নামাল-(Namal) অধ্যায়:১০ পর্ব ৪২, #ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) #জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf)


#নামাল-(Namal)


#ফারিস_গাজী (Faris Ghazi) 

 

#জুমার_ইউসুফ (Zumar Yousuf) 



অধ্যায়:১০


পর্ব :-৪২



Yeh āyān jo āb-e-hayāt hai ise kyā karūñ? Ke nihān jo zehr ke jaam the mujhe khā gaye!



[সামনে স্পষ্ট দেখা যাওয়া এই যে অমৃতের ধারা, এ নিয়ে আমি কী করব? আড়ালে থাকা ওই বিষের পেয়ালাগুলোই যে আমাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলেছে!]


জেলের ভিজিটিং রুমের চারপাশটা এক দমবন্ধ করা হতাশা আর ডিপ্রেশনের বাতাসে ভারী হয়ে দুজনকে ঘিরে রেখেছিল।


ফারিস পেছনে হেলান দিয়ে, এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে, মুখে কিছু একটা চিবাচ্ছিল। ওর চোখ দুটো চারপাশের জিনিসপত্রের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল।


অন্যদিকে সাদি চাপা ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।


“আর উনি ভাবছেন যে আপনি ওনাকে Use করার Try করেছেন।”


“Breaking News, সাদি! (ব্রেকিং নিউজ, সাদি!) দুনিয়ার সব প্রবলেম তোমার ফুপ্পুর কারণে হয় না।” সে চরম তিক্ততায় মাথা ঝাঁকাল।


“কত কষ্ট করে উনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেন, আর আপনি সবকিছু Spoil করে দিলেন!” সে নিচু কিন্তু তীব্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল।


“তো কী করব?” ফারিস রেগে সাদির দিকে তাকাল।


“আরও আড়াইটা বছর এখানে কাটিয়ে দেব?”


“যখন আমি বলেছিলাম যে আপনাকে এখান থেকে বের করে আনব, (জেল থেকে বের করে আনব) তখন নিজেকে নিয়ে জুমারকে আবার বীতশ্রদ্ধ করার কী দরকার ছিল?”


ওর রাগ কমার কোনো লক্ষণই ছিল না, বরং তা আরও বাড়ছিল।


“ও সব সময়ই আমাকে এমনটাই মনে করেন।” তোমার ওই অতি চালাক ফুপ্পু...” সে ব্যঙ্গাত্মক নজরে তাকাল, “...এতটুকুও Detect করতে পারলেন না যে ফারিস গাজী আসলে নির্দোষ!”


এই কথায় সাদি কিছুটা পেছনে সরে বসল। চোখ ছোট করে এক তীক্ষ্ণ নজরে ফারিসের দিকে তাকাল এবং দাঁত চেপে বলল,


“ফারিস গাজী সাহেব, (Faris Ghazi Sahib) আমার ফুপ্পু আপনার চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট আর বুদ্ধিমান। আপনার মতো উনি আবেগ দিয়ে ভাবেন না, Brain দিয়ে ভাবেন। (মাথা খাটিয়ে ভাবেন।)


আর হ্যাঁ, আপনার জায়গায় যদি উনি জেলে থাকতেন, তাহলে আড়াই বছর তো দূরের কথা, আড়াই দিনও লাগত না—বাইরে চলে আসতেন।”


“Thank You Very Much, সাদি! (অনেক ধন্যবাদ, সাদি!) আমি সত্যিই খুব Impressed হলাম!” সে ঠিক ততটাই রেগে মাথা ঝাঁকাল।


“আপনার কি এই ভেবে অবাক লাগছে যে এত স্মার্ট হয়েও ওনার আপনার Innocence-এর ওপর কোনো Belief নেই?”


কিছুক্ষণ পর সে কিছুটা শান্ত স্বরে বলল।


ফারিস কিছু না বলে শুধু ওর দিকে তাকিয়ে রইল।


“মামু, আপনি একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছেন।


ব্যাপারটা Intelligence বা বোকামির নয়।


আম্মুকে দেখুন। আম্মু বিন্দুমাত্র বুদ্ধিমান নন। দুধ চুলায় রেখে ভুলে যান। ওনাকে জিজ্ঞেস করুন, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অ্যাটাক কবে হয়েছিল—ওনার তারিখ বা সাল কিছুই মনে থাকবে না।


কিন্তু উনি বলবেন, ‘তখন সাদি অমুক ক্লাসে পড়ত।’


ওনার ক্যালেন্ডার ওনার বাচ্চাদের জন্ম, তাদের হাঁটা, কথা বলা কিংবা কোন ক্লাসে পড়ত—এসবের ওপর ভিত্তি করে ওনার ব্রেইনে ফিট হয়ে আছে।


আম্মু একদমই সাধারণ, সহজ-সরল।


কিন্তু যখন আমি ওনাকে বলেছিলাম, ‘মামুর ওই Fake Tape-টা শুনে নিন,’ উনি শোনেননি।


শুনলেও উনি বিশ্বাস করতেন না।


ওনার সমস্ত সরলতা সত্ত্বেও ওনাকে আপনার বিরুদ্ধে যত Evidence-ই দেওয়া হোক না কেন, উনি আপনাকে Culprit মনে করবেন না।


জানেন কেন?”


“কারণ ওনার আমার ওপর সেই Trust আছে।


আর...” সে থামল, মাথা নেড়ে সায় দিল।


“...আর ম্যাডাম জুমার আমার ওপর সেই বিশ্বাস নেই!” 


অনেক বছর পর আজ সে এই ধ্রুব সত্যটা বুঝতে পেরেছিল।


“একদম।


উনি আপনাকে Trust করেন না। তাই এখন আকাশ থেকে ফেরেশতারা নেমে এসেও যদি আপনার পক্ষে Witness দেয়, উনি তাও মানবেন না।


কারণ ভাঙা বিশ্বাস জোড়া লাগানো খুব কঠিন।


আর উনি কেনই বা আপনাকে Trust করবেন?


উনি আপনাকে চেনেনই বা কতটুকু?


মাত্র কয়েক মাসের জন্য আপনি ওনার Student ছিলেন।


উনি কখনোই আপনার সঙ্গে Close ছিলেন না।


আপনি কাজের বাইরে ওনার সঙ্গে কোনো কথাও বলতেন না।


এরপর কাজের প্রয়োজনে ওনার সঙ্গে Contact হতো, কিংবা ফ্যামিলি Program-গুলোতে ওনার সঙ্গে শুধু উপর-উপর দেখা হতো। (শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ হতো।)


আর ব্যস।


উনি আপনাকে ওভাবে চিনতেন না, যেভাবে আমরা চিনি।


যেভাবে আম্মু চেনেন।


যেদিন উনি আপনাকে সত্যিকার অর্থে Realize করতে পারবেন, সেদিন থেকেই Trust-ও করতে শুরু করবেন।


তাই, Please, ওনাকে Enemy ভাবা বন্ধ করুন।”


প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে সে বেশ চিন্তিত হয়েই বলছিল।


“জুমার শত্রু নন।




জুমারই একমাত্র মানুষ, যাকে আমি এই লড়াইয়ে আমার পাশে দাঁড় করাতে চাই।


কিন্তু এখন সেটা Possible নয়।


তাই ওনাকে Blame দেবেন না।


আমি আপনাকে বাইরে নিয়ে আসব।


Trust me. (আমাকে বিশ্বাস করুন।)


শুধু কয়েকটা মাস...


আমাকে কয়েক মাস সময় দিন।


আমি আপনাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে আসব।”


বুকের ওপর হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে সে বেশ আকুল হয়েই Request করছিল।


ফারিস হালকা মাথা নেড়ে সায় দিল।


কিন্তু একই সঙ্গে এক তীক্ষ্ণ নজরে ওর দিকে তাকাল।


“আর তুমি কী করবে?”


সাদি একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল।


আঙুল দিয়ে কপাল চুলকাল।


“যা করা দরকার, তা-ই করব।”


“এই... শোনো!”


সে আঙুল তুলে সতর্ক করল।


“কোনো উল্টোপাল্টা Step নেবে না। নয়তো চার দিনের মাথায় তুমি নিজেই এখানে জেলে এসে Locked Up হবে।”


বিরক্তি আর রাগের পেছনে যেন এক অদ্ভুত উদ্বেগ লুকিয়ে ছিল।


সাদি ঠোঁট কামড়ে সামনে এগিয়ে এল।


ঝুঁকে ওর চোখের দিকে তাকাল।


“আমার যা ইচ্ছে, আমি তা-ই করব।


যা করা দরকার, তা-ই করব।


আপনার বেশি প্রবলেম হলে আমাকে Arrest করিয়ে দিন।”


বেশ ঢীঠের মতো কথাগুলো বলে সে উঠে দাঁড়াল।


ফারিস চরম অসহায়ত্ব আর রাগ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।


“কিছু ভুল করার কী দরকার?”




“আমি আপনার ওপর একটা উপকার করতে যাচ্ছি, এই আশায় যে হয়তো কোনো দিন আপনিও আমার ওপর এমন কোনো উপকার করার যোগ্য হবেন।



ওহ, And You Are Welcome. (আপনাকে স্বাগতম।)”


মুচকি হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে সে ওনার সেই Thanks-টা গ্রহণ করে নিল, যা উনি মুখে বলেননি, আর বলবেনও না।


তারপর সে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন সে শুনতে পেল ফারিস কিছুটা ইতস্তত করে বলল—


“শোনো...


আমি একজন মানুষকে চিনি, যে তোমাকে সাহায্য করতে পারে।



🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Samajhta kya hai tu deewane-gaan-e-ishq ko zahid!... Yeh ho jayenge jis jaanib, isi jaanib khuda hoga!


[হে উপাসক! প্রেমের দেওয়ানাদের তুমি কী বা বোঝো!... এরা যেদিকে মুখ ফেরাবে, খোদা স্বয়ং সেদিকেই থাকবেন!]


---


সাদি এক এক পা করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল।


করিডোরের মাথায় বিল্ডিংয়ের ফ্লোর নম্বর লেখা ছিল।


সে হাতে ধরা চিরকুটটার সাথে ঠিকানাটা মিলিয়ে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।


সামনে-পেছনে ফ্ল্যাটগুলোর বন্ধ দরজা দেখা যাচ্ছিল।


সে ডানদিকের দ্বিতীয় দরজার সামনে এসে বেল বাজাল।


“কে?” ভেতর থেকে একটা পুরুষালী আওয়াজ শোনা গেল।


“আমি... আমি আহমেদ শাফির সাথে দেখা করতে এসেছি।”


দরজাটা সামান্য একটু খুলল আর সেই ফাঁক দিয়ে এক তরুণ বাইরে তাকাল।


কপালে এলোমেলো চুল, ট্রাউজার আর শার্ট পরা সেই তরুণের চোখ দুটো ছিল কুচকুচে কালো।


সে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সাদিকে খুঁটিয়ে দেখল, যে জিন্স আর গোল গলার সোয়েটার পরে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকেই তাকাচ্ছিল।


“আমি কোনো পিজ্জা অর্ডার করিনি।” সে চরম বিরক্তিতে দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল।


সাদি জলদি বলে উঠল,


“আমি সাদি। ফারিস গাজীর ভাগ্নে (আমি কি দেখতে কোনো ডেলিভারি বয়ের মতো?)”


বন্ধ করতে করতে সে থমকে গেল, তারপর পুরো দরজাটা খুলে দিল।


এবার সেই তরুণ বেশ মনোযোগ দিয়ে ওকে দেখল, তারপর ঘাড় বাঁকিয়ে ভেতরে আসার ইশারা করল।


সাদি কিছুটা উত্তেজনা আর কৌতূহল নিয়ে ভেতরে ঢুকল।


“আপনি রিসেন্টলি জেল থেকে রিলিজড হয়েছেন, মামু বলেছিলেন।”


ছোট ফ্ল্যাটটার ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে লাউঞ্জের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে কথা বলার ছলে বলল।


জবাবে আহমেদ স্রেফ কাঁধ ঝাঁকাল।


“হুম। আমার লইয়ার সব এভিডেন্স ভ্যানিশ করে দিয়েছিল আর ওই কোঁকড়ানো চুলের ডাইনি প্রসিকিউটরকে শেষ পর্যন্ত চার্জেস ড্রপ করতে হলো।”


সে ওপেন কিচেনে এসে ফ্রিজটা খুলল।


দুটো কোকের ক্যান বের করল, আর সাদি সোফার পাশে দাঁড়িয়ে একদম চুপচাপ ওকে দেখছিল।


“বসো।” সে একই রকম কেয়ারলেস ভঙ্গিতে ইশারা করল, কিন্তু সাদি বসল না।


“ওই কোঁকড়ানো চুলের প্রসিকিউটর আমার আপন ফুপ্পু।”


দাঁত দিয়ে ক্যানের মুখটা খুলতে গিয়ে আহমারের যেন হেঁচকি উঠে গেল।


কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে সে মুখে একটা অ্যাপোলজেটিক এক্সপ্রেশন ফুটিয়ে তুলল।


“আই অ্যাম সরি, আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি। উনি খুব ভালো, আমি ওনাকে ভীষণ রেস্পেক্ট করি। বসো না!”


এক পলকের জন্য সাদি করিডোরের দিকে যাওয়া দরজার দিকে তাকাল, যেন ওখান থেকে এখনই পালিয়ে যেতে চায়।


তবে সে এটা বুঝে গিয়েছিল যে ফার্স্ট ইম্প্রেশন সবসময় পারফেক্ট হয় না, তাই মাথা নেড়ে সোফায় বসল।


আহমেদ দ্বিতীয় ক্যানটা ওর দিকে ছুড়ে দিল, যা সে দুই হাত দিয়ে ক্যাচ করল। (হঠাৎ কেন যেন নওশেরওয়াঁনের কথা মনে পড়ে গেল।)


কয়েক মিনিট পর ওরা দুজনে সোফায় মুখোমুখি বসে ছিল।


সাদি দুই হাঁটু সোজা রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছিল, আর আহমার সোফার পিঠে হাত ছড়িয়ে, এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে পা দোলাতে দোলাতে নিজের কালো চোখ দুটো ছোট করে ওকে দেখছিল।


“আমি চাই জাজ ফারিস গাজীর ফেভারে রায় দিক। এর জন্য আমি কী করব? মামু বলেছিলেন আপনি আমাকে হেল্প করতে পারবেন।”


আহমেদ ক্যানটা ওপরে তুলে একটা চুমুক দিল, তারপর ওটা নিচে নামাল।


ভ্রু কুঁচকে বলল,


“সিম্পল। একটা presentation রেডি করো, ওটাতে গাজীর ফেভারে সব এভিডেন্স পুট করো আর দেখাও যে উনি কত ভালো মানুষ। তারপর ওটা একটা ফ্ল্যাশ ড্রাইভে নাও আর ওই ড্রাইভ জাজের বাড়ি নিয়ে যাও। ওনাকে রিকোয়েস্ট করো ওটা দেখার জন্য, ওনার কম্পিউটারে ওটা রান করো। তারপর ওনার কাছে খুব মিনতি করো যাতে ওনাকে রিলিজ করে দেয়।”


“স্রেফ মিনতি করলেই কি উনি ছেড়ে দেবেন?”


“আরে না ভাই!” আহমেদ বিরক্ত হয়ে নাক দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করল।


“যে ফ্ল্যাশ ড্রাইভ তুমি ওনার কম্পিউটারে প্লাগ-ইন করবে, ওটা ওনার সিস্টেমে একটা mole এন্টার করিয়ে দেবে। এরপর জাজ সাহেব ওই কম্পিউটারে যা কিছু লিখবেন বা দেখবেন, সেটার প্রতি মুহূর্তের আপডেট তোমার কম্পিউটারে চলে আসবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তুমি জাজের এগেইন্সটে ভালো রকম ম্যাটেরিয়াল পেয়ে যাবে। প্রথমে অ্যানোনিমাসলি ওটা ওনাকে পাঠাবে। উনি যদি ভয় পেয়ে যান আর ট্র্যাপে পা দেন, তবে ওপেনলি ব্ল্যাকমেইল করবে। কয়েক মাসের মধ্যে গাজী বাইরে চলে আসবে।”


সাদির মুখ হাঁ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে সে মাথা নাড়ল। (ওয়াও!)


আহমেদ তখন কোকের শেষ চুমুকটা দিচ্ছিল।


“আরেকটা কাজও আছে।”


“বলো।” সে ক্যানটা রেখে সিরিয়াস আর এক্সপেক্ট্যান্ট নজরে সাদির দিকে তাকাল।


সাদি কিছুটা হেজিটেট করছিল।


“একটা রেসপেক্টেড ফ্যামিলির মেয়ের একটা গলফ ক্লাবের রেকর্ডে কিছু footages আছে, যা...”


“কেমন footages? গ্যাম্বলিং? ড্রাগস? নাকি অন্য কিছু?” সে যে আটকে আটকে বলছিল, আহমার ততটাই সরলতার সাথে ডিরেক্ট জিজ্ঞেস করল।


সাদি একটা গভীর নিশ্বাস ফেলল।


ফজরের সময় উঠে কোরআন পড়া মানুষের কাছে এসব আজেবাজে কথা বলাটা একটু বেশিই খারাপ লাগছিল।


“উনি কার্ড খেলছিলেন। অফকোর্স জুয়া।” সে কাঁধ ঝাঁকাল।


“তার মানে footages ভ্যানিশ করতে হবে? হয়ে যাবে। ক্লাবের নাম কী? বাই দ্য ওয়ে, আমার আইডিয়া আছে এটা কোথায় হয়ে থাকতে পারে, যাই হোক—নাম, ডেট আর ওই মেয়ের ছবি সব দিয়ে দাও। আমি করে নেব।”


“কিন্তু আপনি ওনার হাজবেন্ডকে জানাবেন না।” আহমেদ অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল।


“কেন, আমি কি ওনার হাজবেন্ডকে চিনি?”


“মিসেস শেহরীন কারদার।” সে কিছুটা ইতস্তত করে নামটা বলল।


আহমেদ চমকে সোজা হয়ে বসল।


পা থেকে পা নামিয়ে চরম বিস্ময়ে ওর দিকে তাকাল।


“হাশিম কারদার-এর ওয়াইফ? ওহ! এটা তো কারদার সাহেবের জন্য বেশ শেমফুল হবে। ওয়াইফের gambling footages? ছিঃ ছিঃ! এটা তো একটা স্ক্যান্ডাল হয়ে যেতে পারে।”


সে কপালে হাত দিল।


“হাশিম-এর সাথে এমনটা হওয়া উচিত নয়। সে গাজীর কাজিন, আমি ওকে পছন্দ করি না কিন্তু সে একজন ডিগনিফাইড মানুষ। আর তুমি কি ওর ওপর রেগে আছ গাজীর মতো?”


সাদির মুখে ওই নামটা শুনে অপছন্দের ভাব দেখে সে জানতে চাইল।


“সে তো নিজের লেভেল বেস্ট ট্রাই করেছিল গাজীকে বের করার জন্য, কিন্তু ওর বাবা নওশেরওয়াঁন আটকে দিয়েছিলেন। আর উনিও নিজের এডভাইজারের কারণে এমনটা করেছিলেন।”


যেন অনুশোচনার সুরে সে নিজের মাথায় একটা মৃদু থাপ্পড় মারল।


সাদি তীক্ষ্ণ নজরে ওর দিকে তাকাল।


“কোন এডভাইজার? কেউ কি ওনাকে ফারিসকে হেল্প না করার অ্যাডভাইস দিয়েছিল?” জিজ্ঞেস করার সময় ওর ভ্রু জোড়া রাগে কুঁচকে গেল।


আহমেদ আচমকা ওর দিকে তাকাল, তারপর সেন্টার টেবিলটিতে রাখা কাঁচের ফুলদানিটার দিকে নজর দিল, যেটা যদি ভাঙত তবে খুব জোরে আওয়াজ হতো। আউচ!


“...হ্যাঁ, মে বি কেউ অ্যাডভাইস দিয়েছিল। জানি না কে ছিল, আমি জাস্ট ওড়ো ওড়ো খবর শুনেছি!” ঘাবড়ে গিয়ে কথাগুলো বলে সে থুতু গিলল।


সাদি মাথা নেড়ে চুপ হয়ে গেল।


তারপর আসল কাজের কথা মনে পড়ল।


“তো আপনি কি শেহরিনের ফুটেজ ভ্যানিশ করতে পারবেন?” সে ব্যাকুল হয়ে সামনে ঝুঁকে এল।


“হ্যাঁ, কিন্তু টাইম লাগবে। অন্য কাউকে দিয়ে করাতে পারব না, নিজেকেই করতে হবে।”


“আপনার এই সব কিছুতে সময়ের সাথে টাকাও তো লাগবে...” বলতে বলতে সাদি জিন্সের পকেটে হাত দিল, যেন ওয়ালেট বের করতে যাচ্ছে।


কিন্তু আহমেদ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল।


“না, আমি গাজীর ভাগ্নের কাছ থেকে টাকা নেব না।”


“না প্লিজ, আমি আপনাকে হায়ার করছি আর আমি জানি লোকজন আপনাকে এসব কাজের জন্যই হায়ার করে থাকে, সো ন্যাচারালি আমার ভালো লাগবে না যদি আমি...”


“শোনো বাচ্চা।” সিরিয়াসলি বলে সে হাত তুলে সাদিকে আর বলতে দিল না।


“প্রথম কথা, আমি তোমার কাছ থেকে টাকা নেব না। আর দ্বিতীয় কথা—যে পকেটে তুমি হাত দিয়েছ, তোমার ওয়ালেট ওটাতে নেই, বরং অন্য পকেটে আছে। এমব্যারেসড হয়ো না, আমি জানি তুমি নিজের সেলফ-রেস্পেক্টের কারণে বলছ, সো শোনো—আমিও নিজের সেলফ-রেস্পেক্টের কারণেই বলছি। আমি গাজীর ভাগ্নের কাছ থেকে টাকা নেব না।”


সাদি ক্লান্ত হয়ে একটা ঠান্ডা নিশ্বাস ফেলল।


এখন আর নতুন করে লজ্জিত হওয়ার কী আছে?


সে উঠে দাঁড়াল। “থ্যাংকু ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার জন্য।” সে হালকা হাসল।


“এক মিনিট ভাই, এক মিনিট!” আহমেদ উঠে এসে ওর কাঁধে হাত রাখল।


“আমি এটা বলিনি যে ফ্রি কাজ করব। তোমার কাজ হয়ে যাবে, কিন্তু শেহরিন বিবিকে বোলো আমার চেক যেন রেডি রাখেন।”


“ওহ, শিওর!” সে নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হাসল।


“বরং...” আহমেদ থুতনিতে দুটো আঙুল রেখে কিছু একটা ভাবল।


“মিসেস শেহরীন-এর কাছ থেকে ক্যাশ নিয়ো, চেক নয়। উনি যেন এটা জানতে না পারেন যে এই কাজটা তুমি জেল থেকে করাচ্ছ।”


“উনি নিজের হাজবেন্ডকে বলে দেবেন। আর উনি পুরো রাগটা আমার ওপর ঝাড়বেন, এমনেই তো উনি আমাকে অপছন্দ করেন।”


“আরে না। ওনারা দুজন সেপারেট হয়ে গেছেন আর উনি তো নিজেই এটা হাশিম ভাই-এর কাছ থেকে সিক্রেট রাখতে চান।” ওর কথায় আহমেদ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।


“জানো তো মেয়েদের প্রবলেম কী?” কাছে এসে কিছুটা রহস্যের সুরে জিজ্ঞেস করল।


সাদি না সূচক মাথা নাড়ল।


“ওরা কারও না কারও সামনে কখনো না কখনো মুখ ফুটেই ফেলে। সো আজ না হোক, দুই বছর পর উনি হাশিম-কে ঠিকই জানাবেন। Once a Kardar, Always a Kardar। সো...”


সে ভ্রু তুলে ওয়ার্নিং দিল।


“ওকে, বুঝেছি।” ওটার জন্য আবার থ্যাংকস জানিয়ে সে বাইরে যাওয়ার জন্য ঘুরল।


“বাই দ্য ওয়ে, গাজীর কেসের সাথে শেহরিন কারদার-এর কী কানেকশন?” থুতনি চুলকাতে চুলকাতে সে বেশ ভাবুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।


সাদির কদম থেমে গেল।


আহমেদের দিকে ওর পিঠ ছিল, তাই সে থুতু গিলে বেশ কনফিডেন্সের সাথে ঘুরল।


“শেহরিনের ম্যাটারটা একটা পার্সোনাল ফেভার। এটার মামুর কেসের সাথে কোনো কানেকশন নেই।”


“আহাঁ।” আহমেদ মাথা নাড়ল, যেন সে স্যাটিসফাইড।


এর চেয়ে বেশি এ বিষয়ে ওর কোনো ইন্টারেস্ট ছিল না।



🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼


Yeh haqeeqat hai jahan toot ke chaha jaye... wahan bichhadne ke bhi imkaan hua karte hain


[এটা এক নির্মম সত্য, যেখানে বুক উজাড় করে ভালোবাসা থাকে... সেখানে হারিয়ে যাওয়ার বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও ঠিক ততটাই থাকে।]


---


কারদার প্যালেসের ওপর তখন সন্ধ্যার এক ঘন কালো অন্ধকার নেমে এসেছে, যখন হাশিম বাইরের দরজা পেরিয়ে লাউঞ্জে ঢুকল।


একজন পরিচারক ওর ব্রিফকেস হাতে নিয়ে পেছনে পেছনে আসছিল।


জওয়াহেরাত নিজের সেই চেনা উঁচু চেয়ারটায় বসেছিল আর নওশেরওয়াঁন ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।


ওরা দুজনে কোনো একটা বিষয়ে কথা বলছিল, কিন্তু হাশিমকে দেখেই চুপ হয়ে গেল।


রোজকার নিয়মের বাইরে গিয়ে সে আজ সরাসরি ওপরে চলে গেল না।


টাইয়ের নটটা আলতো করে আলগা করতে করতে কাছের একটা সোফায় এসে বসে পড়ল।


ওকে ভীষণ ক্লান্ত আর গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখাচ্ছিল।


“সব ঠিক আছে তো?” জওয়াহেরাত এক সতর্ক নজরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল।


“আজ সাদি এসেছিল।” মাথার নিচে দুহাত দিয়ে বালিশের মতো বানিয়ে, টেবিলের ওপর পা দুটো তুলে সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে এক ধ্যানী সুরে সে কথাটা বলতেই জওয়াহেরাত আর নওশেরওয়াঁন একে অপরের দিকে না তাকিয়ে পারল না।


“কেন? কী বলছিল ও?” গলার মুক্তোর মালায় অকারণেই হাত বোলাতে বোলাতে সে খুব ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করল, তবে ওর চোখে এক চরম অস্বস্তি আর ব্যাকুলতা ফুটে উঠেছিল।


জবাবে সে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা অবস্থাতেই পুরো ঘটনাটা এক এক করে বলে গেল।


সব শুনে জওয়াহেরাতের টানটান হয়ে থাকা স্নায়ুগুলো যেন শিথিল হয়ে এল, আর নওশেরওয়াঁনও একটা স্বস্তির দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।


“আমি যখন লইয়ার চেঞ্জের ব্যাপারে ওকে জাস্ট জিজ্ঞেস করলাম, ও হুট করে খেপে উঠল। ও কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলেনি। আমার মনে হলো ও স্রেফ ঝগড়া করার একটা বাহানা খুঁজছিল।”


তারপর সে হুট করে চমকে উঠে ঘাড় ঘোরাল।


ফিওনা স্প্রে বোতল হাতে নিয়ে ওখান দিয়ে যাচ্ছিল।


হাশিম ওকে ডাক দিতেই সে থমকে দাঁড়াল।


“তুমি সাদিকে চেনো তো? ও কি আজ এ বাড়িতে এসেছিল?” ফিওনা উত্তর দেওয়ার আগে এক পলকের জন্য জওয়াহেরাতের দিকে তাকাল, যে প্রায় দম বন্ধ করে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল।


তারপর সে হাশিমকে দেখে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।


“No sir. লাস্ট টাইম আমি ওনাকে চার দিন আগে এখানে দেখেছিলাম।”


হাশিম মাথা নেড়ে ওকে চলে যাওয়ার ইশারা করল।


“আপনার সাথে কি ওর কোনো কথা হয়েছে?” এবার সে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে জওয়াহেরাতকে উদ্দেশ্য করে জানতে চাইল।


“না তো, কেন? ওর সাথে আমাদের আবার কীসের সম্পর্ক?”


“না, আসলে আমার মনে হলো ও ঝগড়া করার বাহানা খুঁজছিল। মন খারাপ ছিল অন্য কোনো কারণে, আর রাগটা ঝাড়ল অন্য কোথাও।”


তারপর আলতো করে মাথা ঝাঁকাল।


“হয়তো আমি একটু বেশিই ভাবছি। তবে আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে, এতগুলো বছর ধরে যে ছেলের সাথে আমি এতটা স্নেহ আর ভালোবাসার সাথে বিহেভ করে এসেছি, সে হুট করে আমার সাথে এমন আচরণ কীভাবে করতে পারল?”


সে মনে বেশ আঘাত পেয়েছিল।


নওশেরওয়াঁন নিজের মুখের বিরক্তিটা কোনোমতে delicately লুকিয়ে রাখল।


“ও তো আসলে এমনই। অভদ্র আর অকৃতজ্ঞ। আপনিই ওর আসল রূপটা চেনতে বড্ড দেরি করে ফেললেন। কিন্তু আমি জানি, আপনি এখনও ওর প্রতি সেই ছোট ভাইয়ের মতোই সফট কর্নার ধরে রাখবেন।”


“আর নয়।” হাশিমের মুখের সেই কোমলতা নিমেষেই মিলিয়ে গেল।


চোখে এক কঠিন কঠোরতা নেমে এল।


ওর মনে সাদির জন্য যে দেওয়ালটা তৈরি হয়ে গেল, তা চিরতরের জন্যই হয়ে গেল।


“আজ ও যেভাবে অভদ্রতা করল, আমি আর কোনোদিন ওর মুখও দেখতে চাই না।”


টেবিল থেকে পা দুটো নিচে নামিয়ে সে ঝুঁকে নিজের বুটের ফিতে খুলতে লাগল।


“এটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।” জওয়াহেরাত আলতো করে হাসল আর নওশেরওয়াঁনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।


নওশেরওয়াঁনকেও এখন বেশ রিল্যাক্সড দেখাচ্ছিল।


ফিতে খোলা শেষ করে হাশিম সোজা হয়ে বসল এবং পকেট থেকে একটা কি-চেইন বের করে নওশেরওয়াঁনের দিকে ছুড়ে দিল, যা সে একদম পারফেক্ট টাইমিংয়ে ক্যাচ করল।


তারপর ওটা উল্টেপাল্টে দেখে ওতে চারটে চাবি ঝুলতে দেখল।


“এটা কী?”


“তোমার নতুন গাড়ি।” ওভাবেই বসে মাথা তুলে সে এক ক্লান্ত হাসি হাসল।


নওশেরওয়াঁন চরম অবিশ্বাস নিয়ে একবার ওর দিকে আর একবার চাবিগুলোর দিকে তাকাল।


“না, এটা সেই স্পোর্টস কার নয় যেটা তুমি চেয়েছিলে। সেটার বদলে একটা executive luxury car দিয়ে আমি তোমাকে এটাই বোঝাতে চাই নওশেরওয়াঁন যে, তোমার যে কোম্পানিটা Dad তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন, ওটা আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। লাইফে তুমি যা চাইবে তার সবকিছুই তুমি পাবে না, বরং সেটাই তোমাকে দেওয়া হবে যা তোমার জন্য পারফেক্ট।”


সে আবার এক মৃদু হাসি হাসল।


“Thank you so much ভাই!” সে একই সাথে সারপ্রাইজড আর হ্যাপি হয়ে দ্রুত বাইরে দৌড়ে চলে গেল।


হাশিম এবার সোফা ছেড়ে উঠে ওপরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।


জওয়াহেরাত মুখে এক প্রশান্তির হাসি নিয়ে পরম তৃপ্তি আর স্বস্তির সাথে দুই ছেলের চলে যাওয়া দেখছিল।


সে যখন লাউঞ্জে একদম একা হয়ে গেল, তখন টেবিলে রাখা নওশেরওয়াঁনের ফোনটা বিপ করে উঠল।


কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে মোবাইলটা তুলে দেখল।


শেহরিনের একটা মেসেজ এসেছে।


খুব ক্যাজুয়াল একটা কথাই লেখা ছিল ওতে, কিন্তু জওয়াহেরাতের ভ্রু কুঁচকে গেল।


সে এক গভীর ভাবনায় বাইরের দরজার দিকে তাকাল যেখান দিয়ে নওশেরওয়াঁন বাইরে গিয়েছিল, তারপর স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে মেসেজটা ডিলিট করে দিল।


ফোনটা আবার আগের জায়গায় রেখে সে ঠিক আগের মতোই রাজকীয় ভঙ্গিতে সেই চেয়ারটায় বসে রইল, যা স্রেফ কোনো রানীর জন্যই মানায়।


টানটান সোজা ঘাড়, এক উদাসীন অথচ তাচ্ছিল্যের হাসি আর এক বিশাল সাম্রাজ্য জয়ের স্বপ্নে চকচক করতে থাকা দুটো চোখ।


সে এখন একদম স্বাধীন।


অওরঙ্গজেবের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে পুরোপুরি মুক্ত।


তাই পরের দেড়টা বছর বড্ড চমৎকার কেটেছিল।


হাশিম বিজনেস থেকে শুরু করে ঘরসংসার—সব একহাতে সামলে রেখেছিল।


সোনি থাকত শেহরিনের কাছে, মাঝে মাঝে ও এ বাড়িতে বেড়াতে এলে ভালো লাগত।


শেহরিনের আসাটা অবশ্য ওর একদমই পছন্দ হতো না, কিন্তু সে আপাতত বড্ড ধৈর্যের সাথে ওকে সহ্য করে যাচ্ছিল।


শেহরিনের প্রতি নওশেরওয়াঁনের বাড়তে থাকা সফট কর্নারটাও ওর নজর এড়ায়নি, কিন্তু এখন ওটাকেও সহ্য করা ছাড়া উপায় ছিল না।


সাদি আর ওর ফ্যামিলির জন্য এ বাড়ির দরজা এখন চিরতরে বন্ধ।


সোনির বার্থডে পার্টিতে (যা অওরঙ্গজেবের মৃত্যুর প্রায় পাঁচ মাস পরে হয়েছিল) সে সাদিকে ইনভিটেশন কার্ড পাঠিয়েছিল কিন্তু সে আসেনি।


হাশিমও এখন আর ওর কথা তুলত না, স্রেফ দু-একবার ছাড়া যখন সে বলেছিল যে সাদিকে ইদানীং ওর আশেপাশে দেখা যাচ্ছে—কখনো কোনো হোটেলে তো কখনো অন্য কোনো পাবলিক প্লেসে, যেন ও কোনো কিছুর পিছু নিয়েছে।


জওয়াহেরাত তখন ওটা ইগনোর করেছিল।


কিন্তু হাশিম খুব বেশিদিন এই ম্যাটারটা ইগনোর করতে পারত না।


এতদিন সে এই দিকে মন দিতে পারেনি কারণ বাবার মৃত্যুর পর সবকিছু takeover করা, বিজনেস হ্যান্ডেল করা—এই সব ঝামেলার মাঝে সে বড্ড বেশি বিজি হয়ে পড়েছিল।


এমন পরিস্থিতিতে কারই বা এত সময় থাকে যে জেলে পচে মরা কাজিন কিংবা তার ভাগ্নেকে নিয়ে চিন্তা করবে?


কিন্তু ঠিক যেদিন ওর মনে সাদিকে একটু চেক করার আইডিয়াটা এল, ঠিক সেই দিনই ফারিস জেল থেকে রিলিজড হয়ে ওদের জীবনে আবার ফিরে এল।


আর অমনি এক শান্ত নদীর বুকে যেন এক বিশাল পাথর এসে আছড়ে পড়ল।


আজ দেড় বছর পরের এই এক নিঝুম বিকেলে, যখন জওয়াহেরাত জুমার বাড়ি থেকে ফারিসের সাথে ফিরে এসেছিল এবং নিজের এই ফাঁকা বাড়ির চেনা উঁচু চেয়ারটায় বসেছিল, তখন নিজের কানের দুলটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে ওর ভেজা চোখে সেই অতীতগুলো ভেসে উঠছিল, যা ও কোনোদিন মনে করতে চায়নি।


আর হ্যাঁ, একটা কথা সে আজও খুব ভালো করেই জানত—হাশিম মুখে স্বীকার করুক আর না-ই করুক, সে আজও সাদিকে মনে মনে ভালোবাসত।


সে আজও ওকে বড্ড মিস করত।


তাহলে অবশেষে আমরাও দেড় বছর আগের সেই কনকনে শীতের অতীত গল্পটাকে ওখানেই দাফন করে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ‘বর্তমান’-এর এই গ্রীষ্মকালের দিকে এগিয়ে যাই, যেখানে ফারিস গাজীর মুক্তির পর সবার জীবন এক অদ্ভুত নিয়মে বদলে যাচ্ছিল।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Ruk gaya main saza se kuch pehle... usko ehsaas khud khata ka tha


[শাস্তি পাওয়ার ঠিক কিছু মুহূর্ত আগে আমি থমকে গেলাম... কারণ নিজের ভুলটা সে ততক্ষণে নিজেই অনুধাবন করতে পেরেছিল।]


---


ইউসুফ সাহেবের আলোকিত বাড়িটার ওপর ধুলোমাখা এক তপ্ত সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।


তিনি ড্রয়িংরুমের ঠিক সেই জায়গাটাতেই হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন, যেখানে দুপুরবেলা জওয়াহেরাত আর ফারিস আসার সময় বসেছিলেন।


তবে এখন চারপাশের মানুষগুলো বদলে গেছে।


নুদরাত সামনের সোফায় বসে নিচু স্বরে বড় আব্বাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।


আর সাদি—যে অফিস থেকে ফারিসের ফোন পেয়ে প্রায় এক কাপড়ে আম্মুকে নিয়ে এখানে ছুটে এসেছে—সে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত না-সূচক মাথা নাড়ছিল।


তারপর সে বড় আব্বার দিকে ফিরল, ওর মুখাবয়বে এক তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি স্পষ্ট ছিল।


“আপনি কীভাবে নিজের মুখে এই কথাটা ফারিস মামুকে বলতে পারলেন? অন্তত আম্মু কিংবা আমার সাথে তো একবার ডিসকাস করতেন! উনি আমাদের ব্যাপারে কী ভাববেন?”


“তোমার এত বেশি কথা বলার কোনো দরকার নেই, সাদি।” নুদরাত বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন।


“আজকালকার দিনে মেয়ের বাড়ির পক্ষ থেকে বিয়ের কথা তোলাটা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, আর এতে ভুলটাই বা কী? জুমারের যখন কোনো অবজেকশন নেই, তখন তুমি কেন এত হাইপার হচ্ছ?”


“আপনি ঠিক যে জায়গাটাতে বসে আছেন, ঠিক এইখানেই গত সপ্তাহে ফারিস মামু বসে ছিলেন, যখন জুমার এসে ওনাকে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছিল!” সে আঙুল উঁচিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সোফাটার দিকে ইশারা করল।


নুদরাত অবজ্ঞাভরে একটু নড়েচড়ে বসলেন।


“আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে জুমার এই বিয়েতে রাজি হয়েছে।” সে চরম দৃঢ়তার সাথে মাথা নাড়ল।


বড় আব্বা ঘাড় তুলে এক তীব্র অসহায়ত্ব নিয়ে ওর দিকে তাকালেন।


“ও পুরোপুরি মন থেকে রাজি হয়নি, জাস্ট আমাকে বলেছে যে আমার যা ইচ্ছে আমি যেন তা-ই করি।”


“তার মানে আপনারা ওনার ওপর মেন্টাল প্রেশার ক্রিয়েট করছেন! এমনটা করবেন না বড় আব্বা।” সে বেশ রুষ্ট হলো।


“আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়েই গত সপ্তাহে তুমি নিজে আমাকে বলেছিলে সাদি, যে আমি যেন জুমারের বিয়েটা ফারিসের সাথেই দিয়ে দিই।”


সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।


“কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওনাকে জোর করে এই ডিসিশনটা নিতে বাধ্য করা হবে।”


“তাহলে যাও বাবা, জুমারের সাথে গিয়ে কথা বলো। ওকে জিজ্ঞেস করো কোনো প্রেশার ছাড়া ও নিজে আসলে কী চায়। ও যা চাইবে, আমি ঠিক তা-ই করব।”


সাদি ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।


সে বড্ড বিভ্রান্ত আর একই সাথে ভীষণ বিরক্ত ছিল।


কোন জিনিসটা ওকে এতটা বাঁধা দিচ্ছে, তা সে নিজেও মেলাতে পারছিল না।


“এই সব কিছুর মধ্যে মিসেস কারদার-এর  ইন্টারফিয়ারেন্স আমার একদম পছন্দ হয়নি বড় আব্বা। উনি জুমারের বিয়ের জন্য এত উদগ্রীব কেন?”


“আমিই ওকে বলেছিলাম যেন ও জুমারকে বিয়ের জন্য কনভিন্স করে। ও আমার রিকোয়েস্টেই মাঝখানে এসেছে।”


ওনার এই এক্সপ্লেনেশনের পর সাদি চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের চুলে হাত চালাল।


“আমি জানি না, তবে আমার কাছে এটা মোটেও ঠিক মনে হচ্ছে না।”


আর এই চিন্তিত মুখ নিয়েই সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।


লনের চারপাশটা সন্ধ্যার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল।


সে বারান্দার সিঁড়িতে বসে কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় মগ্ন রইল।


তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে জওয়াহেরাতের নম্বর ডায়াল করল।


ফোনটা কানে ঠেকিয়ে, গম্ভীর চোখ আর এক তীব্র টানটান উত্তেজনা নিয়ে সে ওপাশ থেকে আসা রিংটোন শুনতে লাগল।


“সাদি!  এত দিন পর ফোনে তোমার আওয়াজ শুনলাম। মাঝে আমাদের জন্যও একটু সময় বের করে নিও।” ওপাশ থেকে সে বেশ নরম ও মধুর সুরে কথা বলে উঠল।


“আপনি এমনভাবে আফসোস করছেন যেন আপনি নিজেও জানেন না যে আমার জন্য এখন কারোরই কোনো সময় থাকে না।” মনে তীব্র ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও সে নিজেকে খুব একটা রুক্ষ দেখাতে চাইল না।


সবকিছুর পরেও হাশিমের মায়ের থেকে হাশিমের সমস্ত অপকর্মকে সে সবসময় আলাদাই রাখত।


“সেদিন রাতে বিয়েবাড়িতেও তুমি আমার সাথে ওভাবে কথা বললে না। সোনির পার্টিতে ওই নেকলেসের ইনসিডেন্টটা নিয়ে...”


“মিসেস কারদার, আজ আপনি কী করেছেন?” সে বড্ড কর্কশ আর শুকনো গলায় ওনার কথা মাঝপথেই কেটে দিল।


ওপাশ থেকে তড়িৎ জবাব এল, “আর কী করেছি আমি?”


“আমি জানি না আপনি কেন জুমার আর ফারিসের বিয়ে দিতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে রিজন যাই হোক না কেন, আমি বড় আব্বাকে বলে দিয়েছি যে এই বিয়ে করার কোনো দরকার নেই।” সে কঠোর গলায় বলে যেন কথাটার ওখানেই ইতি টানল।


“তৃতীয়বারের মতো, সাদি?” সে বেশ মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে হেসে উঠল, যা সাদিকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলল।


“Sorry?”


“প্রথমবার ছোটবেলায় জুমারের যৌতুকের জিনিসে আগুন লাগানো, আর দ্বিতীয়বার চার বছর আগে জুমারকে একটা ডেঞ্জারাস কেসের মুখে ঠেলে দেওয়া। দু-দুবার তুমি ওর বিয়ে হতে দাওনি। এবার কি তৃতীয়বারের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে?”


“Excuse me?” এক চরম অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে সে ফোনটা কান থেকে সরিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।


“খুব একটা কঠিন কথা তো বলিনি। তুমি নিজেই তো আমাকে বলেছিলে—ছোটবেলায় ও যখন তোমাকে ওর বিয়ের পুতুল আর জিনিসপত্র দেখাচ্ছিল, তারপর ও ওখান থেকে চলে যায় আর তুমি ওখানে খেলছিলে। খেলতে খেলতেই নাকি আগুন লেগে যায় আর ওর সব জিনিস পুড়ে ছাই হয়ে যায়।”


“আমি তখন মাত্র দশ বছরের এক বাচ্চা ছিলাম, মিসেস কারদার!” এতক্ষণ ধরে মুখের সেই টানটান এক্সপ্রেশন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল, আর সে এক ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল।


“আর তুমি খুব ভালো করেই জানতে যে তুমি আসলে কী করছিলে।” ওপাশ থেকে জওয়াহেরাত হয়তো মুচকি হাসছিল।


“খেলতে খেলতে আগুন লাগেনি সোনা। তুমি ওটা জানবুঝেই লাগিয়েছিলে।” সে এক পরম তৃপ্তির সুরে ফিসফিস করল, আর সাদি যেন নিজের নিঃশ্বাস আটকে পাথর হয়ে বসে রইল।


“আমি তখন মাত্র দশ বছরের এক শিশু ছিলাম, মিসেস কারদার...”


কিন্তু ওপাশ থেকে কথা চলতেই থাকল।


“ও তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল আর বিয়ের পর ও করাচি চলে যেত। তুমি বড্ড জেলাস আর ইনসিকিউরড ফিল করছিলে। তুমি যখন আমাকে গল্পটা বলেছিলে, তখনই আমি তোমার চোখ জোড়া পড়ে নিয়েছিলাম বাছা। ওই আগুন তুমি নিজেই লাগিয়েছিলে।”


“আমি তখন স্রেফ দশ বছরের ছিলাম, মিসেস কারদার...” বড্ড কষ্টে কথাটুকু উচ্চারণ করে সে নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল।


চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।


“কিন্তু এখন তো তুমি আর দশ বছরের নও। এখন অন্তত ম্যাচিউরড হও আর নিজের ফুপ্পুকে নিজের মতো করে লাইফটা লিভ করতে দাও। ওর সম্পর্কের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ো না। কারণ যখনই তুমি মাঝখানে আসো, ও স্রেফ সাফার করে।”


“আপনি... আপনি এই কথাগুলো এই জন্য বলছেন যাতে... যাতে আমি নিজেকে এই ম্যাটার থেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিই আর আপনার যে নোংরা পারপাস আছে, তা সাকসেসফুল হয়।” সে নিজের দুর্বল কণ্ঠস্বরকে সামলানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করল।


“হ্যাঁ, আমি এই জন্যই বলছি, কিন্তু এটাই তো আলটিমেট ট্রুথ। তাই নয় কি?”


আর এক মুহূর্তের স্তব্ধতার পর ওপাশ থেকে কলটা কেটে গেল।


সাদি কতক্ষণ যে চুপচাপ ওই সিঁড়িতে বসে রইল, তার হিসাব নেই।


পায়ের কাছে জন্মানো ঘাসগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে অনবরত নিজের ঠোঁট কামড়ে যাচ্ছিল।


সে খুব ভালো করেই জানত জওয়াহেরাত ওকে মেন্টালি ডিস্টার্ব করার জন্যই এই চালটা চেলেছে, কিন্তু কোনো চালের পেছনের উদ্দেশ্যটা জানা থাকলেই যে ডিস্টার্বড হওয়া থেকে বেঁচে যাওয়া যায়—এমনটা তো নয়।


🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼



Main dalail par takiya kar betha... Aah! woh waqt ilteja ka tha




​[আমি যুক্তির ওপর ভরসা করে বসে রইলাম... হায়! ওটাই তো ছিল মিনতি করার আসল সময়।]


---


বেশ কিছুক্ষণ পর সে যখন উঠে ঘরের ভেতরে এল, তখন নুদরাত আর বড় আব্বা অনবরত ওই একই বিষয় নিয়ে ডিসকাশন করে যাচ্ছিলেন।


সে যে মুখ নিয়ে বাইরে গিয়েছিল, সেই মুখ নিয়ে ফিরে আসেনি।


তাই ওদের দুজনকে ওভাবেই রেখে সে করিডোর বেয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল।


লাউঞ্জে টিভি চলছিল আর ঘরের কাজের ছেলে সদাগত একটা টুলের ওপর বসে পেঁয়াজ ছিলতে ছিলতে স্ক্রিনে চোখ জমিয়ে রেখেছিল।


ওকে আসতে দেখে সে কিছুটা লজ্জিত হয়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু সাদি ওদিকে পাত্তা না দিয়ে আরও সামনে এগিয়ে গেল।


জুমারের ঘরের দরজায় নক করল, তারপর ওটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।


জুমার নিজের স্টাডি টেবিলটায় বসে ছিল।


ফাইলের ওপর ঝুঁকে থাকা অবস্থায় টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছিল আর সে ঘাড় বাঁকিয়ে কলম দিয়ে কিছু একটা লিখছিল।


পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে মুখ তুলল।


সাদিকে দেখে ওর বাদামি চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত কোমলতা নেমে এল আর সে মুচকি হাসল।


“এসো সাদি!” সামনের কাউচটার দিকে ইশারা করল।


সে একদম নিশ্চুপ হয়ে ওখানে এসে বসে পড়ল।


“তা কী খবর? কী হচ্ছে?” ফাইলটা বন্ধ করতে করতে সে বড্ড মায়াবী সুরে জিজ্ঞেস করল।


সাদি বড্ড কষ্টে মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল।


“এই তো, জব চলছে। আপনি...” সে একটু থামল।


মাথাটা এখনও নিচু হয়েই ছিল।


“আব্বা পাঠিয়েছেন আমার সাথে কথা বলার জন্য?”


“হ্যাঁ, কিন্তু... আমি আপনার সাথে ওই বিষয়ে কোনো কথাই বলতে চাই না।”


জুমার নিজের সেই চেনা ফ্ল্যাট আর এক্সপ্রেশনলেস ভঙ্গিতে নিজের পয়েন্টগুলো গুছিয়ে নিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সাদির এই একটা কথাই ওকে থামিয়ে দিল।


সে বেশ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতে লাগল।


“তাহলে...?”


“বড় আব্বা বলেছেন যে আপনি এই বিয়েতে রাজি আছেন। আমি স্রেফ আপনাকে এটাই বলতে এসেছি জুমার, যে আপনি লাইফের যে ডিসিশনই নিন না কেন, আমি সবসময় আপনার পাশে থাকব।”


মাথা নিচু করে নিজের আঙুলগুলো মলতে মলতে সে এক বুঁজে যাওয়া গলায় বলছিল।


“আপনি কোনো প্রেশার বা অবলিগেশনের আন্ডারে এসে কোনো ডিসিশন নেবেন না, এটা আপনার নিজের লাইফ। আমি আপনাকে পুরোপুরি সাপোর্ট করব।”


জুমার আলতো করে মাথা নাড়ল।


যেন সব শব্দ আচমকা ফুরিয়ে গেছে।


“আমি এটাও জানি যে এই সব কিছুর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রিজন আছে। আপনি ওনাকে মনে মনে চরম ঘৃণা করেন, আর তা সত্ত্বেও আপনি ওনাকে বিয়ে করার ডিসিশন নিচ্ছেন...”


জুমারের আপাত শান্ত মুখে এক অদ্ভুত অন্ধকারের ছায়া খেলে গেল, কিন্তু সাদি সেদিকে তাকাচ্ছিল না।


সে মাথা নিচু করেই একটানা বলে যাচ্ছিল।


“আপনার মন ওনার প্রতি বিন্দুমাত্র নরম হয়নি, কিন্তু এই সব কিছুর পরেও যেহেতু আপনি ওনাকে বিয়ে করতে চলেছেন, তাই আমি আপনার কাছ থেকে স্রেফ একটা জিনিস চাই।”


সে নিজের ঝুঁকে থাকা চোখ দুটো তুলে জুমারের দিকে তাকাল, যে প্রায় দম বন্ধ করে ওর কথা শুনছিল।


“আপনি কি আমাকে promise করছেন যে আপনি ফারিস মামুকে কোনোদিনও ঠকাবেন না?”


জুমার ঢোক গিলল।


ওর চোখ দুটো তখন ওই কোঁকড়ানো চুলের সুন্দর ছেলেটার ওপর আটকে ছিল, আর ঠোঁট দুটো ছিল একদম নীরব।


“আপনি কি আমার সাথে promise করবেন যে আপনি কোনোদিনও ওনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো হার্ম পৌঁছাবেন না?” সে এক চরম ও ভয়াবহ ভীতি মিশ্রিত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল।


জুমার অকারণেই মুখ ঘুরিয়ে একবার টেবিলটা দেখল, তারপর ল্যাম্পটা, তারপর ফাইলগুলো এবং সবশেষে আবার সাদির দিকে তাকাল।


এত বড় একটা প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিশোধের সমস্ত আগুনকে এক নিমেষেই নিভিয়ে দেয়?


“আমি... আমি ওনার কোনো ক্ষতি করব না। I promise!” কয়েক মুহূর্ত পর সে সাদির চোখের দিকে তাকিয়ে কথাটি বলল এবং আরও একবার ঢোক গিলল।


সাদি একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে নিজের ভ্রুর ওপর হাত রেখে মাথাটা নিচু করে দিল।


যেন ওর টানটান হয়ে থাকা স্নায়ুগুলো এতক্ষণে একটু রিলিজ পেল।


জুমার তখনও চোখের পলক না ফেলে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল।


তারপর সে মাথা তুলল।


একটু হাসল এবং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।


“আমি আপনার সাথে আছি। আপনি যা চাইবেন, আমি ঠিক তা-ই করব আর করাব।”


জুমার এক ফ্যাকাসে হাসি হাসল। (আর যখন এই প্রতিশ্রুতিটা ভেঙে যাবে, তখন ও আমার সম্পর্কে কী ভাববে?)


“আব্বা চান আমি ওনাকে বিয়ে করি, সো আমি করে নেব সাদি।”


“আমি বললাম না, আমি আপনার সাথে আছি।” সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, তারপর একটু থামল।


মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে এক গভীর বিষাদে রূপ নিল।


মাথা নিচু করে না ঘুরেই সে বড্ড ধিমে আওয়াজে বলল,


“আর আমাকে ক্ষমা করে দেবেন আমার সেই সব কিছুর জন্য, যা কোনো না কোনোভাবে আপনাকে হার্ট করেছে। I am sorry জুমার, আমি ইচ্ছা করে কিছু করি না, তাও কেন যেন আমার কারণেই সবসময় কিছু না কিছু ভুল হয়ে যায়...”


আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।


জুমার নিজের রগটা আঙুল দিয়ে টিপে ধরল।


ওর মনে হলো ওর আঙুলগুলো কাঁপছে।


চেয়ারটা ঘুরিয়ে ডানদিকে ফিরতেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা সামনে ভেসে উঠল এবং আয়নায় ওর নিজের প্রতিবিম্বটাও।


চেয়ারে বসে থাকা কোঁকড়ানো সুন্দর চুলের এক মেয়ে, যার নাকের নোলকটা জলজল করছিল, কিন্তু চোখ দুটো ছিল ভীষণ বিপর্যস্ত।


ঠিক তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠল।


সে চমকে উঠল।


একটা আননোন নম্বর শো করছিল স্ক্রিনে।


নিজের সমস্ত চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সে মোবাইলটা কানের কাছে ধরল।


“Hello.”


“Prosecutor! এবার নিশ্চয়ই আমাকে চিনতে পেরেছেন আপনি?”


আর সে ফারিসের গলার আওয়াজ চিনতে পারবে না—এমনটা কী করে হয়?


ওর মুখের চিন্তিত ভাবটা পলকেই বদলে গেল।


চোখ দুটো হয়ে উঠল অত্যন্ত গম্ভীর আর নিস্পৃহ।


“কোথায়?”


“হ্যাঁ ফারিস, বলুন।”


“আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনি খুব ভালো করেই জানেন আমি কেন দেখা করতে চাইছি। টাইম আপনি ডিসাইড করুন, প্লেস আমি বলব।”


সে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে মনের ভেতরের সমস্ত তিক্ততাটুকু গিলে নিল, তারপর এক স্বাভাবিক ও সমান্তরাল কণ্ঠে বলে উঠল, “Okay, কাল বিকেল চারটায় আমি দেখা করতে পারি। তবে ঠিক সেই রেস্তোরাঁতেই, যেখানে আপনাকে ডেকে আমি গুলি করেছিলাম! কেন? ঠিক আছে তো?”


জুমারের চোখের শীতলতা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।


“Sure.”


আর মোবাইলের বাটনটা জোরে প্রেস করে সে কলটা কেটে দিল।


চারপাশটা যেন স্রেফ যন্ত্রণায় ছেয়ে গেল।






চলবে,,,




 

Comments

Popular posts from this blog

মুসহাফ - পর্ব: ০৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ০৪ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)

মুসহাফ - পর্ব: ১৩ (অনুবাদে: রেজওয়ান হোসেন মাসুম) (ফারিস্তে_ইব্রাহিম) (মেহমিল_ইব্রাহিম) (হুমায়ুন_দাউদ) (ফাওয়াদ_কারীম)