নামাল-(Namal) অধ্যায়:১০ পর্ব ৪১, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
#নামাল-(Namal)
#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi)
#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)
অধ্যায়:১০
পর্ব :-৪১
বিষয়:- আকদ (চুক্তি)
Woh khaain waqt ki kuch be-dayanat sa'atein hongi /
Mere andar ka mai mahboos kar dala gaya par-hol zindaan mein! /
Bada hi la-ubaali waqt tha / Jo ho gaya ek mushtail bacha! /
Dar-e-zindaan mein muqaffal kar ke chaabi qulzum-e-loolak mein pheinki / Kahin toh wus'at-e-aflaak mein cheinki /
Woh chaabi ab nahi milti! / Muqaffal dar nahi khulta! / Mujhe toh khud se milna tha.. / Mein kab tak wus'at-e-aflaak
chhaanoonga? /
Kahan tak dhund mein khoye hue aafaaq chhaanoonga?)
[সে হয়তো বিশ্বাসঘাতক সময়ের কোনো এক অসৎ মুহূর্ত ছিল, যখন আমার ভেতরের 'আমি'-কে বন্দি করা হয়েছিল এক ভয়ানক কারাগারে! বড়ই উদাসীন এক সময় ছিল তা, যা আচমকা এক ক্ষুব্ধ শিশুর রূপ নিল! কারাগারের দ্বারে তালা ঝুলিয়ে চাবিটা ছুঁড়ে দিল সৃষ্টিজগতের মহাসমুদ্রে, কিংবা হয়তো হারিয়ে দিল মহাকাশের অতল বিস্তারে—সে চাবি আজ আর কোথাও মেলে না! অবরুদ্ধ সেই দ্বার আর খোলে না! আমার তো নিজের সাথে দেখা করার ছিল... আমি আর কতকাল আকাশের সীমানায় খুঁজে বেড়াব? আর কতদূর কুয়াশায় হারানো দিগন্ত চষে বেড়াব?]
সৈয়দ নাসির শাহ
-----------------------------------------
লনের ওপর দাঁড়িয়ে মেরি এতক্ষণ সাদির সাথে কথা বলছিল। জওয়াহেরাত বুকে হাত বেঁধে হেঁটে ওদের কাছাকাছি আসতেই কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যেতে লাগল।
"আমার মনে হয়, বরং তোমার ছেলের ক্যানসার নিয়ে আমি যতটুকু রিসার্চ করেছি, তাতে অপারেশন করলেই ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একদম টেনশন কোরো না। রোগটা আগেভাগে ধরা পড়া তো ভালো লক্ষণ..." সে মেরিকে সান্ত্বনা দিয়ে যেই ঘুরল, অমনি দেখল জওয়াহেরাত আর নওশেরওয়াঁন হেঁটে আসছে। সাদি আলতো হেসে মাথা নিচু করে সালাম দিল।
"মিসেস কারদার, আপনাকে আগের চেয়ে একটু বেটার দেখে ভালো লাগল।"
"এই ক'দিনে এতবার দেখেছ যে চেহারার তফাতটা তো চোখে পড়ারই কথা।" সে বিনোদনে হাসার ভান করে ঠিক ওর সামনে এসে থামল। সাদির খটকা লাগল। ও চোখ তুলে জওয়াহেরাতের কাঁধের পেছন দিয়ে নওশেরওয়াঁনের দিকে তাকাল, যে চরম ঘৃণা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
"জিজ্ঞেস করতে পারি, আমার কাজের মেয়ের সাথে কী কথা হচ্ছিল?" সে এখনও হাসছিল, কিন্তু ওর চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছিল।
"মেরি আমাকে ওর ছেলের ক্যানসারের কথা বলেছিল। আমি ইন্টারনেটে ওটা নিয়ে একটু সার্চ করেছিলাম তো..."
"এসব কথা কি হাশিম-কে বলার মতো ম্যাটার, নাকি মেরি বা এই বাড়িতে আসা প্রতিটা বাইরের মানুষকে জানানোর বিষয়?" হাসিমুখে অথচ জ্বলন্ত চোখে সে মেরির দিকে তাকাল। মেরির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে 'সরি' বলে লজ্জায় মাথা নিচু করে উল্টো পায়ে চলে গেল। সাদির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে জওয়াহেরাতের দিকে তাকাল।
"I am sorry মিসেস কারদার, আমি স্রেফ আপনার খোঁজখবর নিতে এসেছিলাম আর..."
"খোঁজখবর নিতে, নাকি এটা শিওর হতে যে অরঙ্গজেব উইলে তোমার বোনের নামে কিছু রেখে গেছেন কি না?"
সাদির মাথাটা এক ঝটকায় ঝিমঝিম করে উঠল। "জি?" সে অবিশ্বাস নিয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকাল।
"আমার ছেলের বিরুদ্ধে ওর বাবার কান ভাঙানোর সময় তোমার বোনের একবারও মনে হলো না যে এই শকটা অরঙ্গজেব-এর লাইফ কেড়ে নিতে পারে? আর শুধু ওই কেন, তোমরা দুজনেই তো শামিল ছিলে এই ড্রামায়, তাই না? কী ভেবেছিলে? নিজের ছেলেকে disown করে নিজের সব প্রপার্টি উনি তোমাদের নামে লিখে দিয়ে যাবেন?" ঠোঁটের কোণে হাসিটা লেগে থাকলেও ওর গলার আওয়াজ রাগে চড়ে যাচ্ছিল।
"মিসেস কারদার, আপনি নিজেও জানেন না আপনি কী বলছেন!" সাদি বেশ বিরক্তি নিয়ে ওকে থামানোর চেষ্টা করল। জওয়াহেরাতের চোখের শিরাগুলো রাগে লাল হতে শুরু করল। বুকে হাত বেঁধে সে আরও দু-কদম এগিয়ে এল।
"কী ক্ষতি হতো যদি তোমরা অরঙ্গজেব-কে না বলে আমাকে বা হাশিম-কে আড়ালে ডেকে সবটা বলতে? কিন্তু তোমরা ওই মানুষটার কথা একবারও ভাবলে না! এই কষ্টটা ওকে ভেতর ভেতর শেষ করে দিল সাদি, আর উনি এই কন্ডিশনে মারা গেলেন যে নিজের ছেলের ওপর মারাত্মক রেগে ছিলেন। আর এই সবকিছুর জন্য একমাত্র তোমরাই দায়ী!" এই কথায় সাদি এবার বেশ গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ, একদম! নিজেকে নিজে কিডন্যাপও আমিই করেছিলাম, আর মিথ্যা বলে বাবার কাছ থেকে টাকাও তো আমিই চেয়েছিলাম, তাই না?" ও ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় বলতেই জওয়াহেরাত মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
"এই... আমার বাবার নাম মুখেও আনবে না!" নওশেরওয়াঁন রাগে লাল হয়ে আঙুল উঁচিয়ে ওয়ার্নিং দিল। "তোমরা ওনাকে আমার বিরুদ্ধে উস্কেছিলে, এটার জন্য আমি তোমাদের কখনো মাফ করব না।"
"আমি তো মাফ চাচ্ছিও না। আমি স্রেফ মিসেস কারদার-এর শরীর কেমন আছে জানতে এসেছিলাম।" সে কোনোমতে নিজের রাগ কন্ট্রোল করল।
"আমার শরীরের কন্ডিশন দেখলে তো? আমার হাজব্যান্ড এই অবস্থায় মারা গেছেন যে উনি শেরুকে disown করতে যাচ্ছিলেন। দেখলে তো আমরা কতটা পেইন আর ট্রমার মধ্যে আছি?"
নওশেরওয়াঁন কিছুটা চমকে মায়ের দিকে তাকাল। জওয়াহেরাত সাদির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কষ্ট আর ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বলছিল।
"এর আগেও তুমি শেরুর লাইফ ডিস্টার্ব করার ট্রাই করেছ, কিন্তু এবার তোমরা লিমিট ক্রস করেছ সাদি!" এই লাস্ট সেন্টেন্সটা সে শেরুর দিকে তাকিয়ে বলল, যাতে নওশেরওয়াঁনের রাগ আরও চড়ে গেল আর সে চরম ঘৃণায় একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করল।
সাদি ওদের দুজনের দিকে একটা অপছন্দের দৃষ্টি দিল। মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল 'খুব ভালো'। দু-কদম পিছিয়ে সে সরাসরি নওশেরওয়াঁনকে অ্যাড্রেস করল।
"তুমি কখনো রাস্তার ধারে রাখা ওই ডাস্টবিনগুলো দেখেছ নওশেরওয়াঁন? ওগুলোর গায়ে লেখা থাকে Use Me। তুমিও নিজের ওপর ঠিক এই কথাটাই লিখিয়ে রেখেছ। যে-ই আসে, নিজের আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য তোমাকে ইউজ করে (জওয়াহেরাতের দিকে একটা তীক্ষ্ণ নজর দিল) আর চলে যায়। সো, আমি আর তোমাদের এই নোংরা games-এর পার্ট হতে পারছি না। আল্লাহ হাফেজ।"
সে ঘুরে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। নওশেরওয়াঁন যতক্ষণ ওর এই টোন্টের মানে বুঝতে পারল, ততক্ষণে ও বেশ দূরে চলে গেছে।
"উল্লুর..." সে হাত মুঠো করে রয়ে গেল। "ও যদি আর কখনো এই দিকে আসে আম্মু, তবে আমি..."
"যদি ওর বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান থাকে, তবে ও আর কোনোদিন এই বাড়িতে পা রাখবে না। আর আমার এতটুকু বিলিভ আছে যে ও সেলফ-রেসপেক্ট থাকা মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইগোইস্টিক।"
জওয়াহেরাত এক চরম যন্ত্রণার হাসি নিয়ে ওকে চলে যেতে দেখছিল। নওশেরওয়াঁনের ভেতরের রাগটা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। সে নিজেকে একটু রিল্যাক্স করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং ঘোরার উপক্রম করল, তারপর হঠাৎ থামল।
"ওটা... ওটা আপনি নিজের কথার জোর বাড়ানোর জন্য বলেছিলেন না আম্মু? ড্যাড তো আমাকে সত্যি সত্যি disown করতে যাচ্ছিলেন না, তাই না?" নওশেরওয়াঁন কিছুটা দ্বিধা অথচ আশা নিয়ে ওর দিকে তাকাল। জওয়াহেরাতের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল, চোখের কোণটা জলভারে লালচে হয়ে উঠল।
"না... উনি তোমাকে... তোমাকে কখনো disown করতে পারতেন না। আমি ওটা শুধু কথার ওয়েট বাড়ানোর জন্য বলেছি।" মাথা নেড়ে সে কথাটার সত্যতা দিল এবং নিজের ভেতরে একরাশ কান্না চেপে নিল। নওশেরওয়াঁন শান্ত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। জওয়াহেরাত নিজের হাতের ভেজা ভাবটা লুকানোর জন্য মুঠো শক্ত করে নিল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেরির দিকে তাকাল। ও এখন এই মেয়েটাকে নিয়ে কী করবে? মেইন উইটনেস—যে নিজে নিজের সাক্ষ্যের ব্যাপারে কিছুই জানত না—সে তো এখনও এই বাড়িতেই রয়ে গেছে!
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Tark-e-taalluqat koi masla nahi. Yeh toh woh raasta hai ke bas chal pade koi
[সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলাটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। এ তো এমন এক পথ, যাতে স্রেফ পা বাড়ালেই চলা শুরু হয়ে যায়।]
সাদি রাগে লাল হয়ে আর মুখে এক চরম ক্ষোভের এক্সপ্রেশন নিয়ে কারদার প্যালেসের মেইন গেট থেকে বের হতেই যাচ্ছিল, যাতে নিজের গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তখনই সামনে থেকে জুমারের গাড়িটা আসতে দেখা গেল। সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে রাস্তার ওপর দাঁড়াল।
পাহাড়ের ওপরের এই আঁকাবাঁকা রাস্তাটা একদম নির্জন ছিল। আশেপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু বড় বড় রাজপ্রাসাদ ছিল, যেগুলো কারদারদের প্রাসাদের মতোই বিশাল লন দিয়ে ঘেরা ছিল; ফলে এই রাস্তা থেকে চারপাশের স্রেফ দেওয়ালগুলোই চোখে পড়ত। জুমার গাড়িটা ওখানেই থামিয়ে দিল। ও সাদিকে ইশারা করল। সে ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে ভেতরে এসে বসল।
"আপনি এখানে কীভাবে?"
"জানাজার পর আর আসতে পারিনি, সো এখন মিসেস কারদার-এর জন্য এসেছিলাম। উনি হসপিটালে আমাকে প্রায়ই ভিজিট করতে আসতেন, সো আমার আসাটা উচিত ছিল।" একদম রুক্ষ আর ব্ল্যাঙ্ক মুডে উইন্ডস্ক্রিনের ওপারে তাকিয়ে সে এক্সপ্লেনেশন দিল। সাদি ড্যাশবোর্ডের দিকে চোখ জমিয়ে অপেক্ষা করল যে উনি হয়তো বলবেন—'যখন তুমি আমার পাশে ছিলে না, তখন উনি আসতেন'—কিন্তু জুমার কোনো কমপ্লেন করল না। ওরা দুজনেই যেন মনে মনে প্রমিস করে রেখেছিল যে মনের ভেতরের আসল কথাটি মুখে আনবে না।
"আমি মিসেস কারদার-কে দেখতে এসেছিলাম আর এখন খুব ভালোমতোই দেখে নিয়েছি। সো, বাড়ি ফেরার প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম।"
"আর তুমি এখানে কীভাবে?" ফেস ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাতেই সাদিও ওনার দিকে ঘাড় ফেরাল। দুজনের চোখাচোখি হলো।
জুমার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নরম সুরে বলতে লাগল:
"আমি খোঁজ নিয়েছিলাম, হাশিম এই কেসে ইনভলভড নয়। এটলিস্ট ওপর ওপর তো দেখেই মনে হচ্ছে ও নেই।"
সাদি ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "নিজে খোঁজ নিয়েছেন নাকি অন্য কেউ করে দিয়েছে?" কারণ ওর কাছে এই দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত ছিল।
"নিজে করিনি, তবে ওনার আব্বু বাসিরাগ সাহেব ওটা চেক করেছিলেন। ওনার কোনো হাত নেই এই ম্যাটারে। কিন্তু তুমি বলো, তোমার কেন মনে হলো যে হাশিম এতে ইনভলভড থাকতে পারে?"
"আমার আসলে তেমন কিছু মনে হয়নি। স্রেফ যার নাম মুখে এসেছে, বলে ফেলেছি। I am sorry, আমার এভাবে কারও ওপর ব্লেম করা উচিত হয়নি।" সে খুব সিম্পলভাবে অ্যাপোলোজি চাইল। জুমার স্রেফ ওর দিকে তাকিয়েই রয়ে গেল।
"তুমি ওর ব্যাপারে এত বড় একটা কথা বলে দিলে, আর আমি এতগুলো দিন ধরে ওটা নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করিয়ে বেড়াচ্ছিলাম! আর এখন তুমি বলছ যে তুমি স্রেফ এমনিই বলে দিয়েছিলে?" নিজের প্রচণ্ড রাগটা সে কোনোমতে কন্ট্রোল করল। তাহলে ফারিসের ফেভারে কোনো একটা এভিডেন্স খোঁজার জন্য সে যে ক'টা দিন খাটাখাটনি করল, সেগুলোর কি কোনো ভ্যালু নেই? ওটা কি একটা জোক ছিল?
"আমি বুঝতে পারছিলাম না কার নাম নেব। ব্যাস, ওনার নামটা নিয়ে নিলাম। এই লোকেরা..." আঙুল দিয়ে কারদার প্যালেসের দিকে ইঙ্গিত করল, "এখন আমার সাথে আগের মতো বিহেভ করে না। আমার হয়তো ওই কারণেই রাগ হয়েছিল।" জুমার কোনোমতে রাগ চেপে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। সাদি লজ্জিত হয়ে মাথা নিছু করল। নিচু গলায় বলল, "সরি!"
"আর তুমি হাশিম-কে কেন বললে যে ওই অডিওটা আমি বের করে দিয়েছিলাম?" সাদি এক ঝটকায় মাথা তুলল।
"তার মানে উনি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন? তো আপনি কী বললেন?"
"যা আমার বলা উচিত ছিল।"
"জানি। এই জন্যই ওটা বলেছিলাম।" সে মনমরা হয়ে হাসল। সবকিছু ঠিক সেভাবেই হয়েছিল যা ও ভেবেছিল।
"আমি ওনার ওপর রেগে ছিলাম, কারণ উনিও আপনার মতোই ফারিস মামুকে খুনি ভাবেন। আর এখন যেহেতু আমি মামুর জন্য ট্রাই করছি, তাই উনি আমার ওপর রেগে আছেন। তবে আমার খুব ভালো লেগেছে যে আপনি আমার মান রেখেছেন। আর আপনি মামুর সাথে দেখা করতে জেলে গিয়েছিলেন, তার জন্য থ্যাংকস।"
"তোমার মামু কি তোমাকে এটা বলেছেন যে ও আমাকে ইউজ করে জেল ভেঙে পালানোর ট্রাই করেছিল?"
সাদি-র মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। সে একদম সোজা হয়ে বসল। "কী বলছেন আপনি?"
জুমার ডিটেইলস বোঝাতে স্রেফ কয়েকটা সেন্টেন্স খরচ করল, যা শোনার পর সাদির মুখের রঙ একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"আমি শিওর ফুপ্পু, কোনো একটা ভুল হচ্ছে, নয়তো উনি কখনো এমন করতে পারেন না। আমি ওনার সাথে..."
"সাদি, আমি টায়ার্ড হয়ে গেছি!" সে দুই হাত তুলে ওকে কথা বলা থেকে থামাল। "আমি নিজেকে এই কেস থেকেও আলাদা করে নিয়েছি। আমি আর ফারিসের প্রবলেমগুলোর মধ্যে জড়াতে চাই না। তাও আমি আবার জড়িয়ে গেলাম। এতদিনের মধ্যে ফার্স্ট টাইমের জন্য আমি ধরে নিতে শুরু করেছিলাম যে ও হয়তো ইনোসেন্ট হতে পারে, কিন্তু ও আবার ওই একই কাজ করল। আমাকে আর বোঝাতে এসো না। নিজের মামু-কে বোঝাও যে খোদার দোহাই, নিজের ওপর আর অন্যদের ওপর একটু দয়া করুক। আমাকে আর হ্যারাস কোরো না। আমি ওর কেস নিজে প্রসিকিউট করিনি, এখন তো উইটনেসও তুলে নিয়েছি। আর কী চাও তোমরা আমার কাছে? যখন আমার মন বলে যে ওই আমার আসল ক্রিমিনাল, তখন আমাকে জোর করে ওকে ইনোসেন্ট বলার জন্য কমপেল কোরো না। আমি ট্রাই করেছিলাম, আমি সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে ওর কাছে গিয়েছিলাম। ওটার জন্য হাশিম-কেও সাসপেক্ট বানিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু ও আবার ওটাই করল।"
সে কতক্ষণ মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। তারপর আস্তে করে বলল:
"I am sorry। আমার আপনাকে ওনার কাছে যাওয়ার জন্য বলা উচিত হয়নি। আপনার কষ্টের গভীরতাটা আমার বোঝা উচিত ছিল। আপনার কষ্ট আমাদের সবার চেয়ে অনেক বেশি। ও জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেলেও একটা নতুন লাইফ স্টার্ট করতে পারবে, কিন্তু আপনি পারবেন না। এটলিস্ট এত সহজে তো নয়ই। I am sorry। আমরা আর এই বিষয়ে কোনো কথা বলব না। কিন্তু..." সে মুখ তুলে একরাশ আশা নিয়ে জুমারের দিকে তাকাল। "আমার সাথে একটা প্রমিস করুন। একদিন আমি আপনার কাছে এভিডেন্স নিয়ে আসব, তখন আপনাকে আমার কথা শুনতেই হবে। আর যদি ওই এভিডেন্স এক্সেপ্টেবল হয়, তবে ওটা মেনেও নিতে হবে।"
"Sure!" সে হালকা করে কাঁধ ঝাঁকাল। "আমি তো তোমাকে সবসময়ই বলে এসেছি, আমাকে এমন কোনো কথা বলো যা আমি বিশ্বাসও করতে পারি। তাহলে আমি ডেফিনিটলি মেনে নেব। তারপর সে চুপ হয়ে গেল। সাদি, আমি তোমাকে আবারও বলছি, যদি এমন কোনো কথা থাকে যা ফারিসের ফেভারে যায়, তবে আমাকে বলো। আমি আরও একবার ওর এই কাজটা ইগনোর করে ওর জন্য ট্রাই করতে রেডি আছি। যদি থার্ড কোনো পারসন ইনভলভড থাকে, তবে আমাকে বলো।"
"না ফুপ্পু।" সে মাথা নাড়ল। "এমন কোনো কথা নেই। আপনি যা ভাবছেন, এখন ওটাই ভাবতে থাকুন। কিছু সময় পর আমি আপনার কাছে নিশ্চয়ই আসব। আপনি জাস্ট নিজের খেয়াল রাখবেন।"
সে জুমারের ফেসের দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমার জন্য আপসেট হোয়ো না বেটা, আমি ঠিক আছি।" ওর দিকে চোখ না মিলিয়েই সে উইন্ডস্ক্রিনের ওপারে দেখতে লাগল। সাদি কিছুক্ষণ ওনার মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"পরের মাসে আপনার বার্থডে, আমি একটা বই আপনার জন্য রেখেছি। কখনো টাইম পেলে ওটা পড়বেন। ওটাতে মনের সব কষ্টের শেফা আছে।" নীরবতা আবার ওদের দুজনের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। তারপর জুমার ওর দিকে তাকাল, ও তখনও ওনার দিকেই তাকিয়ে ছিল। জুমারের চোখ ওর মুখ থেকে নেমে ওর হাতের ওপর গেল এবং একটা কালো কি-চেইনের ওপর আটকে গেল, যা ও আঙুল দিয়ে ধরে রেখেছিল। ওটার ওপর গোল্ডেন কালারের অক্ষরে লেখা ছিল "Ants Everafter"।
যদিও এখন আর আগের মতো সেই রিলেশন বা ফ্রিডম ছিল না, তাও ও জিজ্ঞেস করেই ফেলল। ও জবাবে ঘাড় নিচু করে কি-চেইনের দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল:
"উঁহু। আলিশা হানিন দিয়েছিল। হানিনের জন্য ওটার সাথে কিছু পেইনফুল মেমোরিজ জড়িয়ে আছে, সো এটা আমি রেখে দিয়েছি। আজ সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে এমনিই হানিনের রুমে গিয়েছিলাম আর ওটা তুলে নিয়ে এলাম।" কালো হিরের মতো পাথরটার ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে সে বলছিল, "আমার এটা খুব ভালো লাগে। স্পেশালি এই লেখাটা।"
"খুশুশি ইবারাত"
"এর মানে কী?" ওনার ভয়েসে কিছুটা সফটনেস চলে এল। জিজ্ঞেস করার সময় সে ওর ফেসের দিকে তাকাচ্ছিল। এটা কি সেই বাচ্চাটাই, যাকে সে আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল?
"যখন আমি ছোট ছিলাম ফুপ্পু, তখন আব্বুর সাথে ফজর পড়তে মসজিদে যেতাম। তখন ওখানে মসজিদের ওয়ালে ছাদ থেকে ফ্লোর পর্যন্ত পিঁপড়ের একটা লাইন থাকত। প্রতিটা সিজনে, প্রতিটা মোমেন্টে। তখন আব্বু বলতেন—'যদি আমার কিছু হয়ে যায় সাদি, তবে তুমি নিজের ফ্যামিলির খেয়াল রাখবে। বড় আব্বু একজন উইক মানুষ, কিন্তু তোমাকে ব্রেভ হতে হবে। তুমি সাদি, আমার পর এই ফ্যামিলির মেইন পারসন হবে। আর তোমার ফ্যামিলির মেয়েরা, বৃদ্ধরা আর বাচ্চারা—এরা সবাই পিঁপড়ের মতো, উইক আর সফট।' আর উনি এটাও বলতেন যে দুনিয়াতে মাত্র দুই ধরনের মানুষ হয়—রাজা আর পিঁপড়ে। 'তুমি সাদি, নিজের পিঁপড়েগুলোকে একসাথে জুড়ে রাখবে। তুমি সাদি, আমার পর নিজের ফ্যামিলির হেড হবে'।" কি-চেইন থেকে চোখ তুলে সে একটা স্যাড স্মাইল নিয়ে জুমারের দিকে তাকাল। "আর আমি গত কয়েক বছর ধরে এটাই করার ট্রাই করছি আর করেই যাব। আপনি, হানিন, আম্মু—সবাই এক রকমের। পিঁপড়ে। আর জানেন ফুপ্পু, পিঁপড়েদের মধ্যে কমন ফ্যাক্টর কী?"
সে কত সুন্দর করে কথা বলত—ইনোসেন্ট আর সিম্পল। চোখ দুটো ওর ওপর ফিক্সড রেখে জুমার মাথা নাড়ল। সে ওনার দিকে কিছুটা ঝুঁকল এবং আস্তে করে বলল:
"সেটা হলো... সব পিঁপড়েই অন্ধ হয়।" আর তারপর সে লক খুলল, দরজা পুশ করল এবং সালাম দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। জুমার স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ওকে চলে যেতে দেখল। পলকের জন্য ওর মন চাইল ওকে আটকে রাখতে, কিন্তু... আটকানোর মতো কোনো বাহানা ছিল না।
পরের দেড় বছর পর্যন্ত সে সাদিকে আর দেখেনি। না ও কখনো ওনার সামনে এসেছে, না উনি ওদের বাড়িতে গেছেন; যতক্ষণ না হাশিম একদিন এসে ওনাকে বলল যে সে যেন সাদিকে সোনিয়ার বার্থডের কার্ডটা দিয়ে আসে... আর চার বছর পর জুমার ওই বাহানাটা পেয়েই গেল, সাবকনশাসলি যার খোঁজে সে এতদিন ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Shauq apne bhi kya nirale hain. Aasteenon mein saanp paale hain
[শখ আমারও কী অদ্ভুত আর অনন্য! নিজেরই অজান্তে হাতার ভেতর কালসাপ পুষে চলেছি।]
ঠিক যে সময় জুমার আর সাদি বাইরে গাড়িতে বসে কথা বলছিল, প্যালেসের ভেতরে নিজের রুমে একখানা উঁচু চেয়ারে বসে জওয়াহেরাত আঙুলের আংটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। রুমের খোলা দরজা দিয়ে লাউঞ্জে নতুন ফিলিপিনো মেয়েটাকে বালতি আর মুভ নিয়ে সিঁড়ি পরিষ্কার করতে দেখা যাচ্ছিল।
হঠাৎ জওয়াহেরাত মোবাইলটা বের করে একটা নম্বর ডায়াল করে উঠে দাঁড়াল। দরজাটা বন্ধ করে ফোনটা কানে ঠেকাল।
"জি ডক্টর আফতাব। কী খবর? আপনার ফ্যামিলি কেমন আছে?"
"সবাই ভালো আছে মিসেস কারদার। আপনার শরীর কেমন?" সে মলিন হেসে বলল।
"হুম। I'm fine।" বেশ দেমাকের সাথে বলে কিছুটা পজ নিল। "পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা পড়েছি আমি। আই অ্যাম স্যাটিসফাইড। এখন আপনি আমাকে বলুন, কেউ আনস্যাটিসফাইড নয় তো?"
"না।" সে মুহূর্তের জন্য থামল। "হাশিম আর ওদের সিকিউরিটি অফিসার খাওয়ার—ওরা দুজনেই আমাকে অরঙ্গজেব সাহেবের মুখের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিল।"
"কী জিজ্ঞেস করেছিল?" ওর বুকটা ধক করে উঠল।
"কারদার সাহেবের ডেথ মাথায় আঘাতের কারণে হয়নি, দম বন্ধ হওয়ার কারণে হয়েছে। Smothering-এর কারণে নাক আর তার চারপাশের অংশটা বেশ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল।"
"তো আপনি কী বললেন?" সে জলদি জিজ্ঞেস করল।
"এটাই যে কারদার সাহেবের অ্যাজমা বেড়ে গিয়েছিল, ওই কারণে উনি পড়ে যান আর চোট পান। ডেথও ওই কারণেই হয়েছে। ওরা দুজনেই তো ডক্টর নয়, সো স্যাটিসফাইড হয়ে গেছে। কারণ কারদার সাহেবের মারাত্মক অ্যাজমা তো ছিলই। তাছাড়া homicidal smothering ডিটেক্ট করা খুবই ডিফিকাল্ট। সো, আমি ওটা হ্যান্ডেল করে নিয়েছি। এটা একটা ন্যাচারাল ডেথ ছিল।"
জওয়াহেরাত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সে মাথা নেড়ে সায় দিল। দু-একটা নরমাল কথা বলে ফোনটা রেখে দিল। তারপর উঠে দরজাটা খুলল।
ফিওনা পরিষ্কার করতে করতে এখন শেষ সিঁড়িতে চলে এসেছে। জওয়াহেরাত ওকে আলতো করে ডাকল। সে জিনিসপত্র রেখে বেশ বিনীতভাবে এগিয়ে এল।
"বাইরে থেকে ঠান্ডা আসছে, দরজাটা বন্ধ করে দাও।" সে আবার চেয়ারে এসে বসল এবং হাসিমুখে চোখ দিয়ে ইশারা করল। ফিওনা চটপটে পায়ে দরজা বন্ধ করে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। জওয়াহেরাত গভীরভাবে ওকে দেখল। সে কালো চুলের পনিটেল করা, কিছুটা চাইনিজ ছাঁচের মুখের এক সুন্দরী আর কমবয়সী মেয়ে।
"কাজে মন বসেছে তোমার?"
"জি। মেরি আমাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে।" মেয়েটা কিছুটা লাজুক হেসে বলল।
"হুম। পেছনে তোমার ফ্যামিলিতে কে কে আছে?"
"মা, চার বোন আর এক ভাই। আমি সবার বড়।" মাথা নিচু করে সে ঠোঁট কামড়াল। চোখে জল চলে এল।
"তোমার স্যালারি দিয়ে ওদের দিনকাল হয়তো ভালোই কেটে যায়, কিন্তু ভাইকে পড়াশোনা করানো, একটা সম্মানজনক চাকরি জুটিয়ে দেওয়া—এসব তো বেশ টাফ হবে, তাই না?" সে কানের দুলটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওকে দেখছিল। ফিওনা নিচু মাথাটা আলতো নেড়ে সায় দিল।
"সেটা তো ঠিক।"
"ইশ! আমি যদি তোমার স্যালারিটা বাড়াতে পারতাম! কিন্তু মেরি হলো হেড স্টাফ আর তুমি স্রেফ একজন জুনিয়র মেইড। হ্যাঁ, যদি তুমি মেরির জায়গায় হতে, তবে লাখে খেলতে। কিন্তু..."
ফিওনা চোখের পাতা তুলল। আশা আর ভয়ের একটা মিক্সড এক্সপ্রেশন নিয়ে ওর দিকে তাকাল। "কিন্তু?"
"ওর পজিশনে পৌঁছাতে তো তোমার সাত-আট বছর লেগে যাবে। আমাদের ফ্যামিলির সাথে ওর আরও তিন বছরের চুক্তি আছে। আর সেই অনুযায়ী আমি ওকে বিনা কারণে টার্মিনেট করতে পারি না।" সে থামল।
ফিওনা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। "জি, উনি খুব ভালো কাজ করেন।"
"কিন্তু ও তোমার মতো স্মার্ট আর চটপটে নয়। সবসময় ওর বাচ্চার চিন্তা ওকে গ্রাস করে রাখে, যাকে ও ফিলিপাইনে রেখে এসেছে। তুমি ওর চেয়ে অনেক বেটার হেড স্টাফ হতে পারো।"
"ওটা তো পসিবল নয়। কারণ ও আরও কয়েক বছর এই পোস্টে থাকবে আর আপনি ওকেও বের করতে পারবেন না।" কিছুটা হতাশা আর উদাসীনতার সাথে বলতে বলতে ওর চোখ আবার নিচু হয়ে গেল।
"আমি এটা বলিনি যে আমি ওকে বের করতে পারব না। চাইলে এখনই বের করে দিতে পারি, জাস্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তার জন্য একটা স্ট্রং রিজন থাকা দরকার।"
"রিজন?" ফিওনা চমকে ওর দিকে তাকাল। দ্বিধায় ওর ভ্রু কুঁচকে গেল।
"হ্যাঁ। যেমন চুরি!" কানের দুলটা দুই আঙুল দিয়ে ডলতে ডলতে সে হাসল।
"যেদিন ও চুরি করবে, সেদিনই ওকে ডিপোর্ট করে দেওয়া হবে। আর আমি জানি ও আজ হোক বা কাল চুরি করবেই। ওর বাচ্চার ট্রিটমেন্টের জন্য ওর টাকা দরকার, যা ওর স্যালারির চেয়ে বহুগুণ বেশি। যখন ও জানতে পারবে যে এই ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ছোট জুয়েলারি বক্সটা (সে একটা দামি জুয়েলারি বক্সের দিকে ইশারা করল, যার কোড জওয়াহেরাতের বার্থডে দিয়ে খোলে) আর ওটার ভেতরে আমার একটা এক্সপেনসিভ নেকলেস রাখা আছে, তখন কি ও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারবে? ওর এই ব্যাপারে ভাবা উচিত, তাই না ফিওনা?" সে থেমে থেমে মুচকি হেসে ওর নামটা উচ্চারণ করল।
জুমারের আসার পর ফিওনা যখন মিসেস কারদার-এর রুম থেকে বের হলো, তখন এক অদ্ভুত ভাবনায় ওর চোখ দুটো চকচক করছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Jo khuli khuli thi adavatein mujhe raas thi. Yeh jo zahar-khand salaam the mujhe kha gaye
[যে শত্রুতা প্রকাশ্য ছিল, তা-ই আমার সয়ে গিয়েছিল। এই যে বিষাক্ত হাসিমাখা সালামগুলো, এগুলোই আমাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলল।]
হাশিম কারদার-এর অফিস যে ফ্লোরে ছিল, তার করিডোরটা স্পটলাইটের আলোয় ঝলমল করছিল যখন সাদির লিফটের দরজাটা খুলল। বের হওয়ার আগে সে লিফটের আয়নায় নিজের রিফ্লেকশন দেখাল—একটু থামল, পাঞ্জাবির ওপরের বোতামটা খুলল, সোয়েটারের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ওপরে তুলল, কপালে হাত দিয়ে চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত করে বাইরে বের হলো। দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে সে এক মুহূর্তের জন্য হাশিম-এর অফিসের বাইরের ডেস্কে থামল।
"হাশিম ভেতরে আছেন?" সে ডেস্কে রাখা নেমপ্লেটের দিকে তাকিয়ে বেশ সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করল। সুন্দরী সেক্রেটারি টাইপ করা হাত থামিয়ে চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল।
"জি, কিন্তু স্যার একটা কাজ করছেন। আপনার কি appointment আছে?"
"প্রয়োজন নেই।" ওকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে অফিসের দরজার কাছে গেল এবং ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। হালিমা হকচকিয়ে ওর পেছনে দৌড়াল।
"আমি আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।" প্রচণ্ড রাগে সে সোজা টেবিলের কাছে চলে গেল। হাশিম—যে কোটটা পেছনে ঝুলিয়ে শার্ট আর কটি পরে ফাইলে কিছু লিখছিল—মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল। তারপর পেছনে আসা হালিমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল। সে থামল এবং ফিরে চলে গেল। সিটে হেলান দিয়ে সে এবার বেশ গম্ভীরভাবে সাদির দিকে তাকাল, যে রাগী চোখ আর লালচে কান নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
"কী হয়েছে সাদি?" কোনো রাগ বা তিক্ততা ছাড়াই হাশিম যখন বলল, তখন ওর গলার আওয়াজ বেশ কড়া ছিল। সাদির এই অ্যাটিটিউড ওর একদম পছন্দ হয়নি।
"সেটা তো আপনিই বলবেন!" দুই হাত টেবিলের ওপর রেখে সে সামনের দিকে ঝুঁকে এল। "জুমারকে কেন বললেন, যা হানিন আপনাকে বলেছিল?"
"এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে সাদি যে তুমি নিজের manners ভুলে গেছ?" এবার ওর চোখেও বিরক্তি ফুটে উঠল। কলমটা টেবিলের ওপর রাখল। টাইয়ের নটটা আলতো করতে করতে হেলান দিয়ে এই ছেলেটার দিকে তাকাল।
"ধ্যাত তেরি আপনার ম্যানার্সের! কিন্তু আপনার ম্যানার্স কোথায় ছিল যখন হানিন আর আমার ট্রাস্ট ব্রেক করলেন?"
"আমি জানতাম না যে জুমার তোমাদের কাছে কোনো বাইরের মানুষ। ইনফরমেশনের জন্য থ্যাংকস। এখন আমি কাজ করতে পারি?" তিক্ততার সাথে ওর দিকে তাকিয়ে সামনে রাখা ফাইলের স্তূপের দিকে ইশারা করল। "আর তুমি যদি ভুলে গিয়ে থাকো তবে মনে করিয়ে দিই—আমি এখন খুব ইম্পর্ট্যান্ট কিছু ম্যাটারে ব্যস্ত আছি। আমার সব কটা কোম্পানি আর কার্টেলের লিড দিতে হচ্ছে আমাকে এই দিনগুলোয়, কারণ আমার বাবা ঠিক সাত দিন আগে মারা গেছেন।"
"আমার বাবা দশ বছর আগে মারা গেছেন, সো বেটার হবে যদি আমরা বাবাদের মাঝখানে না এনে কথা বলি।" ওর এই টোনে হাশিম ঠোঁট কুঁচকে অবাক হয়ে ভ্রু তুলল।
"ওহ! তো তুমি আমার সাথে ঝগড়া করতে এসেছ?" সে জোরে ফাইলটা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রাখল এবং নিজের ভেতরের চরম রাগটা কন্ট্রোল করল। পুরো মুডটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
"আমার কী সাধ্য যে আমি আপনার সাথে ঝগড়া করব? আমি স্রেফ আপনাকে confront করতে এসেছি। আর কনফ্রন্ট করার জন্য আপনার অফিসের চেয়ে বেটার জায়গা আর কিছু হতে পারত না। সো আমাকে বলুন, কেন কথা বললেন জুমারের সাথে? উনি আমার ওপর ট্রাস্ট করেছিলেন, এখন কীভাবে আবার করবেন?" সে বেশ রুডলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
"আমি কি তোমার কাছে কোনো জবাব চেয়েছিলাম যখন তুমি আমার অ্যাপয়েন্ট করা লইয়ারকে ফায়ার করেছিলে?" সে কড়া কিন্তু শান্ত গলায় বলতেই সাদি আরও ক্ষেপে গেল।
"চান জবাব! আমি দেব প্রতিটা জবাব!" সাথে সাথে সে টেবিলের ওপর জোরে একটা থাপ্পড় মারল আর চরম ক্ষোভ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
"তাহলে কেন করলে আমার লইয়ারকে ফায়ার?"
"কারণ ওই লইয়ারও আপনার মতোই ছিল হাশিম ভাই। আপনার মতোই ওরও ফারিস গাজীর ইনোসেন্সের ওপর কোনো বিলিভ ছিল না। আপনার কী মনে হয়, আমি একটা বাচ্চা?" সে চরম ঘৃণায় ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। "আমি সব বুঝে গেছি। আপনারও ভেতর থেকে এটাই মনে হয় যে ফারিসই খুনগুলো করেছে। আপনিও ওনাকে কালপ্রিট ভাবেন। মুখে আপনি যা-ই বলুন না কেন, ভেতর থেকে আপনিও ওনাকে একলা ফেলে দিয়েছেন।"
"এক্স্যাক্টলি, আমি এমনটাই ভাবি। তো? কী করবে তুমি?" সে তখনও নিজেকে সামলে নিচ্ছিল।
"আমি আপনাদের সবার সামনে প্রমাণ করব যে এই মার্ডারগুলো উনি করেননি। আপনি, জুমার—সবাই এক রকমের। আপনারা সবাই ওনাকে একলা করে দিয়েছেন। এতগুলো বছরে আপনি একবারের জন্যও ওনার সাথে দেখা করতে জেলে যাননি। লোকজনের কথাবার্তা আপনার মনেও গেঁথে গেছে আর আপনিও... আপনিও বাকিদের মতোই হয়ে গেছেন।" বলতে বলতে ওকে ভীষণ হার্ট আর স্যাড দেখাল, সে কিছুটা পিছিয়ে গেল। হাশিম বেশ কড়া আর অপছন্দের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।
"আমি যদি জানতাম যে লইয়ার চেঞ্জের ব্যাপারে জাস্ট জানতে চাওয়ায় তুমি আমার সাথে এভাবে বিহেভ করবে, তবে আমি এই টপিকটাই তুলতাম না।" হাশিম-এর শক আর রাগটা একদম রিয়েল ছিল।
"আমার আপনার কথায় কিচ্ছু যায় আসে না।" সে পিছিয়ে যেতে যেতে আরও লাউড আর রাগী গলায় বলল, "আপনার ইমেজ আমার চোখে একদম ডেস্ট্রয় হয়ে গেছে। তাই বলে দিই—আপনার বাবার চেহলামের ইনভিটেশন কার্ড এসেছিল, আমি আসব না, আমার ফ্যামিলি থেকেও কেউ আসবে না। ফিউচারে আমাদের কোনো ইনভিটেশনে ডাকার কষ্ট করবেন না, রিফিউজাল শুনে আপনার নিজেরই লজ্জা লাগবে।" চরম ঘৃণা আর ইমোশনাল টোনে কথাগুলো বলে সে ঘুরে বাইরে চলে গেল। দরজা বন্ধ করার সময় ভেতরের যে দৃশ্যটা ওর চোখে পড়ল—তাতে দেখা গেল হাশিম প্রচণ্ড ক্ষোভ আর কিছুটা শক নিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে সাদি একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল। ইচ্ছে করে উস্কে দেওয়া আর টানটান হওয়া নার্ভগুলোকে যেন সে আলতো করে রিল্যাক্স করল। হাত দুটো এখনও সামান্য কাঁপছিল আর হার্টবিট ছিল ফাস্ট। লিফটের কাছে থামতেই ওটার মেটালিক দরজায় নিজের রিফ্লেকশন দেখে সে নিজেকেই সাবাশ জানাল।
(দারুণ পারফরম্যান্স ছিল সাদি! জওয়াহেরাত যদি ওটা নাও করত, তাও ওদের বাড়ি না যাওয়ার কোনো না কোনো বাহানা তো আমাকে খুঁজতেই হতো। কারণ এখন ওদের সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়া, হাসিমুখে কথা বলা—সব একটা টর্চার মনে হতো। সব জায়গায় ওয়ারিসের রক্ত চোখে ভাসত। সো খুব ভালো করেছ সাদি। এখন হাশিম ভাই এটলিস্ট এটা জানতে পারবেন না যে আমি ওনার আসল রূপটা চিনে ফেলেছি। উনি এটাকে স্রেফ ট্রাস্ট ব্রেকের রাগ বলেই ভাববেন। আমি যদি এটা না করতাম, তবে আমার এই ডিস্ট্যান্ট বিহেভিয়ার দেখে উনি সব বুঝে যেতেন। খুব ভালো করেছ সাদি। রোজ ওনাদের মুখ না দেখার একটা পারফেক্ট বাহানা পেয়ে গেলে!) লিফটে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে নামার সময় সে নিজেকে নরমাল করছিল আর নিজের তারিফ করছিল। মনটা অবশ্য একদম ফাঁকা আর খাঁ খাঁ লাগছিল। চোখে বারবার জল চলে আসছিল, যা সে সোয়েটারের হাতা দিয়ে মুছে নিচ্ছিল।
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
Bhoolne wala laut toh aaya... waqt maghrib ya esha ka tha
[ভুলে যাওয়া মানুষটা ফিরে তো এলো... সময়টা মাগরিব কিংবা এশার ছিল।]
ছোট্ট বাগানওয়ালা বাড়িটার কিচেন থেকে রান্না করা খাবারের সুগন্ধ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, যেমন এক গ্লাস জলের মধ্যে নীল কালির এক ফোঁটা ছড়িয়ে পড়ে। পুরো পরিবেশটা এক ক্ষিদে জাগানিয়া সুবাসে সুবাসিত হয়ে উঠেছিল। এমন সময় হানিন, সাদির খালি রুমের চেয়ারে উদ্দেশ্যহীনভাবে বসে ছিল। কনুই দুটো টেবিলের ওপর রেখে মুখটা তালুর ওপর ছেড়ে দিল। চশমাটা খুলে সাইডে রেখে দিল। কিছুক্ষণ আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর হিজিবিজি দাগ কাটল। তারপর হঠাৎ ও চমকে উঠল।
কাছেই একটা সাদা মলাটের বই রাখা ছিল। সাথে একটা পেন আর কার্ড। সাদি কি এই বইটা কাউকে গিফট করছে? বেশ অবাক হয়ে সে কার্ডটা তুলল। জুমারের নামে একটা বার্থডে কার্ড। ওহ! কয়েক দিন পরেই তো ফুপ্পুর বার্থডে ছিল। সো সাদি এই বইটা জুমারকে দিতে যাচ্ছিল। এটা সেই বইটাই ছিল, যা বছরের পর বছর আগে সে একবার এমনিই খুলে দেখেছিল। এখন আবার খুলতেই ফার্স্ট পেজে হাশিম-এর নাম লেখা দেখতে পেল। সে নামটার ওপর আঙুল বোলাল এবং মুচকি হাসল। তারপর উদ্দেশ্যহীনভাবে পাতা উল্টাতে লাগল। হঠাৎ মাঝখানের একটা পাতায় এসে সে থমকে গেল।
সাতশ বছর আগের সেই ধূসর-হলদেটে সময়ের দিকে নিয়ে যাওয়া দরজাটা ঠিক সামনে ছিল। হানিন এক মুহূর্তের জন্য ভাবল ভেতরে যাবে কি না, তারপর আর কিছু না ভেবেই সে হাত বাড়িয়ে দরজাটা পুশ করল। প্রাচীন খোদাই করা কাঠের পাল্লা দুটো খুলে গেল। ওখান থেকে একরাশ আলোর বন্যা ধেয়ে এল। ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আলোটা কিছুটা কমতেই সে চোখের পাতা টিপটিপ করে চারপাশ দেখল। সে প্রাচীন দামেস্কের সেই হলদেটে বাড়িটার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, যা মসজিদের সাথে লাগানো ছিল। এক সময় সে এখানে ভিড়ের মাঝে ঘেরা এক অসুস্থ মানুষকে দেখেছিল। আজ এখানে এক শূন্যতা ছিল, নিস্তব্ধতা ছিল। গোধূলির আলো নেমে আসছিল। আলো এখন শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির ভেতরে চেরাগ জ্বলছিল। পায়জামা, লম্বা কামিজ আর হেয়ারব্যান্ড লাগানো চুলের হানিন এই পুরো হলদেটে পটভূমিতে একমাত্র কালারফুল জিনিস ছিল। সে প্রথমে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর বিড়ালের মতো নিঃশব্দে, ফুঁকে ফুঁকে পা ফেলে বাড়ির ভেতরে এল। প্রথম রুমের পর্দাটা সরাল এবং মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকল।
সেই স্টাডি রুমটার জায়গায় জায়গায় প্রদীপ জ্বলছিল কিংবা কয়েকটা মোটা মোমবাতি। দেওয়ালের খোপগুলোতে বই রাখা ছিল। সামনে ফ্লোরের ওপর হাঁটু গেড়ে শেখ মুয়াল্লিম বসে ছিলেন আর চৌকির ওপর রাখা কোরা কাগজে কলমটা কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে লিখে যাচ্ছিলেন।
সে বুকে হাত বেঁধে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে এক ক্রিটিক্যাল নজরে ওনাকে দেখতে লাগল। তারপর ঘাড় সোজা করে ডেকে উঠল:
"আপনি কি আপনার বই শেষ করেননি?" সে মাথা নিচু করেই লিখতে থাকল। হানিন বিরক্তি নিয়ে চোখ ছোট করল। চারপাশের সবকিছুই হলদেটে ছিল, যেন পুরনো আমলের কোনো প্রিন্ট, আর একমাত্র ওই ছিল কালারফুল। তারপর ধীর পায়ে সে কাছে এল। একদম চৌকির সামনে। মাথাটা একটু বাঁকিয়ে যেন উঁকি দিল।
"আপনার বইতে কি সত্যি সত্যি মনের সব অসুখের ট্রিটমেন্ট আছে?" জিজ্ঞেস করার সময় মুখটা এমন ইনডিফারেন্ট বানাল যেন জবাবে কোনো ইন্টারেস্ট নেই, কিন্তু ওর সবকটা ইন্দ্রিয় জবাব শোনার জন্যই ব্যাকুল ছিল।
উনি বললেন:
"প্রতিটা রোগের ওষুধ আছে। যে একে জানে, সে একে জানে; আর যে একে জানে না, সে একে জানে না।" মাথা নিচু করেই কথাগুলো বলছিলেন।
"আহ! আপনার জামানার রোগ!" সে যেন হতাশ হয়ে হাত ঝাড়ল। তারপর সামনে বসল, চৌকির ওপর কনুই রাখল আর হাতের তালুতে থুতনি ঠেকাল। "প্লেগ বা অন্য কোনো মহামারীর রোগ আমাদের জামানায় হয় না। আমাদের প্রবলেমগুলো আলাদা ইবনে। কিন্তু না, আপনার কী বা জানা থাকবে।" তারপর যেন ওর রাগ হলো। ভ্রু কুঁচকে বলল, "আপনি সাতশ বছরের পুরনো একজন বুড়ো মানুষ। একজন naive বুড়ো। আপনি তো এটাও জানেন না যে কম্পিউটার কী, ইন্টারনেট কী, টিভি শো কাকে বলে... আর ওগুলো কীভাবে লাইফ ডেস্ট্রয় করে। কিন্তু না... উফ!" যেন যন্ত্রণায় মাথা ঝাঁকাল। আফসোসের সাথে ওনার দিকে তাকাল।
"আপনার বই আমাকে হেল্প করতে পারবে না, কারণ এতে আমার কোনো প্রবলেমের সলিউশন নেই।"
উনি তখনও কলমটা কালিতে চুবিয়ে লিখে যাচ্ছিলেন, সো বিরক্ত হয়ে হানিন ওনার কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ঘাড় বাঁকিয়ে পড়ল:
'হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' হানিন মাথা তুলল, চোখ ছোট করে সন্দেহী নজরে ওনার দিকে তাকাল।
"আমি জানি এটা একটা আয়াত, মিনিংটাও জানি। খমর মানে হলো মদ। ময়সির হলো জুয়া। আনসাব হলো মূর্তি আর আজলাম..." চোখ বন্ধ করে ব্রেইনে একটু প্রেসার দিল। "হ্যাঁ, ভাগ্যের তীর ইত্যাদি, রাইট? কিন্তু হে শেখ! এটা আমার কান্ট্রির, আমার মতো মিডল ক্লাস মেয়েদের ওপর অ্যাপ্লাই হয় না।" চরম আফসোসের সাথে ওনার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। "আপনার জামানায় হয়তো দামেস্কে মদের আড্ডাখানা থাকত। ওই যেমন নসীম হিজ্জাজীর নভেলগুলোতে থাকত। আমরা তো এই ড্রিংকের নামও মুখে আনি না, আনতে হলে ইংলিশে অ্যালকোহল বলে দিই। ইংলিশে জিনিসগুলো কম খারাপ শোনায়।" বেশ সিক্রেটলি একটু এগিয়ে ওনাকে ইনফরমেশনটা দিল। সে কথা না শুনেই লিখে যাচ্ছিল। "যাই হোক—মদ, জুয়া, পাশা কোনো কিছুর সাথেই আমার দূর-দূরান্তের কোনো কানেকশন নেই, সো..." সে হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। "আপনার বই আমার কোনো কাজের না। যেমনটা আমি বললাম—আপনি সাতশ বছরের পুরনো একজন naive বুড়ো।" কিছুটা হতাশা আর কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে সে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরল।
হাঁটু গেড়ে বসে কলম দিয়ে কাগজে শব্দ ফুটিয়ে তুলতে তুলতে শেখ খুব আস্তে করে ডেকে বললেন:
"যখন মদ হারাম করা হয়েছিল, তখন ওই বাসনগুলোও ভেঙে ফেলার অর্ডার দেওয়া হয়েছিল যেগুলোতে ওটা পান করা হতো।" সে ওর দিকে তাকাচ্ছিলেন না, সম্ভবত লেখার মাঝেই জোরে বলছিলেন। হানিন আফসোস করে মাথা নাড়ল।
"যেমনটা আমি বললাম—আপনার আর আমার জামানার প্রবলেমগুলো টোটালি ডিফারেন্ট।"
পুরনো বৈঠকখানার মোমবাতিগুলো তখনও জ্বলছিল। সে ওগুলোর আবছা আলোয় রাস্তা বানিয়ে সামনে এল এবং চৌকাঠের পর্দাটা সরিয়ে দিল। ওপাশে এক মায়াবী অন্ধকার ছিল। সে অন্ধকারে পা রাখল আর...
আর বইটা বন্ধ করে দিল। মাথা তুলল তো দেখল সে ভাইয়ের স্টাডি টেবিলে বসে আছে। রুমটা হোয়াইট টিউবলাইটের আলোয় উজ্জ্বল ছিল। লাউঞ্জ থেকে কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল। হানিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও বইটা যথাস্থানে রাখল, কেবল উঠেছে এমন সময় সাদি ভেতরে চলে এল। ওকে দেখে সে থামল, তারপর চোখ এড়িয়ে আলমারির দিকে চলে গেল।
"রেগে আছেন আমার ওপর?" সে বেশ ব্যাকুল হয়ে ওর পেছনে পেছনে এল। কয়েক সেকেন্ড ও এভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ওর দিকে ঘুরল।
"না। আমি তোমাকে মাফ করে দিয়েছি।" একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল।
"মন থেকে বলছেন?"
"হ্যাঁ।" সে ওর সামনে এল। আলতো করে ওর হাত ধরে খাটের ওপর বসাল। আর নিজে কাছে বসল। সে মাথা নিচু করে নিজের হাঁটুর দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি কারও মৃত্যুর জন্য রেসপন্সিবল নও, না। ওসিপি সাহেবেরও ততটাই দোষ ছিল যতটা তোমার। ওনার তোমার ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা উচিত ছিল। আম্মুর কাছে আসতেন, তোমার কাণ্ডটা বলতেন, তো আম্মু তোমাকে দুটো চড় মেরে ওনার কাজটাও করিয়ে দিতেন আর মাফও চাইতে বলতেন। ওনাকে পেপারসও দিতে হতো না আর কাজটাও হয়ে যেত। কিন্তু উনি ভীরুতার পথ বেছে নিয়েছেন। এটা ওনারও ভুল ছিল। সো এখন বেটার হবে যে আমরা এই ইনসিডেন্টটা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাই।" হানিন নিচু মাথাটা নেড়েই বারণ করল।
"আমি অ্যাডমিশন নিচ্ছি না। আমি বিএ করব।"
"ঠিক আছে, এখন তুমি ইঞ্জিনিয়ার হবে না। তুমি এটা deserve করো না। সবাই বলত—হানিনকে সারাক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসতে দিয়ো না, মেয়েটা নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তোমার ইন্টারনেট, কম্পিউটার গেমস—কিছুই কখনো আটকাইনি। আমার তোমার ওপর এই বিশ্বাসটা ছিল। তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ। হানিন, একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ডের চিটিংও তোমার ডিগ্রিকে 'নাজায়েজ' বানিয়ে দেয়। যে মানুষগুলো চিটিং করে মেডিকেলে অ্যাডমিশন নেয়, তারা সারাজীবন ফ্রি ট্রিটমেন্ট করলেও কি তাদের ইনকাম পবিত্র হবে? আল্লাহর নিয়মগুলো কখনো চেঞ্জ হয় না। You know what হানিন, আমি তোমাকে এটার জন্য মাফ করছি, কারণ তোমার মধ্যে আর ফারিস মামুর খুনির মধ্যে তফাত আছে। তুমি বললে ওদের নাকি গিল্ট ফিল হয়েছে, তোমার তো ওটাও হয়নি। আমি তোমাকে বলি—আমারও মনে হয় ওদের গিল্ট ফিল হয়েছে। ওরাও হয়তো মামুর কবরে গেছে, ওনার নামে চ্যারিটিও করেছে। আজও মামুর খুনিরা যদি মামুর মেয়েদের দেখে, তবে ওদের জন্য খুব কষ্ট ফিল করবে। কিন্তু স্রেফ কষ্ট ফিল করাটাই কি এনাফ?" সে মাথা নাড়ল। "বড় পাপের কাফফারা দিতে হয়, স্রেফ ফাঁকা গিল্ট আর কষ্ট চুলোয় যাক। কিছুক্ষণের জন্য জারতাশার শোক ওরাও হয়তো পালন করেছে, আর তারপর? কী, অপরাধ স্বীকার করেছে? কাফফারা দিয়েছে? নিজেকে ল-এর হাতে তুলে দিয়েছে? না! তুমি ওদের মতো নও। তুমি কাফফারা দিয়েছ, আর হানিন—কাফফারা দেওয়ার পর গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ওসিপি সাহেবের লাইফ তুমি নও, ওনার মেয়ে আর ওনার ভীরুতা কেড়ে নিয়েছে। আমি তোমাকে মাফ করছি, কিন্তু তোমার ওপর আবার ট্রাস্ট করতে আমার অনেক টাইম লাগবে। আর এখন তুমি যা পড়তে চাও পড়ো, কিন্তু তুমি আমার সাথে একটা প্রমিস করবে। একটা পাকাপোক্ত আকদ যে তুমি আর কখনো এই কাজ করবে না। কারণ হানিন, কখনো যদি আমি জানতে পারি যে হানিন আবার পেপারে চিটিং করেছে, তবে সেদিন আমরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাব।" আঙুল উঁচিয়ে বেশ কড়া গলায় সে ওয়ার্নিং দিচ্ছিল। "আমাকে ফিউচারে কখনো এটা শুনতে দিয়ো না হানিন যে তুমি আবার এই একই কাজ করেছ।"
হানিন ঝটপট মাথা নেড়ে সায় দিল। (এমনটা তো কখনোও হবে না, কখনোও না। ওর নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল।)
সাদি বলল, "আপাতত বিএ করাটাও এই প্রবলেমের সলিউশন নয়। প্রবলেমটা হলো তোমার অ্যাডিকশন। কম্পিউটার আর টিভি ড্রামার অ্যাডিকশন।"
"অ্যাডিকশন?" সে চমকে উঠল। ভীষণভাবে। এক নিমেষে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। সে সাতশ বছর আগের সেই শেখ মুয়াল্লিমের আধা-অন্ধকার বৈঠকখানায় বসে ছিল, আর দূর কোথাও সাদি কথা বলছিল।
"আমিও দুই-তিনটে ড্রামা ফলো করি। গত দুই বছর ধরে Suits আর চার-পাঁচ বছর ধরে Grey's Anatomy দেখছি। আমি এটা বলছি না যে ড্রামা দেখো না, সিনেমা দেখো না। আমি ওটা বললে তুমি শুনবেও না। আমি স্রেফ এতটুকু বলছি যে লিমিটের মধ্যে থেকে দেখো। এক্সেস যেকোনো কিছুরই হোক না কেন, ক্ষতি করে।"
সে ওর ফেসের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ভেবে গেল।
"কী ভাবলে তাহলে তুমি?"
"খমর শয়তানের অপবিত্র কাজ।" সে খুব নিচু গলায় বলতেই সাদি না বোঝার মতো করে ওর দিকে তাকাল।
"মানে?" সে কথার কনটেক্সটটা বুঝতে পারল না। সে দূর কোনো এক জামানায় বসে কথা বলছিল।
"শেখ ঠিকই বলেছিলেন। একেক জনের খমর একেক রকম হয়। জানেন অ্যালকোহল কেন হারাম? কারণ ওটা নেশা তৈরি করে আর লত ধরিয়ে দেয়। প্রতিটা নেশা ধরাবার জিনিসই খমর। চাই সেটা কোনো ড্রিংক না হোক বা সেটার কালার রেড না হোক। আমার খমর ছিল এসব কিছু। এই কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট, টিভি। সো এখন..." সে দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল। "আমি এসব জিনিস আর ইউজ করব না।" একটা দৃঢ় সংকল্প সে ওই মুহূর্তেই করে ফেলল। সাদি অবভিয়াসলি ওকে বোঝানোর ট্রাই করল।
"হানিন, কোনো জিনিস নিজে থেকে ভালো বা মন্দ হয় না। সেটার ব্যবহার ওটাকে ভালো বা মন্দ..."
"একদমই বলবেন না এই ফালতু কথাটা, যা মানুষ রিপিট করতে করতে ক্লান্ত হয় না!" সে বেশ রাগে বলল। "প্রতিটা জিনিসের ব্যাপারে আপনি এটা বলতে পারেন না যে এটা নিজে থেকে ভালো বা মন্দ নয়। কিছু জিনিসের খারাপ ব্যবহার ওগুলোর ভেতরে মন্দের ইফেক্টটা এতটাই গেঁথে দেয় যে... যে ওগুলোতে আপনার জন্য ভালোটাই শেষ হয়ে যায়। যখন খমর নিষিদ্ধ হয়েছিল, তখন ওই বাসনগুলোও ভেঙে ফেলার অর্ডার দেওয়া হয়েছিল যেগুলোতে ওটা পান করা হতো। আপনি খমরের বাসনে জমজমের পানি খেতে পারেন না ভাইয়া!"
"আরে আজকালকার বাসনগুলোকে ধুয়ে ইউজ করা যায়, ওগুলো তো সেই আমলের লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো বাসন ছিল যা..." সে ওকে ফতোয়া আর ফিকহ বোঝাচ্ছিল, কিন্তু হানিন মাথা নাড়ল।
"জামানা বদলায়নি ভাইয়া। এখনও প্রবলেমগুলো ওগুলোই, যা সাতশ বছর আগের দামেস্কে থাকত। অন্য কারও জন্য হয়তো এই জিনিসগুলো খারাপ হবে না, কিন্তু আমার জন্য। আমি এগুলোকে এখন হাতও দেব না।" মাথা নাড়তে নাড়তে হানিনের চোখ দুটো ভিজে উঠছিল।
"কিন্তু হানিন, অ্যালকোহলও তো একবারে হারাম হয়নি। আস্তে আস্তে বারণ করা হয়েছিল। তিনটে পার্টে। এক ঝটকায় যদি এই জিনিসগুলোকে লাইফ থেকে বের করে দাও, তবে নিজের একটা পার্টও ওগুলোর সাথেই হারিয়ে ফেলবে। একজন অ্যাডিক্টেড মানুষকে একবারে ড্রাগস থেকে দূরে সরানো যায় না। ডোজ হালকা থেকে আরও হালকা করা হয়। আস্তে আস্তে ছাড়ো। নিজেকে এভাবে চেপে রেখে জোর করলে কতদিন কন্ট্রোল থাকবে? একদিন স্প্রিংয়ের মতো বাউন্স ব্যাক করে আবার ওখানেই চলে আসবে।"
"না। যদি এখনই না ছাড়ি, তবে কখনোও ছাড়তে পারব না।" সে 'না' সূচক মাথা নেড়েই যাচ্ছিল। সাদি আরও বোঝাতে চাইল, কিন্তু হানিন ডিসিশন নিয়ে ফেলেছিল। সে চুপ হয়ে গেল। ও যদি নিজের সেলফ-কন্ট্রোল টেস্ট করতে চায়, তবে সাদির ওকে আটকানো উচিত নয়।
পরের দিন নুদরাত যখন কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে লাউঞ্জে তাকাল, তখন দেখল সে কম্পিউটার প্যাক করে সাদির রুমে শিফট করছে। স্মার্টফোন থেকে সে আগেই সিম কার্ড বের করে ওটা ভেঙেচুরে ফেলে দিয়েছিল এবং আম্মুর সিমটা একটা ছোট পুরনো নোকিয়া সেটে ঢুকিয়ে ওনাদের দিয়ে বলেছিল—আমি এখন আর এটা ইউজ করব না। নুদরাতকে সাদি কী বলে বুঝিয়েছিল কে জানে, উনি প্রথমে তো চুপ ছিলেন, তারপর বকতে শুরু করলেন। ওনার ওর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অ্যাডমিশন না নেওয়ার ভীষণ কষ্ট ছিল, কিন্তু সে একদম পাথরের মতো হয়ে সব শুনে গেল। কতদিন নুদরাত ওর সাথে মাথা কুটলেন, তারপর নিজেই টায়ার্ড হয়ে সাইলেন্ট হয়ে গেলেন। লাইফে আরও অনেক দুঃখ ছিল হানিন ছাড়া।
আর এই লোনলিনেস আর সাইলেন্সের নতুন টানেলে ঢোকার পর হানিনের জন্য মাত্র একটাই আলোর পথ খোলা ছিল—নিজের প্রমিস! নেক্সট বোর্ড এক্সামে (বিএ-র ফাইনাল এক্সামে) সে নিজের হার্ডওয়ার্ক দিয়ে পাস করবে, যেমনটা সেকেন্ড ইয়ারের আগে প্রতি বছর করে এসেছে। আর যেদিন এই সততার রেজাল্ট আসবে, সেদিন ওর আঁচলে লাগা বেইমানির দাগটা ধুয়ে সাফ হয়ে যাবে। ভাইয়া আবার ওর ওপর ট্রাস্ট করতে শুরু করবে। এখন সে ওনাকে কখনোও এই সুযোগ দেবে না শোনার যে হানিন চিটিং করেছে। এখন হানিন এমনটা কখনোও করবে না। সাদি বলেছিল যদি সে আবার এমন কিছু জানতে পারে, তবে সেদিন ওরা দুজনে আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু এমন কিছুই হবে না, ওর বিশ্বাস ছিল।
সে প্রমিস করেছিল।
চলবে,,,,,,,

Comments
Post a Comment