নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৫ পর্ব ১৯, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


 

#নামাল-(Namal)

#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 
 
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 


অধ্যায়:০৫

পর্ব ১৯:-


Ae gulaab... tum bimaar ho... naadeeda keera jo raat mein udta hai... baraste toofaan mein... usne dhoond liya hai tumhaara bister... surkh lutf ka... aur uske gehre khufia ishq ne... barbaad kar di hai... tumhaari zindagi

[ওহে গোলাপ! তুমি অসুস্থ। এক অদৃশ্য কীট, যা রাতের আঁধারে ডানা মেলে... প্রবল ঝড়-তুফানের রাতে, সে খুঁজে নিয়েছে তোমার শয্যা... রক্তিম আনন্দের শয্যা। আর তার সেই গভীর, গোপন ভালোবাসা... তছনছ করে দিয়েছে তোমার জীবন।]

— উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা The Sick Rose থেকে
--------------------------------------

বর্তমান সময় থেকে চার বছর আগে

(ওয়ারিস গাজীর হত্যাকাণ্ডের ঠিক তিন দিন আগে)

বুষয়:- অসুস্থতায় ও সুস্থতায়

​জুলফিকার ইউসুফের বাড়ির ছোট্ট রান্নাঘরটাতে একটা দুষ্টুমিভরা নীরবতা ছড়িয়ে ছিল। কাউন্টারের ওপর দুটো ডিশ রাখা—একটা খালি, আর অন্যটায় সদ্য বেক করা একটা কেক, যার লেয়ারগুলো কেটে ভেতরে নিখুঁতভাবে ক্রিম ভরা হয়েছে। এখন কেকটাকে অন্য একটা পরিষ্কার ডিশে স্থানান্তর করতে হবে। সাদি নিচের ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে হানিনের দিকে তাকাল, যে নিজের হাতা গুটিয়ে কেকটার দিকে হাত বাড়াচ্ছিল আর বারবার ভয়ে হাত সরিয়ে নিচ্ছিল।

​“আমি ওটায় তুলে দিই, হানা?”

​“খবরদার! এটা ভীষণ নরম। ভেঙে যাবে। আপনি এতে হাতও ছোঁবেন না,” সে রাগ দেখিয়ে বলল।

​“একটু আঙুল দিই?” সাদি নিজের আঙুলটা কেকের দিকে বাড়াল। হানিন সজোরে তার আঙুলে থাপ্পড় মেরে হাতটা সরিয়ে দিল।

​“আমি আপনাকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেব বলে দিচ্ছি! ফুপ্পুর বিয়েতে তখন প্লাস্টার বেঁধে ঘুরতে হবে।”

ইদানীং হানিনের প্রতিটা কথাতেই দুই সপ্তাহ পর হতে যাওয়া ফুপ্পুর বিয়ের প্রসঙ্গটা কোনো না কোনোভাবে চলে আসত।

​“সবসময় যা তা মুখে এনো না তো!” নুদরাত ওকে চোখ রাঙিয়ে রান্নার খুন্তিটা দেখালেন। সাদি প্রাণখুলে হেসে উঠল।

​“দেখেছ হেনা! আম্মু এখনো আমাদের বিরুদ্ধে এই খুন্তি, জুতো আর বেলন ছাড়া অন্য কোনো আধুনিক অস্ত্র খুঁজে পেলেন না?”

​নুদরাত না চাইলেও হেসে ফেললেন এবং চুলার দিকে ঘুরে গেলেন। হানিনের কেকটা তখনো ওভাবেই পড়ে ছিল এবং সে ভয়ভয় হাতটা ওটার দিকে বাড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল।

​নুদরাত সাদিকে ডাকলেন, আর সাদি হানিনের দিকে তাকাল। তারপর চোখের আন্দাজে দরজা থেকে ওর দূরত্বটা মেপে নিয়ে বলল, “তুমি কাছে আছ, তুমিই গিয়ে ধরো।”

আর এটা তো তাদের বাড়ির এক অলিখিত নিয়ম ছিল—যে কাজের সবচেয়ে কাছে থাকবে, দায়িত্বটা তারই। হানিন মুখে একটা “উঁহু” শব্দ করে লাউঞ্জে গেল এবং খুব দ্রুতই ফিরে এল। এসে আবার নিজের হাতা দুটো গুটিয়ে নিল।

​“জারতাশা আন্টির ফোন ছিল।”

নিজের থেকে মাত্র দশ-এগারো বছরের বড় জারতাশকে ‘আন্টি’ বলাটা অদ্ভুত লাগলেও গত পাঁচ মাস ধরে বলতে বলতে সে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

​“কী বলছিল ও?” নুদরাত প্রশ্ন করতেই হানিন সেটাকে এড়িয়ে গেল। সে আলতো করে চিমটেটা দিয়ে কেকের নিচে হাত ঢোকাল, ওটাকে সাবধানে তুলল এবং খুব আলতো করে অন্য ডিশে বসিয়ে দিল। তারপর একটা স্বস্তির “হাশ” ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সাদি তখনো মুচকি হাসছিল।

​“উনি জিজ্ঞেস করছিলেন, আমরা পরশু সোনিয়ার জন্মদিনের পার্টিতে যাচ্ছি কি না।”

​“সোনিয়ার জন্মদিন বছরে কতবার আসে?” সাদি অবাক হলো। “আমার জন্মদিনের ঠিক ছয় দিন পর ওর জন্মদিন, অথচ ওটা তো দুই মাস আগেই চলে গেছে!”

​“কিন্তু দুই মাস আগে হাশিম ভাই বাইরে গিয়েছিলেন, ওই যে মানালিতে। তারপর ফিরে এসে এখানে অনুষ্ঠান করার সময় এখন পেলেন। জারতাশা আন্টিই বললেন। তবে হ্যাঁ, আমি কিন্তু যাচ্ছি না।”

​নুদরাত তরকারিতে চামচ নাড়তে নাড়তে অবাক হয়ে ঘুরে ওর দিকে তাকালেন, যে নিজের কেকের ওপর অত্যন্ত আনাড়ির মতো ক্রিম ছড়াচ্ছিল।

(কবে যে এই মেয়েটার একটু গুছিয়ে কাজ করা অভ্যাস হবে!)

​“কেন যাবে না?”

​“অমন বড়লোকদের দাওয়াতে গিয়ে কী লাভ, যদি ওরা ভেতরে ক্যামেরা বা মোবাইলই নিয়ে যেতে না দেয়? মানুষ একটু ছবিও তুলতে পারবে না!”

​“এটা কোনো বাহানা হলো না। তুমি যখন আগেরবার এই একই কথা হাশিম ভাইকে বলেছিলে, তখন উনি নিজেই বলেছিলেন যে তুমি ক্যামেরা নিয়ে যেও, তোমাকে কেউ আটকাবে না। আর তারপর উনি পার্টির সব ছবি তোমাকে ই-মেইলও করে দিয়েছিলেন।”

​“আম্মু! ভাইয়ের তো শুধু একটা সুযোগ চাই ওই হাশিম ভাইয়ের দালালি করার। আমার একদমই পছন্দ নয় ওই কৃত্রিম হাসির হাশিম ভাই আর ওনার আম্মুকে। ওনার আঙ্কেল বেশ ভালো, আর ওই অদ্ভুত উস্কোখুস্কো চুলের নওশেরওয়ানও অনেক বেটার।”

তারপর আচমকা চমকে উঠে সাদি দিকে তাকাল। কিছুটা কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলল, “আপনার কি ওর সাথে মিটমাট হয়েছে?”

​“মিটমাট? কথাই হয় না। যেদিন থেকে ওর ড্রাগস নেওয়ার ব্যাপারটা ওর আম্মুকে জানিয়েছিলাম, সেদিন থেকে আমাকে দেখলেই শুধু রাগী চোখে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।”

​“ও কি এখনো ড্রাগস নেয়?” হানিনের কৌতূহল জাগল।

​সাদি ওর দিকে তাকাল, “আমার মনে হয় এখন আর নেয় না। তবে এই নিয়ে বাইরে কোথাও আর চর্চা করো না।”

​“এখন ওই কেকটা ফ্রিজে রাখো তো। রান্না প্রায় শেষের দিকে। আগে খাবারটা খেয়ে নাও,” আম্মু কিছুটা ধমকের সুরে বললেন। সে ক্রিম লাগাতে লাগাতে উদাসীন গলায় বলল—

“আম্মু! আমি এই কথায় বিশ্বাস করি যে মানুষের খুব মজা করে সবকিছু খাওয়া উচিত। আর যে নিষেধ করবে…”সে চোখ তুলে নুদরাতের দিকে তাকাল, “...তাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলা উচিত!”

​নুদরাত হয়তো ওকে কড়া কিছু শোনাতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তখনই দরজার বেল বেজে উঠল। এবার সাদি দরজার সবচেয়ে কাছে ছিল।

​“যাও সাদি, ফুপ্পু এসেছেন হয়তো।”

সে হেসে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, কিন্তু মাঝপথে গিয়েই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মুখের অবয়ব শক্ত হয়ে উঠল, ভ্রু কুঁচকে গেল এবং সে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে গিয়ে দরজাটা খুলল, তবে এমনভাবে দাঁড়াল যাতে হ্যান্ডেলটা তার হাতেই থাকে এবং সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে রইল।

​বাইরে জুমার দাঁড়িয়ে ছিল। বেশ পরিপাটি আর সতেজ দেখাচ্ছিল তাকে। সাদিকে দেখে সে মিষ্টি করে হাসল। সাদি সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

​“কে এসেছে সাদি? কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না কেন?” ভেতর থেকে নুদরাত গলা চড়ালেন।

​“একজন নারী এসেছেন। কোঁকড়ানো চুল, বাদামি চোখ, বয়স ঊনত্রিশ বছর এবং মুখে এক চাটুকারিতার হাসি।”

তারপর সামান্য বিরতি দিয়ে সরাসরি জুমারকে সম্বোধন করল, “জি, বলুন? কী চাই?”

​সে একইভাবে হাসিমুখে বলল, “লর্ড ভলডেমর্ট সম্পর্কে তোমার কী মতামত?”

​“ভেতরে আসতে দাও!”

​সাদি বিরক্ত হয়ে একটু পিছিয়ে এল এবং দরজাটা বন্ধ করে দিল। নুদরাত রান্নাঘর থেকে বের হতেই এই দৃশ্য দেখে পুরোপুরি থমকে গেলেন।

​“ফুপ্পুকে দরজা থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছ কেন?”

​“থাকতে দিন আম্মু! এই ভদ্রমহিলা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেই বেশি ভালো লাগবে,” দরজার কাছে মুখ নিয়ে সে বেশ জোরেই বলল।

জুমার ওপাশ থেকে বিরক্ত হয়ে আঙুল দিয়ে দরজায় টোকা দিল। সে আবার দরজাটা খুলল এবং আগের মতোই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “জি?”

​“প্রফেসর স্নেপ ঠিক আছেন?”

​সাদি একটা কুৎসিত মুখভঙ্গি করে আবার দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জুমার নিজের পা-টা চৌকাঠে আটকে দিল এবং আপোসের ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, চলো তোমাকে রন উইসলির ক্যারেক্টারটা দিলাম। এবার খুশি তো?”

সাথে সাথেই সে নিজের হাতে থাকা একগাদা কাগজ শূন্যে দোলাল। সাদি সন্দেহী চোখে ওগুলোর দিকে তাকাল, তারপর পথ ছেড়ে দিল। সে হাসতে হাসতে ভেতরে চলে এল। কাগজের তাড়াটা দিয়ে ওর কাঁধে হালকা একটা টোকা মেরে গোল টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল।

​হানিন ঠিক তখনই ঘর থেকে বাইরে এল। জুমারকে দেখে সে হাসল এবং সালাম করল। ফারিসের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর প্রায় এক বছর কেটে গেছে এবং হানিনের সেই শীতল ভাবটা পুরোপুরি কেটে না গেলেও অনেকটাই কমে এসেছে।

​“এসো, বসো। কেমন আছ তুমি?” নুদরাত হাত মুছতে মুছতে এদিকে এলেন। সাথে সাথেই সাদিকে বকলেন, “এটা কেমন ব্যবহার? ফুপ্পুকে ভেতরে আসতে দিচ্ছিলে না কেন?”

​“এই মুহূর্তে উনি মোটেও আমার ফুপ্পু নন,” সে জ্বলে উঠে বলল। “উনি কেবল একজন প্রসিকিউটর, যিনি হ্যারি পটারকে শাস্তি দিতে চান।”

​“এই ছাইপাঁশ হ্যারি পটার আবার কে...?” নুদরাত প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকালেন। জুমার তৃপ্তির হাসি হেসে চেয়ার টেনে বসল।

​“আমার পুরোনো কলেজে একটা mock trial আছে—‘সরকার বনাম হ্যারি পটার’। আমাকে প্রথমে জাজ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু ডিফেন্সের কাছে একটা পুরোনো বাঘা উকিল আছে আর প্রসিকিউশনের স্টুডেন্টদের সাথে আমার খুব ভালো জমে, তাই জাজ হওয়ার চেয়ে আমি প্রসিকিউশনের পক্ষ নেওয়াটাই ভালো মনে করলাম। এখন একে গত দুই দিন ধরে বলছি একটা ক্যারেক্টার হয়ে অন্তত সাক্ষ্য দিতে আসতে, কিন্তু ও রাজিই হচ্ছে না।”

​“Mock trial?” নুদরাত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

​“Mock trial হলো এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে কোনো রূপকথা, ঐতিহাসিক যুদ্ধ বা বাস্তব কিংবা কাল্পনিক কেস নিয়ে আদালতের মতো শুনানি করা হয় এবং রায় শোনানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য সাধারণত শিক্ষার্থীদের আইনি প্রক্রিয়া শেখানো,” জুমার বুঝিয়ে বলল।

​“সরকার বনাম হ্যারি পটার?” হানিনের আগ্রহ জাগল। তবে সে ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “হ্যারির ওপর অপরাধের অভিযোগটা কী?”

​“আমি বলছি,” সাদি, যে গত দুই দিন ধরে এই অবাস্তব কেসটা নিয়ে খেপে ছিল, বলতে শুরু করল। “মনে আছে ফোর্থ বুকে টুর্নামেন্টের শেষে হ্যারির সাথে ওর প্রতিযোগী সেড্রিককে ভলডেমর্ট মেরে ফেলেছিল?”

​হানিন মাথা নেড়ে সায় দিল।

​“কিন্তু হ্যারি যখন সেড্রিকের লাশ আর টুর্নামেন্টের ট্রফিটা নিয়ে ফিরে এল, তখন পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করে নিল এবং তার ওপর অভিযোগ লাগাল যে সে-ই আসলে সেড্রিককে খুন করেছে। আর ফুপ্পু আছেন প্রসিকিউশনে—উনি হ্যারিকে খুনি প্রমাণ করেই ছাড়বেন।”

​জুমার কাঁধ ঝাঁকাল, “রায় দেওয়ার কাজ জাজের। আমি তো শুধু যুক্তি-তর্ক তুলে ধরব। শেষমেশ হ্যারিকে তো তার প্রতিপক্ষের লাশের সাথেই পাওয়া গিয়েছিল!”

​“কিন্তু আপনার রনের সাক্ষ্যের প্রয়োজন কেন?” সাদি কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। “রন তো হ্যারির বেস্ট ফ্রেন্ড। ও তো ওর পক্ষেই সাক্ষ্য দেবে।”

​“হ্যাঁ, ঠিক আছে। ও ওর পক্ষেই সাক্ষ্য দিক না।”

সে এবার সেই কাগজগুলো বের করে ওর হাতে দিল, যেগুলোতে রন সংক্রান্ত সব নোট ছিল। যেহেতু এটা একটা unscripted trial ছিল, তাই কাজটা বেশ কঠিন। জুমার আদালতে যেকোনো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে পারত। সাদি এবার মনোযোগ দিয়ে ওগুলো দেখতে লাগল।

​হানিন চুপচাপ সেখান থেকে উঠে এল। আম্মুর রান্নার হাঁড়িটা দমে বসানো ছিল এবং সে সাদি ঘরে গিয়ে ওর জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে দিতে লাগল। ও এক সপ্তাহ আগে এসেছে, দেড় মাসের জন্য। দেখা-সাক্ষাৎ আর গল্পগুজব করতেই এই দিনগুলো কেটে গেল। জুমারের বিয়ে একদম ঘাড়ের ওপর। এর আগে ও প্রায় ছয় মাস আগে একবার এসেছিল, তড়িঘড়ি করে মাত্র চার দিনের জন্য—বড় আম্মুর ইন্তেকালের সময়। সবাই বারণ করেছিল, “এসো না, এক্সাম সামনে,” কিন্তু ও চলে এসেছিল এবং কাজ শেষ করেই ফিরে গিয়েছিল।

​হানিন আম্মুকে ব্যস্ত দেখে ঘরের দিকে ফিরতে যাচ্ছিল, তখনই সাদি স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা একটা খালি মগ দেখে ভাবল—এটা যদি রান্নাঘরে নিয়ে রেখে আসে, তবে আম্মুর ওপর একটা মস্ত বড় এহসানে আজিম করা হবে। Very good!

সে কাছে এল, কিন্তু মগটা তোলার আগেই সাদির ব্যাগ থেকে বের করে রাখা বইগুলোর দিকে তার নজর আটকে গেল, যেগুলো আম্মু টেবিলের ওপর স্তূপ করে রাখছিলেন। সেগুলোর মধ্যে একটা বইয়ের নাম বেশ অন্যরকম ছিল। সে ওটা তুলে নিল। পাতাগুলো ওল্টাতে লাগল। নিচে হাশিমের দস্তখত আর তার নিচে মুহাম্মাদ আউয়ালের নাম। ভাইকে সম্ভবত হাশিম ভাই-ই বইটা উপহার দিয়েছিলেন।

​হানিন চেয়ারে বসল এবং বেশ আগ্রহ নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর কোনো এক আলেমের লেখা আরবি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ। সে ভাবল ভূমিকাটা পড়ে দেখে, হয়তো কোনো উপন্যাস হবে। কিন্তু না, এটা ছিল non-fiction। সে পড়তে চাচ্ছিল না, তবুও কোনো এক অদ্ভুত আকর্ষণে পড়তে লাগল।

​বইয়ের পাতাগুলো ছিল একদম সাদা এবং তাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা শব্দগুলো যেন কালো হিরের মতো ঝকমক করছিল। আর কলম দিয়ে লেখা শব্দ—যদি আল্লাহ চান—তবে তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অমর হয়ে রয়ে যায়। বই আর তার মাঝখানে থাকা এই সাতশো বছরের ব্যবধান সেই শব্দগুলোর শক্তিকে আটকে রাখার জন্য এতটাই তুচ্ছ ছিল, যেন কোনো আলোর ঝর্ণার মুখে রাখা এক টুকরো কাঠ—যার ওপর দিয়ে সোনালি জলধারা কোনো বাধা ছাড়াই অনায়াসে বয়ে চলে যায়।

​এই সাতটি শতাব্দীর দূরত্ব পার করার জন্য এটা ছিল একটা অদৃশ্য দরজা এবং হানিন সেই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর হানিন—ট্রাউজার আর লম্বা কামিজ পরা, চোখে চশমা এবং চুলগুলো ফ্রন্ট-ফ্রিঞ্জ স্টাইলে খোঁপা করা। সে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। বইয়ের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য তাকে এই দরজাটা খুলতে হতো। তাই সে দরজাটা খুলে দিল। কবাট দুটো দুপাশে সরে গেল। ভেতরে এক তীব্র আলো ছিল—ভীষণ উজ্জ্বল আলো। হানিন ভেতরে পা রাখল। দরজাটা তার পেছনে বন্ধ হয়ে গেল।

​সে একটা কাঁচা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এটা ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দী। চারপাশের প্রতিটি জিনিস কেমন যেন হলুদ আর ফ্যাকাশে রঙের ছিল। দামেস্কের বাজার আর চারপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষজন।

​সে সাবধানে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। মানুষজন ওপাশ দিয়ে যাতায়াত করছিল, কিন্তু তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না। এই adventure-টা বেশ চমৎকার ছিল। সে হাঁটতে থাকল।

​তারপর সে থমকে দাঁড়াল। একটা মসজিদসদৃশ বড় ইমারতের সামনে এক বিশাল ভিড় জমে ছিল। সে গুটিগুটি পায়ে সামনে এগিয়ে এল। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে, ঘাড় উঁচিয়ে কারো কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল।

​মাটিতে একটা লোক হাঁটু মুড়ে বসে ছিল। এতটাই রোগা-পটকা যেন আস্ত একটা কঙ্কাল। চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে ছিল এবং ওতে এক তীব্র যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল। সে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় বিড়বিড় করছিল। না তার পোশাক জীর্ণ ছিল, না শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল, কিন্তু এক চরম হতাশা আর গভীর কষ্ট তাকে একদম নিস্তেজ করে রেখেছিল। চোখে এক ফোঁটা জল আটকে ছিল, যা সে না পারছিল গিলতে, না পারছিল ফেলতে। ঠিক কী হয়েছিল ওর?

​ভিড়টা আচমকাই হালকা হতে শুরু করল। সে-ও কিছুটা পিছিয়ে এল। এদিক-ওদিক তাকাল। মানুষজন ওই ইমারতটার দিকে যাচ্ছিল, সে-ও ওনাদের পিছু নিল। ইমারতের নিচু দেওয়ালের ওপাশ দিয়ে দেখল—কিছু মানুষ ভেতর থেকে কোনো একজনকে সাথে করে নিয়ে আসছেন। অত্যন্ত মার্জিত, সৌম্য আর শান্ত চেহারার একজন প্রবীণ শিক্ষক বা শেখ। ওনারা এখন সেই শেখের পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং ওই লোকটার দিকে তাকাতে লাগলেন, যে লোকটা চারপাশের সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল। একেবারে নিঃসঙ্গ।

​তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন উচ্চস্বরে আহ্বান জানাল—

​“এই দ্বীনের ইমামগণ এমন একজন মানুষের সম্পর্কে কী রায় দেন, যার দ্বীন আর দুনিয়া এই মারাত্মক ব্যাধি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে? এই রোগের কি কোনো ওষুধ আছে, হে শেখ?”

​ইমাম শেখ নিজের ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকালেন এবং যখন তিনি মুখ খুললেন, তখন হানিন ওনার কণ্ঠস্বর এতটাই স্পষ্টভাবে শুনতে পেল, যেন শব্দগুলো সরাসরি তার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল—

​“আল্লাহ প্রতিটি রোগেরই প্রতিষেধক অবতীর্ণ করেছেন। যে তা জানে, সে জানে। আর যে জানে না, সে জানে না।”

​“কিন্তু ওর ঠিক হয়েছেটা কী?” হানিনের ঠোঁট গলে শব্দ কটা বেরিয়ে গেল। পরক্ষণেই সে নিজের জিভ দাঁত দিয়ে চেপে ধরল। দূর! সাত শতাব্দী আগে চলে যাওয়া একজন শেখ কীভাবে ওর কথা শুনতে পাবেন? না ওনার কাছে তার কোনো প্রশ্ন পৌঁছাবে, না ওনার কোনো জবাব সে পাবে।

কিন্তু শেখ যেন ওকে দেখেই ফেলেছিলেন এবং ওর চোখে লেখা সেই প্রশ্নটাও পড়ে নিয়েছিলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন —  "ও... প্রেমের রোগে আক্রান্ত।”

​“প্রেমের রোগ?” সে বিস্ময়ের সাথে মনে মনে আওড়াল। “ভালোবাসা কি একটা রোগ?”

​“শুধু রোগই নয়, বরং এক প্রাণঘাতী ব্যাধি!”

​সে নিজের ঘাড় ঘুরিয়ে সেই হাঁটু মুড়ে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকাল এবং তারপর আবার শেখের দিকে।

​“তাহলে কি প্রেমের এই রোগেরও কোনো ওষুধ আছে?”

​“এই মগটা রান্নাঘরে রেখে এসো!”

দরজার ওপাশ থেকে আম্মুর চড়া গলা ভেসে এল। হানিন শেখের দিকে তাকাল। তিনি যেন ওর থমকে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সে আর দাঁড়াল না। সে উল্টো দিকে দৌড়ে চলে এল। সোনালি রোদে ভেজা সেই দরজাটাকে জোরে ধাক্কা দিল এবং এক ঝটকায় ফিরে এল।

​সে বইটা বন্ধ করে দিল। তারপর চারপাশের দিকে তাকাল। সে তার ভাইয়ের চেয়ারে বসে ছিল এবং নুদরাত তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে বকাঝকা করছিলেন। সে নিজের মাথাটা একটু ঝাঁকাল। ওর সেই পুরোনো অভ্যাস—যা-ই পড়ত, সেটা কল্পনা করতে করতে সেই যুগে হারিয়ে যেত। মাত্র একটা প্যারাগ্রাফ ওকে এতটা প্রভাবিত করল, পুরো বইটা তো ওকে একদম পাগল বানিয়ে ছাড়বে! থাক বাবা, এমন বই পড়ার কোনো দরকার নেই।

সে আসন ছেড়ে উঠল এবং বইটা শেলফে রেখে দিল। এবার বইয়ের শিরোনামটা তার চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল—

‘এক সম্পূর্ণ উত্তর সেই ব্যক্তির জন্য, যে প্রশ্ন করেছিল—নিরাময়কারী ওষুধ সম্পর্কে!’

​“আচ্ছা আম্মু! শুনেছি তো,” সে ওনার বারবার দেওয়া ধমকে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল এবং মগটা তুলে নিয়ে বাইরে চলে এল। গোল টেবিলের চারপাশে ফুপ্পু আর ভাইপো তখনো তর্কে মেতে ছিল। সে সামনে এগিয়ে এল। জুমার ওর দিকে তাকাতেই হুট করে একটা কথা মনে পড়ে গেল।

​“তোমার ওই আমেরিকান বান্ধবীরও তো বিয়েতে আসার কথা ছিল। ও কবে আসছে?”

​“পরশু,” সে হালকা একটু হাসল। “ওর পাকিস্তান ঘুরে দেখার ভীষণ শখ। ও আসলেই আমরা সবাই মিলে স্কার্দু যাব।”

এই বলে সে মুচকি হেসে বাসনপত্র গোছাতে লাগল।

(আম্মুর ওপর দ্বিতীয় এহসান)

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

“Jang haari na thi abhi ke Faraz... kar gaye dost darmiyaan se gureiz”

[লড়াইটা এখনও হেরে যাইনি হে ফারাজ... অথচ বন্ধুরা মাঝপথেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল।]

অফিসে এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। ফাতেমি সাহেব টেবিলের ওপর ফাইলটা রেখে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে একটার পর একটা পাতা উল্টে যাচ্ছিলেন। তারপর এক বুক প্রশংসা নিয়ে চোখ তুলে সামনে বসা ওয়ারিসের দিকে তাকালেন।

“Amazing work! তোমাকে এই কেসের I.O. বানিয়ে আমি সত্যিই খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

ওয়ারিস মৃদু হাসল। ঘাড় সামান্য ঝুঁকিয়ে বলল, “Thanks, sir!” কিছুটা বিরতি দিয়ে সে যোগ করল, “এই ফাইলটা দুর্নীতি সংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ ও নথিপত্রের, যা মামলা দায়ের করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই ফাইলটা...” সে পাশে সরিয়ে রাখা একটা কালো কভারের ফাইলের দিকে ইশারা করল। “...এতে এমন কিছু তথ্য ও প্রমাণ আছে, যা হাশিম কারদারের বিরুদ্ধে আমি পেয়েছি। এগুলো আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে। আমরা চাইলে এগুলো অন্য কোনো এজেন্সিতে ফরোয়ার্ড করতে পারি।”

“হ্যাঁ, আমি ঠিক সেটাই করব। Good job, Ghazi!” তিনি ফাইলটা বন্ধ করে একপাশে রাখলেন এবং ওর দিকে তাকালেন। ওয়ারিস ঘাড় ঝুঁকিয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

“আমাদের এখন arrest warrant ইস্যু করা উচিত।”

“Sure! আমি যত দ্রুত সম্ভব এই কাজটা সেরে ফেলব।”

এটাই ছিল তাদের শেষ কথোপকথন। ওয়ারিস মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তবে বাইরে যাওয়ার আগে এক মুহূর্তের জন্য সে তার বসের দিকে এক সংশয়ী দৃষ্টিতে তাকাল। মনটা কেমন যেন খটকা লাগল, কিন্তু পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকিয়ে সে কুচিন্তা দূর করে বেরিয়ে গেল। ও বেরিয়ে যেতেই ফাতেমি সাহেব উঠলেন, দরজার লকটা আটকে দিলেন। তারপর মোবাইল বের করে একটা নম্বরে কল করলেন এবং ফোনটা কানে চেপে ধরে সেই কালো ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন।

হাশিম নিজের অফিসের টেবিলে একগাদা ফাইল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অত্যন্ত বিভ্রান্ত মুখে বসে ছিল। মোবাইলটা কোনো একটা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে ছিল। মৃদু কম্পনের ‘ঝোঁ ঝোঁ’ শব্দ কানে আসতেই সে এদিক-ওদিক হাতড়ে ফোনটা টেনে বের করল এবং বেশ কিছুটা ক্লান্ত গলায় বলল, “হ্যালো।” তার কোটটা হ্যাঙ্গারে ঝুলছিল আর সে নিজে একটি ওয়েস্ট পরা অবস্থায় ছিল।

“কী খবর কারদার সাহেব?”

“ভালো। আপনার বলুন?” মোবাইলটা কান আর কাঁধের মাঝে চেপে ধরে সে ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।

“আল্লাহর রহমত। আচ্ছা, শুনলাম আওরঙ্গজেব কারদার সাহেব নাকি বাই-ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছেন? আগামী নির্বাচনের মহড়া আর কী!”

“হ্যাঁ, ওনার বন্ধুবান্ধবরাই ওনাকে জোর করে রাজনীতিতে ঠেলে দিয়েছে। যাই হোক, good for him!” সে ফোনটা ওভাবেই কাঁধের মাঝে গুঁজে দিয়ে পেছনের শেলফের দিকে এগিয়ে গেল এবং সেখানে রাখা ফাইলগুলো একে একে টেনে বের করে চেক করতে লাগল। “তাছাড়া নতুন কোনো খবর?”

“আমার মেয়েটা আমার ওপর একটু রেগে আছে। ওর জন্য একটা গাড়ি ইম্পোর্ট করিয়েছিলাম, ওটা করাচি পোর্টে এখনো আটকে আছে। আসলে আমি বেশ ব্যস্ত ছিলাম। আমার একজন A.D. একটা দুর্নীতির কেস নিয়ে কাজ করছিল...”

“আমি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি, ফাতেমি সাহেব!” হাশিম নিচু হয়ে একটা বক্স দুই হাতে তুলে নিল এবং হাঁটতে হাঁটতে টেবিলের কাছে চলে এল। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “একজন ভালো নাগরিকের পরিচয় দিন। কাস্টমস ডিউটিটা পে করে দিন এবং গাড়িটা ক্লিয়ার করিয়ে নিন। কারণ আমরা তেলের ব্যবসা করি, আর তেল ও জলের পার্থক্যটা তো এটাই—তেলের ওপর কোনো জীবন্ত জিনিস ভেসে থাকতে পারে না, যা পড়ে তা সোজা ডুবে যায়। আপনার A.D. যে স্ক্যান্ডাল বানাতে চায়, বানাতে দিন। এটা আমেরিকা নয়, ফাতেমি সাহেব! এখানকার মানুষের নৈতিকতার মাপকাঠি আমেরিকানদের মতো অতটা উঁচুতে নয়। এখানে কোনো স্ক্যান্ডাল বা দুর্নীতির অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক নেতার career তছনছ করতে পারে না।”

“আমি সবটাই খুব ভালো করে জানি, সেই জন্যই তো আপনাকে আগে ফোনটা করলাম। আপনি চাইলে আমি কালই আমার ওই ছেলের কাছ থেকে resignation letter চেয়ে নিয়ে কেসটা close করে দিতে পারি।”

“না, ওটা ওকেই চালিয়ে যেতে দিন। ওর শখ পূরণ করে নিক। আমার আব্বুর হাত একদম পরিষ্কার।”

কয়েক মুহূর্তের জন্য ওপাশে এক নিথর নীরবতা নেমে এল। তারপর ফাতেমি সাহেব সেই কালো ফাইলটার মলাটের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত সাধারণ গলায় বললেন—

“আপনি গত মাসের দুই, তেরো আর বাইশ তারিখে পেশোয়ারে হওয়া মিটিংগুলোতে উপস্থিত ছিলেন, হাশিম!”

হাশিমের বক্স খোলার হাতটা মাঝপথেই জমে গেল। পরম অবিশ্বাসে সে মাথা তুলে তাকাল। মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক নিমেষে শুষে গেল।

“আপনি একদম ঠিক বলেছেন, হাশিম! কোনো স্ক্যান্ডাল বা দুর্নীতির অভিযোগ পাকিস্তানে কাউকে ধ্বংস করতে পারে না, কিন্তু একটা জিনিস পারে—সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের জন্য money laundering করা, যার বিনিময়ে ওরা আপনাকে ওদের এলাকায় ব্যবসা করার সুযোগ দেয়। আপনি যদি একবার মিলিটারির bad books-এ চলে যান, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।”

সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ, নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ঘাড়ের একপাশের শিরাটা বারবার ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। তারপর সে অত্যন্ত দ্রুততায় নিচু হয়ে একটা কলম তুলে নিল এবং নোটপ্যাডটা সামনে টেনে আনল।

“গাড়িটা কোনটা? মেক আর মডেল কী? আর ওটা কার নামে রেজিস্টার্ড?” সে ঝড়ের গতিতে কাগজের ওপর কলম চালিয়ে ডিটেইলসগুলো লিখতে লাগল। তখন তার মাথার ভেতর যেন এক কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।

ফোনটা কেটে দিয়ে সে বক্সটা ওভাবেই ফেলে রেখে কোটটা হ্যাঙ্গার থেকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে বাইরের দিকে দৌড় দিল। সেক্রেটারি ভড়কে গিয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে করিডোর দিয়ে হনহন করে লিফটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং একই সঙ্গে মোবাইলে একটা নম্বর ডায়াল করছিল।

“খাওয়ার, এখনই বাড়ি পৌঁছাও। একদম এক্ষুনি!”

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

“Khwaab to roshni hain, nawa hain, hawa hain... jo kaale pahaadon se rukte nahi”

[স্বপ্ন তো আলো, এক সুর, এক উন্মুক্ত হাওয়া... যা কখনো কালো পাথুরে পাহাড়ের বাধায় থমকে যায় না।]

আদালত কক্ষের কার্যক্রম বেশ সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলছিল। মাননীয় জাজ সাহেবরা অত্যন্ত মনোযোগ ও গম্ভীরতার সঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সাক্ষীর (লর্ড ভলডেমর্ট) জবানবন্দি শুনছিলেন, যাকে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জুমার জেরা করছিল। সে ছিল ‘সরকার বনাম হ্যারি পটার’ কেসের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। পেছনের দর্শকদের সারিতে রোশ-এর বাঁ পাশে বসা মানুষদের মধ্যে সাদিও একজন ছিল, যে ক্ষুব্ধ চোখে তার ফুপ্পুর দিকে তাকিয়ে ছিল।

“তাহলে আপনি বলছেন যে, ঘটনার রাতে আপনি ওই কবরস্থানেই উপস্থিত ছিলেন?” জুমার হাতের কলমটা ঘোরাতে ঘোরাতে খুব ধীর পায়ে কাঠগড়ার সামনে ডানে-বাঁয়ে পায়চারি করছিল।

“জি,” ভলডেমর্ট অত্যন্ত বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ল। সে মূলত ওই কলেজেরই একজন স্টুডেন্ট ছিল, যে চরিত্র অনুযায়ী একটা কালো আলখাল্লা জড়িয়ে এসেছিল।

“আর যে মুহূর্তে আসামি হ্যারি ভিকটিমকে সঙ্গে নিয়ে ওখানে এল, তখন আপনি কবরস্থানে ঠিক কী করছিলেন?”

“আমি... জি, আমি আমার আব্বুর কবরে ফাতেহা পড়তে গিয়েছিলাম,” সে অত্যন্ত নিরীহ মুখে বলল। সাদি চরম বিরক্তিতে নিজের বসার ভঙ্গিটা বদলে নিল। পাশে বসা ছাত্রীদের একটা গ্রুপ কোনোমতে নিজেদের হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।

“আপনি তো জানেনই, ম্যাম,” সেই নিরীহ লর্ড বলে চলল, “এই হ্যারি ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই ওইসব তুকতাক আর জাদুটোনায় ওস্তাদ ছিল। মাত্র এক বছর বয়সে সে আমাকে জাদুবলে প্রায় আধমরা করে দিয়েছিল। আমি তো তখন থেকেই বনে-জঙ্গলে যাযাবরের মতো দরবেশের জীবন কাটাচ্ছি!”

“Objection, your honor!” ডিফেন্সের উকিল আচমকা দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল। জাজ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকালেন।

“Irrelevant!” সে কারণ দর্শাল।

“Sustained!” জাজ সাক্ষীকে সতর্ক করে বললেন, “অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলবেন না।”

জুমার মাথা নেড়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করল, “তাহলে আদালতকে বলুন, সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?”

“হ্যাঁ, তো সেই রাতে আমি যখন ওকে ওর প্রতিযোগী খেলোয়াড়ের সঙ্গে কবরস্থানে আসতে দেখলাম, আমি খুব স্নেহ করে বললাম—‘বাবা, এই মাঝরাতে তো তোমার বিছানায় থাকার কথা।’ কিন্তু ও উল্টো আমাকে বলল—‘আঙ্কেল, আমাদের ম্যাটার থেকে দূরে থাকুন।’ তারপর কিছু ভাবার আগেই নিজের প্রতিযোগীকে খুন করে ফেলল। আমি তো তখন থেকেই, জি, গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে আছি!”

সাদি তখন ইচ্ছে করছিল গিয়ে ওই ভলডেমর্টের মুখটা ভেঙে দিতে। সবাই খুব ভালো করেই জানত যে আসল খুনি ওই নিজেই, কিন্তু এই আইনের মানুষগুলো তো আইনের চেয়েও বেশি অন্ধ ছিল!

কিছুক্ষণ পর সাদিকেও কাঠগড়ায় ডেকে নেওয়া হলো। জুমার প্রশ্ন করা শুরু করল, “এটা কি সত্যি যে আপনি আসামি হ্যারির অন্যতম সেরা বন্ধুদের একজন?”

“জি, এই কথাটা ঠিক ততটাই সত্যি, যতটা সত্যি যে হ্যারি সম্পূর্ণ নির্দোষ,” সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জুমারের চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল। জুমার খুব স্বাভাবিকভাবেই ওনার দিকে তাকাল।

“তার মানে আপনি ঘটনার সময় ওখানে উপস্থিত ছিলেন?”

“আহ... না,” সে কিছুটা আমতা আমতা করল। “তবে হ্যারি আমাকে নিজে বলেছে যে খুনটা ভলডেমর্ট করেছে।”

“আপনি এই কথাটি সম্পূর্ণ সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বলছেন, যা আসামি আপনাকে নিজে জানিয়েছে?”

“আমি খুব ভালো করেই জানি ও সত্যি কথা বলছিল।”

“তার মানে আপনি আগে থেকেই জেনে যান যে মানুষ মনে মনে কী ভাবছে? আপনি কি জানেন এই মুহূর্তে আমি কী ভাবছি?” জুমার ভীষণ সিরিয়াস ছিল। সাদি একদম চুপ মেরে গেল।

“আপনার উত্তরের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত মতামত যোগ করা থেকে বিরত থাকুন,” জাজ সতর্ক করলেন।

জুমার ডান থেকে বাঁয়ে হেঁটে কাঠগড়ার একদম সামনে এল। অত্যন্ত গম্ভীর চোখে সাদি দিকে তাকাল।

“আপনি কি চো চ্যাং নামের কোনো মেয়েকে চেনেন?”

“জি। ও মৃত ছেলেটার গার্লফ্রেন্ড ছিল আর...” সে আচমকা নিজেই থেমে গেল।

“আর আসামি নিজেই ওই মেয়েটিকে পছন্দ করত। সেই সূত্রেই মৃত ছেলেটির প্রতি তার এক ধরনের ঈর্ষা আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। এটা কি সত্যি?”

“আপনি বিষয়টাকে ভুলভাবে...”

“হ্যাঁ অথবা না, মিস্টার রন!” সে এক মৃদু অথচ কঠোর গলায় বলল। সাদি নিরুপায় হয়ে বলল—

“জি হ্যাঁ।”

“আর এটাও কি সত্যি যে, মৃত ছেলেটি আর আসামি একই টুর্নামেন্ট জেতার জন্য লড়ছিল, যার কারণে দুজনের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেষারেষিও ছিল?”

“জি। কিন্তু ওটা এতটাই সামান্য ছিল যে তার জন্য হ্যারি কাউকে খুন করতে পারে না।”

“আর এটাও কি সত্যি যে, যেদিন প্রতিযোগিতার জন্য হ্যারির নাম সিলেক্ট করা হয়েছিল, সেই রাতে আপনি ওর ওপর ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন এবং jealous-ও হয়েছিলেন? কারণ হ্যারির জনপ্রিয়তার আড়ালে আপনার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব সবসময় চাপা পড়ে যেত।”

সাদি মুখটা অপলক বিস্ময়ে খোলাই রয়ে গেল। এই সমস্ত ঘটনা জুমার আগের রাতে নিজের মুখে আওড়েছিল, কিন্তু সে একবারও বলেনি যে আদালতে ও এইভাবে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেবে!

“জি... আমি সাময়িকভাবে একটু jealous হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু পরে আমাদের সব ঠিক হয়ে যায় এবং আমার ওই সামান্য ভুলের জন্য আমি সত্যিই অনুতপ্ত।”

“আর ঠিক এই অনুশোচনা আর অপরাধবোধের কারণেই আপনি বারবার হ্যারির পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন!”

“না তো! আমি...”

“আপনি হ্যারির পক্ষ নিচ্ছেন না?”

“আমি... এই কারণে নিচ্ছি না...” কিন্তু জুমার ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই জাজের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ঘাড় সামান্য ঝুঁকিয়ে বলল, “That’s all, your honor!” আর তারপর অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে গিয়ে প্রসিকিউশনের টেবিলের পেছনে পা-এর ওপর পা তুলে বসে পড়ল।

“আমি জাস্ট বিশ্বাসই করতে পারছি না! জাজদের প্যানেল হ্যারিকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দিল! চরম অন্যায়!”

রায় ঘোষণার পর কোর্টরুম থেকে বেরোতে বেরোতে সে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ গলায় জুমারকে বলছিল। জুমার মুচকি হাসতে হাসতে ওর পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছিল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দুপাশ থেকে স্টুডেন্টরা ওনাকে দেখে wish করছিল, আর সে-ও হালকা মাথা নেড়ে তার জবাব দিচ্ছিল। ভীষণ তৃপ্ত আর শান্ত দেখাচ্ছিল তাকে।

“সমস্ত প্রমাণ ওর বিরুদ্ধে ছিল আর ওর ডিফেন্সও ভীষণ দুর্বল ছিল।”

“কিন্তু সবাই তো জানত যে হ্যারি নির্দোষ, জুমার!” কোঁকড়ানো চুলের ছেলেটা তখনও রেগে ফুঁসছিল।

“জাজ কখনো আবেগের বশে রায় দেন না, সাদি। প্রমাণের ভিত্তিতে দেন।”

“আর আপনি কী করলেন? প্রথমে আমার মুখ থেকে এমন সব কথা বের করালেন, যা হ্যারির বিরুদ্ধে যায়। তারপর যখন দেখলেন যে আমার সাপোর্টের কারণে জাজদের ওপর একটা positive impact পড়তে পারে, তখন ওই jealousy-র কথাটা টেনে এনে জাজদের সামনে আমার credibility-টাই নষ্ট করে দিলেন! আমার তো মনটাই ভেঙে গেল।”

জুমার হাঁটতে হাঁটতেই মুচকি হেসে চোখজোড়া কপালে তুলে ওর দিকে তাকাল।

“তুমি ইংল্যান্ডে গিয়ে একটু বেশিই স্মার্ট হয়ে গেছ, তাই না?” ও তখনও মুখ ভার করে হাঁটছিল দেখে জুমার নিজের হাতের কাগজের রোলটা দিয়ে ওর কাঁধে হালকা একটা চাঁটি মারল। সে কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

“Mock trial শেষ হয়ে গেছে ভাইয়া। এবার বাস্তব জীবনে ফিরে এসো।”

সাদি এবার হেসে ফেলল। ভেতরের সমস্ত উত্তেজনা এক নিমেষে শিথিল হয়ে এল। (দূর ছাই, বাদ দাও হ্যারিকে! জাদুকরের বাচ্চা কোথাকার!)

“আপনার ছুটি মঞ্জুর হয়েছে?”

“হ্যাঁ,” সে এক গভীর আর তৃপ্তির শ্বাস নিয়ে বলল। ওরা করিডোর পেরিয়ে এতক্ষণে লনের খোলা বাতাসে চলে এসেছিল। “এত বছরের পড়াশোনা আর টানা এই জবের পর প্রথম লম্বা ছুটি... মনে হচ্ছে যেন শতাব্দীর ক্লান্তি এক নিমেষে জুড়িয়ে যাবে। এবার অন্তত কয়েকটা সকাল আমি অফিসের টেনশন ছাড়া শান্তিতে ঘুমাতে পারব!”

“হুম। তা, হাশিম ভাইয়ের মেয়ের বার্থডে পার্টিতে আসছেন তো?” গাড়ির কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাদি হুট করে মনে পড়ায় জিজ্ঞেস করল।

“আমি একদমই আসতাম না, কিন্তু সেদিন আব্বু একটা কাজে কোর্টে এসেছিলেন আর ওখানে হাশিমের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও নিজেই আব্বুকে ইনভাইট করেছে। আব্বু শুধু ভদ্রতা বজায় রাখার জন্য যাবেন, নইলে ওকেও ওনার আমার মতোই বিশেষ একটা পছন্দ নয়।”

সে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলতে খুলতে কথাগুলো বলছিল। সাদি “Good” বলে পাশে গিয়ে বসে পড়ল। হাশিম ভাইকে জুমার পছন্দ করত না, আর এই কারণেই সাদিও সবসময় ওনার প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলত।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

“Mein badhta hoon zindagi ki jaanib lekin... zanjeer si paon mein chhanak jaati hai”

[আমি জীবনের দিকে পা বাড়াতে চাই বটে... কিন্তু এক অদৃশ্য শিকল যেন পায়ে এসে ঝনঝন করে ওঠে।]

করিডোরের ওপাশ থেকে সাদি ঘরের দরজাটা খোলা দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে দাঁড়িয়ে সে খুব তাড়াহুড়ো করে টাই বাঁধছিল। তখনও তার পুরো dress-up শেষ হয়নি, অথচ অনুষ্ঠান শুরু হতে আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। আরও কিছুটা সামনে এগোলে গোল টেবিলটা চোখে পড়ে, আর সেখান থেকে বাঁয়ে ঘুরলেই লাউঞ্জ, যেখানে বেশ জোরে টিভি চলছিল।

একটা সোফার ওপর ফারিস পা-এর ওপর পা তুলে বসে ছিল। ও একটি grey coat আর গোল গলার সাদা শার্ট পরে ছিল। সে বারবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল আর মাঝেমধ্যেই নাদরাতকে দেখছিল, যিনি নিজে জুয়েলারি পরার পাশাপাশি সায়াম আর সাদি—দুজনকে নিয়েই বেশ জোরে জোরে চেঁচাচ্ছিলেন আর জলদি তৈরি হতে বলছিলেন। তারপর ওনার সমস্ত ক্ষোভের তীর গিয়ে পড়ল সামনে সোফায় বসে থাকা সাধারণ ঘরের কাপড়ে মোড়া হানিনের ওপর।

“তুমি কখন তৈরি হবে শুনি? মামু কখন থেকে তোমাকে নিতে এসে বসে আছেন!”

সে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “আমার কোনো পার্টি-টার্টিতে যেতে ইচ্ছে করছে না। শুধু তো এতটুকুই বলেছিলাম যে আজ সন্ধ্যায় আমাকে আলিশার সঙ্গে দেখা করাতে কেউ যেন ওর হোটেলে নিয়ে যায়, কিন্তু না... কারো সময় নেই!”

নুদরাত ওর কথা পুরোপুরি ignore করে ল্যান্ডলাইন ফোনটা তুলে রিসিভারটা কানে ঠেকালেন। সেটটা নিজের হাঁটুর ওপর রেখে নম্বর ডায়াল করতে করতে হাঁক ছাড়লেন—

“সাদি! জলদি করো। ফুপ্পুরা হয়তো এতক্ষণে পৌঁছে গেছেন।”

ফারিস চমকে উঠে নাদরাতের দিকে তাকাল। “ওরাও কি আমন্ত্রিত?” সে খুব সাধারণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।

হানিন আড়চোখে ফারিসের সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন মুখটা দেখল। নাদরাত ততক্ষণে পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে ফোনে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন, অত্যন্ত মিষ্টি আর নরম গলায়—

“আসসালামু আলাইকুম, আপা! হ্যাঁ, আমি ভালো আছি। আপনি সকালে যে কড়ি পাঠিয়েছিলেন, সেটার জন্য ধন্যবাদটুকুও দেওয়ার সময় পাইনি। সত্যি, আপনি এত কষ্ট করতে গেলেন কেন... এক মিনিট!” তিনি রিসিভারের mouthpiece-এ হাত চাপা দিয়ে চরম রাগে হানিনের দিকে তাকিয়ে চিল্লিয়ে উঠলেন, “টিভির সাউন্ডটা কমাও বলছি! আগুন লাগুক এই টিভিতে! আমি কী বলছি, হানিন? আমি যদি একবার ওখান থেকে উঠি, তবে জুতোপেটা করে তোমার হাড়গোড় ভেঙে দেব বলে দিচ্ছি!”

হানিন বেশ ক্ষোভের সঙ্গে রিমোটটা তুলে জোরে একটা বাটন চাপল। সাউন্ড একদম বন্ধ। টিভির ভেতরের সমস্ত অভিনেতা যেন এক পলকে বোবা হয়ে গেল। নাদরাত আবারও অত্যন্ত নম্রভাবে ফোনে কথা বলা শুরু করলেন। তিনি মূলত সেইসব সরল মায়েদের একজন ছিলেন, যাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে রিসিভারের mouthpiece-এ হাত চাপা দিলে নিজের গলার আওয়াজ ওপাশে কোনোভাবেই পৌঁছায় না।

ফারিস চোখ সরু করে হানিনের দিকে তাকাল। “তোমার মুড কীভাবে ঠিক হতে পারে? Italian food খেলে?”

“এখন যদি আমি Italian খাবারের দিকে চোখ তুলেও তাকাই, তবে আমার নাম হানিন নয়!” সে যেন এক আক্রোশে ফেটে পড়ল।

“তাহলে?”

“আমাকে আলিশার সঙ্গে দেখা করতে হবে। ও আমার friend। কিন্তু এখানে তো সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত!”

নুদরাত কথা বলতে বলতেই নিচু হয়ে নিজের জুতোটা খুলতে চাইলেন, কিন্তু স্যান্ডেলের strap-গুলো বেশ শক্ত করে বাঁধা ছিল। এখন এই জেদি সন্তানের জন্য কে আবার ওটা খুলতে যাবে! তাই তিনি ওভাবেই আবার ফোনে কড়ি-নামা শোনাতে লাগলেন।

ফারিস নিজের মোবাইল বের করে একটা নম্বরে কল করল।

“ওয়ারিস! তুমি আর সারা আসছ তো, তাই না? Okay, তোমরা আপার বাড়িতে এসে ওনাদের সবাইকে pick করে নাও। আমি হানিনকে ওর friend-এর ওখানে drop করতে নিয়ে যাচ্ছি।” মোবাইলটা বন্ধ করে সে বেশ কৌতুকপূর্ণ চোখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা হানিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে বলল—

“দশ মিনিটের মধ্যে ready হয়ে বাইরে এসো, নইলে আমি একাই চলে যাব।”

নুদরাত ওপাশ থেকে “আরে... শোনো, শোনো...” করতেই রয়ে গেলেন, আর হানিন যেন গায়ে কারেন্ট খেয়ে এক লাফে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। পরম অবিশ্বাসে সে ফারিসের দিকে তাকাল।

“কিন্তু আপনি পার্টিতে কেন যাচ্ছেন না?” সে তড়িঘড়ি করে ভেতরের দিকে দৌড় দিল, পরক্ষণেই আবার উল্টো পায়ে ছুটে ফিরে এল। ফারিসের কানের কাছে সামান্য ঝুঁকে অত্যন্ত মাসুম একটা মুখ করে জিজ্ঞেস করল—

“আচ্ছা, এইমাত্র Italian খাবার নিয়ে যে মতামতটা দিয়েছিলাম, ওটা কি দয়া করে withdraw করতে পারি?”

ফারিস কেবল এক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল। সে দুই হাত তুলে “Sorry, sorry!” বলতে বলতে ঘরের ভেতর ছুটে পালাল।

সে খুব দ্রুততার সঙ্গে তৈরি হয়ে নিল। নিজের চশমাটা খুলে contact lens পরে নিল। (উফ! এগুলো চোখে পরাই এক মস্ত ঝামেলার কাজ। বারবার চোখের পাতা কাঁপছিল আর ওগুলো বাইরে বেরিয়ে আসছিল। আসলে lens পরার অভ্যাস তো ছিল না, ফুপ্পুর বিয়ের জন্যই মূলত কেনা হয়েছিল।) কপালের ওপর সামান্য কিছু চুল আলগা ছেড়ে দিয়ে বাকি চুলগুলো দুপাশে clip দিয়ে আটকে খোলা রেখে দিল। সে নিজের নতুন purseটা হাতে তুলে নিল, যেটা প্রায় তিন মাস আগে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার সময় সারা ওর জন্য নিয়ে এসেছিল। বাইরে আসতেই দেখল ওয়ারিস আর সারা ততক্ষণে চলে এসেছে।

ওয়ারিসের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ফারিস আর ও বেশ গম্ভীর মুখে কিছু একটা আলোচনা করছিল। ফারিস কিছুটা চিন্তিত গলায় বলছিল—

“তুমি কোনোভাবেই resignation letter দেবে না। ওনারা আজ প্রথমবার চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তুমি একদমই দেবে না।” একই সঙ্গে সে হাতের চাবিটা বাতাসে ছুড়ে দিল। হানিন ওটা লুফে নিল। সে ফারিসের গাড়ির দিকে এগিয়ে এল এবং front seat-এ বসে window glassটা নিচে নামিয়ে দিল। ওখান থেকেই ওনাদের দুজনের কথার আওয়াজ স্পষ্ট আসছিল।

“আমি যে কেসের I.O., সেই কেসের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর সঙ্গে ফাতেমির খুব ভালো খাতির। ইলিয়াস ফাতেমি আমার বস। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ও আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে।” ওয়ারিসের মুখে আপাতদৃষ্টিতে এক শান্ত ভাব থাকলেও সে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা লুকাতে পারছিল না।

“তুমি ঠিক কোন কেসের I.O.?”

“অবশ্যই এটা আমি তোমাকে বলতে পারব না। এটা সম্পূর্ণ classified information।”

“Okay, কিন্তু...” নুদরাত, সাদি এবং সায়াম ততক্ষণে বাড়ি থেকে বাইরে আসছিলেন। ফারিস কথা থামিয়ে বেশ চিন্তিত চোখে ওয়ারিসের দিকে তাকাল। “তুমি শুধু এখন হুট করে কিছু করতে যেয়ো না। আমরা রাতে ফিরে এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব। এখন আমাকে বেরোতে হবে। কিন্তু মনে রেখো, তুমি resignation দেবে না। ঠিক আছে তো, ওয়ারিস?” ওকে বারবার সতর্ক করতে করতে সে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে এল।

ওয়ারিস মাথা নেড়ে একটা মলিন হাসি হাসল এবং নিজের গাড়ির দিকে ঘুরে গেল। ফারিস ভেতরে এসে সিটে বসল, চাবি ঘুরিয়ে গাড়িটা reverse করল। হানিন আড়চোখে তাকিয়ে দেখল ওর মুখটা বেশ বিভ্রান্ত এবং গভীর ভাবনায় ডুবে আছে। এক মুহূর্তের জন্য সে নিজের মনের ভেতর নামটা আওড়াল—

ইলিয়াস ফাতেমি... ইলিয়াস ফাতেমি।

কিন্তু পরক্ষণেই আলিশার সঙ্গে দেখা করার আনন্দটা তার মনের সমস্ত মেঘ উড়িয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে আপন মনেই একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

সে খুব কৌতূহলী চোখে windshield-এর দিকে তাকাতে লাগল। রাস্তার ওপর এঁকে রাখা সাদা দাগগুলো নির্দিষ্ট ব্যবধানে গাড়ির নিচে এসে এক এক করে মিলিয়ে যাচ্ছিল। সে মনে মনে গুনতে শুরু করল। এক... দুই... তিন... ঠিক তিনটে... একটা total দশটা... আর তারপর আবার প্রথম থেকে গোনা শুরু।




চলবে,,,,,,

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)