নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৪ পর্ব ১৬, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)

 



#নামাল-(Namal)

#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 
 
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 


অধ্যায়:০৪

পর্ব ১৬:-


Ab ehtiyaat ki koi soorat nahi rahi... qaatil se rasm-o-raah siwa kar chuke hain hum

[এখন আর সতর্ক থাকার কোনো উপায় নেই... খুনির সাথেই আমরা মেলামেশা বাড়িয়ে ফেলেছি।]

Leeds-এর ধূসর সকাল নিজের বুকে একরাশ আর্দ্রতা মেখে নেমে আসছিল। সারার রান্নাঘরের জানালা দিয়ে মেঘে ঢাকা আকাশটা একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সে চুলা থেকে সসপ্যান নামিয়ে গরম দুধ কাপে ঢালছিল। পেছনে একটা পিঁড়িতে জাকিয়া বেগম বসে ফল কেটে কেটে সাদির সামনে রাখছিলেন। সাদি যখন থেকে এসেছে, একদম চুপচাপ বসে ছিল।

“কতদিন পর এলে বলো তো! একবার নিজের চোখে একটু ঘুরে যাওয়াও কি সম্ভব হয় না? তাও ভালো, আমার ওয়ারিসকে নুদরাত আপার কাছে অভিযোগ করতে হলো যে সাদি কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না, তখন গিয়ে তোমার আসার সময় হলো। PhD কি আমি করছি নাকি তুমি?”

নিজের চিরচেনা সরল ভঙ্গিতে ভুরু কুঁচকে কথা বলতে বলতে সে এদিকে এগিয়ে এল। ট্রেটা টেবিলের ওপর রাখল। একে একে প্রতিটি মগে চামচ দিয়ে নাড়ল। তারপর সবার সামনে মগগুলো এনে রাখল। জাকিয়া বেগম মগটা তোলার সময় গভীর দৃষ্টিতে সাদির দিকে তাকালেন।

“আজ সাদি এসেই মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করেনি।”

সে চমকে উঠে নিজেকে সামলে নিল। সামান্য হেসে বলল, “না তো, আমি এমনিই...”

“ঠিকই তো আম্মু! আজ ওকে খুব মনমরা লাগছে। কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলো।” নিজের কাপটা নিয়ে সামনে বসতে বসতে সে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে জিজ্ঞেস করতে লাগল। সাদি কিছুটা লজ্জিত বোধ করল।

“আসলে... সমস্যাটা আমার নয়। আমার এক বন্ধু আছে, তার সমস্যাটা দিন দিন বেশ জটিল হয়ে উঠছে।”

“Okay।” সারা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে কাপে চুমুক দিল।

“ওই ছেলেটার আম্মু ভীষণ possessive আর caring। ও এখানে এসেছেও এই কারণে যে ওর আম্মু ওকে আমার সঙ্গে রাখতে চেয়েছিলেন, যাতে আমি ওর খেয়াল রাখি আর ওর ওপর নজরও রাখি। ও আগে drugs-এর ওপর চলে গিয়েছিল।”

“ওহ... তা ও কি drugs ছেড়ে দিয়েছে?” জাকিয়া বেগম কিছুটা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। সাদির মুখে একরাশ অসহায়ত্ব ফুটে উঠল।

“এটাই তো সমস্যা। আমার আর ওর subject আলাদা, department-ও আলাদা। মাঝেসাঝে দেখা হয়। ওর আম্মুর প্রতিটা mail-এর জবাবে আমি ‘সব ঠিক আছে’ লিখে report দিতাম। কিন্তু সম্প্রতি কিছু দেশি ছেলের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে ও আবারও drugs নিতে শুরু করেছে। হয়তো কোনো মেয়ে ওকে ছেড়ে চলে গেছে। একটা তো সমস্যা, ওর আবার প্রতি মাসেই কাঁচা পিরিত উথলে ওঠে!” শেষমেশ সে বেশ বিরক্ত হয়ে বলে উঠল। জাকিয়া বেগম আর সারাহ হেসে ফেললেন।

“সেদিন ও গাড়িটা কোথাও ঠুকে দিয়েছে। জরিমানাও হয়েছে, মানে চালান কেটেছে। ভাগ্যিস ওই সময় ও drugs-এর ঘোরে ছিল না, নইলে পুরো ব্যাপারটা আরও বিগড়ে যেত। ওর আম্মু এই কথা জানেন না। এখন আমি কী করব? বন্ধুর নামে অভিযোগ করব, নাকি তার দোষ লুকিয়ে রাখব?”

“দেখো সাদি!” সারা কাপটা রেখে বেশ গুরুত্ব দিয়ে ওর দিকে তাকাল। “একজন মা হিসেবে আমার অধিকার আছে যে আমি আমার সন্তানের প্রতিটা কাজের report পাব। যদি তুমি ওর ভালো বন্ধু হও, তবে ওর মাকে অবশ্যই জানাও, যাতে উনি ওকে শুধরে নিতে পারেন। ওর জায়গায় যদি সায়াম এটা করত, তবে তুমিও তো এটাই চাইতে যে তোমার আম্মুকে যেন খবর দেওয়া হয়। তাই না?”

সাদি ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। তারপর সে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পেরেছিল।

“সারা একদম ঠিক বলছে। ওর মাকে জানাও, যাতে উনি দুটো কড়া কথা শুনিয়ে ওকে সোজা করতে পারেন।” জাকিয়া বেগমের ভেতরের মাতৃত্ব পুরোপুরি জেগে উঠেছিল। সাদি হেসে কাপ তুলে নিয়ে বিষয়টা বদলে ফেলল। “ধন্যবাদ আপনাদের দুজনকে। ওয়ারিস মামু ভালো আছেন? আপনাদের program-এর আর মাত্র এক বছর বাকি আছে না?”

“মাত্র? পুরো একটা বছর বাকি আছে!” সারা চুমুক দিতে দিতে কিছুটা মন খারাপ করে হাসল। “আর তারপর আমরা অবশেষে একটা family হব আর ফ্যামিলির মতোই একসঙ্গে থাকব। এই পড়াশোনাগুলো আমাদের জীবনটা একদম তছনছ করে দিল।”

“সত্যিই!” জাকিয়া বেগমও সারার দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিষণ্ন মুখে হাসলেন। মাত্র এক বছর... পুরো একটা বছর বাকি ছিল।

সাদি মুচকি হেসে চুমুক দিতে লাগল।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Humein ne rok liya panja-e-junoon warna,,,

 humein aseer ye kotah-kamand kya karte


[আমরা নিজেরাই পাগলামির হাতকে থামিয়ে রেখেছি, নইলে এই ছোট ফাঁদ কি আর আমাদের বন্দি করতে পারত!]»

লাউঞ্জের বিশাল জানালার পাশে জওয়াহেরাত দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে ছিল গভীর চিন্তা, আর শক্ত করে ধরে রাখা মোবাইলে সাদির পাঠানো একদম তাজা mail-টা খোলা ছিল। মোবাইলটা সে এতক্ষণ ধরে ওভাবে ধরে রেখেছিল যে স্ক্রিনটা হাতের ঘামে ভিজে উঠেছিল।

মেরি আপাদমস্তক ধীর পায়ে হেঁটে তার কাছে এল। বেশ বিনীত স্বরে ডেকে বলল, “Mrs. Kardar! আপনার সব packing শেষ হয়ে গেছে। রাতের জন্য Leeds-এর flight-ও book করে দেওয়া হয়েছে আর Mrs. Shehrin বলেছেন যে উনিও সঙ্গে যাবেন।”

জওয়াহেরাত ভুরু উঁচিয়ে “হুম” বলে ইশারা করতেই সে সেখান থেকে সরে গেল। ঠিক তখনই আওরঙ্গজেবকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে দেখা গেল। পায়ের আওয়াজ পেয়েও জওয়াহেরাত আগের মতোই বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না তিনি পেছনের একটা সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসলেন।

“হঠাৎ করেই তুমি ইংল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফেললে?”

“আমি শেরুকে খুব miss করছিলাম, আর এই উসিলায় শেহরিন আর সোনিয়ারও মনটা একটু হালকা হবে। হাশিমের কাছে তো এত সময় থাকে না।”

“তার মানে তুমি এটাকে একটা পুরোদস্তুর family trip-এর রূপ দিয়েছ। Very good! আর আমার documents?” তিনি নিজের রাগ খুব কষ্ট করে চেপে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন। জওয়াহেরাত না ঘুরেই সামান্য কাঁধ ঝাঁকাল।

“আমি কি গত দুই দিনে বেশ কয়েকবার বলিনি যে আমার laptop-টা নষ্ট হয়ে গেছে? তাই এই মুহূর্তে ওগুলো recover করা সম্ভব নয়, আর না ওগুলোর draft তৈরি করা যাবে।”

“আর যেহেতু তুমি দেশের বাইরে যাচ্ছ, তাই এক মাসের জন্য এই কাজটা স্থগিত হয়ে গেল। ততদিনে তো আমার মামলার শুনানির তারিখও পার হয়ে যাবে, আর এর সবচেয়ে বড় সুবিধা তো তোমারই হবে।”

এই তীব্র ব্যঙ্গাত্মক সুরের পরও জওয়াহেরাত একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই খাওয়ার ভেতরে প্রবেশ করল। স্যুট পরা, সুবিন্যস্ত গোঁফওয়ালা এই লোকটির বয়স ছিল প্রায় চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের মতো।

“ জি স্যার! আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”

“জি, আসুন।”

“আসুন খাওয়ার সাহেব! আর একটু বুঝিয়ে বলুন তো, আপনার মতো একজন expert আমার স্ত্রীর একটা laptop কেন ঠিক করতে পারল না?”

খাওয়ার মুহূর্তের জন্য জওয়াহেরাতের দিকে তাকাল, তারপর আওরঙ্গজেবের দিকে। দুজন কর্তার অধীনে থাকা এক মস্ত বড় আজাব।

“স্যার! আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু সমস্যাটা আমার বোধগম্য নয়। আপনি যদি বলেন, তবে কোনো professional-এর কাছে নিয়ে যাব? নাকি অফিস থেকে কাউকে...”

জওয়াহেরাত দ্রুত তার দিকে ঘুরল।

“আমার laptop-এ আমাদের কোম্পানির কত শত গোপনীয় documents আছে, ধারণা আছে তোমার? আমি কীভাবে ওটা অন্য কারো হাতে তুলে দিতে পারি?”

“আমার স্ত্রীর এটাই ভুল ধারণা যে আমি অন্য কাউকে laptop দিতে পারি না, অথচ আমি তা পারি। Mary!” তিনি দুজনের ওপর এক তীব্র রাগান্বিত দৃষ্টি ফেলে মেরিকে ডাকলেন। জওয়াহেরাত বেশ অস্থির হয়ে খাওয়ারের দিকে তাকাল আর খাওয়ার কিছুটা চিন্তিত মুখে আওরঙ্গজেবের দিকে চাইল। তাদের দুজনেরই ধারণা ছিল যে আওরঙ্গজেব এমনটা করবেন না, কিন্তু...কিন্তু স্যার,,,

মেরি কিছু বলতে যাওয়ামাত্রই আওরঙ্গজেব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। মেরি সামনে এলে তিনি তাকে শুধু ইশারায় নির্দেশ করলেন। তাকে আগে থেকেই সব জানিয়ে রাখা হয়েছিল, তাই সে মাথা নিচু করে বাইরে চলে গেল।

জওয়াহেরাত যেন রাগে জ্বলতে জ্বলতে আবার জানালার বাইরে তাকাতে লাগল। তার পুরো মুখে তীব্র অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল। এই মানুষটি সত্যিই অসহ্য ছিল। ভীষণ রকম অসহ্য।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

Dilbari thehra zabaan-e-khalq khulwanay ka naam... 

ab nahi laitay pari-roo zulf bikhranay ka naam

[মন হরণ করা এখন মানুষের মুখে মুখে চর্চিত হওয়ার নামান্তর... সেই পরীর মতো রূপসীরা এখন আর চুল এলিয়ে দেওয়ার নামও নেয় না।]

অ্যানেক্সির ভেতরে ছোটখাটো একটা লিভিং রুম ছিল, যেখানে টিভি চলছিল আর সামনে বসা হানিন ঘনঘন চ্যানেল পাল্টাচ্ছিল। সে কপালের ওপর কিছু চুল ছেড়ে বাকিটা পনিটেল করে বেঁধে রেখেছিল আর তাকে বেশ অধৈর্য দেখাচ্ছিল। নুদরাত আর ফারিস চুপচাপ বসে ছিলেন।

“তুমি কি আওরঙ্গজেব আঙ্কেলের ওখানে যাবে না? উনি তো তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন,” নুদরাত তাকে উদ্দেশ করে বললেন।

“ওদের কাজের মেয়েটি আমাদের আসতে দেখে ফেলেছিল। যখন ডাকার দরকার হবে, উনি নিজেই ডেকে নেবেন।”

“আচ্ছা, একটু উঠে আমাদের জন্য চা তো বানিয়ে দাও। কোনো কাজই করো না তুমি।”

“আম্মু! আপনারা সোজাসুজি বলে দিন না যে—‘হানিন, তুমি একটু বাইরে যাও, আমাদের কিছু জরুরি কথা আছে’, তাহলেই তো আমি চলে যাই।” সে রিমোটটা রেখে মুখ কালো করে উঠে দাঁড়াল। ফারিস চুপচাপ তা দেখতে লাগল।

“এখন আবার কোথায় যাচ্ছ?” নুদরাত আবারও ডাকলেন।

“ওয়ারিস মামুর কাছে। উনি একটা কল ধরতে বাইরে গিয়েছিলেন, ওখানেই রয়ে গেলেন।” সে সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল এবং দরজাটা সামান্য খোলা রেখে দিল। তারপর দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কান পেতে ভেতরের কথা শোনার চেষ্টা করতে লাগল। তার চোখে তখন দুষ্টুমি আর ঠোঁটে হাসির রেখা।

“জি, কী বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলেন আপনি?” ফারিসের কণ্ঠস্বর একদম পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।

“আসলে ফারিস, সেলিম ভাই উনার মেয়ে জারতাশার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতে একটা কথা পেড়েছেন। তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তবে আমি কি কথা চালানো শুরু করব?” তিনি ফারিসের পাশে গিয়ে বসলেন এবং বেশ আশা নিয়ে তার হাঁটুর ওপর হাত রেখে বলতে লাগলেন।

“আমাদের পরিবারে কি জারতাশাই একমাত্র মেয়ে?” সে বেশ বিরক্তি নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।

“আচ্ছা, তুমিই বলো। তুমি যেখানে বলবে, আমি সেখানেই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে যাব।”

হানিন দরজার দিকে মুখ ঝুঁকিয়ে, ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে সব শুনছিল।

ফারিস কয়েক মুহূর্ত নুদরাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

“আপনার ননদ... উনারও তো এখনো কোথাও বিয়ে হয়নি,” সে বেশ অনায়াস ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল। নুদরাত চমকে উঠলেন। তারপর ওনার চোখে একধরনের স্বস্তি ও খুশি ভেসে উঠল।

“হ্যাঁ, ওরও...” তারপর তিনি থেমে গেলেন। চোখের সেই উজ্জ্বলতা যেন দপ করে নিভে গেল। ফারিস গভীর মনোযোগ দিয়ে ওনার মুখের ভাব লক্ষ্য করল।

“আমি কি তার যোগ্য নই, নাকি সে আমার যোগ্য নয়?”

“না, আসলে আমার শাশুড়ি... উনি এত সহজে রাজি হবেন না।”

“রাজি না হলে না হবেন। আপনি শুধু একবার কথা বলে দেখুন না।” ফারিসের মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা কঠোর হয়ে উঠল। নুদরাত জলদি পরিস্থিতি সামাল দিলেন।

“না, আমি আমার পুরো চেষ্টা করব। ও খুব ভালো মেয়ে। এমনটা হলে তো খুবই ভালো হয়। আজকাল ওর জন্য আরও একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আমি তাহলে এই সপ্তাহেই গিয়ে কথা বলব।”

আর বাইরে বুকের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা হানিন তখন একাধারে অবাক, খুশি আর চরম উত্তেজনা—এককথায় সব ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কেউ একজন তার কান ধরে অন্যদিকে টান দিল। সে অপ্রস্তুত হয়ে ঘুরে তাকাল। ওয়ারিস সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

“মামু! আমি তো আপনার দিকেই আসছিলাম।”

“কিন্তু আমি ভাবলাম যে... আড়ি পেতে কথা শোনাতেও কোনো ক্ষতি নেই,” সে হানিনের বাক্যটি সম্পূর্ণ করল। হানিন তখনও নিজের কান ডলছিল, সে বেশ বিরক্ত হয়ে ওনার দিকে তাকাল।

“আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? এই গরমে কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।”

“সে গাড়িটা সরিয়ে নিজেরটা সামনে রাখছিল।” সে ফারিসের গাড়ির দিকে ইশারা করল। হানিনের কান ডলা হাতটা হঠাৎ থমকে গেল। চোখে কিছু একটা চকচক করে উঠল। সে ওয়ারিসের হাত থেকে চাবিটা ছিনিয়ে নিয়ে গাড়ির দিকে দৌড়াল। চট করে দরজা খুলে সামনের সিটে বসল এবং ড্যাশবোর্ডের ড্রয়ারটা ওলটপালট করতে লাগল। ওয়ারিস বেশ অবাক হয়ে সেদিকে এগিয়ে এল।

“কী করছ তুমি?”

“যখন মামু আমাদের pick করতে এসেছিলেন, তখন... আমাকে দেখে জলদি করে কিছু একটা এটার ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। পেয়ে গেছি! এই তো পেয়ে গেছি।” একটা কালো মখমলের কৌটা হাতে নিয়ে হানিন বিজয়ের হাসিতে ওনার দিকে তাকাল আর বেশ উৎসুক হয়ে কৌটাটা খুলল।

“Oh God! কৌটাটা বন্ধ করে ওখানেই রেখে দাও নূরা। এগুলো ফারিসের personal জিনিস।”

“আরে একটু দেখতে তো দিন।” ওয়ারিস হাত বাড়িয়ে কৌটাটা নিতে চাইলেন, কিন্তু সে হাতটা দূরে সরিয়ে নিল। কৌটাটা ততক্ষণে খুলে গিয়েছিল এবং সে যেখানে কোনো কানের দুল বা আংটি আশা করছিল, সেখানে নিজেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

কালো মখমলের ওপর হিরের একটা ছোট্ট নাকফুল জলজল করছিল—একেবারে মুগ ডালের দানার মতো ছোট।

“ওটা রেখে দাও বলছি।” দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়ারিস এবার বেশ কঠোর গলায় বলতেই সে কৌটাটা বন্ধ করে সাবধানে আগের জায়গায় রেখে দিল। তারপর নিজেও গাড়ি থেকে নেমে এল। তার মুখে এক চিলতে হাসি, চোখে এক অদ্ভুত চকমকানি।

“ওটা একটা nose pin ছিল।”

“ফারিস হয়তো কারো জন্য কিনেছে। এখন ওটা নিয়ে আর ঘাটাঘাটি কোরো না।”

“হুম... আমি খুব ভালো করেই জানি ওটা কার জন্য। আমার ফুপ্পু নাকে নাকফুল পরেন।”

ওয়ারিসের চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এদিক-ওদিক তাকাল।

“তোমার বুদ্ধি-শুদ্ধি কোথায় গেছে? দ্বিতীয়বার এই কথা আর মুখেও আনবে না।”

“কেন? আমি আবার কী বললাম?”

“আমার কথা মন দিয়ে শোনো,” সে বেশ গম্ভীর হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল। “আমিও জানি যে তোমার ফুপ্পু নাকে নাকফুল পরেন। আর আমি এটাও জানি যে তুমি ভেতর থেকে কী শুনে আসছ। ফারিস প্রথম পরামর্শ আমার সাথেই করেছিল। এই বিষয়গুলো, হানিন! আমাদের পরিবারে সহজে মেনে নেওয়া হয় না। দেড়-দুই বছর আগে পর্যন্ত সে ওনার student-ও ছিল। সে যদি তখন এই নিয়ে কোনো কথা না বলে থাকে, তবে এই কারণেই যাতে পরিবারের কেউ বলতে না পারে যে তাদের মধ্যে কোনো affair ছিল। আর এই জিনিসটা...” সে কড়া চোখে ড্যাশবোর্ডের দিকে ইশারা করল। “এটা কারো সামনে ভুলেও মুখে আনবে না। নুদরাত আপার সামনেও নয়।”

“আচ্ছা!” হানিন মুখ কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। তার পুরো রোমাঞ্চটার ওপর এই অতি-সতর্ক মামু একদম জল ঢেলে দিয়েছিলেন। ঠিক তখনই মেরিকে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। হানিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“কারদার সাহেব আপনাকে ডাকছেন।”

হানিন মাথা নেড়ে যেতে উদ্যত হতেই ওয়ারিস গাড়ি লক করে সামনে এগিয়ে এল। “দাঁড়াও! একা যেয়ো না। আমিও সাথে আসছি।”

তার মুখে একরাশ কঠোরতা দানা বেঁধে উঠেছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

(Is raah mein jo sab par guzarti hai wo guzri... 

tanha pas-e-zindaan kabhi ruswa sar-e-bazaar)

[এই পথে সবার ওপর যা যা ঘটে, তা-ই ঘটেছে... কখনো কারাগারের আড়ালে একাকীত্ব, তো কখনো ভরা বাজারে লাঞ্ছনা।]

হাশিমের ঘরের জানালাটি ছিল অ্যানেক্সির দিকে। তাই সেখান থেকে এই দৃশ্যটি একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। হাশিম তাদের ওপর এক নজর বুলিয়ে পেছনে ফিরল। সামনে বিছানার ওপর একটা খোলা ব্যাগ রাখা ছিল আর শেহরিন আলমারি থেকে এক এক করে হ্যাঙ্গার বের করে স্তূপ করছিল। সে জোড়া ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কিছুদিন ধরে তোমার ইংল্যান্ড যাওয়ার চক্করটা একটু বেশিই বেড়ে যায়নি?”

হ্যাঙ্গার থেকে শার্ট নামাতে নামাতে শেহরিনের হাত দুটো থমকে গেল। তারপর সে ওটা টেনে-হিঁচড়ে নামাল। ভাঁজ করে ব্যাগের ভেতর রাখল আর নিজের সোনালি চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“Mrs. Kardar আমাকে offer করেছিলেন, আর ওখানে আমার খালাও থাকেন। ভালোই হলো, এই উসিলায় ওনার সাথেও দেখা হয়ে যাবে। তোমার কাছে যদি সময় থাকত, তবে আমরা একটা family-র মতো একসাথে যেতাম।”

“কোনো ব্যাপার না। তুমি হয়তো আমাকে ছাড়াই ওখানে বেশি ভালো থাকো।” সে কিছুটা তিক্ততা নিয়ে চোখ সরু করে তাকে কাপড় গোছাতে দেখতে লাগল।

“তুমি কি ঝগড়া করার মেজাজে আছ?” সে বেশ বিরক্তি নিয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা কৌটা তুলে সেটার ভেতর জিনিসপত্র ভরতে লাগল।

“ঝগড়া করে কোনো লাভ নেই। ওখানে গিয়েও তুমি আমার মেয়েকে কাজের লোকেদের ভরসায় ছেড়ে দেবে। ওর জ্বর গত সপ্তাহে সবে ঠিক হয়েছে, কিন্তু তোমার কাছে না এখানে ওর জন্য সময় আছে, আর না ওখানে থাকবে।”

“তুমি নিজে সময় দেওয়া শুরু করো, আমি তোমাকে follow করব।” সে এক এক করে লিপস্টিকগুলো তুলে কৌটায় রাখছিল। হাশিম তীব্র বিরক্তি নিয়ে মাথা ঝেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

করিডোরের অন্য প্রান্তে একটা ঘরের দরজা অর্ধেক খোলা ছিল। ওটা ছিল nursery আর ভেতরে একটা খাটের পাশে একজন আয়া দাঁড়িয়ে ছিল। হাশিমের চোখে এক বুক আফসোস ভেসে উঠল। নিজের ঘরের দিকে শেষবারের মতো এক নজর তাকিয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।

সিঁড়ির মাঝপথে সে থমকে গেল। ভুরু দুটো কুঁচকে এল। তারপর দ্রুত পায়ে শেষ ধাপ পর্যন্ত নেমে এল।

“তোমার ভাই গত বছর আমার সাথে দেখা করেছিল। বলছিল, যখনই কম্পিউটার নষ্ট হয়, সে নাকি তোমাকে ফোন করে।” আওরঙ্গজেব সোফায় আরাম করে বসে কথাগুলো বলছিলেন। সামনের সোফার কোণায় হানিনও বসে ছিল এবং সে বারবার কখনো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়ারিসকে দেখছিল, তো কখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাগে জ্বলতে থাকা জওয়াহেরাতকে।

“ভাইয়া কম্পিউটারের কাজে খুব একটা ভালো নয়, তাই...” সে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল। তারপর আবারও জওয়াহেরাতের দিকে তাকাল। জওয়াহেরাত তখন বুকের ওপর হাত বেঁধে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকেই দেখে যাচ্ছিল। সাধারণ পরিস্থিতিতে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী থাকা হানিনও এবার কিছুটা ঘাবড়ে যাচ্ছিল। হাশিম খুব কষ্ট করে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

“এই laptop-টা,” আওরঙ্গজেব টেবিলের দিকে নির্দেশ করলেন। “চলছে না। এমনিতে তো আমি যে কাউকেই ডেকে নিতে পারতাম, কিন্তু ভাবলাম আজ তোমার একটা পরীক্ষা নেওয়া যাক।”

হানিন একবার ওয়ারিসের দিকে তাকাল, যার দিকে আওরঙ্গজেব দ্বিতীয়বার চোখ তুলেও তাকাননি। তারপর সে ল্যাপটপটা তুলে নিজের কোলে রাখল। ওটা খুলে power on করল। এখন সে সচেতনভাবেই জওয়াহেরাতের দিকে না তাকানোর চেষ্টা করছিল।

স্ক্রিনের ওপর কিছু লেখা ভেসে উঠছিল। হানিন কয়েকটা কি চাপল। তারপর চোখ তুলতেই দেখল, শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা হাশিমও তাকেই দেখছে—একেবারে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায়, চরম উদগ্রীব হয়ে।

কারদার পরিবারের এই সদস্যদের মুখের তেজ সহ্য করা বেশ কঠিন ছিল। সে মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিল। আরও কয়েকটা বাটন চাপতেই system চালু হয়ে গেল।

“মনে হচ্ছে এটা অন হয়ে গেছে। তাহলে হানিন, এটাতে আসলে কী সমস্যা ছিল?” আওরঙ্গজেব এক বাঁকা হাসি নিয়ে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। হানিন মুখ তুলল, হাশিমের সাথে চোখাচোখি হলো। হাশিম আলতো করে মাথা নেড়ে ইশারা করল—“না, নেতিবাচক কিছু বলো না।”

সে আওরঙ্গজেবের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল, সে আসলে একটা পারিবারিক যুদ্ধের মাঝখানে ফেঁসে গেছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে সে... এক মিনিট। সে সাধারণ কেউ ছিল না। সে ছিল হানিন। সে নিজের ঘাড় সোজা করল। ল্যাপটপটা ওনাদের দিকে ঘুরিয়ে টেবিলের ওপর রাখল এবং একদম সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“এটাতে কোনো সমস্যাই ছিল না। startup-এর সমস্যাটা পুরোপুরি নিজে থেকে তৈরি করা হয়েছিল। হয়তো আপনি বা অন্য কেউ...” সে বেশ নিষ্পাপ চোখে জওয়াহেরাতের দিকে তাকাল। “...ওর সাথে কোনো দুষ্টুমি করেছিলেন।” এবার ঘাড় ঘুরিয়ে আওরঙ্গজেবের দিকে তাকিয়ে হাসল। তিনিও মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে হালকা হাসলেন। হাশিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল—“এই বাচ্চারাও না!”

“আমি এই favor-টা মনে রাখব,” আওরঙ্গজেব বেশ জোরালো গলায় বললেন। হানিন আর ওয়ারিস যাওয়ার জন্য ঘুরল।

“তোমরা কি রাতের খাবার খেয়ে যাবে না?” জওয়াহেরাত কিছুটা হেসে শীতল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন।

“না, আমরা তাড়ায় আছি।” ওয়ারিস তাকে ইশারা করল।

“অনেক দিন হলো তুমি আমাকে মুভির কোনো তালিকা পাঠাওনি?” আওরঙ্গজেব সেই চেনা গম্ভীর আর ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন। হয়তো ওনার সবচেয়ে নরম সুর এটাই ছিল। হানিন বেশ উদাসীনভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।

“আমি এখন আর সিনেমা দেখি না। দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়, আর তারপর মনে হয় ঠিক একই রকম আরও সিনেমা দেখি, কিন্তু তেমন ভালো সিনেমা আর পাওয়া যায় না। So, আমি এখন আমেরিকান TV shows দেখি। লম্বা লম্বা season, বারবার দেখার আনন্দ!”

এটাই ছিল শেষ কথা যা সে বলল। তারপর খোদা হাফেজ জানিয়ে দুজনে বাইরে বেরিয়ে এল। দরজা বন্ধ করার সময় ওয়ারিস হানিনের দিকে এক নীরব অথচ গভীর দৃষ্টি অবশ্যই দিয়েছিল।

“আমি তোমাকে একটা উপদেশ দেব। কারদারদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখো। এরা ভালো মানুষ নয়।” দুজনে যখন সবুজ লন পার হচ্ছিল, তখন সে কথাটি বলল। হানিন বেশ অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকাল।

“আমি তো গত দুই বছর ধরে ওনাদের বাড়িতেও আসিনি। আওরঙ্গজেব আঙ্কেলকে শেষ mail-টা বোধহয় এক বছর আগে করেছিলাম। ওনারাই তো প্রতি মাসে basket পাঠান।”

“তাহলে তুমি এটাও জানো না ওনাদের ব্যবসাটা কী?”

“Basket?” এই প্রশ্নে হানিন প্রাণখুলে হেসে উঠল।

“হাশিম ভাইয়ার ছোট মেয়েটা যখন জন্মেছিল, তখন থেকে প্রতি মাসের ছয় তারিখে চকলেট আর bridal sweets দিয়ে ভরা একটা basket সব আত্মীয়দের বাড়িতে যায়। যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া—ভাই, সোনিয়া এখন এত মাসের হলো, এখন অত মাসের হলো! যতক্ষণ না ওর দুই বছর বয়স হচ্ছে, এটা চলতেই থাকবে। বড়লোকদের আদিখ্যেতা আর কী!”

দুজনে কথা বলতে বলতে আরও দূরে এগিয়ে যাচ্ছিল।

হাশিম জানালা দিয়ে ওনাদের চলে যেতে দেখছিল। তার চোখে গভীর চিন্তা ছিল, কিন্তু তখনই বাবার গলার আওয়াজ তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।

“হাশিম! আমাকে draft-টা বের করে দাও, যাতে আমি papers তৈরি করতে পারি। আর এই কাজটা তোমার ওই অবিশ্বস্ত মা চলে যাওয়ার আগেই শেষ হওয়া চাই।”

হাশিমের ভুরু কুঁচকে গেল। সে খাওয়ারকে চলে যাওয়ার ইশারা করল। সে চলে গেলে হাশিম সামনে এগিয়ে এল—সোফায় বসে থাকা বাবার ঠিক মুখোমুখি।

“কাজের লোকেদের সামনে আমার মাকে এভাবে অপমান করবেন না।”

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। এক রাগান্বিত দৃষ্টি হাশিমের ওপর আর অন্যটি জওয়াহেরাতের ওপর ফেললেন, যার টানটান হয়ে থাকা স্নায়ুগুলো এতক্ষণে কিছুটা শিথিল হয়েছিল।

“যা বলেছি তা-ই করো, আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না।” তিনি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ওনার ঘরের দরজা বন্ধ হতেই জওয়াহেরাত দ্রুত হাশিমের কাছাকাছি এলেন।

“তুমি কি দেখলে, ও সবসময় কেমন করে কাজের লোকেদের সামনে...”

“আমার সামনে আমার বাবার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবেন না।” জওয়াহেরাত থমকে গেলেন। তিনি একনাগাড়ে হাশিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাশিমকে তখন ভীষণ রাগান্বিত দেখাচ্ছিল।

“ভবিষ্যতে আপনি ওনার সাথে কোনো মিথ্যাচার করবেন না। জমি বিক্রি করতে না পারলে আমাকে জানাবেন। হাশিম সব ধরনের সমস্যা handle করতে পারে। নিজে থেকে এমন বোকার মতো পদক্ষেপ নিতে যাবেন না।”

জওয়াহেরাত তার দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। হাশিম একপাশ দিয়ে হনহন করে বাইরে চলে গেল।

বারান্দার উঁচু স্তম্ভগুলোর পাশে খাওয়ার বেশ সতর্ক ও বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। হাশিম বেশ ক্ষোভ নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“তুমি আমার মায়ের জন্য কাজ করো না। আমার বাবার জন্যও কাজ করো না। তুমি স্রেফ আমার জন্য কাজ করো। ভবিষ্যতে ওনাদের এমন কোনো আদেশ মানবে না, যা ওনাদের মধ্যকার ঝগড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি কি আবারও বলব, নাকি তুমি বুঝে গেছ?” খাওয়ার মাথা নিচু করল।

“Sorry sir! আসলে মিস্টার কারদার আমাকে হুমকি দিয়েছিলেন... Okay, আমি এখন থেকে সাবধানে থাকব।”

হাশিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। এখান থেকে অ্যানেক্সি দেখা যাচ্ছিল না, ওটা পেছনের দিকে ছিল। কিন্তু তার মনে হলো, সে এমন কিছু একটা দেখছে, যা সচরাচর দেখা যায় না।

“এই লোকটি... ফারিসের ভাই ওয়ারিস গাজী, ওর ওপর কড়া নজর রাখো খাওয়ার! ফোন ট্যাপ করো, অফিস bug করো, যা করার করো। আমি শুনেছি, সে পেট্রোলিয়াম আমদানির ডিলিংসের একটা রিপোর্ট তৈরি করছে। আপাতদৃষ্টিতে ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু এই মাত্র সে যেভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল... বুঝেছ তো?” সে খাওয়ারের কাঁধে হাত চাপড়ে জিজ্ঞেস করল। খাওয়ার সায় দিয়ে মাথা নাড়ল।

“Good!” হাশিম পেছনের দিকে ঘুরে চলে গেল আর কারদার প্রাসাদের ওপর নেমে আসা নীলচে সন্ধ্যা আস্তে আস্তে নিকষ কালো অন্ধকারে রূপ নিতে লাগল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

Farishta mujh ko kehnay se meri tahqeer hoti hai... 

main masjood-e-malaik hoon, mujhe insaan rehnay do

[আমাকে ফেরেশতা বললে আমার অবমাননা করা হয়... আমি তো সেই যাকে ফেরেশতারা সেজদা করেছিল, আমাকে মানুষই থাকতে দাও।]

জুলফিকার ইউসুফের বাড়ির লিভিং রুমটা আজ একটু বেশিই প্রাণবন্ত লাগছিল। জুমার আজ রাতে ওদের ওখানেই থাকার জন্য এসেছিলেন। নুদরাত বেশ খুশি মনে স্টোররুম থেকে পরিষ্কার তোয়ালে আর লেপ-কম্বল বের করছিলেন। তবে হানিন কিছুটা মনমরা হয়ে জুমারের সামনের সোফাটায় পা তুলে বসে ছিল। জুমার বেশ কয়েকবার গভীর চোখে তার দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে রইলেন।

হানিনের মুখটা স্কুল থেকে আসার পর থেকেই এমন থমথমে হয়ে ছিল। যে বিষয়টাকে সে এতদিন ধরে পাত্তা না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, আজ সেটাই ভীষণ এক ভয়ানক রূপ নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ক্লাসের সেই অহংকারী, অভদ্র আর ফাঁকিবাজ সহপাঠী সাবরিনা জাভেদের মা ইয়াসমিন জাভেদ—যিনি আবার ওই স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল—আজ হানিনকে নিজের অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

“তুমি নবম শ্রেণিতে বোর্ডে top করেছিলে হানিন! কারণ তোমার notes নাকি খুব চমৎকার হয়।”

“জি... ম্যাম!” সে বেশ সতর্ক চোখে ওনার মুখের দিকে তাকাল। তিনি চেয়ারে অত্যন্ত দম্ভ আর গাম্ভীর্যের সাথে বসে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

“আর সাবরিনা বেশ কিছুদিন ধরে তোমার কাছে notes চাচ্ছে। তুমি তাকে notes তো দাওইনি, এমনকি তার practical notebook-টাও বানিয়ে দাওনি।”

“হুম! ওই notes আমি lecture চলার সময় নিজে তৈরি করি। আর ইংরেজি চিঠি বা রচনার প্রস্তুতি আমি যেসব বই থেকে নিই, সেগুলো আমার ভাইয়া আর ফুপ্পুর পুরোনো বই। ওগুলো আমি কীভাবে অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারি? আর আমি কেনই-বা তাকে notebook বানিয়ে দেব?”

“তুমি তো জানো নিশ্চয়ই, নবম শ্রেণির বোর্ডে top করাটা তখনই কাজে আসবে, যখন তুমি দশম শ্রেণিতেও top করবে। দুটো মিলিয়েই তো final result আসবে, তাই না? So, তুমি সাবরিনাকে সাহায্য করো। যদি না করো, তবে একটা কথা মাথায় রেখো—ভাইস প্রিন্সিপাল চাইলে তোমার board exam-এর admission আটকে দিতে পারেন, আবার এমন মন্তব্য লিখে স্কুল থেকে rusticate করতে পারেন, যাতে আগামী তিন বছর কোনো স্কুল তোমাকে admission দিতে রাজি না হয়। Monday-র মধ্যে সাবরিনার notebook তৈরি হয়ে যাওয়া চাই। তুমি এখন যেতে পারো।”

আর সে এক বুক অসহায়ত্ব, ক্ষোভ এবং অজানা আশঙ্কায় ডুবে বাড়ি ফিরে এসেছিল এবং তখন থেকেই ওভাবে ঝিম মেরে বসে আছে।

“আম্মু! আমার সেই লিন্ডা বাজারের বাদামি জুতো জোড়া পাচ্ছি না।” সায়াম ফুপ্পুর উপস্থিতিতে নিজের নতুন কেনা জুতো দেখানোর জন্য বড্ড তাড়াহুড়ো করছিল, তাই বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘর থেকে চেঁচিয়ে ডাকছিল। হানিন চমকে উঠল। তারপর উঠে ভেতরের ঘরে গেল, যেখানে সায়াম আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে ছিল, আর সে তাকে জোরে একটা চিমটি কাটল।

“কতবার আম্মু বলেছে, ওটাকে লিন্ডা বাজার বলবে না, L Shop বলবে!”

সায়াম তার দিকে তাকাল। তারপর আবারও গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল, “আম্মু! আম্মু! আমার ওই L Shop-এর জুতো জোড়া পাচ্ছি না, ওই যে লিন্ডা বাজার থেকে যেটা নিয়েছিলাম!”

“উফ!” সে বিরক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। জুমার খুব কষ্ট করে নিজের হাসি চেপে বসে ছিলেন। হানিন একটা ফ্যাকাশে হাসি দিল।

“বাইরে বেশ বাতাস ছাড়ছে। চলো, ওপরের terrace-এ গিয়ে বসি।” জুমার উঠে দাঁড়ালেন। সায়াম জুতো খুঁজে পেয়েই তড়িঘড়ি বাইরে চলে এল আর চোখ কপালে তুলে বেশ অবাক হয়ে বলল—

“ফুপ্পু! এই সময়ে বাইরে যাবেন না একদম। আমাদের বাগানের গাছটা একদম terrace পর্যন্ত চলে গেছে। ওখানে জীন থাকে!”

জুমার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। জীন-ভূত নিয়ে গল্প শোনানোর মতো অভিজ্ঞতা দুনিয়ার প্রতিটা মানুষেরই কমবেশি থাকে।

“আর জানেন ফুপ্পু! আমার বন্ধুর বাড়ির কাছে একটা কবরস্থান আছে, যেখানে...” সায়াম বেশ উত্তেজনা নিয়ে বলতে শুরু করল। সে এখন এমন এক বয়সে পা দিয়েছে, যখন বাচ্চারা স্কুল থেকে ফিরে সারাক্ষণ ‘আমার শিক্ষিকা’ আর ‘আমার বন্ধু’-দের বাণী শোনাতে ব্যস্ত থাকে। জুমার আলতো করে তার কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিলেন।

“আমি তোমাকে এর চেয়েও চমৎকার একটা গল্প শোনাব। তবে আগে ওপরে চলো।” সায়ামের সেই ভয়কে পাত্তা না দিয়ে তারা সবাই ছাদে চলে এল। হানিনও মনমরা হয়ে তাদের পেছনে পেছনে এল।

ওপরের তলাটা অন্য একটা পরিবার ভাড়া নিয়ে থাকত। তবে terrace-এর দিকে যাওয়ার জন্য বাইরে একটা লোহার সিঁড়ি ছিল আর ওখানটায় মাঝেমধ্যে বাড়ির সবাই গিয়ে বসত। বাগানের গাছটা terrace-এর একটা অংশে বেশ ঘন ছায়া তৈরি করে রেখেছিল। তারা গাছ থেকে কিছুটা দূরে মাঝখানে রাখা চেয়ারগুলোতে গিয়ে বসল।

“তা হলে ওসামা ইউসুফ খান জীনকে ভয় পায়?” সায়ামকে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে পাশে বসিয়ে তিনি আড়চোখে সামনে বসা হানিনকে লক্ষ্য করে কথাটা বললেন। সায়াম কিছুটা ইতস্তত করে মাথা নাড়ল।

“ওগুলো... অনেক scary হয় না?”

“আর এটা তো তুমি জানোই যে মানুষ জীন আর ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ অনেক বেশি noble।”

“আমি জানি।” সে ইসলামিয়াত বইতে পড়েছিল—আশরাফুল মাখলুকাত।

“মানুষ সবচেয়ে বেশি noble এই কারণেই যে, আমরা এমন অনেক কিছু করতে পারি, যা জীনরা করতে পারে না।”

“জীনরা তো গায়েব হয়ে যেতে পারে ফুপ্পু!”

“হ্যাঁ পারে! কিন্তু আমাদের লুকিয়ে থাকার জন্য গায়েব হওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। আমরা খুব সহজেই নিজের মনের কষ্ট আর ভয় অন্য সবার থেকে আড়াল করে নিজেকে একদম স্বাভাবিক দেখাতে পারি।” জুমার আড়চোখে তাকালেন। হানিন কিছুটা চমকে উঠল।

“কিন্তু ওরা তো উড়তেও পারে!” সায়ামের আবার জীনদের এমন অবমাননা সহ্য হচ্ছিল না।

“আর আমাদের ওপরে ওঠার জন্য ডানা বা পায়ের প্রয়োজন হয় না। আমাদের চরিত্রই আমাদের উঁচুতে নিয়ে যায়। আমরা অনেক বেশি শক্তিশালী, কারণ আমরা বিপদের দিনে নিজের পরিবারের হাত শক্ত করে ধরে রাখি।”

“কিন্তু...” সায়াম সামান্যক্ষণ গাছটার দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল। সে পুরো ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, আর জুমারও তাকে জোর করে কিছু বোঝাচ্ছিলেন না।

“আমি তোমার বন্ধুর চেয়েও অনেক সুন্দর একটা জীনের গল্প শোনাই তোমাকে,” তিনি সায়ামের চুলে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন। হানিনও কিছুটা এগিয়ে এসে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।

“শতাব্দী ধরে জীনরা আকাশে ঘুরে বেড়াত আর ফেরেশতাদের কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনত। তারপর একদিন হঠাৎ তারা আকাশে যাওয়ার চেষ্টা করতেই দেখল, সেখানে কড়া পাহারা। তারা যখনই কান পাততে গেল, অমনি তাদের ওপর আগুনের ফুলকি ঝরে পড়তে লাগল। তারা তখন জানত না যে তাদের পালনকর্তা মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ নির্ধারণ করেছেন, নাকি অকল্যাণ। তাই তারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল এটা জানার জন্য যে, আসলে এমন কী অলৌকিক ঘটনা ঘটছে, যার জন্য আকাশে এত পাহারা বসানো হয়েছে।”

কথাটা বলতে বলতে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশটা তখন অন্ধকার ছিল। চাঁদ না থাকলেও অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছিল—বেশ রহস্যময়, শান্ত আর গভীর।

“খুঁজতে খুঁজতে তাদের একটা দল নাখলা উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে রসূলুল্লাহ (সা.) নিজের সাহাবিদের নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ছিলেন আর তখন কুরআন নাজিল হচ্ছিল। নামাজের সেই কুরআন যখন তারা শুনল, তখন তাদের মন পুরোপুরি বদলে গেল। তারা তখনই নিজের জাতি আর নিজের পরিবারের কাছে ফিরে গেল এবং বলল যে—আমরা এক চমৎকার কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথ দেখায়। So সায়াম ইউসুফ, তোমার বন্ধুর বন্ধু যা-ই বলুক না কেন, আমি তো কুরআনে জীনদের কথা খুব সুন্দরভাবে উল্লেখ থাকতে দেখেছি। আমার কাছে তো ওদের বেশ noble মনে হয়েছে। তারা সত্যটা জানার পর তা লুকিয়ে রাখেনি, বরং নিজের লোকেদের কাছে গিয়ে সত্য পৌঁছে দিয়েছে। এটা তো মানুষের মতোই এক মহৎ গুণ, তাই না? সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। এখন বলো, তুমি কি এখনও জীনকে ভয় পাও?”

সায়াম, যে একদম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল, প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠল। সে সামান্য কাঁধ ঝাঁকাল।

“না... একদম না।”

“জীনদের ভয় পেয়ো না সায়াম! এটম বোম না ওরা বানিয়েছিল, আর না ওরা ফেলেছিল।” মানুষই আসলে বেশি বিপজ্জনক হয়।”

হানিন একনাগাড়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সব শুনছিল। জুমার এবার সায়ামকে নিচ থেকে কিছু একটা নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সে চলে যেতেই তিনি হানিনের দিকে ঘুরলেন।

“এবার সেই সময় চলে এসেছে হানিন, যখন তোমার ভয় পাওয়া বন্ধ করতে হবে। মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে গেলে সাহসী হতে হয়,” তিনি বেশ মৃদু হেসে বললেন। অন্ধকার রাত, ঘন গাছ, terrace-এর এই নির্জনতা—হানিনের সব সংশয় আর ভয় যেন ওনার চোখের সেই নরম চাউনিতে মিলিয়ে গেল। জুমার নিজে থেকে তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করবেন না, এটা নিশ্চিত ছিল। তিনি শুধু কথা বলার মতো একটা ভরসা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার অন্যজনের ওপর ছেড়ে দেন।

হানিন উঠে এসে সায়ামের জায়গায় ওনার একদম কাছাকাছি বসল। এবার মাথা নিচু করে নিজের আঙুল মটকানো শুরু করল, কথা বলতে চাইল কিন্তু শব্দ যেন গলায় আটকে গেল। জুমার গভীর মনোযোগ দিয়ে তার ঝুঁকে থাকা মুখটা দেখলেন।

“আমি একটা ভীষণ আত্মবিশ্বাসী মেয়েকে চিনি, যে যেকোনো কথার চটজলদি জবাব দিয়ে সবাইকে হাসিয়ে তোলে। আজ কি সে বাড়িতে নেই? আমি আসার পর থেকে তাকে তো দেখিনি।”

হানিন হালকা হাসল। মুখ তুলল, কিন্তু হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখে একরাশ অস্থিরতা ফুটে উঠল।

“আলিশা বলে—আমার আমেরিকান বন্ধু—যে সমস্যার দুটো সমাধান থাকে। হয় নিজের ভেতর সাহস খোঁজো, না হয় নিজের চেয়ে বেশি সাহসী কাউকে খুঁজে নাও।”

“আর...?”

“আমার ক্লাসমেট সাবরিনা...” প্রথম পদক্ষেপটা নেওয়াই আসলে কঠিন হয়, তারপর পরের ধাপগুলো মানুষ নিজের অজান্তেই পার করে ফেলে, যেন বছরের পর বছর ধরে এটাই তার অভ্যাস। হানিন এক এক করে ভাইস প্রিন্সিপালের বলা সব কথা ওনাকে খুলে বলল।

সবটা শুনে জুমার বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন, “প্রথম কথা হলো, তোমাকে স্কুলে bully করা হচ্ছে। আসলে এটা একটা harassment আর এটা একটা অপরাধ। হানিন! জীবনে কখনো অন্যায়ের সামনে চুপ থাকবে না, okay?”

হানিন সাথে সাথে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল।

“দ্বিতীয় কথা হলো, এই সমস্যাটা আমি মাত্র দুই দিনের মধ্যে solve করে দিতে পারি। আমার কাছে এমন একটা plan আছে, যার পর ওই শিক্ষিকা দ্বিতীয়বার তোমাকে হুমকি দেওয়ার সাহস পাবেন না।”

“সত্যিই?” হানিনের চোখে এক নিমেষে বিস্ময়, আনন্দ আর সব ধরনের ইতিবাচক অনুভূতি চকচক করে উঠল।

“হ্যাঁ, তুমি শুধু দেখে যাও আমি কী করি।”

হানিনের মুখটা যেন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শব্দ যেমন দুনিয়া তৈরি করতে পারে, তেমনই শব্দ দুনিয়া তছনছও করে দিতে পারে। স্রেফ কয়েকটা শব্দই তাকে এতটা আশ্বস্ত করে দিল। সে বেশ শান্ত হয়ে বসল। তারপর চট করে সোজা হয়ে বলল—

“Oh! আম্মু তো ফ্রিজে trifle বানিয়ে রেখেছিলেন। চলুন নিচে যাই, নইলে ওই মোটা আলুটা সব একাই সাবাড় করে দেবে।”

জুমার হালকা হাসলেন, কিন্তু তিনি নিচে গেলেন না। তিনি হানিনের নিচে চলে যাওয়ার অপেক্ষা করলেন। সে চলে যেতেই ওনার মুখের সেই শান্ত ভাবটা উধাও হয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল এক গভীর চিন্তামগ্নতা। তিনি নিজের মোবাইলটা বের করলেন। contact list-এ ওপর-নিচ করে একটা নম্বরে গিয়ে থামলেন।

ফোনের চতুর্থ রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ করা হলো।

“ফারিস! আমি আপনাকে disturb করলাম না তো?”

সে তখন gym থেকে ফিরছিল, তার শ্বাস তখনও দ্রুত চলছিল। “না ম্যাম! বলুন।”

“আমার এক বান্ধবীর একটা case আছে। বিপক্ষ হচ্ছে একটা স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল,” অন্ধকার রাতে প্রায় ফিসফিসানি স্বরে তিনি বলতে লাগলেন। “আর ওই ভদ্রমহিলা সহজে বাগে আসছেন না। So, উনাকে handle করার মতো কোনো plan আছে আপনার কাছে?”

জুমার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিচ থেকে হানিন আর সায়ামের আবারও কোনো একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করার আওয়াজ আসছিল। তারা ওনার কথা শোনার সীমানার বাইরে ছিল।

“না। কিন্তু আমি যদি এই কথা এখনই আমার ওই বান্ধবীকে বলতাম, তবে সে দ্বিতীয়বার কোনো সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসত না। সত্যি বলতে, আমি নিজেও জানি না আমার কী করা উচিত।”

“Okay। আপনি ওই ভদ্রমহিলার কোনো নম্বর বা ঠিকানা আমাকে দিন। আমি উনার একটা background file তৈরি করে আপনাকে পাঠিয়ে দেব। উনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মতো কিছু না কিছু তো অবশ্যই পাওয়া যাবে।”

“Thank you so much ফারিস! ব্যস, এটা যেন শুধু আমাদের মধ্যেই থাকে।”

“ঠিক আছে! আর কোনো সমস্যা?” সে সামান্য থামল। কিন্তু জুমার আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। এখন ওনার কিছুটা স্বস্তি লাগছিল।

“বেচারা পুরোনো ছাত্ররা কত সম্মান করে! কাশ ম্যাডাম ইয়াসমিনও যদি জানতেন, কীভাবে সম্মান আদায় করতে হয়।” সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তিনি ভাবলেন।



চলবে,,,,,,,,,


Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)