নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৫ পর্ব ২০, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)



 

#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৫


পর্ব ২০:-



Bane hain ahl-e-hawas mudda'ee bhi munsif bhi... kisse wakeel karein, kis se munsifee chaahein)


[লোভী মানুষেরাই আজ নিজেই বাদী আর নিজেই বিচারক বনে বসেছে... তবে কাকে নিজের উকিল করব, আর কার কাছেই বা ন্যায়বিচার চাইব!]


​সোনিয়ার দ্বিতীয় জন্মদিনের দাওয়াত কারদার প্রাসাদের লনের পরিবর্তে লিভিং রুম এবং তার সংলগ্ন ডাইনিং রুম, ড্রয়িং রুম আর সানরুম মিলিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। ভেতরের সমস্ত দরজা স্লাইডিং হওয়ায় সেগুলো দেয়ালের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাড়ির পুরো গ্রাউন্ড ফ্লোরটা একটা বিশাল খোলা হলের রূপ নিয়েছিল। আমন্ত্রিত অতিথিরা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।


​শেহরিন মেইন এন্ট্রান্সে দাঁড়িয়ে মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছিল। একতলা পর্যন্ত ঝুলে থাকা ফার্সি বেগুনি রঙের ম্যাক্সি পরা শেহরিন নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু আপ্রাণ আড়াল করার চেষ্টা করছিল। সে বারবার ভিড়ের মাঝে হাশিমকে খুঁজছিল, পরক্ষণেই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল।


​সিঁড়ির ওপরের ঘরগুলোর সামনে থাকা রেলিং ঘেঁষে কালো রঙের একটি গাউন পরে জওয়াহেরাত দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠোঁটে এক রহস্যময় গাঢ় হাসি নিয়ে তিনি অন্য এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন। চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে বাম কাঁধের ওপর ফেলে রাখা ছিল।


​হঠাৎ করেই হাশিম পেছন থেকে হনহন করে হেঁটে এল। তার কোটের বোতাম খোলা ছিল, ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রাখা আর চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে ওনার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, “আমার আম্মুকে একটু দরকার, কিছুক্ষণের জন্য...” তারপর জওয়াহেরাতের কনুই ধরে ওনাকে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে গেল। তিনি কিছুটা অবাক ও চমকে উঠে ওর সঙ্গে হেঁটে চললেন।


​“হাশিম...”


​“Shh...” সে ওনাকে নিজের স্টাডি রুমে নিয়ে এল। খাওয়ার সেখানে আগেই উপস্থিত ছিল। জওয়াহেরাত বেশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকালেন।


​“তুমি ঠিক আছ, হাশিম?”


​“এখনও? একদমই না!” নিজের চুলে হাত বুলিয়ে কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর চরম ক্লান্তি নিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।


​“আমরা কার জন্য money laundering করছি, ওরা সব জেনে গেছে।”


​জওয়াহেরাতের যেন দম আটকে গেল। “তোমার আব্বু কি জানেন?”


​“উনি যদি জানতেন, তবে আপনি কি আমাকে এখানে জ্যান্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতেন?” সে অত্যন্ত তেতো গলায় ওনার দিকে তাকিয়ে বলল। জওয়াহেরাত এতক্ষণে একটা স্বাভাবিক শ্বাস নিলেন।


​“National Accountability Bureau (NAB)-এর লোকেরা... ওরা আমাদের কোম্পানিগুলোর ওপর ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ওরা আমাদের সেই টাকাগুলোর হদিস পেয়ে গেছে, যেগুলো আমরা টেররিস্ট গ্রুপের জন্য money laundering করেছিলাম। কেসের হেড বলেছেন যে উনি Investigation Officer-এর কাছ থেকে resignation letter চেয়ে নেবেন। কিন্তু আপনি কি জানেন সেই অফিসারটা আসলে কে?”


​“কে?” তিনি অপলক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।


​“ফারিসের সৎ ভাই, ওয়ারিস। এরপর আপনি নিজেই খুব ভালো করে বুঝতে পারছেন যে, আব্বুর কান পর্যন্ত আমার আর আপনার এই সমস্ত কীর্তি পৌঁছানো থেকে এখন আর কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।”


​জওয়াহেরাত যেন একদম নিস্তেজ হয়ে পাশের চেয়ারটার ওপর ধপ করে বসে পড়লেন। দুহাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরলেন।


​“সমস্যাটা হলো ম্যাম, ওয়ারিসের বস ওই কেস ফাইলগুলো কোনোভাবেই আমাদের হাতে তুলে দেবে না,” খাওয়ার এবার বলতে শুরু করল। “সে নিজের গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচ লাগতে দেবে না। আমাদের ওয়ারিসকে নিজেদের মতো করে হ্যান্ডেল করতে হবে।”


​জওয়াহেরাত মাথা তুলে ওনার লালচে হয়ে আসা চোখে হাশিমের দিকে তাকালেন।


​“তাহলে তুমি এই কারণেই তোমার আব্বুকে দিয়ে ফারিসের ভাইকে ফোন করালে, যাতে ও এই পার্টিতে অবশ্যই আসে? আর এইমাত্র আমি দেখলাম, ও নিচে এসে দাঁড়িয়েও গেছে।”


​“আমরা গত তিন দিন ধরে ওকে ফলো করছিলাম, ম্যাম! ও একটা হোস্টেলে থাকে। ওর ওয়াইফ থাকে নিজের মায়ের সঙ্গে। ওর ল্যাপটপ, কেসের ফাইল—সবকিছু ওই হোস্টেলের ঘরেই রাখা থাকে। ও এখন এখানে আছে, আর আমি এই সুযোগে ওর হোস্টেলে যাচ্ছি। আমাদের চেক করতে হবে যে ওর কাছে ঠিক কী কী প্রমাণ আছে এবং ও ওগুলো কাকে কাকে দেখিয়েছে।”


​“আর তোমরা এই সমস্ত কথা আমাকে এখন বলছ?” তিনি যেন ফেটে পড়লেন। চরম রাগে দুজনের দিকে তাকালেন।


​“কারণ আপনি কালই ইংল্যান্ড থেকে ফিরেছেন আর আপনার সঙ্গে আমার এখনই দেখা হলো।”


​জওয়াহেরাত ঝড়ের গতিতে উঠে হাশিমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফুঁসে উঠলেন, “তুমি বলেছিলে কিচ্ছু হবে না! সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি একাই সব সামলে নেবে! তাহলে এই সবকিছু কী?”


​“আমি কোনো পেশাদার অপরাধী নই, আম্মু। বড়জোর দুই বছরও হয়নি আমি এই লাইনে এসেছি। আমি জানতাম না যে এত তাড়াতাড়ি আমি মিলিটারির নজরে পড়ে যাব।”


​কিন্তু জওয়াহেরাত মাথা নেড়ে ওর কোনো কথা না শুনেই চরম অস্থিরতায় নিজের মনেই বলে চললেন—


​“হাশিম... হাশিম... এই সবকিছু এক্ষুনি শেষ করো। ওর মুখ বন্ধ করো। যা ইচ্ছা করো, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি করো!” ওনাদের দুজনের দিকে একটা কঠোর নজর ছুঁড়ে দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।


​হাশিম তৎক্ষণাৎ খাওয়ারের দিকে ঘুরল।


​“ও যেন বিন্দুমাত্র টের না পায় যে তুমি ওর হোস্টেলে গিয়েছিলে। ও এখান থেকে রওনা হওয়ার আগেই ফিরে আসবে। কারণ ও যদি একবার কিছু জানতে পারে, তবে ও আদালতে এসে এমন এক যুদ্ধ শুরু করবে, যা আমি এই মুহূর্তে একদমই চাই না।”


​“Yes, sir!” খাওয়ার ওর সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বের হলো। দুজনে সিঁড়ির ওপরের রেলিং পর্যন্ত এল। হাশিম নিচের দিকে তাকাল। এন্ট্রান্সের কাছে শেহরিন সারার সঙ্গে বেশ হাসিমুখে দেখা করছিল। সঙ্গে দুটো ছোট বাচ্চাও ছিল—আট বছরের যমজ কন্যাসন্তান। কাশ্মীরি আপেলের মতো লালচে গাল দুটো নিয়ে ওরা বেশ লাজুক ভঙ্গিতে মায়ের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছিল। হাশিম একদৃষ্টে শান্ত চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঘাড়ের সেই শিরাটা আবারও ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল। সে খুব ধীর গলায় বলল—


​“ওয়ারিসকে কোনো আঘাত কোরো না, খাওয়ার! ওর বাচ্চা দুটো বড্ড ছোট।”


​খাওয়ার মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। সে যখন মেইন গেটের কাছে পৌঁছাল, ওয়ারিস ঠিক তখনই ভেতরে আসছিল। ও খাওয়ারকে থামাল। খাওয়ার দাঁড়িয়ে গেল, নিজের শ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।


​“আমি কি আমার cell phone-টা সঙ্গে রাখতে পারি? আসলে আমার কিছু জরুরি কল আসার কথা আছে,” মোবাইলের দিকে ইশারা করে ওয়ারিস জিজ্ঞেস করল। তার পরিমাপিত গম্ভীর চোখ দুটো খাওয়ারের মুখের ভাব বোঝার চেষ্টা করছিল, তবে তার অবয়বে একধরনের জড়তা স্পষ্ট ছিল।


​“Sure, sir!” খাওয়ার ঘাড় ঝুঁকিয়ে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।


​হাশিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে নিচে নেমে এল। সে ওয়ারিসকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল। সে মূলত ততক্ষণ পর্যন্তই নিজেকে লুকিয়ে রাখত, যতক্ষণ সামনের মানুষটার মনে সন্দেহ থাকত। এখন যেহেতু বাস্তবটা পুরোপুরি সামনে চলে এসেছে, সে আর লুকানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে যেন মনে মনে অপরাধটা স্বীকারই করে নিল। এই কারণেই সে ওয়ারিসের সঙ্গে কোনো কথা বলল না। সে সোজা সারার দিকে এগিয়ে গেল, যে জুমারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।


​জুমার নিজের চিরচেনা সহজ-সরল ভঙ্গিতে বলছিল, “আর মাত্র দেড় সপ্তাহ বাকি অনুষ্ঠানগুলো শুরু হতে। তোমার কেমন লাগছে এখন?”


​“একদম blank!” জুমার হাসিমুখে কাঁধ ঝাঁকাল। সে একটি মেরুন রঙের লম্বা কামিজের সঙ্গে একটা চমৎকার ফ্লোরাল ওড়না কাঁধে ফেলে দাঁড়িয়ে ছিল। কোঁকড়ানো চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো ছিল। হাশিম পেছন থেকে ওর চুলের দিকে তাকাল এবং ঘুরে ওর সামনে এসে দাঁড়াল।


​“Hello, Sara... আর hello, DA!”


​জুমার সামান্য একটু কৃত্রিম হাসল এবং বেশ শান্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “Thank you, Hashim! অনেক দিন হলো আপনি আমার কাছে কোনো favor চাননি।”


​“আসলে অনেক দিন হলো আমার কোনো আত্মীয়র criminal litigation-এর প্রয়োজনই পড়েনি।” জুমার আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে জুসের গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়াল। হাশিম এবার সারার দিকে মনোযোগ দিল।


​“আপনি ইংল্যান্ড থেকে কবে ফিরলেন?”


​“আমার প্রায় তিন মাস হয়ে গেল, হাশিম ভাই। আসলে বাড়ি গোছানো আর সব সেট করার চক্করেই পুরো সময়টা কেটে গেল। এই মাস থেকেই মূলত job-টা শুরু করেছি,” সে বেশ প্রফুল্ল চিত্তে বলতে লাগল।


​“তাহলে নতুন বাড়িতে শিফট হচ্ছেন কবে?”


​“ব্যস, আগামী সপ্তাহেই!” সে ভীষণ খুশি দেখাচ্ছিল। “এখন থেকে আমরা একসাথেই একটা family হয়ে থাকব।”


​হাশিম মুচকি হেসে বাচ্চাদের দিকে তাকাল। একজনের গাল আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওদের নাম কী?”


​“আমাল আর নূর,” সারা তার পেছনে লুকিয়ে থাকা নূরকে সামনে আনার চেষ্টা করল, কিন্তু সে কিছুতেই সামনে আসতে রাজি হলো না। হাশিম কেবল হেসেই রইল। তারপর কিছুক্ষণ পর সে জওয়াহেরাতকে ওনাদের দিকে নিয়ে এল।


​“জুমার! ইনি আমার আম্মু। আর আম্মু, ইনি হলেন আমাদের Public District Prosecutor জুমার ইউসুফ।” জওয়াহেরাত হাসিমুখে গালে গাল মিলিয়ে ওর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন। তারপর কিছুটা সরে এসে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখলেন।


​“সাদির ফুপ্পু... হুম।”


​তারপর জওয়াহেরাতকে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা বড় মামুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গেল। ওয়ারিস ওনাদের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। হাশিম আগের মতোই ওকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে চলল। সে কোনোভাবেই নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে কোনো কাণ্ড ঘটাতে চাচ্ছিল না।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Jaaiz thi ya nahi, tere haq mein thi... karta tha jo kabhi woh wakaalat tamaam shud


[ন্যায় ছিল কি অন্যায়, তা কেবল তোমার পক্ষেই ছিল... একদা যে ওকালতি আমি করতে পারতাম, আজ তা চিরতরে সমাপ্ত হলো।]


​লিফটটা হোটেলের কাঙ্ক্ষিত ফ্লোরে এসে থামল। কবাট দুটো খুলে যেতেই বেশ উৎফুল্ল হানিন এবং মুখে কিছু একটা চিবানো সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন ফারিস বাইরে বেরিয়ে এল। সামনেই ছিল হোটেলের রুমগুলোর লম্বা করিডোর। দুপাশের দরজার ওপর হালকা নাইট ল্যাম্পগুলো জ্বলছিল। হানিন বেশ আলতো করে তার পাশে হাঁটতে থাকা ফারিসের দিকে তাকাল।


​“Thank you, মামু! আপনি আমাকে আমার best friend-এর সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে এলেন।”


​“It’s okay. তা, তোমার ওই friend ঠিক কী করে?”


​হানিন হাঁটতে হাঁটতে মাঝপথে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কিছুটা চমকে উঠে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “Sorry?”


​“I mean, ও কি পড়াশোনা করে, নাকি কোনো job-টব করে?” সেও ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। আলিশার ঘরের দরজাটা সেখান থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে ছিল।


​“পড়াশোনা তো ও মাঝপথেই ছেড়ে দিয়েছে, কলেজে যেতে পারেনি। আসলে tuition fees আর hostel-এর খরচ ও afford করতে পারছিল না। এখন ও ঠিক কী করে, তা আমার জানা নেই।”


​“আর ওর parents কী করেন?”


​“আমি জানি না। কিন্তু আপনি এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন?” সে এবার কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করল।


​“তুমি তো রাস্তায় বললে যে তুমি ওকে প্রায় তিন বছর ধরে চেনো, অথচ তুমি ওর সম্পর্কে এই basic তথ্যগুলোই জানো না!”


​“আমি আসলে কোনোদিন ওসব জিজ্ঞেস করিনি।” ওরা আবারও হাঁটতে শুরু করল। তবে এবার ফারিসের মনে একধরনের অস্বস্তি কাজ করছিল এবং হানিন কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল। রুমের সামনে এসে ফারিস কিছু একটা ভেবে ওর দিকে তাকাল।


​“আমিও ভেতরে আসতে চাই। আমার অন্তত জানা উচিত যে আমি তোমাকে সঠিক জায়গায় নিয়ে এসেছি কি না।”


​“Sure!” হানিন কিছুটা অসন্তুষ্ট গলায় বলে দরজায় দস্তক দিল। দরজাটা খুব দ্রুতই খুলে গেল এবং পুরোটা খুলে যেতেই সামনে এসে দাঁড়াল কালো shoulder-cut চুল আর ধূসর-সবুজ চোখের এক ফর্সা মেয়ে—আলিশা। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে একটি black pant আর সাদা shirt পরে ছিল, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো ছিল, বেশ ঢিলেঢালা। কিছুটা দুষ্টুমি আর কিছুটা লাজুকতার সঙ্গে সে হানিনকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আলাদা হয়ে ওকে উপর-নিচ খুঁটিয়ে দেখল। হানিন ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসছিল।


​“তুমি একদম হুবহু তোমার ভিডিওগুলোর মতোই মিষ্টি!” তারপর সে ফারিসকে ‘Hello’ বলল এবং ওনাদের ভেতরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাল।


​“ইনি আমার মামু,” হানিন ফারিসের পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর ওরা ভেতরে এল। ফারিস এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আলিশাকে দেখল, তারপর চারপাশের ঘরটা ভালো করে পরখ করে নিয়ে সোফার ওপর গিয়ে বসল।


​হানিন বেশ জাঁকজমক করে বসে গল্প শুরু করে দিল। সে করিডোরের সেই অস্বস্তিকর কথোপকথন একদম ভুলে গেল। ফারিস চুপচাপ বসে একদৃষ্টে ওনাদের দুজনকে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে এবং হাসতে দেখছিল। রাতের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘরের সমস্ত হলুদ বাতিগুলো জ্বালানো ছিল। আলিশা এর মাঝেই উঠে গিয়ে room service-এ call করে জুসের order দিল। ফিরে এসে সে সোফায় বসল এবং বেশ মার্জিত গলায় ফারিসকে জিজ্ঞেস করল—


​“আর আপনি কী করেন?”


​“Government sector-এ একটা job করি,” সে আলিশার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল। “তা, আপনার job-টা ঠিক কী?”


​আলিশা সামান্য একটু থমকে গেল। সে প্রথমে হানিনের দিকে তাকাল, তারপর ফারিসের দিকে এবং বলল, “আমি National Geographic-এর জন্য কাজ করি। আমরা এখানে একটা documentary বানাতে এসেছি।”


​“আর National Geographic আপনাকে চাকরিটা দিয়ে দিল? অথচ আপনি তো কোনোদিন কলেজেই যাননি!”


​আলিশা চমকে উঠে হানিনের দিকে তাকাল, যে নিজে অস্বস্তিতে ছটফট করছিল, তারপর ফারিসের দিকে ফিরল। ওর মুখের হাসিটা এবার কিছুটা ফিকে হয়ে এল।


​“আমি যদি afford করতে পারতাম, তবে অবশ্যই কলেজে যেতাম। কিন্তু এই job-টার জন্য ডিগ্রির চেয়ে আমার যোগ্যতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”


​“তা, কিসের ওপর documentary বানাচ্ছেন আপনারা?”


​“আমরা এই শহরের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে cover করব,” সে নিজের ঘাড় কিছুটা উঁচিয়ে হাসিমুখে বলল। ফারিস এক ভ্রু উঁচিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর চোখে ওর দিকে তাকাল।


​“ইসলামাবাদের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ওপর?”


​“Yeah!”


​“That’s great! কারণ আমার জীবনের এই দীর্ঘ তেত্রিশটা বছরে আমি ইসলামাবাদে আজ পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিক স্থানের হদিস পাইনি। Nat Geo-র লোকেরা কি আপনাকে জানায়নি যে এই শহরটা মূলত ৬০-এর দশকে তৈরি করা একটা কৃত্রিম, আধুনিক শহর?”


​আলিশা কোনোমতে নিজের থুতু গিলল। “I mean... আমার বোঝানোর উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ইমারতগুলো, যেমন—Supreme Court, Parliament, Prime Minister House ইত্যাদি।”


​“তা, আপনারা কোন ক্যামেরা ব্যবহার করেন? আপনারা যদি আমাদের আপনাদের ক্যামেরাগুলো একটু দেখাতেন, তবে বেশ ভালো লাগত।” ফারিস ঘরের এদিক-ওদিক তাকাল, যেন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছিল।


​হানিন একদম বোবা হয়ে বসে এক এক করে দুজনের মুখের ভাব দেখছিল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না যে ওনাদের এই আলোচনা আসলে কোন দিকে মোড় নিচ্ছে।


​“আমি... আসলে আমি camera work করি না।” আলিশার মুখের হাসি এবার পুরোপুরি গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সে সামান্য একটু থামল এবং তারপর এক টানে বলে চলল, “আমি কম্পিউটারে বেশ ভালো। বিভিন্ন কোম্পানি আমাকে তাদের website check করার জন্য hire করে। এটা একটা freelance job।”


​“এই এতক্ষণে মনে হলো আপনার মুখ থেকে প্রথম কোনো সত্যি কথা শুনলাম,” ফারিসের এই একটা কথায় আলিশার মুখের সমস্ত রঙ যেন এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।


​“আপনি কি বলতে চাইছেন যে আমি এতক্ষণ এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছিলাম?”


​“আমি শুধু এতটুকুই বলছি যে, আপনি এতক্ষণ যা যা বানিয়ে বলছিলেন, সেগুলোতে প্রচুর খামতি ছিল।”


​হানিন আচমকা নিজের পার্সটা তুলে সোফা ছেড়ে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। আলিশা আর ফারিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর দিকে তাকাল। আলিশা বলল, “Please, বসো...”


​“না, আমাদের একটা পার্টিতে যেতে হবে। আমাদের বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছে। চলুন, মামু!” আর তারপর সে আলিশার হাজারো অনুরোধ সত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্য আর থামল না। আলিশা জোর করে একটা gift pack ওর হাতে ধরিয়ে দিল, কিন্তু সে ওটা খুলেও দেখল না। নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে, রাগে ভ্রু কুঁচকে সে হনহন করে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল।


​“মেয়েটা এমনিতে ভালো, কিন্তু ও অনেক কিছু লুকাচ্ছে। আর এই Nat Geo-র গল্পটা তো একদমই...” ফারিস অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ওর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলছিল, ঠিক তখনই সে চরম ক্ষোভে ফারিসের দিকে ঘুরে দাঁড়াল—


​“Thank you so much, মামু! আমার best friend-এর সঙ্গে এমন একটা ব্যবহার করার জন্য, যার কোনো অধিকার আপনার বিন্দুমাত্র ছিল না!” এক চরম অপমানবোধে ওর ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে গিয়েছিল।


​“আমি শুধু কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন করেছি। আমার পুরো অধিকার আছে যে আমি তোমার এই internet friend-কে ভালো করে যাচাই করতে পারি।”


​“অতিথিদের সঙ্গে কি কেউ এইরকম ব্যবহার করে? ও কতটা hurt হয়েছে আপনি জানেন? এর চেয়ে ঢের ভালো হতো, যদি আপনি আমাকে এখানে নিয়ে না আসতেন!”


​“ও মিথ্যা কথা বলছিল আর আমি শুধু ওর মিথ্যাটা ধরছিলাম।”


​“আমি কি কোনোদিন আপনার মিথ্যাগুলো ধরে ফুপ্পুকে বলেছি যে, ওই নোংরা magazine-টা আসলে আপনিই ওনাকে পাঠিয়েছিলেন?”


​তীব্র আবেগের বশে হানিনের মুখে যা এল, সে একনাগাড়ে বলে চলল এবং যখনই নিজের ভুলের অনুভূতিটা মাথায় এল... সে এক নিমেষে সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল। বুক থেকে শ্বাস নেওয়াটাও যেন থমকে গেল। ফারিস চরমভাবে চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে এক অপরিসীম বিস্ময়, অবিশ্বাস, এমনকি এক গভীর আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। সে একদৃষ্টে হানিনের দিকে ওভাবেই তাকিয়ে রইল, যে হানিন নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ভেতর থেকে চরম ভয়ে কাঁপছিল।


​“তুমি আসলে কে, হানিন?”

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


(Haan talkhi-e-ayyaam abhi aur barhegi... haan ahl-e-sitam mashq-e-sitam karte rahenge)


[হ্যাঁ, জীবনের তিক্ততা এখন আরও বাড়বে... হ্যাঁ, অত্যাচারীরা তাদের অত্যাচারের চর্চা চালিয়েই যাবে।]


​নেপথ্যে মৃদু মৃদু মিউজিক বাজছিল। হাশিম গ্লাস হাতে হাসিমুখে লিভিং রুমের সেই কোণে এগিয়ে এল, যেখানে জারতাশা দাঁড়িয়ে ছিল। ফোনে বারবার একটা নম্বরে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সে হতাশ মনে ফোনটা লক করল। তার পরনে ছিল কালো রঙের একটি শাড়ি, আর কালো চুলগুলো একদম শেহরিনের স্টাইলে বাঁধা। ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে সে যেমনই মাথা তুলল, দেখল হাশিম সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে হাসছিল। জারতাশা একটা ম্লান হাসি হাসল। তার চোখ দুটো ছিল বড় বড় আর কালো, গায়ের রঙটা সোনালি আভাময়।


​“তুমি কি কোনো কারণে চিন্তিত?”


​জারতাশা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। “ফারিস যে কোথায় রয়ে গেল, বুঝতে পারছি না।” তারপর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা সাদিকে ডাকল, “সাদি!”


​সাদি জুমারের সঙ্গে হাসিমুখে কিছু একটা বলছিল। ডাক শুনে সে চট করে ঘুরল এবং বাধ্য ছেলের মতো হেঁটে ওনাদের কাছে চলে এল। “জি!”


​“ফারিস কোথায়?”


​“Oh... উনি তো হানিনকে ওর এক ফ্রেন্ডের ওখানে নিয়ে গেছেন। আম্মু বারণও করেছিলেন, কিন্তু...” ঠিক তখনই কেউ একজন সাদিকে ডাকল। সে মৃদু হেসে হাশিম ভাইকে বিদায় জানিয়ে আবার ওদিকে চলে গেল।


​“Oh...হানিন ও আচ্ছা, সাদির ওই ছোট চালাক বোনটা।” হাশিমের মনে পড়ল। সে মুচকি হেসে এক গভীর দৃষ্টিতে জারতাশার মুখের দিকে তাকাল, যেখানে একটা চাপা ক্ষোভ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।


​“তার মানে ফারিস আবারও একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গায়েব?”


​“বাড়ি থেকে তো পার্টির জন্যই তৈরি হয়ে বের হয়েছিল। তারপর যে কী হলো! ও তো সাধারণত সব অনুষ্ঠানে এমন করে না।”


​“হ্যাঁ, ও শুধু সেই অনুষ্ঠানেই এমনটা করে, যেখানে ও থাকে।” হাশিম খুব ধীর গলায় কথাগুলো বলে নিজের ভ্রু দিয়ে একদিকে ইশারা করল। জারতাশা চমকে উঠে সেদিকে তাকাল। সাদি আর জুমার তখন জওয়াহেরাতের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। জারতাশা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে আবার হাশিমের দিকে তাকাল।


​“উনি তো সাদির ফুপ্পু।”


​“আর ফারিসের পুরোনো টিচারও বটে। তুমিই কি আমাকে বলোনি যে, জুমারের আব্বু যখন তোমাদের বিয়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন, সেখান থেকেও ফারিস কিছুক্ষণ পরেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল? আর আমি যখন জুমারসহ তোমাদের সবাইকে invite করতে চেয়েছিলাম, তখন ও নিজেই আমাকে বলেছিল যে, আমার জুমারকে ডাকা উচিত হবে না, শুধু পরিবারের লোকজন থাকলেই যথেষ্ট।”


​“তো?”


​“Oh! তুমি কি জানো না যে ফারিস জুমারের জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল? কিন্তু কোনো এক কারণে ওরা রিজেক্ট করে দেয়। সাদি একবার আমাকে এই কথা বলেছিল।” হাশিম বেশ অবহেলার সঙ্গে কাঁধ ঝাঁকাল। জারতাশা একদম বাকরুদ্ধ হয়ে সব শুনতে লাগল।


​“আমি তো এই কথা কোনোদিন শুনিনি!”


​“তোমার বিয়েরই বা আর কতদিন হয়েছে? মাত্র পাঁচ মাস!”


​জারতাশা নিজের ঘাড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে জুমারের দিকে তাকাল। জুমার তখন সারার সঙ্গে কথা বলছিল। তার মুখের একপাশ দেখা যাচ্ছিল। কোঁকড়ানো চুলের একটা লট গালের ওপর এসে পড়েছে, আর মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি। হিরের নাকফুলটা ঠিক ওই পাশেই জ্বলজ্বল করছিল। জারতাশা এক তীব্র ক্ষোভ আর রাগে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল।


​“যদিও আমার তোমাকে এসব বলা উচিত হয়নি। আমি নিশ্চিত, ওদের দুজনের মাঝে এখন আর কিছুই নেই। এটা একটা পুরোনো কাসুন্দি।” হাশিম গ্লাসটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে এক চুমুক দিয়ে বলল। তারপর আবার বলল, “এই শাড়িটা খুব সুন্দর। এটা কি সেই ডিজাইনারেরই, যেখানে শেহরিন তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল?”


​জারতাশার চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা নেমে এল। সে ডানে-বামে মাথা নাড়ল।


​“ফারিস বলল যে ও এটা afford করতে পারবে না, তাই আমি অর্ডারটা cancel করে দিয়েছি।”


​“এটা কেমন কথা? Payment না হয় শেহরিনের বিলের সঙ্গে অ্যাড হয়ে যেত। তুমি আমাকে জানাতে পারতে।”


​“ফারিসের ওটা ভালো লাগত না। বাদ দিন না, হাশিম ভাই,” সে বেশ মন খারাপ করে মুখ ফিরিয়ে নিল।


​অরঙ্গজেব কারদার ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় সাদির পাশে এসে থামলেন। (তিনি জুমারের দিকে একবার তাকিয়েও দেখলেন না।) তিনি নিজের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া নিয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে ওকে প্রশ্ন করলেন, “তোমার বোন এখনও কেন আসেনি?” ওনার মুখে একধরনের কর্কশ ভাব আর চরম শীতলতা ছিল। সাদি তৎক্ষণাৎ ওনাকে কারণটা বুঝিয়ে বলতে লাগল। তিনি একটা ঠান্ডা ‘হুম’ শব্দ করে সামনে এগিয়ে গেলেন। সাদি যখন ফিরে এল, জুমার তখন সারার সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। সে বেশ বোর হয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। ঠিক তখনই মেইন গেটের দিক থেকে জায়গা ছেড়ে ভেতরে আসতে থাকা শেহরিনের ওপর তার নজর পড়ল। শেহরিনও সাদির ওপর এক তীব্র ও কঠোর নজর ছুঁড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। সাদি একদম নিশ্চুপ রইল। নওশেরওয়ান তখন ইংল্যান্ডেই ছিল। ও যদি আজ এখানে থাকত, তবে হয়তো সাদি এই পার্টিতেই আসত না।


​লাউঞ্জের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবাইকে খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকা ওয়ারিসের মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠল। সে ফোনটা বের করে মেসেজটা দেখল। System-এর একটা alert আসছিল। ওয়ারিস নিজের জায়গায় একদম জমে গেল। তার কম্পিউটারটা ছিল তার হোস্টেলের ঘরে, আর এই মেসেজটা তাকে সংকেত দিচ্ছিল যে কেউ একজন ওটা অন করার চেষ্টা করছে!


​তার মানে, এই মুহূর্তে কেউ একজন তার ঘরে ঢুকেছে?


​তার পুরো মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে সারার কাছাকাছি এসে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল—


​“আমি একটা জরুরি কল করার জন্য লনে যাচ্ছি। যদি বেশি দেরি হয়ে যায়, তবে সবাইকে বলে দিও আমি এদিক-ওদিক আছি। আর যদি আমি তাড়াতাড়ি ফিরতে না পারি, তবে ফারিস আমাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে।”


​সারা বেশ অবাক হয়ে ওর দিকে ঘুরল, তবে পরিস্থিতি বুঝে মাথা নাড়ল। ওয়ারিস খুব ধীর পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে আসতেই তার হাঁটার গতি তীব্র হলো, আর মনে এক অজানা আশঙ্কার ঝড় বয়ে যেতে লাগল।


​ডাইনিং হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে অন্য কারও সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে থাকা হাশিম বিন্দুমাত্র টেরও পেল না যে ওয়ারিস কখন সেখান থেকে কেটে পড়েছে। এই ধরনের সমস্ত report তাকে খাওয়ার দিয়ে থাকত, আর খাওয়ার সেখানে ছিল না। এমনকি তার কোনো কলও আসেনি।


​হাশিমের মনের ভেতর কোনোমতে চেপে রাখা অস্থিরতাটা এবার ধীরে ধীরে আরও বাড়তে লাগল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



(Jeene ke fasaane rehne do ab in mein ulajh kar kya lenge)


[জীবনের এই গল্পগুলো এখনকার মতো থাক, এগুলোতে জড়িয়ে এখন আর কী-ই বা লাভ হবে!]


​হোটেলের রেস্তোরাঁ এরিয়ার সেই হালকা হলুদ আলো চারপাশে এক জাদুকরী ও মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। হানিন এবং ফারিস মুখোমুখি বসে ছিল, আর হানিনের মাথাটা নিচু হয়ে ছিল। ওরা বাড়ি যায়নি, সরাসরি এখানেই চলে এসেছে। এখন নিজের মুখের এই আচমকা কথা ফসকে যাওয়ার কারণে হানিন ভেতরে ভেতরে ভীষণ লজ্জিত বোধ করছিল।


​“তুমি ওই nose pin এর  ব্যাপারটা কীভাবে জানলে?” ফারিস বেশ গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত নরম গলায় জিজ্ঞেস করল। হানিন বেশ অভিমানী মুখে মাথা তুলল।


​“আমি আপনার গাড়িতে ওটা দেখেছিলাম। আমি কি জানতাম যে আপনি ওটা ফুপ্পুকে এভাবে পাঠিয়ে দেবেন?”


​“আমি ওটা ওভাবে পাঠাইনি,” ফারিসের কপালে স্বভাবসুলভ একটা ভাঁজ পড়ল। “আমি একদম পরিষ্কার করে বলছি, সেই সময়ে আমার মনে হয়েছিল ওনার সঙ্গে আমার বিয়েটা হয়ে যাবে আর উনি আমার হাতের লেখা খুব সহজেই চিনে ফেলবেন। নামটা এই কারণেই লিখিনি, যাতে অন্য কেউ দেখে ভুল না বোঝে।”


​“তাহলে আপনি জারতাশা আন্টিকে কেন বিয়ে করলেন?”


​“কারণ তোমার ফুপ্পুর ওখান থেকে বিয়ের প্রস্তাবটা রিজেক্ট হয়ে গিয়েছিল। ব্যস, কথা ওখানেই শেষ। আপা বলছিলেন জারতাশাকে বিয়ে করে নিতে, আমি করে নিলাম। আমি আমার এই বিয়ে নিয়ে বেশ খুশিতেই আছি।”


​“কিন্তু আমি একদম খুশি নই! আমার ফুপ্পুর ওপর বড্ড রাগ হচ্ছে যে উনি কেন ওভাবে রিজেক্ট করে দিলেন?”


​“ওর আম্মু রিজেক্ট করেছিলেন। ও হয়তো এই ব্যাপারে কিছুই জানত না।”


​“আমি এসব বিশ্বাস করি না।”


​“Whatever, হানিন। আমি তোমাকে এসব কথা শুধু এই কারণেই বলছি, যাতে তুমি এই ব্যাপারটা নিজের মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলো। ওর সঙ্গে আমার কোনো affair ছিল না। এখন ওনার বিয়ে হতে চলেছে। আমাদের মুখ থেকে এমন কোনো কথাই যেন বের না হয়, যা ওনাকে বিন্দুমাত্র hurt করে।”


​“Okay,” হানিন নিজের মাথাটা আরও নিচু করে নিল। ফারিস কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে রইল।


​“ওনাকে বলো যে, এই নাকফুলটা এখন আর ওনার ওপর একদম suit করে না। ওটা খুলে অন্য কোনোটা যেন পরে নেন।”


​“আমি বলেছিলাম, আপনার বিয়ের ঠিক পরের দিনই বলেছিলাম। কিন্তু উনি বললেন যে ওনার নাকি এই নাকফুলটার অভ্যাস হয়ে গেছে, আর উনি যেকোনো পরিবর্তনের সঙ্গে খুব দেরিতে adjust করতে পারেন, তাই ওটাই পরে থাকবেন।”


​ফারিস আলতো করে মাথা নাড়ল, সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসল। জুসের গ্লাসটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে সে মৃদু হাসল। “তোমাকে তো বেশ ভয় পাওয়া উচিত, হানিন!”


​সামান্য একটু হেসে হানিন চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল।


​“এই কারণেই তো বলছি, আপনি আলিশাকে নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। ও কোনো মিথ্যা কথা বলছে না। এখন আমাদের চলা উচিত, পার্টিতেও তো যেতে হবে।” সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, আর ফারিস নিজের ওয়ালেট বের করতে করতে উঠে দাঁড়াল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



(Woh aayein toh sar-e-maqtal tamaasha hum bhi dekhenge... yeh shak ki aakhri saa'at giraan kaisi bhi ho hamdam)


[ওরা যখন বধভূমিতে আসবে, তখন সেই তামাশা আমরাও দেখব... এই রাতের শেষ প্রহরটা যতই কঠিন হোক না কেন, হে বন্ধু!]


​ওয়ারিশ গাজীর হোস্টেলের ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে ছিল। খাওয়ার নিজের হাতে গ্লাভস পরে একটা চেয়ারে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করে যাচ্ছিল। একের পর এক অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র খুলে যাচ্ছিল। ডকুমেন্টগুলো সব encrypted ছিল। সেগুলোর লক ভাঙতে বেশ ভালোই সময় লেগেছে, আর এখনও প্রচুর কাজ বাকি রয়ে গেছে। সে বারবার অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিতে দরজার দিকেও তাকাচ্ছিল, যা সে ভেতর থেকে লক করে রেখেছিল।


​হঠাৎ করেই বাইরে জুতো ঠোকার শব্দ শোনা গেল। খাওয়ার অত্যন্ত চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে ল্যাপটপটা অফ করল। যে data copy হচ্ছিল, তার flash drive-টা এক টানে খুলে নিল। সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল, পরক্ষণেই আবার ঘুরল—“উঁহু, জানালা দিয়ে হবে না।” সে সোজা মানুষের সমান লম্বা আলমারিটার ভেতরে গিয়ে ঢুকল আর কবাট দুটো টেনে দিল। সে একদম প্রস্তুত ও চটজলদি ছিল—ওদিক থেকে কেউ আলমারি খুললেই সে তার ওপর আক্রমণ করবে।


​বাইরে চাবি ঘোরানোর আওয়াজ স্পষ্ট শোনা গেল। তারপর দরজাটা খুলে গেল। “Damn it! এটা নিশ্চয়ই ওয়ারিস হবে। হাশিম সাহেব কেন আমাকে জানালেন না যে ও পার্টি থেকে বেরিয়ে গেছে?” তার মনে চরম বিরক্তি জন্ম নিল।


​আলমারির কবাটের সামান্য একটু ফাঁক দিয়ে সে বাইরে নজর রাখল। ওয়ারিস ভেতরে ঢুকল, নিজের কোটটা সোফার ওপর ছুঁড়ে মারল আর জলদি গিয়ে জানালাটা চেক করল—ওটা ভেতর থেকেই লক করা ছিল। তারপর সে ল্যাপটপের দিকে এগিয়ে এল। স্ক্রিনটা তুলতেই দেখল, ওটা বন্ধ। ওয়ারিস ল্যাপটপের ওপর হাত রাখল—ওটা বেশ গরম ছিল! তার মানে, এইমাত্র কেউ এখানে ছিল!


​সে ল্যাপটপটা অন করে চেয়ারটা টেনে বসল। সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মোবাইলটা বের করল, একটা নম্বরে কল মিলিয়ে কানে ঠেকাল। খাওয়ার আলমারির দরজাটা ধরে আরও একটু সামনে এগিয়ে এসে ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। ওয়ারিসের পিঠ ছিল তার দিকে। সে এতখানি কাছাকাছি বসে ছিল যে খাওয়ার তার নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। খাওয়ার নিজের অন্য হাতটা মুখের ওপর চেপে ধরে নিজের শ্বাস যেন পুরোপুরি বন্ধ করে রাখল।


​“স্যার! আমি খুব ভালো করে জানি যে আপনি আমাকে হাশিমের হাতে বিক্রি করে দিয়েছেন,” ওয়ারিস অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে ফোনে বলছিল। “তাই এখন আপনি চাইলে আমাকে চাকরি থেকে dismiss করে দিতে পারেন, কিন্তু আমি সেই সমস্ত প্রমাণ আর record একটা অন্য agency-র কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এখন আমরা দুজনই শুধু এই রহস্যের একমাত্র অংশীদার থাকব না। এবার হাশিম আর তার মায়ের বিরুদ্ধে Anti-Terrorism Act-এর অধীনে investigation হওয়া থেকে আপনিও ওদের আটকাতে পারবেন না। আমি যা বললাম, তা কি আপনি শুনতে পেয়েছেন, স্যার?!”


​সে চরম রাগে ফোনটা কেটে টেবিলের ওপর রাখল। সে বেশ ঘন ঘন গভীর শ্বাস নিচ্ছিল। এক অপরিসীম দুঃখ, রাগ আর চরম অসহায়তা তার পুরো অবয়ব থেকে যেন উপচে পড়ছিল। এবার যা হওয়ার হবে, সে যা করবে—পুরো দুনিয়া তা দেখবে।


​সে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এবার নিজের ইমেইলটা ওপেন করল। ইমেইল অপশনে ক্লিক করে ফারিসের ইমেইল অ্যাড্রেসটা টাইপ করল। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে কিছু একটা ভেবে সে ডকুমেন্টগুলো ওপেন করতে লাগল—ওকে ফারিসকে ঠিক কী কী পাঠাতে হবে?


​খাওয়ারের চোখ দুটো চরম দুশ্চিন্তায় সংকুচিত হয়ে এল। সে ফারিসের নামের প্রথম অক্ষরগুলো পরিষ্কার পড়ে ফেলেছিল। সে খুব ভালো করেই জানত যে এই ইমেইলটা চলে যাওয়ার আসল মানেটা ঠিক কী হতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে সে মাত্র এক মুহূর্ত সময় নিল আর এক দমকা ঝড়ের মতো আলমারির কবাট দুটো ধাক্কা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ওয়ারিস চমকে উঠে যেমনই ঘুরতে যাবে, তার আগেই খাওয়ার নিজের পিস্তলের বাঁট দিয়ে তার মাথার পেছনে এক সজোরে আঘাত করল। সে উপুড় হয়ে কম্পিউটার টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ল এবং তারপর নিচে গড়িয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরে এক শ্মশান নীরবতা নেমে এল।


​খাওয়ার নিচে ঝুঁকে ওকে সোজা করল। ওয়ারিসের বন্ধ চোখ দুটো সামান্য একটু খুলে গেল। সে যন্ত্রণায় চরমভাবে কাতরাচ্ছিল। সে খাওয়ারকে দেখে ফেলল। তার চোখ দুটোয় এক তীব্র ক্ষোভ ফুটে উঠল। সে খাওয়ারের কলার ধরার এক আপ্রাণ চেষ্টা করল।


​“তোমাকে হাশিম পাঠিয়েছে, না...?” কিন্তু খাওয়ার অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে তার দুটো হাত চেপে ধরে মুচড়ে দিল। ওকে উপুড় করে মেঝেতে ফেলে রেখে, নিজের হাঁটু দিয়ে ওর পিঠের ওপর পুরো শরীরের চাপ দিয়ে ওকে চেপে ধরে রাখল আর হাত দুটো পেছনে এনে শক্ত করে ধরল। অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে ওকে কাবু করে নিজের পকেট থেকে একটা দড়ি বের করল, যা সে এই ধরনের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সবসময় সঙ্গে রাখত। সে ওর হাত দুটো বেঁধে ফেলল। মাথার সেই চোটের তীব্র যন্ত্রণায় ওয়ারিসের চোখ দুটো বারবার বন্ধ হয়ে আসছিল, তবুও সে নিজেকে সজ্ঞান রাখার আর একটা শেষ প্রতিরোধের চেষ্টা করে যাচ্ছিল। সে নিজের পা বাঁকিয়ে খাওয়ারকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু খাওয়ার তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং বিশেষভাবে trained ছিল। সে চরম কঠোরতায় ওকে নিচে চেপে ধরে রাখল আর ওর গোড়ালি দুটো একসঙ্গে বেঁধে ফেলল। তারপর সে উঠে দাঁড়াল, নিজের গায়ের পোশাকটা ঝেড়ে নিল। নিজের বুট জুতোটা ওয়ারিসের পিঠের ওপর চেপে ধরে ওকে পাশ ফিরতে বাধা দিয়ে সে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল।


​হাশিম তখনও হাসিমুখে লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলছিল। যখন তার মোবাইলটা বেজে উঠল, সে স্ক্রিনে খাওয়ারের নাম দেখল। এক মুহূর্তে ওনার মুখের সমস্ত হাসি উধাও হয়ে গেল। সে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ওপরে চলে এল। নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভালো করে লক করল এবং মোবাইলটা কানের কাছে ধরল।


​“হ্যাঁ, বলো!”


​“আপনার তো আমাকে জানানো উচিত ছিল যে ও ওখান থেকে বেরিয়ে গেছে!”


​“ও ওখান থেকে বেরিয়ে গেছে?!” হাশিম এক পরম অবিশ্বাসের সঙ্গে কথাটা পুনরাবৃত্তি করল।


​“ও একদম আমার সামনে চলে এসেছিল। আমাকে বাধ্য হয়ে ওকে কাবু করতে হয়েছে। ও ফারিসকে সমস্ত ডকুমেন্ট ইমেইল করছিল।”


​“তুমি কী আবোলতাবোল বকছ? ও কি তোমাকে দেখে ফেলেছে?” হাশিম নিজের গলার আওয়াজ চেপে ফুঁসে উঠল। ওনার পুরো মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল।


​“আপনি এই ফাইলগুলো ভালো করে দেখেননি, স্যার। ওর কাছে সমস্ত প্রমাণ আছে, সাক্ষী আছে, সমস্ত records আছে—এমনকি আপনার নিজের sign করা কাগজ পর্যন্ত! আর আমি যদি ওকে এই মুহূর্তে না আটকাতাম, তবে ও এই সবকিছু ফারিসকে পাঠিয়ে দিত।”


​“ধিক্কার তোমাকে, খাওয়ার! একটা কাজও তুমি ঠিকঠাক মতো করতে পারলে না!” হাশিম নিজের ঘরের ভেতর পায়চারি করতে করতে চরম রাগে বলতে লাগল।


​ওয়ারিস অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ কণ্ঠে নিজের ঘাড়টা সামান্য একটু ঘোরাল। তার গলা থেকে এক অবরুদ্ধ ও ভাঙা ভাঙা আওয়াজ বের হলো—


​“হাশিমকে বলো... ও এর হিসাব দেবে।”


​খাওয়ার চরম বিরক্তি আর রাগে নিজের বুট জুতো দিয়ে সজোরে এক লাথি মারল ওয়ারিসের পাঁজরের ওপর। ওয়ারিস যন্ত্রণার মাঝেও সামান্য একটু হাসল।


​“এখন বলুন, আমার জন্য আপনার কী হুকুম? ওর গল্পটা যদি এখানেই শেষ করে দিই, তবে আর কোনো প্রমাণই বাকি থাকবে না।”


​“না, একদমই না!” সে চরম ব্যাকুলতার সঙ্গে বলল। ওনার মুখে তখন ঘাম জমতে শুরু করেছিল। কপালে হাত রেখে সে খাটের এক কোণে বসে পড়ল। ওনার চারপাশের দুনিয়ায় যেন একের পর এক বোমা ফাটছিল।


​“স্যার? জলদি বলুন, আমি কী করব?”


​“থামো। আমাকে কয়েকটা মুহূর্ত সময় দাও। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত, খাওয়ার...” এক বিবর্ণ মুখ আর শূন্য চোখে কথাগুলো বলতে বলতে হাশিম মোবাইলটা কানে রেখেই ঘরের দরজাটা খুলল। রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে সে নিচের দিকে তাকাল।


​লাউঞ্জের ঠিক মাঝখানে সারার বাচ্চা দুটো দাঁড়িয়ে ছিল। সারা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ওদের একজনের জুতোর ফিতে বেঁধে দিচ্ছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে বেশ নরম সুরে ওকে বকাঝকা করছিল—নিশ্চয়ই এমন কোনো কথা, যা ছোটবেলায় ওর নিজের মা-ও ওকে বলতেন, “খোলা ফিতের জুতো পরে দৌড়াতে নেই। ফিতে যদি জুতোর নিচে পড়ে, তবে একদম উপুড় হয়ে আছড়ে পড়বে।”


​সে অপলক চোখে অত্যন্ত দুর্বল ও নিস্তেজ মনে ওই দুটো নিষ্পাপ বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রইল। ওনার ঘাড়টা নিজের অজান্তেই ডানে-বামে না-সূচকভাবে হেলে উঠল।


​সে কি সত্যিই এমনটা করতে পারত? তার কাছে কি এই সবকিছু করার পেছনে এমন কোনো কারণ ছিল, যা এই বাচ্চাদের নিষ্পাপতার চেয়েও অনেক বড় ও মহান ছিল?


​তার দৃষ্টি এবার ওদের ছাড়িয়ে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা অরঙ্গজেব কারদারের ওপর গিয়ে থমকে গেল। তিনি নিজের এক রাজনীতিক বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কিছু একটা বলছিলেন। তিনি কি সত্যিই খুশি ছিলেন, নাকি স্রেফ রাজনীতির এক মহড়া দিচ্ছিলেন? এক নতুন ক্যারিয়ার, এক নতুন বাজি। তিনি কি এই মুহূর্তে ওনার কোনো scandal publish হওয়া afford করতে পারতেন? কোনো affair থাকত, কোনো অবৈধ সন্তান থাকত—তা-ও না হয় মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু উপজাতীয় অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক? কোনোদিনই না!


​হাশিম আবার ঘরের ভেতরে চলে এল। ফোনটা তখনও কানের কাছে ধরা ছিল। খাওয়ার ওপাশ থেকে উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। হাশিম নিজের মুখ থেকে কথাটা বের হতে শুনল—


​“খাওয়ার! এটা যেন suicide মনে হয়।” আর এই বলেই সে মোবাইলটা খাটের ওপর ছুঁড়ে মারল। নিজের কোটটাও গা থেকে খুলে ওখানেই ফেলে দিল।


​খাওয়ার ওপাশ থেকে হুকুমটা শুনে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করল, তারপর কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস নিল। চোখ খুলে সে নিজের বুট জুতোটা ওয়ারিসের পিঠ থেকে সরিয়ে নিল। নিচে ঝুঁকে সে ওকে টেনে তুলল। সে প্রায় আধমরা হয়ে কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল। তার চোখ দুটো বারবার বুজে আসছিল আর সে ওগুলো জোর করে খোলার এক শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল।


​“তুমি... কী... চাও...?” খাওয়ার নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে শক্ত করে ওর মুখের ভেতর গুঁজে দিল। কাছের টেবিলটা আরও একটু টেনে এনে সে ওয়ারিসকে ওটার ওপর বসাল। তারপর ঘাড় তুলে ছাদের ceiling fan-এর দিকে তাকাল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


​নিজের ঘরের দিকে হেঁটে যাওয়া হাশিমের একেকটা কদম যেন মনের পর মন ভারী হয়ে উঠছিল। সে বাথরুম পর্যন্ত এল। দরজার চৌকাঠটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। নিজের চোখ দুটো বন্ধ করল। এক চরম যন্ত্রণা, কষ্ট আর দম বন্ধ করা এক অনুভূতি। সে বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


​খাওয়ার বিছানার চাদরগুলো সব এক জায়গায় জড়ো করল। সেগুলোতে শক্ত করে গিঁট দিল। ফ্যানের চারপাশ দিয়ে একটা ফাঁসের মতো করে ঝুলিয়ে দিল। ওয়ারিস এই পুরোটা সময় অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে টেবিলের ওপর বসে ছিল। তার ঘাড়টা বারবার বাঁ দিকে হেলে পড়ছিল আর সে বারবার ওটা সোজা করার চেষ্টা করছিল। মাথার সেই আঘাতটা ঠিক এমন এক angle-এ করা হয়েছিল যে, তার ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা ইতিমধ্যেই একদম দমে গিয়েছিল। খাওয়ার ওকে দুই কাঁধ ধরে ওপরের দিকে টেনে তুলল, কিন্তু ওয়ারিস নিজের শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। খাওয়ার নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে আরও দ্বিগুণ শক্তিতে ওকে ওপরের দিকে টানতে লাগল। ওয়ারিসের মাথাটা ওপরে উঠতেই চোখের সামনে সেই মৃত্যুর ফাঁসটা দুলতে দেখল। সে এক পরম অবিশ্বাসের সঙ্গে খাওয়ারের দিকে তাকাল। সেই চোখ দুটোর মাঝে কোনো ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক সীমাহীন অবিশ্বাস। আর হয়তো এক গভীর দুঃখ এবং এক চরম মানসিক আঘাত।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


​হাশিম নিজের চোখ দুটো খুলল।


​বাথরুমের দরজাটা ধাক্কা দিয়ে সে ভেতরে পা রাখল। শরীরের ওলটপালট হওয়া উত্তাপটা বাড়তেই অটোমেটিক লাইটগুলো নিজের থেকেই জ্বলে উঠল। পুরো বাথরুমটা আলোয় আলোকিত হয়ে গেল।


​ওয়াশবেসিনের জায়গাটা বেশ বড়সড় ছিল। দুটো সিঙ্ক লাগানো ছিল আর ওপরে দেওয়াল ঘেঁষা একটা বিশাল আয়না। সে দরজার চৌকাঠ ছেড়ে স্ল্যাবটার কাছাকাছি এগিয়ে এল। দুই হাত দিয়ে ওটা শক্ত করে চেপে ধরল আর ওভাবেই ঝুঁকে পড়ল—ঠিক যেভাবে কোনো মানুষ বমি করার সময় নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


​খাওয়ার এবার ওকে পুরোপুরি সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ওর ঘাড়ের চারপাশে ফাঁসটা লাগাতে বেশ ভালোই কসরত করতে হচ্ছিল, কারণ ও তখনও বাধা দেওয়ার এক শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল—নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা। একটা শেষ চেষ্টা, একটা শেষ আশা। Oh! জীবন মানুষের কাছে কতখানি প্রিয় হয়! কিন্তু ফাঁসটা শেষমেশ লেগেই গেল। একদম শক্ত ও জোরালো একটা ফাঁস। খাওয়ার নিচে নেমে এল, বুকের ভেতর এক দীর্ঘ আর শীতল শ্বাস টেনে নিল, যা তার হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপন ধরিয়ে দিল আর তারপর... সজোরে টেবিলটার ওপর এক লাথি মারল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


​হাশিম নিজের মাথা তুলে আয়নার দিকে তাকাল। ওনার চোখ দুটো একদম লাল টকটকে আগুনের গোলার মতো দেখাচ্ছিল। সে নিচের দিকে ঝুঁকে জলের নলের নিচে হাত নিয়ে গেল। জলের ধারা নিজে থেকেই বয়ে চলল।


​দুই হাতের তালু এক জায়গায় জড়ো করে সে এক আঁজলা জল মুখে ছুঁড়ে মারল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। জলের ফোঁটাগুলো তার মুখ বেয়ে গড়িয়ে গলার ত্বকে লেপ্টে যেতে লাগল। তার গায়ের শার্ট, হাতের কাফ—সবকিছু একদম ভিজে একাকার হয়ে গেল।


​খাওয়ার লাথি মেরে টেবিলটা সরিয়ে কিছুটা পেছনে হটে গেল। ওয়ারিস নিজের মাথাটা এদিক-ওদিক ঝাঁকিয়ে নিজেকে মুক্ত করার এক শেষ চেষ্টা করল। আর মাত্র কয়েকটা ছটফটানি... শ্বাসটুকু একেবারে গলার কাছে এসে আটকে গেল। জীবনের সেই শেষ সুতোটাও ছিঁড়ে গেল। ফ্যানের সেই রাক্ষুসে ফাঁসে ঝুলতে থাকা লাশটা এক মুহূর্তে একদম নিথর, শান্ত হয়ে গেল।


​খাওয়ার জলদি জলদি তার হাতের বাঁধনগুলো খুলে দিল, পায়ের দড়িটাও আলাদা করে দিল। দড়িটা অত্যন্ত সাবধানে একটা প্লাস্টিক ব্যাগের ভেতর চালান করে দিল। মুখের ভেতর গুঁজে রাখা সেই কাপড়টা বের করে ব্যাগে ভরে ওটা সিল করে দিল। আর তারপর তার ঘরের সমস্ত কাগজপত্র, ল্যাপটপ ইত্যাদি এক জায়গায় গুছিয়ে নিতে লাগল।




চলবে,,,,



Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)