নামাল-(Namal) অধ্যায়:০৯ পর্ব ৪০, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


 #নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:০৯


পর্ব :-৪০


Jaane kis ke liye wa hai tera aaghosh-e-karam... Hum to jab milte hain ek zakhm naya lete hain


[জানি না কার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে তোমার এই দয়ার আঁচল... আমরা তো যখনই মেলা করি, একটা নতুন ক্ষত নিয়েই ফিরি।]


জেলের উঁচু চার দেয়ালের ভেতরের ওই খোলা চত্বরে ওরা দুজনে ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছিল। আহমেদ নিচু গলায় কিছু বলছিল আর ফারিস চোখ দুটো ছোট করে ঘাড় ঘুরিয়ে একপাশে তাকিয়ে ছিল।


"আপনি কিছু ভেবেছেন এখান থেকে বের হয়ে কী করবেন, গাজী ভাই?"


"তোমার কী তাতে?"


"তাহলে অন্তত এতটুকু তো জিজ্ঞেস করুন যে আমি এখান থেকে বের হয়ে কী করব?"


"তুমি সেটাই করবে যা আগে করে এখানে এসেছ। প্রতারণা আর জালিয়াতি।" সে অত্যন্ত শুষ্ক গলায় কথাটা বলে মাথা ঝাকাল। আহমেদ ভীষণ আঘাত পেয়ে ওনার দিকে তাকাল।


"আমি শুধু একবার..." তর্জনী আঙুলটা তুলে দেখিয়ে বলল, "শুধু একবার এই কাজটা করেছিলাম আর জীবনে কখনো করব না।"


"তুমি অবশ্যই করবে। মানুষ কখনো বদলায় না। যে একবার করে, সে বারবার করে।" সাথে সাথেই সে জুতো দিয়ে মাটিতে থাকা একটা কাঁকরে ঠোকর মারল।


"আশফাক আহমেদ বলেছিলেন, যে ভালো মানুষ শুধু একবার পাপ করে আর তারপর তওবা করে নেয়, সে কখনো দ্বিতীয়বার এমনটা করে না।"


"এটা আশফাক আহমেদ বলেননি, তুমি এইমাত্র বানিয়েছ।" ফারিসের এই স্পষ্টবাদিতায় আহমেদ বেশ রাগ নিয়ে ওনার দিকে তাকাল।


"এত রুক্ষ কেন হচ্ছেন? কারদার সাহেবের মৃত্যুতে আমারও খুব খারাপ লেগেছে, কিন্তু..."


"তুমি কি কিছুক্ষণের জন্য চুপ থাকতে পারো না?" সে বেশ বিরক্ত হলো। আহমেদ 'হুম' বলে মুখ ফিরিয়ে নিল, তারপর ঠোঁটের কোণে কিছু একটা বিড়বিড় করল। ফারিস দেখল ওর বিড়বিড়ানির কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না, কিন্তু ও কিছুই শুনছিল না।


"আপনার কি ওনার ওপর এখনও রাগ আছে?"


"উঁহু। শুধু আফসোস আছে। ওনার ওপর রাগ করার মতো ওই অনুভূতিটাই আর অবশিষ্ট নেই কোনোদিন।"


"আর হয়তো এই কথাটারও কষ্ট আছে যে উনি আপনার নির্দোষিতাটা না জেনেই এই দুনিয়া থেকে চলে গেলেন।"


"জানি না।" সে আগের মতোই উদাসীনভাবে পা ফেলে হাঁটতে লাগল। দুজনে তখনই থামল যখন সামনে একজন সিপাই এসে দাঁড়াল।


"আপনার দর্শনার্থী এসেছে।" ফারিসকে ইঙ্গিত করল সে।


"কে?" সে চমকে উঠল।


"প্রসিকিউটর সাহেবা ।" ওরা দুজনে স্পষ্টতই একে অপরের দিকে তাকাল। আহমেদের ঠোঁট দুটো কুঁচকে গেল।


"এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার দেখা? এই ডাইনির মনে এত দয়া কবে থেকে উথলে উঠল?"


কিন্তু ফারিস কোনো কথা না শুনে একদম অভিব্যক্তিহীন আর শক্ত মুখ নিয়ে সিপাইয়ের পেছনে পেছনে হেঁটে গেল। যখন সে ওনার সামনে এসে চেয়ারে বসল, তখন ওনার ভ্রু কুঁচকে ছিল, তবে চোখের কঠোরতা কিছুটা কম ছিল।


উনি একটা সাদা কামিজের ওপর কালো মিনি কোট পরে ছিলেন, সাদা ওড়নাটা কাঁধের ওপর রাখা ছিল আর চুলগুলো একটা ক্লাচার দিয়ে অর্ধেক খোঁপা করে বাঁধা ছিল। ওনার চোখ দুটো টেবিলের ওপর রাখা নিজের দুই হাতের ওপর স্থির ছিল, নাকের নাকফুলের চমকটা এতদিন পরও ঠিক আগের মতোই ছিল। ফারিস এসে বসতেই উনি চোখ তুলে ওনার চেহারার দিকে তাকালেন। ওটা ছিল একদম ফাঁকা, তবে তীক্ষ্ণ এক জোড়া চোখ।


"এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার এত দয়া কবে থেকে হতে লাগল আপনার?" আহমেদের শব্দগুলো (সামান্য পরিবর্তন করে) সে আওড়াল। চোখ দুটো ওনার বাদামি চোখের ওপর জমে ছিল।


"প্রথমে শুনতে এসেছিলাম, এখন বলতে এসেছি। দয়া করে মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, কারণ যখন আমি বলব, তখন আওয়াজ বাইরে পর্যন্ত যাবে।" শব্দগুলো ওনার ঠোঁট থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে বের হলো আর চারপাশের পরিবেশের উদ্বেগটা এক ধাক্কায় বেড়ে গেল। ফারিসের চোখের ভেতরের নরম ভাবটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল।


"বলুন।"


"তুমি বলেছিলে আমি ছবির অন্য পিঠটা দেখি না। এটাও বলেছিলে যে আমার একদম মনে নেই যে কখনো আমি তোমার শিক্ষক ছিলাম। তুমি ভুল ছিলে।"


ফারিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। (সে বুঝে গিয়েছিল।) উনি যেন নিজের ভেতরের জমানো ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে করতে ওনার দিকে তাকিয়ে বলছিলেন:


"যখন তোমার ওই সহযোগী আমার কাছে এসেছিল, তখন আমি শুধু সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু ফারিস, আমি ছবির অন্য পিঠটা অবশ্যই দেখি। সো যখন আমি জানতে পারলাম যে ও একটা বিশ্বস্ত মানুষ, তখন এটাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে ও নিজের সেলমেটের জন্য কেন ওকালতি করবে? তোমরা জেলে কোনো দাঙ্গা পরিকল্পনা করছ না। তোমরা জেল ভেঙে পালাতে যাচ্ছ।" ওনার জ্বলন্ত চোখ জোড়া ফারিসের চোখের মণি অব্দি নেমে আসছিল। সে একদম শান্ত চেহারা নিয়ে চুপ করে রইল।


"Don't worry, আমি এই সম্ভাব্য অপরাধটা রিপোর্ট করব না। আমার জন্য এটাই ভালো হবে যে তুমি জেল ভাঙো আর আবার ওই একই অপরাধটাই করো যার জন্য ভেতরে গিয়েছিলে। জানো তুমি কী করবে?" উনি কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকলেন, টেবিলে জোরে একটা থাপ্পড় মারলেন এবং জ্বলন্ত চোখে তীব্র ঘৃণা নিয়ে ওনার দিকে তাকালেন। "আবার বিয়ে করবে আর ওই স্ত্রীকেও মেরে ফেলবে। তোমরা সব wife killers-দের মনোভাব একই রকমের হয়। এই জন্যই জেল ভাঙো, যাতে সবাই জানতে পারে যে তুমি দোষী ছিলে, আর এই জন্যই পালিয়েছ।"


সে চুপচাপ ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসে মুখে কিছু একটা চিবোচ্ছিল। হয়তো কোনো কাগজের টুকরো ছিল।


"কিন্তু তোমাকে এই পরিকল্পনা অন্য কারও সাথে মিলে বানাতে হবে, কারণ আহমেদ শাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ prosecution বাদ দিচ্ছে। প্রমাণের অভাবের কারণে। সো ও খুব শিগগিরই মুক্তি পেয়ে যাবে।" ফারিস কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। শুধু ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।


"জানেন কি? এত বছর পর প্রথমবারের জন্য আমি কয়েক দিনের জন্য ধরে নিয়েছিলাম যে তুমি নির্দোষ। আমি নিজে তোমার মামলাটা নিতে যাচ্ছিলাম। আমি তোমাকে presumed innocent মনে করে তোমার পক্ষের গল্পের সমর্থনে প্রমাণ খুঁজতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু..." আর তখনই ওনার চোখে এক গভীর কষ্ট নেমে এল। তীব্র ঘৃণায় ওনার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, "কিন্তু তুমি আবার আমাকে ব্যবহার করলে। ফারিস, তুমি আমাকে কী মনে করো? আমি তোমার শিক্ষক ছিলাম, সাদির ফুপ্পু ছিলাম নাকি কোনো অর্থহীন জিনিস যাকে তুমি যখন ইচ্ছা ব্যবহার করে যাবে? আমার এই হাল করেছ তুমি, ওটাই কি কম ছিল যে তোমার এখন মুক্তি পাওয়ার জন্যও আমার কাঁধে পা দেওয়া লাগবে?" সামনে ঝুঁকে প্রতিটা শব্দ প্রচণ্ড রাগে বলতে বলতে জুমারের গলার আওয়াজ চড়ে যাচ্ছিল। চোখে এখন জলও জমা হতে শুরু করেছিল।


"এই কাজের জন্য তুমি যেকোনো prosecutor বা পুলিশ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করতে পারতে। আমাকে ব্যবহার করার সময় ওই ছেলেটাকে দিয়ে আমার কাছে বার্তা পাঠানোর আগে তোমার একবারের জন্যও মনে হলো না যে তুমি বারবার একটা মেয়েকে ব্যবহার করছ? তুমি আমার থেকে চাওটা কী?" রাগে বলতে বলতেই একটা ফোঁটা চোখ থেকে গড়িয়ে গালে এসে পড়ল। ওনার নিজেরও খেয়াল ছিল না যে একটা জল গড়িয়ে পড়েছে।


সে তখনও চুপচাপ রইল।


"আর জানেন আমি এতক্ষণ ধরে আপনার সামনে কেন বসে আছি? আপনার মুখ থেকে শুধু একটা ক্ষমাপ্রার্থনা শোনার জন্য। এই কথাটা বলা এতটা কঠিন ছিল না ফারিস! আমাকে আবার ব্যবহার করার জন্য, আমার জীবনটা নষ্ট করার জন্য, আমার স্বাস্থ্য ধ্বংস করার জন্য কি আপনি একবারের জন্যও ক্ষমা চাইতে পারেন না?" টেবিলে জোরে হাত মেরে উনি আবার সামনে ঝুঁকলেন, চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে জ্বলছিল। "এই কথাটা বলা এতটা কঠিন ছিল না ফারিস—'I am sorry জুমার'। শুধু তিনটে শব্দ ছিল। আপনি একবার আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে দেখতেন, আপনি একবার এই সব মিথ্যে বলার বদলে দোষ স্বীকার করে দেখতেন, আমি আপনার পাশে এসে দাঁড়াতাম। কিন্তু আপনি এখন যা করলেন না, তার মাধ্যমে আপনি আমার মনে নিজের জন্য থাকা শেষ নরম কোণটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। আপনি এইমাত্র ওই মানুষটাকে হারিয়ে দিলেন, যে যদি আপনার নির্দোষিতার ওপর বিশ্বাস পেয়ে যেত, তবে সে আপনার সবচেয়ে বড় সমর্থক হতে পারত। কিন্তু এখন..." উনি পেছনে সরতে সরতে তীব্র ঘৃণায় ওনার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, "এখন আর না। এখন আমার আপনার মামলায় সাক্ষী হওয়ারও কোনো আগ্রহ নেই আর কিছুতেও না। আমি নিজের সাক্ষ্যও তুলে নিয়েছি। এই জন্য নয় যে আপনার ওপর আমার কোনো দয়া হয়েছে, শুধু এই জন্য যে আমি আপনার সাথে কোনো সম্পর্কই রাখতে চাই না। কারণ আপনার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো ঝামেলা ছিলই না। যদি থাকত, তবে দেখতেন আমি আপনার কী হাল করি। কিন্তু না।" মাথা ঝাকিয়ে টেবিলে ডান হাতটা মারলেন। সে চুপচাপ বন্ধ ঠোঁটে কাগজ চিবোতে চিবোতে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। "আমি তো একটা ব্যবহারের জিনিস ছিলাম, যার মাধ্যমে যখন খুশি আপনি নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে নেবেন। আর আপনার এখনও কোনো অপরাধবোধ হচ্ছে না?" এক অবাক করা কষ্ট নিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে সে মাথা নাড়ছিল। "ফারিস, আপনি আমাকে এই যোগ্যতাই রাখেননি যে আমি কখনো নিজের একটা সংসার পাততে পারি, কখনো মা পর্যন্ত হতে পারব না আমি!" (ওর চিবোতে থাকা চোয়ালটা আটকে গেল, চোখে একটা চমকে ওঠার অভিব্যক্তি ভেসে উঠল যা ও পরের পলকেই লুকিয়ে ফেলল।) "আমার কখনো বাচ্চা হবে না, আমার এই কষ্ট নিয়ে আমার বাবা সময়ের আগেই মারা যাবেন, কিন্তু আপনি... আপনি কি এখনও এই দুঃখ প্রকাশের তিনটে শব্দ বলতে পারবেন না? 'I am sorry জুমার'... এই তিনটে শব্দ বলা এতটা কঠিন কিছু না। এতে কিছুই পরিবর্তন হবে না, আমি এখনও আপনার পাশে দাঁড়ানোর কথা ভাবব না, কিন্তু হয়তো এটা আপনার নিজের জন্য ভালো হতো, হয়তো আপনার নিজের শান্তির জন্য হতো..." গড়গড় করে বলতে বলতে ওনার শ্বাস আটকে আসছিল। তাই ওখানেই চুপ হয়ে গেলেন। উনি যা বলতে এসেছিলেন তা বলে দিয়েছিলেন, আর ওনার আওয়াজ বাইরে পর্যন্ত গিয়েছিল কি না জানা নেই, তবে টেবিলের ওপাশে বসা ফারিসের ভেতর পর্যন্ত অবশ্যই পৌঁছে গিয়েছিল।


সে কিছুটা সামনে ঝুঁকল, দুই হাত একসাথে মিলিয়ে টেবিলের ওপর রাখল এবং অত্যন্ত গম্ভীরভাবে ওনার চোখের দিকে তাকাল। আর তারপর যখন ও বলল, তখন প্রতিটা শব্দ ছিল একদম স্থির কিন্তু দৃঢ়:


"আমাকে ক্ষমা করবেন যা আপনার সাথে হয়েছে তার জন্য। আমার খুব খারাপ লাগছে যে আপনার বাবা আপনার এই কষ্ট নিয়ে সময়ের আগেই মারা যাবেন। আমার সত্যি খুব আফসোস হচ্ছে যে আপনার জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেল। খুব কষ্ট হচ্ছে যে আপনিও নিজের পরিবার গড়তে পারবেন না। আপনার প্রতি আমার গভীর সমবেদনা আছে যে আপনার স্বাস্থ্য সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ হতে থাকবে..." একটু থামল, চোখের পলক না ফেলে ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "কিন্তু আমি ফারিস গাজী, আর ফারিস গাজীর নিজের চোখে নিজের জন্য অনেক সম্মান আছে। সো ম্যাডাম জেলা প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নি সাহেবা, আমি ক্ষমা চাইব না।" চিবিয়ে চিবিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ করল। হালকা একটু মাথা নেড়ে বলল, "আপনার যা করার আছে করে নিন, কিন্তু আমি ক্ষমা চাইব না।" সে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক ঝটকায় কুর্তার কলারটা ঠিক করল, হাতার অংশ দুটো পেছনে ভাঁজ করে নিল। "মিটিং খতম!" উনি জ্বলন্ত চোখে ওনার দিকে তাকাতে তাকাতে উঠলেন, পার্সটা নিলেন আর বাইরে চলে গেলেন।


"ওনাকে বললেন না কেন যে আপনি বাসিরাত সাহেবকে এই সব বলতে বলেছিলেন, ওনাকে নয়? এটা তো আমার ভুল ছিল।" যখন সে নিজের সেলে ফিরে এল এবং দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসল, তখন শলাকার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আহমেদ জিজ্ঞেস করল। নিজের মুক্তির কথা শুনে ওর যতটা না খুশি হয়েছিল, পরিকল্পনাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আফসোস তার চেয়ে বেশি হচ্ছিল। নিজের মুক্তির কথাটা তো একটা রসিকতা মনে হচ্ছিল।


"আর উনি কি বিশ্বাস করতেন?"


"করুক আর না করুক, বলা তো উচিত ছিল।"


"আমি সারাজীবন ওনাকে নিজের সাফাই দিতে পারব না। ওটার কোনো লাভ নেই। ও যেমন আছে, ওকেই ওভাবেই থাকতে দাও। ও-ও তো জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছে।"


"অন্তত জেলে তো নেই ও।" সে বেশ ক্ষোভ নিয়ে বলল।


"বন্ধনের অনেক রকম ধরন থাকে। ওর বন্ধনটা অন্য রকমের। যদি এই বন্ধনে থেকে কাউকে দোষ দেওয়া আর দোষ দিয়ে যাওয়াই ওর একমাত্র বাঁচার পথ হয়, তবে আমার ওটা ওর থেকে কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। অন্তত ওর কাছে কেউ একজন তো আছে যাকে ও দোষ দিতে পারছে। আমার কাছে তো তাও নেই। আর যখন এমন কেউ থাকে না, তখন মানুষ নিজেকেই দোষ দিতে শুরু করে। সো ও যেমন আছে, ওকে ওভাবেই থাকতে দাও।" সে একদম নিচু গলায় মাথা নিচু করে বলছিল, তবে আহমেদ মাথা নেড়ে নেড়ে তর্ক করতেই থাকল, কিন্তু ওর কথা তখন শুনছিলটাই বা কে?


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Maut se guzar kar yeh kaisi zindagi paayi, shaakh shaakh hota hai vaar ka gumaan yaaro


[মৃত্যুর ওপার থেকে ফিরে এ কেমন জীবন পেলাম বন্ধু, প্রতিটি ডালে ডালে আজ শুধু আঘাতের সংশয়।]


জওয়াহেরাত কারদারের রুমে হিটারের ওম ছিল। ভরদুপুরেও টানা পর্দার কারণে চারপাশ অন্ধকার লাগছিল। ঘাড়ের নিচে ফোলা ফোলা বালিশ গুঁজে, কালো রেশমি কম্বল জড়িয়ে সে শুয়ে ছিল—তাকে ভীষণ বিধ্বস্ত আর অসুস্থ দেখাচ্ছিল। কানের পেছনে গোঁজা চুল, কালি পড়া ফোলা চোখ, মেকআপ ছাড়া ফ্যাকাসে দুর্বল মুখ। সে কালো পোশাকেই ছিল আর নিজের উদাসীন চোখে পর্দার নিকষ অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে ছিল।


সাদি সামনে চেয়ারে হাত দুটো একসাথে কুঁকড়ে বসে চিন্তিত মুখে ওর দিকে তাকাচ্ছিল। সে মূলত ওর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে এসেছিল, কিন্তু জওয়াহেরাতের আচ্ছন্ন ভাব দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা জগতের মানুষ। ওষুধের কড়া অ্যাকশন চলছিল।


"মিসেস কারদার, আল্লাহ আপনাকে একা ছাড়বেন না। উনি আপনাকে সামলে নেবেন। ওনার ওপর একটু ভরসা রেখে দেখুন, আপনার প্রতিটি প্রবলেম উনি সলভ করে দেবেন।" সে খুব সফটলি বোঝাচ্ছিল, তখনই জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা জওয়াহেরাতের ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল।


"তুমি কি ওই ডকুমেন্টারি শো-টা দেখেছ, যেখানে predator..." ও বলতে বলতে থামল। সামান্য ঘাবড়ে গেল। ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বা ডিসকভারি চ্যানেল কবে দেখেছে? সময় কোথায় ওর?


"না, আমি আসলে..."


"সেদিন ওটার একটা এপিসোড চলছিল আর ওটা ফিমেল predators (শিকারী)-দের নিয়ে ছিল। শিকারীদের রানি—স্ত্রী চিতা। ও আমাকে খুব কাঁদিয়েছে। জানো কেন?"


"আপনি বলুন কেন।" সে আলতো করে সামনে ঝুঁকে শুনতে লাগল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বলেই যাচ্ছিল, যেন নিজের মনেই গভীর কোনো চিন্তা আউড়াচ্ছে।


"শিকারী জানো কারা হয়? Predators। ওইসব অ্যানিমেল, যারা নিজেদের চেয়ে দুর্বলদের শিকার করে। তোমরা ভাবো ওরা হয়তো খিদে মেটাতে বা অভ্যাসের বশে এমনটা করে, কিন্তু না, স্ত্রী চিতা মোটেও তেমন নয়। কারণ পুরুষ চিতা খুব আনফেইথফুল একটা প্রাণী, নিজের সঙ্গিনীকে সন্তানের উপহার দিয়ে মাঝপথে ছেড়ে চলে যায়। স্ত্রী চিতা একাই নিজের বাচ্চাদের মানুষ করে। আর সেদিন ওই শো-তে আমি দেখলাম, একটা ফিমেল predator হওয়া কতটা টাফ।" পর্দার দিকে তাকিয়েই ওর চোখ দুটো লালচে হয়ে উঠল। গলাটা ধরে এল। সাদি আফসোস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। (সে নিজের কষ্টের কথা ডিরেক্ট বলতে পারছে না, তাই এদিক-সেদিকের গল্প ফাঁদছে—সাদির এটাই মনে হলো।)


"ও একটা স্ত্রী চিতা ছিল আর ওর দুটো ছোট্ট বাচ্চা ছিল, যাদের জন্য ও শিকার খুঁজে আনত। জানো, প্রতিটা চিতার একটা নির্দিষ্ট এনার্জি লেভেল থাকে। একটা শিকার ধরার জন্য ও যতটা দৌড়ায়, তাতে ওর এনার্জি অর্ধেক হয়ে যায়। ও-ও নিজের বাচ্চাদের ডেরায় রেখে শিকারের খোঁজে বের হয়, ওত পেতে থাকে, হরিণের পেছনে দৌড়ায়। কিন্তু খোদার কী নিয়ম দেখো—হরিণ যতই দৌড়াক, তার এনার্জি লস হয় না। কিন্তু ওই হাই-স্পিড স্ত্রী চিতা হরিণটাকে কামড়ে ধরে নিজের ডেরায় নিয়ে আসে ঠিকই, তবে ততক্ষণে নিজের হাফ এনার্জি হারিয়ে ফেলে। নিস্তেজ ছোট্ট বাচ্চাদুটো ক্ষুধার্ত, কিন্তু ও হরিণের লাশটা খাওয়ার আগেই একটা সিংহ চলে আসে। একটা বড় শিকারী।" সে চরম যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করল। দুটো জলের ফোঁটা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।


"সিংহটা গর্জন করে আর ওই নিরুপায় মা চিতা পেছনে হটে যায়। যদি ও তা না করে, তবে সিংহটা ওর দুটো বাচ্চার ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়বে, আর ও তো সিংহের সাথে ফাইট করতে পারবে না। ওর চোখের সামনে সিংহ ওর শিকারটা খেয়ে ফেলে আর ও নিজের বাচ্চাদের নিয়ে স্রেফ চেয়ে চেয়ে দেখে।" একদম ম্লান মুখে সে একটুখানি হাসল। সাদি চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। এই স্টোরিতে ওর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট ছিল না, স্রেফ কারদার সাহেবের শোকে জওয়াহেরাত এসব আবোলতাবোল বকছে বলেই মনে হচ্ছিল। হাশিমের সাথে যা-ই প্রবলেম থাকুক না কেন, তাতে জওয়াহেরাতের তো কোনো দোষ ছিল না। সে হয়তো জানতও না যে হাশিম ওয়ারিস মামুকে খুন করিয়েছে। আর তাছাড়া সে তো সাদির ফ্রেন্ড ছিল, ওর পাশে এসে প্রায়ই বসত, গল্প করত; ওর এই কন্ডিশন দেখে সাদির খারাপ লাগা ছাড়া আর কী-ই বা ফিল হতো।


"এখন ওর হাফ এনার্জি শেষ। কাল ওকে ডেফিনেটলি শিকার করতেই হবে যাতে ওই এনার্জিটা রিকভার করা যায়, নয়তো ও মরে যাবে আর ওর পর বাচ্চাদুটো না খেয়েই মারা যাবে।" সে কথা বলেই যাচ্ছিল। "সো পরের দিন ও আবার বের হয়, হরিণের পেছনে ছোটে, ওটাকে কাবু করে টেনেহিঁচড়ে একটা সেফ কর্নারে নিয়ে আসে। নিজের সবটুকু এনার্জি ও এবারও শেষ করে ফেলেছে। যদি এই হরিণটাও কোনো সিংহ বা বড় শিকারী ছিনিয়ে নেয়, তবে ও মারা যাবে। আর সবচেয়ে পেইনফুল বিষয় হলো, আজ ও বড় কোনো হরিণ নয়, বরং হরিণের একটা বাচ্চা শিকার করেছে। ওটা এত ছোট যে বাচ্চাদের দিলে নিজের ভাগে মাত্র কয়েক টুকরোই আসবে আর ও নিজে মারা যাবে। এনার্জি ব্যালেন্স করার জন্য ওটাকে ওর একাই খেতে হবে। সো ও ওটাকে বাচ্চাদের কাছে নিয়ে যায় না। নিজেই খেয়ে নেয়।" চোখ দুটো বন্ধ করল সে। অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছিল।


"বাচ্চারা এখনও ক্ষুধার্ত। পরের দিন ও আবার শিকারের জন্য দৌড়ায়। এনার্জি কম, কারণ কালকের হরিণটা ছোট ছিল। সো আজ ও একটা বড় হরিণ শিকার করে। ফাইনালি এবার ওর বাচ্চারা আর ও মিলে ওটা খেতে পারবে। ও হরিণের লাশটা টেনে ডেরা পর্যন্ত নিয়ে আসে তো..." ওর গলাটা এবার কেঁপে উঠল। ভাঙা ভাঙা কান্না মেশানো গলায় একটা জড়তা চলে এল। "তো দেখে ওর ছোট্ট বাচ্চাদের hyenas (হায়েনা)-দের একটা দল ঘিরে রেখেছে। ও কাছে আসে। অ্যাটাক করে না। ও তো ক্লান্ত। শুধু গর্জন করে। আর হায়েনারা পালিয়ে যায়, ও নিজের বাচ্চাদের ফিরে পায়। আর তোমরা... তোমরা ভাবো চিতা খিদের জন্য বা পাওয়ার দেখানোর জন্য শিকার করে। এমনটা হয় না, সাদি। কেউ নিজের খুশিতে কারও রক্ত ঝরায় না। নিজের বাচ্চাদের জন্য, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ও এমনটা করে।" আর তারপর বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে সে চোখ বুজে নিল। অনবরত জল পড়ছিল।


"যাও সাদি, আমাকে একা ছেড়ে দাও।" সে পাশ ফিরতেই সাদি উঠে দাঁড়াল।


কিছুক্ষণ পর জওয়াহেরাত আবার পাশ ফিরল, তখন আধখোলা দরজা দিয়ে বাইরের দৃশ্যটা দেখা যাচ্ছিল। সাদি মেরির সাথে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলছিল। ওদের কথাবার্তা খুব নরমাল ছিল, সেটা জওয়াহেরাত জানত না, স্রেফ মেরির উপস্থিতিই ওকে অস্থির করে তুলল। সে সাদির সামনে কী কী বলে ফেলেছে! মেরি যদি কিছু উল্টোপাল্টা বলে দেয়? সাদি যদি দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নেয়? সে উঠতে চাইল, কিন্তু স্লিপিং পিলের অ্যাকশন আরও স্ট্রং হচ্ছিল। ওর চোখ দুটো বুজে আসতে লাগল। চেতনা ক্রমশ হারিয়ে গেল আর বুকটা বারবার দুলতে লাগল।


এসবের থেকে সম্পূর্ণ আনঅ্যাওয়ার সাদি তখন মেরির কাছে ওর মালিকের মৃত্যুর জন্য সমবেদনা জানাচ্ছিল।

🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Khwahish aarzoo ki haasil-e-zindagi hi sahi, haasil-e-aarzoo hai kya swaa-e-daam ke siwa


[আকাঙ্ক্ষা আর কামনাই যদি জীবনের একমাত্র প্রাপ্তি হয়, তবে সেই কামনার শেষ পরিণতি তো এক ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়।]


সাদি যখন বাড়ি ফিরল, তখন চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। সায়াম স্কুলে গিয়েছিল আর আম্মু সম্ভবত ওই নতুন রেস্তোরাঁয়, 'হানিন' যার নাম রেখেছিল। সাদি জানত এই নামটা কোনো এক পাকিস্তানি ড্রামা থেকে ইন্সপায়ারড হয়ে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সে রেস্তোরাঁ এখন কোথায়?


ও হানিন রুমে উঁকি দিতেই দেখল সে বেডের ওপর হাঁটু মুড়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। সামনে কয়েকটা কাগজ একদম টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। ও ভেতরে এল। ওর চোখ ওই বিধ্বস্ত হানিন থেকে কাগজের টুকরোগুলোর ওপর গেল। সে যেন একটা ইলেকট্রিক শক খেল। জলদি ওগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে টুকরোগুলো উল্টেপাল্টে দেখল।


"কে করেছে এটা? এটা তো তোমার ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিশন ফর্ম ছিল!" প্রথম ডাউটটা সায়ামের ওপর গিয়েছিল। দিনকাল ভালো যাচ্ছে না ভেবে সে টেনশনে বেডের সামনে বসল।


"হানিন, এটা তুমি করেছ? কী হয়েছে তোমার, বলো আমাকে?" আলতো করে ওর মাথায় হাত রাখল। সে এতক্ষণ বিছানার চাদরের দিকে তাকিয়ে ছিল, এবার চোখ তুলল। মেকআপ ছাড়া ওর চোখ দুটো খুব ছোট দেখাচ্ছিল।


"আমি অ্যাডমিশন নেব না। আমার আর পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করছে না।" চোখ দুটো জলে ভরে উঠল ওর।


"হানিন, জাস্ট স্টপ ইট! আলিশা যদি পড়াশোনা না করে, তবে তাতে তোমার কোনো দোষ নেই।" এবার সাদির একটু রাগ হলো।


"আমার পড়তে ইচ্ছা করছে না ভাইয়া।" কিন্তু সে ওর কথা শুনছিলই না।


"ওটা আলিশা আর হাশিম ভাইয়ের ম্যাটার ছিল। তুমি কোনো ভুল করোনি, নিজেকে ক্রিমিনাল ভেবো না প্লিজ।"


"আমি ক্রিমিনাল। আমি পাপিষ্ঠা।" জল টপটপ করে ওর গাল বেয়ে পড়ছিল।


"আলিশা সেটাই পেয়েছে যা ও নিজে বুনেছিল। আলিশা নিজের..."


"কী আলিশা আলিশা লাগিয়ে রেখেছেন আপনি? জাহান্নামে যাক আলিশা!" সে হঠাৎ এত জোরে চিৎকার করে উঠল যে সাদি বাধ্য হয়ে একটু পিছিয়ে গেল। ওর গলার আওয়াজ যন্ত্রণায় কাঁপছিল। "সব কথা আলিশার জন্য হয় না। এটা আমি, হানিন!" আঙুল দিয়ে নিজের বুকে আঘাত করল। "এগুলো আমার পাপ!" ওর বলার স্টাইলে আর চোখে এমন কিছু ছিল যে সাদি চমকে উঠল। ফার্স্ট টাইমের জন্য ওর মনে হলো যে হানিন আসলে আলিশার জন্য আপসেট নয়।


"অন্য কোনো প্রবলেম তাহলে? কী হয়েছে হানিন?" কিছুটা অ্যালার্মড হয়ে সে ওর ফেসের দিকে তাকাল। হানিনের চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়তে লাগল।


"আমি কে, ভাইয়া?"


"তুমি হানিন... আমাদের বাড়ির সবচেয়ে কিউট আর ইন্টেলিজেন্ট বাচ্চা। তুমি... তুমি কোরিয়ান কালচারের দিওয়ানা আর..." সে জলদি জলদি বলতে লাগল, "আর তুমি লাহোর বোর্ডে টপ করেছ..." ওর শেষ কথাটা শুনতেই হানিন হাঁটুতে মাথা গুঁজে কাঁদতে লাগল।


"আমি করিনি ভাইয়া! আমি টপ করিনি, আমি ফার্স্ট পজিশন পাইনি!"


"হানিন, কী বলছ এসব?" সে টেনশনে ওর মাথা চাপড়ে দিচ্ছিল। সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। হানিন ওর ভেজা মুখটা তুলল, ভেজা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল।


"আমি বোর্ড টপ করিনি। আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে ওই কোরিয়ান ড্রামা আর সিনেমাগুলো। আমি তো এই বছর ঠিকমতো পড়াশোনাও করিনি।"


ওর মাথায় হাত বুলানো সাদির হাতটা পজ হয়ে গেল। চরম অবাক হয়ে সে ওর মুখের দিকে তাকাল।


"যা বলছি সত্যি।"


"কী আবোলতাবোল বকছ?"


"আমি বোর্ড টপ করিনি।"


"পাগল হয়ে গেছ নাকি? পুরো সিটি জানে তুমি বোর্ড টপ করেছ। তোমার... তোমার রেজাল্ট কার্ড বোর্ডের অনুষ্ঠানে, নিউজপেপারে পাবলিশ হয়েছে..."


"ওই রেজাল্টটা রিয়েল ছিল না।" সে জোরে চেঁচিয়ে উঠল। "আমি চিটিং করেছিলাম। শুনলেন আপনি? আমি পেপার্স আগেই দেখে নিয়েছিলাম।"


সাদি যেন একটা বড়সড় শক খেল। সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে পেছনে হটল। "কী ফালতু কথা বলছ হানিন? কেউ চিটিং করে টপ করতে পারে না। কেউ কোশ্চেন পেপার আগেই দেখতে পারে না। তুমি আমার সাথে... কোনো প্র্যাঙ্ক করছ?" ওর এখনও মনে হচ্ছিল সে হয়তো হঠাৎ হেসে উঠবে, কিন্তু সে কাঁদছিল।


"আমি দেখেছিলাম... সব পেপার্স দেখেছিলাম। আমার জানা ছিল এক্সামে কী আসবে।" কিন্তু ও তখনও বুঝতে পারছিল না।


"এমনটা পসিবলই না। তুমি হ্যাকিংয়ে যতই ভালো হও না কেন, তুমি কোনো বোর্ডের মেইনফ্রেম হ্যাক করতে পারো না। তুমি কী বলছ এসব? পেপার্স তো বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও থাকে না, এত টাইট সিকিউরিটি থাকে।" সে মাথা নাড়ছিল। "যারা পেপার সেট করে, তারাও ফাইনাল পেপারটা জানতে পারে না। বোর্ডের কোনো স্টাফ পর্যন্ত পেপার দেখতে পারে না, এক্সেপ্ট..." আর এখানেই সে আটকে গেল। অবিশ্বাস নিয়ে হানিন দিকে তাকাল।


"এক্সেপ্ট অফিসার কনফিডেন্সিয়াল প্রেস (OCP)।" সে ভাইয়ের সেন্টেন্সটা কমপ্লিট করল।


"তুমি জোক করছ, তাই না?" একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সে কাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করল। "OCP পজিশনে সবচেয়ে অনেস্ট মানুষকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়। একজন রেসপেক্টেড আর অনেস্ট মানুষ... কোনো OCP এমনটা করতে পারে না। আমি জানি তোমার ওই ফ্রেন্ডের আব্বু OCP, যে তোমার সাথে স্কুলে ছিল। কিন্তু OCP তোমাকে পেপার দেখাতে পারেন না।" সে এখনও মেন্টালি এটা মেনে নিতে পারছিল না। হানিন কষ্ট জড়ানো ভেজা চোখে ওর দিকে তাকাল।


"আপনি কি জানেন ভাইয়া, একটা মানুষ নিজের ফ্যামিলির জন্য কোন লেভেল পর্যন্ত যেতে পারে?" আর জল আবার টপটপ করে পড়তে লাগল। সাদি একদম নিস্তেজ হয়ে সাইড টেবিলের অন্য কোণায় বসল। হানিন থেকে বেশ দূরে। ওর স্তব্ধ চোখ দুটো ওর ওপর জমে ছিল, যে নিজের হাঁটুর দিকে তাকিয়ে বলে যাচ্ছিল:


"হুমায়রার আব্বু OCP, ওনার কারণেই হুমায়রা আমাদের বোর্ড থেকে এক্সাম দিতে পারে না, নিয়ম অনুযায়ী। হুমায়রা আমার কাছে এসেছিল এক্সামের পনেরো দিন আগে। ওগুলো এমন দিন ছিল যখন আমি মারাত্মক মেন্টাল প্রেশারে ছিলাম। আপনি বাইরে ছিলেন আর আমি সারাদিন-রাত কোরিয়ান ড্রামা দেখতাম, আর তারপর এই গিল্ট হতো যে পড়াশোনা করছি না, কিন্তু বইয়ে মন বসত না। এফএসসির ফার্স্ট ইয়ারে খোদার কসম আমি সত্যিই জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছিলাম আর বোর্ডে আমার থার্ড হাইয়েস্ট মার্কস ছিল। এবার আমাকে পজিশন পেতেই হতো। ওটা আমার ইগো ছিল নাকি আম্মুকে খুশি করার তাগিদ ছিল জানি না। আম্মু বলতেন, 'তুমি যদি ফেইল করো, তবে তোমার কম্পিউটার বন্ধ করিয়ে দেব'। এই মায়েরা রাগের মাথায় আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নেওয়ার হুমকি কেন দেয় সবসময়?" হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে গালটা মুছল সে। মাথা নিচু করে সে বলে যাচ্ছিল আর সাদি শ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।


"তখনই হুমায়রা আমার কাছে আসে। সাথে ওর আব্বুও ছিলেন। আমার কম্পিউটার স্কিলসের নামডাক দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছিল। মেয়েরা নানা কাজ নিয়ে আসে, আমি কখনো করি, কখনো করি না। বদলে কিছু নিই না, জাস্ট অনেক প্রশংসা পাই। হুমায়রারও একটা কাজ ছিল। ওর বোনের সাথে পাড়ার একটা ছেলের রিলেশন হয়ে গিয়েছিল, ছেলেটার কাছে ওর একটা ভিডিও ছিল। ওনার আব্বু ওখানে বিয়ে ভেঙে দিয়ে একটা রেসপেক্টেড ফ্যামিলিতে ওর সম্বন্ধ ঠিক করেন। এক মাস পরেই ওর বিয়ে ছিল, কিন্তু ওই ছেলেটা ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে। ঠিক বিয়ের দিন ভিডিওর স্ক্রিনশট বানিয়ে ও ফাংশনে ডিস্ট্রিবিউট করে দেবে—এটাই বলেছিল সে। হুমায়রা আমার কাছে এসে রিকোয়েস্ট করে যাতে ওই ছেলের কম্পিউটারের সব ডেটা ওড়াতে পারি। আমি বললাম ও যেন ওর আব্বুকে একা পাঠায়। পরের দিন সকালে ওনার আব্বু আসেন। এই ড্রয়িংরুমে। আম্মু স্কুলে ছিলেন, আমি ওনাকে এখানে বসালাম, ওনার কথা শুনলাম। ওনাকে খুব লজ্জিত আর হেল্পলেস লাগছিল। বললেন, 'আমি কী করতে পারি?' তো আমি বললাম..." ওর চোখের জলে পুরো দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে গেল। আর ওই কুয়াশার ভেতর থেকে একটা পুরোনো দৃশ্য ভেসে উঠল।


ওদের ড্রয়িংরুম... সোফায় বসা মাঝবয়সী কিন্তু অত্যন্ত ভদ্র আর শরীফ ফারুক সাহেব, আর ওনার সামনে সোফায় পা ওপর পা তুলে বসা হানিন। চশমা পরা, চুলে ফ্রেঞ্চ বিনুনি বাঁধা—তাকে খুব গম্ভীর আর শান্ত দেখাচ্ছিল।


"আমি ওর মোবাইল আর ঘরের সব কম্পিউটারে ভাইরাস ঢুকিয়ে ইনফেক্ট করে দেব। তারপর ওকে একটা মেসেজ পাঠাব যে যে-সব ফ্ল্যাশ ড্রাইভ আর সিডিতে তুমি ওগুলো সেভ করে রেখেছ, সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ও অবাক হয়ে ওগুলো একটা একটা করে চেক করবে। এভাবেই প্রতিটা জিনিস ইনফেক্টেড হয়ে যাবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওর সব ডেটা ডিলিট হয়ে যাবে। শুধু এটাই নয়, বরং আমি ওর কম্পিউটার অ্যাক্সেস করে ওর বোনদের ছবিগুলো নিয়ে নেব, তারপর ওগুলোর থ্রুতে ওকেই ব্ল্যাকমেইল করব যে যদি নাজিয়া আপুর ব্যাপারে কাউকে একটা কথাও বলেছ, তবে আমি ওর বোনদের ছবি ফটোশপ করে ওর পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দেব। এরপর ওর আর সাধ্য হবে না যে ও নাজিয়া আপুকে আবার ব্ল্যাকমেইল করে।"


উনি যেন শ্বাস বন্ধ করে শুনছিলেন। খুব কষ্টে মাথা নাড়লেন।


"মা, তুমি এই সব করতে পারবে? সত্যি? নরমাল মানুষ তো..."


"আমি নরমাল নই। আমি হানিন।" সে পলকের জন্য থামল, ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "কিন্তু আপনি কি এটা ভেবেছেন যে আমি যদি ধরা পড়ি—এটা তো আলটিমেটলি সাইবার ক্রাইম—তাহলে আমার কী হবে? বদনামও হবে আর জেলও হবে। লাইফ তো একদম শেষ হয়ে যাবে আমার। সো আমি যদি আপনার মেয়ের জন্য এত কিছু করতে যাচ্ছি, তবে আপনাকেও আমার জন্য কিছু করতে হবে।"


"হ্যাঁ, বলো আমি কী করতে পারি?" উনি সামনে ঝুঁকলেন।


"আপনি OCP, আপনার কাছে আগামী মাসে হতে যাওয়া..."


"একটা শব্দও এর চেয়ে আগে বলো না!" উনি রাগে লাল হয়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গেলেন। "ভাববেও না যে আমি এমন কিছু করব।"


"আমি বোর্ড টপার, আমাকে পেপার্স না দেখালেও আমি সেকেন্ড পজিশন পেয়ে যাব।" সে-ও সাথে সাথে দাঁড়িয়ে ওনার চোখের দিকে চোখ রেখে শক্ত গলায় বলল, "কিন্তু আমাকে ফার্স্ট পজিশনটাই নিতে হবে, এটা আমার সম্মানের ব্যাপার।"


"আমি এমন কিছুই করব না।" আঙুল তুলে শক্তভাবে ওয়ার্নিং দিলেন উনি। সে তিক্তভাবে হাসল।


"তাহলে অন্য কোনো এক্সপার্টের কাছে যান আর তাকে বলুন ওই ছেলের ডেটা ওড়াতে। কিন্তু আমার মতো কে করে দেবে বলুন? আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, ওই ভিডিওটা এখন আমার কাছেও আছে।"


ফারুক সাহেব চরম অবিশ্বাস নিয়ে ধাক্কা খেয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেলেন।


"আর ওই মুহূর্তে ভাইয়া, আমার মনে হলো আমি ওই মানুষটাকে অর্ধেক মেরেই ফেলেছি। ওনাকে কনভিন্স করা ইজি ছিল না, কিন্তু উনি বাধ্য হয়ে গেলেন। আমি ওনার কাজ করে দিলাম আর উনি আমার। আমি এটাও বললাম যে রেজাল্ট আসার আগে নাজিয়া আপুর ভিডিও আমি ডিলিট করব না, যাতে উনি আমার নামে কোনো ইনফর্মার লাগাতে না পারেন। উনি আমাকে পেপার্স দিয়ে দিলেন আর আমি বোর্ড টপ করে নিলাম। আমার কোনো গিল্ট ফিল হয়নি। রেজাল্টের দিন ওনাকে কল করে বললাম যে ভিডিও আমি ডিলিট করে দিয়েছি, উনি কোনো আনসার না দিয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। এতগুলো মাস কেটে গেল কিন্তু আমার একবারের জন্যও খারাপ লাগেনি। যে ওয়ারিস মামুকে খুন করেছে, তারও হয়তো একবারের জন্য কষ্ট হয়েছে, আমি তো তার চেয়েও ওর্স্ট বের হলাম যে আমার মনে হলো আমি পেপার্স না দেখেও সেকেন্ড হতে পারতাম, কোনো ক্রাইম তো করিনি। কিন্তু এটা সত্যি ছিল না। আলিশার লেটারটা আমাকে বুঝিয়ে দিল যে এটা সত্যি ছিল না। আমি ভালো নাম্বার পেয়ে যেতাম, মরে-কেটে মেরিটে চলে আসতাম কিন্তু আমি কখনো টপ করতে পারতাম না, কারণ ওই কোরিয়ান ড্রামাগুলো আমাকে পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। আলিশার লেটারটা আমাকে দেখাল যে আমি কতটা খারাপ। তখনও আমি ভাবলাম আমি ফারুক সাহেবের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব আর ব্যাস। সো আলিশার লেটারের পর আমি ওনার বাড়িতে ফোন করলাম, তখন ওনার মেয়ে বলল, 'যেদিন আমার রেজাল্ট এসেছিল, সেদিন আমার ফোন পাওয়ার পর উনি ওনার স্টাডি টেবিলে যান, নিজের রেজিগনেশন লেটার লেখেন, সাইন করেন আর বিষটা টেবিলের ওপর রেখে দেন। হুমায়রা ওনাকে ডাকতে গিয়েছিল কিন্তু ততক্ষণে উনি মারা গেছেন।' উনি মারা গেছেন ভাইয়া! বছরের পর বছর ধরে ওই রিয়াল পজিশনের দু-ধারী তলোয়ারের ওপর সততার সাথে চলেছিলেন, ওনাকে আমি কেটে টুকরো করে দিলাম। আমি ওই মানুষটার লাইফ কেড়ে নিলাম। আমি কে ভাইয়া? আমি কে?" সে হাঁটুর ওপর মাথা রেখে কেঁদেই যাচ্ছিল।


আর সাদি ওনার সামনে একদম চুপচাপ বসে রইল। অনেকক্ষণ পর সে নিজেকে কিছুটা সামলাল। মাথা তুলল, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ভেজা মুখটা মুছল।


"আমি এখন আর অ্যাডমিশন নেব না। সব পাপ তওবা করলেই মাফ হয়ে যায় না। বড় পাপের বড় কাফফারা দিতে হয়। এটা বলবেন না যে আমি আবার এক্সাম দিয়ে দেব। আমি ওই বইগুলো আবার খুলতেও পারব না, পড়া তো দূরের কথা।" সে ওই টুকরো টুকরো কাগজের আরও কুচি করতে লাগল। তারপর চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকাল। সে একদম নিশ্চুপ ছিল।


"কিছু তো বলুন।"


"আমার তোমাকে কিছু বলার নেই।" বলতে বলতে সে উঠল, আর একদম নিস্তেজ পায়ে হেঁটে বাইরে চলে গেল। হানিনের মাথাটা আরও ঝুঁকে গেল আর বইতে থাকা চোখের জলের স্পিড বেড়ে গেল। বড় পাপের বড় কাফফারা...


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


কারদার প্যালেসে শীতের বিকেলের ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়া ভেতরে জমা হতে শুরু করেছে। লাউঞ্জের দেয়াল ঘেঁষা জানালার পর্দাগুলো টানা ছিল না, বাইরের আলো পুরো লাউঞ্জটাকে ব্রাইট করে রেখেছিল। কাজের লোকেরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে আসা-যাওয়া করছিল। এমন সময় উঁচু জানালার সামনে জওয়াহেরাত দাঁড়িয়ে ছিল। ওয়েস্টার্ন স্টাইলের কালো হাঁটু পর্যন্ত আসা ড্রেস আর ব্ল্যাক টাইটস পরা, বুকে হাত বেঁধে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাম কনুইতে অনবরত টোকা মারছিল। ওর সিংহীর মতো চোখ দুটো বাইরে ফিক্সড ছিল, যেখানে লন দিয়ে সাদিকে হেঁটে আসতে দেখা যাচ্ছিল।


আজ অরঙ্গজেবের মৃত্যুর সপ্তম দিন ছিল আর এই সময়ের মধ্যে সে বেশ কয়েকবার জওয়াহেরাতের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে এসেছে। কিন্তু ওই লাস্ট মিটিংয়ে জওয়াহেরাতের ওর সামনে আবোলতাবোল বকে ফেলা, ওর মেরির সাথে কথা বলা—এগুলো জওয়াহেরাতকে এখনও বিঁধছিল।


আর তখনই ওর তীক্ষ্ণ চোখে আরও বিরক্তি ফুটে উঠল। লন দিয়ে হেঁটে আসা সাদি মাঝপথে থামল। মেরি যে ট্রে হাতে নিয়ে পাশ কেটে যাচ্ছিল... সাদি তাকে ডাকতেই সে থেমে ওর সাথে কথা বলতে লাগল। জওয়াহেরাত শব্দগুলো এত দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু ওর অস্থিরতা বেড়ে গেল।


"ওর কি নিজের বাড়িতে শান্তি নেই যে রোজ রোজ চলে আসে?" পেছন থেকে নওশেরওয়াঁন বলতেই সে চমকে ঘুরে তাকাল। সে পকেটে হাত দিয়ে বেশ বিরক্তি নিয়ে জানালার ওপারে সাদিকে দেখছিল।


"এখন আমাকে বকাঝকা করবেন না যে আমি আপনার ফ্রেন্ডের শানে গুস্তাখি করে ফেলেছি।" সাথে সাথেই এক বিরক্তিকর ভঙ্গিতে হাত তুলে দেখাল যে সে বকুনি শোনার মুডে নেই। জওয়াহেরাত কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ঘুরে জানালার দিকে তাকাল। নিচে দাঁড়িয়ে সাদি আর মেরি মগ্ন হয়ে কথা বলছিল। মেরি কিছু বলুক আর না বলুক, সেদিন সে নিজে যা যা বলে ফেলেছে, ওটাও ডেঞ্জারাস ছিল।


"তুমি ঠিক বলছ, ওর এখানে সারাক্ষণ আসা উচিত নয়। তাহলে কেন না ওর এই বাড়িতে এন্টার করাটাই বন্ধ করে দিই?" চকচকে চোখে ক্রুর হাসি নিয়ে সে শেরুর দিকে ঘুরল। সাত দিন পর তাকে অবশেষে সামলানো, আগের সেই জওয়াহেরাতের মতোই লাগছিল।


নওশেরওয়াঁন অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। "আপনি কী করবেন?"


"আমি যা করব, তা যেন তোমার ভাই জানতে না পারে। বুঝেছ?"


নওশেরওয়াঁনের কয়েক সেকেন্ড লাগল ওর মানে বুঝতে আর তারপর ওর মাথা আপনা-আপনি সায় দিল। "বুঝে গেছি।"


"আমার সাথে এসো।" সে হিলের ওপর ঘুরল আর হনহন করে হেঁটে এগিয়ে গেল। ওর মুখ বাইরের দিকে ছিল। শেরু জলদি ওর পেছনে পেছনে চলে গেল।


চলবে,,,,,,

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)