নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৪ পর্ব ১৫, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


 

#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৪


পর্ব:-১৫



 বিষয়:-মানুষের বন্ধু

           insaan dost


Agar tum hosla mujtama rakh sako jab ird gird

insaan dost

sab hosla kho rahe hon aur tuলm ko moorid-e-ilzam thehra rahe hon


যখন চারপাশের সবাই সাহস হারিয়ে ফেলে

আর তোমাকেই দোষারোপ করে,


তবুও যদি তুমি নিজের ধৈর্য ও সাহস ধরে রাখতে পারো।



---


Agar tum khud pe bharosa kar sako jab sab

tum par shak karein

magar un ko shak ki ijazat bhi do


যখন সবাই তোমাকে সন্দেহ করে,

তবুও যদি তুমি নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারো,

আর তাদের সন্দেহ করার অধিকারও মেনে নিতে পারো।



---


Agar tum intezar kar sako aur intezar se thako nahin


যদি তুমি অপেক্ষা করতে পারো

এবং অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত না হও।



---


Ya tum se jhoot bola jaye magar tum na bolo


যদি তোমার সাথে মিথ্যা বলা হয়,

তবুও তুমি মিথ্যার আশ্রয় না নাও।



---


Ya tum se nafrat ki jaye magar tum nafrat ko rasta na do


যদি মানুষ তোমাকে ঘৃণা করে,

তবুও তুমি ঘৃণাকে নিজের মনে জায়গা না দাও।



---


Aur phir bhi na tum bohat achhe lago na bohat aqalmand


তবুও নিজেকে অতিরিক্ত মহান

বা অতিরিক্ত জ্ঞানী হিসেবে প্রকাশ না করো।



---


Agar tum khwab dekh sako aur khwabon ko apna aaqa na banao


যদি তুমি স্বপ্ন দেখতে পারো,

কিন্তু সেই স্বপ্নের দাস না হয়ে যাও।



---


Agar tum soch sako magar sochon ko apna maqsad na banao


যদি তুমি চিন্তা করতে পারো,

কিন্তু চিন্তাকেই জীবনের শেষ লক্ষ্য না বানাও।



---


Agar tum fatah aur tabahi dono se mil sako

aur in dono dhokay bazon se aik jaisa sulook kar sako


যদি তুমি সাফল্য আর ব্যর্থতা—

দুই প্রতারককেই সমানভাবে গ্রহণ করতে পারো।



---


Agar tum apne bare bola gaya sach sunne ki himmat kar sako

jise nadanon ko behkane ke liye tor maror kar pesh kiya jaye


যদি তুমি সাহস করে শুনতে পারো

তোমার সত্য কথাগুলোকে মিথ্যা রূপ দিয়ে

মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।



---


Ya jin cheezon ko tum ne apni zindagi de dali un ko toota hua dekh sako


যে জিনিসগুলোর জন্য তুমি জীবন উৎসর্গ করেছো,

সেগুলোকে ভেঙে যেতে দেখতেও যদি পারো।



---


Aur phir jhuk kar un ko ghise pite auzaron se dobara tameer kar sako


আর তারপর পুরোনো ভাঙা যন্ত্র নিয়েও

সেগুলোকে আবার গড়ে তুলতে পারো।



---


Agar tum hujoom se baat karo aur apne andar ki achhai bhi barqarar rakho


যদি তুমি জনতার সাথে মিশো,

তবুও নিজের ভেতরের সততা বজায় রাখতে পারো।



---


Ya badshahon ke sath chalo aur apna aam hone ka ehsaas bhi na kho sako


অথবা রাজাদের সাথে চলাফেরা করেও

নিজের সাধারণ মানুষ হওয়ার অনুভূতি না হারাও।



---


Agar na dushman na dost tum ko dukh de sakein


যদি শত্রু বা বন্ধু—

কেউই তোমাকে আঘাত করতে না পারে।



---


Agar tum be-reham minute ko bhar sako

saath second jitne faasle ki daur se


যদি তুমি প্রতিটা নির্মম মিনিটের ৬০টি সেকেন্ডকেই পূর্ণ উদ্যমে কাজে লাগাতে পারো,


---


Tab… haan tab

tumhari hogi yeh zameen aur jo is mein hai


তবে—হ্যাঁ তবে—

এই পৃথিবী এবং এর সবকিছু তোমার হবে।



---


Aur sab se barh kar — tum ek kamil insaan ban jaoge.


আর সবচেয়ে বড় কথা,

তুমি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠবে।


— (কিপলিং-এর ‘If’ কবিতার অংশবিশেষ)»


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Tum nahaq tukray chun chun kar daaman mein chhupaye baithay ho... sheeshon ka masiha koi nahi, kya aas lagaye baithay ho


[তুমি অকারণেই কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে আঁচলে লুকিয়ে রেখেছ... কাঁচের কোনো ত্রাতা হয় না, তুমি কিসের আশা নিয়ে বসে আছ?


বাড়ি ফিরে সাদি সবার আগে হানিনের ঘরে উঁকি দিল। তারপর মনে পড়ল, সে তো এই সময়ে টিউশন একাডেমিতে থাকে। সে নিজের ঘরে এসে প্যাকিং করতে লাগল।


যখন মাগরিবের কাছাকাছি সময়ে লাউঞ্জ থেকে কথাবার্তা আর টিভির আওয়াজ ভেসে এল, তখন সে বাইরে বের হলো। হানিন ব্যাগটা সোফায় রেখে—মানে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে—কিচেনে ঢুকে পড়েছিল। সে দরজার চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়াল।


“একটা খারাপ খবর আছে।” মুখের হাসি চেপে সে কথা শুরু করল।


হানিন ফ্রিজ থেকে খাবার বের করতে ব্যস্ত ছিল, সেদিকেই মগ্ন রইল।


“আমি আজ নওশেরওয়ানের বাড়িতে তোমার গেমের high-scorers-এর তালিকাটা দেখলাম। অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, আপনি আর এখন এক নম্বরে নেই।”


“আমার মেজাজ খারাপ করো না, ভাইয়া! আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমিই top-এ আছি।” সে বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে প্লেটটা নিয়ে লাউঞ্জে চলে এল। কম্পিউটারের চেয়ারটা টেনে নিয়ে পাওয়ার বাটন চাপল এবং একই সাথে এক লোকমা মুখে পুরল।


“শেষবার কখন চেক করেছ?” সে-ও পাশে এসে দাঁড়াল।


“পরশু। তুমি তো জানোই, আমি দুদিন ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলাম। এই জন্য গেমটা খুলতেই পারিনি, আর তুমি এখন আমাকে বোকা বানাচ্ছ।” এক হাতে খেতে খেতে অন্য হাতে মাউস চালিয়ে সে ইমেইল খুলছিল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আঙুল দিয়ে চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিল।


“কারদার সাহেবের ইমেইল এসেছে।”


সাদিও একটু ঝুঁকে পড়ল। হানিন ওনাকে চার-পাঁচ দিন আগে কিছু মুভির একটা তালিকা পাঠিয়েছিল, যেগুলো ওনার দেখা উচিত। জবাবে উনি একটি ‘Thanks’ লিখে পাঠিয়েছেন এবং সাথে একটি ফাইলও ছিল।


হানিন হাসতে হাসতে তার গেমের সাইটটা খুলল। তারপর সবার আগে তালিকাটা সামনে নিয়ে এল। নিজের নামটা খুঁজতেই মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল। সে প্লেটটা রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। সে এখন দুই নম্বরে ছিল, আর এক নম্বরে অন্য কেউ।


“এটা কে? আর ও কখন...?” সে অবাক হয়ে এবং কিছুটা রেগে গিয়ে তার প্রোফাইলটা খুলে দেখতে লাগল। মেয়ে এবং আমেরিকার বাসিন্দা—এ ছাড়া আর কোনো তথ্য ছিল না।


“Ants ever after! এর মানে কী দাঁড়াল?”


খুব কষ্ট করে হাসি চেপে সাদি কাঁধ ঝাঁকাল। হানিন এখন নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক পেজগুলো ওল্টাতে লাগল। সাদি বেশ মজা পাচ্ছিল। বোনেদের ক্ষ্যাপানোর চেয়ে বেশি আনন্দ আর অন্য কিছুতে আছে নাকি দুনিয়ায়?


“আচ্ছা, ও এই জেলি-ওয়ালা রাউন্ডটা কীভাবে পার করল? আর এক ধাক্কায় একদম top-এ চলে এল কীভাবে?”


সাদির তাকে ক্ষ্যাপানো হয়ে গিয়েছিল, তাই সে হাসতে হাসতে কিচেনে আম্মুর কাছে চলে গেল। হানিন তখনও ওভাবেই ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর তাকে একটা মেসেজ পাঠাল। খাবার-দাবারের কথা সে একদম ভুলে গিয়েছিল।


“Hi!”


আর তারপরই মেসেজ এল।


“Hello!” ঠিক পরের মিনিটেই জবাব এল।


হানিন কি-বোর্ডে আঙুল রেখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে টাইপ করতে লাগল।


“তুমি জেলি-ওয়ালা রাউন্ডটা কীভাবে পার করলে?”


সামান্য বিরতি দিয়ে জবাব ভেসে উঠল।


“Normally, আমরা কথা শুরু করার আগে ‘কেমন আছ’ জিজ্ঞেস করি।”


“আমি normal নই। আমি হানিন। এবার বলো, তুমি ওই রাউন্ডটা কীভাবে পার করলে?”


“পরিশ্রম, বারবার চেষ্টা আর তাতেই হয়ে গেল। তা তুমি হানিন, পাকিস্তান থেকে?”


“হ্যাঁ! আর তুমি কে আমেরিকা থেকে?” সে এখনও বেশ ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।


সেখানে প্রথমে একটি স্মাইলি ইমোজি ভেসে উঠল।


“আমি আলিশা (Alicia), ভার্জিনিয়া থেকে। আর আমার পূর্বপুরুষরা ফরাসি।”


‘French-American?’ হানিন সন্দেহজনক দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।


“আমি কীভাবে বিশ্বাস করব যে তুমি সেটাই, যা তুমি বলছ?”


“Okay, আমি ক্যামেরা অন করে দিচ্ছি। আমার এই high-scorer-এর সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগছে, যার রেকর্ড আমি ভেঙেছি।”


আর সে ক্যামেরা চ্যাট অনও করে দিল। হানিনের জন্য এত দ্রুত এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তবুও সে কানে হেডফোন চেপে নিল, তবে নিজের ক্যামেরা অন করল না। (নইলে আম্মু কিচেন থেকে জুতো ছুঁড়ে মারতেন!)


কানে একটি মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।


“তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?”


স্ক্রিনে একটি চারকোণা বক্স তৈরি হয়েছিল, যাতে একটি ছোট বেডরুম দেখা যাচ্ছিল। আলিশার পেছনে দেয়ালের ওপর একটা আয়না ছিল, যা কম্পিউটার টেবিলের প্রতিফলন দেখাচ্ছিল। সে সত্যিই আমেরিকান একটা মেয়ে ছিল—সতেরো-আঠারো বছর বয়স। চুলগুলো কালো আর shoulder-cut, গায়ের রঙ খুব ফর্সা, বড় বড় চোখ আর খুব সুন্দর একটা হাসি।


স্ক্রিনে সে হাত নাড়ল, তাও এত সুন্দর করে হাসল যে হানিনের রাগী মনটা একদম গলে জল হয়ে গেল। সে বেশ উৎসাহ নিয়ে সামনে ঝুঁকে কথা বলতে লাগল।


“তাহলে তুমি French-American?”


“হ্যাঁ, তবে আমি নিজেকে আমেরিকান বলতেই বেশি পছন্দ করি।” সে আবার হাসল। তার হাসার একটা সহজাত অভ্যাস ছিল।


“কিন্তু তুমি নিজের নামে কেন আসো না? আর তোমার এই nickname-এর মানেটাই বা কী?”


“ওহ!” সে বেশ অবহেলাভরে কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নিচু হয়ে ড্রয়ার থেকে কিছু একটা বের করল।


“ওটা তো একটা লেখা, যা আমার key chain-এ খোদাই করা আছে।”


সাথে সাথে সে একটা কালো পাথরের key chain দোলাল এবং ওখানেই টেবিলের ওপর রেখে দিল।


“আমি নিজেও এর আসল অর্থ জানি না।”


“আচ্ছা, ওই জেলি-ওয়ালা রাউন্ডটা...” হানিনের সুঁই ওখানেই আটকে ছিল।


“আমি দু-একটা tips দিতে পারি।” আলিশা ডান হাতের তালুতে থুতনি ঠেকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বলতে শুরু করল। হানিন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।


সাদি যখন সেখান দিয়ে হেঁটে নিজের ঘরে যাচ্ছিল, তখন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মাঝপথেই থামল। ইশারায় জিজ্ঞেস করল—কে ওটা?


হানিন মাইকে হাত চাপা দিয়ে বলল, “আমার নতুন বন্ধু।”


আর পরক্ষণেই আবার ওদিকেই মনোযোগ দিল।


সে ভ্রু কুঁচকে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।


ফোনের রিংটোন বাজতেই সাদি চমকে উঠল এবং এদিক-ওদিক কিছুটা অচেনা দৃষ্টিতে তাকাল। সে নিজের অফিসে বসে ছিল। সাতটি বছর কেটে গেছে এবং সবকিছু বদলে গেছে।


ক্লান্তি ঝেড়ে মাথাটা নাড়িয়ে সে ফোনটা তুলল, যা হাশিমের কলের পর থেকে এখনও গরম হয়ে ছিল।


“জি, আমি আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”


অফিস থেকে কারো কল ছিল। সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল, যেখানে সে একটা ভুল command দিয়ে নিজের সমস্ত data corrupt করে ফেলেছিল। এখন নতুন করে হাশিমের ফাইলগুলো সে কীভাবে উদ্ধার করবে? উফ!


সে ফোনটা রেখে নিজের মাথাটা দুই হাতের তালুতে গুঁজে দিল। মস্তিষ্কটা একদম ফাঁকা আর শূন্য লাগছিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Chhora nahi ghairon ne koi naawak-e-dushnaam, chhooti nahi apnon se koi tarz-e-malaamat


[পরেরা গালিগালাজের কোনো তির ছুঁড়তে বাকি রাখেনি, আর আপনজনেরাও তিরস্কারের কোনো ধরণ বাদ দেয়নি।]


ব্যাংকুয়েট হলটি আজ এই অন্ধকার সন্ধ্যায় আলোয় ঝলমল করছিল। গানবাজনা আর হাসাহাসির রোল; রঙ-বেরঙের স্টেজে বর-বধূর সঙ্গে লোকে লোকারণ্য হয়ে ছিল। ছবি তোলা হচ্ছিল—group photo, happy ending, fairy mela।


অন্যপাশে খাবার দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। বুফে স্ট্যান্ডের দিকে যারা যাচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে হানিন আর সায়ামও ছিল। হানিন একটা হালকা গোলাপি রঙের লম্বা ফ্রক আর চুড়িদার পায়জামা পরেছিল, আর সায়ামের পরনে ছিল কুর্তা-সালোয়ার। উচ্চতায় সে হানিনের কান পর্যন্ত আসত। তার সঙ্গে চলতে চলতে সায়াম যখন কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতে লাগল, তখন বোন তার কনুই ধরে নিজের কাছে টানল এবং গোয়েন্দার মতো চোখে তাকাল।


“মোটু আলু... এক মিনিট। বিয়েবাড়িতে খাওয়ার তিনটি নিয়ম মনে আছে তো?”


“একদম!” সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আঙুল গুনে বলতে লাগল। “প্রথম নিয়ম—এমন কিছু খাওয়া যাবে না, যা কেবল পেট ভরায়; যেমন রুটি আর সালাদ। 


দ্বিতীয়ত—যা সাধারণত আমরা প্রায়ই খেয়ে থাকি, যেমন চিকেন আর বিফ, সেগুলোর ওপর বেশি দামি মাংসকে প্রাধান্য দিতে হবে, যেমন মাটন আর prawns। 


তৃতীয় আর শেষ নিয়ম—এই সবকিছুকে নিজের জীবনের শেষ খাবার মনে করে খেতে হবে।”


“ঠিক!” সে বেশ গাম্ভীর্যের সঙ্গে মাথা দোলাল এবং তারপর দুজনে একসঙ্গে সামনে এগিয়ে গেল। প্লেট তুলে নিল। দূর থেকে বুফে টেবিলগুলোর ওপর একদফা সমালোচকের দৃষ্টি বোলাল। তারপর বারবিকিউ দেখে হানিনের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। দুজনে বেশ আত্মবিশ্বাসী চালে সেদিকে এগিয়ে গেল।


জুমারও ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। খুব মার্জিতভাবে প্লেটে সামান্য একটু খাবার নিচ্ছিলেন। আজও তিনি কালো রঙ পরেছিলেন। কোঁকড়ানো চুলগুলো আগের মতোই আলতো করে ওপরে বাঁধা ছিল। হানিন তাঁকে অগ্রাহ্য করে নিজের প্লেট ভরতে লাগল।


জুমার মাথা তুলতেই দেখলেন, সে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই একসাথেই এসেছিল এবং তখন থেকে দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। জুমার কিছুটা সৌজন্যতা দেখিয়ে টেবিল থেকে মায়োনিজভরা বাটিগুলোর একটা তুলে হানিনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।


হানিন এমন ভাব করল, যেন সে দেখেইনি। খাবার নিয়ে সে অন্য টেবিলের দিকে চলে গেল। সেখান থেকে আরেকটি বাটি তুলে নিয়ে অন্যপাশে ঘুরে গেল। জুমারের মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল, বাটিটা তাঁর হাতেই রয়ে গেল।


“ফুপ্পু, এটা আমাকে দিন।” সায়াম চট করে ওনাকে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাল।


হানিন কথাটা শুনতে পেয়েছিল, কিন্তু সে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্লেটে গ্রেভি ঢালতে লাগল। চামচটা যেই না রাখল, একটা মেহেদি-রাঙানো হাত ওটা তুলে নিল। অবলীলায় হানিনের চোখ ওপরে উঠল।


ওটা ছিল কিরাণ। জমকালো পোশাক, গয়না আর মেকআপে সে বেশ হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত লাগছিল। সঙ্গে ওনার এক কাজিনও ছিল। সে তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে খাবার নিচ্ছিল। হানিনের দৃষ্টি আরও পেছনে গেল। কাছের একটা টেবিলে ওনার শাশুড়ি বসে ছিলেন, সঙ্গে কাজের মেয়ে এবং দুটি যমজ বাচ্চা ছিল, যাদের খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ঝুঁকে ঝুঁকে আদর করছিল।


হানিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘুরে জুমারকে দেখল। জুমার ততক্ষণে বিষয়টি দেখে নিয়েছিলেন এবং এখন বেশ গম্ভীর মুখে অন্যদিকে ফিরে গিয়েছিলেন। কারও কাছে সেই জিনিসটা দেখা কতটা যন্ত্রণাদায়ক, যা আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে! হানিন পেছনে ঘুরল, যাতে ফুপ্পুর হাত থেকে মায়োনিজের বাটিটা নিজে নিয়ে নেয়, কিন্তু ওটা ততক্ষণে সায়ামের কাছে চলে গেছে। এবার বড্ড দেরি হয়ে গেছে।


“হাম্মাদ!” সে নামটি শুনতে পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। সে তার মায়ের টেবিলে ঝুঁকে কারও সঙ্গে দেখা করছিল। চশমা পরা, দেখতে বেশ ভালোই ছিল ছেলেটা, কিন্তু এই মুহূর্তে হানিনের কাছে তাকে বিষের মতো লাগছিল। একরাশ চাপা ক্ষোভ নিয়ে সে খাবার তুলে জুমারের পাশে এসে দাঁড়াল। আম্মু আর ভাইয়া দূরের একটা টেবিলে ছিলেন, কিন্তু তারা তিনজন এখানেই দাঁড়িয়ে রইল।


“এই কোঁকড়ানো চুলের প্রসিকিউটর মেয়েটিই না হাম্মাদ ভাইয়ের ex-fiancée?” কিরাণের কাজিন বেশ জোরেই ফিসফিস করে বলল। জুমার ও হানিনের পিঠ ছিল তাদের দিকে, কিন্তু কথার আওয়াজ কে আর রুখতে পারে!


কিরাণ আড়চোখে তাকাল, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে খাবার তুলতে তুলতে বলল—


“ছিল না, সে এখনও প্রসিকিউটরই আছে। Career woman, you know।”


“তাহলে ওর বিয়ে হয়নি? সত্যি, ওর তো কিডনি দুটো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল না?”


“কিডনির আর কী! ওটা তো পেয়েই গিয়েছিল। কোনো এক ফরাসি মহিলা হঠাৎ এক উদাসী যাযাবর আত্মার মতো কোত্থেকে যেন এসে কিডনি দিয়ে গেল। So filmi!”


হানিনের গায়ের রঙ যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। প্লেট ধরে থাকা হাতের মুঠো শক্ত হলো।


“কিডনি তো একটা বাহানা মাত্র। যে মহিলারা career-এর পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাদের কি আর সংসার টেকে? এই জন্যই তো আমাদের ধর্মেও ঘর আর পরিবারের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”


উদাসীনভাবে চুলের লট পেছনে সরাতে সরাতে কিরাণের গলার আওয়াজ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে আশপাশের দু-চারজন লোক তা ভালোভাবেই শুনে ফেলেছিল। হানিন আড়চোখে জুমারকে দেখল। তিনি কাঁটাচামচ দিয়ে মাছের টুকরোটা বিঁধছিলেন, মুখটা একদম গম্ভীর ও ভাবলেশহীন দেখাচ্ছিল।


“কী আর বলা যায়, চারদিকে যা সন্ত্রাসবাদ বেড়ে গেছে!”


“আরে ভাই! মানুষের নিজেরও তো একটু বোঝা উচিত। এখন কে বলেছে মেয়েদের খুনের মামলায় জড়াতে? এই জন্যই তো আমাদের ধর্মে...” এখানে সবারই নিজস্ব আল্লাহ আর নিজস্ব ধর্ম ছিল।


“Hello, কিরাণ!” কেউ একজন কিরণকে উদ্দেশ করে বলতেই তার অবিরাম চলতে থাকা মুখটা থামল।


জুমার ততক্ষণে অন্য একটা স্টলের দিকে যাচ্ছিলেন। আওয়াজটা শুনে তিনি মুহূর্তের জন্য থামলেন, তারপর আবার হাঁটতে লাগলেন। আর হানিনের তো গোটা পৃথিবীটাই যেন এই আওয়াজে থমকে যেত। সে কিছুটা আড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার পুরোপুরি পেছনে ঘুরল।


আর ঘুরতেই দেখল, কিরাণও সেখানে বেশ আনন্দিত ও বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


“আরে হাশিম, আপনি?!” সে এক হাতে কাঁটাচামচ আর অন্য হাতে প্লেট নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। টাই ছাড়া শার্ট, ওপরে গ্রে কোট। হাশিম হাসিমুখে কিরণের আনুষ্ঠানিক কথার জবাব দিল।


“আপনার আসার কথা শুনে খুব ভালো লাগল। আপনার আম্মু কি এসেছেন?” সে হাশিমের পেছনে দূরের ভিড়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করল। সে তাদের কোম্পানির এক কর্মকর্তার মেয়ে ছিল এবং তারা ওনার কাছাকাছিই ছিল। কয়েক মুহূর্ত আগের সেই অহংকার আর দম্ভ যেন কর্পূরের মতো উবে গেল, পরম ভদ্রতা আর অমায়িকতা ফিরে এল ওনার মধ্যে।


“কেমন আছ তুমি? আর তোমার চোখের নিচে এত কালি কেন পড়েছে?” সে হাসিমুখে বলছিল, কিন্তু কণ্ঠস্বর এতটাই শীতল ছিল যে কিরণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের হাত দিয়ে চোখটা স্পর্শ করল।


“নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রেখো, কিরাণ। কারণ খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে কোনো মহিলাকে ছেড়ে দেওয়ার রেকর্ড যদি কারও থাকে, তবে আমি ভাবি বর্তমান কোন মহিলার যদি কখনো হাত-পায়ের হাড়ও ভেঙে যায়, তবে তার কী অবস্থা হবে? Hello, হানিন!”


সে কথাটি বলেই হানিনকে উদ্দেশ করে সামনে এগিয়ে এল। কিরাণ একদম হা করে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু হানিন এখন আর তার দিকে তাকাচ্ছিলও না। তার কামড়ানো ঠোঁট দুটো শিথিল হয়ে গেল, টানটান হয়ে থাকা স্নায়ুগুলো শান্ত হলো। মাথা ঝুঁকিয়ে জবাব দিতে দিতে কিরাণ সেখান থেকে কিছুটা দূরে সরে এল, সঙ্গে হাশিমও হেঁটে এল। জুমার ইতিমধ্যে দূরে অন্য টেবিলে সায়াম, সাদি আর নুদরাতের সঙ্গে গিয়ে বসেছিলেন।


“এটা কী করলেন আপনি?” বলতে বলতে হানিন দূরে জুমারকে দেখল। “কী দরকার ছিল এটার?”


“আমি এটা জুমারের জন্য করিনি, আর তুমি সেটা ভালো করেই জানো।” সে নিজের চেনা ঢঙে হালকা কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্লেটে বিরিয়ানি নিচ্ছিল।


“আপনি শুধু এইটুকুই খাবেন?” সে প্রথমে হাশিমের প্লেটের দিকে তাকাল, তারপর নিজের প্লেটের দিকে।


“এতেও অনেক calories আছে, যার মানে হলো extra workout করতে হবে। আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, বোঝার চেষ্টা করো।”


হানিন হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে কাবাব মুখে তুলতে লাগল। হাশিম কাঁটাচামচে বিঁধানো টুকরোটা মুখে দিয়ে হাসিমুখে তার দিকে তাকাল।


“আমার চেনা-পরিচিত মহলে অন্য কোনো হানিন নেই। আমি সেদিন মিথ্যে বলেছিলাম।”


সে চমকে ওনার দিকে তাকাল। “তার মানে আপনি সত্যিই আমাকে চিনতে পারেননি সেদিন?”


“হ্যাঁ, কারণ যে হানিনকে আমি চিনতাম, সে এতটা ঘাবড়ানো আর পেরেশান থাকত না। তোমার কী হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে?”


হানিন একদম থমকে গেল। সে কি সত্যিই এতটা বদলে গেছে যে হাশিম পর্যন্ত তা টের পেয়ে গেল?


“আমি তো আগের মতোই আছি, আর আপনার সঙ্গে তো এখন কেবল অনুষ্ঠানগুলোতেই দেখা হয়। (Eiffel Tower-এর মতো!) আপনি কীভাবে জানবেন আমি কেমন আছি?” সে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসল, কিন্তু হাশিম ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল।


“আর তুমি চাও আমি তোমার এই বাহানাটা বিশ্বাস করি? Okay, করলাম।”


হানিন মাথা সামান্য নিচু করে খেতে লাগল। হঠাৎ কোনো এক অনুভূতির বশে সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। দূরে জওয়াহেরাতের সঙ্গে নওশেরওয়ান দাঁড়িয়ে ছিল এবং বেশ রাগী ও বিরক্ত মুখভঙ্গি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ওদের দিকেই তাকাচ্ছিল। সে সোজা হয়ে বসল।


“ওরকম কিছুই নয়,” হাশিম যেন তাকে সান্ত্বনা দিল। সে তার মুখাবয়ব পড়ার চেষ্টা করছিল। হানিন ভ্রু কুঁচকাল।


“আপনার ভাই এখনও আমার দিকে ওভাবেই তাকাচ্ছে। সেদিন আপনার বাড়িতেও ও আমাকে দেখার পর ভাইয়া আর মামুর কাছে কী যেন বলছিল। ও বোধহয় এখনও আমার ওপর শত্রুতা পুষে রেখেছে।”


“I am sorry! আমি ওর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি।” সে মৃদু স্বরে বলল এবং তারপর শেরুর দিকে তাকিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো চোখ রাঙাল। শেরু অন্যপাশে তাকাতে লাগল। হানিন সায় দিয়ে মাথা নেড়ে ডিশ থেকে কাবাব তুলতে লাগল। তার মুখটা এখন কিছুটা গম্ভীর আর মলিন দেখাচ্ছিল। হাশিম বিদায় নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল। হুট করে ওনার মাথায় কিছু একটা কাজ করল।


সে থমকে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন গোটা দুনিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর ওনার চোখে এক তীব্র কষ্টের আভাস ভেসে উঠল। খুব কষ্ট করে সে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।


“I am sorry, হানিন! I really am। আমি এটা আগে বলতে পারিনি, তোমার সঙ্গে দেখাই হয়নি। আমার সত্যিই খুব... I am sorry!”


হানিন চমকে ওনার দিকে তাকাল। ওনার চোখে এক গভীর বেদনা আর ক্লান্তি ছিল। তার মনের পর্দায় এক ভুলে যাওয়া অতীত মুহূর্ত ভেসে উঠল—তখনও ওনার চোখে ঠিক এমনই এক বেদনা ছিল। হানিন মাথা ঝাঁকিয়ে নিল। সে মুহূর্তের মধ্যে আবার বিয়ের অনুষ্ঠানে ফিরে এল, কিন্তু ততক্ষণে হাশিম চলে গেছে।


সে একপ্রকার শূন্য মনে নিজের টেবিলের দিকে ফিরে এল। জুমারের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে তিনি সাদির সঙ্গে নিচু স্বরে কিছু একটা বলছিলেন। হানিন অন্যমনস্কভাবে তা শুনল।


“তুমি কি ওটা ওকে ফেরত দিয়ে দিয়েছ?”


“খুব জলদিই দিয়ে দেব।” সাদি সংক্ষেপে বলল। হানিন চমকে উঠল। ভাইয়া কবে necklace ফেরত দেবে আবার? কিন্তু তখনই তার চিন্তার মোড় ঘুরে গেল। হাশিমের সেই ক্ষমা চাওয়া... দেড় বছর পর সে সেই মান-অভিমান দূর করে দিল, যা হানিনের ওনার প্রতি কখনোই ছিল না। সে তো স্রেফ ভাইয়াই ছিল।


“সায়াম! জামাকাপড়ে ফেলো না।” নুদরাতের মনোযোগ ওদিকে ছিল না। তিনি বরাবরের মতোই সায়ামকে বকাঝকা করছিলেন। সে-ও মুখ বাড়িয়ে হানিন আর সাদির মতো উত্তর দিচ্ছিল।


“আম্মু! দাগ তো ভালোই হয়।”


হানিন পুরোপুরি বাস্তবে ফিরে এসেছিল। সে বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাল।


“এ নিজেও আমাদের বংশের একটা বড় দাগের চেয়ে কম কিছু নয়।”


“ওকে জ্বালিও না তো।” নুদরাত চাপা গলায় চোখ রাঙালেন। সে সঙ্গে সঙ্গে চটে গিয়ে বলল—


“ঐ তো সবসময় আগে শুরু করে। তালি তো দুই হাতেই বাজে।”


“কিন্তু থাপ্পড় একটাই পড়ে, আর ওটা বাড়ি গিয়ে পড়ে।”


এই হুমকির পর সে বিড়বিড় করতে করতে মাথা নিচু করে খাবার খেতে লাগল।


সাদি উঠে চলে গেলে নুদরাত জুমারের কাছাকাছি হয়ে বললেন, “এই যে নীল জামা পরা মেয়েটি যাচ্ছে না, ওটা হলো হুমেরার মেয়ে রামিয়া। এই বছরই engineering শেষ করেছে। ওরে আমার সাদির জন্য বেশ পছন্দ।”


জুমার চমকে ওনার দিকে তাকালেন এবং বেশ আগ্রহ দেখালেন।


“ও তো ভীষণ মিষ্টি দেখতে। তাহলে কবে চাইছেন ওনাকে ঘরের বউ করে?” কিরাণের কথায় তাঁর মুখে যে বিষণ্নতার ছায়া পড়েছিল, তা কেটে গিয়ে এক চিলতে আনন্দ উপচে পড়ল।


হানিন এক নজর সেই দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির দিকে তাকাল, যে লম্বা ফ্রক পরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর যেহেতু তার কাছে এই খবরটা নতুন ছিল না, তাই সে মাথা ঝাঁকিয়ে আবার খেতে লাগল।


নুদরাতের মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।


“এখনও বড় আব্বুর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে, তারপরই কোনো কথা এগোবে।” এ কথা বলার সময়, এমনকি শুধু ভাবার সময়েও নুদরাতের মুখটা খুশিতে চকচক করে উঠছিল।


“আর আম্মু, ওনারা যদি না করে দেন তো?” সায়াম নিজের বুদ্ধিতে বেশ বড়দের মতো একটা প্রশ্ন করে বসল, আর নুদরাতের হাতটা জাস্ট জুতো পর্যন্ত যাওয়া থেকে বেঁচে গেল।


“কেন না করবেন ওনারা আমাদের সাদিকে? কোনো কারণ আছে কি?” জুমার মুখে মৃদু হাসি চেপে সায়ামকে জিজ্ঞেস করলেন। সায়াম হেসে একপাশে সরে গেল।


হানিনের চামচটা ঠোঁট পর্যন্ত গিয়ে থমকে গেল। সে মাথা তুলল, বেশ গম্ভীর চোখে জুমারকে দেখল এবং একনাগাড়ে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না জুমারও তার দিকে তাকালেন।


নুদরাত যখন sweet dish নিতে উঠলেন, তখন হানিন বলে উঠল—


“কোনো কারণ ছাড়াও তো মানুষ না করে দেয়, ফুপ্পু! কোনো এক অতি উত্তম মানুষকেও স্রেফ নিজের অহংকারে বুনো, জংলি আর বদমেজাজি বলে প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া হয়।”


জুমারের চোখে এক তীব্র বিস্ময় জেগে উঠল। “Sorry?” তিনি যেন কিছু বুঝতেই পারলেন না।


“আমি তো স্রেফ আপনার স্মৃতিশক্তিটা একটু refresh করে দিচ্ছিলাম। কেন? আপনি কি ঠিক এই কথাগুলো বলেই ফারিস মামুর বিয়ের প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করেননি?” আর সে মাথা নিচু করে তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে চামচটা মুখে পুরে নিল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে sweet dish-এর দিকে চলে গেল।


আর জুমার... তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানেই স্থাণু হয়ে রয়ে গেলেন। স্তব্ধ, নিথর। এমনকি তাঁর শ্বাসটুকুও যেন বন্ধ হয়ে এল। ঠিক যেমন অন্ধকারে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শেষ ধাপের পর ভুলবশত মনে করা হয় যে আরও একটা ধাপ বাকি আছে, আর তখনই মুহূর্তের জন্য পা-টা শূন্যে ভেসে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে... সেই মুহূর্তের তীব্র ঝাঁকুনি... সেই বুক ধড়ফড়ানি... যা সময়ের গতিকে একদম স্তব্ধ করে দেয়... একদম নীরব... এক থমকে যাওয়া সময়।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


বর্তমান সময় থেকে পাঁচ বছর আগে


«کچھ زخم صدیوں بعد بھی تازہ رہتے ہیں فراز ... وقت کے پاس بھی ہر مرض کی دوا نہیں ہوتی

Kuch zakhm sadiyon baad bhi taaza rehtay hain Faraz... waqt kay paas bhi har marz ki dawa nahi hoti


[কিছু ক্ষত শতাব্দী পরেও সতেজ থেকে যায়, ফারাজ... সময়ের কাছেও সব রোগের ওষুধ থাকে না।


হানিনের ঘরে পুরো স্পিডে ফ্যান চলছিল। কার্পেটের ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে জুমার তাশাহুদে বসেছিলেন। চোখ জোড়া হাতের ওপর নিবদ্ধ, মুখের চারপাশ জড়িয়ে ওড়না ঢাকা, ঠোঁট দুটো মৃদু নড়ছিল। তারপর তিনি ডানে-বামে সালাম ফেরালেন এবং দোয়ার জন্য হাত তুললেন। ঠিক তখনই আলমারি থেকে কিছু একটা বের করতে থাকা হানিনের ওপর তাঁর নজর পড়ল। জুমার মৃদু হাসলেন। হানিন কোনো একটা বিষয়ে বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে-ও একটা ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে আবারও জিনিসপত্র ওলটপালট করতে লাগল।


জুমার নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে দোয়া করতে লাগলেন। তারপর মুখে হাত বুলিয়ে যখন উঠলেন, তখন দেখলেন হানিন বিছানার কোণায় বসে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। তার মুখটা বেশ মলিন দেখাচ্ছিল, মনটা যেন অন্য কোথাও আটকে ছিল। কোনো একটা পেরেশানি ছিল হয়তো, কিন্তু কে কাকে জিজ্ঞেস করবে, আর কেই-বা বলবে? তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা এতটাই আনুষ্ঠানিক ছিল যে, দুই বছর ধরে সাদির অনুপস্থিতিও তাদের কাছাকাছি আনতে পারেনি। স্রেফ একটা আলতো হাসি থেকে আরেকটা হাসি পর্যন্তই ছিল এই সম্পর্কের পরিধি।


“আমি কি এটা এখানেই রেখে দেব, হানিন?” জায়নামাজটা তোলার আগে তিনি জিজ্ঞেস করলেন।


হানিন সায় দিয়ে মাথা নাড়ল। আম্মু এখন আরও দু-চারটে কথা না শোনালে সে যে অজু করতে যাবে না, তা জুমার খুব ভালো করেই জানতেন। হানিন নিজের গালে হাত ঠেকিয়ে ওভাবেই বসে রইল।


“ফুপ্পু! আপনি তো সব ওয়াক্তের নামাজই পড়েন, তাই না? আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?” সে বেশ দ্বিধাগ্রস্তভাবে এমনভাবে জিজ্ঞেস করতে লাগল, যেন কোনো গণিত, বিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞানের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে ওনার কাছে এসেছে। এর বাইরে সে কখনো ওনার সঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু আলোচনা করত না।


“জিজ্ঞেস করো!” তিনি বেশ নরম সুরে কথাটি বলে আবার জায়নামাজের ওপর বসে পড়লেন।


“আপনার কি আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা আছে?”


“হ্যাঁ, আছে।” জুমারের জন্য উত্তরটা বেশ সহজ ছিল।


“কীভাবে? মানে, আপনি এই ভালোবাসার সংজ্ঞা কীভাবে দেবেন?”


জুমার কয়েক মুহূর্ত বেশ গভীর ও চিন্তিত চোখে তার এই অল্পবয়সী মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সামান্য কাঁধ ঝাঁকালেন।


“আমার মনে হয় না যে, আমি এই ভালোবাসাকে কোনো সংজ্ঞায় বাঁধতে পারব।”


“ওকে। আমার এক Christian ফ্রেন্ড জিজ্ঞেস করেছিল, এই জন্য আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম।” সে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।


জুমার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে বাথরুমের দিকে যেতে দেখলেন। কপালে এসে পড়া কিছু চুল আর বাকি চুলগুলো হেয়ারব্যান্ডে আটকানো অবস্থায় কাঁধের নিচে দুলছিল। তার মুখের সেই দ্বিধা আর অস্থিরতা এখনও ওখানেই জমে ছিল। কোনো একটা সমস্যা তো অবশ্যই ছিল। তবে যাই হোক, তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন। এবার ওনাকে বাড়ি ফিরতে হবে, নইলে আম্মু রাগ করবেন।


হানিন যখন নামাজ পড়ে ফিরে এল, ততক্ষণে জুমার চলে গেছেন। যেহেতু হানিন সামনে ছিল না, তাই আজ জুমার কোনো জিনিস ফেলে যাননি, আর না কোনো কথা ওনার মনে ছিল। সে বেশ ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে কম্পিউটারের সামনে এসে বসল এবং ওটা অন করল। ডেস্কটপের ঘড়িটা সে আলিশার স্টেটের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সেট করে রেখেছিল। সেখানে তখন সকাল হয়ে গিয়েছিল এবং আলিশা অনলাইন ছিল।

🌼🌼🌼🌼🌼

Bbox-এর ভেতর আলিশাকে একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দুই বছর আগের তুলনায় তাকে এখন কিছুটা বড় দেখাচ্ছিল—এই প্রায় ২০ বছরের মতো। অন্য বক্সটিতে ছিল হানিন—বেশ উদাস আর মনমরা। তার বাড়ির লোকজন আলিশার বিষয়ে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, সারাক্ষণ হানিনের ক্যামেরা অন থাকলেও কারও কোনো সমস্যা হতো না।


“তোমাকে বেশ উদাস লাগছে।” আলিশা তার মুখ দেখেই মন খারাপের বিষয়টি ধরে ফেলল। হানিন ডানে-বামে মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখে সেই একই বিষণ্ণতা লেপ্টে ছিল।


“আমি forum-এ তোমার প্রশ্নের উত্তর post করতে যাচ্ছিলাম।” একই সঙ্গে সে কিবোর্ড চেপে যাচ্ছিল। আলিশা চেক করল, তারপর বিস্ময়ে তার চোখ দুটো সরু হয়ে এল।


“শোনো, হানিন! আমার মনে হয় তুমি ভুল উত্তর লিখেছ। আমার প্রশ্ন ছিল—‘তুমি কি আল্লাহকে ভালোবাসো?’ আর তুমি উত্তরে লিখেছ—‘জানি না’।”


“এটাই সত্যি। আমি সত্যিই জানি না।”


“কিন্তু...” আলিশা চুপ হয়ে গেল। হানিন এখন হাতের মুঠোয় থুতনি রেখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।


“কিন্তু তুমি আর আমি, আমরা তো বেশিরভাগ সময় ধর্মের কথাই বলি, একে অপরকে নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে জানাই। আর তুমিও তো আমার মতোই তোমার বইটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ো। তাহলে এমন উত্তর কেন?”


সে কাঁধ ঝাঁকাল।


“খুব একটা বেশি না। আমি সপ্তাহে বড়জোর এক-দুবারই পড়তে পারি। যখন ভাইয়া ছিল, তখন আমরা রোজ পড়তাম, কিন্তু এখন আমি আর সময় পাই না।” একটু বিরতি নিয়ে সে গাল থেকে হাত সরিয়ে পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বেশ স্পষ্ট ভাষায় বলতে শুরু করল—


“দেখো, আলিশা! আমি মিথ্যে বলব না। আমার ওইসব উপন্যাস আর নাটক খুব ভালো লাগে, যেখানে হিরো বা হিরোইন প্রথমে ভীষণ পাপী থাকে এবং তারপর কোনো একটা বড় ঘটনার পর তারা পুরোপুরি ধার্মিক হয়ে আল্লাহর ভালোবাসায় সব পাপ ছেড়ে দেয়। আমি এই ধরনের গল্পগুলোকে খুব সম্মান করি, কিন্তু আমি নিজেকে কখনো এগুলোর সঙ্গে মেলাতে পারিনি। আমি ওনার শুকরিয়া আদায় করি, ওনাকে সম্মান করি, দোয়াও করি আর ওনাকেই একমাত্র উপাস্য বলে মানি। আমি আম্মু, আমার ভাইয়াদের, আব্বুকে আর...” ঘুরে দেখল, জুমার তো অনেক আগেই চলে গেছেন, “...আরও কিছু আত্মীয়স্বজনকে খুব ভালোবাসি। তাই আমি ভালোবাসার অর্থ বুঝি। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে...”


“তোমার এই পুরো বক্তব্য একপাশে থাক... এই মুহূর্তে তুমি কোন বিষয়টি নিয়ে পেরেশান আছ? আমি শুধু এটুকুই বলব যে, সমস্যা যা-ই হোক না কেন, ওটা solve করার চেষ্টা করো।”


“হ্যাঁ, স্কুলের একটা সমস্যা আছে। নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।” সে কিছুটা তিক্ত স্বরে বলল।


আলিশা ঠোঁট চেপে না-সূচক মাথা নাড়ল। তার ধূসর চোখ দুটোতে একরাশ দুশ্চিন্তা ছিল।


“সমস্যা কখনো নিজে থেকে ঠিক হয় না, ওটা ঠিক করতে হয়। আর এর দুটো উপায় আছে—হয় নিজের ভেতর সাহস খোঁজো, না হয় নিজের চেয়ে বেশি সাহসী কাউকে খুঁজে নাও।” আর তারপর সে বরাবরের মতোই হেসে উঠল। এটাই ছিল তার কথা বলার ঢং।


“নিজের চেয়ে বেশি সাহসী?” হানিন ঘুরে দরজার দিকে তাকাল। তারপর না-সূচক মাথা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসল।


“তুমি কি Prison Break-এর এই season-টা শেষ করেছ?” ঠিক তখনই ফোনের রিংটোন বাজতে শুরু করল। হানিন বিরক্তি নিয়ে দূরে পড়ে থাকা ফোনটাকে বাজতে দেখল।


আম্মু আর সায়াম, জুমার চলে যাওয়ার পরপরই ঘুমাতে চলে গিয়েছিলেন। তাকেই এখন উঠতে হবে।



"না, এখনো ষষ্ঠ পর্বে আছি। ইয়ার! এবার একদম জমছে না। তাছাড়া আমার মাইকেলের চেয়ে টিংকানকে বেশি পছন্দ। আচ্ছা আমি এখন রাখছি। এই সময়ে সাধারণত আমার এক আত্মীয় আন্টির ফোন আসে আর উনি খুব লম্বা কথা বলেন।"




সে বিদায় জানিয়ে sign off করতে লাগল। তারপর হানিন দৌড়ে গিয়ে অনবরত বাজতে থাকা ফোনটা তুলল। CLI-তে নম্বরটা অচেনা ছিল, কিন্তু তবুও মনে হলো কোথাও যেন দেখেছে।


“Hello? হ্যাঁ, হানিন বলছি। ওহ... হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই। এখনই? এখনই তো সম্ভব নয়, তবে সন্ধ্যায় মামু আমাদের এখানে আসবেন, তখন আমি ওনার সঙ্গে চলে আসব। Sure, আওরঙ্গজেব আঙ্কেল।”


হাসিমুখে সে ফোনটা রাখল। তার মুখের সমস্ত ক্লান্তি আর বিরক্তি এক নিমেষে দূর হয়ে গেল। সে আম্মুকে জানানোর জন্য দৌড়াল।


আওরঙ্গজেব সাহেবের কোনো একটা কাজ ছিল আর তিনি তাকে ডেকেছিলেন। বাহ!




চলবে,,,,,,,


Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)