার্টিতে আসবে, তখন আমি নিজেই তাকে দেখে নেব। নিজের ছেলের অপমানের বদলা কীভাবে নিতে হয়, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।" কথাটি বলতে বলতে সে সামনে ঝুঁকে আলতো করে শেরুর হাতটা চেপে ধরল। সে খানিকটা শান্ত হলো।
"আসল সমস্যা হলো ফারিস। আমি ওনাকে নিজের আশেপাশে বিন্দুমাত্র সহ্য করতে পারি নাই। আমাকে বলো হাশিম! তুমি এই ঝামেলাটা মেটানোর জন্য এখন ঠিক কী করছ?"
হাশিম এবার একটি কাগজের ওপর কলম দিয়ে কিছু একটা লিখছিল। নিশ্চিতভাবেই সে নিজেও ভেতর থেকে কিছুটা ডিস্টার্ব ছিল, তবে বাইরে নিজেকে অত্যন্ত সংযত ও স্থির (Composed) দেখাচ্ছিল।
"আমি ওনাকে একবার জেলের ভেতরে ঢুকিয়েছিলাম, দ্বিতীয়বারও ওখানেই পাঠাতে পারি।"
"সে যদি একবার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে, তবে দ্বিতীয়বারও চলে আসবে। সো, এর চেয়ে ভালো হবে তুমি ওর সাথে এক চতুর খেলা খেলো। সে তো আর জানে না যে আসল খুনগুলো কে করেছিল! আর ওর ধারণা অনুযায়ী এই পৃথিবীতে আমরাই এখন ওর একমাত্র ফ্যামিলি।"
জওয়াহেরাত তবুও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছিল না।
"সে আমাদের কোনোদিনই পছন্দ করত না।" নওশেরওয়াঁন বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটি বলতে বলতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"ঠিক এই কারণেই ভালো হবে যেন সে আমাদের সাথে কোনো শত্রুতা না রাখে। কারণ জেল থেকে বের হওয়ার পর সে সবচেয়ে আগে এটিই জানার চেষ্টা করবে যে সেই চার বছর আগে আসলে ঠিক কী ঘটেছিল।"
"হাশিম সব সামলে নেবে, আপনি কেন চিন্তা করছেন?" হাশিম অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও ধীরস্থিরভাবে নিজের চেয়ারে পেছনে হেলান দিয়ে বসে বলল।
"আমি তখনও যা কিছু করেছিলাম, তা শুধু নিজের ফ্যামিলির জন্য করেছিলাম। আর এখনও নিজের পরিবারকে প্রটেক্ট করার জন্য আমার যা কিছু করা প্রয়োজন, আমি ঠিক তা-ই করব।
নিজের ফ্যামিলির জন্য কিছু করা কখনোই ক্রাইম বা অপরাধ হতে পারে না। আমি যদি ওয়ারিস গাজীকে রাস্তা থেকে না সরাতাম, তবে সে আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক কেস ফাইল করে আমাদের পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিত। আর ওই জারতাশা... আমি যদি ওকে না মারতাম, তবে এই ডাবল মার্ডারকে আমি কখনোই ‘অনার কিলিং’ (Honor Killing) এর রূপ দিতে পারতাম না।
আমি ওটার জন্য সত্যি দুঃখিত, কিন্তু আমার কাছে তখন আর কোনো option ছিল না। আর তাছাড়া, যখন কোনো খুন হয়, তখন কাউকে না কাউকে তো জেলেই যেতে হয়। ফারিসের প্রতি আমার সমবেদনা আছে যে তার জীবনের চারটা বছর নষ্ট হলো; কিন্তু সে তো একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার (Intelligence Officer) ছিল।
সে যদি জেলের ভেতরে না যেত, তবে সে ঠিকই আসল খুনিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আমি যদি তাকে চার বছর আটকে রাখি, তবে তাতে ভুল কী করেছি? সে তো অন্তত জীবিত আর সুস্থ আছে, তার তো আসলে কিছুই যায়নি! নিজের মানুষদের তো এই পৃথিবীতে সবাই হারায়। আমরাও তো ড্যাডকে হারিয়েছি, যদিও তা স্বাভাবিক মৃত্যু (Natural Death) ছিল।
তবুও আমাদের জীবনেও তো দুঃখ আছে, পেরেশানি আছে। আমি সত্যি দুঃখিত এই সবকিছুর জন্য... তবে জুমার তো উল্টো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে আমি তাকে সাক্ষী হিসেবে অন্তত জীবিত ছেড়ে দিয়েছি! সে তো বেশ ভালোই আছে, নিজের জীবন কাটাচ্ছে। জীবন তো আর সবার সবসময় Perfect হতে পারে না, তাই না?"
কথাগুলো বলার সময় হাশিম আলতো করে নিজের কাঁধ দুটো সামান্য ঝাঁকাল।
"যদি মাত্র দুই-চারজনের উৎসর্গে বহু মানুষের জীবন সুন্দরভাবে বেঁচে যায়, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। আমি ফারিসকে খুব ভালোভাবেই হ্যান্ডেল করে নেব, ওকে আসতে দিন... মাম্মি সে আমার বিন্দুমাত্র কিচ্ছু করতে পারবে না। Okay? সে অত্যন্ত ইমোশনাল এবং রাগের মাথায় পাগল হয়ে যাওয়া এক সাধারণ মানুষ।
না আছে তার কোনো বুদ্ধি, আর না আছে কোনো দূরদর্শিতা। চার বছর জেলে থেকে সে আর কতটুকুই বা বদলেছে? ঠিক আগের মতোই বদমেজাজি রয়ে গেছে। এই ধরণের শত্রুকে তো মানুষ শুধু তাড়া করে করেই ক্লান্ত করে মেরে ফেলে!"
তারপর সে সোজা হয়ে বসে বলল, "এবার আমরা তোমার ওই প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলি শেরু!"
নওশেরওয়াঁ যেন এক চরম তেতো বড়ি গিলে নিল। সে অত্যন্ত অনিচ্ছার সাথে নিজের চেয়ারটি টেনে এনে ধপ করে বসে পড়ল।
"আর আমার এই প্রজেক্টের রাস্তায় একের পর এক দেয়াল তুলে দাঁড়ানো মানুষগুলোও বা কারা ভাইয়া? ওই সা’দি আর ওর লেডি বস!"
হাশিম অবাউনভাবেই হাহা করে হেসে উঠল। "আরে ইয়ার! তোমার আর সা’দির মধ্যে কোনো মেয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা চলছে নাকি?"
জওয়াহেরাত মুচকি হেসে নিজের মাথা নাড়ল এবং খুব নিপুণভাবে শেরুর মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করতে লাগল, যাকে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত দেখাচ্ছিল।
"শেরি... সোনিয়াকে কখন বাড়িতে নিয়ে আসবে?" জওয়াহেরাত তার দিকে তাকিয়ে হাশিমকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল।
নওশেরওয়াঁন এক ঝটকায় টেবিল থেকে একটা ফাইল তুলে নিয়ে পাতার দিকে চোখ বুলাল। তবে এই মুহূর্তে তার ঘাড়ের কাছে ভেসে ওঠা এবং পরক্ষণেই দমে যাওয়া শিরার কম্পনটুকু খুব স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছিল।
"এই সময়ে ওইসব কথার কী দরকার?" হাশিম যেন নাকের ডগা দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে কথাটি উড়িয়ে দিয়ে আবার নিজের কাজের দিকে মনোযোগ দিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
(Jo ranjishein thien jo dil mein ghubaar tha na gaya)
(মনের মাঝে যে মান-অভিমান আর ক্ষোভের ধুলোবালি জমে ছিল, তা আর দূর হলো না)
সেই মধ্যবিত্ত ধাঁচের সাধারণ বাংলো বাড়িটির লাউঞ্জের বড় জানালাটি বিকেলের রোদে চকচক করছিল। জানালার কাঁচটি যেন এক আয়নায় রূপ নিয়ে বাইরের লনের পুরো প্রতিচ্ছবি ভেতরে দেখাচ্ছিল।
জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরে তাকালে স্পষ্ট দেখা যেত—সে এক ক্লান্ত শরীর আর মন নিয়ে ঘরের ভেতর এসে প্রবেশ করছে। মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি কেটে নিজের সেই কোঁকড়ানো চুলগুলো সে একটি ক্লিপ দিয়ে আলতো করে বেঁধে রেখেছিল, যার একটি অবাধ্য গোছা কানের পাশ দিয়ে গালের ওপর দুলছিল। সে হাত দিয়ে ওটা কানের পেছনে গুঁজে রান্নাঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
"সাদাকাত! খাবার কি রেডি?"
"জি বাজি, এই তো জাস্ট রুটি সেঁকছি।"
"তাহলে খাওয়ার ঠিক পরপরই... সা’দির বাড়িতে যেতে হবে, একটা ছোট কাজ আছে।"
লাউঞ্জে বসে হুইলচেয়ারে (Wheelchair) থাকা বড় আব্বা নিজের বই থেকে চোখ তুলে অবচেতনভাবেই তার দিকে তাকালেন। সে ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে ড্রয়িংরুমের দিকে ফিরে আসছিল।
"আজকের দিনটা কেমন কাটল তোমার?" তিনি তার চিরচেনা চিরপরিচিত প্রশ্নটি করলেন।
"ওই তো রোজকার মতোই সাধারণ কিছু কাজ ছিল।" সে সোফায় বসে নিজের জুতোর স্ট্র্যাপ খুলতে খুলতে বলল।
"মহলের অবস্থা কেমন ছিল?"
"হাশিম কারদার তোমার ক্লায়েন্ট (Client) ছিল, দিন আর কেমন কাটবে?" আব্বার বইয়ের ওপর ঝুঁকে থাকা মুখের অবয়বে এক তীব্র অপছন্দের ভাব ফুটে উঠল।
"এই দুনিয়ার যত সব করাপ্ট আর অপরাধী মানুষ কেন সবসময় ওরই ক্লায়েন্ট হতে যায়?"
"সে একজন অত্যন্ত চতুর Defence Lawyer আব্বা! সে যেকোনো পাপ বা অপরাধের পেছনে একটা চমৎকার যুক্তি বা justification দাঁড় করাতে খুব ভালো করেই জানে।" সে নিজের জুতো জোড়া খুলে রেখে চুলগুলো আবার খোঁপা করে বাঁধতে লাগল।
"আমি ওনাকে প্রচণ্ড অপছন্দ করি। অত্যন্ত মিথ্যাবাদী আর এক ধূর্ত মনের মানুষ ও।"
"তা তো বটেই।" জুমার তার কথায় পূর্ণ সায় দিল।
বড় আব্বা হাতের বইটি একপাশে সরিয়ে রেখে তার মুখের দিকে তাকালেন।
"সা’দির কাছে তোমার আবার কী কাজ?"
"হাশিম ওর মেয়ের জন্মদিনের একটা কার্ড দিয়েছে সা’দির জন্য। ওটাই জাস্ট পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।" সে খুব সাধারণ ও হালকা চালে কথাটি বলে টেবিল থেকে রিমোট তুলে নিয়ে টিভির চ্যানেল বদলাতে লাগল।
"তাহলে তুমি নিজেই ওটা গিয়ে দিয়ে এসো।" তিনি হুট করেই এতটাই আশা আর কাকুতিভরা মিনতি নিয়ে কথাটি বললেন যে জুমার অবচেতনভাবেই তার দিকে ফিরে তাকাল।
"আমি না গেলেও কোনো ফারাক পড়ে না। আমি ওর ওপর বিন্দুমাত্র রাগ করে নেই আব্বা!"
"তাহলে তুমি নিজেই চলে যাও না। ওর বার্থডেতে না হয় নিজেই উইশ করে দিলে।"
জুমার ওনার চোখের দিকে তাকাল। সেই বৃদ্ধ চোখ দুটো যেন এক গভীর বিষাদে ডুবে ছিল। তার নিজের মনের ভেতরও কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
"সে তো ছোট। তুমি তো সম্পর্কে ওর বড় হও। যদি ওর তরফ থেকে কোনো ভুল বা বেয়াদবি হয়েও থাকে, তবে তুমি বড় হয়ে ওকে ক্ষমা করে দাও। তোমার ওই কঠিন অসুস্থতার দিনগুলোতে সে তোমার পাশে থাকতে পারেনি... এটা সত্যি ওর এক মস্ত বড় ভুল ছিল।"
"আমি ওকে অনেক আগেই মাফ করে দিয়েছি আব্বা। আমি ওর ব্যাপারে কোনোদিনও মনে কোনো খারাপ ভাব আনতেই পারি না। সে তো আমার নিজের ছেলের মতোই।"
"তাহলে কার্ডটা তুমি নিজেই ওকে গিয়ে দিয়ে এসো। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোনো ভরসা নেই। কে কখন এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়, আর অন্যজন সারাটা জীবন শুধু আফসোস আর অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকে।"
সে কোনো কথা না বলে নিজের আসন ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে চলে গেল। আব্বা অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আর হাতের বইটি তুলে নিলেন না। সে নিজের ঘরে যাওয়ার সময় রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে সাদাকাতকে উদ্দেশ্য করে বলে গেল,
"আমার জন্য কোনো রুটি বানিও না।" আর এতে ওনার মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। ওনার জানা ছিল যে এখন তার মুড পুরোপুরি বিগড়ে গেছে এবং সে রাতে আর কোনো খাবার না খেয়েই নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে।
দশ-পনেরো মিনিট পর সে নিজের পোশাক বদলে একদম ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বাইরে বের হতেই তিনি বেশ চমকে উঠে তার দিকে তাকালেন।
"খাবার খাবে না?"
"আপনার নাতি কি আমাকে এক লোকমা খাবারের কথাও জিজ্ঞেস করবে না?" খুব সাধারণ অথচ গম্ভীর গলায় কথাটি বলে সে টেবিল থেকে সেই ইনভিটেশন কার্ডগুলো তুলে নিজের কাঁধের পার্সের ভেতর পুরে নিল।
আব্বা যেখানে ছিলেন সেখানেই স্তব্ধ হয়ে রয়ে গেলেন। ওনার চোখের কোণে এক অদ্ভুত বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল এবং তার স্থান নিল এক মনোরম আনন্দময় ব্যাকুলতা—ঠিক যেমন মানুষ কোনো এক সুন্দর স্বপ্ন দেখার পর চোখ খোলার ভয়ে পুরোপুরি আনন্দও প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু পরক্ষণেই ওনার মুখটা কেমন যেন কালো হয়ে গেল।
"তুমি কি কোনোভাবে জানতে পেরেছ যে ফারিস আজ জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে?"
সে যেন এক শীতল দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার চৌকাঠের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
"আপনি যদি পরোক্ষভাবে এটি বলতে চান যে—আমি সা’দির কাছে এটি জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি যে ফারিস কীভাবে খালাস পেল, তবে আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি এতটাই Straightforward এক নারী যে আমার যদি ওকে কোনো বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে, তবে আমি চার মিনিটের একটা ডিরেক্ট কল করে কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি তা জিজ্ঞেস করে নিতে পারি। এই মুহূর্তে হাশিম আমার কাছে একটা ছোট favor চেয়েছে, আর আমি তাকে শুধু সেটাই ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি।" ঠিক একই রকম গাম্ভীর্যের সাথে কথাটি শেষ করে সে বাড়ির বাইরে পা বাড়াল।
এবার আব্বার পুরো মুখমণ্ডলে এক অনাবিল ও মনোরম
বিস্ময়ের আভা ফুটে উঠল। সদাকাতও রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েছিল এবং এখন ওনার মতোই অত্যন্ত চমৎকার ও আনন্দঘন অভিব্যক্তি নিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
(Yehi hai jabr yehi hai ikhtiyar ka mausam)
(এটাই নিয়তির নির্মম বাধ্যবাধকতা, এটাই নিজের স্বাধীনতার একমাত্র ঋতু)
হানিন এবং ওসামা ঠিক তখন থেকেই ফারিসের চারপাশ ঘিরে বসে ছিল, যখন থেকে সে জেলের বাইরে থেকে এই বাড়িতে এসে পা রেখেছে। সা’দি অত্যন্ত শান্তভাবে সেই গোল টেবিলের ওপাশে ওদের মুখোমুখি বসে ছিল।
"মামু...! ওরা কি আপনাকে আবার কখনো ধরে নিয়ে যাবে?"
হানিন মনের ভেতরের এক অজানা ভয়ের বশে বেশ আমতা আমতা করে প্রশ্নটি করল।
চুলের ফ্রেঞ্চ বেনি (French braid) আর কপালে ছোট করে ছাঁটা চুলের সাথে সে এখন নিজের সাধারণ ঘরের পোশাকেই সেজে ছিল।
ফারিস হালকা একটু মুচকি হাসল।
"না।" আর সেই সাথে সে সা’দির দিকে তাকাল।
সা’দিও মুখে এক নরম হাসি ফুটিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
"এখন থেকে আপনি আমাদের সাথেই থাকবেন তো?"
ওসামা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
"আমার জন্য ভালো হবে যদি আমি আমার নিজের বাড়ির তলাটা খুলে ওখানেই শিফট হই।"
"কেন ওদিকে যাবে? এখানেই আমাদের সাথেই থাকো না!"
নুদরাত কিছুটা অভিমানের সুরে কথাটি বলতে বলতে টেবিলের ওপর গরম গরম মটর-কিমার বাটিটি এনে রাখলেন; দুপুরের খাবার এই মাত্র টেবিলে সাজানো সম্পন্ন হয়েছিল।
"আমার অনেকগুলো কাজ করা বাকি আছে আপা! তবে আমি প্রায়ই আসব, দেখা করে যাব।" সে এক গম্ভীর ও ভাবলেশহীন শান্ত কণ্ঠে কথাটি বলছিল।
সে সাধারণত খুব ধীর লয়ে এবং ছোট ছোট বাক্যে কথা বলতে পছন্দ করত, কিন্তু রাগের পারদ চড়লে তার গলার আওয়াজ এক মুহূর্তে অনেক উচ্চে পৌঁছে যেত।
নুদরাত কেবল গরম গরম তাজা চিজ-চাপাতি এনে টেবিলে রাখতেই ফারিস হাত ধোয়ার জন্য বেসিন বাথরুমের দিকে উঠে গেল।
সে ততক্ষণে নিজের পরনের পোশাক বদলে নিয়েছিল। জিন্সের ওপর সাধারণ শার্ট এবং চুলগুলো ঠিক আগের মতোই পেছনে পনিটেল (Ponytail) করে আটকানো ছিল। সা’দি পেছন থেকে তাকে ডাকল।
"মামু! আপনার এই মুহূর্তে একটা ভালো Haircut এর প্রচণ্ড প্রয়োজন।"
"একদম না! মামুকে এই হেয়ার স্টাইলেই সবচেয়ে বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে।" হানিন তৎক্ষণাৎ সা’দির কথার বিরোধিতা করল। একই সাথে সে টেবিলের প্লেট থেকে শসা তুলে মুখে দিচ্ছিল। ওসামা এক ঝটকায় তার হাতটি সরিয়ে দিল।
সে চরম রেগে ওসামার দিকে তাকাল।
"কী সমস্যা তোমার?"
"এখনো লাঞ্চ শুরুই হয়নি, তুমি কেন আগে আগে খাচ্ছ?"
"আমি তো আর তোমার ভাগেরটা খাচ্ছি না! বেশি জ্ঞান দিতে এসো না তো, নইলে তোমার লেজ একদম বেঁধে রেখে দেব!"
"আমার কোনো লেজ নেই!" সেও চরম ক্ষোভে নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"ব্যাস!" সা’দি হুট করেই অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে ধমক দিল। "ব্যাস, আর একটা শব্দও নয়।" আর এতেই ওরা দুজনে একদম চুপ মেরে গেল।
"কতবার বলেছি নিজেরা নিজেদের মধ্যে ওভাবে ঝগড়া করবে না, কিন্তু তোমাদের কান পর্যন্ত তো কোনো কথাই পৌঁছায় না..."
নুদরাতের এই চিরচেনা কথাটুকু মাঝপথেই থেমে গেল বাইরের কলিং বেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজে। ফারিস ঠিক তখনই হাত ধুয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে আসছিল। ওসামা দ্রুত ছুটে গিয়ে প্রধান দরজার কাছে গেল এবং জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল।
"কে এসেছে ওসামা?" সা’দি নিজের জায়গায় বসেই জিজ্ঞেস করল, কিন্তু ওসামা কোনো জবাব দিল না; সে শুধু ওভাবেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"ওসামা! কে এসেছে বলো?" নুদরাত এবার একই প্রশ্ন পুনরায় করলেন। ফারিসও কৌতুহল নিয়ে দরজার দিকে তাকাতে লাগল। ওসামা খুব ধীর পায়ে ওদের দিকে ঘুরে তাকাল।
"ফুল নিয়ে এসেছেন।"
"কে?"
"ফুপ্পু... জুমার ফুপ্পু এসেছেন, আর সাথে ফুল নিয়ে এসেছেন।"
কয়েক মুহূর্তের জন্য সেই পুরো করিডোর ও লাউঞ্জে এক অদ্ভুত শ্মশানের নীরবতা নেমে এল; যেন সবার বুকের ভেতরের শ্বাস-প্রশ্বাসটুকুও এক নিমেষে থমকে গেছে।
নুদরাত প্লেট সাজানো অবস্থায় হাত গুটিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। হানিনের শসা তুলতে যাওয়া হাতটি মাঝপথেই জমে গেল এবং তার পুরো ফেসটি একদম ভাবলেশহীন হয়ে পড়ল। তবে সা’দি অত্যন্ত দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ফারিস একে একে সবার মুখের সেই থমথমে ভাবটুকু লক্ষ্য করল।
"সা'দি!" সে অবচেতনভাবেই তাকে মাঝরাস্তায় আটকে দিল।
"আমি আমার ঘরের ভেতরে আছি।" আর সেই সাথে সে চোখের ইশারায় তাকে বুঝিয়ে দিল—সে কোনোভাবেই জুমার সাথে দেখা করতে চায় না এবং তার এখানে আসার খবর যেন তাকে বিন্দুমাত্র দেওয়া না হয়। সা’দি পুরো বিষয়টি অনুধাবন করে আলতো করে মাথা নাড়ল।
প্রধান দরজাটি খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা জুমার মাথা তুলে তাকাল। নিজের সেই কোঁকড়ানো চুলগুলোর অর্ধেকটা ক্লিপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় সে এক ফ্যাকাসে ফেস নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার দুই হাতের বাহুর মাঝে জড়িয়ে ছিল এক তোড়া চমৎকার লিলি (Lily) ফুলের তোড়া। সে অনেক কষ্ট করে নিজের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার নাকের হিরের নাকফুলটি দূর থেকে চকমক করে উঠল, সাথে তার চোখ জোড়াও উজ্জ্বল দেখাল।
"শুভ জন্মদিন সা’দি!" সে ফুলের তোড়াটি তার দিকে বাড়িয়ে দিল। সা’দি তখনও এক ঘোর বা স্তব্ধতার মাঝে আটকে ছিল। কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই তার ঠোঁট জোড়া এক অনাবিল হাসিতে চওড়া হয়ে উঠল, চোখের মণি দুটোর গভীরে এক অতল বিস্ময় নেমে এল।
"Thank... Thank you ফুপ্পু। আসুন না, ভেতরে আসুন..." কোনো এক নিষ্পাপ শিশুর মতো আনন্দে আত্মহারা হয়ে সা’দি একপাশে সরে দাঁড়িয়ে তাকে ভেতরে আসার পথ করে দিল।
জুমার ঠোঁটের কোণের সেই কৃত্রিম হাসিটুকু এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে অত্যন্ত নরম অথচ এক দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে বাড়ির ভেতর পা বাড়াল। যে বাড়ির আঙিনায় সে দীর্ঘ চারটা বছর একটিবারের জন্যও পা রাখেনি, আজ সেখানে তার নিজের প্রতিটি কদম ফেলা যেন পাহাড়সম কঠিন মনে হচ্ছিল।
"জুমার! কেমন আছো তুমি?" নুদরাত এক পরম আনন্দের আতিশয্যে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ডাইনিং টেবিলের একটি চেয়ার টেনে তাকে বসার অনুরোধ করলেন।
জুমার এক মুহূর্তের জন্য সেই গোল টেবিলটির দিকে তাকাল, যেখানে লাঞ্চের সমস্ত খাবার সুন্দর করে সাজানো ছিল।
প্লেটগুলোও একদম গুনে গুনে রাখা ছিল—একটি ফ্যামিলি জাস্ট খাবার খেতেই বসছিল। সে আলতো করে মাথা নেড়ে বসার প্রস্তাব নাকচ করে দিল।
সা’দি আবারও জোর করল, "একটু বসুন ফুপ্পু, সামান্য কিছু মুখে দিন।" কিন্তু সে সেখানে বসল না।
"আমি বাসা থেকেই লাঞ্চ করে এসেছি।" তার কথার মাঝে এক শ্লীলতা, এক ভদ্রোচিত দূরত্ব আর দ্বিধার সংমিশ্রণ স্পষ্ট ছিল।
হানিনের চোখের ভেতরের অভিমান আর রাগ আরও বহুগুণ গভীর হলো। যাই হোক, সে নিজের আসন ছেড়ে উঠে পাশের লাউঞ্জ কাম ড্রয়িংরুমের দরজাটি খুলে দিল।
"কেমন আছো হানিন?"
হানিন যেন এই আচমকা প্রশ্নে কিছুটা ডিস্টার্ব হলো, তবে নিজেকে সামলে নিয়ে একদম ভাবলেশহীন মুখে বলল,
"ভালো।"
তারপর ভেতরের সোফার দিকে হাত উঁচিয়ে বলল,
"বসুন।"
জুমার ঠিক আগের মতোই এক ভদ্রোচিত দূরত্ব বজায় রেখে সোফার একদম কোণার অংশে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসল। ঠিক তখনই ওসামা এসে তার সাথে দেখা করল। এবার তার ফেসের ওপর যেন কিছুটা প্রাণখোলা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ওসামার গালে একটি স্নেহচুম্বন আঁকল, তারপর আলতো করে তার কপালের ওপর এসে পড়া কোঁকড়ানো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নরম সুরে বলল,
"কেমন আছো ওসামা?"
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা সা’দির হাসিমুখের গভীরে এক তীব্র যন্ত্রণার আভাস ফুটে উঠল।
তার চোখের মণি জোড়ায় এক চার বছর পুরোনো অতীত ছবি হুট করেই ঝলমল করে উঠল—
স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কোঁকড়ানো চুলের একটি ছোট ছেলে বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আর হাঁটু গেঁড়ে তার সামনে স্কুলের ড্রেস পরা একটি মেয়ে বসে আছে এবং নিজের হাত দিয়ে পরম স্নেহে তার চোখের জল মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করছে:
"কে মেরেছে তোমাকে? আমাকে নাম বলো। আমি এখনই গিয়ে তাকে দেখে নিচ্ছি! তার এত বড় সাহস কী করে হয় যে সে আমাদের ওসামার গায়ে হাত তোলে? এদিকে তাকাও, একদম কাঁদবে না। আমি আছি না তোমার সাথে—তোমার একমাত্র Support আর Protection হয়ে!" মেয়েটির গলার আওয়াজে তখন এক তীব্র ব্যাকুলতা আর ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছিল।
"আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?" ওসামার সেই লাজুক কণ্ঠস্বরের চোটেই সে এক ঝটকায় নিজের অতীত ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। সা’দি ততক্ষণে এসে তার সামনের একটি সোফায় বসে পড়েছিল এবং টেবিলের ওপর ফুলগুলো সাজিয়ে রেখে বলল:
"আপনার এখনো মনে আছে যে আমি লিলি ফুল কতটা পছন্দ করি!"
জুমার কেবল আলতো করে মাথা নোয়ালো, কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। নুদরাত আবারও খাবার খাওয়ার জন্য প্রচণ্ড জোরাজুরি করতে লাগলেন, কিন্তু অনেক অনুরোধের পর সে কেবল এক কাপ চায়ের জন্য রাজি হলো। হানিন সা’দির গা ঘেঁষে এসে বসল এবং একরাশ অভিযোগ ও অভিমানে ভরা দৃষ্টিতে ফুপ্পুর দিকে তাকিয়ে রইল, তবে মুখ ফুটে কোনো কথাই বলল না।
"আমাকে আসলে এই কার্ডটা দিতে হতো। হাশিম এটা পাঠিয়েছে, তোমার জন্য..." কথাটি বলতে বলতে সে পার্স থেকে সেই ইনভিটেশন কার্ডটি বের করে সা’দির দিকে বাড়িয়ে দিল।
সা’দি তো বটেই, তার চেয়েও অনেক বেশি চমকে উঠল হানিন। তার বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তে জোরে ধক করে উঠল।
"হাশিমের মেয়ের জন্মদিন। সে আমাকে প্রচণ্ড রিকোয়েস্ট করেছিল, তাই আমি তোমার তরফ থেকে পার্টিতে যাওয়ার সম্মতি দিয়ে এসেছি। আমার বিশ্বাস ছিল যে তোমরা সবাই সেখানে অবশ্যই যাবে।"
হানিন সা’দির কাঁধের ওপর দিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে সেই কার্ডটির দিকে তাকাতে লাগল। সা’দির মুখের অভিব্যক্তি অবশ্য আর আগের মতো স্বাভাবিক ছিল না। সে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে সেই কালো কার্ডের ওপর খোদাই করা সোনালি অক্ষরের লেখাগুলো এক নজরে পড়ে নিল। তারপর কার্ডটি হানিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
"হাশিম ভাইয়া আমাকে নিজের মেয়ের বার্থডে পার্টিতে কেন দেখতে চাইবেন ফুপ্পু?"
"তুমি সম্পর্কে ওর আত্মীয় হও, সা’দি।"
সা’দি এক ফিকে বা মলিন হাসি হাসল। "হাশিম ভাইয়ার মাথায় প্রতিটি কাজের পেছনে কোনো না কোনো বিশেষ এবং গভীর উদ্দেশ্য অবশ্যই লুকিয়ে থাকে। যাই হোক, আপনি ওনাকে আমার তরফ থেকে পরিষ্কার ‘না’ বলে দেবেন। আমরা সেখানে আসতে পারব না।"
কার্ডটি পড়তে থাকা হানিন অবচেতনভাবেই সা’দির দিকে তাকাল। তার মুখটা এক মুহূর্তে পুরোপুরি বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল।
"আমাদের নিজেদের ঘরেরই তো ব্যাপার সা’দি! আগেও তো তোমরা কতবার ওদের বাড়িতে গেছ, তবে এখন..."
"ফাংশনটা কি ওদের নিজেদের বাড়িতেই হচ্ছে?" সা’দি হুট করেই বেশ চটজলদি চতুরতার সাথে তার কথার মাঝপথে বাধা দিল এবং এক ঝটকায় হানিনের হাত থেকে কার্ডটি নিজের কাছে নিয়ে পুনরায় লাইনে চোখ বুলাল। তার চোখের ভেতরে হঠাৎ কিছু একটা চকমক করে উঠল, আর তার পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করে নিল।
"Okay, আমরা যাব।" সে একদম নরমাল ভাবে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল।
হানিন নিজের সমস্ত রাগ-অভিমান ভুলে গিয়ে আবারও খুশিতে সেই কার্ডের দিকে মনোযোগ দিল। ওসামাও এসে তার পাশে বসে পড়ল।
"Black and Gold থিম রাখা হয়েছে! তার মানে আমরা শুধু কালো অথবা সোনালি রঙের পোশাকই পরতে পারব।" সে বেশ আগ্রহ নিয়ে ওসামাকে বুঝিয়ে বলতে লাগল।
ঠিক তখনই তার নজর গেল সা’দির হাতের দিকে, যেখানে সে নিজের গাড়ির কি-চেইনটি (Key chain) আঙুলে নিয়ে ঘোরাচ্ছিল।
জুমারও সেই দিকে তাকাল এবং সা’দি নিজেও ঘাড় নিচু করে ওটার দিকে চেয়ে রইল।
দু-তিনটি সাধারণ চাবির সাথে সেই রিংয়ের মাঝে তিন ইঞ্চির একটি কৃত্রিম কালো ডায়মন্ডের (Diamond) মতো লকেট ঝুলছিল। সেটি প্রায় দুই ইঞ্চি পুরু ছিল এবং ওপরের দিকটা গোল আর নিচের দিকটা ছিল পুরোপুরি ত্রিকোণাকার। আসল হিরের মতোই সেটি চারপাশের আলোকে দারুণভাবে প্রতিফলিত করছিল। আর তার ওপর স্পষ্ট সোনালি অক্ষরে খোদাই করে লেখা ছিল:
Ants Everafter
"Hamesha k liye Chuntiyan
পিপীলিকা সদাসর্বদা
জুমার ঠোঁটের কোণে এক বিষাদমাখা মলিন হাসি ফুটে উঠল।
"তুমি এখনো সেই চিওনটিদের রূপকথার ওপর বিশ্বাস রাখো?"
"আমি ঠিক সেইসব জিনিসগুলোর জন্যই বেঁচে থাকি, যেগুলোর ওপর আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখি।" ঠিক একই রকম বিষণ্ণ হাসি নিয়ে সা’দি সেই কালো হিরেটির দিকে তাকিয়ে কথাটি বলল।
চা চলে এল, সাথে কটেজ চিজ কেক, কাবাব আর দু-একটি মুখরোচক স্ন্যাক্স। কিন্তু নুদরাতের শত অনুরোধ সত্ত্বেও জুমার প্লেটের খাবারে হাত দিল না; সে কেবল চায়ের কাপটি তুলে নিয়ে এক এক চুমুকে তা পান করতে লাগল।
"আচ্ছা সা’দি..... এই কারদারেরা আসলে ঠিক কী করে? ওদের আসল বিজনেসটা কীসের?" কার্ডের ওপর চোখ রেখেই হানিন কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল। তার দৃষ্টি তখন নিচে লেখা হাশিমের নাম এবং তার পাশের মোবাইল নম্বরের ওপর পুরোপুরি আটকে ছিল।
ঠিক তখনই এক ঝটকায় ঘরের কারেন্ট চলে গেল এবং প্রতিটি বৈদ্যুতিক আলো নিভে যাওয়ার এক চেনা নিঃশব্দ আওয়াজ কানে এল।
তার পরের মুহূর্তেই ইউপিএস (UPS) এর সাহায্যে ঘরের লাইটটি জ্বলে উঠল আর ছাদের ফ্যানটি এক বিকট গড়গড় শব্দ করে ঘুরতে শুরু করল।
সা’দি আলতো করে হেসে নিজের মাথা ঝাঁকাল। "ওনারা আসলে একটি Oil Cartel বা তেল সিন্ডিকেটের প্রধান।"
"Cartel কী জিনিস?" হানিন অবচেতনভাবেই জিজ্ঞেস করল। তারপর ফুপ্পুর সামনে নিজের এই সাধারণ জ্ঞানের অভাবের জন্য মনে মনে কিছুটা লজ্জিত হলো।
"বিষয়টা এভাবে বোঝো—ধরো বাজারে বার্গারের তিনটি দোকান আছে।" জুমার খুব নরম সুরে তাকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল। "তার মধ্যে দুটি দোকান একটি বার্গার বিক্রি করে ৫০ টাকায়, আর অন্য দোকানটি বিক্রি করে ৪০ টাকায়। তাহলে বল তো, কার দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হবে?"
"৪০ টাকার দোকানেই বেশি কাস্টমার যাবে।" হানিনের ঠোঁট থেকে উত্তরটি এক নিমেষে ফসকে বের হলো। সে ততক্ষণে ফুপ্পুর ওপর নিজের সমস্ত ক্ষোভ ভুলে ওনার কথায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিল।
"একদম ঠিক! কিন্তু কম দাম রাখার কারণে সেই ৪০ টাকার দোকানদারও দিনশেষে খুব বেশি প্রফিট বা মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে না, আর বাকি দুটি দোকান তো এমনিতেই লসে চলতে থাকবে। সো, তখন এই তিনজন দোকানদার মিলে যেটা করবে—তারা নিজেরা একত্রে একটি গ্রুপ বা একটি Cartel বানিয়ে নেবে এবং নিজেদের মধ্যে এটি ফিক্সড করে নেবে যে আজ থেকে আমাদের তিনটি দোকানেই বার্গার একটি নির্দিষ্ট দামেই বিক্রি হবে। এতে করে তিনজনই সমানভাবে ব্যবসা পাবে।"
"আর তারপর এই তিনজন মিলে যখন খুশি তখন এক রাতে বার্গারের দাম একসাথে বাড়িয়ে দিতে পারবে! মানুষের কাছে যেহেতু অন্য কোনো alternative option থাকবে না, তাই তারা চড়া দাম দিয়ে ওটা কিনতেই বাধ্য হবে।" সা’দি মুখে হাসি নিয়ে জুমার কথার সাথে বাকি অংশটুকু জুড়ে দিল।
"আর হাশিম ভাইয়া ঠিক এই কাজটিই করেন। সে দেশের সমস্ত বড় বড় অয়েল কোম্পানিগুলোর কার্টেলকে একহাতে লিড করে। আর এরা এই তেল দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে চড়া দামে সরাসরি গভর্মেন্ট বা সরকারের কাছে বিক্রি করে। আর যখনই ওদের মন চায়, ওরা এক রাতের ব্যবধানে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়! আর তারপর ঠিক এই জিনিসটাই ঘটে!"
সে নিজের চোখের ইশারায় ছাদের সেই ফ্যানটির দিকে ইঙ্গিত করল, যা এখন ইউপিএস-এর কম ভোল্টেজে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। জুমার এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিজের বুকের ভেতরে টেনে নিল।
"আমার অন্তত মনে হয় না যে দেশের এই Energy Crisis বা বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে কেবল এই অয়েল কোম্পানিগুলোই দায়ী।"
"এটি থর কোল প্রজেক্টের (Thar Coal Project) সাধারণ বিজ্ঞানীদের সাথে অয়েল কোম্পানির অহংকারী আর কোটিপতি এক্সিকিউটিভদের কোনো সাধারণ লড়াই নয় ফুপ্পু! এটি আসলে কয়লা আর তেলের মধ্যকার এক আদিম যুদ্ধ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হাশিম ভাইয়া এই পার্টিতে অবশ্যই সোনালি রঙের কোনো পোশাক পরবেন।
একটি ছোট্ট বাচ্চার বার্থডে পার্টিকে Black and Gold থিম দিয়ে ওনারা আসলে এই পুরো দুনিয়াকে নিজেদের সেই শক্তিশালী লোহার মতো স্নায়ু বা নার্ভ দেখাতে চান। কালো আর সোনালি—অর্থাৎ কয়লা আর তেল!"
সে অত্যন্ত নরম সুরে, প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে কথাগুলো বলছিল।
"Anyways... এবার তাহলে আমি আসি।" জুমার যেন ওদের এই সব কথার মাঝে আর কোনো প্রকার আগ্রহ খুঁজে পেল না। সে সোফা ছেড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিতে লাগল। হানিন হাতের কার্ডটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল, তার ফেসটি আবারও বিষণ্ণতায় কালো হয়ে গেল। সা’দি একদম চুপ মেরে গেল; তার মনে হলো তার এই অতিরিক্ত স্পষ্টবাদিতা হয়তো ফুপ্পুকে কোনোভাবে অসন্তুষ্ট বা রাগিয়ে দিয়েছে।
নুদরাত আরও কিছুক্ষণ বসে যাওয়ার জন্য প্রচণ্ড জোরাজুরি করতে লাগলেন, কিন্তু সে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে আগামী সপ্তাহে পার্টির দিন সবার সাথে বসে একদম ডিটেইলসে আড্ডা দেওয়া যাবে। সা’দি তাকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল। সে ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে দেখল হানিন একা লাউঞ্জের সোফায় চুপচাপ বসে আছে।
"দীর্ঘ চার বছর পর বাড়িতে এলেন, অথচ ৪০টা মিনিটও আমাদের সাথে বসতে পারলেন না!" সে একা একাই বিড়বিড় করে ক্ষোভ উগড়ে দিল।
"এভাবে ভাবে না হানিন!" সা’দি যেন বোনের এই কথায় নিজেই মনে মনে কিছুটা হার্ট হলো।
"কিন্তু আমি তো এভাবেই ভাবি ভাইয়া! আপনার মনটা অনেক বড়, আপনি সবকিছু খুব সহজে ভুলে যেতে পারেন; কিন্তু আমার সবকিছু খুব স্পষ্ট মনে আছে। ফুপ্পি আমাদের ঠিক তখন একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন, যখন আমাদের ওনাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
আমাদের মামু সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন, অথচ ফুপ্পু ওনাকে মনেপ্রাণে একজন খুনি বা অপরাধী বলে মেনে নিয়েছিলেন! আর ওনার সেই রাগের কারণেই আপনিও ওনার কোপানলে পড়েছিলেন। কিন্তু এই লড়াই বা শত্রুতা তো ছিল ফুপ্পু আর মামুর মধ্যে! আমি তো নিজের তরফ থেকে কোনো অপরাধ করিনি।
আমার কী দোষ ছিল? আমাকে কেন ওভাবে একা ছেড়ে চলে গেলেন?" বলতে বলতে তার দুই চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।
সা’দির নিজের বুকের ভেতরের মনটাও এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। "সে এই সবকিছুর মাঝে নিজের জীবনের অনেক বড় বড় জিনিস হারিয়ে ফেলেছে হানিন। ওনার স্বাস্থ্য, ওনার বৈবাহিক জীবন, ওনার নিজের পুরো লাইফটাই এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেছে।"
"তাহলে আমি কি নিজের জীবনে কিছুই হারাইনি? আমি তো আমার নিজের ফুপ্পুকে হারিয়েছি ভাইয়া! এই দীর্ঘ চার বছরে কত শত এমন দিন এসেছে, যখন আমার ওনার পাশে থাকাটা বিন্দুমাত্র প্রয়োজন ছিল।
ফুপ্পু তো আর মা বা বোন হয় না... সে তো এই দুই সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অন্য এক আবেগের নাম। আমার তো নিজের কোনো বোনও ছিল না! আমারও কত মন চাইত ওনার সাথে নিজের মনের হাজারটা কথা শেয়ার করি, ওনার কোলে মাথা রেখে নিজের গল্প শোনাই... ওনার কাছে আমার কথাগুলো বলি।
কিন্তু ওনার এখন আমাদের জন্য বিন্দুমাত্র কোনো কেয়ার বা পরোয়া নেই! ওনারা আমাদের ঠিক তখনই রিজেক্ট করে চলে গিয়েছিলেন, যখন আমাদের ওনাকে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। ইউ নো ওয়াট ভাইয়া? আমরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছি।
এখন আর আমাদের ওনার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আর সেই আগের ছোট হানিন নেই, যে ওনার চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে জানালার গ্রিল ধরে রাস্তার দিকে এক নজরে তাকিয়ে থাকত—এই আশায় যে হয়তো ফুপ্পু কোনো জিনিস ভুল করে ফেলে গেছেন, আর ওটা নিতেই আবারও ফিরে আসবেন! আমি এখন আর ওনাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবি না!"
সে এক ঝটকায় নিজের মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। সা’দি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কিছু একটা বলতে চাইল, তবে পরক্ষণেই কোনো কথা না বাড়িয়ে শান্ত পায়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে যখন করিডোরের মাঝপথে পৌঁছাল, তখন মনের এক অজানা তাড়নায় আবারও পেছনের পায়ে ফিরে এল এবং ড্রয়িংরুমের দরজার আড়াল থেকে আলতো করে ভেতরের লাউঞ্জের দিকে উঁকি দিল।
হানিন তখন জানালার পর্দাটা এক হাত দিয়ে সরিয়ে খুব ব্যাকুল হয়ে বাইরের ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল; দূর বহুদূর পর্যন্ত যেন সে কাউকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল—ঠিক যেন কেউ কোনো জিনিস ভুল করে ফেলে আবার এই বাড়িতে ফিরে আসার অপেক্ষায় সে আজও পথ চেয়ে বসে আছে!
সা’দির চোখের কোণে এক গভীর বিষাদ নেমে এল, তবে একই সাথে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নরম হাসিও ফুটে উঠল। সে নিঃশব্দে সেখান থেকে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরা সেই কালো আর সোনালি রঙের ইনভিটেশন কার্ডটির দিকে গভীর নজরে তাকাল।
এক পুরোনো অতীত দৃশ্য এক মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল—
একটি বিলাসবহুল হোটেলের লবি চারপাশের হলুদ ও সোনালি আলোর ছটায় ঝলমল করছে। চার-পাঁচজন দামী স্যুট পরা বিজনেস এক্সিকিউটিভ অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। তাদেরই মাঝে একজন ছিলেন হাশিম কারদার, যে অন্য এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কিছু একটা বলছিল।
হাশিমের ঠিক পেছনেই তার পার্সোনাল সেক্রেটারি দাঁড়িয়ে ছিল, যার একহাতে হাশিমের পার্সোনাল ল্যাপটপটি (Laptop) ধরা ছিল এবং হাতটি শরীরের পাশে ঝুলছিল। সেও অত্যন্ত বিনয়ী হাসির সাথে সামনে মিটিংয়ের জন্য আসা বাকি মেম্বারদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই দূর থেকে জিন্স-শার্ট পরা আর মাথায় পি-ক্যাপ (P-cap) টানা সা’দি মাথা নিচু করে হেঁটে আসছিল। সে অত্যন্ত সাধারণ ভঙ্গিতে সেই সেক্রেটারির গা ঘেঁষে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। সেক্রেটারি যথারীতি সামনের লোকেদের দিকেই মনোযোগ দিয়ে রাখল; সে বিন্দুমাত্র টের পেল না যে সেই ছেলেটি তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ল্যাপটপের সাইডের USB সকেটের মাঝে একটি পেনড্রাইভ বা ফ্ল্যাশ ড্রাইভ (Flash drive) পুশ করে দিয়ে গেছে!
সা’দি লবির কাছের একটি ফাঁকা টেবিল দেখে সেখানে গিয়ে বসল। কাঁধ থেকে নিজের ব্যাগটি নামাল। ভেতর থেকে একটি ট্যাব (Tablet) বের করল এবং স্ক্রিনের ওপর নিজের আঙুল দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দ্রুত প্রেস করতে লাগল।
ঠিক তখনই ট্যাবের স্ক্রিনের ওপর একটি পপ-আপ মেসেজ ভেসে উঠল:
"Your device has detected a hard drive. Would you like to copy all the data?"
সা’দি মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে স্ক্রিনের 'Yes' বাটনে প্রেস করল।
কিন্তু তার ঠিক পরের মুহূর্তেই তার মুখের সেই হাসি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপর লাল রঙের একটি ওয়ার্নিং মেসেজ বারবার ব্লিঙ্ক করছিল:
"Please Enter Password."
"ধুর ইয়ার! এটা হতেই পারে না..." সে এক চরম অসহায়তা নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল, যেখানে হাশিম আর বাকি লোকেরা তখনও নিজেদের মধ্যে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিল। তার মাথায় আগে কেন এটি এল না যে হাশিমের মতো একজন মানুষের ল্যাপটপে স্ট্রং পাসওয়ার্ড প্রটেকশন অবশ্যই দেওয়া থাকবে!
সে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজের সমস্ত জিনিসপত্র ব্যাগে গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মাথা নিচু করে পুনরায় ওদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হুট করেই সেক্রেটারির শরীরের সাথে হালকা ধাক্কা খেল। সে মুখে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটি ছোট
'Sorry' বলে দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে গেল।
হাশিম কেমন যেন একটু চমকে উঠে তার দিকে তাকাল এবং অনেক দূর পর্যন্ত এক গভীর ভাবুক দৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পথটির দিকে চেয়ে রইল।
চলে গেছে নাকি?" ফারিসের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরের চোটেই সা’দি নিজের পুরোনো অতীত স্মৃতির ঘোর থেকে এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এল। তার সামনে এখন ফারিস এসে দাঁড়িয়ে ছিল।
"হুম!" সে হাতের সেই কার্ডটি ফারিসের দিকে বাড়িয়ে দিল—যেন সে ফুপ্পুর এই বাড়িতে আসার আসল কারণটি তার সামনে স্পষ্ট করতে চাইল। ফারিস কার্ডটির দিকে এক নজরে অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভাবে তাকাল এবং তারপর শান্ত পায়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
হানিন আর ওসামাও ততক্ষণে নিজেদের মন সামলে ডাইনিং রুমে ফিরে এসেছিল। সামান্য একটু ঝড়-ঝাপটার পর এই ছোট্ট ফ্যামিলির জীবনটা যেন আবারও তার চিরচেনা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যেতে শুরু করল।
চলবে,,,,,,

Comments
Post a Comment