নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৮ পর্ব ৩২, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


 

#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৮


পর্ব :-৩২




"এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।"


"তোমার পঞ্চাশ ভাগ কাজ হয়ে গেছে।"

"কিন্তু ওর তো নিজের থেকে আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা উচিত ছিল, তা না করে আমার বাবা ওর সামনে মিনতি করবে!" সে চরম ক্ষোভে ফেটে পড়তেও পারছিল না। এটা তো পরিকল্পনার অংশ ছিল না।


"তুমি পরিকল্পনা শুনলেই বা কবে?" তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে মোবাইলের বাটন টিপতে লাগলেন। জুমার চোখে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে ওনাকে গিলে ফেলার মতো করে তাকিয়ে ছিল। জওয়াহেরাত একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।


"তুমি কেন এত ভাবছ? বিয়ে করতে হবে, ব্যস হয়ে যাবে। যেভাবে হোক না কেন। দেখো, আমি খুব একটা কুরআন পড়ি না, তবে একটা আয়াত আমি খুব আনন্দের সাথে সব জায়গায় উদ্ধৃত করি।" তিনি সামান্য হাসলেন, "আর সেটা হলো—নিশ্চয়ই নারীদের ছলনা বড্ড সুগভীর।" জুমারের গালে আলতো করে টোকা দিয়ে তিনি মুচকি হাসতে হাসতে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। জুমার জ্বলন্ত চোখে ওনার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।


সামনের আসনে বসে জওয়াহেরাত দরজা বন্ধ করতেই ফারিস দ্রুত গাড়ি পেছনে নিয়ে গেট থেকে বের করে রাস্তায় নামিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ছিল, একটু পরপরই সে এক একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি জওয়াহেরাতের ওপর ফেলছিল।


"এসব কী ছিল, মিসেস কারদার?"


"একজন অসুস্থ আর নিরুপায় মানুষ নিজের মেয়ের জন্য তোমার কাছে অনুরোধ করছিলেন।"


"আমি বাচ্চা নই। আপনি ওনার মুখে কথা তুলে দিচ্ছিলেন।" সে চরম বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকাল। "সকালে আপনি আমার কাছে এলেন আর হুট করে আপনার আমার বিয়ের জন্য চিন্তা শুরু হয়ে গেল, আর কাকতালীয়ভাবে আজই ইউসুফ সাহেব এই কথা বলে দিলেন!"


"খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, তোমার চেয়ে ভালো জামাই তিনি আর পাবেন না।"


"এই ধারণাটাও ওনার মাথায় আপনিই ঢুকিয়েছেন। আমি তো যেন আপনাকে চিনিই না!" রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে গতি বাড়াল। গাড়ির গতি হু হু করে বাড়তে লাগল।


"আমার তোমার জন্য চিন্তা হয়, ফারিস!"


"আগে তো সারাজীবন আপনার আমার জন্য কোনো চিন্তা হয়নি।"


"এটাই তো কথা, ফারিস। আমি বা অওরঙ্গজেব সারাজীবন তোমার খোঁজ নিইনি, কিন্তু যে মানুষটা নিয়েছে, তোমার ওপর এত উপকার করেছে—যিনি তোমাকে একটা ভালো চাকরি পেতে সাহায্য না করলে আজ তুমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে—আজ সেই মানুষটা অসুস্থ, ওনার মেয়েটা অসুস্থ আর তিনি তোমার কাছে শুধু একটা জিনিসই চাচ্ছেন যে ওনার মেয়েকে বিয়ে করো; তুমি ওনাকেও অস্বীকার করে দেবে? উপকারের বদলে এটাই কি তোমার কৃতজ্ঞতা?" তিনি তীব্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন।


ফারিস একইভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে দুজনের মাঝে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।


"ওনার মেয়ে কখনো রাজি হবে না।" বেশ অনেকক্ষণ পর সে বলল।


"রাজি হয়ে যাবে।"


"কখনো না।"


"ও রাজি হয়ে গেছে রে ভাই!" জওয়াহেরাত বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকালেন এবং কবজিতে বাঁধা ঘড়িটা দেখলেন। ওনার দেরি হচ্ছিল।


আর ফারিস গাজি হুট করে চমকে উঠে ওনার দিকে তাকাল, তারপর আবার সামনে দেখতে লাগল। তার চেহারার রাগটা একটা নতুন ভাবনায় রূপ নিতে শুরু করল। ঠোঁট কামড়ে, চোখ কুঁচকে সে কয়েক মিনিট চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল।


"আপনি ওনাকে বলুন... আমি ভেবেচিন্তে জানাব।" এবার যখন সে বলল, তখন তার গলার আওয়াজ বেশ নিচু ছিল। জওয়াহেরাত স্বস্তির একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কাজ প্রায় হয়েই গিয়েছিল।


ফারিস ওনাকে বাড়ি নামিয়ে দিল এবং নিজে গাড়ি থেকে নেমে অ্যানেক্সির দিকে পা বাড়াল। প্রাসাদের পেছনের অংশে ফিওনা একটা ট্রেতে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে হাশিমের বারান্দার বাইরের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল। ফারিস গাড়ি থেকে নেমে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। সে যখন কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাকে থামাল। "এই, শোনো!" আঙুল দিয়ে ইশারা করল। সে বেশ বিনীত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী পায়ে হেঁটে কাছে এল।


"Yes, sir?"


"তোমার এত সাহস কবে থেকে হলো যে তুমি আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে ঢোকো?"


ফিওনার মুখ যেন ধাক্কার চোটে হাঁ হয়ে গেল। "আমি তো কখনো যাইনি! আপনি কী বলছেন?"


"সেদিন যখন প্রসিকিউটর জুমার এসেছিল, তখন কি তুমি ওকে আমার ঘরে নিয়ে যাওনি?" ক্রুদ্ধ চোখে সে তাকে ঘিরছিল।


"কাল সন্ধ্যায়? ধুর, না তো! প্রসিকিউটর তো শুধু আধা ঘণ্টার জন্য এসেছিলেন, সারাক্ষণ তিনি মিসেস কারদারের কাছেই বসে ছিলেন, তারপর চলে গেলেন। তিনি তো এপাশে আসেনওনি।" সে ভীষণ অবাক হয়ে নিজের সাফাই দিচ্ছিল।


"সত্যি বলছ?"


ফিওনা দ্রুত মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল।


"হুম, ঠিক আছে। আমার জানা ছিল না।" সে ঘুরতে গিয়েও থামল, "এখানে যে আমার দেখভাল করত, ও কোথায় গেল?"


"ও... ও নাকি মিসেস কারদারের ট্যাক্স চুরি করেছিল, তাই ওকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।"


"আর তুমি ওর জায়গাটা নিয়ে নিলে, তাই তো?"


"জি, আমি এখন এখানকার প্রধান কর্মী।" ঘাড়টা সামান্য উঁচিয়ে বলল।


"ঠিক আছে। পরের বার আমার বাড়ির আশেপাশেও যেন তোমাকে না দেখি।" আঙুল উঁচিয়ে সতর্ক করে দিয়ে সে এগিয়ে গেল। চেহারায় আবার রাগের আভাস ফুটে উঠল। ফিওনার কাছ থেকে যা বের করার ছিল, সে তা বের করে নিয়েছে।


'তাহলে ম্যাডাম প্রসিকিউটর এখানে এসেছিলেন আর সারাক্ষণ জওয়াহেরাতের সাথে কথা বলেছেন। প্রশ্ন হলো—এই ফারিস আর জুমারের বিয়ের ধারণাটা কে কার মাথায় ঢুকিয়েছে? জওয়াহেরাত নাকি জুমার? এই রান্না আসলে কে করল?' সে লনের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চরম বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকাল। 'এই দুই মহিলা কি আমাকে বোকা মনে করে?'


নিজের দরজায় দাঁড়িয়ে সে মোবাইল বের করল এবং কল দিয়ে কানে ঠেকাল।


"জি, বলুন।" সাদির ব্যস্ত গলার আওয়াজ ভেসে এল।


"কোথায় তুমি?"


"সাধারণত এই সময়ে ভদ্রলোকেরা নিজেদের অফিসে থাকে। তবে ওহ সরি, আপনার যেহেতু নিজের কোনো চাকরি নেই আর চার বছর ধরে আপনি বেকার বসে আছেন, তাই আপনার তো আর এসব জানার কথা না।"


"বাজে বকো না। এখনই তোমার দাদুর বাড়ি যাও।"


"জি একদম, আমি তো এখানে ফ্রিই বসে আছি! আর এই অফিসটাও তো আমার মরহুম আব্বাজানের, তাই না? যে যখন ইচ্ছে মুখ তুলে বেরিয়ে যাব!" সে রেগেমেগে ফুঁসছিল। সামনে-পেছনে কাগজ আর ফাইলের স্তূপ, কম্পিউটারে একগাদা কাজ খোলা। তার ওপর কিছুক্ষণ আগেই বসের কাছ থেকে মারাত্মক ঝাড়ি খেয়েছে।


"তুমি যাচ্ছ নাকি যাচ্ছ না?"


"দেড় ঘণ্টার আগে যদি এখান থেকে বের হই, তবে এরা আমাকে আর ভেতরে ঢুকতে দেবে না। আর আমার যে বস আছেন, উনি এমনিতেই..."


"তোমার দাদু আমাকে বলেছেন আমি যেন তোমার জুমার ফুপ্পুকে বিয়ে করে নিই। কী হলো, মুখ বন্ধ হয়ে গেল কেন? এবার আম্মুকে নিয়ে ওনাদের বাড়ি যাও আর যা ঠিক মনে হয় করো।" ওপাশ থেকে সাদির মুখ আসলেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফারিস ফোন রেখে ভেতরে চলে গেল।


কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত কারদার প্রাসাদের লাউঞ্জে এক ক্লান্ত জওয়াহেরাত নিজের চেনা সেই উঁচু চেয়ারটায় বসে ছিলেন। চিবুকের নিচে হাতের তালু রেখে তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলেন। বিকেলবেলাটায় চারপাশ একদম নিঝুম হয়ে ছিল। হাশিম, নওশেরওয়াঁন, সোনিয়া—কেউই বাড়িতে ছিল না। তিনি অনেক দিন পর কোনো সপ্তাহের দিনে এই সময়ে বাড়িতে ছিলেন আর এই নীরবতা যেন ওনাকে গ্রাস করতে আসছিল। অফিসে ফিরে যাওয়ার বদলে তিনি ওখানেই বসে রইলেন। আজকের ধকল ওনাকে বেশ ক্লান্ত করে দিয়েছিল।


গত এক সপ্তাহে তিনি মনে মনে অতীতের কতগুলো অধ্যায় বারবার আওড়েছেন।


সাত বছর আগে... যখন ওনাদের সবার প্রথম দেখা হয়েছিল।


পাঁচ বছর আগে... যখন ওনারা পরম আনন্দের সাথে একে অপরের ওপর উজাড় করে দিতেন।


চার বছর আগে... যখন ওনাদের পরিবারের মাঝে এক রক্তক্ষয়ী দেয়াল এসে দাঁড়িয়েছিল।


কিন্তু অতীতের দিনগুলোর শেষ অংশটা এখনও বাকি ছিল। আর জওয়াহেরাত কারদারের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক।


দেড় বছর আগে ঠিক কী ঘটেছিল? সাদি এখন কেন ওনাদের বাড়িতে আসে না? আর সেইসব সমস্যা, যা হাশিম সামলাতে পারেনি।


তিনি না চাওয়া সত্ত্বেও সেসব মনে করতে লাগলেন...


ওনার ভেজা চোখ জোড়া জানালার কাচে নিবদ্ধ ছিল আর সেই কাচের ওপর যেন পুরোনো সব গল্প ভেসে উঠে আবার হারিয়ে যাচ্ছিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Koi hai rang, koi roshni, koi khushbu... Juda juda hai taasur har ik lamhe ka



[কোনোটি রঙ, কোনোটি আলো, আবার কোনোটি সুবাস... প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতিই বড় আলাদা, বড় বিচিত্র।]


বর্তমান সময় থেকে দেড় বছর আগে:


কারদার প্রাসাদে সেই সন্ধ্যাটি নানাবিধ রঙ, হাসির রোল আর হইচই নিয়ে নেমে আসছিল। মেরি ট্রাংক হাতে নিয়ে হাসিমুখে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল। তার পেছনের নিচের তলা থেকে বেশ অনেক মানুষের গলার আওয়াজ আসছিল, যেন অনেক মেহমান এসেছে। সে ওপরে এসে হাশিমের ঘরের সামনে থামল। দরজাটা আধখোলা ছিল। ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাদি আর হাশিমের পিঠের অংশটুকু দেখা যাচ্ছিল। সাদি কিছু একটা বলছিল আর হাশিম মুচকি হেসে তা শুনতে শুনতে কাফলিংক পরছিল।


মেরি দরজায় টোকা দিল। ওরা দুজনেই ঘুরল। সে দরজার ফাঁক দিয়ে মাথাটা সামান্য ভেতরে ঢুকিয়ে বলল, "স্যার, আপনাকে কারদার সাহেব নিচে ডাকছেন।"


"আমি এক্ষুনি রেডি।" সে অন্য কাফলিংকটা তুলে পরতে পরতে আয়নায় নিজেকে দেখল। মেরি মুচকি হেসে মাথা নেড়ে চলে গেল।


সাদি আবার ওনার দিকে তাকাল। সে মাত্রই অফিস থেকে এসেছিল আর যেহেতু সাদির পুরো পরিবার ডিনারে আমন্ত্রিত ছিল, তাই সে আসা মাত্রই তাড়াহুড়ো করে ডিনারের জন্য তৈরি হচ্ছিল। নিচে সবাই খাবার শুরু করার জন্য ওনার অপেক্ষায় ছিল। সাদি ওনাকে ডাকতে এসেছিল এবং মেরিকে পাঠানোর আগ পর্যন্ত ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।


"আমাকে যদি ডিনারের কথাই বলতে, তবে আমি জলদি চলে আসতাম। শেহরিন বলতে ভুলে গিয়েছিল।" সে পারফিউমটা তুলে ক্যাপটা খুলতে খুলতে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বলল। "সো, তোমার বোন বোর্ডে টপ করেছে, হুম?" সে ডিনারের কারণটা আবার জিজ্ঞেস করল।


"জি, ওটা তো পুরনো কথা হয়ে গেছে, এখন তো ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলও দিয়ে দিয়েছে। আর যখন আঙ্কেল ওর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি আমাদের ডিনারে আমন্ত্রণ জানালেন।" পারফিউম স্প্রে করতে করতে হাশিম মুচকি হেসে সাদির দিকে তাকাল। সে কালো কোট আর সাদা শার্ট পরে ছিল, চুলগুলো আগের চেয়ে ছোট ছিল আর চেহারার গাম্ভীর্য ও পরিপক্বতা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। ভঙ্গিটা অবশ্য এখনও আগের মতোই নিষ্পাপ ছিল।


বলতে বলতে সাদি থামল, একটা গভীর শ্বাস নিল, তারপর প্রশংসার দৃষ্টিতে হাশিমের দিকে তাকাল।


"কত সুন্দর পারফিউম!"


"সবচেয়ে দামি পারফিউম এমনই হয়।" হাশিম মুচকি হেসে আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে ঘাড়ে আরও একটা স্প্রে করল, তারপর ক্যাপটা তুলে বোতলের মুখে লাগাল। বোতলটা বাক্সে ভরে সাদির দিকে বাড়িয়ে দিল।


"এখন থেকে এটা তোমার।"


সে এক ঝটকায় থতমত খেয়ে পিছিয়ে গেল। হাত উঁচিয়ে জলদি নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়তে লাগল, "না না হাশিম ভাই, আমি তো এজন্য বলিনি। না প্লিজ, আমার এই মানে ছিল না।" সে এতটাই লজ্জিত হয়েছিল যে বলার বাইরে। "আপনি যদি এমনটা করেন, তবে আমি পরের বার আপনার কোনো জিনিসের আর প্রশংসাই করব না।"


হাশিম তার পুরো কথাটি মন দিয়ে শুনল, তারপর মাথা নেড়ে পারফিউমের বাক্সটা ওর কোটের পকেটে পুরে দিল।


"আমার সাথে তর্কে তুমি কখনো জিততে পারবে না, সো চেষ্টা করছ কেন? চলো, নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।" ওনার কাঁধ চাপড়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। প্রচণ্ড লজ্জায় দাঁড়িয়ে থাকা সাদি নিজেকে মনে মনে দশবার গালি দিল, কিন্তু এখন আর সেই উপহার ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তারপর ঘরটার ওপর এক নজর বুলিয়ে সে-ও ফিরে এল। এই কয়েক মিনিটেও সে লক্ষ করেছিল যে সেখানে শেহরিনের কোনো জিনিসপত্র রাখা ছিল না। ওরা সম্ভবত আলাদা আলাদা ঘরে থাকত। শেহরিন বলতে ভুল করেনি যে ওরা একে অপরের সাথে কথাও বলে না, আর এটা সবাই জানত।


ওরা দুজনে একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল যখন হাশিম খুব স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন করল, "ফারিস কেমন আছে? দেখা হয়েছে?"


"এই তো, মাত্র এক-দুবারই দেখা করতে জেলে গিয়েছিলাম। আপনি তো জানেনই, ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর এই তিন-চার মাস আমি চাকরি নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম।" সাদি জোর করে হাসল।


"হুম। ওর মামলাটা কেমন চলছে?"


"উকিলের সাথে দেখা করেছিলাম। তিনি তো আশা দিচ্ছেন যে কয়েক মাসের মধ্যেই ওনাকে খালাস করিয়ে নেবেন, তাই না?" কিছুটা আশাবাদী হয়ে সে হাশিমের দিকে তাকাল।


"অবশ্যই।" আর দুজনে এগিয়ে এল।


ড্রয়িংরুমে যেন আলোর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। ঝাড়বাতি, টেবিলের মোমবাতি—সবকিছু জ্বলছিল। প্রধান চেয়ারটায় অওরঙ্গজেব কারদার বসে ছিলেন। ডানপাশে জওয়াহেরাত ছিলেন আর বামপাশের প্রথম চেয়ারটা খালি ছিল। হাশিম সেই চেয়ারটা দখল করতে করতে অওরঙ্গজেবের সোজাসুজি অন্য প্রধান চেয়ারটায় বসে থাকা হানিনকে দেখল, যাকে সে জুমারের দুর্ঘটনার পর, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর পর এখন দেখছে। তার চশমাটা কপালে তোলা আর হেয়ারব্যান্ড দিয়ে আটকানো খোলা চুলগুলো আগের মতোই ছিল, তবে উচ্চতা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল আর আত্মবিশ্বাসও আগের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।


"অভিনন্দন হানিন!" মুচকি হেসে হাশিম শুভেচ্ছা জানাল। তবে সে জানত হানিন মুখ দিয়ে একটা ধন্যবাদ বলেই মুখ ফিরিয়ে নেবে, আর হলোও তাই। সে সেই চিরচেনা আলিশার ক্ষোভটা এখনও মনে পুষে রেখেছিল।


"আপনি আপনার ছোট ছেলেকে নিয়ে আসেননি?" সাদি বসে পড়লে জওয়াহেরাত ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে বসা নুদরাতের কাছে জানতে চাইলেন।


"ওর এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল, ওকে ওখানে নামিয়ে দিয়ে আমরা এসেছি।" নুদরাত মলিন হাসলেন। ওনাদের সামনে বসা শেহরিন সবকিছু থেকে উদাসীন হয়ে মোবাইলের বাটন টিপছিল। পাশে থাকা নওশেরওয়াঁনকে বেশ বিরক্ত লাগছিল, যেন জোর করে বসিয়ে রাখা হয়েছে।


"তুমি বাইরে পড়তে কেন যাচ্ছ না, হুম?" আওরঙ্গজেব নিজের সোজাসুজি বসে থাকা হানিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন। কর্মচারীরা এখন টেবিলের ওপর শেষ আইটেমগুলো রাখছিল।


"স্নাতকোত্তরের জন্য বাইরে যাব।" সে লোভনীয় খাবারগুলোর দিকে না তাকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল।


"ওকে, খাবার শুরু করা যাক। হানিন, তুমি শুরু করো।" অওরঙ্গজেব তাকে ইশারা করলেন। সে ক্ষণিকের জন্য থামল। আমেরিকান নাটকের কথা মনে করার চেষ্টা করল। এই পশ্চিমা ধরনের লোকেরা খাবারের শুরুতে কী করে যেন? টোস্ট? গ্রেস?


"হানিন খুব সুন্দর কুরআন পড়তে পারে, অনুবাদসহ।" সাদি গলা খাঁকারি দিয়ে ওর দিকে তাকাল। সে চমকে উঠে ভাইয়ের দিকে মনোযোগ দিল।


"হানিন, তুমি একটু কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাও, তারপর খাবার শুরু করো।"


হানিন প্রথমে সাদির দিকে তাকাল, তারপর অওরঙ্গজেবসহ অপেক্ষারত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মানুষদের দেখল।


"আহম... ওকে। একটা আয়াত পড়ে দিচ্ছি।" সে ওড়নাটা মাথায় টেনে নিল, এক ক্ষুব্ধ দৃষ্টি ভাইয়ের দিকে দিল এবং হাসিমুখে দোয়ার জন্য হাত তুলল।


"আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মুরসালাত-এ বলেছেন, 'কুলূ ওয়াশরাবূ হানীআম বিমা কুনতুম তা'মালূন' (তোমরা যে আমল করতে, তার প্রতিফলস্বরূপ এখন তৃপ্তি সহকারে খাও এবং পান করো)।" চেহারায় দুহাত বুলাল। অওরঙ্গজেব অনুবাদ জানতেন না, শুধু মাথা নেড়ে হুম-হুম করলেন এবং খাওয়া শুরু করলেন। হানিন হাসিমাখা চোখে ভাইকে দেখল, যে তখন নিজের রাগ কোনোমতে চেপে 'উফ' করে রয়ে গেল। (আয়াতও নিজের সুবিধামতো মনে রেখেছিলেন ম্যাডাম!) কিন্তু তার এই উফ-কে পাত্তা না দিয়ে সে খাবারের থালাগুলো থেকে বেছে বেছে নিজের প্লেট ভরতে লাগল।


খাবারের মাঝখানেই শেরু চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়াল। আওরঙ্গজেব প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে "আমার পেট ভরে গেছে" বলে লাউঞ্জের দিকে চলে গেল। সাদি খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকাল। সে যাওয়ার সময়ও এক বিরক্তিকর দৃষ্টি সাদির ওপর ফেলে গিয়েছিল। সাদির চোখ জোড়া ঝুঁকে গেল, শেরুর প্লেটে সামান্য একটু সালাদ ছিল, ওটাও সে অর্ধেক খেয়ে রেখে গেছে। ওদের দুজনের শেষ কবে কথা হয়েছিল, তা সাদির মনেও ছিল না।


"আর আজকাল তুমি কী দেখছ?"


অওরঙ্গজেবের প্রশ্নে সাদি অবলীলায় পকেটে হাত দিল, হয়তো তুলোর কোনো টুকরো পেয়ে গেলে সে ওটা কানে গুঁজে নিত। কারণ এখন কোরিয়ান কিস্সা শুরু হতে যাচ্ছিল। হানিন মুখে থাকা খাবারটা চিবিয়ে শেষ করল এবং তারপর শুরু হলো—


"আমার মতে পৃথিবীর সেরা নাটক দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি হয়। কোরিয়ান মুভিগুলোও একদম দারুণ, কিন্তু কোরিয়ান নাটক আর ওদের অভিনেতাদের গল্পগুলো অসাধারণ! গত এক বছরে আমি একশো এগারোটা কোরিয়ান নাটক আর মুভি দেখেছি—পঞ্চাশটা মুভি আর একষট্টিটা নাটক। Lee Min Ho আমার প্রিয় আর ওর নাটক..." কিন্তু তখনই মেরি টেবিলের মাঝখানে ক্রোকেমবুশ এনে রাখছিল। হানিনের মন চাইল জলদি কয়েকটা বল ভেঙে মুখে পুরে নেয়, কিন্তু ভদ্রতা! উফ!


"একশো এগারোটা মুভি আর নাটক দেখার পরেও তুমি বোর্ডে টপ করলে কীভাবে?" একটা টুকরো ভাঙতে ভাঙতে হাশিম এমনিই জিজ্ঞেস করল, তখন হানিন চমকে ওনার দিকে তাকাল, তারপর চেহারায় অপছন্দের ভাব ছড়িয়ে পড়ল।


"আমি একসাথে অনেক কিছু সামলাতে পারি, হাশিম ভাই!"


হাশিম কাঁধ ঝাঁকিয়ে খেতে থাকল। শেহরিন শুধু নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাচ্ছিল। জওয়াহেরাত অস্থির অথচ হাসিমুখ বজায় রেখে বারবার লাউঞ্জের দিকে তাকাচ্ছিলেন, যেখানে শেরু গায়েব হয়ে গিয়েছিল। সাদি ছাড়া তিনি আর কারও কথার উত্তর ভালো মনে দিচ্ছিলেন না। শেরু আর অওরঙ্গজেবের কোনো না কোনো বিষয়ে রোজ ঝগড়া হওয়াটা একটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সকালেও নতুন গাড়ি কেনার আবদার করায় তাকে বেশ ঝাড়ি খেতে হয়েছিল। তার ওপর আবার সাদিকে সহ্য করা—ওর বাঁচা যেন দায় হয়ে উঠেছিল।


খাবারের পর সবাই লাউঞ্জে এসে বসলে সে ওখান থেকেও উঠে চলে গেল। টিভি চলছিল, কথাবার্তা হচ্ছিল। আওরঙ্গজেব সাহেবের কোনো একটা কল আসায় তিনি উঠে বাইরে গেলেন, তখন সাদির সাথে সোফায় বসা নুদরাত ফিসফিস করে বললেন—


"তুমি কি হাশিমের সাথে ফারিসের মামলার বিষয়ে কথা বলেছ?"


"ওনার উকিল তো কাজ করছেনই আম্মু, এখন আর ও কী করবে?"


"উকিল কী করছে? আড়াই বছর ধরে শুধু 'কয়েক মাস, কয়েক মাস' জপছে। এভাবে তো আরও পাঁচ বছর কেটে যাবে আর ফারিস বাইরে আসতে পারবে না।" তিনি অভিমানী ও ভেজা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললে সাদি বিরক্তি নিয়ে ওনার দিকে তাকাল।


"তাহলে আমি কী করব আম্মু? হাশিম ভাই উকিলকে টাকা দিচ্ছেন, এখন আদালতের তারিখ যদি না পড়ে তবে আমরা কী করতে পারি?"


"তুমি, সাদি, তোমার মামুকে ভুলে যাচ্ছ। তোমরা সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে মেতে উঠে ওকে ওর ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছ।"


"আম্মু!" ওর মনে খুব আঘাত লাগল। "এমনটা নয়। আমি চাকরি শুরু করেছি, ছয়টায় বাড়ি ফিরি, এত কাজ থাকে, আমি চাইলেও আর কী করতে পারি?"


নুদরাত কোনো উত্তর দিলেন না। চোখের কোণ মুছে চুপচাপ বসে রইলেন। সাদিও মুখ ফিরিয়ে নিল। 'এখন সে আর কী-ই বা করতে পারে? সে তো আর উকিল নয়, কিন্তু আম্মু বুঝতেই চায় না!' সে খিটখিটে মেজাজে ভাবল। (আম্মুকে তো সারাক্ষণ একটাই চিন্তা ব্যাকুল করে রাখে যে...) ঠিক তখনই নুদরাত বিড়বিড় করলেন—


"জানি না ও এই মুহূর্তে কেমন আছে? খাবার খেয়েছে কি না? না জানি কত কষ্ট দিচ্ছে পুলিশ ওর ওপর!"


'একদম! ঠিক এই চিন্তাই!' সে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। শেহরিন ওকেই দেখছিল। সাদি তাকাতেই সে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। নুদরাত তখনও ওটাই ভাবছিলেন—ফারিস... সেই অসহায় মানুষটার এই মুহূর্তে কী হাল হবে?


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Qasr-e-umar gawahi de ga kaise kaise karb hain... Kaisi kaisi rut guzri hai hum par itne saalon mein



[এই দীর্ঘ জীবন-প্রাসাদ সাক্ষী দেবে কত শত তীব্র যন্ত্রণা... কেমন কেমন কঠিন ঋতু বয়ে গেছে আমাদের ওপর দিয়ে এতগুলো বছরে।]


জেলের বারান্দায় মৃদু আলো জ্বলছিল। প্রহরীরা সেই হাজতখানার বাইরে জড়ো হয়েছিল, আর সে ভেতরে দাঁড়িয়ে সাদা কুর্তার হাতা গুটিয়ে গারদ ধরে রাগে চিৎকার করে বলছিল—


"এই শুঁটকি, কথাটা মগজে ভালো করে ঢুকিয়ে নাও, পরের বার এই দিকটায়..." (সে কোণের ঘরগুলোর দিকে ইশারা করল) "আশরাফ চিমার কোনো লোক যদি এদিকে আসে, তবে নিজের পায়ে হেঁটে ফেরত যাবে না।"


পাল্টা জবাব দিয়ে সেই সেল থেকে গোঁফওয়ালা আশরাফ চিমা চেঁচিয়ে কিছু একটা বলতেই সে আরও বেশি ক্ষেপে গেল।


"ওকে চুপ করাও মোহাম্মদ দিন, নয়তো আজ ও আমার হাতে বাঁচবে না!"


"আচ্ছা ভাই শান্ত হও, তুমিই চুপ করো..."


"আমার দলের ছেলেরা ওর বাপের চাকর নয় যে ওর ভাগের কাজ করবে! ওকে শেষবারের মতো বুঝিয়ে দাও, নয়তো..." গলার আওয়াজ ক্রমশ চড়ছিল। তারপর কোনোমতে সিপাহিরা এসে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলল। ফারিস একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে মাথা ঝাঁকিয়ে আবার মাটিতে গিয়ে বসল। সেই অন্ধকার ঘরের অন্য কোণায় আরও একজন বসে ছিল।


"গাজী ভাই, এই সিপাহিরা আপনাদের এত ভয় পায় কেন?"


"আমরা তো একদিন খালাস পেয়ে চলে যাব, কিন্তু এরা এখানেই দায়িত্ব পালন করে যাবে। আসল কয়েদি তো এরাই।" সে চরম বিরক্তিতে বলল, তারপর তীক্ষ্ণ চোখে সেই ছেলেটির দিকে তাকাল, যার চেহারা অন্ধকারে ঢাকা ছিল।


"নিজের ভাগের কাজ সময়মতো শেষ করো, এটা তোমার বাপের জেলখানা নয়।"


"জানো, আমার একজন কয়েদি হিসেবেও অনেক অধিকার আছে, যার লঙ্ঘনের অপরাধে আমি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারি। আর যখন থেকে আমি এখানে এসেছি, আমার একটা অধিকারও পূরণ করা হয়নি।" সে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কথাগুলো বলতে বলতে একটু আগে বাড়তেই তার চেহারা আলোয় চলে এল। বেশ সুদর্শন একটা তরুণ সে, অল্পবয়সী ছেলেদের মতো চুলগুলো কপালে ছড়ানো আর চোখেমুখে এক ধরনের নির্লিপ্ত ভাব।


"জেগে ওঠো খোকা, এটা পাকিস্তান!"


"জানি। কিন্তু জেলের ভেতর দলাদলি আর মারামারিতে আপনি যতটুকু সময় নষ্ট করেন, তার অর্ধেকও যদি নিজের অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলতে দিতেন, তাহলে..." সে যেন বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল।


"নিজের কাজ নিয়ে থাকো। বেশি চালাকি কোরো না।" সে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।


"আচ্ছা, আপনি কি আসলেই ওই দুটো খুন করেছিলেন?" কিছুক্ষণ পর সে বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল। ফারিস ঘুরে কটমট করে তার দিকে তাকাল।


"গত ছয় ঘণ্টায় কতবার জিজ্ঞেস করেছ? আমি বারবার উত্তর দিতে বাধ্য নই। তুমি বলো, কী অপরাধে এসেছ?" কঠোর ভঙ্গিতে সে নতুন সেলমেটের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল, যা আজকের ঝামেলার কারণে এতক্ষণ করা হয়ে ওঠেনি।


"আমি...?" সে বেশ আয়েশ করে সামনের চুলগুলো ঠিক করল। "ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির অপরাধে। বিচারাধীন কয়েদি। মামলা আদালতে চলছে।"


"তাহলে অপরাধ তুমি করেছিলে?"


"করেছিলাম তো!" সে ক্ষ্যাপানোর ভঙ্গিতে হাসল।


"চেহারা দেখেও মনে হচ্ছে। মামলা পরিচালনা কে করছে?" এই প্রশ্নটা সে প্রায়ই জিজ্ঞেস করত।


"আরে, যে পুরো আদালতের সবচেয়ে খামখেয়ালি আর মাথাগরম প্রসিকিউটর। জুমার ইউসুফ।" সে মুখ বাঁকাল। ফারিস নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।


"তোমার উকিল কি ওর বিরুদ্ধে মামলা জিততে পারবে?"


"আরে... অবশ্যই! হাশিম কারদার আমার উকিল।" সে কলার ঝাড়ল। ফারিস চমকে উঠল।


"ওকে দেওয়ার মতো এত টাকা কোথা থেকে পেলে? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে এতিমখানা থেকে পালিয়ে এসেছ!"


"আরে আমি আসলে অওরঙ্গজেব কারদারের নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালক ছিলাম। তাই তিনি জোর করে হাশিমকে আমার উকিল নিয়োগ করে দিয়েছেন।" আহমদ শাফি হেসে বলল। ফারিস ভীষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।


"তাহলে তুমি আওরঙ্গজেব কারদারের হয়ে কাজ করতে?"


"জি, আপনার মামুর জন্য। আর শুনুন, আমি কিন্তু হঠাৎ করে আপনার সেলে আসিনি। হাশিম আমাকে এখানে পাঠিয়েছে যাতে আমি আপনার খেয়াল রাখতে পারি।" ফারিস জবাবে তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকাল।


"খেয়াল রাখতে, নাকি নজর রাখতে?"


"অবশ্যই নজর রাখতে!" সে নির্লিপ্তভাবে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। বাইরে অন্ধকারে মৃদু জ্বলতে থাকা আলোয় প্রহরীদের হেঁটে চলে বেড়াতে দেখা যাচ্ছিল।


"কী করতে মামুর জন্য?" সে ছেলেটিকে অনবরত খুঁটিয়ে দেখছিল।


"নির্বাচনী কৌশল, প্রচারণা পরিচালনা, জনমানসে ভাবমূর্তি গঠন ইত্যাদি।"


"মানে ওনাকে পরামর্শ দিতে। জেলে পচে মরা এই ভাগনেকে বের করার বুদ্ধি কখনো দাওনি?"


"ওহ..." আহমদ কিছুটা আমতা আমতা করে থুতনি চুলকাল। "তিনি তো আপনাকে সাহায্য করতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু..."


"কিন্তু কী?" সে জানতে চাইল।


"দেখুন, ওনার নির্বাচনের জন্য এটা মোটেও ভালো ছিল না। সো আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম যেন তিনি আপনার থেকে নিজেকে দূরে রাখেন... ভাই, তিনি আমার ক্লায়েন্ট ছিলেন, আমার তো ওনার সুবিধাটাই দেখতে হবে, তাই না?" সে গড়গড় করে ব্যাখ্যা দিচ্ছিল, আর ফারিস হুট করে উঠে বসল। তার ইচ্ছে করছিল এখনই ওর ঘাড়টা মটকে দেয়।


"তাহলে এই মহান পরামর্শগুলো দেওয়ার পেছনে তুমি ছিলে?" তীব্র ক্ষোভ মেশানো চোখে সে তাকে দেখল। "শোনো, এখন নিজের মালপত্র গুছিয়ে নাও আর সকাল হতেই অন্য কোনো সেলে নিজের এই মুখটা গিয়ে লুকাবে। এখানে তোমার এক মুহূর্তও থাকা হবে না।" রুক্ষ সুরে কথাটি বলে সে উঠে দূরে চলে গেল।


আহমদ অত্যন্ত নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ঘাড়টা বুকের ওপর নামিয়ে আনল। "আসলে সত্যি কথা বলার তো যুগই নেই!"

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Sab sukhan, is lab-e-sukhan ke ameer... Saare mausam gulaab hain jaise



[সব কথা, সব বাণী যেন সেই সুমধুর ঠোঁটের অধীন... চারপাশের সব ঋতুই যেন এখন গোলাপের মতো রঙিন।]


অওরঙ্গজেব কল শেষ করে ফিরে এলেন। লাউঞ্জে চুপচাপ বসে থাকা নুদরাত ছাড়া সবাই কথা বলছিল। হানিন আর সাদি হাশিমের রাজনীতি নিয়ে কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা করছিল। আওরঙ্গজেব এসে বসতেই হানিন জিজ্ঞেস করল—


"আমি মেইলে যে নাটকগুলোর লিংক পাঠিয়েছিলাম, আপনি কি ওগুলো দেখেছেন?"


"আমার কাছে এত সময় থাকে না। হ্যাঁ, দশ-পনেরো বছর পর কখনো অবসর পেলে দেখব।"


"যাই হোক, আপনি যদি কোরিয়ান নাটক না দেখেন বা কে-পপ না শোনেন, তবে আপনার জীবনে দেখার মতোই কিছু নেই।" সে বেশ আবেগী হয়ে গেল।


"আচ্ছা, তোমার কি সব কোরিয়ানদের একই রকম মনে হয় না? একই রকম চীনা চেহারার?" আর ওনার এই প্রশ্নে হানিন যথারীতি চটে গেল।


"আমাদের পুরো জাতির এটাই সমস্যা। আমাদের অন্য জাতির মানুষদের একই রকম মনে হয়। কৃষ্ণাঙ্গদেরও এক লাগে, চীনাদেরও এক লাগে। অথচ ওরাও আমাদের মতোই একে অপরের থেকে আলাদা আর দেখতেও অনেক সুন্দর..." সে অনবরত মুখ চালিয়ে যাচ্ছিল।


হাশিম আস্তে করে উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রান্নাঘরটা বাড়ির একদম শেষ কোণায় ছিল। সেখানে মাঝের টেবিলে বসে নওশেরওয়াঁন খাচ্ছিল। মেরি ট্রাংক হাতে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। হাশিম দরজায় দাঁড়িয়ে একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরু চমকে ওনার দিকে তাকাল, তারপর কিছুটা লজ্জায় প্লেট সরাল।


"খাও খোকা, আমি তো বারণ করতে আসিনি।" তবে সে টিস্যু দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে বিড়বিড় করল—


"আমি ওকে সহ্য করতে পারি না। আর আপনারা ওনাকে পরিবারসমেত আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেন।"


হাশিম মেরিকে ইশারা করল। সে বাইরে চলে গেল। তারপর তিনি পা টিপে টিপে ওর কাছে এসে দাঁড়ালেন।


"তোমার মনে এখনও এই রাগটা জমে আছে যে এত বছর আগে ও কেন তোমার নামে মিমির কাছে অভিযোগ করেছিল?"


"তা রাগ হওয়ার কি কথা নয়?" সে ক্ষ্যাপা সুরে বলল।


"তুমি কি আবার মাদক নিয়েছিলে?"


"না তো।"


"আর মাদক না নেওয়ার কারণেই তোমার পড়াশোনায় ভালো প্রভাব পড়েছে, আজ তুমি একজন সফল মানুষ হতে পেরেছ। সে তো তোমার ভালোর জন্যই কাজটা করেছিল, আর তুমি এখনও রেগে আছ?"


নওশেরওয়াঁনের টানটান হয়ে থাকা স্নায়ু কিছুটা শিথিল হলো। "সেটা ঠিক আছে, কিন্তু..."


"কিন্তু কী শেরু? ও কি সেই সাদি নয়, যে তোমাকে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল?"


নওশেরওয়াঁন নীরব হয়ে গেল।


"এখন এই রাগটা ভুলে যাও।"


"কীভাবে ভুলব? পাঁচটা বছর এই দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছি যে আমার প্রতিটা পদক্ষেপ ও পর্যবেক্ষণ করছে। মিমির কাছে যেদিন আমার অপমান হলো, তারপর কত দিন ধরে মিমি আমাকে অপরাধীদের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছেন। আর..."


"কোনো মেয়েকে নিয়ে কি তোমাদের মাঝে ঝামেলা হয়েছে?" হাশিম হাসি চেপে জিজ্ঞেস করলেন। ওর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল।


"আমাকে কি আপনার এত বড় ব্যর্থ মনে হয়?" (আর এটা ভাগ্য ভালো ছিল যে বিগত বছরগুলোতে একটা মেয়ের বাগদত্তার কাছ থেকে খাওয়া মারের খবর হাশিম পাননি। যখন সেই মারটা পড়েছিল, তখন সাদি সামনে একটা ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিল। উফ!)


"চলো এবার মেজাজ ঠিক করো। লাউঞ্জে তোমার ওই বাচাল বোনটা আবার কথা বলা শুরু করেছে। ওকে সহ্য করার জন্য আমার তোমার সাহায্য চাই।" নওশেরওয়াঁন মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল এবং উঠে দাঁড়াল। দুজনে বাইরে বের হতেই করিডোরে মেরি একটা ফিলিপিনো মেয়েকে কিছু একটা বোঝাচ্ছিল। মেয়েটাকে কিছুটা নার্ভাস কিন্তু বেশ বুদ্ধিমান মনে হচ্ছিল, সে ঘন ঘন মাথা নাড়ছিল। হাশিম কৌতূহলী দৃষ্টিতে মেরির দিকে তাকালেন।


"স্যার, ও হলো ফিওনা।" বেশ ভেঙে ভেঙে ওর নামটা উচ্চারণ করল। "নতুন কর্মচারী। মিসেস জওয়াহেরাত রেখেছেন। আজ থেকেই যোগ দিয়েছে।"


"হুম।" সে এক কৌতূহলী নজর ওর ওপর বুলিয়ে এগিয়ে গেল। শেরু তো ওর দিকে তাকালও না।


ভেতরে যখন হানিন আওরঙ্গজেবের সাথে কথা বলছিল, তখন শেহরিন অনবরত সাদির দিকে তাকাচ্ছিল। সে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু জওয়াহেরাত সামনে বসে ছিলেন আর ওনার সামনে শেহরিন নিজেকে সাদির থেকে একদম বিচ্ছিন্ন দেখাতে চাইত, তাই চুপ করে রইল।


হাশিম আর নওশেরওয়াঁন ফিরে এলে হানিনের নাটক-পুরাণ তখনও জারি ছিল।


"হানিন, তুমি জানো শেরু কাল তাইওয়ান যাচ্ছে? এইমাত্র তুমি কোনো একটা তাইওয়ানিজ নাটকের কথা বলছিলে না?" হাশিম মুচকি হেসে তাকে থামালেন এবং সামনের সোফায় বসলেন। হানিন অনর্গল চলতে থাকা কথা শুনে মাথা ঘুরিয়ে শেরুর দিকে তাকাল।


"তাইওয়ানে কী আছে? যাওয়ার হলে দক্ষিণ কোরিয়া যান।"


"অফিসের কাজে যাচ্ছি।" এক অভিযোগ করার মতো দৃষ্টি বাবার ওপর দিল। "কোরিয়া তো আগে অনেকবার গিয়েছি।"


"তাহলে আরেকবার যান। আমার জন্য কিমচি নিয়ে আসবেন।" সে বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল। সাদি এক সতর্কতার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল, কিন্তু সে খেয়ালই করল না। কিছুটা উদাসীন হয়ে বসা শেরু কাঁধ ঝাঁকাল।


"হ্যাঁ, ওখানেও এক-দুদিনের জন্য যেতে পারি হয়তো। নিয়ে আসব।"


"বাহ... দারুণ!" আগে পিছে নওশেরওয়াঁনের মতো পাত্তাই না দেওয়া হানিন অবলীলায় এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রইল।


নুদরাত তখনও চুপচাপ বসে ছিলেন  ওনার এই ডিনারে কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Kuch bhi kaho sab apni anaon par ade hain... Sab log yahan surat-e-asnam khare hain


[যা-ই বলো না কেন, সবাই এখানে নিজের অহংকার নিয়ে জিদ ধরে আছে... এখানকার প্রতিটি মানুষ যেন স্রেফ জড় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।]


সেই শীতের রাতে যখন ফারিস নিজের নতুন সেলমেটকে আচ্ছা করে শুনিয়ে দিয়ে একপাশে শুয়ে পড়েছিল, আর নুদরাত কারদার প্রাসাদে চরম উদাসীনতায় বসে ছিলেন—ওদের সবার থেকে দূরে, ইউসুফ সাহেবের বাড়িতে, সদাকত ধোঁয়া ওঠা কফি এনে জুমারের সামনে রাখছিল।


হুট করেই প্রধান আসনে বসা বড় আব্বা কিছুটা গলা খাঁকারি দিলেন। সে এক পুরনো খবরের কাগজ দেখছিল, চমকে উঠে নজর তুলে ওনার দিকে তাকাল।


'কোন কথার ভূমিকা বাঁধতে চাচ্ছেন উনি?'


"সে... ফারিসের মামলার শুনানি তো এই মাসেই, তাই না?" এই কথায় জুমারের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে আবার খবরের কাগজের দিকে মনোযোগ দিল।


"আপনি কি এটা দেখাতে চাচ্ছেন যে লাউঞ্জের টেবিলে রাখা সমনটা আপনি দেখেননি, যাতে আমাকে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছে?"


"জুমার..." তিনি বেশ অসহায়ভাবে এগিয়ে আসলেন। "তুমি কি ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে?"


"যা সত্যি, আমি সেটাই বলব।" সে খবরের কাগজ পড়তে থাকল।


"আড়াই বছর হয়ে গেল এই ঘটনার, তুমি একটা বারও ওর সাথে দেখা করোনি। ওর কথাটা তো একবার শোনো।"


"আমি বিচারক নই, প্রসিকিউটর বা ডিফেন্ডারও নই। আমি শুধু একজন সাক্ষী। নিজের কথা ও আদালতে বলুক। আমার থেকে কেন প্রত্যাশা করে?"


"সাদির সাথে তো অন্তত দেখা করতে পারো।" তিনি আরও একটা চেষ্টা করলেন।


"সে আমার উপস্থিতিতে বাড়িতে এলে তো দেখা হতো, সে যদি না আসে তবে আমি কী করব?"


"সে তো তোমারও সাদি, আমাদের সাদি। ওর কী দোষ?"


"যখন আমার ওকে প্রয়োজন ছিল, ও আমার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। হাসপাতালে আত্মীয়দের সেই খোঁটা আর অপমানের যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলো, সেই রাতগুলো যখন আমি ব্যথার তীব্রতায় জেগে থাকতাম—কীভাবে পার করেছি, তা আমার মনে আছে। এখন আর ওকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি একাই ভালো আছি।" সে পাতা উলটে ভেতরের দিকটা সামনে আনল। চেহারায় এক গাম্ভীর্য আর ভাবলেশহীনতা ছিল। তিনি অত্যন্ত আফসোস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন।


"তোমার কি নিজের সাক্ষ্যের ওপর নিজের বিশ্বাস আছে?"


"না থাকলে কখনো সাক্ষী দিতাম না। আর সাক্ষ্যের কথা যদি বলেন, ওটা তো আমি আগের শুনানিতেই দিয়ে দিয়েছি। এইবার আমাকে শুধু জেরার জন্য ডাকা হচ্ছে।" সে সাথে সাথেই মগটা তুলে এক চুমুক দিল।


"নুদরাত মারা যাবে।"


"নুদরাতের ট্রিপল ভেসেল ডিজিজ হয়েছে। ওর হার্ট ঠিকমতো কাজ করছে না। যদি ফারিসের শাস্তি হয়ে যায়, তবে ও এই ধাক্কার চোটেই..."


"এটা ফারিসের আমার ওপর গুলি চালানোর আগে ভাবা উচিত ছিল।" দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে মগটা ফেরত রাখল। চোখ জোড়া খবরের কাগজের নিচের দিকে চলে গেল। নাকের লবঙ্গটা জ্বলজ্বল করছিল।


"সাদির বাড়িতেই না হয় একবার ঘুরে আসতে পারো।"


"জরুরি কোনো কাজ থাকলে যাব। আমি কি ওর ওপর রেগে আছি নাকি?" সাথে সাথেই তার ফোনটা বেজে উঠল। সে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে গেল আর বড় আব্বা নিজের অর্ধেক শেষ হওয়া চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আজ তো চায়ের সাথে কথাটাও অধরাই রয়ে গেল।



চলবে,,,,,



Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)