নামাল-(Namal) অধ্যায়:১০ পর্ব ৪৫, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:১০


পর্ব :-৪৪


Main to is waste chup hoon ke tamasha na bane, tu samajhta hai mujhe tujhse gila kuch bhi nahi


[আমি তো স্রেফ এই কারণে চুপ করে আছি যাতে লোক হাসানো তামাশা না তৈরি হয়, আর তুমি ভাবছ তোমার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগই নেই!]


---


দুপুরের তুলনায় মলে তখন বেশ ভিড় ছিল।


নিশ্চিন্ত, হাসিখুশি আর ব্যস্ত মানুষজন ওপরে-নিচে, সামনে-পেছনে আসছিল-যাচ্ছিল।


এমন একটা পরিবেশে দোকানের সারির সামনে করিডোর দিয়ে হানিন আর সায়ামও হাঁটছিল।


একটা শপের সামনে এসে সে থামল, সায়ামের দিকে ঘুরল আর দুষ্টুমিভরা চকচকে চোখে ওর দিকে তাকাল।


“এই মোটু আলু! Window shopping-এর দুটো নিয়ম মনে আছে তো?”


কোঁকড়া চুলের সেই রোগা-পাতলা আর লম্বা ছেলেটা চট করে পজিটিভলি মাথা নাড়ল।


“একদম। তুমি আমাকে প্রতিটা জিনিস দেখিয়ে দেখিয়ে বলবে, ‘সায়াম, এটা নিয়ে নাও’ আর আমি একগুঁয়ে বাচ্চাদের মতো ‘no no’ করতে সামনে এগিয়ে যাব।”


“Good!” সে হাসল, তারপর ওর কনুইয়ে নিজের হাত গলিয়ে শপের ভেতরে ঢুকল।


এক এক কদম ফেলে দুজনে র‌্যাকগুলোর দিকে এগিয়ে এল।


হানিন বিভিন্ন ক্যাপ সায়ামকে দেখাতে শুরু করল।


“সায়াম বাবু, দেখো এটা তোমাকে কত কিউট লাগবে!”


সে এক বিগড়ে যাওয়া বাচ্চার ভঙ্গিতে না-সূচক মাথা নেড়ে বলল, “না মামা, আমার এটা চাই না।”


“মামা?” সে মনে চটে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।


সব সেলসম্যান ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিল।


“সায়াম জান!” সে জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আদুরে গলায় বলল, “Behave yourself, নাহলে এখনই তোমার পাপার কাছে কমপ্লেন করছি।”


“কিন্তু মামা আর পাপা তো বেশ কয়েক বছর ধরে ওপরে, accounting-এ আছেন (হিসাব-কিতাব করছেন)।”


বড্ড নিষ্পাপভাবে চোখ পিটপিট করে সে বলল।


আর এর আগেই যে হানিন এই পুরো তামাশার ওপর লানত জানিয়ে ওর কান মলে দেবে, ঠিক তখনই ওর হ্যান্ডব্যাগে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল।


সে জলদি জলদি মোবাইল বের করতে করতে শপের বাইরে চলে এল।


সায়ামও পেছন পেছন ছুটে এল।


“ফুপ্পু আর আম্মু কি শপিং শেষ করে ফেলেছেন? ওনারা কি ডাকছেন?” হানিন মোবাইল বের করে দেখছিল আর সায়াম প্রশ্ন করছিল।


এটা আসলে জুমারের মোবাইল ছিল, যা কিছুক্ষণ আগেই সে হানিনকে দিয়েছিল।


কারণ সে আর নুদরাত ওপরের ফ্লোরে নিকাহর জোড়া কিনতে গিয়েছিল আর সায়াম ও হানিন এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসে থাকার পাত্র ছিল না।


এমন পরিস্থিতিতে ওদের ফ্রি করে দেওয়ার আগে জুমার নিজের ফোনটা হানিনকে দিয়ে বলেছিল, কাজ শেষ হলে যেন নুদরাতের ফোনে জানিয়ে দেয়।


এখনও সায়াম সেটাই জিজ্ঞেস করছিল, কিন্তু হানিন একদম চুপ মেরে গিয়ে বাজতে থাকা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।


Hashim Kardar calling।


ফোন ধরা হাত দুটো ঘেমে উঠতে লাগল, বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল ভীষণ জোরে।


“ধরো না হানিন, ফুপ্পুর ফোন এটা।” সায়াম ওয়ার্নিং দিল।


কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক রোগে যে আক্রান্ত, সে আর কী-ই বা করতে পারে?


সে বুড়ো আঙুল দিয়ে গ্রিন সার্কেলটা স্লাইড করে মোবাইলটা কানে ঠেকাল।


“Hello?”


“Hello. জুমার?” সে কিছুটা থমকে গেল।


“না, আমি হানিন।” ধড়ফড় করতে থাকা বুক আর এক অবাধ্য খুশিতে সে জলদি জলদি বলতে লাগল।


“আসলে আমরা মলে আছি, ফুপ্পু আর আম্মু একটু দূরে আছেন, সো ওনার ফোনটা আমার কাছেই আছে।”


“Okay, কেমন আছ তুমি হানিন?” সে বড্ড নরম সুরে জিজ্ঞেস করতে লাগল।


“আমি একদম ঠিক আছি। আপনি কেমন আছেন?” সেও ফুল কনফিডেন্সে হেসে বলল।


এই মুহূর্তে ওর খেয়ালই ছিল না সায়ামের দিকে, যে বড্ড বিরক্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।


“আমি সবসময়কার মতোই খুব ভালো আছি।” ওর এই আন্দাজে হানিন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।


“তোমার রেজাল্ট কবে?” এই নেক্সট কোয়েশ্চেনে হানিনের মুখের হাসিটা ফিকে হয়ে গেল।


চট করে সে সায়ামের দিকে তাকাল, যে বড্ড বেজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল।


“আগস্টে।”


“আর...” সে দমে গেল, ঢোক গিলল।


পুরোনো সব মুহূর্ত চোখের সামনে যেন আবার তাজা হয়ে উঠল।


এক্সাম সেন্টারে হাশিমকে ডেকে আনা, তারপর সেই ব্ল্যাক আর গোল্ডেন পার্টি...


“Don’t worry, তোমার রেজাল্ট খুব ভালো আসবে। এত কাঁচা কাজ তো আর হাশিম করেনি, তাই না?” ওর এই নরম সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে সে একটা ফ্যাকাসে হাসি হাসল, কিন্তু এতক্ষণের সেই এক্সাইটেড নার্ভগুলো এখন একদম ঢিলে হয়ে পড়েছিল।


আর আইফেল টাওয়ারের আলোটাও যেন ফিকে হতে শুরু করেছিল।


“আমি ফুপ্পুকে গিয়ে বলছি, উনি আপনাকে call back করবেন।”


“ও কল ব্যাক করবে না। আমি দশ মিনিটের মধ্যে আবার কল করছি।” আর ফোনটা কেটে গেল।


“কী বলছিলেন উনি?”


“আমি নিজেও জানি না উনি কী আর কেন বলছিলেন!” নিজের সাথেই যেন জড়িয়ে গিয়ে সে সামনে এগিয়ে গেল।


ওরা যখন সেই আউটলেটে এল যেখানে জুমার আর আম্মু ছিলেন, তখন দশ মিনিট কেটে গেছে।


ওনারা দুজনে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ছিলেন।


নুদরাত একটা সিম্পল ওড়না মাথায় দিয়ে শপিং ব্যাগে রাখা ড্রেসটা চেক করছিলেন।


কাজ করা ড্রেসটার কালার অফ-হোয়াইট ছিল, সামান্য এক ঝলক দেখেই হানিন তা আন্দাজ করতে পারল।


তারপর সে জুমারের দিকে এগিয়ে এল, যে চুলগুলো অর্ধেক ক্লাচ দিয়ে বেঁধে মাথা নিচু করে বিলের রসিদটা পার্সে রাখছিল।


ওর “ফুপ্পু” ডাকার আওয়াজে সে মুখ তুলল।


সে হানিনের চেয়ে লম্বা ছিল—কমপক্ষে দুই ইঞ্চি লম্বা।


আর অনেক বেশি অ্যাট্রাক্টিভও।


নিজের খয়েরি চোখে হানিনের দিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি করে হাসল।


সে যখন এভাবে হাসত, হানিন তখন বিগত বছরের সমস্ত তিক্ততা আর অভিমান নিমেষেই ভুলে যেতে লাগত।


“হাশিম ভাইয়ের ফোন আসছে।” আবারও বাজতে থাকা সেলফোনটা সে জুমারের দিকে বাড়িয়ে দিল।


জুমার মোবাইলটা সামনে এনে স্ক্রিন দেখল, তারপর একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে কানে ঠেকাল।


“জি হাশিম, বলুন।” বেশ বিজি টোনে পার্সটা বন্ধ করতে করতে সে কথা বলা শুরু করল।


“হানিন বলছিল আপনি শপিং করছেন। আমাকে guess করতে দিন, এটা কি আপনার বিয়ের শপিং?” সে যেন হেসে জিজ্ঞেস করছিল।


জুমার চট করে হানিনের দিকে তাকাল।


হানিন তো হাশিমের কথা শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু তাও জলদি করে বলে উঠল, “আমি call attend করে বলেছিলাম যে আমরা মলে আছি।” এক নিমেষে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হতে লাগল ওর।


চোখ দুটো তখনই নিচু করে নিল সে।


“হাশিম, আপনি কেন ফোন করেছেন?” একদম এক্সপ্রেশনলেস ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করতে করতে সে হানিনের সাথে বাইরে বেরিয়ে এল।


নুদরাত আর সায়াম পাশের শপটায় সায়ামের জামাকাপড়ের জন্য চলে গিয়েছিলেন।


নুদরাত হানিনকেও ডেকেছিলেন, কিন্তু সে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।


“আপনাকে বিয়ের কনগ্রাচুলেশনস জানাতে।”


“এক মিনিট!” সে ফোন কান থেকে না সরিয়েই জোরে হানিনকে ডাকল।


“হানিন, এই ভদ্রলোক যদি নেক্সট পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফোন না কাটেন, তবে তুমি জোরে আমাকে ডেকে বলবে যে ভাবি আমাকে ডাকছেন, okay? হ্যাঁ হাশিম, আপনি কী বলছিলেন?” বড্ড স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে বলতে সে ফোনের দিকে মনোযোগ দিল।


হানিনের তো মুখই হাঁ হয়ে গেল!


সে ওপাশ থেকে জবাবে হা হা করে হেসে উঠল।


“আমি বলছিলাম যে, সেদিন যদি ওই গুলিগুলো আমি আপনাকে মারতাম, তবে কি আপনি আমাকেও বিয়ে করে নিতেন?” সে বড্ড মজা নেওয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছিল।


“না। আমি আপনাকে খুন করতে পছন্দ করতাম, তাও হাজার টুকরো করে।”


“তাহলে ফারিসকে হাজার টুকরো করে খুন করলেন না কেন?” সে পুরো মজা নিচ্ছিল।


“চার বছর ধরে কেন চুপ করে আছেন?”


“একজন ভালো মানুষ যদি কোনো ভুল করে, তবে চুপ থাকাটাই বেটার। কিন্তু আপনার মতো একজন খারাপ মানুষ যদি অন্যায় করে, তবে আমার চুপ থাকা একদমই উচিত নয়।”


সে জবাবে আবারও হেসে উঠল।


জুমার আর হানিন তখনও পাশাপাশি গ্যালারিতে হাঁটছিল।


হানিনের কান পুরোটাই এদিকেই ফোকাস করা ছিল।


“আর এই খারাপ মানুষটাকে বিয়েতে ইনভাইট করলেন না আপনি?”


“এই কোয়েশ্চেনটা আপনি আপনার কাজিনকে করুন। এই ডিসিশনগুলো ওনার।”


“জুমার...” এইবার সে বেশ সিরিয়াস হয়ে বলল, “আপনি ভুল করছেন। ওনাকে বিয়ে করা আপনার একদমই উচিত নয়।”


“এটা আমার পার্সোনাল ম্যাটার, হাশিম!”


“আপনি এটাকে আর পার্সোনাল রাখেননি যখন এটা নিয়ে আমার মম-এর সাথে discuss করেছেন।”


জুমার ক্লান্ত হয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।


“আপনি কী চান?”


“আমি আপনাকে স্রেফ এটা বোঝাতে চাই যে ফারিস আপনার যোগ্য নয়। ওর ক্রাইমটা যদি ভুলেও যান, তাও ওর ওই রুক্ষ স্বভাব, রাগ, কেয়ারলেসনেস... ও আপনার টাইপের মানুষই নয়।” কিছুটা পজ নেওয়ার পর সে যেন জুমারকে ডাকল, “কী ভাবছেন?”


“ওহ, আমি যা ভাবছি তা আপনি বিন্দুমাত্রও জানতে চাইবেন না।” ওর এই কথার স্টাইলে হানিন ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল।


ওনারা দুজনে একটা শপের বাইরে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এবং জুমার এক হাতে শপিং ব্যাগ ধরে অন্য হাতে মোবাইলটা কানে ঠেকিয়ে বড্ড শান্ত মাথায় বলছিল—


“যেমন কী?”


“আমি এটা ভাবছি হাশিম যে, প্রবলেমটা আমি নই, প্রবলেমটা ফারিস। আমি ভাবছি যে ফারিসের প্রতিটা বউই আপনার চোখে খচে। ও যখনই বিয়ে করবে, আপনার সেটা ভালো লাগবে না। আমি ভাবছি যে, একজন ফার্স্ট কাজিন হিসেবে ওর সাথে আপনার একটা না-বলা অবচেতন মনের কম্পিটিশন আছে, তুলনা আছে। আমি ভাবছি যে, জারতাশার বিয়ের দিনও যখন আপনি স্টেজে এসেছিলেন আর আমি ওখানে ছিলাম কিন্তু ফারিস ওখানে ছিল না, তখনও আপনি জারতাশার কাছেও ওর ওই রাগ আর রুক্ষ স্বভাবের কথা তুলেছিলেন, যার কারণে কনের মুখটা একদম মলিন হয়ে গিয়েছিল। আমি এটাও ভাবছি হাশিম যে, আপনি এটা ইচ্ছে করে করেন না। অবচেতন মনে তখনই করেন, যখন আপনার নিজের বিয়ের ফেইলিউরের কথা মনে পড়ে। সো, প্রবলেমটা আমি নই, প্রবলেমটা ফারিস।”


হানিন স্রেফ হা করে ওর দিকে তাকিয়েই যাচ্ছিল, দম আটকে পুরো শকড!


আর ওপাশে হাশিম একদম চুপ মেরে গিয়েছিল।


“Well, আপনি বেশ কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন।” সে যখন বলল, তখন আওয়াজটা বড্ড মৃদু কিন্তু ভারী ছিল।


“আমি কোনো অ্যাপোলজি চাইব না। আপনি যদি আমার পার্সোনাল লাইফে ইন্টারফেয়ার করেন, তবে নিজের পার্সোনাল লাইফ নিয়েও আপনাকে শুনতে হবে।” বড্ড নরম সুরে বলে সে ভুরু নাচিয়ে হানিনের দিকে তাকাল।


সে একদম আমতা-আমতা করে জোরে বলে উঠল—


“ফুপ্পু! আম্মু ডাকছেন!” এটুকু বলেই সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল।


“আপনি শুনতে পেয়েছেন? আমাকে যেতে হবে।” আর মোবাইলটা অফ করতে করতে সে এদিক-ওদিক তাকাল।


“ভাবি কোথায় রয়ে গেলেন?” বড্ড ক্যাজুয়াল টোন, যেন কোনো কথাই হয়নি।


হানিন একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল।


আর সে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথাই বলেনি, যতক্ষণ না ওরা চারজন শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে ওপরের ফুড কোর্টের একটা টেবিলে গিয়ে বসল।


জুমার নুদরাতের সাথে ওনাদের রেস্টুরেন্টের ব্যাপারে কথা বলতে লাগল।


ওই রেস্টুরেন্টটা ওনাদের সেই দিনগুলোয় তৈরি হয়েছিল যখন জুমারের সাথে ওনাদের যোগাযোগ বন্ধ ছিল।


কিন্তু রক্তের সম্পর্কগুলো মিটমাটের পর পুরোনো কথার খেই তোলে না কখনো।


ওরা এমন একটা ভাব করে যেন কখনো কিছুই হয়নি।


এই জিনিসটাই রক্তকে পানির চেয়েও বেশি ঘন করে তোলে।


নুদরাত আর সায়াম উঠে গেলেন যাতে সায়ামের জুতো জোড়া কিনে নিতে পারেন।


হানিন জুসের স্ট্রটা ঘোরাতে ঘোরাতে, চোখ নিচু করে বড্ড স্বাভাবিক গলায় বলল, “হাশিম ভাইয়া নিশ্চয়ই খারাপ পেয়েছেন এত কড়া কথায়।”


“হাশিমের খারাপ লাগায় কার কী আসে যায়?” জুমার হেসে কাঁধ ঝাঁকাল।


তারপর ঘাড়টা একটু বাঁকা করে ওকে খুঁটিয়ে দেখল, “কোনো বিষয় নিয়ে worried আছ নাকি?”


সে চমকে ওর দিকে তাকাল।


“না না, আমার তো কোনো প্রবলেম নেই।” মুখটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল সে।


দেড় বছর আগের চ্যাটিং থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত জুমার কিন্তু কিছুই জানত না।


“Are you sure? যদি কোনো প্রবলেম থাকে তবে অবশ্যই শেয়ার কোরো।” সে বড্ড নরম করে হানিনের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল।


“আপনার এমন কেন মনে হলো?”


“কারণ এখন তুমি বড্ড চুপচাপ থাকো। আগে তো তুমি কত কথা বলতে!”


হানিনের ভুরু জোড়া কুঁচকে গেল।


একটা কড়া নজর নিজের হাতের ওপর রাখা জুমারের হাতের ওপর দিল আর দ্বিতীয় নজরটা জুমারের চোখের ওপর।


“আমি আর আপনি, ফুপ্পু... কখনো একে অপরের সাথে খুব একটা বেশি কথা বলতামই না।” নিজের হাতটা টেনে সরিয়ে নিয়ে সে চেয়ারটা ঠেলে উঠে অন্য দিকে চলে গেল।


জুমার একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে ওকে চলে যেতে দেখতে লাগল।


আর রক্তের সবচেয়ে বড় গুণ আর দোষ এটাই যে, ওটাতে যদি বাইরের হাওয়া লেগে যায়, তবে তা জমে বরফ হয়ে যায়।


আরবের জ্ঞানীরা এই জমে যাওয়াকে ‘আকদ’ বলেন, কিন্তু এটা কেউ বলে দেয় না যে, সেই জমে যাওয়া রক্তকে মানুষ আবার গলাবে কীভাবে?


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Duniya ki wus'aton mein use dhoondta raha... Lekin khuda meri zaat ke andar mila mujhe


[দুনিয়ার বিশালতার মাঝে তাকেই আজীবন খুঁজে বেড়ালাম... অথচ খোদার দেখা মিলল আমার নিজেরই সত্তার গভীরে!]


---


ছোট্ট বাগানওয়ালা বাড়িটার বাইরে তখন রাতের তৃতীয় প্রহর।


গাঢ় বেগুনি আকাশে তারারা ঝকমক করছে।


করিডোরের প্রথম দরজাটা দিয়ে ভেতরে তাকালে দেখা যাবে, গায়ে চাদর টেনে সাদি ঘুমাচ্ছে।


তারপর কোনো আওয়াজ হলো না, কোনো পায়ের শব্দও পাওয়া গেল না; সে আলতো করে নিজের হাতটা সরিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল।


ঘুম জড়ানো চোখ দুটো আঙুলের গিঁট দিয়ে রগড়ে নিল।


এদিক-ওদিক তাকাল।


সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে স্ক্রিনটা অন করল।


ফজরের আজানের আর মাত্র আধ ঘণ্টা বাকি।


ঠোঁটের কোণে কোনো এক দোয়া পড়তে পড়তে সে বিছানা থেকে নামাল আর বাথরুমের দরজার ওপাশে গায়েব হয়ে গেল।


যখন বাইরে বেরোল, তখন সে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, হাত-মুখ আর পাগুলো ভেজা।


সে যখন করিডোর দিয়ে পা টিপে টিপে সদর দরজার দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নুদরাত নিজের ঘরের দরজাটা খুললেন।


ঘুম চোখে বড্ড অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে ওনার ছেলের দিকে তাকালেন।


“সাদি? এখনও তো আজানও হয়নি। তুমি এত ভোরে কেন উঠলে? অ্যালার্ম কি জলদি বেজে গেছে?”


“আমি তো অ্যালার্ম দিই না আম্মু, তুমি জানো না?” সে বড্ড নিষ্পাপ এক বিস্ময় নিয়ে বলল।


“তাহলে উঠলে কীভাবে?”


“আমি স্রেফ রাতে ঘুমানোর সময় আল্লাহ তাআলাকে বলে দিই যে, ‘আমাকে সকালে এই সময়ে জাগিয়ে দিয়ো’, আর আল্লাহ আমাকে জাগিয়ে দেন।” সে বড্ড সরলভাবে হাসল।


“ইমাম সাহেবের শরীরটা রাতে আবারও খারাপ হয়েছিল, আমি ওনাকে বলেছিলাম যে সকালে আমিই ইমামতি করব। এই জন্য একটু জলদি যাচ্ছি।”


“আচ্ছা, সাবধানে যাও।” উনি মনে কিছু একটা পড়ে ওর গায়ে ফুঁ দিলেন এবং তারপর হানিন আর সায়ামের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।


চড়া গলায় বকাঝকা শুরু করলেন, “তোমাদের দুজনের কোনো লজ্জা-শরম আছে? ওঠো, কুরআন পড়ো, নামাজ পড়ো!”


সাদি বাইরে বেরিয়ে আসতেই ভেতরের আওয়াজগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।


কলোনির রাস্তাটা একদম নিঝুম, অন্ধকারে ডুবে ছিল।


সাদি ভোরের তাজা হাওয়াটা অনুভব করে মাথা তুলে তাকাল।


পৃথিবীর মানুষদের কাছে আকাশের তারারা ঝলমল করতে দেখা যাচ্ছিল, আর আকাশের বাসিন্দাদের কাছে পৃথিবীর বুকে কুরআন পাঠকারীদের বাড়িগুলো আলোয় উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছিল।


এটা অন্ধকারের এমন এক মুহূর্ত ছিল, যখন সবচেয়ে বেশি নূর বা আলো ছড়িয়ে পড়ে।


সে কানের ভেতর Hands-free গুঁজল, কুরআন পেনটা বের করল (একটি সাদা কলমের মতো ডিভাইস, যার নিব কুরআনের যেকোনো আয়াতের ওপর রাখলেই সেখান থেকে তিলাওয়াতের রেকর্ডিং বাজতে শুরু করে) আর সূরাগুলোর কার্ডটা বের করে সব সূরার নামের ওপর একটা ভাবুক নজর বোলাল।


প্রতিদিনের ফজর বেলার কুরআনে সে সূরা নামাল ছিল।


নিয়ম অনুযায়ী এর পরের সূরাটা পড়ার কথা, কিন্তু সে ভাবতে লাগল।


তারপর নিজের অভ্যাস মতো পছন্দের সূরা নামালের ওপর পেনের নিবটা রাখল।


মাথা তুলে ভুরু কুঁচকে এক অবুঝ ব্যাকুলতায় আকাশের দিকে তাকাল।


“Okay আল্লাহ তাআলা, I am sorry। আমার কুরআন নিয়ম মেনে ক্রমানুসারে পড়া উচিত, কিন্তু আমি কী করব—আমার এই সূরাটা বড্ড পছন্দ!” তারপর মুচকি হেসে কানের Hands-free-টা ঠিক করতে করতে সে এক এক কদম ফেলে রাস্তার ধার দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।


“আল্লাহ তাআলা, আমার আজও মনে আছে, যখন আমি আব্বুর সাথে মসজিদে আসতাম, তখন উনি আমাকে পিঁপড়েদের সারি দেখাতেন। তখন আমি ভাবতাম, মানুষদের কেন এই কীটপতঙ্গের সাথে তুলনা করা হবে? কিন্তু অনেক বছর পর আমি বুঝতে পারলাম যে, সূরা নামাল স্রেফ কীটপতঙ্গের সূরা নয়, এটা একটা family-র সূরা। একটা পরিবারকে কীভাবে একসাথে জুড়ে রাখতে হয়, তা তুমি আমাকে এই সূরা দিয়েই শিখিয়েছ।”


বেগুনি অন্ধকারের মাঝে সে মাথা নিচু করে মুচকি হেসে মৃদু স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে যাচ্ছিল।


ওপরে কলোনির কোনো একটা বাড়ির ছাদে কেউ একজন ওভাবেই নিজের ফোনটা কানে ঠেকিয়ে বারবার চোখের জল মুছছিল, আর কোনো এক night package-এর কল্যাণে নিজের অসুস্থ boy friend-এর সাথে ফিসফিস করে কথা বলছিল।


সামনের অন্য একটা বাড়িতে একটা ছেলে বিছানায় শুয়ে দুহাতে মোবাইল ধরে খটখট করে মেসেজ টাইপ করছিল আর ওর মুখেও সেই চেনা হাসিটা ছিল, যা প্রেমের রোগে আক্রান্ত মানুষদের মুখে এই শেষ রাতে দেখা যায়।


এটা রাতের সেই দুপুর বেলা, যখন মানুষ স্রেফ নিজের প্রিয়তমার জন্য জেগে থাকে।


“পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।” রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোঁকড়া চুলের সেই ছেলেটার কানে গোঁজা Hands-free-তে তিলাওয়াতের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।


“তা-সীন; এগুলো কুরআনের আয়াত এবং স্পষ্ট কিতাবের।”


হাতে ধরা পেনের পজ বাটনটা সে টিপল।


“Oh Allah!” এক অসহায় মাখানো হাসি নিয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল এবং তারপর না-সূচক মাথা নেড়ে ঘাড় নিচু করে হাঁটতে লাগল।


“মানে আমি মাঝেমধ্যে সত্যি অবাক হয়ে যাই, এই ‘স্পষ্ট কিতাব’-এর কথাটা তুমি কতবার কুরআনে বলেছ! তাও প্রতি কয়েকটা সূরার পরেই কেন এই আয়াতটা নিয়ে আসো তুমি, আল্লাহ? আমাকে একটু ভাবতে দাও।” এবার চোখের পাতা দুটো সামান্য বুজে সে সত্যিই গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো।


“হুম...” আরও কয়েক সেকেন্ড ভেবে সে বিড়বিড় করল।


“প্রতিবার এই আয়াতের একটা নতুন মানে আমার সামনে স্পষ্ট হয়। দেখো আল্লাহ, আমি এতটুকু তো জানি যে, এই শব্দগুলোর যদি একটাই মাত্র মানে হতো, তবে তা কুরআনে বারবার রিপিট করা হতো না। স্পষ্ট কিতাব, উজ্জ্বল কিতাব—মানে...” সে রাস্তার ধারে পা ফেলতে ফেলতে মাথা নিচু করে বলছিল, “মানে তুমি আমাকে এটা বোঝাচ্ছ যে, সামনে যে আয়াতগুলো তুমি আমাকে দেবে, তা এই কিতাবেরই অংশ, যা ছাড়া দুনিয়ায় আমি অন্য কোনো কিছু থেকেই কোনো আলো পাব না। কোথাও শান্তি পাব না, কোথাও কোনো খুশি পাব না। এই কিতাব ছাড়া আমাকে আর কেউই বলবে না যে আমার কী করা উচিত। কেউ আমার আঙুল ধরে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখাবে না। আমার মনের কথা বুঝে আল্লাহর কথা আর কেউ ওভাবে বোঝাবে না।” মুচকি হেসে বড্ড খুশি মনে বলতে বলতে ওর মুখের এক্সপ্রেশন পাল্টাতে লাগল।


চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত উদাসীনতা নেমে এল।


বুকটা ভারী হয়ে উঠল আবার।


নিজের জীবনের জটিলতা আর চারপাশের বিপদের কথাগুলো মনে পড়ে গেল ওর।


কী হারিয়েছে আর কী পেয়েছে।


বেগুনি ভোরে যেন উদাসীনতার রঙ মিশতে লাগল।


“যারা ঈমান এনেছে, এটি তাদের জন্য হেদায়েত ও সুসংবাদ।” কানের ভেতর সেই গমগমে মিষ্টি আওয়াজটা বিলীন হচ্ছিল।


সে সামনের নিঝুম অন্ধকার রাস্তাটার দিকে বড্ড উদাস চোখে চেয়ে রইল।


“আল্লাহ, তুমি কীভাবে জানতে পারো যে এই আয়াতের পরেই আমি ভীষণ আপসেট হয়ে পড়ব? কীভাবে তুমি ঠিক পরের আয়াতেই মলম নিয়ে হাজির হও? তোমার কি প্রতিটা মানুষের জন্য এতটাই খেয়াল থাকে, নাকি আমি বিন্দুমাত্র special?” নিজের মন খারাপটাকে জোর করে চেপে সে দুষ্টুমিভরা এক হাসিতে নিজেই হেসে দিল।


“সুসংবাদ...” একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল সে।


“সো, এই কিতাবটা পড়া এই জন্য জরুরি কারণ এটা আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়, তাই না আল্লাহ? তুমি এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আমাকে শিখিয়েছ যে, খারাপ দিনগুলোয় মানুষ কীভাবে সেই দুই চোখের ওপর ভরসা রাখবে, যা তাকে সেই আলো দেখাবে যা এখন হয়তো কাছে নেই, কিন্তু কখনো না কখনো তো আসবে। কখনো তো আমরাও সেই সুখের দিনগুলো দেখব, আল্লাহ, যার প্রমিজ তুমি করেছ। কিন্তু আল্লাহ, এই গুড নিউজটা কি আমার জন্যও? তুমি বলেছ এটা ঈমানদারদের জন্য। কিন্তু আমি তো নিজেই জানি না যে আমি মুমিন কি না! যদি নিজেকে মুমিন ভাবি তবে তা অহংকার হয়ে যাবে, আত্মপূজা হয়ে যাবে, আর নিজেকে যদি মুনাফিক ভাবি তবে তা হবে চরম হতাশা। আমি কীভাবে বুঝব যে আমি একজন মুমিন?”


আজান শুরু হয়ে গেল।


চারপাশের ভেজা বেগুনি রাতের একাকীত্বে যেন এক তীব্র হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল।


হৃদয়ের সমস্ত শূন্যতা এই শেষ রাতের অন্ধকারের সাথে মিলেমিশে একাকার হতে লাগল।


“হেদায়েত ও সুসংবাদ মুমিনদের জন্য। এরা তারাই...” সে আচমকা একদম স্থির হয়ে শুনতে লাগল, “...যারা নিজেদের নামাজ কায়েম করে...” আর বুকের ভেতর যেন একটা স্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল।


“ওহ আল্লাহ! মানে আমি যদি কুরআনের এই সুসংবাদগুলোর আশা রাখতে চাই, তবে আমি কখনো নামাজ ছাড়তে পারি না। যেদিন আমি নামাজ ছেড়ে দেব, ঠিক সেই মুহূর্তেই তুমি আমাকে ছেড়ে দেবে। তুমি চাও আমরা সবাই নামাজ পড়ি, কিন্তু না—নামাজ স্রেফ ‘পড়লেই’ মুক্তি মেলে না। নামাজ কায়েম রাখাই আসল জিনিস। প্রতিটা নামাজ নিজের সঠিক সময়ে এবং সমস্ত নিয়মকানুনের সাথে আদায় করা। আমি নামাজ ছাড়ি না, কিন্তু যেদিন ভাবি যে ‘আজকের দিনটা না হয় থাক’, ঠিক সেদিনই কোনো না কোনো নামাজ কাজা হয়ে যায়। আমার ভাইবোনরা নামাজ পড়ে না। আমার স্রেফ এই একটা কথাই বড্ড কষ্ট দেয় যে, কেয়ামতের দিন যদি তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো, ‘তুমি একা কেন মসজিদে আসতে? তোমার ভাইবোনরা কেন সেই সময় ঘুমিয়ে থাকত?’ তবে আমি কী জবাব দেব?”


বুকের ওপর যেন পাথরের ওজন বাড়তে লাগল।


দুঃখ, একাকীত্ব আর এক তীব্র দুশ্চিন্তা এই শেষ হতে যাওয়া রাতটাকে নিজের চাদরে জড়িয়ে নিল।


কানের ভেতর তিলাওয়াত ওভাবেই জারি ছিল।


“...এবং যারা জাকাত আদায় করে এবং আখেরাতের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।”


“Thank you আল্লাহ।” সে বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল আর নিজের মনেই বলল, “আমি এই তিনটে কাজই করি, কিন্তু তাও নিজের ভালো মানুষ হওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো ভরসা নেই। হয়তো এটাই বেটার। যতক্ষণ আমাদের পাপের guilt আমাদের সাথে থাকবে, আমরা অন্তত তওবা তো করতে থাকব, নিজের ইবাদতের ওপর কোনো অহংকার আসবে না। তাও আমার থেকে ভুল হয়ে যায়, পাপ হয়ে যায়। জানি না এই চারপাশের মানুষজন আমার নামাজ পড়া দেখে, আমার মুখে কুরআনের কথা শুনে আমাকে এত ভালো কেন ভাবে?” সে বড্ড উদাস মনে বলছিল।


“আল্লাহ, যখন মানুষ আমাকে নেক বান্দা বলে, তখন আমার বড্ড গিল্ট ফিল হয়। মানুষের বোঝা উচিত যে, একজন সবচেয়ে ভালো মানুষও দিনে দশ হাজার বার নিজেকে পাপ করা থেকে আটকায়, আর অনেক সময় আটকাতেও পারে না। কত ভালো হতো যদি ঈমান একবারেই মনের ভেতর চলে আসত আর সারাজীবনের গ্যারান্টি হয়ে যেত! এই প্রতিদিন নিজের সাথে যুদ্ধ, গিল্ট আর তওবার এই cycle-টা তো অন্তত থাকত না। তুমি জীবনটাকে এত জটিল কেন বানালে?”


মাথা তুলে সে যেন এক অনুযোগ করল।


দূরের ভোরের পাখিরা ডাকতে শুরু করেছিল।


ওদের নিজেদের এক সুর ছিল।


প্রত্যেকের তাসবিহ বা আরাধনা আলাদা হয়।


“হ্যাঁ... কিন্তু আল্লাহ, আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে যে, একদিন এই জীবনটা তার সমস্ত অপূর্ণ ইচ্ছে আর কষ্ট নিয়ে শেষ হয়ে যাবে, সব দুঃখ মরে যাবে আর সেই বড় দিনটা আসবে যখন আমরা আর তুমি মুখোমুখি দাঁড়াব। আর আমি এটাও জানি যে, নামাজ ছাড়া এবং নিজের সম্পদ আর talent মানুষের কল্যাণে খরচ না করে যদি আমি বলি যে আমার আখেরাতের ওপর বিশ্বাস আছে, তবে তা চরম মিথ্যে হবে। এই বিশ্বাস তো সবারই মুখে মুখে থাকে। কিন্তু আমাকে এই কাজগুলো করে যেতেই হবে। তোমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য, নিজের মনকে বিশ্বাস করানোর জন্য।” সে মাথা নিচু করে গভীর ভাবনায় ডুবে বলতে বলতে যাচ্ছিল।


পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে হয়তো ভাবত, ও Hands-free লাগিয়ে ফোনে কারও সাথে কথা বলছে।


কিন্তু সব কথা তো আর মানুষের বোঝার জন্য হয় না।


তিলাওয়াতের সেই গম্ভীর অথচ সুমধুর কণ্ঠস্বর কানে তখনও ভেসে আসছিল—


“অবশ্যই যারা আখেরাতের ওপর ঈমান আনে না, আমি তাদের কৃতকর্মগুলোকে তাদের চোখে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন করে দিয়েছি, ফলে তারা বিভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়। নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম আজাব এবং আখেরাতে তারাই হবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত।”


রাত তখন একদম শেষের পথে।


পরিবেশের এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নাকি তিলাওয়াতের সেই জাদুকরী আওয়াজ—ওর গায়ের পশম একদম খাড়া হয়ে গেল।


এক অলৌকিক গাম্ভীর্য যেন চারপাশটা গ্রাস করতে লাগল।


এগুলো এমন কিছু মুহূর্ত ছিল, যখন সে সবকিছু ভুলে গেল।


জুমার, ফারিস, হাশিম কিংবা নিজের জীবনের জটিলতা—কোনো কিছুই আর ম্যাটার করছিল না।


চোখের সামনে ভাসছিল স্রেফ নিজের আমলনামা।


“ইয়া আল্লাহ!” সাদি বুক চিরে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল।


“যখন আমি নামাজ পড়ব না, বা কুরআন পড়ব না, কিংবা মানুষের পেছনে আমার ভাগের অংশটুকু খরচ করব না, তখন কি আখেরাতের ওপর আমার ঈমান দুর্বল হয়ে যাবে? আর... আর আমি কি সেইসব মানুষের দলে শামিল হয়ে যাব, যারা অনেক আমল তো করবে কিন্তু দিনশেষে স্রেফ ক্লান্ত হবে?” এক অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, যার উত্তর ওর নিজেরও জানা ছিল।


“যে জিনিসটা আমাকে নামাজ আর কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, আল্লাহর রাস্তা ছাড়া যে উদ্দেশ্যহীন জিনিসে আমি আমার সম্পদ বা আমার ট্যালেন্ট লাগাব, তুমি কি সেই লক্ষ্যহীন জিনিসগুলোকেই আমার চোখে বড্ড আকর্ষণীয় আর সুন্দর করে দেখাতে থাকবে আর তারপর আমি ওগুলোর মাঝেই পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াব? স্রেফ একটা নামাজ ছেড়ে দেওয়া কি এতটাই দামি পড়বে? নামাজ কমতে থাকবে আর ফালতু জিনিসগুলো লাইফে বাড়তে থাকবে? এভাবেই কি চলে যায় ঈমান? স্রেফ একটা নামাজ চলে যাওয়ায়? একটা মিথ্যে বলায়? কারও মন দেওয়ায়?” রাস্তার এক কিনারে সে থমকে দাঁড়াল।


এক পরম বিস্ময়।


চরম এক জাদুকরী অনুভূতি।


মাথা তুলে সে সেই গাঢ় রহস্যময় আকাশের দিকে তাকাল।


বুকটা কানায় কানায় ভরে উঠল ওর।


সে Hands-free-টা কান থেকে নামিয়ে নিল।


“আল্লাহ তাআলা, I am sorry প্রতিটা সেই জিনিসের জন্য, যাকে আমি নামাজের ওপরে জায়গা দিয়েছিলাম। আমি বারবার ক্ষমা চাইব। তুমি দয়া করে ক্ষমা করা বন্ধ কোরো না।” এভাবেই নিজের মনে বিড়বিড় করতে সে পা বাড়াল, যতক্ষণ না সে মসজিদের সদর দরজার সামনে এসে পৌঁছাল।


গুল খান অন্য দিনের চেয়ে আলাদাভাবে আজ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।


সাদি নিজের ফজর বেলার কুরআনে এতটাই মগ্ন ছিল যে, ও ওকে দেখতেই পায়নি।


ঠোঁটের কোণে মৃদু স্বরে তখনও কিছু একটা আউড়ে যাচ্ছিল সে।


জুতো জোড়া খুলতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গুল খান বেশ অবাক হয়ে ওর হাতটা নাড়াল।


“কার সাথে কথা বলছ সাদি ভাই?”


সে যে এতক্ষণ নিজের দোয়া শেষ করে দরুদ পড়ছিল, ঝুঁকে জুতো জোড়া রাখল, তারপর সেই ছোট পাঠান ছেলেটার দিকে তাকাল।


“আমি আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলছিলাম।” আর খালি পায়ে ভেতরের আঙিনায় পা রাখল।


শেষ হতে যাওয়া রাতের এই প্রহরে উঠোনের ইটগুলো বড্ড ঠাণ্ডা ছিল।


“তওবা তওবা!” গুল খান দুই আঙুল দিয়ে একে একে নিজের দুই কান ছুঁয়ে পেছনে হেঁটে এল।


“আল্লাহর সাথে এভাবে কথা বলা যায় না! ওপাশে মসল্লায় (জায়নামাজে) বসে আদবের সাথে কথা বলতে হয়।”


“আমি আদবের সাথেই কথা বলি, যেমনটা নিজের মুরুব্বিদের সাথে বলি।” সে বড্ড নরম সুরে বলতে বলতে ভেতরে চলে গেল।


গুল খানের তো প্রচণ্ড রাগ হলো।


“সাদি ভাই... এখন যদি মৌলভি সাহেব তোমাকে এভাবে কথা বলতে দেখতেন, তবে তোমার ওপর ফতোয়া জারি হয়ে যেত!”


“আচ্ছা, তুমিই বলো আমাকে যে দোয়া কীভাবে করে?” সে বড্ড শান্ত মনে হেসে জামায়াতের মূল ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।


“আদবের সাথে, তমিজের সাথে আর ওই জায়নামাজে বসে দোয়া করা যায়। মাথা নিচু করে, কেঁদে কেঁদে। হ্যাঁ!” হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে সে বেশ বিরক্তি নিয়ে ইশারা করছিল।


সাদি মুচকি হেসে সেই ছোট পাঠান ছেলেটার দিকে তাকাল, যে মাথায় সাদা পেশোয়ারি টুপি পরে, পায়জামার নিচের অংশটুকু গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।


“আল্লাহ আমাদের সেই দোয়াই কবুল করেন গুল খান, যা আমরা মন থেকে চেয়েছি, আর মন থেকে বের হওয়া কথা সবসময় natural হওয়া উচিত। বানানো শব্দ চয়ন আর টিভিতে বসে থাকা আলেমদের মতো কঠিন গুরুগম্ভীর ভাষা নয় ভাই।” সে অসহায়ভাবে না-সূচক মাথা নাড়ল।


“আমি সাধারণ জীবনে যে সহজ ভাষা বলি, আমার সেই natural স্টাইলেই আল্লাহর সাথে কথা বলা উচিত।”


“তওবা! তুমি হাঁটতে হাঁটতে কোন কথা বলছিলে, হ্যাঁ?” ওর ভেতরের মুফতি সাহেব যেন এটা হজমই করতে পারছিলেন না, সে চোখ গরম করে সন্দেহের দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল।


“আমি ফজর বেলার কুরআন শুনছিলাম, প্রতিটা আয়াতের ব্যাপারে আমার নিজের চিন্তাভাবনা আল্লাহকে জানাচ্ছিলাম, আর এরপর আমি ওনাকে সেটা বলছিলাম যা আমি কাল করেছি আর যা আজ করব।” মাথায় জালি টুপিটা গলিয়ে সে বড্ড সহজভাবে উত্তর দিল।


বারান্দায় মানুষজন জড়ো হচ্ছিল।


কেউ একজন ওকে সালাম দেওয়ার জন্য থামল, তো ও সেদিকে মনোযোগ দিল।


কথা শেষ করে যখন আবার ঘুরল, তখন দেখল গুল খান বড্ড ভাবুক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।


“আমি তোমাকে আগেও দেখেছি ভাই, তুমি এভাবেই নিজের মনে কথা বলো। তোমাকে এভাবে আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলা কে শিখিয়েছে?”


সে হালকা একটু হাসল, কিন্তু ওটা এক বড্ড উদাসীন হাসি ছিল।


“আমার ফুপ্পু। উনিও একটা সময় এভাবেই দোয়া করতেন।” হাসিটা আস্তে আস্তে ওর ঠোঁট থেকে মিলিয়ে গেল।


“এখন আর করেন না। মানুষ বদলে যায়, মন শক্ত হয়ে যায়।” তারপর সে মাথাটা ঝাড়া দিল।


অনেকগুলো ভাবনাও যেন ঝেঁটিয়ে বিদায় করল মন থেকে।


“তুমি বলো, আজ তোমার তায়া (চাচা) কোন জায়গায় চড় মেরে তোমাকে নামাজের জন্য উঠিয়েছেন?” এইবার সে চোখ ছোট করে গুল খানের মুখটা এদিক-ওদিক থেকে পরখ করল।


“কী!” গুল খান রাগে চোখ দুটো বড় করল।


“আমরা কি এমন কোনো নেশাখোর যে নিজে নিজে উঠতে পারি না, হ্যাঁ?” কোমরে হাত দিয়ে বেশ অভিমান আর রাগ নিয়ে ও ওর দিকে তাকাল।


সাদি ‘আচ্ছা?’ টাইপের এক এক্সপ্রেশন নিয়ে ভুরু ওপরে তুলল।


গুল খান ওভাবেই তাকিয়ে রইল, তারপর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ওর কাছে ঘেঁষে এল।


“ঘাড়ের ওখানটা কি এখনও লাল হয়ে আছে?” বড্ড গোপন সুর নিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।


সাদি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, হো হো করে হেসে ওর মাথায় একটা মৃদু চাপড় দিল আর ইমামতির জায়গার দিকে এগিয়ে গেল।


হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের কাতার সাজানো হচ্ছিল।


নামাজের সময় প্রায় হয়ে এসেছিল।


ব্যস, হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ!


আস-সাবিকুন আস-সাবিকুন! (অগ্রবর্তী দল, অগ্রবর্তী দল!)



🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Maut se kis ko mafar hai magar insano ko... Pehle jeene ka saleeqa to sikhaya jaye


​[মৃত্যু থেকে কারই বা রেহাই আছে, কিন্তু মানুষকে... আগে বেঁচে থাকার সঠিক নিয়মটা তো শেখানো হোক!]


​আর এভাবেই ফজরের সেই মূল্যবান মুহূর্তগুলো মানুষের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল। প্রতিদিন ভোর হবে, কিন্তু সেই বিশেষ দিনের ভোরটি আর কখনো ফিরে আসবে না। সূর্য তার পূর্ণ দীপ্তি নিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, যখন সে সারা-র বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। 


অফিসের পোশাকে তৈরি সাদি নিজের আঙুলে কালচে-সোনালী রঙের কি-চেইন ঘোরাতে ঘোরাতে মেইন ডোরে নক করতেই দরজাটা সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। সামনে নূর স্কুলের ইউনিফর্ম পরে একদম রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে আদর করে সাদি ভেতরে আসতেই দেখল লাউঞ্জে জাকিয়া বেগম আমলের চুল বেঁধে দিচ্ছেন। ওনার এক চোখ ছিল মেয়ের চুলের দিকে আর অন্য চোখ টিভির পর্দায় চিৎকার করতে থাকা এক মহিলার ওপর। সাদির সালাম দেওয়াতে উনি চমকে উঠলেন, তারপর মায়াবী এক হাসিতে ওকে স্বাগত জানালেন। একই সাথে কাজের মেয়েটিকে ডেকে নাস্তা নিয়ে আসতে বললেন।


​“Thank you নানি, আমি নাস্তা করেই এসেছি।” নিজের আম্মুর খালার কাছে বড্ড ভদ্রতার সাথে বিনম্র আপত্তি জানিয়ে সে সোফায় বসল। এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে সে চারদিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাল।


​“আরে সাদি, তুমি?” সারা ভেতর থেকে পার্স আর ব্যাগ নিয়ে বড্ড তাড়াহুড়ো করে আসছিল, ওকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল এবং একই সাথে অন্য হাতে ধরা কিছু কাগজ ব্যাগের ভেতর চালান করে দিল। সে অবলীলায় দাঁড়িয়ে পড়ল।


​“অফিসের রাস্তায় যাচ্ছিলাম, ভাবলাম আপনার সাথে একটু দেখা করে যাই। সেখানে তো একদমই সময় পাওয়া যায় না boss!”


​“কী হয়েছে? সব ঠিক তো?” সে সামনে এগিয়ে এল। চুলে একটা ফ্রেঞ্চ খোঁপা, গায়ে লম্বা কামিজ, ওড়না আর কানে টপস পরা সারা-কে দেখে সাদির মনে হচ্ছিল সে যেন প্রজেক্ট ডাইরেক্টরের অফিসে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি তৈরি।


​“কালকের প্রোগ্রামের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম। আপনি আসছেন তো? জুমার আর ফারিসের নিকাহ কাল।” 


ওর মুখের এক্সপ্রেশনের পরিবর্তনগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করতে করতে সাদি বড্ড সাবধানে শব্দগুলো বেছে নিল। সারা-র ব্যাগে কাগজ গোঁজার হাত দুটো মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে এল, সে ঘাড় ঘোরাল। এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ানো মেয়েদের দিকে তাকাল।


​“তোমাদের ব্যাগগুলো নাও আর গাড়িতে গিয়ে বসো। জলদি করো, আমি আসছি।” তারপর সে মুখটা ওর দিকে ঘোরাল। একটুখানি মলিন হাসল।


​“হ্যাঁ, নুদরাত আপা ফোন করেছিলেন। শুনে খুব ভালো লেগেছে। হ্যাঁ, কিছুটা অবাকও হয়েছে। ফারিস জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে তো মাত্র তিন সপ্তাহ হলো। তবে নিশ্চয়ই এটাই ভালো হবে।” মাথা নেড়ে কথাগুলো বলতে বলতে সে মোবাইলটা ব্যাগের চেইনের পকেটে 

রাখল।


​“আপনি আসছেন তো?”


​“আসলে আাগামীকাল planning 

commission-এর কিছু কর্মকর্তার সাথে আমার একটা meeting আছে।”

​“কাল তো রবিবার, খালামণি!”

​“রবিবারেই তো meeting-টা।” (জাকিয়া বেগম বড্ড ক্লান্ত হয়ে না-সূচক মাথা নাড়লেন)।



​“আপনি তো জানেন, আমি জাস্ট পনেরো মিনিটে planning commission-এর লোকজনের থেকে ওই meeting-এর ডেট আর টাইম বের করে নিতে পারব।”

​“Okay সাদি!” সে দুই হাত তুলে বড্ড সিরিয়াসলি ওর দিকে তাকাল। “আমি আসতে পারব না।”

​“আমরা আপনার ফ্যামিলি, আপনার আসা উচিত। আমি যত বেশি সবাইকে একসাথে জুড়ে রাখতে চাইছি, সবাই যেন ততটাই একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।” সে বড্ড অভিমানী চোখে সারা-র দিকে তাকাল।



​“তুমি তো জানো আমি কোনো gathering-এ যাই না।”


​“আমি স্রেফ এতটুকুই জানি যে, আপনি ফারিস মামুর থেকে নিজেকে আর আপনার বাচ্চাদের দূরে রাখার ট্রাই করছেন।” এক তীব্র ও গভীর দুঃখ মেশানো বিস্ময় নিয়ে সে বলছিল।


 “ও খুনি নয়, You know what!”


​“জুমার আর ফারিসই এই সবকিছুর পেছনে মূল রিজন!” সে বেশ চড়া গলায় বলে উঠল। ওর চোখে কষ্ট, একাকীত্ব আর কান্না সব যেন একসাথে দলা পাকিয়ে ভেসে উঠল। 


“ওকে ফাঁসানোর জন্য ওর ভাই আর বউকে খুন করা হয়েছিল।ফারিস নামের মানেই হলো ‘মুসিবত’ আর আমি আমার বাচ্চাদের প্রতিটা মুসিবত থেকে দূরে রাখতে চাই। কারণ কেউ যখন একবার মারা যায়, সে আর কখনো ফিরে আসে না—তা তুমি তার জন্য যতই প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখো না কেন।”



​সাদি কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল, কিন্তু তারপর শক্তভাবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “You know what, সবচেয়ে বেশি মুসিবতে কোন মানুষগুলো পড়ে? যারা সবচেয়ে বেশি মুসিবত থেকে দূরে থাকার ট্রাই করে।


 See you in office।” আর এই একই গম্ভীর মুখের এক্সপ্রেশন নিয়ে সে জাকিয়া বেগমকে সালাম জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।



​সারা বড্ড আফসোসের সাথে মাথা নাড়ল, তারপর যখন ঘুরল দেখল জাকিয়া বেগম বেশ বিরক্ত চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন।


​“আম্মু, আমি এখন কোনো lecture শোনার মুডে নেই। আমি যখন বলেছি আমরা যাব না, তার মানে আমরা যাব না।” ওনার সাথে আই কন্টাক্ট না করেই সে ব্যাগটা তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে যখন বাইরে বেরোল, তখন সাদির গাড়িটা দূর থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছিল।


 



চলবে,,,,,,

 

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)