নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৬ পর্ব ২৩, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৬


পর্ব ২৩:-


Chalney hi ko hai ik samoom abhi... raqs farma hai rooh-e-barbadi


[এখনই এক তপ্ত ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার উপক্রম... আর ধ্বংসের আত্মা যেন তাণ্ডব নৃত্যে মেতে উঠেছে।]


"তুমি একটা তীর দিয়ে আসলে কয়টা শিকার করতে চাইছো হাশিম? যদি কোনো কিছু ভুল হয়ে যায়, তখন কী হবে?"


"আরেকবার মন দিয়ে প্ল্যানটা শুনে নিন মাম্মি। কোনো কিছুই ভুল হবে না। আমরা জুমারের ওপর ফায়ারিং করব, আর গান ব্যবহার করা হবে ফারিসের। হোটেলের যে রুমটা থেকে গুলি চালানো হবে, ওটাও ওর নামেই বুক করা থাকবে। এমনকি গানের ওপর ফারিসের ফিঙ্গারপ্রিন্টসও পাওয়া যাবে।"


"আর যদি সে মরে যায়?" জওয়াহেরাত বড্ড শঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন।


"আমরা ওনাকে মারতে চাইছি না মাম্মি। সে আপাতদৃষ্টিতে ফারিসকে তদন্ত করছে আর ওর ওপরই সন্দেহ করছে। এমন পরিস্থিতিতে জুমারের কাছে এই অ্যাটাকটাকে স্রেফ একজন অপরাধীর নিজেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা বলে মনে হবে। সে এটাই ভাববে যে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে ফারিস নিজে এই সবকিছু ঘটিয়েছে।"


"আর সে যদি এটাকে ফারিসের বিরুদ্ধে একটা কনস্পিরেসি বা চক্রান্ত মনে করে, তবে?"


"উঁহু!" হাশিম এবার প্রথমবার প্রাণখুলে হাসল আর খাওয়ারের দিকে তাকাল। খাওয়ারও মুচকি হাসল। জওয়াহেরাত এক এক করে দুজনের মুখের দিকে তাকালেন।


"আমি কি কোনো কিছু মিস করছি?"


"জুমার কোনোদিনও ভাববে না যে এটা ফারিসের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত। সে ফারিসকেই একমাত্র দোষী মনে করবে, কারণ এই কথাটা ফারিস নিজেই ওনাকে বলবে।"


"ওকে, কিন্তু ফারিস ওনাকে এই কথা কেন বলতে যাবে?" জওয়াহেরাত এবার কিছুটা বিরক্ত হতে শুরু করেছিলেন।


"সেটা এভাবে মাম্মি, আমরা ফারিসের তরফ থেকে জুমারকে ঠিক এই কথাটাই বলিয়ে নেব।"


"কখনোই না হাশিম!" জওয়াহেরাত বড্ড বিরক্তির সাথে নিজের মাথা নাড়লেন। "জুমার আজকেও ফারিসের নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত, আর কালকেও থাকবে।"


"আমরা ওনাকে ফারিসের ফোন থেকে কল করব।" এই বলে হাশিম খাওয়ারের দিকে ইশারা করল। খাওয়ার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে জওয়াহেরাতের সামনে ধরল। তিনি এক গভীর সন্দেহভরা চোখে ওটার দিকে তাকাতে তাকাতে কাছে এগিয়ে এলেন।


"তোমরা দুজন কি একটু স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করবে?" খাওয়ার নিজের মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল এবং স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বড্ড বিনীত সুরে বোঝাতে লাগল।


"আমি এই সফটওয়্যারটার ভেতর ফারিসের আগের সমস্ত রেকর্ডিংগুলো লোড করে দিয়েছি, যা যা আমার কাছে ছিল। আমরা গত এক সপ্তাহ ধরে ওর ফোন ট্যাপ করছিলাম। এখন দেখুন।"


সে কয়েকটা বোতাম টিপে আরও কিছু পেজ খুলতে লাগল। জওয়াহেরাত বরাবরের মতোই এক অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ওটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।


"আমি এখানে যা-ই টাইপ করব, তা হুবহু ফারিসের গলার আওয়াজে রূপ নিয়ে সামনে আসবে। আমরা ফারিসের ফোন নম্বর ব্যবহার করেই প্রসিকিউটরকে কল করব। আর আমাদের লিখে রাখা স্ক্রিপ্টটা ওর নিজের গলার আওয়াজে পড়া হবে। সে এটাই ভাববে যে ওপাশ থেকে ফারিস নিজেই কথা বলছে, আর ওনার ওপর অ্যাটাক করার ঠিক আগে ওনার সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিজের ভেতরের জমানো শেষ বোঝাটা হালকা করছে। সে ভাববে ফারিস ওনাকে শেষ করে দিয়ে নিজের বিরুদ্ধে থাকা শেষ প্রমাণটুকুও মুছে দিতে চাইছে। কিন্তু যেহেতু সে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাবে, তাই সে এই কলটাকেই ফারিসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।"


"অবশ্যই জুমারের কাছে এই রেকর্ডিংটা থাকবে না। কিন্তু ফারিসের এই শেষ কথাগুলো ওনার সারাজীবন মনে থাকবে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজেই ওর বেইল বাতিল করাবে আর সে-ই হবে ওর বিরুদ্ধে কোর্টের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। আমাদের নিজেদের কিচ্ছু করতে হবে না। ওনারা দুজনে নিজেই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।"


জওয়াহেরাত কিছুটা বিস্ময় নিয়ে ওনাদের দুজনের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে ওনাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল।


"হাশিম! যদি কোনো কিছু ভুল হয়ে যায়? যদি জুমার আমাদের এই চালে পা না দেয়? সে যদি এই সবকিছুকে একটা সাজানো প্ল্যান বলে ধরে ফেলে, তখন?"


"তখন আমাদের ভাগ্যের ফয়সালা ওনার হাতে চলে যাবে। তবে আমি আমার পরিবারের জন্য ভালো কিছুরই আশা রাখতে চাই।" সে নিজের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বড্ড স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল।


জওয়াহেরাত বড্ড কষ্ট করে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়লেন, কিন্তু তিনি মনে মনে মোটেও খুশি হতে পারছিলেন না। ওনার চোখের কোণায় এক তীব্র ছটফটানি আর আতঙ্ক স্পষ্ট ছিল। তখনই হুট করে কোনো একটা চিন্তায় চমকে উঠে সে হাশিমের দিকে তাকালেন।


"কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। ফারিস যদি সত্যিই ওয়ারিসকে খুন করে থাকে আর সে জুমারের সামনে কলে নিজের অপরাধ স্বীকারও করে নেয়, তবুও এই খুনের পেছনে আসল কারণ বা মোটিভটা কী হবে? অন্তত তোমাদের এই পুরো প্ল্যানের ভেতর আমি কোনো শক্ত কারণ দেখতে পাচ্ছি না।"


হাশিমের মুখের অভিব্যক্তি নিমেষেই বড্ড কঠোর হয়ে উঠল। ওর চোখ দুটো সরু হয়ে গেল, আর তার ভেতর এক অদ্ভুত হিংস্র অনুভূতি খেলা করতে লাগল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল, যেখান থেকে এইমাত্র জারতাশা বাইরে চলে গেছে। তারপর সে আবার নিজের মায়ের দিকে মুখ ফিরাল। এবার যখন সে কথা বলল, ওর গলার আওয়াজে এক গভীর ক্ষতের টান ছিল।


"খুনের কারণটা একদম আমাদের সামনেই আছে মাম্মি, আর আমি ওটাকে এই সবকিছুর মাঝে একদম নিখুঁতভাবে ফিট করে দেব। ভরসা রাখুন, হাশিম সব পরিস্থিতি সামলাতে পারে।" জওয়াহেরাত স্রেফ একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার মনে হলো সে হাশিমকে জিজ্ঞেস করেন যে সে খুনের কী কারণ সাজাচ্ছে? কিন্তু শেষমেশ ওনার আর জিজ্ঞেস করা হলো না। বুকের ওপর চেপে বসা পাথরের মতো বোঝাটা যেন দিন দিন আরও বেড়েই যাচ্ছিল। সে বড্ড নিস্পৃহ মনে ওখান থেকে উঠে চলে এলেন।


বাইরে আসতেই দেখলেন অওরঙ্গজেব কারদার লিভিং রুমে বসে আছেন। ওনাকে দেখেই জওয়াহেরাত নিজের মুখে এক কৃত্রিম হাসির মুখোশ এঁটে নিলেন এবং পরম আভিজাত্যের সাথে এসে বড় সোফাটায় বসলেন। এক পায়ের ওপর অন্য পা তুললেন। নিজের হাতটা সোফার হাতলের ওপর এলিয়ে দিয়ে হেসে ওনার দিকে তাকাতে লাগলেন।


ওনার মুখের চড়া ভাবটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। কিছুটা আত্মরক্ষামূলক কঠোরতা নিয়ে সে ওনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন—


"হাশিমকে বলো যত দ্রুত সম্ভব এই ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলতে। আমি এই মুহূর্তে এই ধরনের কোনো নোংরা স্ক্যান্ডাল একদমই সামলাতে পারব না।" জওয়াহেরাত হেসে মাথা নোয়ালেন। অন্তত এই একটা বিষয়ে ওনারা দুজনে একমত ছিলেন।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Raste dayar-e-dil ke bhi kitne ajeeb they... sab rahrow they koi yahan rehnuma na tha


[দিলের দুনিয়ার রাস্তাগুলোও কী অদ্ভুত ছিল... সবাই ছিল স্রেফ পথিক, কেউ এখানে পথপ্রদর্শক ছিল না।]


অ্যানেক্সির বাইরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। দোতলার মাস্টার বেডরুমে খাটের এক কোণায় বসে থাকা জারতাশার মুখের ওপর চিন্তার এক মস্ত বড় জাল বিছানো ছিল। সে নিজের চিবুকটা হাতের তালুর ওপর রেখে, আঙুল দিয়ে সামনের চুলের একটা লট পাকাতে পাকাতে দূরের কোনো এক অদৃশ্য বিন্দুর দিকে তাকিয়ে ছিল। বাথরুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ আসছিল। মাঝে মাঝে সে ঘাড় ঘুরিয়ে ওদিকে তাকাচ্ছিল আর পরক্ষণেই আবার শূন্যতায় চোখ রাখছিল।


ওর মনটা এই মুহূর্তে দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। হাশিমের সাথে বলা কথাগুলো, জুমারের বারবার নাম আসা, আর এই পরিস্থিতিতে ফারিসের অনুপস্থিতি — সবকিছু ওকে বড্ড গুলিয়ে দিচ্ছিল। যদি খাওয়ারের ওই পার্টিতে উপস্থিত না থাকাটা এতটা সাধারণ ব্যাপার হতো, তবে হাশিম ওভাবে আলাদা করে বিষয়টার উল্লেখ কেন করল? আর ওকে ওভাবে আসতে দেখেই বা ওনাদের মুখের রঙ কেন ওভাবে ফ্যাকাশে হয়ে গেল?


জারতাশার মনে এই মুহূর্তে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু একটা প্রশ্নেরও কোনো সঠিক উত্তর ওর জানা ছিল না।


হঠাৎ করেই ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। সে বড্ড বিরক্ত হয়ে খাট থেকে উঠল এবং হেঁটে সাইড টেবিলের কাছে এল। ফারিসের মোবাইলটা বাজছিল। স্ক্রিনের ওপর নাম উঠছিল — "ম্যাডাম জুমার"।


জারতাশার ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। চোখের কোণায় এক অদ্ভুত অপছন্দের ভাব ফুটে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সে ফোনটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর এক ঝটকায় ওটা তুলে নিল। বেশ জোরে বোতাম চেপে কানের কাছে ধরল। ওপাশটা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল।


"জি বলুন?"


"আমি ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর জুমার ইউসুফ বলছি।" জুমার কথা বলার সময় সামান্য একটু ইতস্তত করলেন। "আমি ফারিসের সাথে একটু কথা বলতে চাই।"


"আমি ফারিসের স্ত্রী বলছি। আপনার ফারিসের সাথে ঠিক কী কথা আছে?" জারতাশার গলার আওয়াজ বড্ড শুষ্ক আর শীতল ছিল। জুমার এক মুহূর্তের জন্য ওপাশে একদম চুপ হয়ে গেলেন।


"আপাতত আমি ঠিক আছি। কিন্তু আপনি যেভাবে আমার স্বামীর সাথে ব্যবহার করছেন, আমার মনে হয় না যে পরের বার আমরা এত মিষ্টি করে কথা বলতে পারব।" লাইনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক নিঝুম নীরবতা নেমে এল। তারপর জুমারের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, যাতে এক গভীর বিস্ময় লুকিয়ে ছিল।


"সরি, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না।"


"যদিও আপনার খুব ভালো করেই বোঝা উচিত ছিল যে আমার স্বামী একদম নির্দোষ। তবুও যেভাবে আপনি আমার স্বামীকে বারবার অপরাধী প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, এই সবকিছু দেখে আমার তো এটাই মনে হচ্ছে যে আপনি ওর ওপর নিজের কোনো পুরনো প্রতিশোধ নিচ্ছেন। আখের আমার স্বামী আপনার কী ক্ষতি করেছে?" সে কোনোমতে নিজের ভেতরের চরম রাগ চেপে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। এতদিনের মনের ভেতর জমতে থাকা তপ্ত লাভাটা আজ কোনো না কোনোভাবে ফেটে বেরোনোরই ছিল।


ওপাশে জুমার এক পরম বিস্ময় আর চমক নিয়ে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ওনার মুখের অভিব্যক্তিও বড্ড কঠিন হয়ে গেল। গলার আওয়াজ একদম সমতল হয়ে গেল।


"আমি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারছি না যে আপনি ঠিক কোন দিকে ইশারা করছেন। আমি স্রেফ ফারিস আর সাদির সাহায্য করতে চাইছিলাম। যাইহোক, ফারিস যখন আমার সাথে কথা বলার জন্য ফ্রি হবেন, ওনাকে দয়া করে জানিয়ে দেবেন যে কাল ওনাকে নিজের অ্যালিবাইয়ের সাথে আমার দেখা করাতে হবে। আর হ্যাঁ, ওনাকে বলবেন পরের কলটা যেন সে নিজেই আমাকে করে, কারণ আমার কাছে এই মুহূর্তে করার মতো আরও অনেক জরুরি কাজ পড়ে আছে।" খট করে ফোনটা কেটে গেল।


জারতাশা চরম ক্ষোভ নিয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সজোরে ওটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে মারল।


ঠিক তখনই বাথরুমের দরজাটা খুলতেই সে চমকে ঘুরে তাকাল। ফারিস ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বাইরে আসছিল। ওর চোখ আর মুখে এক তীব্র ক্লান্তি আর অস্থিরতার ছায়া ছিল। নিশ্চিতভাবেই সে এই কথোপকথনটা শুনতে পায়নি।


সে কাছে আসতেই জারতাশা বড্ড কষ্ট করে নিজের মুখের ভাব স্বাভাবিক করল। ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফোটাল।


"ম্যাডাম প্রসিকিউটরের ফোন এসেছিল। উনি চাচ্ছেন আপনি যেন ওনাকে একটা কল ব্যাক করেন।" ফারিস কিছুটা চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। চোখ দুটো সরু করে ওর মুখের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করল।


"আর কী বলছিলেন উনি?"


"এমন বিশেষ কিছু না।" সে ঘুরে খাটের অন্য পাশে চলে গেল আর হেয়ার ব্রাশটা তুলে নিয়ে চুলের ওপর থেকে নিচে টানতে লাগল। তবে ওর মুখের ওপর এক হালকা ভয়ের ছায়া ছিল। বুকটা দড়দড় করে কাঁপছিল।


ফারিসের মতো একজন চতুর মানুষকে ধোঁকা দেওয়া অন্তত জারতাশার জন্য এতটা সহজ ছিল না।


সে মুখ ঘুরিয়ে আয়নার ভেতর দিয়ে ওনাকে লক্ষ্য করতে লাগল। ফারিস এখন ফোনটা মিলিয়ে কানের কাছে ধরছিল। তারপর সে ঘুরে ঘরের সাথে থাকা বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াল।


জারতাশার সমস্ত মনোযোগ এখন ওখানেই আটকে ছিল। চুলে ব্রাশ চালাতে থাকা হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল।


"জি, আসসালামু আলাইকুম! ম্যাডাম, কেমন আছেন আপনি? আপনার ফোন এসেছিল।" সে ফারিসের গলার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।


সে হেয়ার ব্রাশটা টেবিলের ওপর রেখে বড্ড গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়াল। ফারিসের পিঠটা ওর দিকে ফেরানো ছিল। সামনে মস্ত বড় লন দেখা যাচ্ছিল আর তার ওপারে হাশিমের ঘরের বারান্দা। হাশিমের ঘরটা বরাবরই বেশ উঁচুতে ছিল আর ওনাদের এই ঘরটা কিছুটা নিচুতে। এই তফাতটা জারতাশা আজ অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে অনুভব করল।


"জি, সিওর ম্যাম! আমি কাল ওনাকে আপনার সাথে দেখা করিয়ে দেব। সময় আর জায়গাটা আমি আপনাকে টেক্সট করে দিচ্ছি।"


"ওকে।" ফারিস হয়তো আরও কিছু বলতে চাইছিল। কিন্তু ওপাশ থেকে সম্ভবত বড্ড শুষ্ক মুখে কথাটা মাঝপথেই কেটে দেওয়া হয়েছিল, তাই সে চুপ হয়ে গেল আর ফোনটা কেটে দিল।


সে যখন পেছন ফিরল, জারতাশাকে ওখানেই ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।


"কী বলছিলেন উনি?" সে বড্ড অবুঝ সেজে জিজ্ঞেস করল। যদিও ওর নিজের বুকের ভেতরটা তখন তীব্র বেগে কাঁপছিল।


ফারিস ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে সামনে এগিয়ে এল, নিজের কাঁধ দুটো সামান্য ঝাঁকাল। ওকেও কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছিল।


"কাল আমাকে ওনার সাথে আমার অ্যালিবাইয়ের দেখা করাতে হবে। ওটার কথাই বলছিলেন।" তারপর সে চুপ হয়ে গেল, যেন ও নিজেও জুমারের এই শুষ্ক জবাবে কিছুটা অবাক হয়েছিল বা হয়তো ওর খারাপ লেগেছিল।


জুমার কি সত্যিই ওকে একজন খাঁটি অপরাধী ভাবছে?


"আপনার কি মনে হয় যে ডিএ আপনাকে সত্যি অপরাধী ভাবেন?" জারতাশা বড্ড সাবধানে ওনার মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে কাছে এগিয়ে এল।


সে এতক্ষণ খাটের কোণায় বসে পড়েছিল, চট করে মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল। মুখের চড়া ভাবটা কিছুটা নরম হলো। আখেরে সে তো ওর স্ত্রী, ওর মনের ভাব তো পড়তে পারবেই। সে আলতো করে নিজের মাথা নাড়ল।


"হয়তো।"


জারতাশা মনের ভেতর কিছুটা সাহস পেল। নিজের ঘাড় উঁচিয়ে আরও বুকভরা আত্মবিশ্বাসের সাথে সে ওনার কাছে এল। ওনার কাঁধের ওপর পরম মায়ায় নিজের হাতটা রাখল।


"জুমার যা-ই বলুক না কেন, আমি খুব ভালো করেই জানি যে আপনি কিচ্ছু করেননি আর আমি জানি যে আপনি কোনো অপরাধী নন। নিশ্চিতভাবেই কেউ আপনাকে এই নোংরা চক্রান্তে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।" ফারিসের মুখের সেই কঠোরতা আরও কিছুটা কমে এল। সে আলতো করে হেসে নিজের মাথাটা নোয়াল — এমন এক মলিন হাসি যার ভেতর এক গভীর বিষণ্ণতা আর ক্ষতের দাগ স্পষ্ট ছিল।


"থ্যাঙ্ক ইউ জারতাশা! তোমার এই সাপোর্ট আমার জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার।" সে-ও জবাবে একটা মিষ্টি হাসি দিল।


তবে সে নিজের মনের ভেতর আগের চেয়েও অনেক বেশি অস্থির হয়ে উঠছিল।


কোন জিনিসটা আসলে ওকে এভাবে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল? হাশিমের বলা ওই একটা অর্থহীন আর অকারণ বাক্য? স্রেফ এই একটা সামান্য কথাই কি জারতাশাকে এতটা অস্থির করে তুলছিল?


সে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাগুলো দূর করতে চাইল, কিন্তু ভাবনাগুলোকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলা এতটা সহজ ছিল না।


ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর অঞ্জুর হাত দিয়ে পাঠানো সেই ভিডিও সিডিটা রাখা ছিল। যেহেতু ওটা শেহরিন পাঠিয়েছিল, তাই খাওয়ার এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র টের পায়নি আর হাশিমও জানতে পারেনি।


সে মনে মনে ভাবল — সে আগামীকালই ওটা চালিয়ে দেখবে। হ্যাঁ, একদম কালকেই!


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Lamhon se ab maamla kya ho... dil pe ab kuch guzar raha bhi nahi


[মুহূর্তগুলোর সাথে এখন আর কী-ই বা বোঝাপড়া হবে... এই অন্তরের ওপর দিয়ে তো এখন আর কিছুই বয়ে যায় না।]


জুমার যখন ফারিসের ফোনটা কেটে দিল, তখন সে ঠিক বাড়ির ভেতর ঢুকছিল।


ওনার মুখের ওপর এক অদ্ভুত বিরক্তি আর কিছুটা অপছন্দের ভাব ফুটে উঠেছিল। মোবাইলটা পার্সের ভেতর রাখতে রাখতে সে আপনমনেই কিছু একটা বিড়বিড় করলেন, যেন সে এই পুরো ঝুটঝামেলা আর নাটক নিয়ে চরম ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন।


কিন্তু সাদি — স্রেফ সাদির মুখের দিকে তাকিয়ে ওনাকে আরও কিছুটা সময় এই সবকিছু সহ্য করতে হবে। কে জানে বিয়ের পর ঠিক কী হবে? উফ...!!


মেইন দরজা খুলে সে করিডোরে এলেন। তারপর ড্রয়িংরুমের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় হুট করে থমকে দাঁড়ালেন। নেট বা জালির পর্দার ওপাশ থেকে মেহমানদের কথাবার্তা আর ওনাদের অস্পষ্ট মুখগুলো দেখা যাচ্ছিল।


একটু আড়ালে হয়ে সে ভালো করে তাকালেন। এখান থেকে সোফায় বসা স্রেফ হাম্মাদকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল — এক সুদর্শন শ্যামবর্ণ যুবক, যার চোখে চশমা ছিল, তবে এই মুহূর্তে সে বড্ড অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতিতে বসে ছিল।


বাকি ওনার মায়ের মুখটা এখান থেকে দেখা না গেলেও, ওনার চড়া গলার আওয়াজ তো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সে বড় আব্বাকে বলছিলেন —


"আমরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি যে আপনাদের পরিবারে বড্ড কাছের একজন মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু আপনারা এটাও একটু বিবেচনা করে দেখুন যে আমাদের বিয়ের কার্ড সব বিলি হয়ে গেছে। আমাদের সব মেহমান চলে এসেছেন। কত মানুষ যে দেশের বাইরে থেকে ছুটি নিয়ে এসেছেন! ওনারা এর চেয়ে বেশিদিন থাকতেও পারবেন না। এমন অবস্থায় আমরাও বড্ড বাধ্য।"


"আমি আপনার সব কথা একদম বুঝতে পারছি। আমি তো আপনাকে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার কথাও বলছি না। বিয়ে কার্ডে লেখা ওই নির্দিষ্ট দিনেই হবে। আমি স্রেফ এটুকুই বলছি যে আমরা এই বিয়েটা বড্ড ধুমধাম করে না করে কিছুটা সাদাসিধেভাবেও তো করতে পারি।"


"আমাদের তো এই একটাই মাত্র ছেলে। আমাদের কি কোনো অধিকার নেই যে আমরা আমাদের সমস্ত শখ-আহ্লাদ ওর ওপর পূরণ করব? আপনারা তো জানেনই সে তিন বোনের একমাত্র ভাই। এর সাথে সবার আনন্দ জড়িয়ে আছে।"


"সেসব তো ঠিক আছে। আপনারা ওলিমার অনুষ্ঠানে আপনাদের সমস্ত শখ পূরণ করে নিয়েন। কিন্তু আমরা আমাদের তরফ থেকে অনুষ্ঠানগুলো স্রেফ একটু সাদামাটাভাবে সম্পন্ন করতে চাচ্ছি। এই মৃত্যুটা আমাদের পরিবারের জন্য একটা মস্ত বড় আঘাত ছিল। আমি চাই না আমাদের কোনো আচরণের কারণে আমার ভাগ্নি আর নাতি-নাতনিরা কষ্ট পাক।" বড় আব্বা বড্ড গাম্ভীর্য আর রাশভারী গলায় ওনাদের নিজের মনের কথাটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।


এটা ছিল একদমই ফলহীন এক বিতর্ক, যা জুমারকে আরও বেশি বিরক্ত করে তুলছিল।


হুট করেই বড্ড জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা হাম্মাদের নজর ওনার ওপর পড়তেই সে বড্ড কষ্ট করে একটু হাসল। জুমারও ঠিক ততটাই কষ্ট করে একটা ফিরতি হাসি দিলেন, মাথা নোয়ালেন আর উল্টো ঘুরে ভেতরে চলে গেলেন।


হাম্মাদের সাথে ওনার সম্পর্ক স্রেফ এটুকুই ছিল। আর রইল পছন্দ করার কথা, তো নিজের মতো আরও দশটা মেয়ের মতোই বিয়ের মতো আইনি লাইসেন্স পাওয়ার পর সে ওনাকে পছন্দ করার অধিকার তো পেয়েই গিয়েছিলেন। ভালোই ছিল, সে ওনাকে পছন্দও করতেন আর এই বিয়ে নিয়ে মনে অনেক আশাও ছিল। কিন্তু ওয়ারিস গাজীর এই খুন... এই একটা ঘটনাই যেন সব ওলটপালট করে দিচ্ছিল।


রুমে এসে সে নিজের মোবাইলটা খুললেন। ফারিসের এইমাত্র কেটে দেওয়া কলের রেকর্ডটা দেখলেন। জারতাশার বলা কথাগুলো ওনার মনের ভেতর আবার নতুন করে গুঞ্জরিত হতে লাগল।


মুখের ওপর জমতে থাকা ক্লান্তিটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। বড্ড নিস্পৃহ মনে সে ফোনটা একপাশে ছুঁড়ে রাখলেন।


ঠিক তখনই ওটা আবার বেজে উঠল। জুমার কলটা রিসিভ করলেন। এটা ওনার অফিস থেকে এসেছিল।


"আচ্ছা, হুম ঠিক আছে, আমি বুঝতে পেরেছি। আমি খুব ভালো করেই জানি যে ওয়ারিস গাজীর বস এভাবে নিজের classified ফাইলগুলো আমাদের কখনোই দেবে না। কালকের শুনানির জন্য প্রস্তুতি নাও। আমরা ওনাদের ওই ফাইলগুলো খোলানোর জন্য সরাসরি কোর্ট থেকে অর্ডার নেব। আখের ওনাদেরও তো আমাদের এই তদন্তের আওতায় রাখতে হবে। ফারিস গাজী যদি ঠিক বলে থাকে যে এই খুনের পেছনে ওই কেসেরই কোনো হাত আছে — যার তদন্ত স্বয়ং নিহত ব্যক্তি করছিল, তবে কোর্টের অর্ডার আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বুঝতে পেরেছ? Okay."


ফোনটা কেটে দিয়ে জুমার আগের চেয়েও অনেক বেশি উদাসীনভাবে ওটা বেডের ওপর ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর দুই আঙুল দিয়ে নিজের কনকনে রগ দুটো টিপতে টিপতে, মাথাটা দুই হাতের ওপর সঁপে দিয়ে ওখানেই চুপচাপ বসে রইলেন।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Yeh aur baat ke baazi us ke haath rahi... wagarna farq to le de ke ek chaal ka tha


[সেটা অন্য কথা যে খেলার বাজিটা ওর হাতেই রয়ে গেল... নয়তো তফাত বলতে স্রেফ একটা চালেরই তো ছিল।]


সেই সকালটা যেন আগের যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি দমবন্ধ আর দুর্গন্ধময় ছিল। এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর বাতাসের বুকে এক ভ্যাপসা পোড়া গন্ধ ছড়ানো — ঠিক যেন বহুদূরে মাটির তলে কোনো কিছু পুড়ছে, ঝলসে যাচ্ছে। কোনো এক অদৃশ্য বস্তু।


অফিস থেকে বের হয়ে জুমার নিজের গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় মোবাইলটা দেখলেন। ফারিস সকালেই ওনাকে হোটেলের নামটা SMS করে দিয়েছিল। সাথে সাথে call করে বারবার তাগিদও দিয়েছিল। ওখানেই ওনাকে ফারিসের alibi-র সাথে দেখা করতে হতো।


সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছিল। হোটেলের নামটা মনে মনে আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য সে যেমনই message-টা খুললেন, অমনি মোবাইলটা বেজে উঠল। ফারিসের নম্বর ভেসে উঠছিল। সে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে ফোনটা কানের কাছে ধরলেন।


"আমি ফারিস, এই জাস্ট বের হচ্ছি..."


"Change of plan. হোটেল নয়, ওটার ঠিক উল্টো দিকের restaurant-এ চলে এসো জুমার! আমি সমস্ত details SMS করে দিচ্ছি।" আর ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল।


জুমারের ভ্রু জোড়া এক পরম বিস্ময়ে কুঁচকে গেল। ওটা ফারিসই ছিল, তবে ওর কথা বলার ধরনটা বড্ড অদ্ভুত ছিল, একদম আলাদা। এমন নয় যে সে কোনোদিন ওভাবে সরাসরি বা দুম করে কথা বলেনি, কিন্তু জুমারের কোনো কথা না শুনেই ওভাবে হুট করে ফোন কেটে দেওয়াটা এর আগে কখনো হয়নি।


ওনার মনে বিষয়টা বড্ড খটকা লাগল। হয়তো গতকাল ওনার ওই শুষ্ক আর সংক্ষিপ্ত কথার জবাব দিতেই সে আজকে এভাবে কথা বলল।


যাহোক, নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে সে গাড়িটা start দিলেন আর আয়নায় নিজের মুখটা দেখলেন। বাদামী চোখ দুটোর ভেতর এক গভীর গাম্ভীর্য ছিল আর নাকের নাকফুলটা চিকচিক করছিল। কোঁকড়ানো চুলগুলো একটা খোঁপার ভেতর বাঁধা ছিল। প্রতিদিনের মতোই আজও ওনাকে বড্ড সতেজ আর দীপ্তিময় দেখাচ্ছিল।


হাশিম নিজের অফিসের ওই দামি পাওয়ার চেয়ারে হেলান দিয়ে বড্ড আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিল। ওর কোটটা চেয়ারের পেছনের হাতলে ছড়ানো ছিল। কাফলিংকগুলো টেবিলে খোলা রাখা ছিল।


একদম নিস্তেজ, ক্লান্ত আর রক্তশূন্য এক ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে সে টেবিলের ওপর খোলা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিল। খাওয়ারের সাথে ওর যোগাযোগ অনবরত বজায় ছিল। সে ফারিস আর জুমারের মধ্যকার পুরো কথাটাই শুনতে পাচ্ছিল।


তবে ওর চোখের ভেতর এক তীব্র অসন্তুষ্টি ছিল। কলটা শেষ হতেই সে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে এল আর মাইক্রোফোনে বলে উঠল —


"এটা ফারিসের গলার আওয়াজ একদমই ছিল না। সে খুব সহজেই ধরে ফেলবে।"


"স্যার, এটাই সবচেয়ে কাছাকাছি সুর। এর চেয়ে বেশি মিল আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা স্রেফ গলার আওয়াজ copy করতে পারি, কথা বলার ধরন বা লহজা নয়। আপনি তো জানেনই যে প্রত্যেক মানুষের গলার একটা আলাদা voice print থাকে। এই কারণেই আমি এই recording-গুলো বড্ড সরাসরি আর সংক্ষেপে রাখছি, যাতে সে কথার লহজা নিয়ে ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ না পায়।"


সে নিজের কাজে চরম পারদর্শী ছিল, কিন্তু হাশিম এই মুহূর্তে বড্ড খিটখিটে হয়ে উঠছিল।


"যদি কোনো সামান্যতম গণ্ডগোল হয় খাওয়ার, তবে আমি নিজের হাতে তোমাকে গুলি করে দেব!" সে বড্ড বিরক্ত আর ছটফট করতে করতে নিজের হাতটা শক্ত করে মুঠো পাকিয়ে আবার পেছনে হেলান দিল।


ওর চোখের ভেতর এক অদ্ভুত কষ্ট, রাগ আর এক তীব্র অপরাধবোধের লড়াই চলছিল। হাশিমের কাছে এই মুহূর্তে দুনিয়ার সব সুখ-ঐশ্বর্য ছিল, স্রেফ মনের শান্তিটুকু ছাড়া।


হোটেলের ওই রুমে খাওয়ার জানালার একদম ধার ঘেঁষে বসে ছিল। পর্দাটা কিছুটা টানা ছিল। একটা বড় বন্দুক স্ট্যান্ডের ওপর তাক করা ছিল।


সে নিজের হাতে নিখুঁত দস্তানা পরে রেখেছিল, যার আঙুলের ডগাগুলোর জায়গায় বড্ড সূক্ষ্ম প্লাস্টিক লাগানো ছিল। আর ওই প্লাস্টিকের ওপর হুবহু ফারিসের আঙুলের ছাপ খোদাই করা ছিল। সে ঘরের যেখানে যেখানে হাত দিচ্ছিল, সেখানে সেখানে ফারিসের আঙুলের ছাপ বসে যাচ্ছিল — যা পরবর্তীতে পুলিশ বড্ড সহজেই খুঁজে পাবে।


অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সে বন্দুকটাকে স্ট্যান্ডের সাথে fit করছিল, যাতে ওটার ওপর থাকা ফারিসের আসল আঙুলের ছাপগুলো বিন্দুমাত্র নষ্ট না হয়ে যায়। (এই বন্দুকটা সে ফারিসের বাড়ির basement থেকে চুরি করে এনেছিল।) বন্দুকটা একদম নিখুঁতভাবে set করে সে ওটার নল দিয়ে সোজা বাইরের দিকে তাকাল।


নিশানা একদম বরাবর সেট করল। বহুদূরে নিচে থাকা restaurant-এর কাচের দেয়ালটা একদম চোখের সামনে ভেসে উঠল। ওখানের ঠিক কোণায় থাকা একটা টেবিল সে দেখতে পেল। প্রতিটি জিনিস একদম plan মতোই এগোচ্ছিল।


সে বড্ড চতুরতার সাথে ল্যাপটপে কয়েকটা key চাপল। সাথে সাথে একটা call যেতে লাগল।


জারতাশা অ্যানেক্সির বারান্দার একটা চেয়ারে বসে বড্ড মনমরা হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই আকাশছোঁয়া রাজপ্রাসাদের পেছনের অংশটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওখানেই ঠিক ওপরের দিকে হাশিমের বারান্দাটা ছিল, আর তার ঠিক নিচে শেহরিন নিজের দুই বছরের মেয়ে সোনিয়ার আঙুল ধরে ওটার সাথে কথা বলতে বলতে, কোনো একটা কথায় হালকা হেসে ঘাসের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছিল।


শেহরিন টাইটসের ওপর একটা ঢিলেঢালা ডিজাইনার শার্ট পরে ছিল, যার কাঁধের একপাশ থেকে হাতাটা নিচ পর্যন্ত ঝুলছিল। গলায় পাথরের তৈরি একটা লম্বা দামি মালা জড়ানো ছিল। সবকিছুই একদম branded ছিল আর জারতাশা খুব ভালো করেই জানত যে এই সবকিছুর দাম কত আকাশছোঁয়া হতে পারে!


ফারিসের তিন মাসের পুরো বেতন দিয়েও হয়তো এর চেয়ে এক গুণ বেশি দামি জিনিস কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু না, সে চাইলে তো দুনিয়ার অনেক কিছুই afford করতে পারত! সে যদি কালোবাজার থেকে কেনা সাত-আট লাখ টাকার একটা বন্দুক অনায়াসে কিনতে পারে, তবে সে ওকে একটা পার্টির জন্য দুই লাখ টাকার শাড়িও তো কিনে দিতে পারত, কিন্তু কই, দিল না তো...


জারতাশা এক পরম হতাশা নিয়ে ওদিকে তাকিয়ে রইল।


হুট করেই বহুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা শেহরিন ওর দিকে তাকাল। কড়া রোদের কারণে কপালে হাতের তালু দিয়ে একটা ছায়া বানিয়ে চোখ দুটো সরু করে দেখল। তারপর হাত নাড়ল — ঠোঁটের কোণে এক চরম অহংকার আর তাচ্ছিল্যের হাসি মেখে।


জারতাশা বড্ড মলিন একটা ফিরতি হাসি দিয়ে হাত নাড়ল। শেহরিন আগে বেড়ে গেল। সে বেশ উঁচুতে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখান থেকে নিচের দিকে একটা ঢাল নেমে এসেছিল। জারতাশা ওপরের দিকেই তাকিয়ে রইল। সে তো বরাবরই ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে অভ্যস্ত ছিল।


তারপর সে বড্ড অনিচ্ছা নিয়ে খাট থেকে উঠল। সামনে রাখা ল্যাপটপ আর ভিডিও সিডিটা তুলে নিয়ে ভেতরের রুমে এল।


সে পুরো ভিডিওটা আগেই দেখে ফেলেছিল। খাওয়ার — যাকে সাধারণত সবসময় হাশিমের আগে-পেছনে কোথাও না কোথাও দেখা যেত, সে এই পুরো ভিডিওর একটা মস্ত বড় সময় জুড়ে একদম গায়েব ছিল। কিন্তু গায়েব তো ফারিসও ছিল! এ থেকে তো আসলে কিছুই প্রমাণিত হয় না।


আর সে খাওয়ারকে অতটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলও না। যে দৃশ্যের ভেতর জুমার থাকত, অন্তত সেই দৃশ্যে সে অন্য কারো দিকে চোখ ফেরাত না।


ঠিক তখনই ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। সে তাকাল। একটা একদমই অচেনা নম্বর। বড্ড অনিচ্ছার সাথে সে ফোনটা তুলল।


"আমি একটা restaurant-এর address SMS করছি, যেখানে এই মুহূর্তে আপনার স্বামী ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর জুমার সাহেবার সাথে লাঞ্চ করছেন। যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তবে নিজের চোখে এসে দেখে যান।"


ওপাশ থেকে এক একদমই অপরিচিত গলার আওয়াজ কথাটি বলেই ফোনটা কেটে দিল।


সে স্রেফ "হ্যালো? হ্যালো?" করতেই রয়ে গেল। প্রথমে তো সে কিছুই মাথায় ঢুকিয়ে নিতে পারছিল না, আর তারপর যখন পুরো বিষয়টা বুঝল, সে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখের ওপর এক তীব্র ক্ষোভ, রাগ আর এক গভীর সংশয় ছড়িয়ে পড়ল।


ফারিস ওনার সাথে দেখা করবে — এটা তো সে আগে থেকেই জানত, কিন্তু কোনো একটা restaurant-এ গিয়ে লাঞ্চ করা... এই দুটো শব্দ ওর মনের ভেতর তীরের মতো বিঁধে গেল। আর সে তো জারতাশা ছিল। ওকে সত্যটা জানতেই হতো। নিজের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা এই সন্দেহের পোকাটাকে চিরতরে দূর করার জন্য ওকে কিছু একটা তো করতেই হতো।


সে নিজের মোবাইলটা তুলে ফারিসকে call করল। একবার রিং হলো, তারপর দুবার। ওপাশ থেকে ফারিস ফোনটা তুলল।


"হ্যাঁ জারতাশা, বলো?"


"আপনি কোথায় আছেন?" কিছুটা দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল। সাথে সাথে নিজের ওপর এক তীব্র ধিক্কার জন্মাল — সে কীভাবে স্রেফ একজন অচেনা মানুষের একটা বেনামী ফোন কলে ওভাবে বিশ্বাস করে নিল!


"আমি একটা কাজের জন্য বাইরে এসেছি। কোনো দরকার আছে?"


"না। স্রেফ আপনার খোঁজ নেওয়ার জন্য ফোন করলাম। আজকে তো আপনার প্রসিকিউটরের সাথে ওই মেয়েটার দেখা করানোর কথা ছিল, তা সবকিছু ঠিকঠাক মিটেছে তো?"


"হ্যাঁ, কিন্তু ম্যাডাম এখনো এসে পৌঁছাননি। আমি আর হানিন আলিশার রুমে বসে ওনার জন্যই অপেক্ষা করছি।"


"হোটেলের রুমে? মানে..." ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারিস একটা "Bye" বলে ফোনটা কেটে দিল।


সে এক মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মোবাইলটা একপাশে রেখে এক নতুন জেদ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


হোটেলের ওই রুমে খাওয়ার একদম প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল। ওর চোখ দুটো দেয়ালঘড়ির কাঁটার ওপর আটকে ছিল। নিজের শিকারের অপেক্ষায় সে যেন এক একটি সেকেন্ড গুণছিল।


ল্যাপটপে হাশিমের সাথে ওর যোগাযোগ এই মুহূর্তে একদম নিস্তব্ধ ছিল। এমন নয় যে হাশিম ওপাশে উপস্থিত ছিল না, হাশিম স্রেফ একদম চুপচাপ ছিল। একদম নিঝুম।


ওনারা দুজনেই বড্ড শান্ত হয়ে অপেক্ষা করছিলেন কারো জীবনের শেষ পাতাটা লিখে দেওয়ার জন্য...


খাওয়ারের হোটেলের রুমের সাথে যুক্ত পাশের রুমটায় আলিশা বড্ড ছটফট করতে করতে একটা চেয়ারে বসে ছিল। সে বারবার বিরতি দিয়ে সামনে একদম শান্ত হয়ে বসে থাকা হানিন আর তার ঠিক উল্টো দিকে বড্ড অস্থির হয়ে পায়চারি করতে থাকা ফারিসের দিকে তাকাচ্ছিল। ওর নিজের মুখের ওপরও এক গভীর চিন্তার মেঘ জমে ছিল।


"আমি কোনোভাবেই আদালতে যাব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাই না।" সে নিজের আঙুলগুলো মটকাতে মটকাতে কথা বলা শুরু করল।


ফারিস থমকে দাঁড়িয়ে বড্ড রাগ চেপে ওর দিকে তাকাল।


"অন্তত এই মুহূর্তের জন্য তোমাকে প্রসিকিউটরের সামনে আমার alibi-টা মজবুত করতেই হবে, কারণ এটাই একমাত্র সত্যি যে আমি খুনের সময় এখানেই ছিলাম।"


"কিন্তু আমি আদালতে যাব না!"


"ওটা পরের বিষয়।"


কিন্তু আলিশা দিন দিন আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠছিল।


"হানিনও তো ওই রাতে আমাদের সাথেই ছিল। স্রেফ হানিন কি একাই এটার সাক্ষ্য দিতে পারে না?" কোনো একটা গভীর চিন্তা ওকে বড্ড বেশি ভাবিয়ে তুলছিল।


"আমি একটা ষোলো বছরের মেয়ে, ওনাদের আত্মীয়। আমার সাক্ষ্য আইনগতভাবে ততটা গ্রহণযোগ্য হবে না।" হানিন প্রথমবার ওনাদের এই কথাবার্তায় হস্তক্ষেপ করল, আর তা-ই বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে।


ফারিস আর আলিশা দুজনেই ওর দিকে তাকাল। হানিন স্রেফ নিজের কাঁধ ঝাঁকাল।


"Ally McBeal, The Good Wife, Boston Legal — এইসব সিরিজ দেখলে অন্তত এটুকু আইন তো বড্ড সহজেই চেনা যায়।"


"সব ঠিক আছে, কিন্তু আমি ওখানে গিয়ে বলবটা কী? আমার কাছে এই সবকিছু বড্ড অদ্ভুত লাগছে। আমি আবার কোনো বড় সমস্যায় ফেঁসে যাব না তো?" আলিশা এখনো বড্ড ইতস্তত করছিল। "কারণ আমি যদি কোনো সমস্যায় পড়ি, তবে আমি আপনাকে এখন থেকেই পরিষ্কার বলে রাখছি — আমি এই সবকিছু থেকে নিজেকে একদম সরিয়ে নেব।"


"অন্তত আজকের দিনের জন্য তুমি এই সবকিছু থেকে কোথাও সরে যেতে পারছ না!" ফারিস বড্ড কঠোর চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, যেখানে ভয়ের কারণে একেকবার একেক রঙ আসছিল আর যাচ্ছিল।


তারপর সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনে রাখা সোফাটায় এসে বসল আর বড্ড শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বোঝাতে লাগল —


"এই আত্মীয়তার পুরো গল্পটা প্রসিকিউটরের সামনে একদম বলতে যাবে না। তুমি স্রেফ এটুকুই বলবে যে তুমি একজন tourist হিসেবে এখানে নিজের বন্ধুর সাথে দেখা করতে এসেছ, ব্যাস! কথা এখানেই খতম, বুঝতে পেরেছ?"


আলিশার মুখের ওপর এক লজ্জার ভাব ছড়িয়ে পড়ল, তবে সে নিজের মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, "Okay."


ফারিস বড্ড অস্থির হয়ে আবার ঘরের ভেতর পায়চারি করতে লাগল। তারপর নিজের হাতঘড়িটা দেখল।


হানিন ওর এই মানসিক অবস্থা দেখে বলে উঠল —


"আপনি ফুপ্পুকে একটা call করে নিন।" ফারিস মাথা নেড়ে নিজের ফোনটা বের করল। নম্বর মিলিয়ে কানের কাছে ধরল। ওপাশে রিং হতে লাগল।


পাশের রুমে থাকা খাওয়ারের ল্যাপটপের স্ক্রিনে সাথে সাথে signal ভেসে উঠল। ফারিসের নম্বর থেকে একটা call যাচ্ছিল। সে চট করে কয়েকটা key চেপে ওই কলের পথ মাঝপথেই কেটে দিল, আর ফারিসের ফোনে call কেটে যাওয়ার বার্তা ভেসে উঠল।


সে নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে মোবাইলটা পকেটে পুরে নিল।


"নিশ্চিতভাবেই উনি পথেই আছেন, আসছেন।" হানিন একদম চুপচাপ নিজের মাথা নোয়াল।


সে এই পুরো লড়াইয়ে ফারিসকে সবরকম সাহায্য তো অবশ্যই করছিল, কিন্তু সে মনে মনে বিন্দুমাত্র খুশি ছিল না। জুমারের ফারিসের ওপর এই অনর্থক সন্দেহ করা, আলিশাকে এই পুরো ঝামেলার ভেতর টেনে হিঁচড়ে আনা, আর সাদির এই চরম ছটফটানি — প্রতিটি জিনিস ওকে বড্ড পীড়া দিচ্ছিল।


কতই না ভালো হতো যদি জুমার স্রেফ ওর কথার ওপর একটু ভরসা রাখতেন! কিন্তু সে তো বড্ড পরিষ্কার আর রুক্ষ সুরে বলে দিয়েছিলেন যে এই কেসের ক্ষেত্রে সে কারো কোনো আত্মীয়ের কথা শুনবেন না।


হানিন এই পুরনো কথাগুলো মনে করে বড্ড বিরক্ত হয়ে নিজের মাথাটা ঝাঁকাল। ওর চোখ দুটো এখনো কান্নার কারণে লাল আর ফুলে ছিল। প্রথমে তো ওয়ারিস মামুর চলে যাওয়ার এই অকাল শোক, আর তারপর শুরু হওয়া এই অদ্ভুত পুলিশ, কোর্ট আর আইনের চক্কর...


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Marhalay aur bhi they jaan se guzarne ke liye... Karbala kis ne pas-e-karb-o-bala bheji hai


[প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার জন্য সামনে আরও অনেক পথ বাকি ছিল... কে জানে এই অন্তহীন যন্ত্রণার পেছনে এই কারবালা কে পাঠিয়েছে!]


জুমার নিজের গাড়িটা restaurant-এর ঠিক বাইরে এসে থামালেন। মোবাইল আর পার্সটা হাতে নিয়ে সে বাইরে এলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন।


দরজার ঠিক কাছের একটা টেবিলের ওপর "Reserved" লেখা কার্ডটা এখান থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে restaurant-এর ওই বড় কাচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ওয়েটারকে ওই নির্দিষ্ট টেবিলটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন।


যখন জানতে পারলেন যে ওটা ওনার নিজের নামেই book করা আছে, সে ওখানে গিয়ে বসলেন। তারপর নিজের হাতঘড়িটা দেখলেন। সেখানে এখনো পর্যন্ত কেউ এসে পৌঁছায়নি। সে একটা কফির অর্ডার দিলেন আর নিজের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে মড়কাতে মড়কাতে অপেক্ষা করতে লাগলেন।


সে কি আসলেই ঠিক করছেন? ফারিসের alibi-র সাথে দেখা করার জন্য ওনার কি এভাবে নিজে হেঁটে এখানে আসাটা উচিত ছিল? আইনগতভাবে তো ফারিসেরই উচিত ছিল ওই মেয়েটাকে নিজের সাথে করে ওনার কাছে নিয়ে আসা।


কিন্তু কোনো ব্যাপার না। সে নিজের তরফ থেকে কোনো খামতি রাখতে চান না। সে সাদিকে অন্তত এটা দেখিয়ে দিতে চান যে সে সত্যিই ওর মামুর জন্য মনেপ্রাণে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই সবকিছু দেখানোর কি আসলেই কোনো ফায়দা হবে? ওর ওপর থেকে কি সত্যিই ওই স্বার্থপরতার তকমাটা কোনোদিন মুছে যাবে?


এই সমস্ত সাত-পাঁচ চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে জুমার নিজের পুরো মনোযোগ ওই ওয়েটারের দিকে দিলেন, যে এইমাত্র ওনার সামনে কফির মগটা এনে রাখছিল।


সে যেমনই কাপটা নিজের হাতে তুলতে যাবেন, অমনি সামনে থেকে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। জুমার বড্ড চমকে উঠে ওদিকে তাকালেন।


ওটা জারতাশা ছিল। একটা কুচকুচে কালো পোশাকের সাথে ধূসর রঙের দোপাট্টাটা গলায় জড়িয়ে সে বড্ড শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতে তাকাতে কাছে এগিয়ে এল। চেয়ারটা টেনে ওনার ঠিক মুখোমুখি বসল, নিজের কনুই দুটো টেবিলের ওপর রাখল আর হাতের তালুর ওপর নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে দিল।


চরম এক হিংসা আর ক্ষোভভরা চোখে সে জুমারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।


জুমার কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে চেয়ারের কোণার দিকে সামান্য এগিয়ে এলেন। ঘাড় নিচু করে সালাম দিলেন আর জিজ্ঞেস করলেন —


"ফারিস কোথায়?"


জারতাশা বড্ড আলতো করে নিজের কাঁধ ঝাঁকাল আর জুমারকে বিন্দুমাত্র পলক না ফেলে দেখতে দেখতে বলল —


"সেটা তো আপনার খুব ভালো করেই জানা উচিত। আপনারা কি এইমাত্র একসাথে বসে lunch করলেন না?"


"Lunch? আমি তো কতক্ষণ ধরে এখানে একা বসে ওর জন্য অপেক্ষা করছি। সে-ই তো আমাকে এখানে ডেকে পাঠাল, বলল কার সাথে যেন দেখা করাবে।"


"কিন্তু আমি তো এখানে অন্য কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আখের কার সাথে দেখা করানোর কথা ছিল ওর?"


"ওর alibi-র সাথে। খুনের সময় সে যার সাথে ছিল।" জুমারের মনের ভেতর এখন কোনো একটা মস্ত বড় খটকা লাগছিল, কিন্তু সে না পারছিলেন নিজের এই অনুভূতিটা কাউকে বোঝাতে, আর না জারতাশার এই অদ্ভুত আচরণটা হজম করতে — যে এক অদ্ভুত চোখে ওনার দিকে অনবরত তাকিয়ে ছিল।


"আপনার জন্য কি কোনো কিছু order করব?" জুমার কথাটি বলতে বলতে ওয়েটারকে এক আঙুলে ইশারা করলেন।


সে কাছে আসতেই জারতাশা ওনার ওপর থেকে নিজের চোখ জোড়া এক চুলও না সরিয়ে স্রেফ একটা juice-এর অর্ডার দিল। সে মাথা নেড়ে চলে গেল।


জুমার আবার নিজের হাতঘড়িটা দেখলেন আর তারপর মোবাইলটা। আখের ফারিস কোথায় আটকে গেল? আর সে নিজের স্ত্রীকেই বা কেন এখানে ডেকে পাঠাল?


ওনার নিজের মনের ভেতর তো কোনো পাপ ছিল না, সে তো স্রেফ ওনার একজন পুরনো ছাত্র ছিল, তার বেশি কিচ্ছু নয়। আর হ্যাঁ, সে সাদির মামুও ছিল। কিন্তু তবুও জারতাশার এই তাকানোর ধরনটা বড্ড অদ্ভুত ছিল, ঠিক যেন সে অন্য কোনো পর-নারী।


অন্যদিকে জারতাশা অনবরত ওনাকে দেখেই যাচ্ছিল। ওর বুকের ভেতর যেন এক তপ্ত লাভা ফুটছিল। ওর মনে মনে পুরো বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে ওই বেনামী ফোনটা এই জুমারই ওকে করিয়েছিলেন।


ফারিসের ওপর এই অনর্থক সন্দেহ করা আর বাকি সব নাটক — সে স্রেফ ফারিসের মনোযোগ পাওয়ার জন্য আর ওর সংসারটা ভাঙার জন্যই করছে।


ওনার সামনে বসে থাকা এই কোঁকড়ানো চুলের, মগ থেকে কফির একেকটা চুমুক দিতে থাকা মেয়েটাকে ওর বড্ড চোখ টাটাচ্ছিল।


"আপনার আর ফারিসের বাগদান হতে হতে ভেঙে গিয়েছিল, এটা একদম সত্যি না?" জারতাশা হুট করেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল।


জুমার যেন আকাশ থেকে পড়লেন, এক মস্ত বড় ধাক্কা খেলেন। সে একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাতের কাপটা টেবিলের ওপর বেশ জোরে আওয়াজ করে রাখলেন।


"জারতাশা!" ওনার মনের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ আর রাগ ফেটে বেরোল, যা সে বড্ড কষ্ট করে চেপে রাখলেন। "আপনার কোনো মস্ত বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এমন কিচ্ছু ছিল না।"


"আপনি এভাবে অস্বীকার কেন করছেন? ফারিস নিজে এই কথার সত্যতা স্বীকার করেছে যে সে আপনাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।" নিজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে সে কথাগুলো বলল। ওর এই কথার ধরনে এক চরম ঈর্ষা ছিল, বড্ড অবুঝ এক হিংসে।


জুমার একদম নিঃসাড় হয়ে শুনলেন। মনের ভেতর এক তীব্র ঝড় বইতে শুরু করল। সে আগে শুনেছিলেন যে কিছু পুরুষ নিজের স্ত্রীদের ওপর একটু রোব জমাতে বা ভাব মারতে বলে বেড়ায় যে — বংশের অমুক অমুক মেয়ে আমার জন্য পাগল ছিল, এই সেই। কিন্তু ফারিসের মতো একজন মানুষের কাছ থেকে এই ধরনের সস্তা কথার আশা ওনার অন্তত ছিল না।


ওনার মনটা ওর প্রতি আরও বিষিয়ে উঠল।


"এটা অত্যন্ত বোকামি আর ফালতু কথা। ফারিস এখনই হয়তো চলে আসবে। আপনি ওকেই সরাসরি আমার সামনে এই কথাটা জিজ্ঞেস করে নিয়েন। আর রইল আমার কথা, তো আমার নিজের বিয়ে একদম ঠিকঠাক তৈরি। এমন এক মুহূর্তে আপনার মুখে এই ধরনের কথা মানায় না আর আমার পক্ষেও তা শোনা বড্ড শোভনীয় নয়।"


সে চরম ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাতে লাগলেন।


ভুল সময়ে আর ভুল জায়গায় বসে দুটো নারী একদমই ভুল বিষয় নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিল।


জারতাশা বড্ড আলতো করে নিজের কাঁধ ঝাঁকাল। কোনো ভাবাবেগ ছাড়াই বলল —


"আপনার যা ইচ্ছা ভাবুন।"


সময় বড্ড দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছিল কিন্তু ফারিসের কোনো নামগন্ধও ছিল না। জুমার প্রায় দশমবারের মতো নিজের হাতঘড়িটা দেখলেন। তারপর বড্ড শীতল গলায় জারতাশার দিকে তাকিয়ে বললেন —


"আমার জানা ছিল না যে ফারিস সময়ের আর কথার এত কাঁচা। এই মুহূর্তে ওর এখানে থাকা উচিত ছিল। আমার আরও অনেক জরুরি কাজ করার বাকি আছে।"


"আমি জানি না সে কোথায়।" জারতাশা এবার কিছুটা আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গিতে বলে উঠল। "আসলে আমি তো জানতামও না যে সে এখানে আসছে। আমি তো এখানে স্রেফ shopping করতে এসেছিলাম। আপনাকে দেখে এখানে চলে এলাম।"


সে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামল। এখন ওর মনে মনে এক তীব্র ভয় জাগছিল যে — যদি ফারিস সত্যিই এখানে চলে আসে আর ওকে ওভাবে ওনার সাথে দেখে, তবে সে ওটার কী ব্যাখ্যা দেবে? কে জানে, জুমার হয়তো এই সবকিছু ওকে ফারিসের চোখে ছোট করার জন্যই ফেঁদেছেন!


নিজের গলার আওয়াজটা কিছুটা নরম করে সে আবার বলতে লাগল —


"গতকাল সে উল্লেখ করেছিল যে আজকে ওনার আপনার সাথে দেখা করার কথা আছে, তাই আমার মনে হয়েছিল সে হয়তো এখানেই আসবে।"


জুমার ওর এই কথার বিন্দুমাত্র কোনো গুরুত্ব দিলেন না। সে বরাবরের মতোই ওটাকে এড়িয়ে গিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। ওর এই ফালতু আর বোকা বোকা কথায় ওনার এখনো মনে মনে বড্ড রাগ হচ্ছিল। যদি এটা কোনো রসিকতা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত নোংরা একটা রসিকতা ছিল।


আর ঠিক তখনই ওনার ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। ফারিসের নম্বর ভেসে উঠছিল স্ক্রিনে।


জুমার কলটা রিসিভ করলেন আর বড্ড শুষ্ক গলায় বললেন —


"আপনি কোথায় ফারিস? আমি কতক্ষণ ধরে আপনার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি!"


কয়েক মুহূর্ত ওপাশে এক গভীর নীরবতা ছেয়ে রইল। তারপর ওনার গলার আওয়াজ ভেসে এল —


"জুমার, I am sorry..."


হাশিম ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা শব্দগুলো স্পষ্ট দেখল আর বড্ড ক্লান্ত হয়ে নিজের মাথাটা চেয়ারের পেছনের হাতলে এলিয়ে দিল...


"জি? আপনি আসছেন না?" জুমার বললেন, কিন্তু ওপাশ থেকে শুনে মনে হচ্ছিল সে ওনার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না। ওর যা বলার, সে স্রেফ তা-ই বলে যাচ্ছিল।


ওর কথা বলার ধরনটা বড্ড অদ্ভুত ছিল — একেকবার থেমে থেমে বলা, কোনো ভাবাবেগহীন, একদম যান্ত্রিক আর স্বয়ংক্রিয় একটা কণ্ঠস্বর।


"আমি তোমার খুব কাছাকাছিই আছি জুমার! কিন্তু আমি ওখানে আসতে পারছি না। এটা আমার মস্ত বড় এক বাধ্যবাধকতা। আমি তোমাকে আমার alibi-র সাথে মেলাতে চেয়েছিলাম কারণ স্রেফ তুমিই একমাত্র মানুষ, যার আমার খুনি হওয়ার ওপর তীব্র সন্দেহ আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমার কাছে কোনো alibi নেই।"


জুমারের বুকটা ধক করে উঠল। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনের দিকে একবার একদৃষ্টিতে তাকালেন আর তারপর আবার কানের কাছে ধরলেন।


"ফারিস, আমি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারছি না আপনি কী বলছেন? (ওনার কবে ফারিসের ওপর সন্দেহ ছিল? ওইসব স্রেফ তদন্তেরই একটা অংশ ছিল। সে কি তবে রাগ করেছে?)"


হাশিম টেবিলের ওপর ভর দিয়ে নিজের চেয়ার থেকে উঠল আর তারপর ওই চেয়ারের পায়ের কাছেই একদম গুটিসুটি মেরে নিস্তেজ হয়ে বসে পড়ল। টেবিলের আড়ালে, একদম লুকিয়ে। নিজের মাথাটা দুই হাতের ভেতর চেপে ধরল।


কিন্তু ফারিস জুমারের কোনো কথা শোনার জন্য বিন্দুমাত্র থামল না। সে নিজের মতোই বলে যাচ্ছিল —


"আর যেহেতু আমার কাছে কোনো alibi নেই, তার একটাই মানে দাঁড়ায় — ওয়ারিস গাজীর খুনি আমি নিজেই। আর আমি ওনাকে আসলে মারতে চাইনি, কিন্তু আমাকে তা করতে হয়েছিল কারণ সে আমার নিজের স্ত্রীর সাথে মিলে আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিল।"


জুমারের মাথাটা যেন এক ঝটকায় ভোঁ-ভোঁ করে উঠল। সে চরম এক অবিশ্বাস নিয়ে সামনে বসে থাকা জারতাশার দিকে তাকালেন, যার juice এতক্ষণে চলে এসেছিল আর সে একটা straw ওটার ভেতর ঘুরিয়ে মগ্ন হয়ে ওটা নাড়ছিল।


ফারিসের এই কথায় সে ওনার প্রতি কিছুটা হিংসার শিকার তো অবশ্যই ছিল, কিন্তু তবুও ওর মুখের ওপর এক মায়াবী নিষ্পাপ ভাব ছিল, বড্ড বাচ্চাদের মতো এক সরলতা।


"ফারিস, আপনি... আপনি কোথায় আছেন? (ওনার মনে হলো ফারিস নির্ঘাত কোনো ঠাট্টা করছে।)"


হাশিম ওভাবেই চোখ দুটো বন্ধ করে নিজের আঙুল দিয়ে রগ দুটো ডলতে ডলতে মাথাটা হাঁটুর ভেতর গুঁজে বসে রইল। এক তীব্র কষ্ট, চরম এক যন্ত্রণা।


"I am sorry জুমার! কিন্তু আমি ঠিক সেখানেই আছি, যেখানে আমার থাকা উচিত। আমাকে আমার স্ত্রী আর আমার ভাই — দুজনকেই চিরতরে শেষ করতে হতো। এই কাজটা না করা পর্যন্ত আমি জীবনে কোনোদিনও শান্তি পাব না।


আর প্রতিটি জিনিস তো একদম ঠিকঠাকই এগোচ্ছিল। আমি সমস্ত সন্দেহ ওয়ারিসের ওই তদন্তাধীন কেসটার ওপর চাপিয়ে দিতে পুরোপুরি সফল হচ্ছিলাম, কিন্তু আমার মনে হলো স্রেফ তোমারই আমার ওপর সন্দেহ আছে। তাই আমি ভাবলাম আমি নিজের এই সন্দেহটা একবার চিরতরে দূর করে নিই। আমি তোমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিই যে আমার কাছে কোনো alibi নেই।


তুমি এই কেসের মেইন প্রসিকিউটর। স্রেফ তুমি ছাড়া দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ এটাই ভাবছে যে ওয়ারিস গাজী মার্ডার কেসে সবচেয়ে বেশি দৌড়ঝাঁপ আমিই করছি, তার মানে আমি একদম নির্দোষ। তুমি ছাড়া আর কেউ আমার ওপর বিন্দুমাত্র সন্দেহ করছে না।


এখন এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন তুমি ওয়ারিস গাজীর ওই confidential ফাইলগুলো খোলানোর জন্য কোর্ট থেকে অর্ডার আনতে যাচ্ছ, তখন যদি কেউ তোমাকে হুট করে গুলি করে দেয় — তবে সবার সমস্ত সন্দেহ স্রেফ ওই কেসটার ওপরই যাবে, যার তদন্ত ওয়ারিস নিজে করছিল। ফারিস গাজীর ওপর কোনোদিন কোনো আঙুল উঠবে না।


আর রইল জারতাশার কথা, তো আসল টার্গেট তো তুমিই থাকবে, আর সে স্রেফ collateral damage হিসেবে মারা যাবে।"


"ফারিস, আপনি কী বলছেন আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। ফারিস, আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?" জুমার চরম এক আতঙ্ক নিয়ে বড্ড কষ্ট করে বলতে চাইলেন।


ওনার চারপাশটা যেন একের পর এক বোমার বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছিল।


হাশিম নিজের চোখ দুটো খুলল। সে টেবিলের ভেতরের ওই ফাঁকা অন্ধকার জায়গাটা দেখতে পাচ্ছিল। এক চরম অন্ধকার আর দমবন্ধ পরিবেশ। সে আবার নিজের চোখ দুটো বুজে নিল। মাথাটা আরও ভেতরে গুঁজে দিল।


ওপরের ল্যাপটপ থেকে ওনার গলার আওয়াজ অনবরত কেটেই যাচ্ছিল —


"জুমার, আমি তোমাকে call করে স্রেফ শেষবারের মতো একবার ক্ষমা চেয়ে নিতে চাই। আমি একদমই এমনটা করতে চাইনি, কিন্তু আমি বড্ড বাধ্য। আমাকে দয়া করে মাফ করে দিইও। তবে তোমাকে বিন্দুমাত্র কষ্ট পেতে হবে না। আমি তোমাকে স্রেফ একটা গুলি করব, স্রেফ একটা গুলি — একদম বুকে। আর তারপর সবকিছু একদম ঠিক হয়ে যাবে।"


জুমার যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক শক খেয়ে নিজের জায়গা থেকে ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফোনটা কানের কাছে ধরেই সে বড্ড দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলেন।


জারতাশাও নিজের মাথা উঁচিয়ে এক পরম বিস্ময় নিয়ে ওনার দিকে তাকাতে শুরু করেছিল।


Restaurant-টা প্রায় একদম ফাঁকাই ছিল। ওটার ওপারে বড় বড় উঁচু বিল্ডিং আর নামীদামী হোটেলগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। এই সামনের হোটেলেই তো ফারিস ওনাকে ডেকেছিল, আর তারপর হঠাৎ করেই change of plan, হঠাৎ করে এই সবকিছু...


সে বিন্দুমাত্র কোনো কিছুর কুলকিনারা পাচ্ছিলেন না। আর ফারিস একনাগাড়ে বলেই যাচ্ছিল —


"আমি এই সবকিছু তোমাকে এই কারণেই বলছি, কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি যে এটাই তোমার সাথে আমার জীবনের শেষ কথোপকথন। আর এই শেষ কথাটায় আমি তোমাকে আমার আসল সত্যটা জানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।


জারতাশা আর তোমার মৃত্যুর পর আমি জানি আমি কোনোদিনও শান্তি পাব না, কিন্তু অন্তত আমি এই আইনি শাস্তির হাত থেকে বড্ড সহজে বেঁচে যাব। I am sorry জুমার!"


"ফারিস, তুমি কোথায় আছ? প্লিজ আমাকে বলো। আমি তোমাকে সাহায্য করব। যেভাবে হোক, আমি তোমাকে সাহায্য করব।" জুমার চরম এক ছটফটানি নিয়ে বড্ড দ্রুত কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন।


পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ওনাকে যা করার বড্ড জলদিই করতে হতো।


"আমি তোমার হয়ে কেস লড়ব। তুমি যা-ই করেছ, ওটার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো শক্ত কারণ ছিল। আমি কোর্টে তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াব। তুমি আমাকে যা-ই বলছ, এই সবকিছু attorney-client privilege-এর আওতায় একদম সুরক্ষিত থাকবে। আমি তোমার attorney ফারিস, আমার কথা শোনো!"


কিন্তু সে ওনার কোনো কথাই শুনছিল না। সে স্রেফ নিজের মতোই একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছিল, একদম কোনো রোবটের মতো। ঠিক যেন জুমারের কোনো কথায় ওর বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহ নেই।


"নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়বে না। আমি তোমাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তুমি বড্ড ঘাবড়ে যাচ্ছ, কিন্তু একদম নড়াচড়া করবে না, নয়তো তোমারই কষ্ট হবে। আমি তোমাকে স্রেফ একটা গুলি করব, একদম বুকে। বাকিগুলো আমার ওই বেঈমান স্ত্রীর জন্য তোলা রইল।"


খাওয়ার Barrett M95-এর নলের ভেতর নিজের এক চোখ বন্ধ করে তাকাল। নিশানা একদম বরাবর set করল।


"ফারিস, প্লিজ এমনটা করো না। আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমি তোমার হয়ে কেস লড়ব। প্লিজ আমার কথা শোনো!"


ওনার মনে হচ্ছিল সে যেন ওর সামনে হাতজোড় করে মিনতি করছেন। ওনার চোখের কোণায় হয়তো জল এসে জমেছিল।


জারতাশা একদম হতভম্ব হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে ছিল।


"কী হয়েছে ডিএ?" সে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু জুমারের তখন কোনো বাহ্যিক জ্ঞান ছিল না। সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে ফারিসের সামনে অনবরত মিনতি করে যাচ্ছিলেন —


"প্লিজ ফারিস! আমার সাথে এভাবে কোরো না। তুমি এমনটা করতেই পারো না, তুমি বড্ড ভালো একজন মানুষ। তোমার ভেতর এক অদ্ভুত ভালোমানুষী লুকিয়ে আছে। দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের ভেতরেই তা থাকে, আমাদের স্রেফ ওটাকে বাইরে বের করে আনার দরকার হয়। তোমার মনে আছে — আমি তোমাকে এই কথাটা বলেছিলাম? প্লিজ, আমি তোমার শিক্ষিকা ছিলাম। আমার বিয়ে হতে চলেছে!"


সে নিজের পুরো জীবনে কোনোদিন কোনো মানুষের সামনে এতটা মিনতি করেননি। এভাবে কারো সামনে কোনোদিন হাঁটু মুড়ে হাতজোড় করেননি।


কিন্তু সে তো ওনার কোনো কথাই শুনছিল না —


"I am sorry জুমার! কিন্তু আমাকে এটা করতেই হবে। এই সবকিছু জানানোর পর আমি তোমাকে কোনোভাবেই জীবিত ছাড়তে পারি না। I am so, so sorry..."


আর সে ওনার সাথে আরও অনেক কিছুই বলছিল, কিন্তু এবার জুমার ওর কোনো কথাই শুনছিলেন না। সে স্রেফ নিজের ওই ভেজা চোখ দুটো নিয়ে অনবরত ওকে বলে যাচ্ছিলেন —


"ফারিস! আমি তোমার শিক্ষিকা ছিলাম। আমি সাদির ফুপ্পু। আমার বিয়ে হতে চলেছে। প্লিজ আমার সাথে এমনটা কোরো না। নিজের স্ত্রীর সাথে এভাবে কোরো না।"


জারতাশা একদম স্তব্ধ হয়ে নিজের জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর মাথায় বিন্দুমাত্র ঢুকছিল না যে জুমার ফারিসকে কেন এই সব কথা বলছেন!


"ফারিস! তুমি এমন কিচ্ছু করবে না। প্লিজ আমার কথা শোনো। তুমি একবার মনে করে দেখো, আমি তোমার শিক্ষিকা। আমি তোমাকে পড়িয়েছি। আমি সাদির ফুপ্পু। তুমি আমার সাথে এমন কিচ্ছু করতে পারো না। তুমি আমার কাছে এসো। এখানে এসো, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা এই বিষয়ে বসে কথা বলব। তোমার যা-ই কথা বলার আছে, আমরা সব বলব। আমি তোমার কেস লড়ব। আমি সবকিছু একদম ঠিক করে দেব ফারিস! তুমি স্রেফ আমার কথাটা শোনো।"


কিন্তু এবার ফারিসের তরফ থেকে এক গভীর নীরবতা নেমে এল। সে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। এমনকি ওর নিঃশ্বাস ফেলার সামান্যতম আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছিল না।


খাওয়ার নিজের আঙুলটা ট্রিগারের ওপর রেখে, কানের সাথে লেগে থাকা earpiece-এ ফিসফিসিয়ে বলল —


"স্যার! আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি এর পরের শব্দগুলো শুনতে চান?"


টেবিলের আড়ালে মাটির ওপর বসে থাকা হাশিম স্রেফ নিজের মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ওর এক একটি শব্দ যেন ওর কলিজা চিরে নিচে নামছিল, চোখ দুটো তীব্র রাগে একদম লাল হয়ে উঠেছিল।


"তুমি কি ওনাকে দেখতে পাচ্ছ খাওয়ার?"


"হ্যাঁ স্যার। এইতো আর মাত্র বিশ সেকেন্ড বাকি আছে। ওনারা দুজনেই restaurant-এর ভেতর আছেন। ডিএ বড্ড ঘাবড়ে গেছেন, কিন্তু সে অত্যন্ত সাহসী একজন নারী। সে কোনোভাবেই পালিয়ে যাবেন না। সে নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফারিসকে convince করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবেন।"


"ওর মুখের ওপর এই মুহূর্তে ঠিক কী ভাব ফুটে উঠছে খাওয়ার?" সে তীব্র যন্ত্রণায় নিজের রগ দুটো টিপছিল। মাথার ভেতর এক অদ্ভুত ব্যথা চড়চড় করে উঠছিল।


"না কোনো ভয়, না কোনো চিন্তা। স্রেফ একটা শক আর চরম এক অবিশ্বাস।"


নিচে restaurant-এর ভেতর জুমারের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা জারতাশার মনে এবার তীব্র ভয় জাগতে শুরু করেছিল।


"কী হচ্ছেটা কী? আপনি ফারিসকে কীসব বলছেন? সে কোথায়?" কিন্তু জুমারের তখন কোনো হুঁশ ছিল না।


ওনার মগজ ওনাকে বারবার বলছিল যে সে যেন এক্ষুনি জারতাশার হাত ধরে এখান থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে যান, কিন্তু ওনার মন এখনো বিশ্বাস করতে পারছিল না যে ফারিস এমন কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।


সে নিজের শেষ চেষ্টাটুকু করতে চাইলেন —


"ফারিস, প্লিজ তুমি এমন কোনো কাজ কোরো না, যার জন্য তোমাকে সারাজীবন পস্তাতে হয়। আমি তোমার সাথে আছি। আমি তোমার কেসও লড়ব আর তোমাকে সবরকম support করব। প্লিজ ফারিস! তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? ফারিস, প্লিজ আমার বিয়ে হতে চলেছে। আমার সাথে এভাবে কোরো না। নিজের স্ত্রীর সাথে এমন কোরো না। ফারিস... ফারিস?"


খাওয়ার এক ঝটকায় ট্রিগারটা টিপে দিল। এক, দুই, তিন, চার... একদম টিপ টিপ করে...


আর জুমার হঠাৎ অনুভব করলেন যে ওনার হাত থেকে ফোনটা ফসকে নিচে পড়ে গেছে। ওটা মেঝেতে গিয়ে আছাড় খেল, কিন্তু কোনো আওয়াজ ওনার কানে পৌঁছাল না।


জুমার ওই মুহূর্তে দুনিয়ার কোনো কিছুর আওয়াজই শুনতে পাচ্ছিলেন না।


স্রেফ মনে হলো ওনার পিঠটা চিরে কোনো কিছু একটা ওপার হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। এক, দুই, তিন... কোনো একটা তীরের ফলার মতো বস্তু, যাতে তীব্র আগুন জ্বলছিল। এক অদ্ভুত যন্ত্রণার অনুভূতি, তীব্র — সীমাহীন এক কষ্ট।


সে নিচু হয়ে টেবিলের কোণাটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরতে চাইলেন, কিন্তু নিজের শরীরের ভারসাম্য কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছিলেন না। জারতাশার চোখ দুটো পরম বিস্ময় আর আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল।


জুমার দেখলেন সে দাঁড়িয়ে ছিল। জুমারের কাছে এবার ওকে বড্ড উঁচুতে মনে হচ্ছিল, কারণ সে নিজে অনবরত নিচের দিকেই তলিয়ে যাচ্ছিলেন। সে দেখলেন কতগুলো মানুষ ওনার দিকে দৌড়ে আসছে, সে জারতাশাকে ওভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখলেন।


সে নিজে একদম উপুড় হয়ে মাটির বুকে আছাড় খেয়ে পড়লেন। সাদা মার্বেলের ওই ঠান্ডা মেঝেটা ওনার নিজের গালের সাথে লেপ্টে যাচ্ছিল। এক বড্ড ঠান্ডা মেঝে — সবচেয়ে কঠোর হৃদয়ের মানুষের মতোই শীতল।


এ ছাড়া জীবনের আর সমস্ত অনুভূতি যেন নিমেষেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, হয়তো ওনার আশেপাশেই কেউ একজন ছিল... কোনো একটা লাল রঙের জিনিস ছিল... কোনো একটা লাল রঙের তরল, যা ওনার পিঠ থেকে গলে গলে ওনার চারধারে ছড়িয়ে পড়ছিল।


সাদা মার্বেলের মেঝের ওপর, ওনার নিজের হাতের ওপর, ওনার ফ্যাকাশে মুখের চারপাশ দিয়ে ওটা বয়ে যাচ্ছিল। ওটা পানি ছিল না, ওটা পানির চেয়ে অনেক বেশি ঘন আর গাঢ় ছিল।


হাশিমের অফিসে এখন এক গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। সে নিজের চোখ দুটো খুলল, বড্ড ভাঙা মন নিয়ে মাটি থেকে উঠল, অত্যন্ত ক্লান্ত শরীরে চেয়ারে এসে বসল, ল্যাপটপটা বন্ধ করল আর বড্ড ধীর লয়ে intercom-টা তুলে নিয়ে বলল —


"হালিমা! এক কাপ কফি নিয়ে এসো। আর তারপর যতক্ষণ না আমি নিজে বাইরে বের হচ্ছি, কাউকে ভেতরে আসতে দেবে না। আমি কিছুটা সময় একদম একাকী কাটাতে চাই।"


তারপর সে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে মাথাটা চেয়ারের পেছনের হাতলে এলিয়ে দিল।


এক পরম শোকের বিকেল — জুমার ইউসুফের নামে আর জারতাশা গাজীর নামে!


"তুমি কোনো এক জান্নাতে থাকার বড্ড শখ ছিলে না জারতাশা? তোমার এই শেষ ইচ্ছেটাও ফারিসের জায়গায় আমি নিজেই পূরণ করে দিলাম।"





চলবে,,,,,,



 

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)