নামাল-(Namal) অধ্যায়:১১ পর্ব ৪৭, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
#নামাল-(Namal)
#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi)
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
অধ্যায়:১১
পর্ব ৪৭:-
A rahi hai chah-e-Yousuf se sada /
ইউসুফের কূপ থেকে অনবরত আওয়াজ আসছে...
Kya main hoon apne bhai ka rakhwala?
বিষয়:-আমি কি আমার ভাইয়ের রক্ষক?
---
আর হাবিল ছিল ভেড়ার পাহারাদার, পক্ষান্তরে কাবিল ছিল মাঠের কৃষক।
এবং সময়ের আবর্তনে এমনটাই ঘটল যে, কাবিল তার বাগানের ফল (কিছুটা নিম্নমানের ফল) নিয়ে এল তার প্রভুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার জন্য, আর হাবিল নিয়ে এল তার পালের প্রথমজাত সুস্থ-সবল ভেড়া, এবং ঈশ্বর হাবিল ও তার উৎসর্গকে সম্মানিত করলেন, কিন্তু কাবিল ও তার উৎসর্গকে সেই সম্মান দিলেন না।
এতে কাবিল অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো, এবং তার মুখ বিষণ্নতায় মলিন হয়ে গেল।
তখন ঈশ্বর কাবিলকে ডেকে বললেন, “তুমি কেন এত রাগে আছ? কেন তোমার মুখ মলিন হয়ে গেছে?”
“যদি তুমি (খাঁটি) পুণ্য করো, তবে কি তা গ্রহণ করা হবে না?”
“আর যদি তুমি (খাঁটি) পুণ্য না করো,”
“তবে পাপ তোমার দোরগোড়ায় ওত পেতে বসে আছে।”
এবং তুমি তার ইচ্ছার অধীন হয়ে গেলে।
আর কাবিল তার ভাই হাবিলের সাথে কথা বলতে লাগল, এবং এমনটাই ঘটল যে, যখন তারা দুজনে মাঠে ছিল, তখন কাবিল তার ভাই হাবিলের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, এবং তাকে হত্যা করে ফেলল।
তখন ঈশ্বর কাবিলকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় তোমার ভাই হাবিল?”
সে উত্তর দিল, “আমি জানি না। আমি কি আমার ভাইয়ের পাহারাদার?”
আর তার ওপর পরমেশ্বর বললেন, “এ তুমি কী করে বসলে?”
“তোমার ভাইয়ের রক্তের চিৎকার”
“জমিনের ভেতর থেকে আমাকে ডাকছে!”
“আর এখন থেকে তুমি এই জমিনে অভিশপ্ত হলে”
“যে নিজের ওষ্ঠাধর উন্মুক্ত করে”
“তোমার ভাইয়ের রক্ত”
“তোমার হাত থেকে শুষে নিয়েছে।”
“এখন যখন তুমি চাষাবাদ করবে,”
“তখন এই জমিন তোমাকে কোনো ফলন দেবে না।”
“একজন ফেরারি আর যাযাবরের মতো”
“তুমি এই জমিনে ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়াবে।”
তখন কাবিল ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলল, “আমার শাস্তি আমার সহ্যক্ষমতার অনেক বাইরে!”
(তাওরাত)
---
নিকাহ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
জুমারকে যখন ভেতর থেকে আনা হলো, তখন একপাশে সায়াম আর অন্যপাশে সাদি ছিল।
সে সাদির কনুই ধরে রেখেছিল আর ওভাবেই ধীর পায়ে পা ফেলে মৃদু হাসিমুখে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল।
সেখানে উপস্থিত সমস্ত মানুষ উঠে দাঁড়ালেন।
ফারিসও।
সে জুমারের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল না।
ওর দৃষ্টি আটকে ছিল সাদির কনুইয়ের ওপর।
জীবনটা বড্ড জটিল হয়ে উঠেছিল।
জুমারকে ওর পাশে বসিয়ে দেওয়া হলে সে-ও একই রকম গাম্ভীর্য নিয়ে বসে পড়ল।
আপাতদৃষ্টিতে সে নুদরাত দিকে মনোযোগ দিয়েছিল, যিনি ওকে কিছু একটা বলছিলেন; কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে ওর প্রোফাইলের অর্ধেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—সে ওড়না আর তারপর হাঁটুর নিচ থেকে ম্যাক্সির ঘেরটা ঠিক করতে করতে, হাসিমুখে কোনো এক আত্মীয়ের মুবারকবাদের জবাব দিচ্ছিল।
সে মেকআপ একদম হালকা রেখেছিল, আর সাধারণ পরিস্থিতিতে (ওর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব বাদ দিয়ে জাস্ট ফেসিয়াল ফিচারের দিক থেকে দেখলে) সে চমৎকার গড়নের অধিকারী ছিল, আজ সত্যি ওকে অপূর্ব লাগছিল।
এবার নুদরাত ঝুঁকে জুমারকে কিছু একটা বলতে লাগলেন।
ওনার চোখ দুটো ছলছল করছিল, যা তিনি বারবার মুছিলেন।
জুমার জবাবে মৃদু হাসিমুখে মাথা নেড়ে সায় জানাচ্ছিল।
মুবারকবাদ, দোয়া, মিষ্টি মুখ—এই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের শেষ অংশটুকুও সম্পন্ন হয়ে গেলে সাদাকাত অন্য কাজের লোকেদের সাথে খাবার টেবিলে সাজাতে লেগে গেল।
সায়াম সোফায় বসেই ঘাড় উঁচিয়ে আসা-যাওয়া করা কাজের লোকেদের ট্রে দেখার চেষ্টা করতেই হানিন ওর হাত চেপে ধরে ওকে শান্ত করল।
“এটা পোলাও আর চিকেন। এত কষ্ট কোরো না। বারবিকিউটা একদম শেষে আসবে। আমি আগেই দেখে এসেছি।” বড্ড নিশ্চিন্ত মনে তথ্যটা দিল সে।
সে ফারিস আর জুমারের সোফার কাছেই বসেছিল।
মাঝখানে শুধু বড় আব্বার হুইলচেয়ারটা ছিল।
হঠাৎ বড় আব্বা হানিনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগলেন, “মেয়ে, তুমি কি ওই nose ring-টা কখনো পরবেও, নাকি আমার মেয়ের থেকে স্রেফ এমনিই কেড়ে নিলে?”
“আপনার যদি মনে হয় যে আপনার এই কথায় আমার সেলফ-রেসপেক্টে লাগবে আর আমি নথটা ফেরত দিয়ে দেব, তবে তেমনটা মোটেও হওয়ার নয়। আমি নরমাল কোনো মেয়ে নই, আমি হানিন। ফুপ্পুকে এই নাকছাবিটাই স্যুট করে। আমি চাই না উনি এটা খুলুন।” সে বড় আব্বার দিকে মুখ নামিয়ে, চোখ গোল গোল করে বলল, আর ফারিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও একবার ওর দিকে তাকাল।
কিন্তু হানিন আপ্রাণ চেষ্টা করছিল যেন সে ফারিসের দিকে ভুল করেও না তাকায়।
হয়তো ওর হাসি পেয়ে যাবে।
কিংবা হয়তো একরাশ কান্না দলা পাকিয়ে আসবে।
নুদরাত কথাটা শুনে ফেলেছিলেন।
বেশ আফসোসের সাথে (আর হানিনকে চোখ গরম করে দেখতে দেখতে) ওনার এই ধৃষ্টতার বিবরণ দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন।
ফারিস নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে পুরো কথাটা শুনল।
কিন্তু চুপ করে রইল।
জুমার স্রেফ আলতো করে এতটুকুই বলল, “হানিন ঠিকই বলছে ভাবি। আমার এই নাকছাবিটা খুব পছন্দ, আমি এটা হারাতেও চাই না।”
ফারিসের মাথা নিচু ছিল, গলার ভেতর ডেবে গিয়ে আবার ভেসে ওঠা শ্বাসনালীর ওঠানামাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
হানিন চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
“এটা কোথা থেকে বানিয়েছিলে?” ফারজানা বাজি জুমারের পাশে এসে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।
“এটা আমার এক স্টুডেন্ট আমাকে দিয়েছিল। আপনি তো জানেনই, মেয়েরা তাদের টিচারদের এমন গিফট দেওয়ার জন্য কতটা ক্রেজি থাকে! আমি সবসময় ফেরত দিয়ে দিই, কিন্তু এটা রেখে দিয়েছিলাম।” সে, যে কি না বাস্তবেও এই নাকছাবির আসল ইতিহাস বা বংশপরিচয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জানত না, বড্ড সরল মনে ওনার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে গেল।
খাবার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।
জিভে জল আনা সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
কথাবার্তা আর হাসাহাসির হুল্লোড়ের মাঝে ফারিস একদম চুপচাপ বসে ছিল।
দৃষ্টি সামনে টেবিলের ওপর স্থির হয়ে ছিল।
পাশে বসা জুমার নিজের জমকালো ওড়নাটা ঠিকঠাক করছিল।
সায়াম খাওয়ার জন্য যাওয়ার সময় ওর হাঁটুর ওপর এক তোড়া ফুল এনে রেখেছিল, যার একটা ডাল ওর ওড়নার জরির কাজের সাথে আটকে গিয়েছিল।
সে জট পাকানো সুতোগুলো থেকে ওটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
বারবার ডালটা ধরে টানছিল, কিন্তু ওটা আলাদা করা যাচ্ছিল না।
সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘাড় বাঁকিয়ে দেখতে লাগল।
সে ভুল দিক থেকে ওটা টানছিল আর এই অনবরত টানাটানি দেখে ফারিসের বড্ড বিরক্তি লাগছিল।
সে হাত বাড়িয়ে ডালটা টেনে বের করে নিল।
জুমার চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল।
চোখাচোখি হলো দুজনের।
ওর মুখের আনুষ্ঠানিক হাসিটা মিলিয়ে গেল।
মুখের ওপর একরাশ বিরক্তি আর রাগ ফুটে উঠল।
“আমার আপনার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।” বড্ড চাপা কিন্তু কঠোর গলায় সে বলল এবং ঝটকা দিয়ে নিজের জমকালো ওড়নাটা ছাড়িয়ে নিল।
“যতদিন বেঁচে থাকবেন, মনে রাখবেন।” আর কিছুটা অন্য পাশে সরে বসল।
যেহেতু খাবার নিয়ে দু-একজন মানুষ এই দিকেই আসছিল, তাই পরের মুহূর্তেই সে মুখের ওপর আবার চট করে হাসি ফুটিয়ে তুলল।
ফারিস কিছু বলল না, স্রেফ ঠোঁট কামড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে টেবিলের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন ঝুঁকে খাবার বেড়ে নিচ্ছিলেন।
চারপাশের দৃশ্যটা আস্তে আস্তে বদলে যেতে লাগল।
বাতাস পালটে গেল।
সময় কয়েক বছর পেছনে চলে গেল।
ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে কাটানো সেই এক বিকেলের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেই দৃশ্যের ওপর এমন একটা হলদেটে ভাব ছড়ানো ছিল, ঠিক যেমনটা পুরনো বইয়ের পাতায় খুঁজে পাওয়া শুকনো ফুলের ওপর থাকে।
লাইব্রেরির জানালা দিয়ে বাইরে নেমে আসা সন্ধেটা ক্রমশ ঘন হতে দেখা যাচ্ছিল।
কোণের একটা টেবিলে কোঁকড়ানো চুলের মেয়েটি বসে ছিল, মাথা নিচু করে কাগজের ওপর কী যেন লিখছিল।
বাঁ দিকে প্রথম চেয়ারটায় সে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বসে জুমারের কাগজপত্রগুলো দেখছিল।
মাথা নিচু করে থাকার কারণে ওর একটা কোঁকড়ানো চুলের লক কাগজের পাতা ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ পাশে রাখা ছোট, পুরনো নোকিয়া ফোনটা সামান্য একটু বেজে উঠেই শান্ত হয়ে গেল।
জুমার কিছুটা বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে ওটার দিকে তাকাল।
“মানুষ কেন যে শুধু missed call দেয়!” সে বিড়বিড় করল।
ওর মুড অফ ছিল আর ওকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
মোবাইলটা তুলে কল ব্যাক করল আর ওটা কানে ঠেকাল।
আঙুলের মাঝে পেনটা ঘোরাতে ঘোরাতে সে ওপাশের নীরবতা শুনতে লাগল।
তারপর যখন কম্পিউটারাইজড আওয়াজ ভেসে এল, ওর চোখে একরাশ বিরক্তি নেমে এল—(ব্যালেন্স শেষ)।
চরম বিরক্তিতে ফোনটা কান থেকে সরিয়ে সে পার্সের ভেতর হাত চালাল।
“মানুষের ফোন যেন কখনো নষ্ট না হয়, ব্যস!”
“এটা কার ফোন?” সে নিজের হাসি চেপে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আমার আম্মুর। প্রিপেইড।” পার্স থেকে একটা স্ক্র্যাচ কার্ড বের করল।
“আমি পোস্টপেইড ইউজ করি, ওটা নষ্ট হয়ে আছে তাই সাময়িকভাবে এটাই...” সে সচরাচর ওর সাথে এত লম্বা ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলত না, এটাও জাস্ট মেজাজ খারাপ থাকার কারণে একনাগাড়ে বলে গেল।
কার্ডটা বের করে মাথা নিচু করে সেটার সিলভার কোটিংটা নখ দিয়ে ঘষতে লাগল।
ফারিসের ভুরু কুঁচকে গেল।
সে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকল।
“শুনুন...” বেশ একটা দ্বিধা নিয়ে সে থামল।
জুমার ঘষতে থাকা নখটা থামিয়ে চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল।
“জি?”
“এটা নখ দিয়ে স্ক্র্যাচ করে না। এদিকে দিন।” পকেট থেকে চাবি বের করতে সে অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল।
জুমার এক পলক ওর হাতের দিকে তাকাল, আরেক পলক কার্ডটার দিকে আর তারপর কার্ডটা ওর হাতের ওপর রাখল।
ফারিস চাবিটা বের করে উঠল আর কার্ডটা স্ক্র্যাচ করতে করতে কয়েক কদম এগিয়ে গেল।
লাইব্রেরিয়ানের টেবিল পর্যন্ত গিয়ে বক্স থেকে দুটো টিস্যু পেপার বের করল এবং ফিরে এল।
চেয়ারটা টেনে বসল।
টিস্যুটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“নখটা পরিষ্কার করে নিন। এই কোটিংটা হেলথের জন্য বেশ ক্ষতিকর।” জুমার টিস্যুটা লুফে নিল আর তারপর নখ পরিষ্কার করতে করতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
সে তখন ওর মোবাইলটা হাতে নিয়ে কার্ডের নাম্বারটা দেখে দেখে টাইপ করছিল।
রিচার্জ করে মোবাইলটা ওর সামনে রাখল।
তারপর ওর মুখের দিকে তাকাল।
সে বড্ড দ্বিধাগ্রস্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
সে যখন কিছুই বলল না, তখন ফারিসকেই বলতে হলো—
“এবার কলটা করুন।”
জুমার কিছু না বলে পার্সের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করে সামনে রাখল।
ফারিস চমকে তাকাল।
ওটা প্লাস্টিকে মোড়ানো নয়টি কার্ডের একটা তাড়া ছিল।
এগুলোর মধ্যে দশ নম্বর কার্ডটা ছিল সেটাই, যা সে এইমাত্র রিচার্জ করে দিল।
কার্ডগুলো তুলে নেওয়ার সময় চাবিটা আবার পকেটে পুরতে পুরতে সে হেসে ফেলল।
আর জুমার... সে-ও মাথা ঝাড়া দিয়ে হেসে দিল।
“Thank you। আমাকে এটা...” নিজের বুড়ো আঙুলের নখটা উঁচিয়ে দেখাল।
“নখ দিয়ে করে না। যতদিন বেঁচে থাকব, মনে রাখব।”
হলদেটে অতীতের সেই সন্ধে সময়ের ধুলোয় আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।
চারপাশের নতুন আর রঙিন দৃশ্যগুলো আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।
গল্পগুজব, হাসির রোল আর থালাবাসনের আওয়াজ।
খাবারের সুবাস।
সে মাথা ঝাড়া দিয়ে আবার বর্তমানে ফিরে এল।
অনুষ্ঠান পুরোদমে চলছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Kash koi hum se bhi poochhe raat gaye tak kyun jaage ho?
[কাশ কেউ আমাদেরও জিজ্ঞেস করত—এত গভীর রাত পর্যন্ত কেন জেগে আছ?]
---
কারদার প্রাসাদের উঁচু স্তম্ভগুলো গভীর রাতেও বেশ আলোয় ঝলমল করছিল।
এমন এক মুহূর্তে ফিওনা লাউঞ্জের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল এবং নওশেরওয়ানের ঘরের দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল।
নওশেরওয়ান ভেতরে ছিল না, সম্ভবত বাথরুমে ছিল।
ঘরের ভেতর একটা আবছা আলো জ্বলছিল।
ফিওনা জলের বালতিটা নিয়ে ব্যালকনির দিকে বাইরে বেরিয়ে এল।
সে একে একে গাছগুলোতে জল দিল।
মাঝে মাঝেই চোখ তুলে অ্যানেক্সির দিকেও দেখে নিচ্ছিল, যেখানে ধবধবে সাদা রঙের পা ছোঁয়া পোশাক পরা এক কনেকে এক মহিলা হাত ধরে গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসছিলেন।
ফিওনা বড্ড আগ্রহ নিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু কনেটির পিঠ ওদিকের দিকে ফেরানো ছিল।
সে কিছুটা হতাশ হয়ে ঘরের ভেতর চলে এল।
ফিরে যাওয়ার সময় সে স্টাডি টেবিলের কাছে এসে থমকে দাঁড়াল।
সেখানে কাগজের একটা খোলা পুরিয়া পড়ে ছিল।
সেটার ওপর সাদা রঙের দানাদার এক বস্তু রাখা ছিল।
সে থতমত খেয়ে ওই পুরিয়াটার দিকে তাকাল।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর ভুরু দুটো বিস্ময়ে কুঁচকে গেল।
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজাটা খুলল।
ফিওনা চমকে উঠে সেদিকে তাকাল, যেখান থেকে সে আসছিল।
উসকোখুসকো পোশাক আর লাল টকটকে চোখ নিয়ে ওকে ভীষণ ক্লান্ত আর অবসন্ন দেখাচ্ছিল।
ফিওনা নড়ল না, ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
নওশেরওয়ান ওকে দেখে চমকে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে ওই পুরিয়াটার দিকে তাকাল।
তারপর ওর ভুরু দুটো কুঁচকে গেল।
চরম বিরক্তি নিয়ে সে মাথা ঝাড়া দিল।
“যাও, গিয়ে হাশিম ভাইকে বলে দাও যে আমি drugs নিচ্ছি।”
ফিওনা শুকনো ঢোক গিলল, মুখে একপ্রকার জোরপূর্বক হাসি ধরে রেখে বলল—
“আমি যদি বাড়ির এক সদস্যের কথা অন্যজনকে বলে বেড়াতাম, তবে মিসেস কারদার আমাকে প্রথম দিনই কাজ থেকে বের করে দিতেন স্যার। আমি আপনার কাজের মেয়ে, আপনার হুকুম মানতে বাধ্য।” বড্ড বাধ্যগতভাবে মাথা নিচু করে সে কথাটা বলতেই নওশেরওয়ান বড্ড সন্দেহী চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর স্টাডি টেবিলের চেয়ারটা টেনে বসল।
চাবির ধারালো লোহার অংশটা দিয়ে ওই দানাদার টুকরোগুলোকে গুঁড়ো গুঁড়ো করতে লাগল।
“স্যার, আমি কি আপনাকে কোনো হেল্প করতে পারি?” কিছুটা সহানুভূতির সুরে সে ড্রাগস নিতে যাওয়া নওশেরওয়ানের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমার আবার কার সাহায্যের প্রয়োজন?” বড্ড উদাসীনভাবে সে কাঁধ ঝাঁকাল, কিন্তু ওর গলার আওয়াজে এক তীব্র বিষাদ মিশে যাচ্ছিল।
“আমি নওশেরওয়ান কারদার, ভাই বলে তুমি একটা মস্ত বড় ফ্যামিলিতে জন্ম নেওয়া একজন মস্ত বড় মানুষ। আমি কেন কারও কাছে সাহায্য চাইতে যাব?” সে যেন নিজের ভাগ্যকে উপহাস করছিল।
ফিওনা বালতিটা ধরে বড্ড চিন্তিত মুখে ভুরু কুঁচকে দু-কদম এগিয়ে এল।
“আপনার ওভাবে ভাবা একদমই উচিত নয়। আপনি সত্যিই একজন বড় মানুষ।” ফিওনা একটু থেমে ওর আরও কিছু গুণবাচক বিশেষণ খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু নওশেরওয়ানের কোনো গুণই ওর মনে পড়ছিল না।
“বড় মানুষ!” মাথা নিচু করে চাবি দিয়ে পাউডারটা টানতে টানতে সে তীব্র বিদ্রূপের সাথে মাথা ঝাড়া দিল।
“জানি না, কে বড় আর কে ছোট! মাম্মি আমার নাম রেখেছিলেন নওশেরওয়ান। জানো এর মানে কী?”
ফিওনা না-সূচক মাথা নাড়ল।
“বাদশাহ। সুপারহিরো। হুহ!” তারপর সে মাথা ঝাড়া দিল।
আচমকা একটা পুরনো স্মৃতি ওর মনে পড়ে গেল।
কোরিয়া গিয়ে অপহরণের নাটক করার কয়েক দিন আগের কথা।
হানিনের জন্য দেওয়া এক ডিনারে যখন সবাই লাউঞ্জে বসে ছিল, তখন জওয়াহেরাত নুদরাতের কোনো একটা কথার জবাবে বলেছিলেন—‘আমার মনে হয় না আমার ছোট ছেলের নামের চেয়ে বেশি সুন্দর কোনো নাম আমার পছন্দ। নওশেরওয়ান। একজন মস্ত বড় বাদশাহ। একজন মস্ত বড় হিরো, সুপারহিরো!’ বড্ড গর্বে ঘাড় সোজা করে নওশেরওয়ানের দিকে তাকিয়ে ওর মা হাসিমুখে কথাগুলো বলেছিলেন।
ও-ও তখন সামান্য একটু হেসেছিল।
আর ওই অতি চালাক মেয়েটি—সেই ভয়ানক চতুর হানিন! সে সঙ্গে সাদির দিকে ঝুঁকে কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল—‘ভাই, এই loser যদি সুপারহিরো হয়, তবে আমি তো নির্ঘাত হেলেন অব ট্রয়!’ আর সাদি বড্ড কষ্ট করে নিজের হাসি চেপে ওকে চুপ থাকতে বলেছিল, কারণ নওশেরওয়ান কাছেই বসে ছিল।
আর সে সেটা শুনে ফেলেছিল...।
“আমার নাম থেকে শুরু করে আমার পার্সোনালিটি পর্যন্ত—আমার প্রতিটা জিনিস নিয়ে ওরা দুজন ঠাট্টা-তামাশা করে।” চাবিটা জোরে জোরে পাউডারটার ওপর চেপে ধরতে ধরতে সে বলছিল।
“ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ওই সাদি... সে সবসময় আমার competition হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাম্মির চোখে, হাশিম ভাইয়ের চোখে সে বড্ড উঁচু মানের একটা জিনিস, আর আমি কী? একটা loser?” ওর কণ্ঠস্বর থেকে বিরক্তি উধাও হয়ে তা এক গভীর কষ্টে রূপ নিচ্ছিল।
ফিওনা বড্ড আফসোসের সাথে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
“সে আমার প্রতিটা রিলেশন নষ্ট করেছে। মাম্মির কাছে আমার নামে কমপ্লেন করত, তখন থেকে আজ পর্যন্ত মাম্মি আমাকে নিয়ে বড্ড insecure থাকেন। হাশিম ভাইকে ওই অপহরণের ব্যাপারটা বলে দিল, তিনি আজ পর্যন্ত আমাকে বিন্দুমাত্র ট্রাস্ট করেন না। কখনো আমার ফোন কেড়ে নেন, তো কখনো আমাকে ধমকে বলেন—‘শেরু, তুমি কিচ্ছু করবে না!’ যেন আমি আর বিশ্বাস করার মতোই যোগ্য নই। না জানি কখন কী করে বসি!” চাবিটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল।
মুখটা এখন ব্যালকনির দরজার দিকে ঘোরানো ছিল আর ওখান থেকে আসা আলোয় ওর চোখে জল চকচক করতে দেখা যাচ্ছিল।
“আর আমার ড্যাডি...” সে ‘ড্যাডি’ আর নিজের মাঝখানে এতখানি দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছিল যে আমি ওনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করতাম যেন উনি আমাকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু উনি আমার সাথে কথাই বলতেন না...” সে চোখ দুটো বন্ধ করল, পুরনো ক্ষতগুলো যেন আবার টাটকা হয়ে উঠল।
“সেদিন রাতে আমি ভেবে নিয়েছিলাম, আজ ঘুমানোর আগে আমি ওনার কাছে যাব, ওনাকে জড়িয়ে ধরব আর... আর এবার উনি আমাকে পাক্কা ক্ষমা করে দেবেন। আর ঠিক সেই রাতেই ফিওনা, আমার ড্যাডি মারা গেলেন।”
ফিওনার মনে হলো যে, এভাবে আপনমনে চোখ বন্ধ করে কথা বলা নওশেরওয়ান সম্ভবত পুরোপুরি মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
স্টাডি টেবিলের পাশের ডাস্টবিনে বেশ কিছু খালি পুরিয়া এইমাত্র ফেলা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল।
“আর উনি এমন একটা পরিস্থিতিতে মারা গেলেন যখন উনি আমার ওপর মারাত্মক রেগে ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল সাদি এর চেয়ে বড় ক্ষতি আমার আর করতে পারবে না। কিন্তু...” কষ্টটা আরও বাড়ল।
“সে করল। যে মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি, সে তাকে ব্ল্যাকমেইল করল আর তারপর আমার আর ওর রিলেশনটাকে এতটাই জটিল করে দিল যে হাশিম ভাই...মাম্মি” সে চোখ খুলল, না-সূচক মাথা নাড়ল।
“এখন উনি আমাকে আর কখনোই ওই মেয়েটার সাথে কোনো রিলেশন রাখতে দেবেন না। সাদি আমার প্রতিটা রিলেশন ধ্বংস করে দিয়েছে। আমিও ওকে কখনো ক্ষমা করব না।” সে নেশাগ্রস্ত ও ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল।
“একদিন আমি ওর ওপর প্রতিশোধ নেব। প্রতিটা জিনিসের প্রতিশোধ। একটু থামো। এবার তুমি যাও ফিওনা। আর কখনো আমার সামনে আসবে না।”
ফিওনা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ‘জি আচ্ছা’ বলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
নওশেরওয়ান চেয়ারে বসে ওভাবেই বাইরের আলোর দিকে তাকিয়ে রইল, যা ঘরের ভেতরের অন্ধকার দূর করার জন্য তখনও বড্ড অপর্যাপ্ত ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Khud ko bikharte dekhte hain, kuch kar nahi paate... Phir bhi log khudaon jaisi baatein karte hain
[নিজেকে ভেঙে চুরমার হতে দেখেও মানুষ কিছুই করতে পারে না... তবুও লোকে খোদার মতো অহংকারী কথা বলে!]
---
সে কতক্ষণ ওভাবেই বসে রইল।
তারপর দরজায় একটা হালকা নক হতেই সে উঠে দাঁড়াল।
টোকা দেওয়ার ধরনটা তার চেনা ছিল, তাই সটান সাইড টেবিল থেকে মাউথ ফ্রেশনারটা তুলে মুখে স্প্রে করে নিল।
এরপর মুখের ওপর জোর করে একটা হাসিখুশি ভাব ফুটিয়ে সে দরজাটা খুলল।
হাশিম কফির মগ হাতে সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
“হুম?”
“সাদি আমার সেক্রেটারিকে ফোন করেছে। সে কাল সকালে আমাদের সাথে দেখা করতে আসবে। একটা পারফেক্ট ফ্যামিলির মতো আমাদের তিনজনকেই ওখানে প্রেজেন্ট থাকতে হবে।” কফির মগে চুমুক দিয়ে গলাধকরণ করতে করতে বড্ড গম্ভীর গলায় সে তাগিদ দিল।
তাকে বেশ রিল্যাক্সড আর কনফিডেন্ট দেখাচ্ছিল।
নওশেরওয়ান আলতো করে মাথা নাড়ল।
“আমি রেডি থাকব।”
হাশিম চলে গেল।
ওর চোখ আর কথার এই অদ্ভুত ধাঁচটা নওশেরওয়ান স্পষ্ট ফিল করতে পারছিল, কিন্তু তখনই পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল।
মেসেজটা চেক করতে করতে সে নিজের ঘরে ফিরে এল।
মগ আর ফোনটা স্টাডি টেবিলের ওপর রাখল এবং ব্যালকনির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সোনিয়াকে পেছন থেকে এসে দুহাতে কোলে তুলে নিল।
ওর গালে একটা চুমু খেয়ে মুখটা নিজের দিকে ঘোরাল।
সোনিয়া ঘাড় পেছনের দিকে হেলিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
“বাবা... ওদিকে কে এসেছে?” মাথাটা সোজা করে বড্ড উজ্জ্বল ও দুষ্টুমিভরা চোখে সে জিজ্ঞেস করল।
হাশিম ব্যালকনির ওপাশে তাকাল, যেখানে রাতের অন্ধকার পুরোপুরি নেমে এসেছে আর নিচে অ্যানেক্সির আলোগুলো জ্বলছে।
একটা গাড়ি ব্যাক করে চলে যাচ্ছিল।
ওটা সাদির গাড়ি ছিল।
আর বারান্দায় সাদা কুর্তা পরে ফারিস দাঁড়িয়ে ছিল।
“আমাদের ফ্যামিলিতে একটা আনপ্লেজেন্ট অ্যাডিশন। কাল সকালে ওনার সাথেও একটা ছোটখাটো সাক্ষাৎ হয়ে যাবে।” নিজের মনেই বড্ড তৃপ্তির সাথে কথাগুলো বিড়বিড় করে সোনিয়াকে কোলে নিয়েই সে স্টাডি টেবিলের দিকে এগিয়ে এল, যেখানে ল্যাপটপটা খোলা ছিল আর বেশ কিছু ফাইল ওর অপেক্ষায় পড়ে ছিল।
“বাবা এখন কাজ করবে আর সোনি এখন ঘুমাতে যাবে, ঠিক আছে?” সে চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে ওকে বলছিল, ঠিক তখনই মোবাইলটা আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখেই হাশিম বড্ড অস্থিরতার সাথে ওটা রিসিভ করল।
“হ্যাঁ খাওয়ার?”
“আপনি একদম ঠিক ছিলেন। সাদি কোনো ফেরেস্তা বা সাধুপুরুষ নয়। আমি দারুণ কিছু প্রমাণ পেয়েছি।” ওপাশ থেকে খাওয়ার অনবরত বলে যাচ্ছিল আর হাশিম মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে তা শুনছিল।
নিমিষেই যেন ওর পুরো দেহ আর মনে এক পরম শান্তি ছড়িয়ে পড়ল।
“দারুণ খাওয়ার! তুমি আরও একবার প্রমাণ করে দিলে যে তুমি আমার জন্য কতটা ইম্পর্ট্যান্ট। কাল আমরা সবাই একসাথে ওই ছেলেটাকে confront করব।” হাসিমুখে সে মোবাইলটা রেখে দিল।
দেয়ালের ওপাশে, নওশেরওয়ান নিজের ঘরে ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওয়ারড্রোবটা খোলাই ছিল।
টাই র্যাক, কাফলিংকস, কোট, শার্ট—সে বড্ড নিখুঁতভাবে প্রতিটা সেকশন থেকে একটা একটা করে জিনিস বেছে নিতে লাগল।
Tom Ford-এর স্যুট, Brioni-এর শার্ট, Zegna-র টাই।
পোশাকের কম্বিনেশনটা ফাইনাল করে সে ওটা সামনে ঝুলিয়ে রাখল।
তারপর একই রকম নীরবতা বজায় রেখে আলমারির একটা পাল্লা খুলল।
ভেতরে একটা ডিজিটাল সেফ ইনস্টল করা ছিল।
সে সেফের পাসকোডটা চাপতেই ছোট দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল।
শেরু হাত ভেতরে ঢুকিয়ে যখন বের করল, তখন ওর হাতে একটা কালো রঙের চকচকে Glock পিস্তল ছিল।
G-41; একদম ব্র্যান্ড নিউ লেটেস্ট মডেল।
সে বুলেটগুলো বের করল এবং সেগুলোকে একটা একটা করে ম্যাগাজিনে ভরতে লাগল।
এক... দুই... (তুমি কি কখনো সেই ডাস্টবিনগুলো দেখেছ যেগুলোর ওপর Use Me লেখা থাকে?)
পাঁচ... ছয়... (হ্যাঁ নওশেরওয়ান, আমার ভাইবোনরা তোমার মতো দামি জিনিসপত্র খুব কমই দেখেছে!)
দশ... এগারো... (আমার বোনের সাথে একটু ভদ্রভাবে কথা বলো, চলো এখান থেকে!)
বারো... আর এই হলো পুরো তেরোটা!
লোডেড পিস্তলটা সে এপাশ-ওপাশ করে ঘুরিয়ে দেখল।
এই ভারী লোহার টুকরোটা হাতে আসতেই যেন ওর পুরো শরীরে এক তীব্র বৈদ্যুতিক কারেন্ট বয়ে গেল।
অহংকারে ঘাড়টা আরও একটু উঁচিয়ে ধরল।
ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“না হাশিম ভাই, আপনি সাদি ইউসুফকে সামলাতে পারবেন না।” পিস্তলটার দিকে চোখ জোড়া স্থির রেখে সে আপনমনেই বিড়বিড় করল।
“এটা এমন একটা প্রবলেম, যা আমি নিজেই সলভ করে নেব। কালকের দিনটাই এই দুনিয়ায় ওর লাস্ট দিন হবে। ব্যস, অনেক হয়েছে!”
একটা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সে কালকের পোশাকের ভেতরের পকেটে পিস্তলটা গুঁজে রাখল এবং তারপর ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Yeh qurb kya hai ke tu saamne hai aur humein... Shumaar abhi se judai ki saatein karni
[এ কেমন নৈকট্য যে তুমি চোখের সামনে আছ, আর আমাদের... এখন থেকেই গুনে যেতে হচ্ছে বিচ্ছেদের প্রহরগুলো!]
---
যে মুহূর্তে হাশিম আর নওশেরওয়ান নিজেদের মনের সুপ্ত বাসনা ও পরিকল্পনা নিয়ে ভাবনায় মগ্ন ছিল, ঠিক তখন অ্যানেক্সির বাইরে থেকে সাদির গাড়ি গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
ফারিস বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিদায় জানানোর ভঙ্গিতে ওদের চলে যেতে দেখছিল।
ভেতরে পুরো বাড়িতে এক নিথর স্তব্ধতা বিরাজ করছিল।
জুমারের ঘর, ওর জিনিসপত্র—সবকিছু গুছিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করে নুদরাত কনের সাথে সাথেই এখানে এসেছিলেন; এখন তিনি ওই গাড়িতে চড়েই বাড়ি ফিরে গেছেন।
আর ওনার চলে যাওয়ার পর পেছনের এই বাড়িটা এক নিমেষেই বড্ড নিঝুম আর জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে ফারিস ঘাড় উঁচিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাওয়া কাঠের গোলাকার সিঁড়িটার দিকে তাকাল, যার শেষ মাথায় দুটো বেডরুম ছিল।
একটা হলো সেটা, যা একসময় ফারিস আর জারতাশা-র ঘর ছিল; আর অন্যটি হলো সেটা, যেটার ভেতরে এই মুহূর্তে সে বসে আছে।
সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
পায়ের নিচে কাঠগুলো হালকা মচমচ করে উঠল।
নিস্তব্ধতার বুকে একটা মৃদু কম্পন সৃষ্টি হলো।
সে ওপরে চলে এল।
ওর নিজের ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল।
ভেতরে একটা হলদেটে আলো জ্বলছিল।
ড্রেসিং টেবিল আর অন্য দুটো টেবিলের ওপর তিন তোড়া ফুলের বুকে রাখা ছিল।
ওগুলোও সাদি এনে রেখেছিল।
এ ছাড়া পুরো ঘরে সাজসজ্জা বলতে আর কোনো কিছুই ছিল না।
চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সে ভেতরের দিকে তাকাল।
বিছানাটা একদম খালি পড়ে ছিল।
ওর দৃষ্টি আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেল।
জুমার ড্রেসিং টেবিলের টুলের ওপর বসে ছিল।
ফারিসের দিকে ওর পিঠ ফেরানো ছিল।
কিন্তু সামনের বড় আয়নাটায় ওর পুরো অবয়বটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আর ওখানেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ফারিসকেও দেখা যাচ্ছিল।
সে মন দিয়ে নিজের কানের দুলগুলো খুলছিল।
জরির কাজ করা ওই ভারী ওড়নাটা তখনও মাথায় দেওয়া ছিল আর চোখের কাজল তখনও ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
“সবাই চলে গেছে।” সে ওখানেই দাঁড়িয়ে বড্ড নিস্পৃহ কিন্তু শান্ত গলায় বলল।
“আপনার জিনিসপত্র আমি এই ঘরেই রাখিয়ে দিয়েছিলাম। কিচেন নিচে, আর ওটাতে মোটামুটি সবকিছুই এভেইলেবল আছে। আপনার ড্রেসিং টেবিলের ওপর এই বাড়ির একটা ডুপ্লিকেট চাবির তোড়া রাখা আছে আপনার জন্য। শুধু... ওই এক খাঁজকাটা কাঠের আলমারিটা বাদে। ওটার লকের চাবিটা আমার কাছেই থাকবে। ওটাতে আমার স্ত্রীর অনেক স্মৃতি আর জিনিসপত্র রাখা আছে, আর আমি চাই না কোনো কারণে সেগুলোর বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হোক। বাকি পুরো বাড়িটা আপনার। যা ইচ্ছে করতে পারেন।”
সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে অন্য কানের দুলটা খুলছিল।
সে যখন কথা শেষ করল, তখন জুমার ওর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল, “আমি আপনার কোনো কথাই শুনিনি। দয়া করে নিজের শব্দগুলো নষ্ট করবেন না।” দুলটা খুলে মাথা নিচু করে সে ওটা জুয়েলারি বক্সে রেখে দিল।
ফারিস কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর চলে যাওয়ার জন্য ঘুরেও যেন না চটেই জিজ্ঞেস করল, “আপনার কি কিছু লাগবে?”
জুমার মুখটা সোজা করল এবং মাথার নথটা খুলতে লাগল।
“শুধু এতটুকুই যে, আমার সামনে যত কম সম্ভব আসবেন। আপনাকে দেখলে আমার অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যায়।”
ফারিসের চোখে এক তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠল, যা সে বড্ড কষ্টে চেপে নিল।
“এমনভাবে কথা বলবেন না যেন আপনি আমাকে খুব ভালো করে চেনেন।”
নথ খোলার সময় ওর হাত দুটো থমকে গেল।
সে টুল থেকে উঠে দাঁড়াল, ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল এবং চোখের কোণে একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে ওর দিকে তাকাল।
“আমি আপনাকে যতটুকু চিনি, তার চেয়ে বেশি চেনার কোনো প্রয়োজনও আমার নেই।”
“আর তারপরও আপনি আমাকে বিয়ে করলেন?”
“আপনি খুব ভালো করেই জানেন আমি আপনাকে কেন বিয়ে করেছি!” সে-ও একই রকম বিরক্তি নিয়ে কথাটা বলে আবার ঘুরে গেল এবং আয়নায় তাকিয়ে নথটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল।
“আমি জানতাম না আপনি এতটা নিষ্ঠুর।” চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, বুকে দুহাত বেঁধে ওর দিকে তাকিয়ে সে বড্ড নিচু স্বরে কথাটা বলতেই জুমার নথটা খুলে ফেলার সময় আয়নায় ওর প্রতিবিম্বের দিকে তীব্র চোখে তাকাল।
“আপনি এই সবকিছুরই যোগ্য। এটা ভেবে ভুল করবেন না যে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আপনার শাস্তি শেষ হয়ে গেছে!”
“তাই নাকি!” সে ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল।
“তা কী করবেন আপনি আমার সাথে, আমাকেও একটু বলুন তো?” দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সে একনাগাড়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
“আমার আর নিজের সময় নষ্ট করবেন না, দয়া করে এখান থেকে যান। আপনি যদি আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে আল্লাহর কসম, আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কিছু একটা করে বসব!” সে এক পলক ফারিসের দিকে আর অন্য পলক ফলের ঝুড়িতে রাখা ধারালো ছুরিটার দিকে তাকাল।
ফারিস চমকে উঠে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করল এবং ঠিক তখনই ওর ভেতরের কিছু একটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
চোখে একরাশ গভীর আফসোস আর কষ্ট নেমে এল।
“Good night,” বলে সে এক কদম পিছিয়ে গেল, দৃষ্টি তখনও জুমারের ওপরই স্থির ছিল।
এই কথাগুলো শুনে সে বড্ড দ্রুতপায়ে দরজার কাছে এগিয়ে এল, পাল্লাটা ধরল এবং ফারিসের চোখের দিকে তাকিয়ে “Good night ফারিস,” বলে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল।
লকের দুটো ক্লিক হওয়ার শব্দ হলো এবং ভেতর থেকে দরজাটা লক হয়ে গেল।
ফারিস একটা গভীর ঠান্ডা নিশ্বাস ছাড়ল, আলতো করে মাথা ঝাড়া দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
নিজের ঘরে আসতেই সামনের মেইন দেয়ালে আজ ও জারতাশা-র সেই পুরনো ছবিটা টাঙানো দেখতে পেল।
ছবিতে সে একটা কালো শাড়ি পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল।
ওর চোখের সামনে সেই দিনগুলোর কথা ভেসে উঠল যখন সে জারতাশা-র সাথে বড্ড কড়া গলায় বা রেগে গিয়ে কথা বলত।
আর অন্যপাশে এই মহিলাটি... সে দেয়ালটার দিকে তাকাল যার ওপাশে ওই ফুলে সুবাসিত ঘরটা ছিল।
আর এই একটা মহিলা, যাকে আদালতে মানুষ প্রতিদিন মণকে মণ গালিগালাজ করত, কিন্তু এই একমাত্র নারীর ওপর ওর কখনো কোনো রাগ আসত না।
“সেদিন আপনি কী করবেন ম্যাডাম প্রসিকিউটর, যেদিন আপনি জানতে পারবেন যে ফারিস গাজী নির্দোষ ছিল?” ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে আপনমনেই বিড়বিড় করল।
বাইরে রাতটা ওভাবেই নিঝুম হয়ে ভিজছিল।
অন্য ঘরে জুমার এখন পোশাক পরিবর্তন করে এই সম্পূর্ণ অচেনা বিছানাটায় এসে বসেছিল।
জুমারের নিজস্ব ফার্নিচার, জুমারের নিজের নতুন বেডকভার, তবুও সবকিছু কেমন যেন পরশ্রীকাতর আর অচেনা লাগছিল।
কিছুক্ষণ আগে ফারিসের সামনে যে মুখটা একদম ভাবলেশহীন ছিল, তা এখন এক তীব্র যন্ত্রণার অনুভূতিতে ছেয়ে গিয়েছিল।
সে বড্ড উদাস মনে বেডকভারের ওপর হাত বোলাচ্ছিল।
“আমি ফারিসের কী ক্ষতি করেছিলাম যে সে আমার সাথে এমনটা করল?” না চাইতেও ঠোঁটের কোণ গলে শব্দগুলো বেরিয়ে এল।
কিন্তু ওর এই একাকীত্ব আর বিষাদ শুধু ওই শব্দগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ রইল।
না ওর বুকটা ভারী হয়ে এল, না চোখ দুটো ভিজল।
সে জুমার ছিল; সে অন্যকে কাঁদাতে পারত, কিন্তু নিজে কখনো কাঁদত না।
রাত আরও গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল আর এখন থেকে ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর এই রাত এমন এক নতুন দিনের জন্ম দিতে যাচ্ছিল, যা এই দুই পরিবারের কেউ কোনোদিনও ভুলতে পারবে না।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Yeh log kaise magar dushmani nibhate hain / Humein toh raas na aayin muhabbatein karni
[এসব মানুষ কেমন করে যে শত্রুতা টিকিয়ে রাখে, আমাদের তো ভাগ্যেই সইল না ভালোবাসাটুকু আগলে রাখা!]
---
পুরো ইসলামাবাদের ওপর যখন সকালের সূর্য উঁকি দিল, তখন বাতাসে বাসি গোলাপের পাপড়ি আর কর্পূরের একটা অদ্ভুত সুবাস ছড়ানো ছিল।
দূরের বনজঙ্গল থেকে পশুপাখিদের কান্নার সুর ওভাবে ভেসে আসছিল, যেন রাতের অন্ধকারে কোনো হিংস্র শিকারি ভেড়ার একটা ছোট্ট বাচ্চাকে ছিঁড়েখুঁড়ে রেখে চলে গেছে।
কারদার প্রাসাদের সবুজ লনের ওপর অবস্থিত অ্যানেক্সির ভেতরেও ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল।
ফারিস ওপেন কিচেনের গোলাকার টেবিলটার পাশে বসে মগ থেকে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কাঠের সিঁড়িতে সরু হিলের জুতো জোড়ার নিচে নেমে আসার আওয়াজ পাওয়া গেল।
সে থামল না, আর না ঘুরে তাকাল।
সামনের ফ্রিজের চকচকে দরজায় জুমারের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট ভেসে উঠেছিল।
সে একটা কালো রঙের মিনি কোট পরে, ব্যাগ আর ফাইলপত্র হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল।
কোঁকড়ানো চুলগুলো একপাশে গুছিয়ে মুখের বাঁ দিকে ফেলে রেখেছিল আর মোবাইলে কোনো একটা মেসেজ টাইপ করার সময় ওর দৃষ্টি নিচের দিকে নিবদ্ধ ছিল।
সে ওভাবেই হেঁটে এসে ফ্রিজের কাছে থামল।
দরজাটা খুলল।
ঠান্ডা জলের একটা বোতল বের করল।
“তাহলে আপনি অফিসে যাচ্ছেন?” ওর ওপর দৃষ্টি স্থির রেখে, কফির মগে চুমুক দিতে দিতে সে বড্ড নিচু স্বরে বলল।
সে টুলের ওপর বসে ওর দিকে পিঠ ফিরিয়ে জল খেতে লাগল।
কোনো জবাব দিল না।
“বাই দ্য ওয়ে, প্রসিকিউটর সাহেবা!” চোখ দুটো সরু করে ওর দিকে তাকিয়ে, এক অদৃশ্য হাসি চেপে সে বড্ড স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠল।
“আপনার মনে এই খেয়ালটা একবারও এল না যে, আমি যদি আপনার বাবার কাছে গিয়ে এই বিয়ের আসল সত্যটা জানিয়ে দিই, তবে কী হবে?”
জুমার জল খাওয়া শেষ করে দাঁড়াল, নল ছেড়ে গ্লাসটা ধুয়ে যথাস্থানে রাখল এবং ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
বড্ড গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকাল।
“আপনি কখনোই এটা করবেন না।”
“তাই নাকি?” ফারিস ভুরু কুঁচকাল।
“আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমি ইউসুফ সাহেবের সামনে গিয়ে ওনাকে এই কথাটা বলব না?”
জুমারের ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু ও তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“কারণ সামনাসামনি কিছু করার জন্য যে guts দরকার হয়, তা আপনার মধ্যে নেই। আপনি স্রেফ পেছন থেকে আঘাত করা মানুষদের একজন।” বড্ড ঠান্ডা মাথায় ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলেছিল সে।
ফারিসের চেপে রাখা আলতো হাসিটাও এক নিমেষে মিলিয়ে গেল; ভুরু দুটো এক হয়ে চোখের কোণে এক কঠোর ভাব ফুটে উঠল।
সে মগের হ্যান্ডেলটা বড্ড জোরে চেপে ধরল, মুঠো শক্ত করল—যেন নিজের ভেতরের ক্ষোভটাকে বড্ড কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করল।
“কেন? রাগ হচ্ছে? আমারও হয়েছিল। কিন্তু এখন আর হয় না।” একটা ধারালো দৃষ্টি ওর ওপর হেনে সে নিজের ফাইলগুলো গুছিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।
তারপর থামল এবং ঘুরে ওর দিকে তাকাল।
“আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা যত কম সম্ভব করবেন। আর হ্যাঁ, নেক্সট টাইম এই কন্ট্রাক্টটাকে দয়া করে বিয়ে বলে সম্বোধন করবেন না।”
এক জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সে ওকে আপাদমস্তক দেখল।
“আপনি আমার স্বামী নন। স্রেফ আমার বাবার একজন দেনাদার, আর নিজের ঋণ শোধ করছেন।”
ফারিস মুখ ঘুরিয়ে নিল আর মগ থেকে কফিতে চুমুক দিতে লাগল।
জুমার করিডোর পার হয়ে দরজার কাছে পৌঁছানো মাত্রই ওটার বেল বেজে উঠল।
জুমার দরজাটা খুলল।
রান্নাঘরের টেবিলে বসে থাকা ফারিস অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেদিকে তাকাল।
জুমার সামনে থেকে একটু সরতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নজরে এল, আর ওকে দেখামাত্রই ফারিস চরম বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“Good morning, মিসেস গাজী!” প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে হাশিম হাসিমুখে বলতেই জুমার একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল।
তাকে অফিসের জন্য একদম পারফেক্ট লাগছিল।
পরিপাটি চুল আর নামী পারফিউমের সুবাস চারদিকে সুবাস ছড়াচ্ছিল।
বড্ড সুদর্শন ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল তাকে।
সে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল আর ওনার পারফিউমের সুবাস অ্যানেক্সির ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
“Morning, কারদার সাহেব।” সে জোর করে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল।
“আপনাকে এই...” হাশিম নিজের দৃষ্টি চারদিকে ওলটপালট করে দেখল।
“বাড়িতে দেখে খুব ভালো লাগল। কমফোর্টেবল আছেন তো আপনি?”
“আপনাকে নিজের প্রতিবেশী হিসেবে দেখে আমারও খুব ভালো লেগেছে। আশা করি নিয়মিত দেখা হবে। এখন যদি আপনি আমাকে পারমিশন দেন...” সে কবজিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে তাকাল।
“আজ আমার কোর্টে হিয়ারিং আছে আর আমার বেশ লেট হয়ে যাচ্ছে।”
“আগে আমার কথাটা শুনে নিন।” সে হাসতে হাসতে বলল।
“আজ রাতে আপনি আমাদের সাথে ডিনার করবেন। শুনতে পেয়েছ ফারিস?” সে বেশ চড়া গলায় ডাক দিল।
টেবিলে বসে থাকা ফারিস বড্ড বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাড়া দিল।
“আমি বিজি আছি।”
কিন্তু হাশিম ওতে একদমই কান দিল না।
“আমার না-সূচক উত্তর শোনার অভ্যাস নেই। আমরা ডিনারে আপনাদের ওয়েট করব। ঠিক আটটায়।” নিজের কবজির ঘড়ির ডায়ালের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে সময়টা দেখাল।
জুমার একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে মাথাটা সামান্য নোয়াল।
“Sure, আমরা আসব।” সে একই রকম হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
ওনার বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত পর জুমারও পেছনের দিকে না তাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
হাশিমের গাড়িটা তখন দূরে চলে যাচ্ছিল।
সে অ্যানেক্সির বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নেমে লনের সবুজ ঘাসের ওপর এল।
সেখানে ফারিস আর ওর নিজের গাড়ি দুটো পার্ক করা ছিল।
নিজের গাড়ির লকটা খোলার সময় জুমার চোখ তুলে চারদিকে এক পলক আলতো করে দেখল।
সামনে কারদার প্রাসাদের পেছনের ব্যালকনিগুলো দেখা যাচ্ছিল।
একটা ব্যালকনি হাশিমের ঘরের ছিল, সেটা সে আন্দাজ করতে পারল।
চোখ দুটো ঘোরাতে ঘোরাতে ওর দৃষ্টি অন্য একটা ব্যালকনির ওপর গিয়ে ঠেকল, যার কাঁচের দরজার ওপাশে ঘরের ভেতরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল।
জুমার চোখ দুটো সরু করে দেখল।
ওটা তো নওশেরওয়ান ছিল!
ওর হাতে একটা সিগারেট ছিল, যা সে ঠোঁটে চেপে ধরে রেখেছিল।
সে-ও সম্ভবত জুমারকে দেখে ফেলেছিল, তাই চট করে সিগারেট ধরা হাতটা পেছনের দিকে লুকিয়ে নিয়ে ঘুরে গেল।
জুমার মাথা ঝাড়া দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ল।
চলবে,,,,,

Comments
Post a Comment