নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৬ পর্ব ২২, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


 


#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৬


পর্ব ২২:-



“আর দুনিয়ার প্রথম খুনিকে সাজা শুনিয়েছিলেন স্বয়ং পরম বিচারক। তা কি মৃত্যু ছিল? না! বরং তা ছিল জীবন... আর ঈশ্বর বলে দিয়েছিলেন যে—


‘হে কাবিল! তুমি ঘুরে বেড়াবে এই পৃথিবীতে এক পলাতক, ভাগ্যহীন, চিহ্নিত অপরাধী হয়ে। রক্ত জলের চেয়েও ঘন, আর তোমার কপালের সেই চিহ্ন দেখেই তোমাকে চিনে নেবে প্রতিটি পথচারী। আর এটাও আদেশ করা হয়েছিল যে, কেউ যেন কাবিলকে হত্যা না করে; কারণ যে-ই কাবিলকে হত্যা করবে, আমি তাকে নিজ হাতে সাত গুণ বেশি শাস্তি দেব।’


— হেনরি লংফেলোর ‘টেবিল টক’ থেকে নেওয়া।


বিষয়:- পানির চেয়ে ঘন পার্ট ১ 

 রক্তের টান / জলের চেয়ে ঘন (প্রথম অংশ)

paani se garha part 01




জওয়াহেরাত একদম স্তব্ধ হয়ে জুমারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যদিও তিনি চাইতেন জুমার যেন ফারিসের ওপর প্রতিশোধ নেয়, তবুও এত দ্রুত সবকিছু ঘটে যাওয়াটা তাঁকে কিছুটা অস্থির করে তুলছিল। বাহ্যিকভাবে একটা মৃদু হাসি বজায় রেখে তিনি সামনের দিকে তাকালেন, যেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা, আর তার মাঝখানে হাম্মাদ ও কিরাণকে দেখা যাচ্ছিল।


“Of course! আমি তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু এই প্রতিশোধটা কি ফারিসের ওপর, নাকি নিজের ওপর?”


“যদি প্রথমটা পূরণ হয়ে যায়, তবে দ্বিতীয়টাও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য।” জুমারও স্থির ও নিস্পৃহ দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল।


“তুমি কি এই মামলাটা re-open করতে পারো না? আদালত যদি ওকে সাজা দেয়, তাহলে সেটাই বেশি ভালো হতো...”


“আপনি আমাকে সাহায্য করবেন, নাকি আমি অন্য কারও কাছে যাব? আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আপনি নিজেই আমার কাছে এসে বলেছিলেন— যদি কোনোদিন আমার সিদ্ধান্ত বদলায়, তবে আপনি আমার এই প্রতিশোধের যাত্রায় পাশে থাকবেন।”

সে বরফশীতল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল।


জওয়াহেরাত সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলেন। একটু সামনে এগিয়ে এসে নরম করে ওর হাতটা চেপে ধরলেন।


“Sure! আমি আমার কথায় অনড় আছি। সবকিছু একদম স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটবে। সে খুব শিগগিরই তোমার বাড়িতে তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে। শুধু তুমি নিশ্চিত করবে, যেন তোমার বাবা কোনোভাবেই না না করেন।”


“ব্যাস!”

জুমারের গলার স্বর ছিল বরফের মতো ঠাণ্ডা।


জওয়াহেরাত চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে তিনি নতুন এক পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছিলেন।


অনুষ্ঠানটি এবার প্রায় শেষের দিকে। সাদি হানিনের পাশে চুপচাপ বসে ছিল। মাঝে মাঝেই সে দূরে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলতে থাকা জুমার আর জওয়াহেরাতের দিকে তাকাচ্ছিল। জওয়াহেরাত ওকে তাঁদের দিকে তাকাতে দেখে অভিজাত ভঙ্গিতে সামান্য হাসলেন। সাদিও জোর করে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।


ঠিক তখনই ওর নজর গেল হানিনের দিকে। সে ঘাড় সামান্য ঘুরিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হাশিমকে দেখছিল। ওর চোখে তীব্র অপছন্দের ছাপ ফুটে উঠল। সাদি নিজের মুখটা হানিনের কাছে এনে নিচু স্বরে বলল—


“ভবিষ্যতে ওনার সঙ্গে আর বেশি কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আর ওনার কোনো কথাই বিশ্বাস করবে না।”


হানিন কিছুটা চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল।


“উনি কিন্তু মিথ্যে বলছিলেন না। ওনার সত্যিই খুব আফসোস হচ্ছে।”

সে সামান্য থামল।

“ওনার আলিশার জন্য সত্যিই খুব খারাপ লাগছে।”


“বাদ দাও তো, হানিন!”

সাদি বিরক্ত হয়ে পেছনে হেলান দিল, তারপর উঠে সেখান থেকে চলে এল।


হলের এক কোণের দরজার সামনে এসে সে থামল। ওটা পুরুষদের জন্য নির্ধারিত restroom ছিল। ভেতরে আয়নায় ঢাকা দেয়াল, সামনে বেসিনের দীর্ঘ সারি, আর তার ওপারে ওয়াশরুমগুলো।


সাদি একটা বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কল ছেড়ে মুখে পানির ঝাপটা দিল, তারপর কল বন্ধ করল। পাশে রাখা টিস্যু তুলে হাত মুছতে মুছতে মুখ তুলতেই সে আচমকা থমকে গেল।


আয়নায় নিজের ঠিক পেছনে সে হাশিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।


দুটি হাত প্যান্টের পকেটে গোঁজা, দামী কোটের বোতাম লাগানো, আর কোনো রকম হাসি ছাড়াই নরম দৃষ্টিতে তিনি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।


“তুমি আমার অফিসে এলে না। আমার সেক্রেটারি তোমাকে আবার ফোন করেছিল, কিন্তু তুমি রিসিভ করোনি।”


“আমি ব্যস্ত ছিলাম।”

সাদি মাথা নিচু করে হাত মুছতে মুছতে জবাব দিল।


হাশিম গভীর দৃষ্টিতে ওর মুখটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।


“এই সপ্তাহে কি আসবে?”


“জি, আসব। আমার আর আপনার মধ্যে সত্যিই কিছু বিষয়ে কথা বলা খুব জরুরি।”

টিস্যুটা ডাস্টবিনে ফেলে সাদি গুরুত্বের সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।


“তোমার কাছে এমন কিছু আছে, সাদি, যা আসলে আমার। তোমার উচিত সেটা শান্তভাবে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া।”


“নাহলে কী করবেন আপনি?”

সাদি এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে তাঁর একদম মুখোমুখি দাঁড়াল এবং সরাসরি চোখে চোখ রাখল।


হাশিম একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন।


সাত বছর আগে যে নিষ্পাপ, সরল ছেলেটার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল— এ তো সে নয়!


হাশিমের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।


“আমি কিছুই করব না, খোকা! শুধু একটা উপদেশ দেব। যে মানুষের পরিবারের দুজন সদস্য ইতিমধ্যে খুন হয়ে গেছে, তার খুব সাবধানে পা ফেলা উচিত... যাতে পরবর্তী নম্বরটা নিজের না হয়ে যায়।”


সাদির মুখে অদ্ভুত কষ্টের ছাপ ফুটে উঠল। ভ্রু কুঁচকে সে বিস্মিত দৃষ্টিতে হাশিমের দিকে তাকাল।


“আপনি কি আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন? আপনি কি আমার জীবন কেড়ে নিতে পারেন?”


হাশিম পকেট থেকে হাত বের করে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সাদির কাঁধে হাত রাখতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর হাত সাদির কাঁধ স্পর্শ করতেই সাদি যেন তীব্র বৈদ্যুতিক শক খেয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল।


দুটি হাত সামনে তুলে ধরে সে কষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করে একেকটা শব্দ চিবিয়ে বলল—


“আপনার এই হাত দিয়ে আমাকে একদম ছুঁবেন না।”


হাশিমের হাত শূন্যে থেমে রইল। তারপর কঠোর অভিব্যক্তিতে মাথা সামান্য নত করে তিনি হাত নামিয়ে নিলেন এবং পাশে সরে দাঁড়ালেন।


সাদি দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।


হাশিম একবার নিজের শূন্য হাতটার দিকে তাকালেন। হাতটা ফ্যাকাশে সাদা দেখাচ্ছিল। আঙুলগুলো নিখুঁতভাবে manicure করা। তিনি ধীরে মাথা ঝাঁকালেন। মনের গভীরে তীব্র যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল।


তাঁরা কি সত্যিই আর কোনোদিন অতীতে ফিরে যেতে পারবেন না? সেই সুন্দর দিনগুলোয়?


বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখলেন, নওশেরওয়াঁন বিরক্ত মুখে দূরে চেয়ারে বসে থাকা হানিন আর সাদির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছিল, সাধ্য থাকলে সে এই ভাইবোন দুজনকে এখনই গুলি করে দিত।


“আমি কী বলেছিলাম? ওর বোনের পিছু নেওয়া বন্ধ করো।”

হাশিম কাছে এসে কঠোর স্বরে বলতেই নওশেরওয়াঁন কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল। তারপর গা-ছাড়া ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।


“আমার কী! হুহ!”


হাশিম কড়া চোখে ওর দিকে তাকালেন।


“তুমি এখনও ওই শেহরিন ট্রমা থেকে বের হতে পারোনি, নওশেরওয়াঁন! অনেক হয়েছে এবার।”


“ওর কারণেই আমি শেহরিনকে কোনোদিন পাব না। গত এক সপ্তাহ ধরে এই একটা কথাই ভাবতে ভাবতে আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর আপনি বলছেন অনেক হয়েছে!”


“Oh please!”

হাশিম বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকালেন।

“আমাদের সামনে এর চেয়েও অনেক বড় সমস্যা আছে।”


“আর কী সমস্যা আছে? আপনি তো বলেছিলেন, সে আপনার documents কোনোদিন খুলতে পারবে না। তাহলে?”


শেরু চমকে উঠলো..!


“কিন্তু ও খুব ভালো করেই জানে, আমার এই হাতে ঠিক কার কার রক্ত লেগে আছে।”

নিজের কথার মাঝেই তিনি নিজের হাত দুটির দিকে তাকালেন।


নওশেরওয়াঁনের ভ্রু বিস্ময়ে কুঁচকে গেল।


“সে তো ওয়ারিস মামুর ফাইলপত্রের পেছনে পড়ে ছিল, ফারিসকে বের করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সে কীভাবে জানল যে আপনি কোনো খুনের সঙ্গে...”


“ও জানে, নওশেরওয়াঁন! আর এই মুহূর্তে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তবে হ্যাঁ, তুমি ওর গায়ে বিন্দুমাত্র হাত দেবে না। সবকিছু আমি একাই সামলে নেব। তুমি কিছুই করবে না।”


তিনি রাগের সঙ্গে ওকে সতর্ক করে দিলেন।


নওশেরওয়াঁন হালকাভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।

“ওকে।”


তারপর আবার সেই একই হিংস্র দৃষ্টিতে দূরে বসে থাকা সাদির দিকে তাকিয়ে রইল।


ওনারা সবাই এখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অনুষ্ঠানটি ঢলে পড়া চাঁদের মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল।


আর তাঁদের সামনে অপেক্ষা করছিল এক গভীর, অন্ধকার রাত।



🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



“Kab se hain ek harf pe nazrein jami hui... woh padh raha hoon jo nahi likha kitaab mein।”


[কতক্ষণ ধরে যে একটা অক্ষরের ওপর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে! আমি আজ তা-ই পড়ছি, যা কোনো বইয়ে লেখা নেই।]


জুমার বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে যখন বাড়ি ফিরল, ততক্ষণে ওনার নির্দেশমতো সদাগত Prosecutor বাসিরাতের কাছ থেকে কেসের সমস্ত ফাইলপত্র নিয়ে চলে এসেছিল। ওটা বেশ বড় একটা বাক্স ছিল, যা ওনার ঘরের মেঝেতে রাখা ছিল। সে আব্বাকে সালাম আর শুভরাত্রি একই শ্বাসে জানিয়ে নিজের ঘরে চলে এল। দরজার লকটা আটকে পার্সটা একপাশে ছুঁড়ে মারল, তারপর আলমারিটা খুলল।


আলমারির একদম নিচের তাক থেকে একটা ছোট ডাব্বা বের করল, যেখান থেকে খবরের কাগজের টুকরোগুলো সেদিন সকালে ছিটকে বাইরে পড়ে গিয়েছিল—যেদিন ফারিস খালাস পেয়েছিল। সেই সকালটার পর আজ সবকিছু বদলে গেছে। ডাব্বাটা সে মেঝের ওই বড় বাক্সটার কাছে এনে উপুড় করে দিল। কাগজের টুকরো আর নোটসের একটা বড় ঢের তৈরি হয়ে গেল। তারপর সে বড় বাক্সটাও উল্টে দিল।


একটু ঝুঁকে নিজের জুতোর স্ট্র্যাপগুলো খুলে ওগুলোকে দূরে ছুঁড়ে মারল। কোঁকড়ানো চুলগুলোর একটা এলোমেলো খোঁপা বানিয়ে সে মেঝেতে বসে পড়ল। খুব দ্রুত হাত চালিয়ে জিনিসগুলো ওলটপালট করতে করতে সে কিছু একটা খুঁজছিল। ভ্রু জোড়া কুঁচকে রইল, ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে লেগে রইল আর চোখেমুখে ছিল তীব্র এক জেদ।


তারপর ওই কাগজের স্তূপের নিচ থেকে সে একটা ছবি বের করল, আর আবারও হাত চালাল।


“এই তো, দ্বিতীয় ছবিটাও পাওয়া গেছে।” সে বড্ড চেপে রাখা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছবি দুটো হাতে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। খালি পায়ে হেঁটে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল, যেখানে একটা উঁচু আর বেশ চওড়া গ্রিন বোর্ড ঝুলছিল।


জুমার একটা পিন খুলল এবং প্রথম ছবিটা ঠিক সামনে আটকে দিল। তারপর দ্বিতীয় ছবিটাও লাগাল। কিছুটা পেছনে সরে এসে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছবি দুটোর দিকে তাকাল।


জারতাশা গাজী আর ওয়ারিস গাজী।


এটা ছিল ওনার নিজস্ব বোর্ড, আর এখন এটাকে পুরোটা ভরতে হবে।


সে আবার পেছনের দিকে ফিরে এল। নিচে স্তূপ হয়ে থাকা জিনিসগুলো তুলে নিয়ে স্টাডি টেবিলের ওপর রাখল। একদম গুছিয়ে, সলিডভাবে। ওনার ভেতরে চলতে থাকা তীব্র ঝড়টা এখন কিছুটা শান্ত হয়েছিল। সে খুব ভালো করেই জানত, ওকে এখন কী করতে হবে। তবে তার আগে নিজের মনের সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো জরুরি ছিল। নিজের বিবেককে শান্ত করা প্রয়োজন ছিল যে—হ্যাঁ, সত্যিই সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেই আমি এই চরম পদক্ষেপটা নিয়েছি। ইনসাফের সব দরজা যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখনই আমি প্রতিশোধের পথ বেছে নিলাম।


সে একদম শান্ত ও গম্ভীর মুখে চেয়ারে গিয়ে বসল। কাগজপত্রের পুরো বান্ডিলটা সামনে রাখল। টেবিল ল্যাম্পটা অন করল। প্রথম পৃষ্ঠার একদম ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল—


“সরকার বনাম ফারিস গাজী”


জুমারের চোখ দুটো এক একটি শব্দ পার করে এগোতে লাগল। জানালার ওপাশে রাত আরও গভীর হচ্ছিল আর প্রতিটি মুহূর্ত চারপাশটাকে আরও বেশি অন্ধকার করে তুলছিল। একসময় অন্ধকারটা তার চরম সীমায় পৌঁছে গেল। এতটাই কালো, এতটাই নিঝুম যে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত আলো যেন চিরতরে নিভে গেছে।


আর তারপর ভোর হলো। সকালের প্রথম আলো ফুটল। আলো যেন একটা পথ খুঁজে পেল। সে ছড়িয়ে পড়তে লাগল—ফোঁটায় ফোঁটায়, এক একটি রশ্মি হয়ে, আর তারপর সেই সকালের নরম রোদ তীব্র হয়ে এক সোনালি দুপুরে রূপ নিল।


সাদা টি-শার্ট আর নীল জিন্স পরা সাদি যখন জুমারের ঘরের দরজায় নক করল, তখন সূর্য ঠিক মাথার ওপর। রবিবারের আলসে সকালটা আজকেও কেমন যেন নিস্তেজ ছিল। ওর হুট করে গত রবিবারের সকালটার কথা মনে পড়ে গেল, যখন জুমার ওর রেস্টুরেন্টে এসেছিল আর ওকে কিডনি নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। সে বড্ড উদাস হয়ে একটু হাসল, তারপর মাথাটা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল। দরজাটা আবারও বাজাল। কোনো সাড়া নেই।


সাদি আলতো করে দরজাটা ধাক্কা দিতেই ওটা খুলে গেল। ভেতরের দৃশ্যটা স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠল। মেঝেতে অসংখ্য কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। ছবি আর ফটোকপি। সে খুব ধীর পায়ে ভেতরে হেঁটে এল। বেশ অবাক হয়ে মাথা তুলে দেয়ালের দিকে তাকাল।


বোর্ডটা পুরো ভর্তি হয়ে ছিল। একদম ওপরে ওয়ারিস আর জারতাশার ছবি, আর সেগুলোর আগে-পিছে, উপরে-নিচে অসংখ্য খবরের কাগজের কাটিং, কাগজপত্র আর sticky notes লাগানো ছিল। ‘সরকার বনাম ফারিস গাজী’ মামলা সংক্রান্ত সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, অসমাপ্ত জবাব আর অপর্যাপ্ত সাক্ষ্য—সবকিছু সেখানে সংক্ষেপে সাজানো ছিল।


সাদি ঘাড় ঘুরিয়ে স্টাডি টেবিলের দিকে তাকাল। সেখানেও ফাইলপত্র ছড়িয়ে ছিল আর একটা খোলা ফাইলের ওপর মাথা রেখেই ও ঘুমাচ্ছিল। চোখ দুটো বন্ধ, নাকের নাকছাবিটা চকচক করছিল আর ওনার সেই ঢিলেঢালা খোঁপাটা খুলে চুলগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে হালকা একটু হাসল, তারপর ওনার কাছাকাছি এল। টেবিলের কোনায় হাত রেখে একটু ঝুঁকে বসল।


“ফুপ্পু!” সাদি খুব নরম করে ওনার মাথায় হাত রাখল। “আপনার শরীর ঠিক আছে তো? আমি মাথাটা একটু টিপে দেব?”


“উঁহু...” বলতে বলতে ও মাথা তুলতে গেল, সাদি সোজা হয়ে দাঁড়াল। বন্ধ চোখেই মুখ থেকে চুলগুলো সরাতে সরাতে সে সোজা হয়ে বসল। চুলের গোছাগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। দুই হাতের আঙুল দিয়ে চোখ দুটো একটু রগড়ে নিল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে ঘুমজড়ানো চোখে ওর দিকে তাকাল। হালকা একটু হাসল।


“তুমি কখন এলে?”


“এইমাত্র। রাতে আমার মনে হয়েছিল আপনার শরীরটা ঠিক নেই। আপনি কেমন যেন একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন।” ওর স্মৃতির পর্দায় জওয়াহেরাতের সাথে জুমারের কথা বলার দৃশ্যটা ভেসে উঠল।


জুমার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর এক চিন্তিত দৃষ্টিতে ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকাল।


“আপনি এই সব কী করছেন, জুমার?”


“ওহ, এগুলো! এগুলো Prosecutor বাসিরাত পাঠিয়েছে।” সে বেশ ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়াল আর অলসভাবে জিনিসগুলো গোছাতে লাগল।


“দেড় বছর আগে আমিও ঠিক এই কাজটাই করছিলাম। কিন্তু আপনি এখানে কিচ্ছু পাবেন না।”


“তুমি একদম ঠিক বলছ।” সবার ধারণার বাইরে গিয়ে জুমার বেশ গুরুত্বের সাথে ওর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। সাদি এক মুহূর্তের জন্য পুরো থমকে গিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।


“সত্যিই এই কেসটা একদম মৃত। কোনো একটা প্রমাণও এটা নিশ্চিত করে না যে ফারিস guilty।”


সে এবার ফাইলের পাতাগুলো নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখতে লাগল।


“শুধু আপনার সাক্ষ্যটুকু ছাড়া।” মানে সে বড্ড সাবধানে এক একটি শব্দ উচ্চারণ করছিল। “মানে, আপনি আদালতে যা বলেছিলেন... অর্থাৎ... ফায়ারিংয়ের ঠিক আগে ফারিস মামুর নম্বর থেকে ফারিস মামুর গলার আওয়াজে আপনার কাছে একটা কল এসেছিল।”


“আর তুমি...” জুমার এক শান্ত ও বরফশীতল দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকাল। “নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে এটা প্রমাণ করে দিলে যে ওই কলটা সম্পূর্ণ fake ছিল। কোনো software ব্যবহার করে ফারিসের গলার সাথে মিল রেখে একটা ডামি আওয়াজ তৈরি করা হয়েছিল।”


“জি। কারণ ওটা আসলেই fake ছিল আর ঠিক এই কারণেই জজ সাহেব মামুকে খালাস করে দিয়েছেন।”


“You know, সাদি! তুমি একদম ঠিক বলছ।” জুমার বোঝার ভঙ্গিতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। “হতে পারে, আমাকে আসলেই সেট-আপ করা হয়েছিল। এই সবকিছু হয়তো মিথ্যে ছিল। আমার ভুল সাক্ষ্যের কারণে ফারিসকে...” ওনার নাম মুখে আনাটাও জুমারের জন্য এক চরম যন্ত্রণার ছিল। “...চারটে বছর জেলে কাটাতে হলো।


“এই কেসটা পুরোটা পড়ার পর একদম নিরপেক্ষ জায়গা থেকে আমারও এখন সত্যি মনে হচ্ছে যে আমিই ভুল ছিলাম। আমি জানি না। তবে আমার মনে হয় না যে এখন আমার কাছে আর কোনো কারণ বাকি আছে তোমার মামুকে দোষী ভাবার। এই কারণে, যদিও আমার মন পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি, তবুও আমি আমার সমস্ত অভিযোগ থেকে পেছনে সরে আসছি।”


বেশ গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলতে বলতে সে এখন চটপট ঘরের জিনিসপত্রগুলো নিজের জায়গায় গুছিয়ে রাখছিল।


“যদি আমি ভুল হই আর তোমরা সবাই ঠিক হও—আর হয়তো এটাই বাস্তব—তবে আমি আমার হার স্বীকার করে নিচ্ছি।”


“আমি এটা চাই না যে আপনি হার মেনে নিন।” সাদির বড্ড কষ্ট হলো।


“আচ্ছা! তাহলে তুমি আমাকে একটা কথা বলো। ফারিস আমাকে যে কলটা করেছিল, যা তোমার দাবি অনুযায়ী একটা fake আওয়াজ ছিল... whatever... সেটার রেকর্ডিং তোমরা কোথায় পেয়েছিলে?”


“রেকর্ডিং!” সাদির গলায় যেন কিছু একটা আটকে গেল।


“দেড় বছর আগে তোমার আইনজীবী ওই রেকর্ডিংটা আদালতে পেশ করেছিলেন আর তোমার expert সাক্ষী এটা প্রমাণ করেছিলেন যে ওই আওয়াজের voice print ফারিসের আওয়াজের voice print থেকে একদম আলাদা। আর ওই রেকর্ডিংটার source তোমরা কেউই কোনোদিন প্রকাশ করোনি। তুমি কি আমাকে বলবে, ওটা তোমরা কোথায় পেয়েছিলে?”


ওনার সেই গম্ভীর বাদামি চোখ দুটো সাদির ওপর স্থির হয়ে রইল।


সাদি ওনার দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো একবার খুলল, আবার বন্ধ করল। সামান্য একটু ভাবল, তারপর থেমে থেমে বলল—


“আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করছি। এই ভিত্তিতে যে, আমার দেওয়া উত্তর আমাকে কোনো অপরাধের সাথে জড়িয়ে দিতে পারে।”


“আইনগত সাক্ষ্য আইনের আর্টিকেল ১৫ অনুযায়ী তুমি এই সুবিধা পেতে পারো না, কারণ এই ধরনের উত্তরের ভিত্তিতে তোমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।”


“যেহেতু আমরা এখন কোনো আদালতে দাঁড়িয়ে নেই, তাই আমার উত্তর না দেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে।”


“Okay।” জুমার একটা গভীর শ্বাস নিয়ে হাসল। মাথাটা সামান্য নোয়াল এবং বাইরে এসে সদাকাতকে চায়ের জন্য ডাক দিল।


সাদি চরম এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘুরে আবার ওনার দিকে তাকাল।


“আপনি কি ফারিস গাজীকে নির্দোষ বলছেন?”


“আমি শুধু এটাই বলছি যে, আমি আর কোনোদিন ওনার ওপর কোনো অভিযোগ লাগাবো না।”


সে বেশ স্বস্তির সাথে কথাটা বলতে বলতে করিডোর দিয়ে হেঁটে চলে গেল।


সাদি নিজের নজর ঘুরিয়ে ওই বোর্ডের দিকে তাকাল, যা বিভিন্ন নথিপত্রে পুরো ঠাসা ছিল। জুমার পুরো কেসটা পড়েছে, সমস্ত সাক্ষ্য আর প্রমাণ দেখেছে—যা থেকে সে সবসময় মুখ ফিরিয়ে চলে যেত। আর ওনার বিশ্বাস হয়ে গেছে যে ফারিস একদম নির্দোষ।


ব্যাপারটা তো খুবই সাধারণ ছিল। ওর তো এই ভেবে খুশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই পাজলের কোন টুকরোটা উধাও হয়ে আছে? এত সহজ একটা কথার পেছনে লুকিয়ে থাকা কোন জটিলতা ওকে এভাবে ভাবিয়ে তুলছে?


সাদি বছরের পর বছর ধরে ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় ছিল—যখন ফুপ্পু অন্তত এটা মেনে নেবেন যে ফারিস নির্দোষ ছিল।


সেই মুহূর্তটা এল আর চলেও গেল, কিন্তু সে নিজে শান্ত হতে পারছে না কেন?


নাকি এর কারণ এই যে, সে আর বহু বছর আগের সেই নিষ্পাপ সাদি নেই? আর আজকের সাদির মগজ ওকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে—জুমার এত সহজে ভেঙে পড়ার বা মচকে যাওয়ার মতো মেয়ে নয়। তাহলে?


সে নিজের মনের সাথে লড়াই করতে করতে বাইরে চলে এল। এখনও ওকে আরও একটা জায়গায় যেতে হবে।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


“Har ek qadam ajal tha, har ek gaam zindagi... hum ghoom phir ke koocha-e-qatil se aaye hain।”


[প্রতিটি পদক্ষেপই যেন ছিল মৃত্যু, আর প্রতিটি চরণেই ছিল জীবন... আমরা সারা দুনিয়া ঘুরেফিরে আবার সেই খুনির গলিতেই ফিরে এসেছি।]


কারদার প্রাসাদে সেই রবিবারটা তার চিরাচরিত ব্যস্ততা, চপলতা আর কোলাহলের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল। সাদি সীমানাপ্রাচীরের নিচু দেয়ালের সামনে গাড়ি থামিয়ে হর্ন দিল। ওকে দেখেই সিকিউরিটি গার্ডরা মেইন গেটটা খুলে দিল। গাড়িটি নির্দিষ্ট কিছু চেকপয়েন্ট পার হয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে এল। একটা ঢালু রাস্তা পার হতেই ঠিক সামনে দৃশ্যমান হলো সেই বিশাল রাজপ্রাসাদ, আর তার ঠিক পেছনেই মাথা উঁচু করে থাকা ছোট অ্যানেক্সি ভবনটি।


সে সবুজ লনের বুক চিরে উঁচু-নিচু ঘাসের মাঝখান দিয়ে অ্যানেক্সির দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে গাড়িটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই সে গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে দিল। হাশিমের পেছনের বারান্দার দৃশ্যটা ওর ঠিক চোখের সামনে ভেসে উঠল।


হাশিম নিচে লনের ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রাউজার আর হাফহাতা টি-শার্ট পরা অবস্থায় সে একটু ঝুঁকে নিজের পোষা ল্যাব্রাডর কুকুরের গায়ের লোমগুলো বড্ড আদর করে হাত দিয়ে বুলিয়ে দিচ্ছিল। ওর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে খিলখিল করে হাসছিল এক উচ্ছ্বসিত সোনিয়া। ওনারা দুজনে বেশ নিচু স্বরে কথা বলছিলেন আর হাসছিলেন।


গাড়ির আওয়াজ পেয়ে হাশিম মাথা তুলল। ড্রাইভিং সিটে বসা সাদির দিকে একবার তাকাল, তারপর ওর গাড়ির অভিমুখটা দেখে নিল—অর্থাৎ, সে যে অ্যানেক্সির দিকেই যাচ্ছে, সেটা বুঝে নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আলতো করে একটু হাত নাড়ল।


সাদি এর জবাবে মুখে কোনো হাসি না এনেই স্রেফ নিজের ডান হাতটা তুলল। হাতটা কপালে ঠেকিয়ে মাথাটা সামান্য নোয়াল—এক নীরব সালাম। শত্রুতার হাজারো নিয়মের মাঝেও সৌজন্য বজায় রাখাটাই তো প্রথম নিয়ম। তারপর সে গাড়ি নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।


হাশিম এক শীতল হাসি মুখে মেখে ওকে দূরে চলে যেতে দেখতে লাগল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে আবার সোনিয়ার দিকে মনোযোগ দিল, যে ওকে কিছু একটা বলছিল।


সাদি অ্যানেক্সির সামনে গাড়িটা পার্ক করল। পেছনের দিকে আর না তাকিয়ে সরাসরি বারান্দায় চলে এল। কলিং বেল টিপল। বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, তাই বেল বাজল না। সে দরজায় নক করল। ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। সে আর অপেক্ষা করল না। ঘরের চাবি ওর কাছেই ছিল—ফারিস জেলে থাকার সময় থেকেই চাবিটা ওকে দিয়ে রেখেছিল।


ভেতরে আসতেই পুরো বাড়িটা এক নিঝুম নিস্তব্ধতায় ঘেরা মনে হলো। সে বেশ অবাক হয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ঘুরে বেড়াল। বাইরে তো ফারিসের গাড়িটা পার্ক করা আছে, তাহলে মানুষটা গেল কোথায়?


“আমি নিচে, বেসমেন্টে আছি।” ফারিসের গলার আওয়াজ আসতেই সে কিছুটা চমকে উঠল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।


নিচে পুরো বাড়িটার সমান বড় একটা হলরুমের মতো ঘর ছিল, যেখানে বড় বড় পিলার খাড়া ছিল। চারপাশে ভাঙাচোরা কাঠ-কবাট, পুরনো ফ্রিজার আর গাড়ির নানা যন্ত্রপাতি স্তূপ করে রাখা ছিল। একটা দেয়ালের গায়ে খালি কিছু র‍্যাক ঝুলছিল। একটা সময় ছিল, যখন এই র‍্যাকগুলোয় ফারিসের পিস্তল আর বন্দুকের বিশাল কালেকশন সাজানো থাকত। পুলিশ যখন ওকে গ্রেফতার করে, তখন সবকিছু বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই আর ফেরত দেয়নি।


সাদি সিঁড়ি বেয়ে বেসমেন্টের মেঝেতে নেমে এল। ঘরের ভেতরে সাদা বাল্ব জ্বলছিল, তবুও কেমন যেন আলো কম কম লাগছিল। ফারিস দেয়ালের সাথে লাগানো একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদির দিকে ওর পিঠ ফেরানো ছিল। সে মাথা নিচু করে মুখে কিছু একটা চিবোতে চিবোতে মনোযোগ দিয়ে কিছু কাগজপত্র ওলটপালট করছিল।


কিন্তু সাদি ওনার দিকে তাকাল না। ও টেবিলের পেছনে থাকা দেয়ালটার দিকে চোখ রেখে এক এক পা বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল।


সেখানে কোনো বোর্ড জাতীয় কিছু লাগানো ছিল না। সরাসরি দেয়ালের গায়েই অসংখ্য ছবি, কাগজপত্র আর কাটিং পিন দিয়ে সেঁটে রাখা হয়েছিল। উপর-নিচে, ডানে-বামে—এই দেয়ালটা জুমারের ঘরের সেই বোর্ডের চেয়েও অনেক বেশি ঠাসা আর গোছানো ছিল।


সাদির ভ্রু জোড়া দুশ্চিন্তায় কুঁচকে এক হয়ে গেল। সে বেশ মন খারাপ করে মুখ ঘুরিয়ে ওনার দিকে তাকাল।


“তার মানে, আপনি গত দুই সপ্তাহ ধরে এই বেসমেন্টে বসে বসে এই কাজগুলোই করছিলেন?”


“কোনো আপত্তি আছে?” সে বাটিতে রাখা মৌরির দানা তুলে মুখে দিতে দিতে একটুও না ঘুরে জবাব দিল। সে তখনও সাদির দিকে তাকায়নি।


“কিন্তু আপনি আসলে করতে কী চাইছেন?” সে ওনার একদম পাশে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো সরু করে ওনার মুখের ডানপাশটা দেখল। ছোট করে ছাঁটা চুল আর এক পরম গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যে ভরা সেই সোনালি-হলুদ চোখ দুটো, যার প্রতিচ্ছবি এখন ওই দেয়ালেও স্পষ্ট ভেসে উঠছিল।


“যা সারাজীবন করে এসেছি—তদন্ত!” সে একটা লাল মার্কার পেন হাতে নিয়ে দেয়ালটার দিকে এগিয়ে গেল। একটা কাটিং সেখানে গুঁজে দিল আর মার্কার দিয়ে তার ওপর একটা মস্ত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিল। তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বেশ গুরুত্বের সাথে সাদির দিকে তাকাতে লাগল।


“তা তুমি হঠাৎ কীভাবে এলে?”


কিন্তু সে এখন ঘাড় ঘুরিয়ে টেবিলের এক কোণায় রাখা ব্যাগটার দিকে তাকাচ্ছিল, যেটার ভেতর ওনার সদ্য আনিয়ে রাখা নতুন নতুন গানস আর লাইভ বুলেট রাখা ছিল। আর এই সবকিছু দেখার পর সাদির মনের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভ ও রাগ দানা বাঁধতে লাগল। সে ওপরের দুনিয়ায় দিন-রাত এক করে ওনার বেগুনাহ হওয়ার প্রমাণ জোগাড় করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছে, আর উনি এখানে নিচে বসে এইসব করছেন! কেউ যদি হুট করে এই সবকিছু দেখে ফেলে, তবে কী হবে?


“এগুলো কি আপনার নামে লাইসেন্স করা?” বড্ড অপছন্দের দৃষ্টিতে ওই গানসগুলোর দিকে তাকিয়ে সে এক তীব্র সন্দেহভরা চোখে ফারিসের মুখের দিকে তাকাল।


“না। যদি গ্রেফতার করতে চাও, তবে করে নাও।” বড্ড তিক্ততার সাথে কথাটি বলে সে টেবিলের কাছে ফিরে এল এবং কাগজপত্রগুলো তুলে অন্য পাশে সরিয়ে রাখতে লাগল।


সাদি এক পরম অসহায়ত্ব নিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।


“দেড় বছর আগে আমিও ঠিক এই কাজটাই করছিলাম। কিন্তু আপনার এই তদন্ত আপনাকে কোথাও নিয়ে যাবে না। এটার সামনে স্রেফ একটা অন্ধ গলি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।”


“তাহলে তুমিই আমাকে শিখিয়ে দাও যে তদন্ত কীভাবে করতে হয়। আমি তোমার সমস্ত classes attend করব।” বড্ড তাচ্ছিল্যের সাথে, নিজের নাকে বসা মাছি ওড়ানোর মতো করে সে কথাটি উড়িয়ে দিল।


সাদি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে রইল। তারপর ঘুরে ওনার একদম সামনে এসে দাঁড়াল।


“যদি আপনি কোনোভাবে জানতেও পারেন যে এই সবকিছু ঠিক কে করেছে, তবুও আপনি এই অস্ত্রগুলো তো এইজন্যই কিনেছেন না—যাতে ওনার সামনে গিয়ে ওনাকে স্রেফ একটা গুলি করে মেরে দিতে পারেন?”


“তুমি কি রক্তের বদলে রক্ত—এই নীতিতে বিশ্বাস করো না?”


“আমি একদম করি! কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়ারও একটা নির্দিষ্ট ভদ্র উপায় থাকে। আপনি আজ ওনাকে মেরে ফেলবেন, কাল ওনার পরিবারের কেউ এসে অন্য কাউকে মেরে দেবে, আর এই প্রতিশোধের চক্র কোনোদিনও শেষ হবে না।” সে বড্ড দুশ্চিন্তা আর বোঝানোর ভঙ্গিতে আলতো করে ফারিসের কনুইটা চেপে ধরল।


“মামু! আমরা ওনাকে শাস্তি অবশ্যই পাইয়ে দেব, কিন্তু একদম আইনি উপায়ে। এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নয়।”


ফারিস এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ নিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।


“আর তোমার এই ‘আমরা’র দলে ঠিক কারা কারা শামিল আছে, সেটা একটু স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করবে কি?”


সাদি ওনার কনুই থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল, নিজের মুখের থুতু গিলল। সামান্য একটু কাঁধ ঝাঁকাল।


“আমি কীভাবে জানব?”


“আমিও তো ঠিক এটাই জিজ্ঞেস করছি। যা তুমি জানো, তা আর কে কে জানে?”


সাদি একটু থেমে, ওনার সাথে চোখ না মিলিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাতে তাকাতে জবাবে বলল—


“I refuse to answer. On the grounds that my answer may incriminate me.”


“ওহ, কাম অন! তুমি এই exemption...”


“...আইনগত সাক্ষ্য আইনের আর্টিকেল ১৫-এর অধীনে পেতে পারো না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি জানি, ফুপ্পু!” সাদি হেসে উঠল।


ফারিস সত্যি নিজের ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে এক পরম বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকাল।


সাদি নিজের কাঁধ ঝাঁকাল। “জুমার ফুপ্পুর ভাতিজা তো আমি, আখেরে টুকটাক আইন তো আমিও জানি।”


ফারিসের মুখের অভিব্যক্তি এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। সে বেশ গম্ভীর হয়ে আবার দেয়ালের দিকে ঘুরে গেল।


সাদির মুখের হাসিটাও আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। “কী হলো, মামু?”


“তোমার ফুপ্পু আমার সাথে যা যা করেছে, তা আমি কোনোদিনও ভুলিনি। তাই ভালো হবে, আমরা যেন ওই দিকে আর না যাই। চা খাবে?”


সাদির মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু সে নিজের ঠোঁট দুটো একবার খুলে আবার বন্ধ করে নিল। তারপর মাথা নাড়ল।


“জি, খাব।”


এবং একটা চেয়ার টানতে লাগল।


“ওপরে কিচেনে সব জিনিসপত্র রাখা আছে। বানিয়ে নিয়ে এসো। আমার জন্য দুই কাপ, চিনি ছাড়া।”


সে যে বসতে যাচ্ছিল, থমকে গেল। বেশ অভিমানী চোখে ওনার দিকে একবার তাকাল এবং “খুব ভালো!” বলে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।


ফারিস বরাবরের মতোই মাথা নিচু করে কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।


অ্যানেক্সির কিচেনটা লাউঞ্জের সাথেই যুক্ত ছিল—একদম ওপেন কিচেন। সে চা তৈরির জিনিসপত্র খুঁজে নিল। চুলাটা জ্বালাল। পানিতে চায়ের পাতা দিতেই ওটা ফুটে উঠল।


তারপর সে জানালার দিকে তাকাল। জানালার গায়ে কোনো পর্দা ঝুলছিল না। জানালার কাচের ওপর রঙিন গিফট পেপার আঠা দিয়ে লাগিয়ে এক অদ্ভুত সস্তা উপায়ে পর্দা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আর এই বাড়িটার এই হাল দেখে যে কেউ বুঝবে—জারতাশা সত্যিই এক চরম অগোছালো আর আনাড়ি মেয়ে ছিল।


সাদি জানালাটা একটু খুলতেই সামনে কারদার প্রাসাদের পেছনের অংশটা স্পষ্ট ধরা দিল। হাশিম একটা বল শূন্যে ছুঁড়ে মারছিল, আর ওটা মুখ দিয়ে ক্যাচ করে কুকুরটা সোনিয়ার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। সোনিয়া হাসতে হাসতে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল।


সাদির মুখের ওপর এক গভীর কষ্টের ছায়া নেমে এল। সে ধড়াম করে জানালাটা বন্ধ করে দিল। এক তীব্র শব্দে ওটা আটকে গেল।


একটা পুরো সপ্তাহ কেটে গেছে সে হাশিমের ফাইলগুলো নিজের হস্তগত করেছে, অথচ এক চরম অসহায়ত্ব নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছে। ওকে যত দ্রুত সম্ভব প্রমাণ জোগাড় করে হাশিমের মুখোমুখি হতে হবে, যাতে জুমার আর ফারিসের ভেতরের এই ভুল বোঝাবুঝি চিরতরে দূর হয়ে যায়।


মনে মনে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা সাজাতে সাজাতে সে চা নিয়ে নিচে নেমে এল। দেখল, ফারিস তখনও নিজের সেই ঠাসা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে, চোখ দুটো সরু করে গভীর কোনো ভাবনায় মগ্ন সে।


হঠাৎ সে ‘ইলিয়াস’ নামের এক ব্যক্তির ছবির ওপর আঙুল দিয়ে ঠকঠক করে আওয়াজ করল।


“এ ব্যাটা সিদ্দিকের বস ছিল, আর সে-ই ওয়ারিসের কাছ থেকে ইস্তফাপত্র চেয়েছিল। এই নোংরামির প্রতিটি সুতো এই লোকটার সাথেই গিয়ে জুড়েছে। এই ইলিয়াস নিশ্চয়ই কিছু না কিছু জানে।”


সে এক সমর্থন খোঁজার দৃষ্টিতে সাদির দিকে তাকাল। সাদি স্রেফ নিজের কাঁধ ঝাঁকাল আর চায়ের কাপটা ফারিসের দিকে বাড়িয়ে দিল।


ফারিস চায়ের কাপে একটা চুমুক দিল, তারপর বড্ড বিস্বাদ মুখে ওর দিকে তাকাল।


“এটায় তো চিনি দেওয়া!”


“ওহ, আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম। সরি!” সাদি বড্ড নিষ্পাপ মুখে ক্ষমা চাইল। চেয়ারে বসে সে নিজের কাপ থেকে অল্প অল্প করে চুমুক দিতে লাগল।


ফারিস ওর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে একটা মাথা ঝাঁকাল, তারপর আবার দেয়ালের দিকে মনোযোগ দিল।


সেখানে সেঁটে রাখা ছবিগুলো এতক্ষণ ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছিল, কিন্তু হুট করেই যেন সেগুলোর মাঝে এক টুকরো রঙ ফুটে উঠতে লাগল। যেন একটা রংধনু চারপাশটা ছেয়ে গেল আর এক তপ্ত বসন্তে আচমকা বাহারি হাওয়া নেমে এল।


ফারিস একদম নিঝুম হয়ে ওই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে নড়াচড়া করতে শুরু করল—যেন চার বছর আগের সেই পুরনো দৃশ্যগুলো আবারও ওনাদের চারপাশে জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে।


শশশ...


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


“Shehar ki chaukhat par raat gaye tak uljhe rehna hai... malboob khayalon mein chaar hawa mein chalte rehna...kya qabal



শহরের দোরগোড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা অস্পষ্ট চিন্তাগুলোর মধ্যে

চারদিকে বাতাসে ভেসে বেড়ানো — 


এর মানে কী?


“কাবাল”



ওয়ারিসের শেষ সাতটি দিন,,,,,


কাসর-এ-কারদার (কারদার প্রাসাদ)-এর লিভিং রুমের উঁচু জানালাগুলো গলে দুপুরের কড়া রোদ ঘরের ভেতর ঠিকরে পড়ছিল। অওরঙ্গজেব কারদার বড্ড বিরক্ত মুখে আর ক্ষুব্ধ চোখে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছিলেন। কথা শেষ হতেই তিনি নিজের মোবাইল ফোনটা ছুঁড়ে মারার ভঙ্গিতে সোফার ওপর আছাড় দিলেন। নিজের টাইয়ের নটটা একটু আলগা করলেন এবং চরম রাগ চেপে সোফার সামনেই দুই থেকে তিনবার পায়চারি করলেন।


ঠিক তখনই হাই হিল জুতোর ঠকঠক আওয়াজ কানে এল। অওরঙ্গজেব ঘুরে এক ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন।


করিডোর দিয়ে জওয়াহেরাত হেঁটে আসছিলেন। বন্ধ গলার একটা সাদা লং গাউন পরা অবস্থায় ওনাকে বড্ড স্লিম, স্মার্ট, তরুণী আর সুন্দরী দেখাচ্ছিল। নিশ্চিতভাবেই তিনি এইমাত্র কোথাও থেকে ফিরছিলেন। কনুইয়ে ঝুলতে থাকা পার্সটা হেসে টেবিলের ওপর রাখলেন এবং ওনার কাছাকাছি এলেন।


“Good evening!” গাউনের গলার কাছে থাকা বোতামটা দুই আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি এক মিষ্টি হাসি মুখে মেখে অওরঙ্গজেবের দিকে তাকিয়ে রইলেন।


“ফারিসের ভাইয়ের খুনের এই নতুন নাটকটা কী শুরু হয়েছে? পুলিশ কেন আমার বাড়িতে হানা দিচ্ছে?” তিনি বেশ কড়া চোখে ওনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।


“তোমার মানে হলো—তোমার ভাগ্নের সতীন ভাইয়ের খুনের রহস্যটা কী, আর পুলিশ কেন তোমার বাড়ির অ্যানেক্সিতে হানা দিচ্ছে? ওহ সরি! ভাগ্নে শব্দটা তো তুমি বহু বছর আগেই ফারিসের জীবন থেকে মুছে দিয়েছ।”


“জওয়াহেরাত!” তিনি বড্ড রাগ নিয়ে গর্জে উঠলেন, তবে ওনার এই রাগের পেছনে এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক দুর্বলতা স্পষ্ট লুকিয়ে ছিল।


“একদম নিশ্চিন্ত থাকো। কোনো সমস্যা নেই। কিছু মানুষ ওর ভাইয়ের সুইসাইডকে খুন বলে দাবি করছে আর তার দায় ফারিসের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। এটা তো ঠিক যে ফারিস খুনের সময় ওই পার্টিতে উপস্থিত ছিল না।”


তিনি বড্ড মায়াবী গলায় কথাগুলো বলতে বলতে সামনে এগিয়ে এলেন। ঘরের কোণায় রাখা বড় অ্যাকোয়ারিয়ামটার কাছে এসে দাঁড়ালেন। ঘাড় নিচু করে ভেতরের দিকে তাকালেন।


“আর এটাও তো সত্যি যে ওয়ারিসের মোবাইলটা ফারিসের গাড়ি থেকেই উদ্ধার হয়েছে।”


দুই আঙুল দিয়ে অ্যাকোয়ারিয়ামের কাচে আলতো টোকা দিতেই ভেতরের মাছগুলোর মধ্যে একটা ছটফটানি শুরু হয়ে গেল। জওয়াহেরাত হাসলেন।


“আর হ্যাঁ, যে দড়িটা দিয়ে ওয়ারিসের হাত-পা বাঁধা হয়েছিল, সেটাও তো ফারিসের ওখান থেকেই পাওয়া গেছে, আর সে তো আখেরে ফারিসের সতীন ভাই-ই ছিল...”


তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। স্ট্যান্ডে রাখা ফিশ ফুডের জার থেকে এক মুঠো খাবার নিলেন আর পানির ওপর ছড়িয়ে দিলেন। সমস্ত দানাগুলো পানির বুকে ভেসে উঠল।


“কিন্তু এই সবকিছুতে কী-ই বা যায় আসে? তোমার ভাগ্নের তো স্রেফ বন্দুক জমানোর শখ, ওগুলো ব্যবহার করার শখ তো আর নেই। নিশ্চিতভাবেই এটা একটা সুইসাইড ছিল, কোনো মার্ডার নয়।”


তিনি মাছের খাবার দিয়ে নিজের হাত দুটো টিস্যু পেপার দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে এক চতুর চোখে হেসে ওনার সামনে এসে দাঁড়ালেন।


“তাই না?”


আর ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা অওরঙ্গজেব কারদার এর চেয়ে বেশি কিছু বলার আগেই তিনি ওনাকে ওখানেই ফেলে রেখে সামনে এগিয়ে গেলেন।


দ্রুত পায়ে হেঁটে তিনি করিডোর দিয়ে ভেতরের দিকে চলে এলেন। করিডোরে আসতেই ওনার মুখের সেই মায়াবী হাসিটা এক তীব্র উদ্বেগে রূপ নিল। কন্ট্রোল রুমের দরজাটা খুলতেই ভেতরে বসে থাকা খাওয়ার আর হাশিম দুজনেই চমকে উঠলেন। তিনি দরজাটা বন্ধ করে সরাসরি হাশিমের সামনে এসে দাঁড়ালেন আর এক জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেন।


“তোমার বাবার election campaign এই সবকিছুর কারণে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, আর সে কিন্তু বিন্দুমাত্র খুশি নয়।”


“আমি দেখেছি।” হাশিম বড্ড বিরক্ত হয়ে দেয়ালে বসানো স্ক্রিনগুলোর একটার দিকে ইশারা করল, যেখানে লিভিং রুমের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চলছিল। কোনো সাউন্ড ছাড়া স্রেফ একটা ভিডিও। বাকি স্ক্রিনগুলোয় বাড়ির অন্যান্য অংশের লাইভ ফুটেজ দেখা যাচ্ছিল। লিভিং রুম ছাড়া মেইন গেট, লন আর বাইরের বারান্দার মতো গুটিকয়েক জায়গাতেই শুধু এই ক্যামেরাগুলো লাগানো ছিল।


“আমি কোনোভাবেই চাই না যে সে ফারিসের পাশে গিয়ে দাঁড়াক। তাই যা করার, বড্ড জলদি করো।”


“হাশিম সবকিছু সামলে নেবে। আপনি কেন এত চিন্তা করছেন?” খাওয়ার বড্ড অস্থির হয়ে কথাটি বলে সামনে এগিয়ে এল এবং নিজের চেয়ারের পাশে ঝুঁকে ল্যাপটপের দিকে তাকাতে লাগল, যেখানে সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছিল।


“আজ তুমি সাদি আর ফারিসের সাথে প্রসিকিউটরের কাছে গিয়েছিলে। কী বলল সে?”


“সে ফারিসের বেগুনাহ হওয়ার ব্যাপারে একদম নিশ্চিত, কারণ ফারিসের কাছে ওয়ারিসকে খুন করার মতো কোনো solid কারণ বা motive নেই।”


“তাহলে তো হাশিম, ওকে খুন করানোর আগেই তোমার একটা শক্ত কারণ খুঁজে বের করে ফারিসের ওপর ওটা plant করা উচিত ছিল!” জওয়াহেরাত প্রায় গর্জে উঠলেন।


হাশিম বড্ড রেগে নিজের মায়ের দিকে ঘুরল।


“আমি একজন corporate lawyer, কোনো ভাড়াটে খুনি নই! আর আমি কোনো কিছুই ইচ্ছে করে plan করে করিনি। আপনি খুব ভালো করেই জানেন যে ওটা একটা মস্ত বড় ভুল ছিল, আর এখন আমাকে ওটা fix করতে হচ্ছে।”


একটু থেমে সে ক্ষোভের সাথে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে দুটো দীর্ঘশ্বাস ফেলল।


“আর এই সবকিছু এত সহজে fix হবে না।”


“শুধু ফারিস একাই নয়, খুনের সময় খাওয়ারও ওই পার্টিতে ছিল না।”


ঠিক এই মুহূর্তেই দরজায় একটা আনুষ্ঠানিক নক করে কেউ ওটা খুলে ফেলল। হাশিম আর জওয়াহেরাত যেন এক তীব্র বৈদ্যুতিক শক খেয়ে দরজার দিকে ঘুরলেন। খাওয়ারও নিজের চেয়ার ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।


“Oh, I'm sorry! আমি... আঙ্কেল ডেকেছিলেন তো...”


দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল জারতাশা। চৌকাঠে পা রেখেই সে আবার পেছনের দিকে ফিরে যেতে চাইল।


“আপনারা বোধহয় কোনো জরুরি কথা বলছেন... It's okay. আমি পরে আসব।”


কিছুটা দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে ক্ষমা চেয়ে সে এক কদম পিছিয়ে গেল। সে একে একে সবার মুখের দিকে তাকাল, যা এই মুহূর্তে একদম ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গিয়েছিল।


“আরে না... আমরা তো এমনিই... কথা বলছিলাম।” হাশিম নিজের মুখের থুতু গিলল। মুখে এক জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে সে সামনে এগিয়ে এল, কিন্তু নিজের মুখের উড়ে যাওয়া রঙ আর চোখের ভেতরের তীব্র আতঙ্ক সে কিছুতেই লুকাতে পারছিল না।


“সরি, আমি এভাবেই হুট করে চলে এলাম।” সে কিছুটা লজ্জিত আর এক গভীর ভাবুক ও দ্বিধাদ্বন্দ্বভরা চোখে ওনাদের দিকে তাকিয়ে রইল।


ওনারা নিজেদের ভেতরের ঝামেলায় এতটাই মশগুল ছিলেন যে, সিসিটিভি স্ক্রিনের ফুটেজে ওর আসার দৃশ্যটা খেয়ালই করেননি। উফ!


“আরে কোনো ব্যাপার না। আমরা তো একই পরিবারের মানুষ।” জওয়াহেরাত একটা মলিন হাসি হাসলেন। নিজের জায়গা থেকে তিনি এক ইঞ্চিও নড়তে পারছিলেন না। মেয়েটা আবার কোনো কথা শুনে ফেলেনি তো!


“আঙ্কেল ফারিসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলেন। ওয়ারিস ভাইয়ের কেসের অগ্রগতি ঠিক কতদূর হলো, তা-ই। আমি এটাই আপনাদের কাছে জানতে এসেছিলাম। আমাকে তো এ বাড়ির কেউ কোনোদিন কিছু বলেই না।”


বলতে বলতে সে নিজের বাঁকা নজরটা খাওয়ারের ওপর ফেলল, যে একদম নিঃশ্বাস বন্ধ করে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।


সাউন্ডপ্রুফ দরজাটা খোলার সময় ওনার কানে ঠিক শেষ বাক্যটি এসে আটকে গিয়েছিল—


“শুধু ফারিস একাই নয়, খুনের সময় খাওয়ারও ওই পার্টিতে ছিল না।”


“হুম...” হাশিম নিজের গলাটা খাঁকরে পরিষ্কার করে রুমের বাইরে চলে এল। জারতাশাও কন্ট্রোল রুমের দরজা থেকে সরে এসে করিডোরে দাঁড়াল।


হাশিম কোনো কথা শুরু করার আগে বড্ড সতর্ক চোখে ওকে একবার দেখে নিল। সে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক সুন্দরী, ডাগর কালো চোখ আর স্টেপ কাট চুলের এক মায়াবী মেয়ে ছিল। এই মুহূর্তে সে নিজের ভ্রু জোড়া কিছুটা সন্দেহের সাথে কুঁচকে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল।


“আমরা সবাই খুব ভালো করেই জানি যে ফারিস একদম নির্দোষ। ওর গাড়ি থেকে কিছু একটা পাওয়া গেলেই কোনো কিছু প্রমাণিত হয়ে যায় না, জারতাশা।”


সে বড্ড সামলে নিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিল।


“আর রইল ওদিকের প্রসিকিউটরের কথা, তো সে তো খামখাই ফারিসের ওপর সন্দেহ করে চলেছে আর ওকে বারবার প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য নিজের অফিসে ডেকে পাঠাচ্ছে। প্রসিকিউটর জুমার, ইউ নো! সাদির ফুপ্পু। এই আজ দুপুরেও ফারিস ওখানেই ছিল।”


জারতাশার মনের সেই সন্দেহটা এবার কিছুটা হালকা হলো, আর তার জায়গায় এক তীব্র বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল।


“সে ফারিসের ওপর সন্দেহ করছে?”


“সে ফারিসকে বলেছে যে ও যেন ওর alibi মেয়েটার সাথে ওনাকে দেখা করিয়ে দেয়। ওনার আসলে ফারিসের বেগুনাহ হওয়ার অকাট্য প্রমাণ চাই। এখন খোদা জানেন আর কতদিন ওই বেচারাকে ওনার অফিসের চক্কর কাটতে হবে! কিন্তু জুমারকে আসলে বোঝাবে কে?”


“তার মানে, যতক্ষণ না ওনার মনে পুরো বিশ্বাস জাগবে, সে ফারিসকে এভাবেই নিজের কাছে ডেকে পাঠাতে থাকবে?” সে বড্ড দ্রুত চতুর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।


“Oh come on!” হাশিম বড্ড গা-ছাড়া ভাব নিয়ে নিজের মাথাটা ঝাঁকাল। “দিনের মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা ওনার সাথে কাটালেই ওনাদের ভেতরের সেই পুরনো প্রেম বা পুরনো অধ্যায় তো আর নতুন করে শুরু হয়ে যাবে না। নিজের স্বামীর ওপর ভরসা রাখো, জারতাশা।”


আর হাশিমের কাছে এই এক একটি শব্দ ছিল যেন তাসের পাতার মতো। আগে-পিছে ওলটপালট করে ও সেগুলোকে নিজের মতো সাজিয়ে নিত—যা খুশি সামনে আনত, যা খুশি লুকিয়ে ফেলত আর নিজের সুবিধামতো একটা অর্থ বের করে নিত।


জারতাশা নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে চরম এক আত্মনিয়ন্ত্রণের সাথে উল্টো দিকে ঘুরে গেল। সে সাথে সাথে ওর পেছন পেছন হেঁটে এল।


“শোনো! তোমারও কি ফারিসের ওপর কোনো সন্দেহ আছে? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সে ওই সময় পার্টিতে উপস্থিত ছিল না, কিন্তু...”


ওনারা দুজনে একসাথে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হাশিম নিজের তাসের পাতাগুলো আবার নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু সে এক ঝটকায় ওর দিকে ঘুরল।


“শুধু ফারিস কেন? খাওয়ারও তো ওই সময় পার্টিতে ছিল না। তবে পুলিশ কেন শুধু ফারিসের পেছনেই হাত ধুয়ে পড়ে আছে?”


সে কন্ট্রোল রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে যা শুনেছিল, তা একবারে উগরে দিল।


কিন্তু হাশিমও একদম প্রস্তুত ছিল। সে বেশ অবাক হওয়ার ভান করে নিজের মাথা নাড়ল।


“সত্যিই বড্ড অদ্ভুত ব্যাপার। আমিও এইমাত্র আম্মুকে ঠিক এই কথাই বলছিলাম যে খাওয়ারও তো ওই সময় ওখানে ছিল না, আর ও ছাড়া আরও কিছু মানুষও তো অনুপস্থিত ছিল, কিন্তু...”


“আর কে কে ছিল না?” সে বড্ড দ্রুত ওর কথার মাঝখানেই কেটে জিজ্ঞেস করল।


“এই তো আমাদেরই কিছু চেনা-পরিচিত বন্ধু-বান্ধব। কিন্তু আমার দেওয়া পার্টি তো আর কোনো মাপকাঠি নয় যে—যে মানুষটা ওই পার্টিতে উপস্থিত থাকবে না, সে-ই খুনি হয়ে যাবে আর তার ওপরই সন্দেহ করা হবে! You know what, ফারিসের ওপর এই সন্দেহ আর প্রসিকিউটরের এই অন্তহীন তদন্ত—এই সবকিছু সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে।”


“আমি ওসব জানি না।” সে এক গভীর মানসিক অস্থিরতা নিয়ে ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।


হাশিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওকে চলে যেতে দেখতে লাগল।


সে রুমে ফিরে আসতেই এতক্ষণ দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়াহেরাত মুখ খুললেন। যতক্ষণ না হাশিম দরজা বন্ধ করে ওটায় লক লাগাল, ততক্ষণ তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তারপর সে এক গভীর শ্বাস নিয়ে ওনাদের দুজনের দিকে ঘুরল।


“সে আমাদের ক্ষতি করতে পারে, এমন কোনো কথাই শুনতে পায়নি।”


“আমার নার্ভ এবার জবাব দিয়ে দিচ্ছে, হাশিম!” জওয়াহেরাত প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। “এই সব নোংরামি এবার চিরতরে খতম করো। ফারিসের ওপর সমস্ত দোষ প্রমাণ করিয়ে দাও। ওকে জেলের ভেতরে পাঠানোর পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করো, যাতে আমি অন্তত রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারি।”


“আমি জানি।” সে বেশ গম্ভীর গলায় কথাটি বলে খাওয়ারের ল্যাপটপের কাছে এগিয়ে এল এবং এক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল।


“কাজ কতদূর এগোল?”


“হয়ে গেছে, স্যার।” সে বড্ড বাধ্য ছেলের মতো ল্যাপটপের স্ক্রিনে ওকে কিছু একটা দেখাতে লাগল।


জওয়াহেরাত সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক পরম দুশ্চিন্তা আর ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি ওনাদের দুজনকে দেখতে লাগলেন।


“তোমরা দুজন আসলে কী plan করছ?”


বাইরে লনের ঘাসের ওপর জারতাশা বুকের ওপর দুই হাত বেঁধে, মাথা নিচু করে এক অদ্ভুত মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আচমকা কিছু গলার আওয়াজ পেয়ে সে থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল।


লনের এক কোণায় একটা কৃত্রিম ঝরনা তৈরি করা ছিল। ওটা এই মুহূর্তে বন্ধ ছিল আর তার পাথুরে ধাপের ওপর শেহরিন বসে ছিল। টাইটসের সাথে একটা লাল কাফতান স্টাইলের শার্ট পরে সে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে মাথা নিচু করে নিজের মোবাইলে আঙুল চালাচ্ছিল।


জারতাশা এক মুহূর্তের জন্য ভাবল—ওর এই চমৎকার শার্ট, গলার দামি মালা, কবজির এই সুন্দর ব্রেসলেট আর ওনার এই রাজকীয় জুতোজোড়া... এগুলো ঠিক কোন কোন নামী ব্র্যান্ডের হবে?


কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটা দূর করল আর ওর দিকে এগিয়ে গেল।


“শেহরিন...”


শেহরিন কিছুটা চমকে উঠে মাথা তুলল। তারপর নিজের চোখ দুটো সরু করে ওর দিকে তাকাতে তাকাতে মুখের ওপর চলে আসা সোনালি চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে সরিয়ে দিল।


“Hello, জারতাশা!” সে বেশ দেমাক ও আভিজাত্যের সাথে হাসল।


“তুমি কি আমাকে সোনিয়ার বার্থডে পার্টির ভিডিওর কপিটা দিতে পারো? আমার আসলে কাজিনদের তোমার ওই সুন্দর শাড়িটা দেখানোর বড্ড শখ। তোমার কাছে নিশ্চয়ই কোনো extra copy থাকবে?”


“Sure! খাওয়ার আমাকে এক গাদা সিডি এনে দিয়েছিল। আমি আমার মেড অঞ্জুর হাত দিয়ে ওটা তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”


সে এক পরম অহংকারের সাথে নিজের কাঁধ ঝাঁকাল।


জারতাশা বেশ ভদ্রভাবে একটা “থ্যাংকস” জানিয়ে ওখান থেকে সামনে এগিয়ে গেল।






চলবে,,,,,,





Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)