নামাল-(Namal) অধ্যায়:১০ পর্ব ৪৬, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
#নামাল-(Namal)
#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi)
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
অধ্যায়:১০
পর্ব :-৪৬
Main tha la-jawab Laila bhi... Jab sawal ek ki baqa ka tha
[আমিও নিরুত্তর ছিলাম, লায়লাও ছিল নির্বাক... যখন প্রশ্নটি ছিল যেকোনো একজনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার!]
---
রবিবারের সন্ধেয় ইউসুফ সাহেবের বাড়িতে বাতাস যেন এমন এক সুর ছড়িয়ে রেখেছিল, যাতে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল না কোনো মিউজিক—ছিল শুধু একটা অনুভূতি।
আনন্দের অনুভূতি।
লাউঞ্জে বেশ একটা জমজমাট ভাব, যদিও বাইরে থেকে কোনো অতিথি আসেনি, সবাই নিজেদেরই মানুষ।
ওপাশে সামনের সোফায় নুদরাত এবং ফারিসের কাজিন জামাল ভাই বসে ছিলেন।
ওনার স্ত্রীও ছিলেন।
সারা-র মা জাকিয়া খালামণিও ছিলেন।
ওনাদের পাশে শিফনের একটা জমকালো জোড়া পরে, কতদিন পর বেশ সুন্দর করে সেজেগুজে নুদরাত ফুপ্পু বসে ছিলেন।
তিনি হাসিমুখে ওনাদের সাথে গল্পে মগ্ন ছিলেন।
মাঝে মাঝেই চোখ তুলে সামনের সোফাগুলোর দিকেও দেখে নিচ্ছিলেন, যেখানে ফারিস বসে ছিল।
সে একটা অফ-হোয়াইট কুর্তা পরে ছিল, তিন সপ্তাহ আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময়ের একদম ছোট করে ছাঁটা চুলগুলো এখন কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় বেশ ভালো লাগছিল।
তবে সে চুপচাপ ছিল—গম্ভীর আর শান্ত।
শুধু ঘাড়টা বড় আব্বার দিকে ঘুরিয়ে বড্ড মনোযোগ দিয়ে ওনার কোনো কথা শুনছিল।
বড় আব্বা খুশি ছিলেন, মৃদু হাসছিলেনও।
তিনিও একটা অফ-হোয়াইট নতুন সালোয়ার-কামিজ পরে ছিলেন।
বেশ ফুরফুরে আর সুস্থ দেখাচ্ছিল ওনাকে।
কখনো ফারিসকে কিছু বলছিলেন, তো কখনো কাছেই বসা নিকাহ পড়ানো কারী সাহেবের সাথে কথা বলছিলেন।
এমন এক মুহূর্তে সায়াম দুহাতে মুখ গুঁজে সবার চেয়ে বেশি উদাস হয়ে বসে ছিল।
নুদরাত ফুপ্পু যদি ভুল করেও ওর দিকে তাকাতেন, ও অমনি কোনো আওয়াজ না করে ঠোঁট নেড়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করত—খাবার কখন দেওয়া হবে?
আর দুই-তিনবার তো নুদরাত ফুপ্পুর হাত পায়ের জুতো পর্যন্ত গিয়ে গিয়েও থেমে গেল।
করিডোর দিয়ে একটু এগোলেই জুমারের ঘরের দরজা চলে আসে।
ওটা বন্ধ ছিল।
ওপাশে ভেতরে যেন বেশ একটা ব্যস্ততার আমেজ।
হানিন নিজের গোলাপি রঙের লম্বা গাউনটা পরে, খোলা চুলে হেয়ারব্যান্ড লাগিয়ে মাথা নিচু করে ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছড়ানো মেকআপের জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল।
পাশে ওর খালাতো বোন ফারজানা দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলছিলেন।
ফারজানার স্বামী আমজাদ ভাই, যিনি জুমারেরও কাজিন হন, সাদির সাথে সামনের কাউচে বসে ছিলেন।
খয়েরি রঙের কুর্তা পরা সাদি পেনটা খুলতে খুলতে নিকাহর কাগজপত্র নিয়ে কাউচ থেকে উঠল এবং সামান্য ঝুঁকে সেগুলো জুমারের হাঁটুর ওপর রাখল।
জুমার ড্রেসিং টেবিলের টুলের ওপর বসে ওনাদের দিকেই মুখ করে ছিল।
সে হালকা কাজের একটা সাদা ম্যাক্সি পরে ছিল।
নিচে সিল্কের পায়জামা গোড়ালির সামান্য ওপর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।
কারচুপির কাজ করা ওড়নার পাড়ের সবুজ পাইপিং আর জায়গায় জায়গায় বসানো সবুজ স্টোন ছাড়া পুরো পোশাকটাই ছিল ধবধবে সাদা।
চুলগুলো সোজা করে ওপরে একটা উঁচু খোঁপা করা ছিল, যার ওপর ওড়নাটা পিন দিয়ে আটকানো ছিল।
মেকআপ ছিল একদম হালকা, কানে আর গলায় জ্বলজ্বল করছিল ছোট্ট হিরে।
ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছিল, আর একই সাথে শান্ত।
বেশ ধীরস্থিরভাবে মাথা নিচু করে সে নিকাহনামার পাতাগুলো ওল্টাল, তারপর কাজল কালো গভীর বাদামি চোখ দুটো তুলে সাদির দিকে তাকাল আর প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে ভুরু নাচাল।
“এটা কী?” আমজাদ ভাইয়ের উপস্থিতির কারণে সে মুখে একটা হাসি ধরে রেখে জিজ্ঞেস করল।
সাদিও নিজের দুষ্টুমিভরা হাসিটা চেপে বড্ড নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে বলল—
“এটাকে নিকাহনামা বলে।”
“জি, কিন্তু সাদি... এই সেকশনটা কেটে দিতে আমি সম্ভবত বারণ করেছিলাম।” হাসিমুখে চোখে চোখ রেখে মনে একটু রাগ দেখিয়েই সে জিজ্ঞেস করল।
ওর ইশারা ছিল মেয়েদের তালাকের অধিকার সংক্রান্ত কলামটির দিকে।
“এটা আপনার বাবার ইচ্ছে ছিল, যা আমার মতো একজন বাধ্যগত নাতি পূরণ করেছে। আপনার কোনো আপত্তি আছে?”
জুমার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে হাসিমুখে ওর দিকে তাকাল।
“আমার বাবাকে বলুন, আমি ঠিক যেভাবে বলেছিলাম ঠিক সেইভাবেই নিকাহনামা তৈরি করে যেন আমাকে পাঠান, আমি সাইন করে দেব।” সে কাগজপত্রগুলো ওর দিকে বাড়িয়ে দিল।
সাদি হেসে কাগজের বদলে ওর হাতটা ধরল, ওকে আলতো করে টুল থেকে দাঁড় করিয়ে দরজার কাছে নিয়ে এল।
দরজাটা খুলতেই সামনের লাউঞ্জের দৃশ্যটা চোখে পড়ল।
এখান থেকে বড় আব্বা আর ফারিসকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল, কারণ ওনারা একদম মেইন জায়গায় বসেছিলেন।
“আপনি এই কথাটা আপনার বাবাকে নিজে গিয়ে কেন বলছেন না? ওনার শুনতে কত ভালো লাগবে, তাই না?” একই রকম নিষ্পাপ ভঙ্গিতে সাদি জুমারের দিকে তাকাল।
জুমার সেদিকে মুখ ফেরাল।
আব্বা হাসিমুখে ফারিসের সাথে কথা বলছিলেন।
বড্ড খুশি, আশাবাদী আর আগের চেয়ে অনেক বেশি চনমনে লাগছিল ওনাকে।
এখন আর কিছু করার ছিল না।
সে সবার সামনে কোনো দৃশ্য তৈরি করতে পারছিল না।
জুমার চোখ গরম করে সাদির দিকে তাকাল।
“তুমি জানো কারও ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো ডকুমেন্টে সাইন করানো কত বড় ক্রাইম?”
“জি জানি। তো আপনি আমাকে এই ক্রাইমের জন্য অ্যারেস্ট করিয়ে দিচ্ছেন না কেন?” সে আবারও হাসল।
জুমার ঠোঁট কামড়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে ওকে ঘেন্না মেশানো চোখে দেখতে লাগল।
ঠিক তখনই বড় আব্বার কথা শুনতে শুনতে ফারিস ওনাদের দিকে তাকানোর জন্য মাথা তুলল আর ওর দৃষ্টি আটকে গেল।
করিডোরের মাথায় ঘরের খোলা দরজায় সে সাদির সাথে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওর প্রোফাইলটা দেখা যাচ্ছিল।
মাথায় ওড়না দেওয়া, আর নিচে পা পর্যন্ত নেমে গেছে ম্যাক্সির ঘের।
সে সাদির দিকে তাকিয়ে ছিল।
ফারিস এক পলক ওদিকে তাকাল, তারপর সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে আব্বার দিকে দেখতে লাগল।
“আমি আব্বার সাথে পরে হিসাব চুকিয়ে নেব। আর এটা ভেবো না যে একটা সেকশন কাটা বা না কাটায় আমার রাইটসে কোনো তফাত পড়বে।” দরজায় দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে চাপা গলায় সে ওকে ওয়ার্নিং দিল।
“আইনজীবীরা এক হাজার একটা উপায় জানে, নিজেদের ইচ্ছেমতো আইনকে ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্য।” বেশ বিরক্তি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে সে ঘুরল এবং ঠোঁটে একটা আনুষ্ঠানিক হাসি ফুটিয়ে আবার এসে টুলে বসল।
ঘরের বাকি মানুষজন নিজেদের কথাবার্তার আওয়াজের কারণে ওনাদের এই কথোপকথন সম্পর্কে একেবারেই টের পায়নি।
সে বসতেই সাদি নিকাহনামাটা ওর হাঁটুর ওপর রাখল, ওর একদম কাছাকাছি ঝুঁকে সে কিছু দোয়ার বাক্য পড়ল।
তারপর পেনটা ওর হাতে দিল।
“আপনি কি জুমার ইউসুফ, পিতা ইউসুফ খান... ফারিস গাজী, পিতা জহির গাজীকে দশ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া বর্তমান প্রচলিত মুদ্রা অনুযায়ী আপনার নিকাহে...” আমজাদ ভাই বড্ড গুরুত্বের সাথে নিকাহর লাইনগুলো পড়ছিলেন।
জুমারের মাথা নিচু ছিল আর পেনটা ছিল ওর আঙুলের খাঁজে।
‘আমি তোমাকে শুধু একটা গুলি করব। মাত্র একটা গুলি। I am sorry জুমার!’
“কবুল।” সে মাথা নেড়ে বড্ড নিচু স্বরে বলল।
‘আমি নির্দোষ ছিলাম ম্যাম জুমরাহ, আমি নির্দোষ ছিলাম!’
“কবুল।”
‘আমি... ক্ষমা চাইব না।’
“কবুল।” শেষবারের মতো কথাটা বলার সময় ওর ঝুঁকে থাকা চোখে একটা গোলাপি আভার জলকণা উঁকি দিল।
কিন্তু সে ভেতরের সমস্ত কান্না ভেতরেই চেপে নিল।
ঝটপট নির্দিষ্ট জায়গাগুলোয় সাইন করে দিল।
পেন আর কাগজপত্র সাদির দিকে বাড়িয়ে দিল।
সে কোনো একটা দোয়া পড়তে পড়তে উঠল, জুমারের মাথায় হাত রাখল, ঝুঁকে ওর চুলে আলতো করে একটা চুমু খেল এবং কাগজপত্রগুলো নিয়ে আমজাদ ভাইয়ের সাথে বাইরে চলে গেল।
জুমার মাথা তুলে তাকাল, দেখল হানিন ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে আর ফারজানা বাজি নিজের মেয়ের সাথে একইভাবে বকবক করে যাচ্ছেন; কিন্তু জুমার জানত যে এখন আর কোনো কিছুই আগের মতো থাকবে না।
“মুবারক হো ফুপ্পু।” হানিন আস্তে করে চোখ না মিলিয়েই বলল, তো জুমার মুচকি হেসে মাথা দোলাল।
মুখটা আবার ড্রেসিং মিররের দিকে ঘুরিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল।
কাজ করা এই ভারী পোশাকে ওকে সত্যিই খুব সুন্দর লাগছিল।
অর্ধেক খোলা দরজা দিয়ে বাইরের আওয়াজগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
ইজাব ও কবুলের সেই পবিত্র শব্দগুলো।
সে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে জোর করে একটা হাসি ফুটিয়ে সেই আওয়াজগুলো শুনল।
ফারজানা বাজি আর ওনার মেয়ে বাইরে চলে গেলেন।
হানিন ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে তখন মোনাজাত বা দোয়া হচ্ছিল।
জুমার ঝুঁকে ড্রেসারের দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলল।
দুটো ছোট্ট বক্স বের করল।
একটা কালো মখমলের বক্স আর অন্যটা লাল।
প্রথম বক্সটা খুলতেই দেখা গেল ওটা ভেতর থেকে একদম খালি।
শুধু একটা ছোট্ট কার্ড রাখা ছিল, যাতে ফারিসের লেখা শব্দগুলোর কালি এখনও ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল ছিল।
হানিন কিছুটা চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল, যে কি না একই সাথে দ্বিতীয় নতুন বক্সটাও খুলছিল।
সেটার ভেতরে হোয়াইট গোল্ডের একটা ছোট্ট নথ রাখা ছিল।
“দেখো না। আব্বা আমাকে বিয়ের কী গিফট দিলেন!” জুমার দুই আঙুল দিয়ে নাকের নাকছাবিটা খুলতে খুলতে বলল।
ওটা তুলে রেখে এই নতুন নথটা পরতে হতো।
হানিন আচমকা বড্ড অস্বস্তি নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“আপনি... ওটা খুলবেন না।” সে বুঝতে পারছিল না ও কী বলবে।
নাকছাবি খোলার সময় ওর হাত দুটো থমকে গেল।
প্রশ্নবোধক চোখে হানিনের মুখের দিকে তাকাল।
“কেন?”
“ওটা... ওটা বেশ ভালো লাগছে। ব্যস আপনি এই নথটা পরবেন না।”
“কেন পরবে না?” আওয়াজ শুনে দুজনেই ঘুরে তাকাল।
নুদরাত ফুপ্পু বড় আব্বার হুইলচেয়ারটা ঠেলে নিয়ে আসছিলেন।
তিনি হাসিমুখে জুমারের কাছে এলেন, ওর মাথায় হাত রেখে নিচু স্বরে কোনো একটা দোয়া দিলেন।
হানিন এই পুরো সময়টা বড্ড ছটফট করতে করতে নিজের আঙুল মড়াচ্ছিল।
“হ্যাঁ, তো আমার মেয়ে কেন আমার গিফটটা পরবে না?” তিনি একটু নকল রাগ দেখিয়ে হানিনের দিকে তাকালেন।
“কারণ এই নথটা আমার বড্ড পছন্দ হয়ে গেছে। ফুপ্পুর কাছে তো এর চেয়েও অনেক বেশি দামি জিনিস আগেই আছে। এটা কি আমি রেখে দেব আব্বা?” এক লাফে নথের বক্সটা তুলে নিয়ে বড্ড নিষ্পাপ মুখে চোখের পলক ফেলে সে জিজ্ঞেস করল।
বড় আব্বা হেসে দিলেন।
“আমি এটা আমার মেয়ের জন্য কিনেছিলাম। এখন কোন মেয়ে ওটা রাখবে, তা তোমরা দুজনে মিলে ঠিক করে নাও।” কথাগুলো বলতে বলতে তিনি জুমারের মুখের দিকেও তাকালেন।
সে-ও বড্ড আলতো করে হাসল।
“Sure হানিন। এটা তোমারই হলো।” সে আলগা হয়ে যাওয়া নাকছাবিটা আবার নাকের ভেতর চেপে পরতে লাগল।
আর নুদরাতের হাত জুতো পর্যন্ত গিয়ে গিয়েও আবার থেমে গেল।
“কোনো ভদ্রতা আছে তোমার মধ্যে? আব্বা জুমারকে বিয়ের গিফট দিয়েছেন, কারও গিফট কেড়ে নেওয়া তুমি কোথা থেকে শিখেছ?” রাগে লাল-নীল হতে হতে নুদরাতের ইচ্ছে করছিল ওকে দুটো চড় কষিয়ে দিতে।
“তো বাকি সবকিছুও তো আব্বাই দিয়েছেন ফুপ্পুকে। এখন এটা আমার ভালো লেগে গেছে তো কী হয়েছে?” সে বড্ড ত্যাঁদড়ামি করে মুখ বাঁকিয়ে নিজের দাবিতে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তুই বাড়ি চল, তোকে আমি সোজা করছি! নুদরাত চোখের ইশারায় নিজের আসল উদ্দেশ্যটা বুঝিয়ে দিলেন।
ও একদম বোকার মতো অন্য দিকে তাকাতে লাগল।
জুমার বড় আব্বার সাথে কথা বলছিল।
তারপর তিনি মুচকি হেসে আবার ওকে কোনো একটা দোয়া দিয়ে, নুদরাত ফুপ্পুর সাথে বাইরের দিকে রওনা হলেন।
তখন জুমার ওর দিকে ঘুরল।
“তাহলে তুমি নাক ফোঁড়াচ্ছ? তোমাকে খুব ভালো মানাবে।” হাসিমুখে বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়াল।
আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ওকে বাইরে গিয়ে মেহমানদের সামনে বসতে হবে।
ফারিসের সাথে বসতে হবে।
সে আয়নায় নিজের পুরো রূপটা দেখতে দেখতে, কাঁধ থেকে ওড়নার পিনটা ঠিক করতে লাগল।
হানিন বক্সটা খুলে নথটা নিয়ে এমনিই নাড়াচাড়া করছিল।
আর ঠিক তখনই এই ঘটনাটা ঘটল, যখন ওনারা দুজনেই সেই আওয়াজটা শুনতে পেলেন।
খোলা জানালার ওপাশে বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল ছিল আর মাঝখানে চার ফুটের একটা সরু গলি ছিল, যেখান দিয়ে সাদি মোবাইলে বড্ড তাড়াহুড়ো করে কথা বলতে বলতে আসছিল।
ওর গলার আওয়াজ একদম পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল।
“Yes হালিমা, আমি সোমবার অর্থাৎ কাল সকাল দশটায় আসতে চাই। আসব?” সে মোবাইল কানে ঠেকিয়ে, মাথা নিচু করে বলছিল।
হানিন আর জুমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওদিকে দেখতে লাগল।
নিকাহর ঠিক পরপরই এত ব্যস্ত একটা সময়েও সে এভাবে বাইরে এসে কাউকে কল করছে!
জুমার চোখ দুটো ছোট ছোট করে ওকে দেখতে দেখতে জানালার কাছাকাছি এল।
“Okay। তাহলে আমি দশটায় পৌঁছে যাব। আপনি...” বলতে বলতে মাথা তুলতেই জানালার জালের ওপাশে কনে সেজে দাঁড়িয়ে থাকা জুমারকে দেখতে পেল।
সে ‘আপনি হাশিমকে...’ বলার বদলে “আপনি ওপরে জানিয়ে দেবেন” বলে জলদি করে কলটা কেটে দিল আর জুমারকে দেখে হাসল।
“হুম, তো এই হালিমাটি কে?” সে নিজের দুষ্টুমিভরা হাসিটা চেপে জিজ্ঞেস করল।
সাদি ‘উফ!’ টাইপের একটা এক্সপ্রেশন নিয়ে ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল।
“এমন কিছুই না। একটা meeting-এর জন্য টাইম নিচ্ছিলাম।”
“আর কার সাথে meeting? হালিমার প্যারেন্টসের সাথে?”
“আল্লাহ জুমার! আপনিও না...” সে বড্ড লজ্জিত হয়ে মাথা ঝাড়া দিল।
“আমার সত্যিই ওর বসের সাথে দেখা করতে হবে।”
“আচ্ছা, তো হালিমার বস কে? ওহ!” একইভাবে বড্ড কৌতূহলী ও শান্ত মনে সে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিল।
সাদি একটু ভেবে নিজের থুতনি চুলকাল।
কী জবাব দেবে?
সাত বছরের সমস্ত স্মৃতি যেন এক ধাক্কায় চোখের সামনে ভেসে উঠল আর তারপর—
“উনি... উনি নেসকমের একজন সায়েন্টিস্ট। কাজের সূত্রেই ওনার সাথে দেখা করতে যেতে হতো। আপনিও না সত্যি!” আর বড্ড খামখেয়ালি ভাবে সাদি জুলফিকার ইউসুফ খান একটা মিথ্যে কথা বলে দিল এবং তারপর উল্টো ঘুরে চলে গেল—এটা না জেনেই যে, আজ সে নিজের লাইফের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ভুলটা করে ফেলেছে।
প্রথম ভুলটা তো ওকে কাল ঠিক এই সময়েই করতে হতো।
জুমার নিজের হাসি চেপে ওকে চলে যেতে দেখতে লাগল আর হানিন একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কাঁধ ঝাঁকাল।
ওনারা দুজনে ঘরের ভেতর, আর লাউঞ্জে বসে হাসতে থাকা বড় আব্বা, বড্ড গম্ভীর হয়ে বসে থাকা ফারিস, খাবারের অপেক্ষা করতে থাকা সায়াম, খুশিতে বারবার চোখের কোণ ভেজানো নুদরাত আর কিচেনে হন্যে হয়ে কাজ করতে থাকা সাদাকাত—ওদের কেউই এই সত্যটা জানত না যে, ঠিক ত্রিশ ঘণ্টা বারো মিনিট পর ওনারা সাদি ইউসুফকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন।
চলবে,,,,,

Comments
Post a Comment