নামাল-(Namal) অধ্যায়:১০ পর্ব ৪৩, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)

 




#নামাল-(Namal)

#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 
 
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 


অধ্যায়:১০

পর্ব :-৪৩


Aks chunne mein umr guzri hai... Aisa toota hai aaina mujh se

[প্রতিবিম্ব কুড়াতেই যেন সারাটা জীবন কেটে গেল... আয়নাটা আমার হাত থেকে আজ এমনভাবেই ভেঙেছে!]

---

ছোট বাগানওয়ালা বাড়িটার লাউঞ্জে টিভির আওয়াজ তখনো পুরোদমে চলছিল আর হানিন না-সূচক মাথা নাড়তে নাড়তে এদিক-ওদিক চক্কর কাটছিল।

হঠাৎ সে থামল আর বেশ কড়া নজরে সোফায় বসে থাকা সাদিকে দেখল।

“উনি মিথ্যে বলছেন।”

“তুমি কি কিছুক্ষণের জন্য জুমার আর তোমার ভেতরের সব ডিফারেন্সেস ভুলে গিয়ে ওনার দিক থেকে নিউট্রাল হয়ে একটু ভাবতে পারো না?” সে যেন বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

হানিন মাথা নাড়তে নাড়তে ওর সামনে এসে বসল।

হাত দিয়ে কপালের ওপর ঝুলে থাকা ছোট করে ছাঁটা চুলগুলো সরিয়ে দিল, যা আবার ওখানেই এসে পড়ল।

“উনি আসল সত্যিটা লুকাচ্ছেন। এটা পসিবলই না যে কোনো নেগেটিভ রিজন ছাড়া উনি মামুর সাথে বিয়েতে রাজি হয়ে যাবেন।” সে কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারছিল না।

“আমার মনে হয় উনি বড় আব্বার রিকোয়েস্টে এমনটা করছেন আর মনে মনে হয়তো এখনও মামুর ওপর ক্ষোভ আছে। হয়তো উনি সত্যিটা খুঁজছেন, আমাদের ওনাকে সাপোর্ট করা উচিত, সন্দেহ করা নয়।”

“ওহ গড! আপনারা কেন দেখতে পাচ্ছেন না?” সে চরম বিস্ময়ে পুরো আকাশ থেকে পড়ল।

“উনি জুমার ইউসুফ, ওনাকে কেউ ফোর্স করতে পারে না। উনি ফারিস মামুর কোনো ক্ষতি করতে চান, এ ছাড়া আর কোনো রিজন হতেই পারে না।”

“উনি আমাকে নিজের মুখে ওনার word দিয়েছেন যে উনি ফারিসের কোনো ক্ষতি করবেন না।” সে প্রতিটা শব্দে বড্ড সিরিয়াসনেস মিশিয়ে বলল।

হানিন চুপ হয়ে গেল।

বুকের ওপর দুহাত শক্ত করে বেঁধে সে বেশ অস্থির ভঙ্গিতে নখ কামড়াতে লাগল।

কিন্তু কয়েক পলক পরেই মুখ থেকে আঙুল বের করে সে একদম ফাইনাল টোনে বলল, “তাও আমি ওনাকে ট্রাস্ট করতে পারছি না।”

“এবার থামো তো হানিন!” নুদরাত কিচেন থেকে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন।

হাতে খুন্তি ছিল, যেন ওটা দিয়ে হানিনকে একটা বাড়ি মারবেন।

ওদের দুজনের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে উনি যখন বলতে শুরু করলেন, তখন ওনাকে ভীষণ বিরক্ত লাগছিল।

“তোমার কি কোনো কমন সেন্স আছে? ও যখন সবার সাথে খারাপ বিহেভ করত তখনো তোমার প্রবলেম ছিল, আর এখন যখন ও নিজে থেকে কিছু বলছে না তখনো তুমি ওর পেছনেই লেগে আছ। ও যখন নিজের সব অ্যালিগেশনস উইথড্র করে নিয়েছে, তখন এবার ওকে মাফ করে দাও।”

“কিন্তু উনি কীভাবে এত হাসিমুখে মামুকে বিয়ে করতে পারেন?” হানিন এবার কিছুটা নিচু স্বরে বলল।

আনকনশাসলি সে একটা কুশন টেনে নিজের বুকের কাছে ধরল।

ওদিকে আম্মু খুন্তি ঘোরালেন আর সে ওদিকে কুশনটাকে নিজের ঢাল বানাল।

“কারণ ওর মাথায় তোমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি আছে।” উনিও যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলেন।

“ও অসুস্থ বাছা, ওর কিডনি ড্যামেজড আর বড় আব্বাও আগের চেয়ে অনেক বেশি অসুস্থ থাকেন। (হানিন আস্তে করে কুশনটা ছেড়ে দিল।) ও খুব ভালো করেই বোঝে যে ফারিসের চেয়ে বেটার রিলেশন ও আর কোথাও পাবে না। তাই ও সারেন্ডার করেছে। এইভাবে ও নিজের আগের করা ভুলের পেন্যান্স করতে যাচ্ছে। তো তোমরা দুজন কেন অকারণেই খুঁত খুঁজছ?”

“না, আমার তো এখন আর কোনো অবজেকশন নেই।” সাদি তড়িঘড়ি করে দুই হাত ওপরে তুলে দিল আর সাবধানে ওই খুন্তিটার দিকে তাকাল যা এখনও আম্মুর কোমরে রাখা হাতে ধরা ছিল।

হানিন একদম নিশ্চুপ হয়ে ঠোঁট কামড়াতে লাগল।

মুখের সেই ক্ষোভটা এখন অনুশোচনা আর লজ্জিত ভাবে বদলে গিয়েছিল।

“আচ্ছা। ঠিক আছে। ” ব্যস, এতটুকু বলেই সে উঠে ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেল।

নুদরাত বড্ড আফসোস নিয়ে ওর চলে যাওয়া দেখতে লাগলেন।

“ওর কী হয়েছে সাদি? ও তো আগে এমন ছিল না।”

সাদি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রিমোটটা তুলে নিল।

“আম্মু... আমাদের মধ্যে কেউই তো আগে এমন ছিল না।”

নুদরাত  মুখে মুখে কিছু একটা বিড়বিড় করতে করতে ঘুরে চলে গেলেন।

সাদি ওখানেই বসে রইল।

তারপর টিভি বন্ধ করে নিজের রুমে চলে এল।

সায়াম ওর ল্যাপটপে বসে কোনো একটা গেম খেলছিল।

“আপনার কি কম্পিউটার লাগবে ভাইয়া?” ওকে আসতে দেখে সে বড্ড বাধ্য ছেলের মতো জিজ্ঞেস করল।

“উঁহু, তুমি বসো। সে ঝুঁকে স্টাডি টেবিলের নিচের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট বক্স বের করল আর আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।

পাল্লাটা খুলে বড্ড সাবধানে বক্সের ঢাকনাটা আলমারির ভেতরে রেখেই সরাল।  (Sayam দূরে ছিল, ওর মুখটা এদিক পানে ছিল না।)

বক্সের ভেতরে একটা প্লাটিনাম আর হিরের ঝলমলে নেকলেস রাখা ছিল।  Jawaherat সেই নেকলেস, যা ওনাকে রিটার্ন করতে হতো।)

আর সাথে ছিল একটা সাদা রঙের ফ্ল্যাশ ড্রাইভ।

সে ড্রাইভটা বের করে নিয়ে বক্সটা আলমারির ভেতরে লুকিয়ে রাখল এবং বাইরে বেরিয়ে এল।

হানিন নিজের বেডে বসে একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল, যখন সাদি এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়াল।

“এই ফাইলগুলো আমার পিসিতে ওপেন হচ্ছিল না। তুমি কি এগুলো একটু ওপেন করে দেবে?”

সে চমকে উঠল।

ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল।

চোখে এক তীব্র বিস্ময় খেলে গেল।

“আমি... আপনাকে তো আগেই বলেছি ভাইয়া, আমি এখন আর এই সব জিনিস ইউজ করি না।”

“কয়েক দিন এটা তোমার কাছে রাখো। যদি মুড হয় তবে করে দিয়ো, নয়তো ব্যাক করে দিয়ো। কিন্তু এটা রাখো আর ভাবো যে তুমি কি আমার হেল্প করতে চাও কি না।” সে ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে রাখল।

হানিনের চোখে এক অভিমানী ক্ষোভ ছিল, তাও সে চুপচাপ ওটা হাত বাড়িয়ে লুফে নিল।

সাদি চলে গেলে সে উঠে আলমারির কাছে এল, একদম নিচের জুতো রাখার ড্রয়ারটার কাছে বসল।

একটা বড় বক্স বের করল।

ওটাতে সেই ল্যাপটপ, ট্যাবলেট আর এমন আরও অনেক gadgets রাখা ছিল যা অওরঙ্গজেব কারদার ওকে দিয়েছিলেন।

আলিশার লকেটটাও ওখানেই ছিল।

হানিন ওই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটাও সেই সব নিষিদ্ধ জিনিসের সাথে রেখে দিল আর বক্সটা লক করে ভেতরে ঠেলে দিল।

তারপর একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

নতুন করে আর ভাবার কী আছে? যা ডিসাইড করার, তা তো সে আগেই করে নিয়েছে!

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Apne qatil ki zakawat par hairan hoon main... har roz ek naya tarz-e-qatl ijaad kare

[আমি আমার খুনির বুদ্ধিমত্তা দেখে রোজই অবাক হই... সে যেন প্রতিদিন হত্যার এক নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করে!]

---

মে মাসের সেই তীব্র তপ্ত দুপুর যেন পুরো শহরটাকে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছিল।

এমন এক পশ এলাকার সেই রেস্তোরাঁটা একদম ফাঁকা লাগছিল।

দূরে একা-দোকা কোনো টেবিলে হয়তো লোক ছিল, নয়তো এই চরম গরম ব্যবসাটাকে একদম ঠান্ডা করে রেখেছিল।

কোঁকড়ানো চুলগুলোকে একটা হাফ ক্লাচে বেঁধে, কনুইতে পার্স ঝুলিয়ে, ব্ল্যাক মিনি কোট আর হোয়াইট ড্রেস পরা জুমার এক মাপা কদমে ভেতরে ঢুকল আর সরাসরি দরজার কাছের একটা টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

গত বছরগুলোর এক দিনে ঠিক এইখানে জারতাশা বসে ছিল, আজ সেই চেয়ারটা একদম খালি।

এক এক্সপ্রেশনলেস ফেস নিয়ে সে বসে পড়ল আর তারপর কবজিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে তাকাল।

ঠিক চারটে বেজে গেছে।

রেস্তোরাঁটা আগের চেয়ে অনেকখানি বদলে গেছে।

কালার, ফার্নিচার, মে বি মেন্যুটাও।

জুমারের অবশ্য আগের প্রতিটা ডিটেইলস মুখস্থ ছিল।

তাই সে নিজের বাদামি চোখ দুটোকে টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটার ওপর ফোকাস করে রাখার ট্রাই করছিল যাতে ঘাড় না নড়াতে হয়।

অন্যথায় মনের ভেতরটা পর্যন্ত ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল।

“Long time ম্যাডাম!” সে চেয়ারটা টেনে সামনে বসতে বসতে বড্ড সিরিয়াস টোনে কথাটা বলতেই জুমার নিজের চোখ দুটো ওপরে তুলল।

ওদের লাস্ট মিটিংয়ের সেই সিনটা চোখের সামনে ঝলমল করে উঠল—জেলের সেই ভিজিটিং রুম আর টেবিলের ওপাশে সাদা কুর্তা-শলোয়ার আর শক্ত করে পনিটেল বাঁধা ফারিস।

(আমি... ক্ষমা... চাইব না!)

তারপর সিনটা আবার চেঞ্জ হলো, চার বছর আগের জারতাশা স্ট্র দিয়ে জুস খেতে খেতে ঠিক এইখানে বসে ছিল আর এখন... এখন সে ফুল স্লিভ টি-শার্ট পরা, দুই হাত একসাথে মিলিয়ে টেবিলের ওপর রেখে, ছোট করে ছাঁটা চুলের সাথে নিজের হালকা সোনালি চোখ দুটো ছোট করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

এই তিনটে সিনের মধ্যে জারতাশা, জেলের ফারিস আর এখনকার ফারিস—এই সবার মাঝে যদি কমন কিছু থেকে থাকে, তবে তা ছিল জুমার নিজে।

ঠিক একই চুল, একই ব্ল্যাক কোট আর একই হোয়াইট ড্রেস।

সবাই যেন লাইফে আগে বা পেছনে এগিয়ে গেছে, স্রেফ ওর নিজের লাইফটাই এক জায়গায় থমকে ছিল।

“Long time ফারিস!” ওয়েটার এসে মেন্যু কার্ড সামনে রাখল।

জুমার কফি অর্ডার করল।

ফারিস কিছুই অর্ডার করল না।

“তো কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন আমার সাথে?” ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সে বড্ড ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।

“আপনার বাবা আমাকে বলেছেন যেন আমি আপনাকে বিয়ে করে নিই।” ওর রিয়্যাকশন দেখার জন্য সে একটু থামল।

জুমার হালকা মাথা নেড়ে সায় দিল।

“আমি জানি। উনি মিসেস কারদার -এর রিকোয়েস্টে এমনটা করেছেন আর মিসেস কারদার করেছেন আমার রিকোয়েস্টে।”

ফারিস চরম বিস্ময়ে নিজের মুখটা কিছুটা পেছনে সরিয়ে নিল।

চোখের মণি ছোট করে ওর দিকে তাকাল।

ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জুমার নিজের ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে ধরল।

“কেন, আপনার কী মনে হয়েছিল? আমি মিথ্যে বলব? অ্যাক্টিং করব? সবার সামনে এটা দেখাব যে আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি বা আপনাকে ইনোসেন্ট ভাবি আর মন থেকে এই বিয়েতে রাজি হয়েছি?”

সামান্য একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সে মাথা নাড়ল।

“আপনি আমাকে বিন্দুমাত্র চেনেন না ফারিস!”

সে সোফার পিঠে হেলান দিয়ে বসে এক সন্ধানী ও সন্দেহী নজরে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

সে সত্যিই আশা করেনি যে মেয়েটা নিজে থেকেই সবকিছুর এভাবে কনফেশন দিয়ে দেবে।

“আপনি মিসেস কারদার-কে এমনটা করতে কেন বললেন?”

“কারণ আমি কয়েক দিন আগেই জানতে পেরেছি যে আপনি আমার জন্য বিয়ের প্রপোজাল পাঠিয়েছিলেন আর আমার আম্মু রিফিউজ করেছিলেন। এর আগে এতগুলো বছর ধরে আমি স্রেফ এটাই ভেবে এসেছি যে আপনি আমাকে জাস্ট একটা অবজেক্ট মনে করে ইউজ করেছেন, collateral damage হিসেবে। কিন্তু এখন আমি জানতে পেরেছি যে এটা একটা পার্সোনাল ওয়ার ছিল। আমি কোনো ভিকটিম ছিলাম না, রিভেঞ্জ নিয়েছিলেন আপনি আমার ওপর।” সে যেন কোনো নিউজ পড়ার মতো একঘেয়ে সুরে বলে গেল।

কফি চলে আসতেই সে কাপটা তুলে নিল।

ফুটন্ত গরম লিকুইডটা ঠোঁটে ছোঁয়াল।

“আচ্ছা। তারপর?” সে নিজের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ওর ওপর ফোকাস করে রেখেছিল।

“আর আমি এটাও জানি যে বড় আব্বা তখন থেকে এখন পর্যন্ত আমার বিয়ে আপনার সাথেই দিতে চান। সো আমি মিসেস কারদার-কে বলেছি যেন উনি এটা করিয়ে দেন। আমি বিয়ের জন্য একধম তৈরি। কফিটা বেশ ভালো।” তারিফ করে সে কাপটা আবার জায়গায় রেখে দিল।

“হুম। আর কীসের জন্য?” জবাবে জুমার খুব হালকা করে কাঁধ ঝাঁকাল।

“এটাই একমাত্র রাস্তা যার থ্রুতে আমি আপনার মুখ থেকে আপনার ক্রাইমের কনফেশন করাতে পারি। আর আমাকে এটাই করাতে হবে।”

“তো আপনি যদি আমার ওপর রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য বিয়ে করতে চান, তবে আমাকে কেন বলছেন?”

“কারণ আপনার মতো আমি পেছনে ছুরি মারার মানুষ নই। আমি আপনাকে আগে থেকেই warn করে দিচ্ছি। আমি এই বিয়েটা স্রেফ আপনার অপরাধ স্বীকার করানোর জন্যই করছি। সো আপনি চাইলে এই বিয়ে নাও করতে পারেন আর আমার বড় আব্বাকে ডিরেক্ট রিফিউজ করে দিতে পারেন। ডিসিশন আপনার।” কাপের মুখে বুড়ো আঙুল বোলাতে বোলাতে সে বলছিল।

ফারিসের চোখে এক তীব্র বিরক্তি আর অপছন্দ ফুটে উঠল।

“এই অপশনের জন্য থ্যাংকস। কিন্তু আমি কি এখন এমন পজিশনে আছি যে উনি নিজের মুখে বলার পর ওনাকে রিফিউজ করে দেব?”

জুমার আলতো করে কাঁধ ঝাঁকাল।

“আমার আপনাকে ইনফর্ম করার দরকার ছিল, আমি করে দিয়েছি। আমাকে বিয়ে করলে একদিন না একদিন অপরাধ স্বীকার করতেই হবে। আগে আপনার মর্জি।” কাপটা তুলে নিয়ে আরও এক চুমুক দিল।

এক পরম শান্ত ও স্যাটিসফাইড চোখ ফারিসের ওপর জমে ছিল।

ফারিস সামনে এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর হাত রেখে ওর দিকে একটু ঝুঁকে বসল।

“Are you challenging me?”

“সত্যিটা জানাচ্ছি!”

“আর এই সত্যিটা আরও কতজনকে জানানোর ইচ্ছে আছে আপনার?”

“আপনি যদি ওই ক্রাইমটা না-ই করে থাকেন, তবে আপনার টেনশন করার কোনো দরকার নেই।” কাপটা দূরে সরিয়ে সে ব্যাগের স্ট্র্যাপটা কাঁধে তুলে নিল।

এক শীতল হাসি হেসে বলল, “আর যদি বিয়েতে আপনার কোনো অবজেকশন না থাকে, তবে এতটুকু খেয়াল রাখবেন যেন আমার ভাগ্নে আর আমার বড় আব্বা এই পুরো ম্যাটারটা থেকে একদম দূরে থাকেন যা আমাদের মধ্যে ডিসকাস হয়েছে। এই সব কিছুর মাঝে ওনারা যেন বিন্দুমাত্র হার্ট না হন।”

“Sure!” সে বড্ড তিক্ততার সাথে ঘাড় নাড়ল।

“আর কোনো কোশ্চেন না থাকলে আমি কি আসতে পারি?” আর পার্সটা হাতে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল, চেয়ারটা পেছনে ঠেলে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরল।

“স্রেফ একটা কোশ্চেন ম্যাডাম!” সে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করতে করতে উঠল।

মাথা নিচু করে কয়েকটা নোট বের করে টেবিলের ওপর রাখল আর মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল।

সে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল।

“আমার এগেইন্সটে এই সমস্ত অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যদি আপনি হুট করে জানতে পারেন যে আমি নির্দোষ ছিলাম , তবে কী করবেন আপনি?”

জুমার  যে ওর ডাকার কারণে থমকে গিয়েছিল, সে পার্সের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে কয়েক পলক ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“আমরা দুজনেই খুব ভালো করে জানি যে আপনি নির্দোষ নন!”

তারপর সে ঘুরল আর বড্ড দ্রুত পায়ে বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ওর কাছে হয়তো এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না, নয়তো সে এই উত্তরটা কখনো ভেবেই দেখেনি।

ফারিস নিজের কানের লতি মলতে মলতে এক গভীর ও ভাবুক নজরে ওর চলে যাওয়া দেখতে লাগল।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Shubha jo dila dein woh apne hi to mere hain... Ho gila kisi se kyun apni maat ka hi jab

[ভুল ধারণা বা সন্দেহ যারা জাগিয়ে তোলে, তারা তো আমার নিজেরই লোক... তবে নিজের এই পরাজয়ের জন্য অন্য কারোর ওপর কেনই বা অভিমান করব?]

---

কারদার প্যালেসে সে রাতে ডাইনিং হলে খাবার সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

হাশিম প্রধান চেয়ারটার ডান পাশের প্রথম আসনটায় বসে নিজের ন্যাপকিনটা মেলছিল, ঠিক তখনই সে লাউঞ্জের দিক থেকে জওয়াহেরাত  কে আসতে দেখল।

“কার ফোন ছিল?” জওয়াহেরাত এসে প্রধান চেয়ারটায় বসল।

কনুই দুটো টেবিলের ওপর রেখে, দুই হাতের ওপর থুতনিটা জমিয়ে সে মুচকি হেসে ওর দিকে তাকাল।

সে এক ব্ল্যাক প্যান্ট আর হোয়াইট শার্ট পরে মাথা নিচু করে প্লেটটা নিজের দিকে টানছিল।

“ফারিসের।”

প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে হাশিম বড্ড বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঝাঁকাল।

“মুখটা অতটা কালো কোরো না। ও জানাল যে ও জুমারকে বিয়ে করতে রাজি আছে আর আমি যেন জুমারের বাবাকে ইনফর্ম করে দিই।”

“এই ইনফরমেশনটা ওর নিজের বোনকে দেওয়া উচিত ছিল না?”

“ওদেরও দেবে। ও আসলে আমাকে এটাই জাস্ট প্রুভ করতে চাইছিল যে, জুমার ওকে অলরেডি বলে দিয়েছে যে সে নিজে এই বিয়ের কথা তোলার জন্য আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিল।”

কাটাচামচ দিয়ে ভাত মুখের কাছে নিতে নিতে হাশিম মাঝপথেই থমকে গেল এবং চরম বিস্ময়ে ওর দিকে তাকাল।

“জুমার ওকে এই কথা কেন বলতে গেল?”

“ও আমাকে ট্রাস্ট করে না। ওর হয়তো মনে হয়েছে যে আমি এই সিক্রেটটা ওর এগেইনস্টে ইউজ করতে পারি, তাই নিজেই বলে দিয়েছে। আমিও এটা এক্সপেক্ট করিনি, তবে যাই হোক না কেন, মেয়েটা বেশ ক্লেভার।” একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে জওয়াহেরাত সালাদের বাটি থেকে এক চামচ সালাদ নিজের প্লেটে নিল।

“প্রতিশোধ নেওয়ার হাজারটা উপায় আছে। ওর ফারিসকে বিয়ে করার কী দরকার? আমার এই সব নাটক বিন্দুমাত্র পছন্দ হচ্ছে না।” সে চরম অপছন্দ নিয়ে প্লেটের দিকে ঝুঁকে খেতে খেতে বলল।

“তোমার কেন এত খারাপ লাগছে?”

“ও বিয়ের পর সোজা এই...” ভুরু উঁচিয়ে সে জানলার ওপাশের দূর সীমানার সবুজ লনের দিকে ইশারা করল।

“ও এখানে এসে থাকতে শুরু করবে। সকাল-সন্ধ্যা আমাকে ওর মুখ দেখতে হবে। জাস্ট unbearable!” মুখে ভাত রেখেই সে এক ক্ষুব্ধ চোখে চিবোতে চিবোতে বলল।

“এটা আমাদের জন্য আরও বেশি ভালো। তুমি জাস্ট দেখতে যাও।” সে রহস্যময়ী এক হাসি হাসল।

“শেরু কোথায়? ও তো কালকেও ডিনারে ছিল না।” কিছুক্ষণ নীরবতার পর হাশিম সামনের খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“ফ্রেন্ডসদের সাথে বাইরে গেছে বোধহয়।”

“আপনি জিজ্ঞেস করেননি ওর এই নতুন কোন ফ্রেন্ডস জুটেছে?”

“তুমিও তো বলো ওর ওপর যেন বেশি প্রেশার না দিই। সো আমি সাইলেন্ট আছি।”

হাশিম ন্যাপকিন দিয়ে ঠোঁট দুটো মুছল এবং ওটা টেবিলের ওপর একপ্রকার ছুড়ে মারল।

জওয়াহেরাত চমকে ওর দিকে তাকাল।

ওকে বেশ ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছিল।

“ও কি এখনও শেহরিনের ওই ম্যাটারটার জন্য এমন বিহেভ করছে?”

“ঘটনাটার তো মাত্র দেড় সপ্তাহ হলো, এত তাড়াতাড়ি ও নিজেকে কীভাবে সামলাবে? যাই হোক, তুমি একবার কথা বলে দেখো। কারণ আমি যখন কথা বলব, তখন একেবারে ফাইনাল কথা বলব।” এক মৃদু অথচ শীতল গলায় বলে সে আবার খাওয়াতে মন দিল।

“অন্য কোনোদিন দেখা যাবে।” হাশিম টেবিল থেকে সেলফোনটা তুলে, চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দাঁড়িয়ে পড়ল।

তবে ওর চোখে তখনও রাগ আর বিরক্তি স্পষ্ট ছিল।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


To mohabbat se koi chaal to chal... Haar jaane ka hausla hai mujhko

[তবে ভালোবাসার ছলেই না হয় কোনো চাল চলো... হেরে যাওয়ার সাহস তো আমার আছেই!]

---

অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের ওই ফ্লোরটায় ডিম লাইট জ্বলছিল।

সিঁড়িগুলো একদম জনমানবহীন ছিল, তবে লিফটের বাইরের স্ক্রিনে অনবরত নম্বরগুলো চেঞ্জ হচ্ছিল।

হঠাৎ লিফটটা এসে ওখানেই থামল।

এক মৃদু শব্দে দরজাগুলো খুলে গেল।

ভেতর থেকে স্ট্র্যাপওয়ালা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে, জিন্স, টি-শার্ট আর উল্টো করে ক্যাপ পরা আহমেদ বেরিয়ে এল।

কপালের চুলগুলো এবার ক্যাপের ভেতরে গোঁজা ছিল আর ওর চিরচেনা লাপরোয়া মুখাবয়বে সেই একই চেনা এক্সপ্রেশন ছিল।

ঠোঁট দুটো গোল করে এক মৃদু শিস বাজাতে বাজাতে সে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এল।

চাবিটা লক-এ ঘুরিয়ে দরজা খুলে ভেতরে কদম রাখল।

করিডোরে ওভাবেই শিস বাজাতে বাজাতে সে ভেতরে এগিয়ে এল।

লাউঞ্জের টেবিলে ব্যাগটা রেখে ক্যাপটা মাত্র খুলেছে, অমনি আচমকা কারেন্ট খাওয়ার মতো দু-কদম পেছনে ছিটকে গেল।

কিচেন কাউন্টারের উঁচু স্টুলটায় ফারিস ওর দিকে পিঠ করে বসে ছিল।

কনুই দুটো কাউন্টারে জমিয়ে সে একটা সফট ড্রিংকসের ক্যান থেকে চুমুক দিচ্ছিল।

“Oh my God!” আহমেদ এক চরম অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে একবার ওর দিকে, একবার করিডোরের দিকে আর একবার হাতের চাবিগুলোর দিকে তাকাল।

“তুমি কি আমার ঘরের লক ভেঙে ভেতরে ঢুকেছ?”

ফারিস চুমুক দেওয়া অবস্থাতেই একটু থেমে ঘাড় ঘোরাল।

ছোট ফ্ল্যাটটার চারপাশটা একবার দেখে নিল।

“এটাকে ঘর বলে?”

“অ্যাট লিস্ট জেল তো নয়!” সে বেশ রেগে গিয়ে কাউন্টারের কাছে এল এবং ক্ষুব্ধ চোখে ওর দিকে তাকাল।

ফারিস তখনও সেই ধূসর রঙের ফুল স্লিভ শার্টটাই পরে ছিল, যা সে বিকেলবেলা জুমারের সাথে মিটিংয়ের সময় পরেছিল।

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে এন্টার করলে কীভাবে?”

“এই, তামিজ সে! তুমি কি আগে আমাকে ‘আপনি’ করে বলতে না?” সে ওর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ক্যানটা উঁচিয়ে শেষ চুমুকটা গিলে নিল।

“তখন আমরা এত ক্লোজ ছিলাম না।” নিজেই কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজের প্রশ্নের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করে সে ফ্রিজের কাছে এল এবং ওটা খুলে ভেতরে উঁকি দিল।

তারপর দরজাটা বন্ধ করে মুখ বাঁকিয়ে ঘুরল।

“লাস্ট ক্যানটা তোমার ভাগ্যেই ছিল গাজী। এখন বলো, আর কত অস্ত্রশস্ত্র লাগবে?”

সে দ্বিতীয় স্টুলটা টেনে ওর পাশে বসল আর নিজের মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে নিল।

জেল থেকে বেরোতেই ফারিস ওকে ফোন করে কিছু অস্ত্রের কথা বলেছিল, যা সে অলরেডি অ্যারেঞ্জ করে দিয়েছিল।

“অস্ত্র লাগবে না।”

“তাহলে?”

“আমি বিয়ে করছি।” খালি ক্যানটা হাতের মুঠোয় ঘোরাতে ঘোরাতে সে মুখ ঘুরিয়ে আহমেদের দিকে তাকাল।

আহমারের মুখটা প্রথমে হাঁ হয়ে গেল, তারপর সে ওটা বন্ধ করল।

তারপর নাড়া দিয়ে দুই-তিনবার মাথা নাড়ল।

“Good. কনগ্রাচুলেশনস।”

ফারিস ভুরু উঁচিয়ে ‘ব্যস এতটুকুই?’-মার্কা এক লুক দিয়ে ওর দিকে তাকাল।

“আর কী জিজ্ঞেস করব?” সে বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকাল।

তারপর ছাদের দিকে তাকিয়ে একটু ভাবল।

“তা বৈকি, কোন সে অভাগী যার সাথে তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছ?”

ফারিস কয়েক পলক ভাবল, তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।

“পেত্নী একটা।”

“আরে ধুর ভাই!” আহমেদ হাত দিয়ে হাওয়া ওড়াল।

“এখন এতটাও তো খারাপ দেখতে হবে না যে ডিরেক্ট পেত্নী বলে দেবে। আমি জানি এই সব মেয়েরা বলতে বলতে আচমকা ও ব্রেক কষল।

স্টুল থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।

চরম অবিশ্বাস্য চোখে ফারিসের দিকে তাকাল, যে তখনও শান্ত হয়ে বসে ক্যানটা হাতের মধ্যে ঘোরাচ্ছিল।

“ও... ওই পেত্নী? বলো কি ইয়ার! ওই Prosecutor জুমার ইউসুফ?” ওর কাঁধটা ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে সে আবার স্টুলে বসল।

ওর চোখ দুটো তখনও বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে ছিল।

“কিন্তু কেন? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?” সে একনাগাড়ে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ডোরবেল বেজে উঠল।

“খাবার অর্ডার করেছিলাম। নিয়ে এসো, তারপর কথা বলছি।” সে ক্যানটা ডাস্টবিনের দিকে ছুড়ে মারতে মারতে দরজার দিকে ইশারা করতেই আহমারকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠতে হলো।

পনেরো মিনিট পর ওরা দুজনে লাউঞ্জের সোফায় মুখোমুখি বসে ছিল।

টেবিলের ওপর টেক-অ্যাওয়ের বক্সগুলো খোলা পড়ে ছিল আর খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।

“আমার অ্যাডভাইস মানো তো ইমিডিয়েটলি এই বিয়ে রিফিউজ করে দাও। নয়তো জুমার সাহেব তোমাকে এমনভাবে ফাঁসাবেন না, সারাজীবন মনে রাখবে।”

ফারিস বিরক্তি নিয়ে হাওয়া ওড়াল।

“রিফিউজ করতে পারব না। ওনার বাবার অনেক এহসান আছে আমার ওপর। উনি না থাকলে আজ আমি এখানে থাকতাম না।”

“আর ওনার মেয়ে না থাকলে সত্যিই তুমি আজ এখানে থাকতে না!”

“বকো না তো।” সে টিস্যু দিয়ে হাত পরিষ্কার করে সোফায় হেলান দিয়ে বসল।

হাত দুটো সোফার পিঠের ওপর লম্বা করে ছড়িয়ে দিল।

ওপেন কিচেনের দিকে তাকিয়ে সে কিছু একটা ভাবছিল।

“বাই দ্য ওয়ে, একটা কথা ভাবার মতো। ওনার যদি তোমার থেকে...” ফারিস চোখ রাঙিয়ে ওর দিকে তাকাতেই আহমেদ একটু থামল।

“যদি ওনার আপনার থেকে...” (নিজেকে কারেক্ট করে সে কথা জারি রাখল) “ক্রাইমের কনফেশন করাতেই হয় বা আপনাকে কালপ্রিট প্রুভ করতেই হয়, তবে তার জন্য বিয়ে করার কী দরকার? আই মিন, এই কাজটা তো অন্য কোনো ওয়েতেও করা পসিবল, তাই না?”

“আমি খুব ভালো করেই জানি ও কেন বিয়ে করতে চায়! লাস্ট টাইম ও যখন জেলে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল, তখন বলেছিল যে—ভালোই হলো জেল ভাঙো আর বাইরে যাও, আবার বিয়ে করো আর সেই বউটাকেও মেরে ফেলো। তোমরা ওয়াইফ কিলারদের সাইকোলজি... আই ডোন্ট নো, এমন কিছু একটা বলেছিল ও।” সে হালকা মাথা নাড়তেই আহমারের মুখটা হাঁ হয়ে গেল।

“তু... তুমি ওনার চোখে একজন ওয়াইফ কিলার, আর... আর বউকে খুন করা রোগীরা তো সবসময় এটাই করে।” আহমেদ বেশ এক্সাইটেড হয়ে সোফার হাতলে চাপড় মারল।

“ওরা প্রথম খুনের চার্জ থেকে বেঁচে গেলে আবার বিয়ে করে এবং সেকেন্ড বউটাকেও আবার মারার ট্রাই করে। ও ভাবছে যে তুমি ওকেও মারার ট্রাই করবে আর হাতেনাতে ধরা পড়ে যাবে।”

“নো। ও খুব ভালো করেই জানে যে আমি ওকে মারব না। কিন্তু বাকি দুনিয়া তো আর তা জানে না।”

“তার মানে?” আহমেদের বেশ বিভ্রান্ত হয়ে ওর দিকে তাকাল।

সে দুই আঙুল দিয়ে থুতনির দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলছিল।

“ও আমাকে জুমার ইউসুফকে খুনের চেষ্টার অপরাধে ফাঁসাতে চায়। ও ঘটনাগুলোকে নিজের মতো করে সাজাবে। এমনভাবে যেন দুনিয়া বিশ্বাস করে নেয় যে ফারিস গাজী আবারও জুমারকে মারার ট্রাই করেছে। এইবার মানুষ ওর কথা অনায়াসে বিলিভ করে নেবে।”

আহমেদ একদম স্তব্ধ হয়ে যেন সব শুনছিল।

কিছুক্ষণের জন্য ঘরে নীরবতা নেমে এল, তারপর সে যেন একটু শিউরে উঠল।

“সবকিছু জেনেবুঝেও তুমি ওকে বিয়ে করছ? এখনও সময় আছে ইয়ার। ওনার বাবাকে না করে দাও, নয়তো এই শহর ছেড়ে চলে যাও।”

কিন্তু ফারিস না-সূচক মাথা নাড়ল।

“ওর কাছে আমার অপরাধ প্রুভ করার এটাই লাস্ট অপশন। আর আমার কাছে নিজের ইনোসেন্স প্রুভ করার এটাই লাস্ট সুযোগ। আমি এটাকে হাতছাড়া করব না। ও নিজের পুরো ট্রাই করলেও আমাকে ফাঁসাতে পারবে না। আগেরবার ওয়ারিসের খুনিরা যদি আমাকে সেট-আপ করতে সাকসেসফুল হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার ভুল ছিল।” সে বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে থুতনি ঘষতে ঘষতে টেবিলের ওপর ছড়ানো বক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে বলছিল।

“আমার ভাই খুন হয়েছিল, আমার আরও বেশি কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমার বড্ড অহংকার ছিল।” সে এক তিক্ত হাসি হেসে মাথা নাড়ল।

“ভেবেছিলাম আমাকে কেউ ফাঁসাতে পারবে না। তখন পর্যন্ত আমিই মানুষকে অ্যারেস্ট করে এসেছি, আমাকে কে অ্যারেস্ট করবে? কিন্তু এইবার এমনটা হবে না স্টেপনি! এইবার আমি ফুল রেডি।” এক চূড়ান্ত ও গম্ভীর টোনে বলে সে ওর দিকে তাকাল এবং উঠে দাঁড়াল।

আহমেদ তখনও গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।

“ম্যাডাম প্রসিকিউটরের কোনো দোষ নেই।” ফারিস এবার বেশ নরম সুরে ওকে যেন সান্ত্বনা দিল।

“হ্যাঁ, ও তোমাকে ফাঁসির কাঠে ঝুলিয়ে দিলেও বোলো যে ওর কোনো দোষ নেই!” সে মনে মনে বেশ জ্বলে উঠেছিল।

“উঁহু। এটা আমার দোষ। আমার ভাইয়ের শত্রু আর আমার শত্রুরা আমার কারণে আমাকে ফাঁসানোর জন্য ওকে ইনজিওরড করেছে। ও যদি আমাকে কালপ্রিট ভাবে, তবে ও ভুল কিছু ভাবছে না।” চাবি আর ফোনটা তুলে নিয়ে সে করিডোরের দিকে এগিয়ে গেল।

“আমার কী মনে হয় জানো?” পেছন থেকে আহমাদের আওয়াজ আসতেই ওর পা দুটো থমকে গেল।

“আমার মনে হয় এই সব অজুহাত তুমি নিজে বানিয়েছ। ওনার বাবার এহসান, নিজের ইনোসেন্স প্রুভ করার সুযোগ, ওর কষ্টের রিজন তোমার নিজের সত্ত্বা হওয়া—উঁহু, সব বাহানা গাজী!” সে ছড়ানো বক্সগুলো গোছাতে গোছাতে মাথা নিচু করে বলছিল।

ফারিস ওভাবেই মাঝপথে দাঁড়িয়ে রইল।

চোখ দুটো মেইন দরজায় আটকে ছিল আর ঘাড়ের ভেতরে ওঠা-নামা করা স্পন্দনটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

সে খুব ভালো করেই জানত স্টেপনি এখন কী বকতে চলেছে।

“তুমি ওকে পছন্দ করো আর ওকে হারাতে চাও না। এটাই ফার্স্ট রিজন। বাকি সব রিজন এর পরে আসে।”

“বকো না তো!” সে না ঘুরেই এক ধিমে আওয়াজে বলল, দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল আর দরজাটা এক জোরদার আওয়াজে ধপাস করে বন্ধ করে দিল।

বক্সগুলো গোছাতে গিয়ে আহমাদের হাত থেকে কিছু একটা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল।

“আরে ধুর!” সে বিরক্তি নিয়ে করিডোরের দিকে তাকাল।

“সত্যি কথা বলার তো কোনো দামই নেই দুনিয়ায়, স্টেপনি! উঁহু, আহমার।” চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের নামটা কারেক্ট করে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

Kitni ajeeb baat hai jo na chahta tha main... Qismat se is tarah ka muqaddar mila mujhe

[কতই না অদ্ভুত ব্যাপার, যা আমি কখনো চাইনি... ভাগ্যের পরিহাসে ঠিক তেমনই এক তকদির আমি পেলাম!]

---

ইউসুফ সাহেবের বাংলোটা রাতের এই প্রহরে একদম নিশ্চুপ আর উদাস হয়ে পড়ে ছিল।

লাউঞ্জের জানলা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলে চারপাশটা অন্ধকার দেখাত, স্রেফ ইউসুফ সাহেবের হুইলচেয়ারটা ছাড়া, যা তিনি নিজে চালিয়ে করিডোরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই নিস্তব্ধতায় চাকার সেই চিঁ-চিঁ শব্দটা যেন কোনো এক ধিমে সুরের শোকগাথা গাইছিল।

তারপর ওটার সাথে জুমারের ঘরের দরজার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজটাও যোগ হলো, যা ঠেলে তিনি ভেতরে এলেন।

সে জায়নামাজে বসে ছিল।

ওড়নাটা মুখের চারপাশ দিয়ে জড়ানো ছিল এবং সে ততক্ষণে সালাম ফিরিয়ে নিয়েছে।

এখন দোয়া চাওয়ার বদলে সে নিঝুম হয়ে জায়নামাজের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে কিছু একটা ভাবছিল।

চাকার আওয়াজ পেয়ে সে চমকে ঘাড় ঘোরাল।

ওনাকে দেখে সে বড্ড মায়াবী এক হাসি হাসল এবং ওনার দিকে ঘুরে বসে নিজের হাঁটুর চারপাশে দুই হাত দিয়ে একটা লক বানিয়ে নিল।

তারপর নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি ঘুমাননি এখনও?”

বড় আব্বা সজল চোখে ওর মুখের দিকে তাকালেন।

কালো ওড়নার ওই ঘেরাটোপে ওর মুখটা বড্ড ম্লান দেখাচ্ছিল।

খুব একটা রূপসী সে ছিল না, তবে ওর চেহারাটা বেশ মিষ্টি ছিল।

আকর্ষণীয়।

আর ওই শান্ত, ধীরস্থির ভাবটাই ওকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলত।

সে বড্ড ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আর শান্ত ভঙ্গিতেই আঘাত করত, কিন্তু ওর এই সমস্ত নরম আর তিতকুটে স্বভাবের পরেও ও ওনাদের বড্ড আদরের ছিল।

“তুমি রেগে আছ বাবা?” তিনি ওর প্রশ্নটা হয়তো শুনতেই পাননি।

স্রেফ ভেজা চোখে তাকিয়ে নিজের মনের কথাটা জিজ্ঞেস করলেন।

“না আব্বা। আমি কেন রেগে থাকব?”

“তুমি সাদিকে বলেছ যে তুমি ফারিসকে বিয়ে করতে রাজি আছ। এটা কি রাগ অভিমান থেকে বলেছ?” জুমারের চোখে যেন কিছু কাঁচের টুকরো ভেসে উঠল, কিন্তু সে ওগুলো লুকিয়ে মুচকি হাসল।

“জুমারকে দিয়ে কি কেউ জোর করে কিছু করাতে পারে, আব্বা?”

“তাহলে মা, তুমি কেন ওকে বিয়ে করতে রাজি হলে? তুমি যদি রিফিউজ করতে চাও তবে করে দাও। আমি এই সব কথা এখানেই স্টপ করে দেব। আমি জানি না সেদিন কীভাবে মিসেস কারদার-এর প্রেশারে এসে ফারিসকে ওসব বলে ফেলেছিলাম...” এক চরম ভাঙা মনে মাথা নাড়তে নাড়তে ওনাকে ভীষণ অনুতপ্ত দেখাল।

“সেদিন যে বিয়েবাড়িতে আমি সাদিদের সাথে গিয়েছিলাম না, ওখানে আমি হাম্মাদকে দেখেছি। কিরণও সাথে ছিল আর দুটো বাচ্চাও।” সে বড্ড উদাসীন হাসি হেসে বলছিল।

“তখনই আমি ডিসাইড করে নিয়েছি যে আমার এবার লাইফে এগিয়ে যাওয়া উচিত, নয়তো আমি স্রেফ নিজের আর বাকি সবার ক্ষতি করব। তাই এখন আমি এই ডিসিশনটা সাকসেসফুল করতে যাচ্ছি যাতে আমাদের সবার লাইফ বেটার হয়। আমরা সবাই ওই নোংরা ক্যানসারটা থেকে মুক্তি পাই, যা চার বছর আগে আমাদের লাইফে এন্টার করেছিল।”

“সেটা তো ঠিক আছে মা, কিন্তু তুমি কি মন থেকে ফারিসকে বিয়ে করতে রাজি?”

“আমি নিজের লাইফ থেকে ওই নোংরা রোগটাকে উপড়ে ফেলার জন্য যেকোনো লিমিট পর্যন্ত যেতে রেডি আছি আব্বা, ফারিসকে বিয়ে করা তো বড্ড ছোট একটা কথা।” সে বড্ড কন্ট্রোলড এক হাসি হেসে ওনার দিকে তাকিয়ে ওর নাম ধরে বলছিল।

“আর... তুমি কি ওর প্রতি নিজের মনটা পরিষ্কার করে নিয়েছ?” ওনার মুখে এক অদ্ভুত আশার আলো জাগল, তাও বড্ড ভয় পেতে পেতে জিজ্ঞেস করলেন।

হাঁটুর চারপাশে হাত জড়িয়ে বসে থাকা জুমার আলতো করে মাথা নাড়ল।

“ওনার ব্যাপারে আমার থটস একদম ক্লিয়ার। যদি কোনো কনফিউশন থেকেও থাকে, তবে তাও দূর হয়ে গেছে। আজ বিকেলবেলা আমি ওনার সাথে মিট করেছি, আমরা দুজনে এই নিয়ে কথা বলেছি, নিজেদের প্রায়োরিটিজ জানিয়েছি আর ও আমার দিক থেকে স্যাটিসফাইড ছিল। তখনই ও নিজের গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে। আমি এটা বলছি না যে ওনার প্রতি আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো রাগ নেই, তবে এতটুকু বলব যে এই বিয়ের পর এটলিস্ট আমরা সবাই রিয়্যালিটিটা জানতে পারব।” সে একদম খাঁটি সত্যিটা বলে দিল।

কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানত যে ও নিজে কী বলছে আর ওনার আব্বা ওটার কী মিনিং বুঝছেন।

“আচ্ছা, তোমার কথা হয়েছে ওর সাথে?” ওনারা বড্ড স্বস্তির সাথে মাথা নাড়তে নাড়তে স্রেফ নিজেদের মনের ইচ্ছার মানেটাই বুঝলেন।

“হ্যাঁ, একদম। ও বড্ড ধৈর্যের সাথে আমার ফিলিংসগুলো শুনেছে এবং তারপর ও রাজি হয়ে গেছে। আর ও যখন রাজি, তখন আমারও কোনো অবজেকশন নেই। আমি ওনাকে বিয়ে করে একটা নতুন জার্নি স্টার্ট করতে চাই আব্বা, আর এই জার্নিটাই আমাদের সবাইকে প্র্যাক্টিক্যাল বানাবে।” তারপর সে বড্ড মায়াবী এক হাসি হাসল।

বড় আব্বা নিজের হাত বাড়িয়ে ওড়না জড়ানো ওর মাথায় হাত রাখলেন এবং এক মৃদু হাসি আর অফুরন্ত শান্তি নিয়ে পেছনে ঘুরে চলে গেলেন।

ওনার হুইলচেয়ারটা যখন বাইরে বেরিয়ে গেল, তখন জুমারের চোখের সেই কোমলতা এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় বদলে গেল।

সে বড্ড ধিমে পায়ে উঠে দরজাটা লক করল।

তারপর দরজার পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।

“খুনিদের আমরা এই জন্যই শাস্তি দিই আব্বা, যাতে ওরা আরও কোনো ইনোসেন্ট মানুষের লাইফ নিয়ে খেলতে না পারে। ওই পারসনটা সবসময় ওনাদেরই হার্ট করেছে যারা ওনাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। আর এখন আপনারা সবাই ওনাকে আপন ভাবছেন। এটা স্রেফ আমার জন্য নয় আব্বা, এটা আমাদের সবার জন্য। আমাদের ফারিস গাজী নামের এই নোংরা রোগটাকে নিজেদের লাইফ থেকে এভাবেই উপড়ে ফেলে দিতে হবে।” এক গভীর বিষাদে ডুবে ভাবতে ভাবতে সে নিজের মুখের চারপাশ থেকে ওড়নার প্যাঁচগুলো খুলতে লাগল।





চলবে,,,,

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)