নামাল-(Namal) অধ্যায়:১১ পর্ব ৪৮, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
#নামাল-(Namal)
#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi)
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
অধ্যায়:১১
পর্ব ৪৮:-
Qabron mein nahi hum ko kitaabon mein utaaro / Hum log muhabbat ki kahaani mein mare hain
[কবরে নয়, আমাদের বইয়ের পাতায় ঠাঁই দাও; আমরা তো ভালোবাসার গল্পে প্রাণ হারিয়েছি!]
---
ইসলামাবাদের সেই ভোরটা একটু অন্যরকম মলিনতা নিয়ে উদিত হয়েছিল।
নুদরাত রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তা তৈরি করছিলেন।
সাদির ঘরের দরজাটা বন্ধ ছিল; সম্ভবত সে তৈরি হচ্ছিল।
করিডোর ধরে একটু সামনে এগোলে হানিন ওর ঘরের বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছিল।
ওর হাতে একটা সাদা মলাটের বই ছিল, যা কাল রাতে সাদির জিনিসপত্রের মধ্যে দেখে ও চেয়ে নিয়ে এসেছিল।
জুমার এই বইটি কোনোদিন পড়েনি, আর না পড়ার কোনো ইচ্ছে ওর ছিল।
হানিন এখন নখ দিয়ে বইয়ের পাতার কোণগুলো খুঁটতে খুঁটতে গভীর ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিল।
“যাক বাবা, কাল নিকাহর সময় হাশিম ভাই ছিলেন না। ওনাকে দেখলেই আমার পরীক্ষার হলের সেই ঘটনাটা মনে পড়ে যেত আর ভাইয়ের সামনে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হতো,” বড্ড নিচু স্বরে সে বিড়বিড় করল।
পরক্ষণেই চিন্তিত হয়ে ভুরু কুঁচকে ভাবল, “কিন্তু ভাইকে কথাটা বলব কি বলব না?”
এক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে মাথা ঝাড়া দিয়ে সে নিজের দৃষ্টি বইয়ের পাতার দিকে ফিরিয়ে নিল।
মন থেকে সব চিন্তা দূর করে সে বইটা খুলল।
সামনে ঠিক সেই চেনা দরজাটা ছিল, যা ওকে এক নিমেষে শতাব্দী প্রাচীন এক স্বর্ণালি অতীতে নিয়ে যেত।
সে দরজার পাল্লা দুটোকে ধাক্কা দিল।
ভারী কপাট দুটো খুলে গেল।
ওপাশে চাঁদের স্নিগ্ধ ও মিষ্টি আলোয় ভেজা এক মায়াবী রাত।
এক বিস্তীর্ণ খোলা ময়দান আর সামনে হানিন ঘাড় উঁচিয়ে দেখল—এক বিশাল মজবুত দুর্গ, যার সামনে পাহারাদাররা টহল দিচ্ছে।
এই পুরো সাদা-কালো দৃশ্যপটের মাঝে কপালে ছড়ানো চুল, মাথায় হেয়ার ব্যান্ড, গোলাপি কামিজ আর সাদা ট্রাউজার্স পরা মেয়েটিকে একদম আধুনিক আর ফ্রেশ লাগছিল।
কিন্তু বহু শতাব্দী আগের সেই মানুষগুলোর ওকে দেখার কোনো ক্ষমতাই ছিল না।
সে গেট পার হয়ে খোলা উঠোনে চলে এল।
ওটা পেরিয়ে সামনে যেতেই একটা বারান্দা পড়ল।
সে ভেতরে হেঁটে আসতে লাগল।
অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, কিন্তু সে যত দু-কদম করে এগোচ্ছিল, করিডোরের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে রাখা মশালগুলো নিজে থেকেই জ্বলে উঠছিল; যেন প্রাচীনকালের কোনো জাদুকরী স্পর্শ!
অন্ধকার কিছুটা কমে এল।
সে একটা ছোট্ট কুঠুরির সামনে এসে থামল।
মশালের দোদুল্যমান হলদেটে আলোয় দরজায় শিকল দিয়ে বাঁধা বড় বড় তালাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
দেয়ালের গায়ে একটা উঁচুমতো বসার জায়গা ছিল।
হানিন দেয়ালটা ধরে ওই উঁচু জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল, যাতে ওর মুখটা একটা গরাদওয়ালা জানালার সমান সমান্তরালে আসে।
বড্ড ব্যাকুল হয়ে গরাদগুলো শক্ত করে ধরে সে ভেতরের দিকে তাকাল এবং একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
ওর শেখ (শিক্ষাগুরু) একদম জীর্ণ সাদা পোশাক পরে, উসকোখুসকো চুল-দাড়ি আর হাত-মুখে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—জানালা থেকে ঠিক হাত কয়েক ডান দিকে।
“হে শেখ! আমি এত বছর পর এলাম, আর আপনাকে এই অন্ধকার কারাগারে বন্দি দেখছি! এমন কী করেছিলেন আপনি? আপনার খালিফা তো একজন মুসলমান, তাই না?” বড্ড আফসোসের সাথে মাথা নেড়ে সে প্রশ্ন করল।
ভেতরে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৃদ্ধ শিক্ষক বড্ড ক্লান্ত কিন্তু শান্ত চোখে মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালেন।
“শাদ্দুর রিহাল ইলা কাবরিল খলিল।”
(সওয়ারি প্রস্তুত করা পরম বন্ধুর কবরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য।)
“উনি যখন এই কথা বললেন, তখন আপনি কী জবাব দিয়েছিলেন?” সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“বিদআত, বিদআত!”
“উফ!” হানিন বড্ড আফসোসের সাথে ওনার দিকে তাকাল।
“আমরা সবাই তো জানি যে এটা বিদআত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক জিয়ারতের নিয়তে আলাদা করে সওয়ারি বাঁধা বা বিশেষ সফর করা বিদআত; নিয়তটা হওয়া উচিত শুধুমাত্র মসজিদে নববীর, ঠিক আছে, একদম ঠিক আছে।
কিন্তু এই ‘শাদ্দুর রিহাল ইলা কাবরিল খালিল’ কথাটার সরাসরি বিরোধিতা করাটাই আপনাকে এই কারাগারে টেনে নিয়ে এল হে শেখ!” একপ্রকার অনুযোগের দৃষ্টিতে সে ওনার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আই মিন, এভাবে এত খোলামেলা একটা স্ট্যান্ড নেওয়ার কী দরকার ছিল? আর হ্যাঁ, এই স্ট্যান্ড নিয়ে লাভটাই বা কী হলো? এখন তো পুরো দুনিয়া মদিনায় যায় শুধু রওজা মোবারকের নিয়ত নিয়ে, এমনকি মহিলারা জালিগুলোর ওপর দিয়ে দোয়ার চিরকুট পর্যন্ত ছুঁড়ে মারে! এখন কবর আর মসজিদের নিয়তের এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য কেউ বোঝেই না। আমাকেও ভাইয়া এক জমানায় বুঝিয়েছিল, এখন তো সব ভুলেভাল গেছি।”
শেখ চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ওগুলো কেমন যেন কালচে হয়ে যাচ্ছিল।
হানিন মুখটা আরও কিছুটা সামনে বাড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিল।
“আপনার বইপত্র, কলম... সবকিছু কি কেড়ে নিয়েছে ওরা?” উফ বলে সে যন্ত্রণায় চোখ দুটো বন্ধ করল।
“ঠিক আছে, মানুষ অত্যাচারী শাসকের সামনে হকের কথা বলে, কিন্তু তাই বলে কি এতখানি যে নিজের পুরো জীবনটাই এই জেদের পেছনে বরবাদ করে দেবেন? আপনার বইটাও তো অধরা রয়ে গেল। এখন লিখবেন কী দিয়ে?” চোখ খুলে কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে সে ওনার দিকে তাকাল।
ওনার দৃষ্টি তখনও নিজের কালচে হয়ে যাওয়া হাত দুটোর ওপর স্থির ছিল।
আচমকা মেয়েটি চমকে উঠল।
মেঝের ওপর কয়েক টুকরো কয়লা পড়ে ছিল।
ওর দৃষ্টি দেয়াল বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল।
দেয়ালে জায়গায় জায়গায় কয়লা দিয়ে সুন্দর করে বিভিন্ন ইবারত লেখা ছিল—কোরআনের আয়াত, হাদিস এবং আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার পর বেরিয়ে আসা বিভিন্ন চমৎকার পয়েন্ট... পুরো দেয়ালটা ওতে ভরে ছিল।
“যতক্ষণ না আল্লাহ কেড়ে নিচ্ছেন, ততক্ষণ কেউ কিছু কেড়ে নিতে পারে না।” ওকে এভাবে স্তব্ধ ও বিস্ময়াভিভূত হতে দেখে তিনি বলে উঠলেন।
হানিন একদম চুপ হয়ে গেল।
ওর ভেতরের টানটান উত্তেজনা কিছুটা শিথিল হলো, মুখে এক কোমল ভাব ফুটে উঠল।
“আর জীবন যখন সবকিছু কেড়ে নেওয়ার জন্য দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়, তখন কী করা উচিত?” সম্ভবত এই প্রথম সে ওনাকে কোনো প্রশ্ন করল।
“দোয়া...” তিনি বড্ড মৃদু স্বরে বললেন।
“দোয়া কী করে?” গরাদে মাথা ঠেকিয়ে ওনাকে দেখতে দেখতে সে যেন অন্য কোনো দুনিয়ায় হারিয়ে গেল।
“আসন্ন বিপদকে আটকে দেয়। আর যে বিপদ অলরেডি নেমে এসেছে, ওটাকে হালকা করে দেয়। এটা মুমিনের হাতিয়ার, দ্বীনের স্তম্ভ আর আসমান ও জমিনের নূর।”
ওনার কণ্ঠস্বর কারাগারের উঁচু দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যের সৃষ্টি করছিল।
হানিন একমনে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, হাত দুটো গরাদের ওপর শক্ত করে জমে রইল।
তারপর ওর কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মস্তিষ্কটা আবার একটু তর্কের খাতিরে কথা খোঁজার চেষ্টা করল।
“আপনার বিপদ হয়তো দোয়া দিয়ে কেটে যায়, কিন্তু আমাদের বিপদ তো দূর হয় না।”
“দোয়া যদি বিপদের চেয়ে দুর্বল হয়, তবে বিপদ জয়ী হবে। আর দোয়া যদি মজবুত হয়, তবে দোয়াই জয়ী হবে।”
“আর যদি দুটোই সমান সমান মজবুত হয়? তখন?” সে চট করে বলে উঠল।
“তাহলে দোয়া কিয়ামত পর্যন্ত সেই বিপদের সাথে লড়াই করতেই থাকবে।”
“তার মানে...” সে চমকে উঠল।
“যদি দোয়া করা ছেড়ে দিই বা ওটার তীব্রতা কমিয়ে দিই, তবে বিপদ আমাদের ওপর চেপে বসবে?”
শিক্ষাগুরু মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
হানিন ‘ওহ’ বলে ঠোঁট ওলটাল।
ভুরু কুঁচকে গভীর চিন্তার ভঙ্গিতে সে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আর কী করে দোয়া?”
“দোয়া তাকদির বা ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে, ঠিক যেভাবে নেক আমল বা ভালো কাজ মানুষের আয়ু বাড়ায় আর গুনাহ মানুষকে রিজিক থেকে বঞ্চিত করে।”
কিন্তু ওর চোখে এক অস্বস্তিকর বিভ্রান্তি ফুটে উঠল।
পায়ের গোড়ালি উঁচিয়ে সে আরও একটু ওপরে উঠে বলল, “কিন্তু আমার দোয়া তো কবুলই হয় না!”
প্রাচীন কারাগারের কয়লা দিয়ে লেখা দেয়ালটায় পিঠ ঠেকিয়ে সেই বুজুর্গ মানুষটি মাথা নিচু করে একটু হাসলেন, তারপর না-সূচক মাথা নাড়লেন।
“প্রত্যেকটা মানুষের দোয়াই কবুল হয়, যদি সে তাড়াহুড়ো না করে।”
“তাড়াহুড়ো মানে?”
“মানে হলো, তুমি বলতে শুরু করলে যে—আমি দোয়া করেছি, অনেক দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া তো কবুল হতে দেখছি না! এই কথাটা বলার পর তোমরা হতাশ হয়ে দোয়া করাটাই ছেড়ে দাও।”
সে এতক্ষণ এক হাতের নখ দাঁত দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে কথাগুলো শুনছিল।
শেষ কথাটা শুনতেই অবচেতনভাবেই আঙুলগুলো মুখ থেকে বের করে আনল।
“তার মানে, যখন আমি এই কথাটা বলব, তখন দোয়া কবুল হবে না; কিন্তু যদি এটা না বলি, তবে হয়ে যাবে?”
তিনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।
পেছনের দমকা বাতাসে মশালের আগুনটা দপ করে দুলল।
রাতের রহস্যময়তা যেন আরও বেড়ে গেল।
“আচ্ছা, কিন্তু...” ওর মনে আবার একটু অস্থিরতা দানা বাঁধল।
“কিছু মানুষের দোয়া তো বড্ড তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে যায়। সেটা কি এই জন্য যে তারা খুব নেক বা ভালো মানুষ?”
“সেটাও একটা কারণ,” বলে তিনি একটু থামলেন।
হানিন ওনার কথা শোনার জন্য কান দুটো গরাদের আরও কাছে এগিয়ে নিয়ে গেল।
“কিন্তু দোয়া কবুল হওয়ার আসল রহস্যটা হলো দোয়া প্রার্থীর চাওয়ার ধরন। সে কীভাবে চাচ্ছে আর কতটা ব্যাকুলতা নিয়ে চাচ্ছে।”
“আর এরপর কি সব দোয়া কবুল হয়ে যায়?”
“হ্যাঁ, সবকটি দোয়াই কবুল হয়ে যায়।” তিনি মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
হানিন একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে নিজের কপালটা গরাদের সাথে ঠেকিয়ে দিল।
চোখ দুটো বুজে ফেলল।
‘তাহলে আমি দোয়া করছি যে, ভাইয়া যেন পরীক্ষার হলের সেই পুরো ঘটনাটা শোনার পর আমাকে মাফ করে দেয় আর আমার ওপর একদম রাগ করে না থাকে। আল্লাহ তায়ালা, এমন কি হতে পারে যে সবকিছু এক নিমেষে একদম পারফেক্ট হয়ে যাবে?’ সে যখন বই থেকে মাথা তুলল, তখন পাতার পর পাতা ওভাবেই খোলা পড়ে ছিল।
প্রাচীনকালের সেই মশালগুলোকে সময়ের স্রোত কখন যেন নিভিয়ে দিয়ে গেছে, আর সে নিজের ঘরের বিছানায় বসে আছে।
বইটা বন্ধ করে সে ওড়নাটা মুখের চারপাশ দিয়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল এবং দোয়ার জন্য হাত দুটো তুলল।
বাইরে করিডোরে সাদির ঘরের দরজাটা খুলল।
সে যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন পরনে ছিল একটা কালো রঙের স্যুট।
গ্রে শার্টের ওপর কালো আর সাদার কোণাকুণি স্ট্রাইপ করা একটা চমৎকার টাই বাঁধা ছিল।
ফজর নামাজের পরেই সে গিয়ে চুলগুলো কাটিয়ে এসেছিল।
এখন সামনের চুলে জেল লাগিয়ে পেছনের দিকে আঁচড়ানোতে ওগুলো একদম সোজা লাগছিল, কিন্তু সে ঘুরলে পেছনের কোঁকড়ানো চুলগুলো ঠিকই নজরে আসত।
নুদরাত চায়ের মগ হাতে করিডোরে আসতেই সাদি গোল টেবিলের একপ্রান্তের চেয়ারটা টেনে বসছিল।
“অফিসের জন্য লেট হচ্ছে না তোমার?” বড্ড অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতে করতে তিনি মগটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“না, অফিসে যাচ্ছি না। অন্য একটা কাজে যাচ্ছি।” সে একদম তাড়াহুড়ো না করে বড্ড শান্তিতে চায়ে চুমুক দিতে লাগল।
নুদরাত চোখ সরু করে ওর স্যুটের দিকে তাকালেন।
“তোমার এই বেস্ট স্যুটটা তো তুমি কখনো অফিসেও পরে যাও না। আজ এমন কী স্পেশাল ব্যাপার?”
সাদি চায়ের কাপটা মুখ থেকে নামিয়ে বড্ড সিরিয়াস লুকে ওনার দিকে তাকাল।
“আমি না, পালিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছি।”
তিনি ধপাস করে ওর কাঁধে একটা চড় বসিয়ে দিলেন আর মুখ দিয়ে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘরের দিকে ঘুরে গেলেন।
সে নাস্তা শেষ করে উঠল এবং করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছানো মাত্রই হানিন ঘর থেকে বাইরে বেরোল।
সে মুখের চারপাশে ওড়নাটা জড়িয়ে রেখেছিল আর ওকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছিল।
“তোমার ফজরের আজান কি এই সময়ে হয়?”
“না ওটা...” সে ওতে একদমই পাত্তা দিল না।
“আমরা কি একটু কথা বলতে পারি?”
সাদি বড্ড মনোযোগ দিয়ে ওর দিকে তাকাল, যে বুড়ো আঙুল দিয়ে মাঝখানের আঙুলের নখটা খুঁটতে কথা বলছিল।
“তুমি তো বেশ কয়েক দিন ধরেই বলছ যে কথা বলবে, তারপর আবার নিজেই থেমে যাও।”
হানিনের গলাটা যেন শুকিয়ে আসতে লাগল।
কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট দুটো খুলল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার বন্ধ করে নিল।
“না, আপনি যান; তেমন কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কথা না। অন্য কোনোদিন বলা যাবে।” সে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল।
“Sure?” সাদি বড্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকাল।
হানিন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
সে একটু হাসল এবং ‘খোদাহাফেজ’ বলে ঘুরে চলে গেল।
দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সে ওখানেই বড্ড ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে রইল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Jahannam ho ke jannat, jo bhi hoga, faisla hoga / Yeh kya kam hai ke humara aur us ka saamna hoga
[জাহান্নাম হোক কি জান্নাত, যা-ই হোক না কেন, একটা চূড়ান্ত ফয়সালা তো হবেই; এটাও কি কম কথা যে তাঁর আর আমার সামনাসামনি দেখা হবে!]
---
রাস্তার ঠিক ধারেই সেই বিশাল ইমারতটি তার পুরো রাজকীয় ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওপরের তলার কর্নার অফিসে এক কনকনে ঠান্ডা পরিবেশ।
চওড়া টেবিলের পেছনে নিজের পাওয়ার চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে হাশিম বসল; সে মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে ফাইলপত্রের পাতা উল্টে যাচ্ছিল।
তারপর মুখ তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খাওয়ারের দিকে তাকাল।
“দারুণ কাজ করেছ খাওয়ার!” বড্ড প্রশংসার সুরে ফোল্ডারটা টেবিলের ওপর রেখে সে পেছনের দিকে হেলান দিল।
জানালার পাশে বুকে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়াহেরাত বড্ড বিরক্তি আর অপছন্দের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল।
“ওর বিরুদ্ধে সামান্য একটু ক্লু কি যথেষ্ট? কে জানে ও আমাদের বিরুদ্ধে কত ফাইল আর প্রমাণপত্র জোগাড় করে নিয়ে আসবে!”
“ম্যাম, ডেফিনেটলি ও-ও এতদিনে অনেক কিছু বের করে ফেলেছে, কিন্তু ওর প্রতিটা আঘাত কীভাবে counter করতে হয় তা আমরা খুব ভালো করেই জানি।”
সে নাক সিঁটকে আবার জানালার বাইরে তাকাল।
একটা লম্বা কালো গাউন আর মুক্তোর দুল পরা জওয়াহেরাতকে, কাঁধের ওপর বাদামি চুলগুলো এলিয়ে থাকা অবস্থায়, বড্ড অসন্তুষ্ট আর অস্থির দেখাচ্ছিল।
“আপনি কেন চিন্তা করছেন আম্মু? হাশিম সব সামলে নেবে।” সে একদম রিল্যাক্সড আর শান্ত ছিল।
আর হাশিমের টেবিলের ঠিক সামনে, দেয়াল ঘেঁষে রাখা সোফাগুলোর একটিতে বসে থাকা নওশেরওয়ান একদম নিশ্চুপ ছিল।
ওর চোখ দুটো হালকা লালচে হয়ে আসছিল আর সে একনাগাড়ে গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে ছিল...
ঠিক এই সময়ে ওই ইমারতেরই বেইজমেন্টে সাদি নিজের গাড়ি পার্ক করছিল।
দুপুরবেলা হওয়া সত্ত্বেও বেইজমেন্টটা একদম অন্ধকার হয়ে ছিল।
গাড়ি থামিয়ে সে কিছুক্ষণ অবচেতনভাবেই স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে নিথর হয়ে বসে রইল।
ওর সেই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটার কথা মনে পড়ল, যার ভেতরে থাকা ফাইলগুলো সে কোনোভাবেই ওপেন করতে পারেনি।
হাশিমের বিরুদ্ধে ওর কাছে দেখানোর মতো কোনো প্রমাণই ছিল না, স্রেফ একটা শেষ চাল ছাড়া।
যদি এই চালটা সে ঠিকঠাক খেলে দিতে পারে... তবে সবকিছু একদম ঠিক হয়ে যাবে।
কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা কেটে গেল।
তারপর সে ড্যাশবোর্ড খুলে নিজের ডিজিটাল কোরআন চেইনটা বের করল।
কয়েকটা বোতাম চেপে ঠিক সেখান থেকেই তেলাওয়াত চালু করল, যেখানে সে সেদিন ছেড়ে দিয়েছিল।
ক্বারি সাদ আল-গামদির সেই আবেগঘন কণ্ঠস্বর গাড়ির ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি বিতাড়িত শয়তান থেকে! আর আপনাকে এই কোরআন শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে একজন পরম প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞাত আল্লাহর পক্ষ থেকে।’
সাদির ঠোঁটের কোণে এক বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল।
“আমি ঠিক এই কথাই ভাবছিলাম আল্লাহ তায়ালা, যে আমি এই কোরআনে কী খুঁজছি এই মুহূর্তে, যখন আমার ওপরের তলায় হাশিম ভাইয়ের অফিসে থাকা উচিত ছিল? আর দেখুন, আমি জবাব পেয়ে গেলাম। যখনই আমি কোরআন নিয়ে চিন্তা করি, আমার ভেতরের সব জট নিজে থেকেই খুলতে শুরু করে। এই কোরআন আমাকে স্বয়ং আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তো স্বয়ং আলো, আর সব আলো তো আপনার কাছ থেকেই আসে। আমি এখন বুঝতে পারলাম যে এনার্জিটা আমার দরকার—যা যেকোনো মূসাকে ফেরাউনের দরবারে যাওয়ার জন্য দরকার হয়—তা একমাত্র এই কোরআনই দিতে পারে।” বড্ড হালকা হাসির সাথে সে নিচু স্বরে আপনমনেই বলছিল।
ক্বারি গামদি পরের আয়াতটি একই রকম শান্ত ও সুরেলা কণ্ঠে পড়ছিলেন—‘যখন মূসা তাঁর পরিবারকে বললেন...’
সে আচমকা চমকে উঠল।
চারদিকে তাকাল।
ওকে আল্লাহ, সিরিয়াসলি! আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম যে সামনে মূসা আলাইহিস সালামের কথা আছে।
বাই দ্য ওয়ে আল্লাহ, আপনারও মূসা আলাইহিস সালামের কথা উল্লেখ করতে কত ভালো লাগে না? প্রতি কয়েক আয়াতের পরেই আবার ফেরাউন ও মূসা, আর মূসা ও ফেরাউন।
আই মিন, মাঝে মাঝে আমি বড্ড অবাক হয়ে যাই—কোরআনে অন্য কারও কথা এত বেশি বলা হয়নি, যতটুকু মূসা আলাইহিস সালামের কথা বলা হয়েছে! কেন? সে মুখে কিছু বলল না, স্রেফ মনে মনে ভাবল।
আয়াতটি ওর কানে বেজেই যাচ্ছিল—‘আর যখন মূসা তাঁর পরিবারকে বললেন, আমি একটি আগুন দেখতে পেয়েছি। আমি এখনই সেখান থেকে আপনাদের জন্য কোনো খবর নিয়ে আসছি, অথবা নিয়ে আসছি কোনো জ্বলন্ত অঙ্গার, যাতে আপনারা আগুন পোহাতে পারেন।’
সামান্য একটু বিরতি আসতেই সাদি একটা গভীর নিশ্বাস নিল।
“হে মূসা...” সে সিটের পেছনের দিকে মাথা হেলিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।
বড্ড নিচু স্বরে সাথে সাথে বিড়বিড় করতে লাগল, “তাহলে আল্লাহ তায়ালা, আপনি সূরা নামালের প্রারম্ভিক আয়াতগুলোর পর প্রথম গল্পটার শুরুই করলেন মূসা আলাইহিস সালামের ফ্যামিলিকে দিয়ে। এই জন্যই এই সূরাটা আমার বড্ড প্রিয় আল্লাহ তায়ালা, কারণ এটা ফ্যামিলি ভ্যালুজের সূরা। দেখুন না, মূসা আলাইহিস সালাম যে কথাটা বললেন, সেখানে ‘আপনাদের’ শব্দটা ব্যবহার করলেন। অথচ ওই সময়ে ওনার সাথে শুধু ওনার স্ত্রী ছিলেন, নো ডাউট উনি প্রেগন্যান্ট ছিলেন, কিন্তু সামনে তো শুধু উনি একাই ছিলেন। তাও মূসা আলাইহিস সালাম ওনাকে ‘আপনারা’ বলে সম্বোধন করলেন। রেসপেক্ট দেওয়ার জন্য প্লুরাল শব্দ। আমাদের আম্বিয়াকেরাম—যাঁরা আমাদের আত্মিক পিতা ছিলেন—তাঁদের ম্যানার্স কত চমৎকার ছিল না! কত নরম আর অসাধারণ মানুষ ছিলেন তাঁরা। আমার বিন্দুমাত্র কোনো অবাক লাগে না আল্লাহ তায়ালা যে আপনি কোরআনে প্রতি কয়েক পৃষ্ঠা পরেই মূসা আলাইহিস সালামের কথা নিয়ে আসেন। ওনার মনে নিজের পরিবারের জন্য কতখানি কেয়ার আর চিন্তা ছিল! তাহলে আমরা আমাদের পরিবারের মানুষদের সাথে এতটা সফট কেন হতে পারি না?”
গাড়ির ভেতরে এক নিথর নীরবতা নেমে এল।
তারপর আবার সেই আবেগঘন কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল—‘তারপর যখন মূসা সেখানে (সেই আগুনের কাছে) পৌঁছালেন, তখন তাঁকে আওয়াজ দেওয়া হলো যে—বরকতময় সেই সত্তা যিনি আগুনের মধ্যে আছেন এবং যারা তার চারপাশে আছে। আর পবিত্র আল্লাহ, যিনি রাব্বুল আলামিন বা দুই জাহানের পালনকর্তা।’
সাদি পজ বোতামটা চেপে বন্ধ চোখের মাঝেই কয়েক মুহূর্ত সময় নিল এই শব্দগুলোকে নিজের ভেতরে শুষে নেওয়ার জন্য।
“আল্লাহ, আমি জানি না আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে কেমন লাগবে, তবে আমি এতটুকু জানি যে যখনই আমি কোরআন শুনি, ওটাই আমার জন্য আপনার কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ায়। আর এই শব্দগুলো মাঝে মাঝে আমার ধারণক্ষমতার চেয়েও বড্ড ভারী হয়ে আমার হৃদয়ে নেমে আসে। আমার জন্য এই কোরআন আর এর সাথে জুড়ে থাকা প্রতিটা জিনিস বড্ড বরকতময়, কারণ এই কোরআনই আমাকে জানায় যে আল্লাহ আসলে কে।” সে থামল।
বন্ধ চোখেই চরম ক্লান্তিকর শব্দগুলো উচ্চারণ করার সময় ওর গলার আওয়াজ একদম নিচু হয়ে এল।
“আল্লাহ আমার রব, আর আমার আব্বু আমাকে শিখিয়েছিলেন যে রব কাকে বলে। তিনি, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন; তিনি, যাঁর আমাদের ওপর সবচেয়ে বেশি অধিকার আছে; আর তিনি, যিনি আমাদের হয়ে সমস্ত ফয়সালা করেন। খালেক, মালেক, মুদাব্বির!”
বুড়ো আঙুলটা ওই একই বোতামের ওপর রেখে চাপ দিতেই আয়াতের ধারা আবার জুড়ে গেল—‘হে মূসা! নিঃসন্দেহে আমিই আল্লাহ। মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর নিক্ষেপ করুন আপনার লাঠিটি।’ তারপর যখন মূসা দেখলেন যে ওটা (লাঠিটা) নড়াচড়া করছে, যেন ওটা একটা সাপ, তখন তিনি পেছন ফিরে দৌড় দিলেন এবং পেছনে ফিরেও তাকালেন না। (তখন আল্লাহ বললেন) ‘হে মূসা! ভয় পেয়ো না। নিঃসন্দেহে আমার দরবারে পয়গম্বররা ভয় পায় না।’
সাদি চোখ বন্ধ করে সিটে মাথা ঠেকিয়ে বসেই রইল।
ঠোঁটের কোণের হাসিতে একরাশ বিষাদ মিশে যেতে লাগল।
“পয়গম্বর আসলে কে আল্লাহ? সে, যে ভালোর আদেশ দেয় আর মন্দ থেকে বিরত রাখে। আপনি সব পয়গম্বরদের সাথেই এমনটা করেন, তাই না? ওদের অন্ধকারের মাঝে আলোর একটা ঝলক দেখান, আর যখন ওরা সেই নূরের পিছু পিছু ওটার কাছে চলে আসে, তখন আপনি ওদের জানান যে আল্লাহ আসলে কে। তারপর আপনি ওদের বলেন যে নিজের লাঠিটা সামনে ফেলে দাও। এখানে তো আপনি লাঠি বা ‘আসা’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এই কোরআনেরই অন্য এক জায়গায় আপনি মূসাকে বলেছিলেন—‘ফেলে দাও ওটা, যা তোমার ডান হাতে আছে।’ তো আসল কথা হলো আল্লাহ, সবার ডান হাতে তো আর লাঠি থাকে না। ডান হাতে থাকে মানুষের ট্যালেন্ট, কোনো হুনর বা কোনো দামী জিনিস... তো আল্লাহ, যখন আপনার কোনো প্রিয় বান্দা নিজের সেই জিনিসটা উৎসর্গ করে দেয়, তখন ওটার রেজাল্ট এক নিমেষে এতটাই ভয়ানক, এতটাই ডিলিউশনাল আর ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায় যে মানুষ পেছনে ফিরে না পালিয়ে আর কী করবে? ফেরাউনের জাদুকররা যা-ই বানিয়ে আনুক না কেন, আমার ডান হাতের এই জিনিসটা ওটাকে গিলে খাবে—তা আমি খুব ভালো করেই জানি, আর এটাও জানি যে আল্লাহর দরবারে ওনার পয়গম্বররা কখনো ভয় পায় না—না নিজেদের অতীত নিয়ে, না নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু আমার এই ফেরাউনদের সামনে ভয় পেতে বড্ড ভয় লাগে।” ওর মনটা বড্ড ভারী হয়ে গিয়েছিল, যেন আবার হালকা হওয়ার জন্য ছটফট করছিল।
ডিজিটাল কোরআন চেইনটা অফ করে ড্যাশবোর্ডে রেখে দিল।
গাড়ি লক করল।
চাবি, মোবাইল, ওয়ালেট গুছিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল।
নির্দিষ্ট ফ্লোরে যখন লিফটের দরজাটা খুলে গেল, তখন সামনে একটা ওয়াক-থ্রু গেট বা মেটাল ডিটেক্টর ছিল।
সে ওটার ভেতর দিয়ে না গিয়ে একপাশ দিয়ে গলে সামনে এগিয়ে এল।
কেউ ওকে আটকায়নি।
সে যখন হাশিমের অফিসের সামনে পৌঁছাল, তখন কর্মরত হালিমা-র ঠিক ওপাশে কালো কোট পরে খাওয়ার বড্ড সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল।
“কারদার সাহেব আপনার জন্যই ওয়েট করছেন।” সাদি এই কথা শুনে সামনে এগোতে গেলেই খাওয়ার হাত বাড়িয়ে ওর পথ আগলে ধরল।
সাদি একটা গভীর নিশ্বাস নিল।
“আমার কাছে কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই। চাইলে বডি চেক করে নিতে পারেন,” হাসিমুখে সে বলল।
খাওয়ার বড্ড ভাবলেশহীন মুখে ওর পোশাকটা ভালো করে প্যাট ডাউন করে চেক করল।
ওর সেলফোনটা বের করে হালিমার টেবিলের ঝুড়িতে রেখে দিল।
আর তারপর পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে পেছনে সরল।
সাদি নিজের কোটের বোতামটা বন্ধ করল।
ওপরের পকেটে গোঁজা সিলভার রঙের পেনটা একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Woh chahta tha ke kaasa khareed le mera / Main us ke taaj ki qeemat laga ke laut aaya
[সে চেয়েছিল আমার ভিক্ষার পাত্রটা কিনে নিতে; আর আমি তার রাজমুকুটের দাম হাঁকিয়ে ফিরে এলাম!]
---
ভেতরে অফিসের একপাশে সোফায় নওশেরওয়ান বসে ছিল।
সাদীকে দেখামাত্রই ওর কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল।
সামনের মেইন টেবিলের পেছনে হাশিম বসে ছিল।
ওকে দেখে সে মুচকি হাসল।
জওয়াহেরাত—যিনি এতক্ষণ হাশিমের চেয়ারের পেছনের অংশে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—তিনিও হাসছিলেন।
“আসো সাদি!” হাশিম বড্ড নরম গলায় বলে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং হাত বাড়িয়ে দিল।
সাদি সামনে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল এবং তারপর সামনের চেয়ারটা টেনে বসল।
সে বড্ড গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
“কী নেবে? চা? সফট ড্রিংক?” ইন্টারকমটা হাতে তুলে নিয়েই সে বড্ড ফ্রেন্ডলি টোনে জিজ্ঞেস করল।
“কফি!” সে শুধু এতটুকুই বলল।
হাশিম মাথা নেড়ে সায় দিল এবং রিসিভারটা কানে ঠেকিয়ে বলল, “হালিমা, দুটো চা ভেতরে পাঠিয়ে দাও।” তারপর রিসিভারটা রেখে বড্ড হালকা মেজাজে ওকে টোকা দিল, “এত গরমে তোমার কফি খাওয়া একদম ঠিক না।”
সাদি একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল।
সে হাশিমের কাছ থেকে আর কী-ই বা আশা করতে পারত?
আর তারপর পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের জিপ-লক ব্যাগে বন্দি সেই নেকলেসটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
“আপনার আমানত, যা ভুল করে আপনার কাজের মেয়েটি আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।”
নেকলেসটা টেবিলের ওপরই পড়ে রইল।
কেউ চোখ তুলেও ওটার দিকে তাকাল না।
তারা একনাগাড়ে সাদির দিকেই তাকিয়ে ছিল।
“তুমি কী বলতে চেয়েছিলে সাদি?” হাশিম মুখে সেই একই রকম হাসি ধরে রেখে কথা শুরু করল।
সাদি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দুহাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা খাওয়ারের দিকে তাকাল এবং তারপর হাশিমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়াহেরাতকে দেখল।
“খাওয়ার আমাদের নিজেদের লোক, ওর সামনেই কথা বলতে পারো,” সে হাসিমুখে বলে উঠল।
“I see!” সাদি মাথা নেড়ে সায় দিল, তবে ওর ভেতরের কিছু একটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
তাহলে কি জওয়াহেরাতও এর মধ্যে জড়িত? অনেক কিছু ওর মাথায় পরিষ্কার হয়ে গেল।
তারপর সামান্য একটু গলা খাঁকারি দিয়ে হাশিমের চোখের ওপর দৃষ্টি স্থির করে বলল।
“আমরা যে ধর্ম মেনে চলি হাশিম ভাই, ওটাতে বিভিন্ন বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা স্কুল অব থট বা মাযহাব থাকে। খুনের মাসআলা বা ক্রাইমের ব্যাপারেও দুটো মতামত আছে।” হাশিম ওভাবেই মুচকি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
“প্রথম মাযহাবের বক্তব্য হলো—যদি মন থেকে তওবা করা হয় বা দিয়ত (রক্তপণ) দেওয়া হয়, তবে খুন মাফ হয়ে যায়। তারা হাদিসে বর্ণিত সেই ঘটনাটাকে দলিল হিসেবে পেশ করে, যেখানে বনী ইসরাঈলের এক আলেমের কাছে এমন একজন লোক এসেছিল যে নিরানব্বইটা খুন করেছিল। সে খুনের ক্ষমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় যখন না-সূচক উত্তর পেল, তখন সে রাগে ওই আলেমকেও খুন করে ফেলল। পরে অন্য এক আলেমের কাছে গেলে সে ক্ষমার আশা পায়। যাই হোক, ঘটনাটা নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে।” সে একটু শ্বাস নেওয়ার জন্য থামল।
জওয়াহেরাত আর হাশিমের মুখের হাসিতে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন আসেনি।
পেছনে বসে থাকা নওশেরওয়ান—যে এখান থেকে সাদির পিঠ দেখতে পাচ্ছিল—সে বড্ড তিতা মুখ করে বসে ছিল।
হালিমা ভেতরে এল এবং চা রেখে বাইরে চলে গেল, তখন সে আবার বলতে শুরু করল।
“দ্বিতীয় মাযহাব বা মতবাদ বলে যে—না, খুনের কোনো ক্ষমা নেই। যদি আপনাকে খুনের সাজা অর্থাৎ ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট বা মৃত্যুদণ্ড এই দুনিয়ায় না-ও দেওয়া হয়, তবে দিয়ত বা তওবা দিয়ে বড়জোর একটা আশা করা যেতে পারে যে এগুলো আপনাকে মাফ করিয়ে দেবে; কিন্তু আসল ফয়সালা কিয়ামতের দিন হবে—যখন আল্লাহ মাকতুল বা ভিকটিমের হাতে খুনির কাটা মাথাটা দিয়ে বলবেন যে, নিজের প্রতিশোধ নাও! এই দ্বিতীয় মতবাদ বলে যে, কোরআনে যখন আল্লাহ কোনো গুনাহ বা পাপের কথা উল্লেখ করেন এবং ওটার আজাবের কথা বলেন, তখন একদম শেষে এই কথা বলে দেন যে—তারা আজাবেই থাকবে, শুধু তারা ছাড়া যারা তওবা করেছে এবং নেক আমল করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু খুনের আয়াতগুলোর শেষে এক কঠিন আজাবের হুশিয়ারি শোনানোর পর আল্লাহ কোথাও ‘শুধু তারা ছাড়া’ বা ‘এক্সেপ্ট’ শব্দটা বলেননি। আল্লাহ খুনিদের ব্যাপারে ‘তারা চিরকাল আজাবে থাকবে’ বলেই কথা শেষ করে দিয়েছেন। এখন অনেক মুসলমান প্রথম আকিদা বা বিশ্বাসটা রাখে, আবার অনেকেই দ্বিতীয়টা। আমিও এই দ্বিতীয় মাযহাবেরই লোক, যা বলে যে খুনের কোনো মাফ নেই। জীবন নিয়েছেন যখন, তখন জীবনই দিতে হবে। কারণ প্রতিটা মানুষ নিজের ভাইয়ের জীবনের হেফাজতকারী বা প্রোটেক্টর হয়। একটা খুন মানে তার সাথে জুড়ে থাকা সমস্ত মানুষের খুন। একটা খুন—স্রেফ একটা নিষ্পাপ মুসলমানের খুন, হাশিম ভাই, পবিত্র কাবা শরীফ ভেঙে ফেলার চেয়েও বড় গুনাহ! আর আপনি তো আমার পরিবারের দুজন মানুষকে মেরে ফেলেছেন।” ওর গলার আওয়াজ এবার বেশ চড়ে গেল এবং সামান্য কাঁপতে লাগল।
চোখ দুটোর কোণে এক গভীর দুঃখ আর শোক নেমে এল।
এত বছর পর এই প্রথম হাশিমের মুখের ওপর সে সেই সত্যিটা বলে দিল, যা সে এতকাল নিজের মনের মণিকোঠায় লুকিয়ে রেখেছিল।
কয়েক মুহূর্ত পুরো অফিসে এক পিনপতন নীরবতা ছেয়ে রইল।
এসির সেই কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়াটা যেন এক নিমেষে জাহান্নামের উত্তাপে বদলে যেতে লাগল।
তারপর হাশিম একই রকম নরম গলায় ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আর তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে যে এই সবকিছু আমিই করেছি?”
“স্রেফ আমার মনের সাক্ষ্য, আর কিচ্ছু না।”
হাশিম আর খাওয়ার চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল।
খাওয়ার এখন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, যেখান থেকে সে সাদিকে একদম সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছিল।
জওয়াহেরাত হাশিমের চেয়ারের ওপর নিজের কনুইয়ের ভর দিয়ে একদম সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
চোখে একরাশ বিস্ময় ফুটে উঠল।
“তোমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই?” হাশিম বড্ড অবাক হলো।
“না। আমি সেই রাতের পার্টিতে আপনার ফাইলগুলো চুরি করেছিলাম, কিন্তু আমি ওগুলো ওপেন করতে পারিনি। ফাইলগুলো করাপ্ট হয়ে গিয়েছিল। ওটা আমার যোগ্যতার চেয়েও অনেক ওপরের লেভেলের জিনিস ছিল।”
খাওয়ারের ঘাড়টা যেন গর্বে আরও একটু উঁচিয়ে গেল।
“আমি দেড় বছর ধরে চেষ্টা করেছি যাতে কোনো একটা প্রমাণ জোগাড় করতে পারি, কিন্তু আমাকে আজ অ্যাডমিট করতেই হচ্ছে যে আপনারা বড্ড নিখুঁত কাজ করেছেন।” কিছুটা ক্লান্তি আর প্রশংসার দৃষ্টিতে সে খাওয়ারের দিকে তাকাল।
“দেড় বছর?” হাশিম প্রশ্নবোধক ভুরু কুঁচকাল।
“আপনি যে জারতাশা আর ওয়ারিস গাজীকে খুন করিয়েছেন, তা আমি দীর্ঘ দেড় বছর ধরে জানি। আপনার ভাইয়ের দয়ায়...” সে পেছনের দিকে বসা শেরুর দিকে ইঙ্গিত করল।
“আমি এক রাত আপনাদের বাড়িতে কাটিয়েছিলাম। আপনার সেফ—যা আপনার ডেট অব বার্থ দিয়ে খোলে—ওটার ভেতরে ওয়ারিস মামুর মেয়েদের ছবি রাখা ছিল। আমি ওটা এক পলক দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম যে এই সবকিছু আপনারাই করিয়েছেন।”
শেরুর মুখটা এমন হয়ে গেল যেন কোনো তুর্কিকে কেউ জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়েছে।
হাশিমের মুখের হাসি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
সে স্রেফ একটা কঠোর ও তিরস্কারভরা দৃষ্টি নওশেরওয়ানের ওপর হেনে আবার সাদির দিকে মনোযোগ দিল।
“আর নিজের এই থিওরির ব্যাপারে তুমি আর কাকে কাকে জানিয়েছ?”
“কাউকেও না। কারণ আপনারা তো হলেন একেকজন হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল; কে বিশ্বাস করবে যে আপনারা এই সবকিছু করাতে পারেন!”
হাশিম চেয়ারের ব্যাকরেস্ট ছেড়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বসল।
বড্ড চিন্তিত আর বিভ্রান্তির ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকাল।
“আর তোমার কাছে এটা প্রমাণ করার মতো কিচ্ছু নেই?”
“কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমার কোনো প্রমাণের প্রয়োজনও নেই। আমি এখানে আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে আসিনি। আমি এখানে আপনাকে আমার পরিবারের মুখোমুখি করতে এসেছি।”
“মানে?” জওয়াহেরাত বড্ড অবাক হয়ে চোখ সরু করে ওর দিকে তাকালেন।
“আমি এখানে আপনাকে এটা বলতে এসেছি হাশিম ভাই, যে আপনি নিজের মুখে সত্যিটা স্বীকার করে নিন। আমার ফ্যামিলির সামনে গিয়ে নিজের অপরাধ কবুল করুন। এতে ফারিস গাজী প্রতিটা ব্লেম থেকে একদম ক্লিনচিট পেয়ে যাবে। আপনি সারা খালার কাছে ক্ষমা চান, আর ওনার বাবার রক্তের বদলা বা দিয়তের টাকা ওনার মেয়েদের বুঝিয়ে দিন। আমরা আপনার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে যাব না, আমরা আপনাকে মাফ করে দেব।”
আর হাশিমের এই প্রথম মনে হলো—সে সোনিয়ার বার্থডে পার্টি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যে ‘সাদি সাদি’ বা সাদির ড্রামা নিয়ে এত টেনশনে ছিল, তার পুরোটাই একদম ফালতু ছিল।
এ তো একটা আস্ত আহাম্মক, একটা বোকা আর ইমম্যাচিউর বাচ্চা ছেলে!
আই মিন, এ তো একটা আস্ত গাধা!
আর এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে বড্ড জোরে হেসে উঠল।
জওয়াহেরাতও বেশ স্বস্তির সাথে হাসলেন।
হাসতে হাসতেই হাশিম চায়ের কাপটা ঠোঁটে ঠেকাল, একটা চুমুক দিল এবং তারপর ওটা সরিয়ে রাখল।
“আমাকে একটা কথা বলতে দাও সাদি, আজ তুমি আমাকে সত্যিই বড্ড ডিসঅ্যাপয়েন্ট করেছ। আমি একটা স্যুট স্রেফ একবারই পরি; তুমি আমার এই স্যুটের ফার্স্ট ওয়্যারটাই একদম বরবাদ করে দিলে!”
“জি?” সে বড্ড কনফিউজড হয়ে হাশিমের দিকে তাকাতে লাগল।
“আপনি কি এটা বলতে চাচ্ছেন যে আপনি এই খুনগুলো করেননি? ওহ কম অন হাশিম ভাই! আমরা দুজনেই খুব ভালো করে জানি যে এটা আপনিই করেছেন।”
“আমি তো ডিনাই করিনি!” হাশিম মুখে এক সতেজ হাসি নিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল।
“হ্যাঁ, এটা আমিই করেছি। ওয়ারিস আমার রাস্তায় কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, তাই আমি ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছি। খাওয়ার ওটাকে সুইসাইড বা আত্মহত্যার রূপ দিয়েছিল। কিন্তু ওটুকুই যথেষ্ট ছিল না; ওর মার্ডারটা কভার আপ করার জন্য আমাদের জারতাশা-কেও স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছিল। জুমারকেও ইনজিউরড করতে হয়েছিল, যার জন্য আমার বড্ড আফসোস হয়। হ্যাঁ একদম ঠিক সাদি, এই সবকিছু আমরাই করেছি—মি, খাওয়ার অ্যান্ড মাম্মি।”
সাদির দুঃখভরা দৃষ্টি হাশিমের চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়াহেরাতের ওপর গিয়ে ঠেকল।
তারপর সেখান থেকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খাওয়ারের দিকে চলে গেল।
তার মানে এরা সবাই একসাথে ছিল? একদম প্রথম দিন থেকে?
“কিন্তু তুমি সাদি... তুমি আজ আমাকে বড্ড নিরাশ করেছ। আমার ধারণা ছিল তুমি হয়তো আমার বিরুদ্ধে প্রমাণের কোনো পাহাড় নিয়ে আমার সামনে হাজির হবে। কিন্তু তুমি... তুমি তো ঠিক সেই ইনোসেন্ট বাচ্চাই রয়ে গেছ, যার সাথে আমার সাত বছর আগে দেখা হয়েছিল। তুমি কোন দুনিয়ায় বাস করো?” এবার হাশিমের সত্যি একটু আফসোস হতে লাগল।
সে সামনের দিকে ঝুঁকে দুহাতে তালি বাজানোর মতো করে ক্ষোভের সাথে বলতে লাগল, “তোমার কী মনে হয়েছিল—তুমি খুনের ওপর একটা লম্বা চওড়া স্পিচ মুখস্থ করে আমার সামনে আওড়াবে আর আমি অমনি জলদি গিয়ে তোমার ফ্যামিলির পায়ে পড়ে যাব আর ওনাদের কাছে মিনতি করব যাতে ওনাদের পা ছুঁয়ে মাফ চেয়ে নিই? আই মিন, তুমি এটা ভাবতেও পারলে কী করে?” রাগ আর আফসোসের চেয়ে ওর চোখে বিস্ময়টাই ছিল সবচেয়ে বেশি।
“তাহলে কি আপনি এখনও ক্ষমা চাইবেন না? আপনি এত বড় একটা গিল্ট বা অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন?” সাদি বড্ড তাজ্জব হয়ে ওর দিকে তাকাল।
“তুমি নিজের ব্রেইনটা কোথায় ফেলে এসেছ সাদি? তোমার কী মনে হয় আমরা তোমার কথায় এই কাজ করব? উফ!” জওয়াহেরাতের কাছে ওর প্রতিটা কথাই বড্ড অসহ্য লাগছিল।
“আর আপনি সারা খালাকে দিয়তের টাকাও পে করবেন না?”
“তাহলে কথা শেষমেষ এসে ওই টাকাতেই ঠেকল?” নিজের টাইয়ের নটটা কিছুটা ঢিলে করতে করতে হাশিম চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসল।
“আমি একটা ফুটো পয়সাও দেব না, কী করার আছে তোমার করে নাও!”
“আমি...” সে তীব্র কষ্টের মাঝে একে একে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
“আমি জুমার আর ফারিস মামুকে সবকিছু বলে দেব! ওনারা আমার কথা অবশ্যই বিশ্বাস করবেন!”
কিন্তু খাওয়ার কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে সাদির দিকে তাকাচ্ছিল।
ওর এই রাগের পেছনে কেমন যেন একটা সাজানো নাটক বা কৃত্রিমতা ছিল, অথবা হয়তো এটা ওনার স্রেফ এক ভ্রম ছিল।
“অ্যাটলিস্ট জুমার তো তোমার কথা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করবে না,” জওয়াহেরাত নাক সিঁটকে বললেন।
“ওর মনে ফারিসের প্রতি এত তীব্র ঘৃণা জমে আছে যে সে নিজের পুরো লাইফটাই ফারিসের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বাজি ধরে ফেলেছে; তো সে কীভাবে তোমার এই আজগুবি কথা মেনে নেবে?”
“ওনারা কোনো প্রতিশোধের জন্য এই বিয়ে করেননি!” সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
ওর কান দুটো লাল হয়ে চোখ দুটোর কোণে এক তীব্র ক্ষোভ নেমে এল।
“সে ফারিস গাজীকে কোনোদিনও কোনো ক্ষতি পৌঁছাবে না। যে পারপাসের জন্য আপনি ওনাদের বিয়ের ওপর এত জোর দিচ্ছিলেন, তা কোনোদিনও সাকসেসফুল হবে না!”
“তোমার নিজের ফ্যামিলির ব্যাপারে নিজের ইনফরমেশনগুলো একটু আপডেট করা দরকার সাদি!”
চলবে,,,,,

Comments
Post a Comment